অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ২,৩

#অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ২,৩
নাফীছাহ ইফফাত
পর্ব ২

আমার রুম থেকে বেরিয়ে প্ল্যানমাফিক নাকীব কিচেনে যায়। মা কিছু রান্না করছে। মা সারাক্ষণ কিছু না কিছু রান্না করতে থাকে। কিন্তু সেসব রান্নার বেশিরভাগই বাবার এবং নাকীবের পছন্দের। মা বাবার সাথে ঝগড়া করলেও বাবার পছন্দের কথা কখনো ভুলে না। সবসময় বাবার পছন্দ নিয়ে ভাবে মা। আর বাবা সেই খাবার মায়ের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে মহা উৎসাহে খায়। অথচ মায়ের সামনে এমন ভাব করে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে খাবারটা মা রান্না করেছে।

নাকীব মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘মা, কি বানাচ্ছো?’
‘বালুসাই, তোর বাবার প্রিয় মিষ্টি।’

নাকীব কোমড়ে হাত রেখে রাগী গলায় বললো, ‘একটু আগে না ঝগড়া করলে বাবার সাথে?’
‘তো কি হয়েছে? মানুষটা খেতে চাইলো..’
‘টু মাচ! দিস ইজ টু মাচ মা। তোমাদের আদিখ্যেতা আমার জাস্ট সহ্য হয় না। এতই মানুষটাকে নিয়ে ভাবলে ঝগড়া করো কেন সারাক্ষণ?’

‘আমি ঝগড়া করি? ঝগড়া করে তোর বাবা।’

ঠিক তখনই আমি কিচেনে ঢুকে মায়ের কথাটা শুনতে পাই। সাথে সাথেই বলি, ‘বাবা মোটেও ঝগড়া করে না মা। সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করো তুমি!’

মা কিছু বলার আগেই নাকীব বেশ জোরেশোরেই বললো, ‘আপু, সবচেয়ে বেশি বাবা ঝগড়া করে।’
‘না, সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে মা।’

এটা নিয়ে আমি ও নাকীব বেশ তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেললাম। বলা বাহুল্য, বাবা আমাকে বেশি ভালোবাসে আর মা নাকীবকে।
আমাদের চেঁচামেচি শুনে ড্রইংরুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে কিচেনে ছুটে আসে বাবা। আমি সাথে সাথে বাবার হাত ধরে বলি,
‘বাবা, মা না সবসময় তোমার সাথে ঝগড়া করে?’
‘হ্যাঁ তো!’ সাথে সাথে আমার কথায় সায় মেলায় বাবা। যদিও ঘটনা তখনো বোঝেননি তিনি।

নাকীব মায়ের হাত ধরে বললো, ‘মা, তুমি কেন কিছু বলছো না? ঝগড়া তো সবসময় বাবা করে।’
‘হ্যাঁ তাই তো। তোর বাবা-ই তো ঝগড়া করে।’

বাবা রেগে বললেন, ‘কি? আমি ঝগড়া করি? ঝগড়া করো তুমি।’
‘তুমি ঝগড়া করো সবসময়।’ মা আরও চেঁচিয়ে বলে।

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘হৃদিতা, তোর মাকে বল মুখটা বন্ধ করতে। আমি রেগে গেলে কিন্তু তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে ফেলবো।’

মা সাথে সাথে নাকীবকে বললেন, ‘নাকীব, তোর বাবাকে বল তুলকালাম কান্ড আমি আগে বাঁধাবো। আমি কিন্তু কিছু একটা ছুঁড়ে মারবো বলে দিলাম।’

আমি ও নাকীব ততক্ষণে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বললাম, ‘ব্রো, এই ছিলো তোমার প্ল্যান?’
‘আপু, সত্যিই বুঝতে পারিনি কি থেকে কি হয়ে গেল! এখন মনে হচ্ছে ঝগড়াটা আমরা ইচ্ছে করেই বাঁধিয়ে দিয়েছি।’
‘হু।’

আমি আচমকা নাকীবের হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বললাম, ‘একটা প্ল্যান এসেছে মাথায়।’
‘কি প্ল্যান?’
‘তুই এখন চট করে আমাকে একটা চড় মারবি। তারপর দেখ কি হয়?’
‘না আপু আমি তোমাকে চড় মারতে পারবো না। কিছুতেই না।’ নাকীব বেঁকে বসে।
‘আরে মার না, আমি বলছি তো।’
‘না আপু প্লিজ!’
‘মারতে বললাম না?’ রাগী চোখে তাকাতেই নাকীব রাজি হয়ে গেল। ঠাস করে আমার গালে চড় মেরে দিলো।

চড়ের শব্দ হতেই বাবা-মা ঝগড়া থামিয়ে আমাদের দিকে তাকায়। আমি গালে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে বলি,
‘তুই আমাকে মারলি? তোর এতবড় সাহস?’

