অতঃপর প্রণয়,পর্ব:৫

অতঃপর প্রণয়,পর্ব:৫
অরিত্রিকা আহানা

আয়াজ হেলাল সাহেবের সামনে চুপচাপ বসে আছে।তাকে কেন ডাকা হয়েছে সে জানে না।হেলাল সাহেব নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন।ছেলের দিকে তাকিয়ে মধুর হাসি হেসে বললেন,

—“বাবার তোর সাথে কিছু কথা আছে।”

—“বলো বাবা।”

—“যদিও এখন এইসব বলা ঠিক না।তবুও জানিয়ে রাখা ভালো।তুই পাশ করে বেরিয়েছিস।ইন্টার্নি শেষ হলে তোর বিয়েশাদী দিতে হবে।তাই তোর মা বলল তোকে আগে থেকেই যেন সব জানিয়ে রাখাই ভালো।”

—“বিষয়টা কি বাবা?”

—” ইরিন!”

আয়াজের ভ্রু জোড়া অটোমেটিক কুঁচকে গেলো।ইরিনের প্রসঙ্গে হেলাল সাহেব কি কথা বলবেন সে বুঝে উঠতে পারছে না।

—“আমার আর তোর মায়ের ইরিনকে খুব পছন্দ,তোর মা বলছিলো তোদের দুজনকে খুব মানাবে,আমারও তাই মত!”

আয়াজের হাসি পাচ্ছে।কেন পাচ্ছে সে নিজেও জানে না।হাসি চেপে চুপ করে বসে রইলো সে।ইরিন বাস্তবিকই প্রচন্ড সুন্দরি।ওদের এপার্টমেন্ট সুন্দরী অবিবাহিতা মেয়ে হিসেবে প্রচুর জনপ্রিয়তা আছে তার।
হেলাল সাহেব ছেলের মনোভাব উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন।আয়াজ হালকা হেসে বলল,

—“আমাকে কি করতে হবে বাবা?”

—” ইরিনের আম্মারও তোকে খুব পছন্দ। ছোটবেলা থেকেই তোকে খুব পছন্দ করেন তিনি।তোর মা উনার সাথে আলাপ করেছে।উনাদের কোন আপত্তি নেই।এখন তোর মতামত জানতে চাইছি।”

সরাসরি বাবার সামনে সম্মতি প্রকাশ করতে লজ্জা লাগছে আয়াজের।বলল,

—“বাবা,ইরিনের সামনে এইচএসসি পরীক্ষা।এখন এসব আলোচনা ওর কানে গেলে তো পড়াশোনা লাটে উঠবে।কন্সট্রেশন নষ্ট হয়ে যাবে।”

ছেলে জবাবে হেলাল সাহেব ছেলের উত্তর বুঝে গেলেন। ছেলেকে আশ্বস্ত করে বললেন,

—“ইরিন কিচ্ছু জানবে না।আমি তোকে কথা দিচ্ছি।ইরিনের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা এই ব্যপারে তাকে কিচ্ছু জানাবো না।”

আয়াজ চুপ করে রইলো।হঠাৎ করেই বাবার সামনে বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে।হেলাল সাহেব ধীর কন্ঠে বললেন,

—“আসলে সামনের বছরই ইরিনরা এই বাসা থেকে শিফট হয়ে যাচ্ছে।যাত্রাবাড়ীতে ইরিনের বাবার নামে আরেকটা ফ্ল্যাট আছে।সেখানেই যাচ্ছেন তারা।ওদের সাথে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক আছে।আর তোর মাও ইরিনকে খুব পছন্দ করে।সেই জন্যই ওরা চলে যাওয়ার আগে কথাবার্তা সব এখনই ফাইনাল করে রাখতে চাচ্ছে।”

—“কিন্তু ইরিনের মতামত?”

—“ইরিনের মতামত অবশ্যই নেওয়া হবে।তার মতামত ছাড়া তো আর বিয়ে হবে না।তবে এখন থাক,আগে পড়াশোনা শেষ করুক!”

