অতঃপর প্রণয়,পর্ব:১৮

অতঃপর প্রণয়,পর্ব:১৮
অরিত্রিকা আহানা

সুহানার বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর দিনই সবাই ঢাকায় চলে এলো। সবকিছু শুরু হলো নতুন নিয়মে। ইরিন রোজকার নিয়মে কলেজে যায়। ক্লাস করে। বাসায় ফিরে পড়াশোনা করে। মাঝেমধ্যে সোহেলির কাজে টুকটাক সাহায্য করে।

আজকে রবিবার। ইরিন কলেজে গেছে।সোহেলি ড্রয়িংরুমে বসে মুক্তার সাথে সাংসারিক আলাপ করছিলেন। এমন সময় তাঁর ফোন বেজে উঠলো। আয়াজ ফোন করেছে।

—“হ্যালো মা?”

—“কেমন আছিস বাবা?”

আয়াজের জ্বর। জ্বর নিয়ে হস্পিটালে ডিউটি করছে সে। আজকে রোগীদের প্রচুর ভিড়। দম ফেলার সময় নেই। ডিউটি করতে করতে হাঁপিয়ে গেছে। এর ফাঁকেই সুযোগ করে সোহেলিকে ফোন করেছে বাসার সবার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য।

—“আমি ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?”

—“আমরা সবাই ভালো আছি। তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন বাবা?”

—” কালকে রাত থেকে গায়ে গায়ে হালকা জ্বর। টেনশন করার কিছু নেই।”

—” ওষুধ পত্র নিয়েছিস?”

—“হ্যাঁ। আচ্ছা মা বাবা কি বাসায় আছে?”

—“তোর বাবা চেম্বারে।”

—“ও, তোমার শরীর কেমন? ভাবি? ভাইয়া, ওরা কেমন আছে?”

—“আমি ভালো আছি। তোর ভাবি, ভাইয়া সবাই ভালো আছে।”

আয়াজ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ফোনের ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বললো,

—“ইরিন কেমন আছে মা?”

আয়াজ না থেমেই গলাটা আরো খাদে নামিয়ে নিলো, যেন ইরিন ফোনের ওপাশ থেকে তার কথা শুনতে পাচ্ছে। ফিসফিস করে বললো,

—“ও কি আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে?”

ছেলের প্রশ্নের জবাবে সোহেলি কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ইরিন আয়াজের ব্যাপারে কিছুই জানতে চায় নি। তিনি অবশ্য ইরিনকে শুনিয়ে শুনিয়ে মুক্তার সাথে আয়াজের কথা বলেন। ইরিন যে শোনা না তাও নয়। আড়াল থেকে আড়িপেতে শোনে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না। তবে সেটুকু তো আর ছেলেকে বলা যায় না। সোহেলি ছেলেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মিথ্যে বললেন,

—“বলে তো। রোজ তোর কথা জিজ্ঞেস করে। তুই ফোন করেছিস কি না? ভালো আছিস কি না। নিজের শরীরের যত্ন নিচ্ছিস কি না। এসব জিজ্ঞেস করে।”

আয়াজের গলাটা উৎফুল্ল শোনালো। মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

—“ও কি ভালো আছে মা? ঠিকমত পড়াশোনা করছে তো?”

—“করছে।”

—“ঠিক আছে মা। আমি এখন রাখছি তাহলে।”

ক্লাস শেষে করিডোরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো ইরিন। ইত্তি এসে মাথায় টোকা দিয়ে বললো,

—“কি রে ইরিন, তোর কি মন খারাপ?”

—“না তো?”

—“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে তোর মন খারাপ?”

—“তোর এমন মনে হওয়ার কারণ?”

—“কারণ তোর মুখটা বেলুনের মত চুপসে আছে। ”

—“তাই নাকি?”

—“হুম। একটু আগে আয়াজ ভাইয়ের সাথে কথা হলো। তোর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন? তোর সাথে কথা হয় নি?”