নাকীবও চেঁচিয়ে বললো, ‘তোর এতবড় সাহস হয় কি করে আমার মাকে দোষ দেওয়ার?’
‘তুই আমার সাথে তুই-তুকারী করছিস?’
‘একশোবার করবো, হাজারবার করবো। তুই মাকে দোষারোপ করিস কোন সাহসে?’ গর্জন করে ওঠে নাকীব।
‘তুই বাবাকে দোষারোপ করিস যেই সাহসে…’ আমিও সমান তালে চেঁচাই।
‘বাবা দোষী তাই বাবাকে দোষারোপ করি।’

বাবা হঠাৎ নাকীবের দিকে এগিয়ে এসে জোরসে একটা ধমক লাগায়।
‘তুই এই এতটুকুন একটা ছেলে এসে আমাকে দোষারোপ করিস? আমাকে দোষী বলিস? তোর সাহস তো কম না?’

‘বাবা, আমি সত্যিটা বললাম। আর সত্যি বলার মতো সৎসাহস আমার আছে।’ এমনভাবে কথাটা বললো নাকীব যে ওর কন্ঠে আমার পিলে চমকে উঠলো।

বাবা ঠাস করে থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন নাকীবের মাথায়। বললেন,
‘তুই এত ঝগড়ুটে হলি কবে থেকে? তুই তো কালকেও এমন ছিলি না? আমার একটামাত্র মেয়ের গায়ে তুই হাত তুললি?’

মা নাকীবের পাশে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত বুলিয়ে বলেন,
‘তোমার মেয়ে ধমকায়নি আমার একমাত্র ছেলেকে?’
‘ওর রাইট আছে ধমকাবার। ও নাকীবের বড় বোন। কিন্তু নাকীব ওর গায়ে হাত তুলে কোন সাহসে? ওর সাথে ঝগড়া করে কোন সাহসে? আর তুমিই বা ওকে লাই দাও কোন সাহসে?’

নাকীব ফট করে বলে বসে, ‘তোমাদের কাছ থেকেই তো শিখেছি। বাসার গুরুজনেরা যদি সারাক্ষণ ঝগড়া করে তো আমরা আর কি শিখবো?’ বলেই ও বেরিয়ে যায় কিচেন থেকে।

আমি বললাম, তোমরা আসলে কোনোদিনও ঠিক হবে না। করো ঝগড়া। আরও ভালো করে ঝগড়া করো। তোমাদের জন্য আজকে আমাদের মাঝেও ঝগড়া লেগে গেছে।’ বলে কাবার্ড থেকে একটা গ্লাস নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে চলে আসি ওখান থেকে। বাবা-মা আবার লেগে গেল সাথে সাথে।

সেদিন রাতে পড়ায় আর মনোযোগ দিতে পারিনি। পরদিন পরীক্ষা দিয়েছি ঠিকঠাক৷ ভার্সিটি থেকে আসার সময় আজকে রাফিন আমাকে বাসায় ড্রপ করে দেয়। রাফিন আমার ভালোবাসার মানুষ। গত একবছর আগে ওর সাথে আমার পরিচয়। পরিচয়টাও হয় অদ্ভুদ এক ঘটনা দিয়ে।