—“ঠিক আছে।”

আয়াজ উঠে দাঁড়ালো।হেলাল সাহেব থামিয়ে দিয়ে বললেন,

—“শোন।”

আয়াজ দাঁড়িয়ে গেলো।হেলাল সাহেব মুচকি হেসে বললেন,

—“ইরিনের দিকে খেয়াল রাখবি।মেয়েটা ভালো।কিন্তু বয়স তো কম।এই বয়সে মেয়েদের মনমানসিকতা অন্যরকম থাকে।আমার চেয়ে তুই ভালো বুঝবি।তাই ওকে দেখে শুনে রাখার দায়িত্ব তোর।তোর হবু স্ত্রী এখন, তার প্রতি খেয়াল রাখার দায়িত্ব তোর।”

আয়াজ লাজুক হাসি হাসলো।ইরিন তার হবু স্ত্রী? ভাবতেই হাসি পাচ্ছে।ইরিনের সাথে দুই সেকেন্ড বনিবনা হয় না তার।বিয়ের পরে যে কি হবে আল্লাহই জানে!

হলুদের প্রোগ্রামে শুরু হয়েছে। সবার শেষে ইরিন সাজগোজ করে বেরোলো।হলুদ লাগিয়েই আবার পড়তে বসবে।যদিও তার সাজগোজের খুব শখ তবে আজকে বেশি সাজগোজ করে নি।হলুদ রংয়ের একটা সেলোয়ার কামিজ পরে চুল বেধে নিলো।হলুদ দিয়ে এসে পড়তে বসতে হবে ওকে, প্রচুর পড়তে হবে!পৃথিবী জুড়ে আইলা, সিডর, টর্নেডো যাই হোক না কেন ওকে পড়তে হবে।

ছাদের সিঁড়ি কাছে উঠতেই আয়াজের সাথে দেখা।সিঁড়িপথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,ফোনে কথা বলছে।ইরিন পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।

আধঘণ্টা পর হলুদ লাগিয়ে নামার সময়ও সেই একই জায়গায় আয়াজকে দাঁড়ানো দেখলো।ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
এত কার সাথে কথা বলছে?..তাও আধঘণ্টা যাবত দাঁড়িয়ে?..স্পেশাল কেউ?..হোক! ইরিনের কি?ইরিন কেন মাথা ঘামাচ্ছে? দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো সে।


ফোনে কথা শেষ হলে আয়াজ ছাদে উঠলো। রেশমি এসে বলল,

—“ইরিকে একটা ফোন লাগা তো আয়াজ।”

—“কেন?”

—“আমার ফোন ওর কাছে রাখতে দিয়েছিলাম।ভুলে নিচে নিয়ে গেছে বোধহয়।”

—“ঠিক আছে আমি নিয়ে আসছি।”

আয়াজ তুতুরীকে নিয়ে নিচে নামলো।
ওদের ফ্ল্যাটের তালা বন্ধ।সোহেলি তালাবন্ধ করে ছাদে আছেন।ইরিনদের ফ্ল্যাটের সদর দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই সোফায় ওপর রেশমির ফোন রাখা দেখলো।তুতুরীকে দিয়ে ছাদে ফোন পাঠিয়ে দিলো সে।ইরিনদের বুয়া রান্মাঘরে কাজ করছে।আয়াজ ফ্যান চালু করে ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসলো।ইরিনের ঘরের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো,দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো সে। সে যেখানে বসেছে সেখান থেকে ইরিনের ড্রেসিংটেবিলের আয়না স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।ইরিন জামার চেইন খোলার চেষ্টা করছে।আয়াজ উঠে সাবধানে ইরিনের ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিলো।তারপর আবার সোফায় এসে বসলো।

দ্রুত জামা চেইঞ্জ করে বেরলো ইরিন।ড্রয়িংরুমে পানি খেতে এসে দেখলো আয়াজ সোফায় বসে আছে।ইরিনের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে সে।
ইরিন চোখটা ভালো মত কচলে নিলো।আয়াজ কি সত্যি সত্যি সোফায় বসে আছে নাকি ওর দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে?