চাপা অভিমানে বুক ভার হয়ে এলো ইরিনের।কই আয়াজ তো তাকে ফোন করে নি? একবারও জানতে চায় নি ইরিন কেমন আছে? সে তো রোজ আয়াজের ফোনের অপেক্ষা করে বসে থাকে। রাগ হলো তার। ইত্তিকে ফোন দিয়ে ন্যাকামি করা হচ্ছে? বোঝাতে চাইছে তিনি ইরিনকে খুব ভালোবাসেন? কি সুন্দর ছলনা। সবার কাছে ভালো সাজতে চাইছেন? এতই যখন ভালোবাসা তখন ইরিনকে ফোন করলো না কেন?

—“কি রে? কথা হয় নি তোর সাথে?”

—“না!”

—“কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?”

ক্ষোভ জমা হলো ইরিনের কন্ঠে, যার খোঁজ রাখার কথা সে একটা ফোন পর্যন্ত করে না আর এ এসেছে ঢং দেখাতে। থমথমে গলায় বললো,

—“এসব ঢং তোর গার্লফ্রেন্ডকে গিয়ে দেখা। আমার সাথে এসব নেকামি একদম করবি না।”

—“রাগছিস কেন? আমি তো ভালো কথাই জিজ্ঞেস করলাম?”

—“না করবি না। আমি ভালো আছি না খারাপ আছি তা দিয়ে তুই কি করবি?”

—“আচ্ছা বাবা আমি আর কিচ্ছু জিজ্ঞেস করবো না। তুই ঝগড়া করিস না প্লিজ।”

—“কি বললি তুই?”

ইরিনের অকারণে রেগে যাওয়া দেখে ইত্তি হেসে ফেললো। কিন্তু ইরিন কাঁদছে। অভিমানের পাহাড় জমা হলো বুকের ভেতর। ফুঁপিয়ে উঠে বললো,

—“হ্যাঁ আমি তো ঝগড়ুটে। আমি খুব খারাপ। তো আসছিস কেন আমার সাথে কথা বলতে?”

ইত্তি অবাক হয়ে ইরিনের দিকে চেয়ে আছে। কোমল স্বরে বললো,

—“তুই কাঁদছিস কেন?”

ইরিন জবাব দিলো না। ইত্তি পুনরায় মোলায়েম কন্ঠে বললো,

—“তোর কি আয়াজ ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে? ”

ইরিন ফুঁপিয়ে উঠলো। ইত্তি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগেই তো আয়াজের সাথে তার কথা হলো। ইরিনের কথা জানতে চাইলো? এর মাঝখানে ঝগড়া হলো কখন?

—“চুপ করে আছিস কেন ইরিন? তোর কি আয়াজ ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে?”

—“জানি না।”

—“জানি না মানে?”

—“আজকে দেড়মাস উনার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই।”

—“মানে?”

—“হুম। বিগত দেড়মাস যাবত উনি আমার কাছে একটা ফোন পর্যন্ত করে নি। আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি সেই খবরটুকুও নেই নি। এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানের পর থেকে আর বাসায় আসে নি। আমি আর পারছি না ইত্তি। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। মরে যেতে চাই আমি।”

—“কি সব উল্টোপাল্টা কথা বলছিস? আয়াজ ভাইয়ের সাথে আমার প্রায়ই কথা হয়। উনি তো সবসময়ই তোর কথা জিজ্ঞেস করে?”

ইরিনের অভিমান কমলো না। বরং দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। থমথমে গলায় বললো,

—“এবার যদি জিজ্ঞেস করে বলবি ইরিন মরে গেছে। তার সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই।”

—“থাম! পাগলের মত কি সব বলছিস তুই? আমি আয়াজ ভাইয়ের সাথে কথা বলবো।”

—“খবরদার যদি তুই উনাকে কিছু বলেছিস! তোর সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। উনি যখন আমাকে ছাড়া থাকতে পারছে আমিও পারবো। আরো বেশি করে পারবো। তুই কি ভাবছিস আমি উনার জন্য মরে যাবো? কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাবো? নো, নেভার। আমি কখনো তা করবো না। আমি নিজের মত ভালো থাকতে জানি। লাগবে না আমার কারো সিমপ্যাথি!”