সেদিন আমি সেজেগুজে সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। যেই না বেরুবো অমনি বাবা-মায়ের তুমুল চেঁচামেচি শুনতে পাই। ভেবেছিলাম ইগনোর করে বেরিয়ে যাবো কিন্তু সেটা আর পারলাম না। কারণ ভেতর থেকে ভাঙচুরের শব্দ আসছে। বাবা-মা শত রাগারাগি করলেও কখনো ভাঙচুর করে না। ওটা একমাত্র আমার স্বভাব। আমি দ্রুত বাবা-মায়ের রুমে ঢুকে দেখি মায়ের স্বাদের ফ্লাওয়ার ভেসটা ভেঙ্গে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তারই ঠিক উল্টোপাশে বাবার প্রিয় মাটির গ্লাসটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। আমার মেজাজ এমন খারাপ হলো যে চেঁচিয়ে বললাম,
“কি হয়েছে?”
“আরে আমি বাথরুম থেকে বেরুনোর সময় পা লেগে ফ্লাওয়ার ভেসটা পড়ে ভেঙ্গে যায়। এতে তোর মা’র সেকি রাগারাগি। আমি বললামই ভুলে হয়েছে। সে মানতেই চায় না। বলে কিনা আমি ইচ্ছে করে করেছি। তাই রাগে সে আমার সাধের গ্লাসটা অব্দি ভেঙ্গে দিলো! এমন মানুষও হয় বল?”
মা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ধমকে বলে এলাম,
‘এই বাড়িতে তোমরাই থাকো আজ থেকে। সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলো। আমি আর এই বাড়িতে আসছি না। এসব ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে আমি আর নেই।’
বলে ভাঙ্গা ফ্লাওয়ার ভেসটায় জোরে লাথি দিয়ে শোকেসের দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। শোকেসের নিচের দিকটায় খানিকটা ভেঙ্গে পড়ে গেল। সাথে সাথে হনহন করে বেরিয়ে চলে গেলাম। আমার সুন্দর মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছে। ধুর!

এরপর সাইকেল নিয়ে একা একা হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে কাশবনে পৌঁছাই। এই এলাকায় খুব সুন্দর একটা কাশবন আছে। নির্জন রাস্তার দু’পাশে বিস্তর জায়গা জুড়ে কাশবন। প্রায় বিকেলেই আমি ও নাকীব এখানে এসে সাইকেল চালাই। নাকীব প্রায়ই ক্রিকেটও খেলে এখানে। ওর সাঙ্গপাঙ্গরা না থাকলে সেদিন আমি ও নাকীব ক্রিকেট খেলি। আমাদের সাথে থাকে আরও অনেক পিচ্চি বাচ্চাকাচ্চা। সেদিন নাকীবের কোচিংয়ে এক্সাম ছিল বলে ও আগেভাগেই কোচিংয়ে চলে গিয়েছিল। তাই আমি একাই গিয়েছিলাম সাইকেল নিয়ে।

কাশবনে ঢুকতেই সাইকেলে উঠে পড়ি আমি। সাই সাই করে ছুটে যাচ্ছিলাম সামনে। মাথার ওপর নীল-সাদা আকাশ, ভেসে যাওয়া মেঘের টুকরো, দু’পাশে সুন্দর সাদা কাশবন। আর সাথে ফুরফুরে হাওয়া। নিমেষেই মন ভালো হয়ে গেল।
সাইকেল নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে এমন ছুটছিলাম যে দুনিয়ার কোনোকিছুতে আর খেয়াল ছিলো না। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ কাশবনের গহীন থেকে আচমকা একটা বাইক বেরিয়ে আসে। আর তার সাথে ধাক্কা খেয়ে ধপাস করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ি আমি। আর তখনই কোথা থেকে একটা বল এসে পড়ে সোজা আমার মাথায়। কোমড়ে ও মাথায় একই সাথে চোট পেয়ে কুপোকাৎ হয়ে যখন ‘আহ! উহ!’ করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই সামনের বাইকার ছেলেটা এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
‘স্যরি মিস! আ’ম এক্সট্রিমলি স্যরি।’

এক পিচ্চি এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, যে ক্রিকেট খেলছিলো এবং সে-ই বলটা মেরেছে। বললো,
‘স্যরি আপু!’

আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে বাইকারের হাতটা ধরে উঠে দাঁড়িয়ে দুজনের উদ্দেশ্যেই বললাম,
‘ইট’স ওকে! একচুয়েলি, ইট’স মাই ফল্ট।’

বাইকার বললো,
‘ইট’স একচুয়েলি মাই ফল্ট। বাইক নিয়ে ছোটার সময় কাশফুলগুলো হাতে-মুখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তো তাই আমি এখানেই বাইক চালাই। আমার ভালো লাগে খুব। কেউ এদিকটায় একদমই আসে না। আপনি হঠাৎ এসে পড়লেন, খেয়াল করিনি।’

আমি ভীষণ অবাক হয়ে বললাম, ‘আমিও তো ঠিক একই কারণে কাশবনের গহীনে সাইকেল চালাই। কাউকে কখনো আসতে দেখিনি এখানে।’

পিচ্চিটা তখনো কাঁচুমাচু মুখ করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি মুচকি হেসে ওর চুল টেনে দিয়ে বললাম,
‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা খেল। আমি অল্প এট্টু ব্যাথা পেয়েছি।’

পিচ্চি মহা উৎসাহে বল নিয়ে ছুটে গেল। পিচ্চিটাকে এর আগে দেখিনি এখানে। হয়তো নতুন এসেছে। কালকে পরিচয় করে নিতে হবে ওর সাথে। ছেলেটার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হাসছিলাম। পাশ ফিরতেই দেখি সেই বাইকার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে ঝুলিয়ে রেখেছে কিউট একটা হাসি।

ছেলেটার সাথে অল্প বিস্তর কথা হয় আমার। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঐটুকু সময়েই আমরা নিজেদের মধ্যে অনেকগুলো মিল পেয়ে যাই। এরপর ওখান থেকে চলে আসি দুজনই। ছেলেটার কথা আমার আর মনেই ছিলো না। দু’দিন পর নাকীবের সাথে আবার যাই কাশবনে। দুজনে সাইকেল রেস দিচ্ছিলাম। হঠাৎ আবার দেখা হলো সেই ছেলেটার সাথে। সে ক্রিকেট খেলছিলো আমাদেরই টিমের সাথে। আশ্চর্য! আমাদের টিমে খেলছে অথচ তাকে আমরা চিনি না? আমি নাকীবকে বললাম,
‘চলতো দেখি ছেলেটা কে? আমাদের টিমে কি করছে?’

‘তাই তো! চলো দেখি।’

আমরা সামনে যেতেই ছেলেটা আমাদেরকে দেখে রীতিমতো থমকে দাঁড়ালো। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল সে বুঝি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। অথচ মুখে তার অন্য কথা। আমাকে দেখার সাথে সাথেই বললো,
‘আরে আপনি?’ যেন খুব অবাক হয়েছে।

আমি ও নাকীব মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। মুচকি হেসে আমি বললাম,
‘হ্যাঁ, ঘুরতে আসলাম। বাই দ্যা ওয়ে, আপনি এই টিমে খেলছেন?’

‘নো, ইয়েস… ইয়ে আপাতত খেলছি। বাট কোনো টিমের হয়ে না।’
‘তাহলে?’
‘এই এলাকায় নতুন এসেছি। কাউকেই চিনি না। এখানে ঘুরতে এসেছিলাম ওরা হঠাৎ ডেকে বললো ওদের সাথে খেলতে। ওদের টিমে নাকি দুজন প্লেয়ার শর্ট। আমি খেললে ওদের ভালো লাগবে।’

‘ওহ! একচুয়েলি, এটা আমার টিম। আমি আর নাকীব ছিলাম না তো তাই দুজন প্লেয়ার শর্ট পড়েছে।’

‘ওহ রিয়েলি? তুমি ক্রিকেট খেলো?’ ছেলেটা ভীষণ অবাক হলো।
‘ইয়াহ! আপনিও খেলেন?’
‘আমি? হ্যাঁ, আগে নিয়মিত খেলতাম। ইভেন, আমার ড্রিম ছিল জাতীয় দলে খেলার। বাট এখন আর তেমন খেলা হয় না।’

‘ওহ আচ্ছা।’

নাকীব আমাদের মাঝখানে এসে বললো, ‘আপু, তুমি কথা বলো, আমি একটা রাইড দিয়ে আসি ততক্ষণে।’

আমি কিছু বলার আগেই শা করে সাইকেল নিয়ে চলে গেল নাকীব।

ছেলেটা এতক্ষণে নাকীবকে খেয়াল করলো বোধহয়। ওকে দেখে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
‘ও-ই নাকীব?’
‘হুম, আমার ভাই।’
‘ওহ আচ্ছা।’

খানিক নিরবতা। আমাদের টিমের সবচেয়ে ছোট মেম্বার শিহাব এসে আমাকে বললো,
‘আপু, চলো না খেলি।’
আমি হেসে ওর চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললাম,
‘আজকে তোরা খেল, আমি কালকে খেলবো।’
শিহাব মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে বললাম,
‘কালকে খেলবো, প্রমিস।