আয়াজের ফোন বাজছে।পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করল সে।ইরিন এখনো দাঁড়িয়ে আছে।আয়াজ ওকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে ইশারায় পানি খাওয়াতে বলল।

ইরিন পানি এনে ওর সামনে রাখলো।ইতিমধ্যে আয়াজের কথা বলা শেষ।সামনে রাখা পানির গ্লাস তুলে নিয়ে পানিতে চুমুক দিলো সে।পানি খাওয়া শেষ হলে মৃদু শব্দ করে গ্লাসটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখলো।ওর দৃষ্টি ফোনের দিকে।ইরিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

—“ওড়না গায়ে দিয়ে আয়।”

নিজের দিকে তাকিয়ে তব্দা খেয়ে গেলো ইরিন।সে এতক্ষন আয়াজের সামনে ওড়না ছাড়া বসে ছিলো?..ইন্নালিল্লাহ!
বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গেলো।তারপর এক ছুটে এসে রুমে ঢুকলো।
চাদরের মত ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিলো।প্রচুর লজ্জা লাগছে।নিজের গালে কষে দুটো চড় বসাতে ইচ্ছে করছে।

আয়াজ হাতঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রাখলো।ইরিনকে বেরিয়ে আসতে দেখে বলল,

—“দরজা খোলা রেখে তুই জামাকাপড় চেইঞ্জ করছিস?তোর আক্কেল আন্দাজ নেই? এখান থেকে বসলে তোর ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সব দেখা যায়।তুই এত বোকা হলি কি করে ইরিন?”

ইরিন বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেলো।পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো,সে রুমে জামা চেইঞ্জ করেছে?.ওয়াশরুমে যায় নি?..মনে করতে পারছে না।মাথাটা খালি খালি লাগছে।সিঁড়িতে আয়াজকে ফিসফিস করে কথা বলতে দেখে সেই চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো,অন্য কিছু ম্যামরিতে ঢুকেই নি।হায় আল্লাহ!

আয়াজ ধীরস্থির শান্ত কন্ঠে বলল,

—“বড় হয়েছিস,বুঝজ্ঞান খরচ করে চলতে শিখ।এমন বোকার মত কান্ড করিস কেন?”

ইরিনের এখানে বসে থাকতে লজ্জা লাগছে।লজ্জায় আয়াজের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না সে।আয়াজের সামনে থেকে উঠে যাওয়ার বাহানা করে বলল,

—“আমার অনেক পড়া বাকি আছে আয়াজ ভাই।আমি পড়তে বসবো।”

—“পড়ে লাভ কি?পড়াশোনা মানুষ কি জন্য করে? জ্ঞান অর্জনের জন্য।তোর তো ব্রেইনই নেই।পুরো মাথা ফাঁকা,তুই জ্ঞান রাখবি কোথায়?”

ইরিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না।আয়াজ হঠাৎ মোলায়েম কন্ঠে বলল,

—“এভাবে বোকার মত কাজ আর কখনো করবি না।চেইঞ্জ করার সময় হয় ওয়াশরুমে যাবি আর না হলে রুমের দরজা লক করে চেইঞ্জ করবি!মনে থাকবে?”

—“থাকবে।”

—-“ঠিক আছে যা।”

—“আপনি চা খাবেন আয়াজ ভাইয়া?”

—“তুই বানাতে পারবি?”

—“পারবো।”

—“ঠিক আছে,বানা।”

আয়াজ চা খাচ্ছে।ইরিন ওর পাশে বসে আছে।আয়াজ ওর দিকে একবার তাকালো।চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল,

—“বারবার পড়তে বসবো,পড়তে বসবো করছিলি,এখন যাচ্ছিস না কেন?”

ইরিন সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো।বলল,

—“আপনি কি ছাদে যাবেন?”

—“নাহ!..আমি কিছুক্ষন রেস্ট নিবো। ডিউটি শেষে সরাসরি বাসায় এসেছি,মাথাটা ধরে আছে।ছাদের গেলে আরো বেড়ে যাবে,পুরো বিল্ডিং কাঁপিয়ে ফেলছে সবাই মিলে।”

—“কয়দিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন?”

—“তিনদিনের।”

—“সোফায় শুতে পারবেন? মাহিনের বিছানা ঠিক করে দিই?”