দুপুরে খাবার টেবিলে সোহেলি ইরিনকে শুনিয়ে শুনিয়ে মুক্তাকে বললেন,

—“আয়াজের জ্বর বউমা। শরীর বোধহয় ভালো নেই। কাজেরও বোধহয় খুব চাপ যাচ্ছে। বাসার সবার কথা জিজ্ঞেস করলো। আমি বলেছি আমরা সবাই ভালো আছি। আমাদের নিয়ে চিন্তা করার কোন দরকার নেই।”

কথাটা শেষ করে তিনি ভয়ে ভয়ে ইরিনের দিকে তাকালেন। ইরিন চুপচাপ খাচ্ছে। বস্তুত সে খাচ্ছে না। খাবার গিলছে। তার চোখে অলরেডি পানি চলে এসেছে। সোহেলি ইরিনের রিয়েকশনের আশায় চুপ করে রইলেন। কিন্তু ইরিন একটা কথাও বললো না। চুপচাপ খাবারে পানি ঢেলে উঠে চলে গেলো। সোহেলি আবারও মনে মনে হতাশ হলো।


ইরিন খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। আয়াজ সবার সাথেই কথা বলে। অথচ ইরিনকে একটা ফোন পর্যন্ত করলো না। চাপা অভিমানে নিজেকে শান্ত করার জোর চেষ্টা চালালো সে। নিজের প্রবোধ দিলো, কষ্ট পাওয়ার কোন দরকার নেই। কার জন্য কষ্ট পাবে সে? যেই মানুষটা এতদিনে একবারও ইরিনের খোঁজ নেই নি তার জন্য? ইরিন রোজ ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে মানুষটার একটা ফোনের অপেক্ষায়। অথচ সে দিব্যি ইরিনকে ভুলে ভালো আছে। তার জন্য ইরিন কষ্ট পাবে না।

রাগে আছাড় মেরে নিজের ফোন ভেঙ্গে ফেললো। ফোন যখন আসেই না তখন এই জিনিস রেখে লাভ কি? আর অপেক্ষা করবে না সে।


রাতের দিকে আয়াজ আবার সোহেলির নাম্বারে ফোন করলো। সোহেলি শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আয়াজ টুকটাক কথাবার্তা সেরে বললো,

—“ইয়ে মানে, মা তুমি কি আমার জ্বরের কথা ইরিনকে বলেছো?”

সোহেলি ছেলের জন্য দুঃখ বোধ করলেন। তিনি দুপুর বেলা খাবার টেবিলে ইরিনকে শুনিয়ে শুনিয়ে আয়াজের জ্বরের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ইরিন তো কিছুই বলে নি! খাবার টেবিল ছেড়ে সেই যে ঘরের দরজা বন্ধ করেছে আর বেরোয় নি। তিনি আবারো ছেলেকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,

—“হ্যাঁ বাবা। বলেছি। সে তো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আমি আর তোর ভাবি মিলে অনেক কষ্ট শান্ত করেছি।”

আয়াজ মনে মনে দুঃখ বোধ করলো। ইরিন নিশ্চই অনেক কান্নাকাটি করছে? সোহেলিকে বললো,

—“কেন বলেছো মা? ও কি খুব বেশি কান্নাকাটি করছে?”

—“করছে তো। খুব করছে!”

—“আমি কি ওকে একটা ফোন করবো?”

—“কর না।”

—“ঠিক আছে আমি ওকে ফোন করছি তাহলে। এখন রাখি।”

—“খোদা হাফেজ!”

আয়াজ অনেকবার ইরিনের নাম্বারে ট্রাই করলো কিন্তু বন্ধ আসছে। অবশেষে আবার সোহেলির নাম্বারে ডায়াল করলো সে।

—“হ্যাঁ মা?”

—“কী বাবা?”

—” ইরিনের ফোন বন্ধ আসছে কেন? ও কি ঠিক আছে?”