এবার ও এসে ছেলেটাকে ধরলো। ‘ভাইয়া, তুমি চলো।’
‘আমিও কালকে খেলবো। আমার একটু কাজ আছে এখন।’

শিহাব আর কথা না বাড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল বল নিয়ে। আসলে ছেলেটার সামনে ক্রিকেট খেলতে আমার কেমন যেন লাগছিলো। তাই আমি খেলিনি। ও চলে যেতেই ছেলেটা বললো, ‘চলো, হাঁটি।’

দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিলাম নিরবে। ছেলেটার হাতে বাইকের চাবির রিং। সে ওটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,
‘রোজ আসা হয় এখানে?’
‘হুম প্রায়ই।’
‘বিকেল বেলায় তো আসো তাই না?’
‘হু।’
‘সাইকেল পছন্দ বেশি?’
‘হুম।’
‘বাইক পছন্দ না?’
‘পছন্দ।’
‘চালাতে পারো?’
‘না, বাইক নেই আমার।’
‘ওহ!’

দুজনে আবার নিরবে পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। হঠাৎ ছেলেটা বললো,
‘ওহ হ্যাঁ, তোমার নামই তো জানা হলো না! নাম কি তোমার?’
‘হৃদিতা আরোহী।’
‘বাহ! খুব সুন্দর নাম তো। এজন্যই তুমি সাইকেলে আরোহন করতে পছন্দ করো, তাই না আরোহী?’

আমি মিষ্টি করে হাসলাম। ছেলেটা বললো,
‘আরোহী, তোমার নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

আমাকে সাধারণত সবাই ‘হৃদিতা’ বলেই ডাকে। অথচ ছেলেটা ‘আরোহী’ নামটাই পছন্দ করলো। যেটা আমার নিজেরও খুব পছন্দের নাম।
আমি হেসে বললাম,
‘ঠিক আছে, আপনার ইচ্ছে।’
ছেলেটা আবার বললো, ‘নামটা আসলেই চমৎকার।’

আমি এবার কিছুটা জোরেই হেসে ফেললাম। হেসে বললাম,
‘আপনার নাম তো বললেন না?’
আমার নাম ফাইয়াজ রাফিন।’
‘আপনার নামও খুব সুন্দর।’

‘তোমার বাসা কোথায়, আরোহী?’
‘এই তো কাশবনে ঢোকার মুখের সাদা বিল্ডিংটা আমাদের।’

‘ওহ ওয়াও! বাড়িটা অনেক সুন্দর।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ! আপনার বাসা কোথায়? আপনি তো নতুন।’
‘হুম। আমার বাসা ঐ যে দূরে নীল-সাদা বিল্ডিংটা দেখছো?’
রাফিন আঙ্গুল দিয়ে দেখালো দূরে। ওর নির্দেশনা অনুযায়ী তাকিয়ে বললাম, ‘হুম।’
‘ঐ বিল্ডিংয়ের ফোর্থ ফ্লোরের রাইট সাইডের ফ্ল্যাটটা আমাদের।’
‘ওহ আচ্ছা।’

এভাবেই পরিচয় আমাদের। এরপর থেকে প্রায়ই দেখা হতে থাকে, কথা হতে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে ভালো লাগা শুরু। একমাসের মাথায় হুট করে ভালো লাগার কথাটা জানিয়ে দেয় রাফিন৷

#Be_Continued_In_Sha_Allah ❣️

#অগত্যা_তুলকালাম
নাফীছাহ ইফফাত

পর্ব ৩

আমাদের ভার্সিটি থেকে বেশ খানিকটা দূরে সুন্দর একটা জঙ্গল আছে। জঙ্গলের ভেতরে বিশাল পুরোনো ভাঙ্গা রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের আশেপাশে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে সবসময়। তাই প্রাসাদের আশেপাশে কয়েকটা দোকান গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকবছরযাবৎ। আমরা ফ্রেন্ডরা মিলে প্রায়ই এখানে আসি। আজও আমরা পাঁচজন বসে আছি প্রাসাদ থেকে কিছুটা দূরে একটা উঁচু প্রাচীরে। আমি, শাওন, রিয়াদ, মৌ ও মারিয়া।