—“তোর পড়া আছে না?..এতক্ষন তো পড়তে বসবো পড়তে বসবো করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিস,এখন যাচ্ছিস না কেন?..যা নিজের কাজে যা।”

ইরিন মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে আছে।আয়াজ ঠোঁট উলটে বলল,

—“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমার কথা বুঝিস নি?”

—“বুঝেছি!”

—“এবার যা পড়তে বয়।”

দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলো ইরিন,আশ্চর্য তার একফোঁটাও পড়তে ইচ্ছে করছে না।হঠাৎ করেই আয়াজের পাশে বসে থাকতে মন চাইছে।
বই বন্ধ করে উঠে গেলো সে।বেশ সাজগোজ করলো,এবারে হলুদ লেহেঙ্গার সাথে ভারী মেকাপ করেছে,সাথে মেচিং জুয়েলারি।আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই হাসলো কিছুক্ষন।উদ্দেশ্য ছাদে যাবে।এখন আর পড়া হবে না।শুধু শুধু বসে থেকে লাভ নেই।তার চেয়ে মজা করাই ভালো।

আয়াজ কে দেখতে পেলো।সোফায় লম্বা হয়ে ঘুমাচ্ছে।তার একটা হাত সোফার বাইরে ঝুলছে,অন্যহাতে মাথার নিচে রাখা।

ইরিন বেরোতে গিয়ে দরজা থেকে ফিরে এলো।ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে না!আয়াজ এর ক্লান্ত,অচেতন মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে।এত সুন্দর কেন?চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে।পাঞ্জাবী প্রথম দুটো বোতাম খোলা,ফর্সা বুকের খানিকটা দেখা যাচ্ছে!

ইরিন ওর পাশে এসে হাটুমুড়ে বসলো।ঝুলে থাকা হাতটা তুলে দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না।লজ্জা,ভয়,অস্বস্তি ওকে আটকে দিচ্ছে।
একবার ভাবলো আয়াজকে ডাকবে পরে ভাবলো ঘুম নষ্ট করাটা ঠিক হবে না।নিশ্চই ভীষণ টায়ার্ড!
আলতো করে আয়াজের হাতটা বুকের ওপর তুলে দিতেই আয়াজের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

ইরিন থতমত খেয়ে লজ্জিত কন্ঠে বলল,

—“না মানে আমি আপনাকে ডাকতে এসেছিলাম,রুমে গিয়ে শোবেন চলুন।এখানে নিশ্চই ঘাড় ব্যথা হয়ে গেছে?”

—“তুই আমাকে ডাকার জন্য এত সেজেছিস?..মতলবটা কি তোর?”

—“ছাদে যাবো তাই!”

আয়াজের মুখটা রাগে ত্যাড়াব্যাড়া হয়ে গেলো।

—“ছাদে যাবি মানে? তুই না পড়তে বসেছিস?”

—“হ্যাঁ কিন্তু এখন মন বসছে না,শুধু শুধু বসে থেকে তো লাভ নেই।”

—“মন বসছে না মানে কি? মনের নাম মহাশয়!যেভাবে বসাবি সেভাবে বসবে!..যা পড়তে বয়।”

—“আমি এখন ছাদে যাবো।”

—“বেরো তুই!তোর ঠ্যাং যদি আমি না ভেঙেছি তো আমার নামও আয়াজ না।”

—“দিন।আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিন।আপনার যা মন চায় করুন।”

—“আবার মুখে মুখে তর্ক!..যা পড়তে বয়!”

—“আমার এখন পড়ায় মন বসবে না।মরে গেলেও না।”

—“তুই যাবি?”

ইরিন হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালো।রুমে ঢুকে রাগে বই ছুঁড়ে মারলো,ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলতে ইচ্ছে করছে ওর।আয়াজ বুয়াকে দরজা আটকে দিতে বলে ছাদে চলে গেছে।ইরিনের মন চাইছে আয়াজকে টেনে এনে তার সাথে বসিয়ে রাখতে।বদ লোক!ওকে একা ফেলে চলে গেছে।
.
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here