সোহেলি ইরিনের ফোন ভাঙ্গার কথা কিছুই জানেন না। তিনি ভেবেছেন ইরিন রাগ করে ফোন ধরছে না কিংবা সুইচড অফ করে দিয়েছে। দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন,

—“একদম ঠিক আছে। ও ঘুমাচ্ছে। আমি কি ডেকে দেবো?”

—“থাক ডাকার দরকার নেই। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলো, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে টেনশন করার দরকার নেই।”

—“ঠিক আছে বাবা রাখি?”

—“হ্যাঁ মা। রাখছি খোদা হাফেজ।”

সোহেলি ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ছেলের সাথে মিথ্যে বলায় তার খুব খারাপ লাগছে। এদিকে সত্যিটাও বলতে পারছেন না পাছে ছেলে দুঃখ পায়।


ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজে।আয়াজের টেনশন হচ্ছে। ইরিন তো এত সকাল সকাল ঘুমায় না। ওর ফোন সুইড অফ বলছে কেন? ইরিনের কি শরীর খারাপ? নাকি অন্য কিছু? সোহেলি বেগম কি আয়াজের কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছেন? অবশেষে ভেবেচিন্তে মুক্তার ফোনে ফোন দিলো আয়াজ। লাজুক কন্ঠে বললো,

—“ভাবি মা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি কি কষ্ট করে ইরিনকে একটু ডেকে দিতে পারবে? আমি ওর ফোনে ফোন করেছিলাম। সুইচড অফ বলছে।”

—“আচ্ছা ঠিক আছে দাঁড়াও, আমি দেখছি।”

মুক্তার ফোন নিয়ে ইরিনের ঘরে ঢুকলো। ইরিন ওয়াশরুম। ফোন টেবিলের ওপর রেখে ওয়াশরুমের দরজা নক করে বললো,

—“তোর ফোন এসেছে ইরিন। আমি টেবিলের ওপর রেখে যাচ্ছি।”

মুক্তা ফোন রেখে বেরিয়ে গেলো। ইরিন ওয়াশরুম থেকে বেরোতে বেরোতে ফোন কেটে গেলো। একটু পর আবার রিং হলো। স্ক্রিনে আয়াজের নাম দেখে চমকে উঠলো সে। পুরোনো অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এতদিন বাদে তার খবর নিতে এসেছে? সবার ফোনে ফোন করে তার খবর নিয়ে নিজেকে মহান প্রমাণ করতে চাইছেন? এতদিন কোথায় ছিলো ভালোবাসা?
ফোন রিসিভ করলো না ইরিন। ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলো। কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।আয়াজ আবারো ফোন দিলো। আবারো ফোন কেটে গেলো। পরোক্ষনেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেললো ইরিন। নিজেকে নিজে বোঝালো ফোন রিসিভ করে আয়াজকে ইচ্ছেমত কথা শুনিয়ে দিবে। এতদিন বাদে কেন ফোন করেছে ইরিনকে? মায়া দেখাতে? লাগবে না ইরিনের কোন মায়া! আবার ফোন বেজে উঠতে ফোন রিসিভ করে শক্ত কন্ঠে বললো,

—“বেহায়ার মত কেন বারবার ফোন দিচ্ছেন আমাকে? আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাইছি না। আপনি বুঝতে পারছেন না?”

ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো কেবল তারপরই ফোন কেটে গেলো। ইরিন রাগে অভিমানে ফোন আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেললো। একবার বলতেই ফোন কেটে দিলো? এই ভালোবাসে তাকে? সব নাটক! মিথ্যে অভিনয়। ইরিনকে এখন আর উনার সহ্য হয় না। ঘরের দরজা বন্ধ করে ওয়াশরুমে ঢুকে অনেক্ষনযাবত কাঁদলো। রাগে দুঃখে আলমারি থেকে আয়াজের জিনিসপত্র সব ফেলে দিলো। কিচ্ছু রাখবে না সে। কিচ্ছু না। সোহেলি অস্থির হয়ে ছেলের কাছে আবার ফোন দিলেন।
.
.
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here