এদের মধ্যে শাওন আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। ওর আর আমার বাসা পাশাপাশি হওয়ায় ও আমার সম্পর্কে সবই জানে। আমরা কলেজ লাইফ থেকে একসাথে আছি। ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে রিয়াদ সবচেয়ে ভালো। ও সবার মন রেখে চলে সবসময়। সবসময় অন্যের কথা ভাবে, নিজেকে নিয়ে ভাবে না কখনো। মৌ হলো খাদ্যরসিক, ও খেতে খুব ভালোবাসে। আর মারিয়া শপিং করতে। মৌ ও মারিয়া সুযোগ পেলেই আমাকে আমার বাবা-মা নিয়ে খোঁচাতে ভুলে না। ওরা আমার বাবা-মা সম্পর্কে সবই জানে।

মৌ বার্গারে কামড় দিতে দিতে বললো,
‘এখানে কার বাবা-মা সবচেয়ে বেশি শৌখিন?’
মারিয়া বললো, ‘আমার বাবা-মা অনেক শৌখিন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জিনিস কিনে তারা ঘরভর্তি করে রাখে। ঘর সাজিয়ে রাখে।’

শাওন বললো, ‘আমার বাবা-মাও তাই।’
রিয়াদ কিছুই বললো না। আমরা সবাই জানি রিয়াদ এখানে সবচেয়ে বেশি শৌখিন। ওর বাবা-মায়ের কাছ থেকেই ও এই গুণ পেয়েছে।

মৌ মুখে বার্গারের বাকি অংশ পুরে দিয়ে খোঁচা মারলো আমাকে। বললো, ‘আর হৃদি, তোর বাবা-মা?’
সাথে সাথে সবাই হেসে ফেলে। মারিয়া তো বলেই বসে,
‘ওর বাবা-মা ঝগড়ার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি শৌখিন।’

ওদের কথায় মন খারাপ হলেও দেখালাম না। এসব শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমি। মুচকি হেসে বললাম,
‘আসলে সবার চেয়ে আমার মা-বাবাই শৌখিন। কারণ ওরা ভালোবাসতে একফোটাও কার্পন্য করে না। ভালোবাসার দিক দিয়ে ওরা শৌখিন।’

‘ভালোবাসা আসছে কেন? আমরা বলছি শৌখিনতার কথা। জিনিস কি কিনে আনে সেটা বল?’

‘সেদিক দিয়েও ওরাই শৌখিন। ওরা কখনো আমার জন্য একটা জিনিস নিয়ে আসে না। দুজন দুটো করে আনে৷ সেটা ড্রেস হোক কিংবা কোনো দামি গিফট।’

মৌ খ্যাকখ্যাক করে হেসে বললো, ‘ঝগড়া করেই তো দুটো জিনিস আনে। একজনেরটা অন্যজনের পছন্দ হয় না তাই।’

আমি চুপ করে গেলাম। ওদের সাথে কথা বলতে আর ইচ্ছে করছে না। উঠে চলে আসতে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই রিয়াদ বললো, ‘দাঁড়া হৃদিতা।’
এরপর প্রাচীর থেকে লাফ দিয়ে নেমে দাঁড়িয়ে বললো,
‘আচ্ছা হৃদিতা, তুই যদি বলিস তোর নিউ ফোন লাগবে ওরা দুজন কি দু’টো নিয়ে আসবে?’

আমি জানি রিয়াদ কেন এই কথা বলেছে। এখন আমার জবাব শুনে সবাই আফসোস করতে বসবে।

আমি জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, দুটোই আনে ওরা সবসময়। সেটা যেই জিনিসই হোক না কেন!’

মৌ সত্যি সত্যি আফসোস করে বললো, ‘ইস! আমার বাবা-মা যদি এমন হতো। আমি যদি বলতাম আমার দুটো ফ্লেভারের বার্গার চাই। তখন ওরা দুজনে দুটো করে চারটা বার্গার এনে দিতো। ইস!’

রিয়াদ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। চোখের ইশারায় বললো, দেখলি?
আমিও হাসলাম। মারিয়া বললো, ‘আচ্ছা হৃদি, তুই বিয়ে করবি কি করে রে? তোর বাবা-মা তো দুটো বর এনে দিবে তোকে। হাহাহা!’ হাসির রোল পড়ে যায় ওর কথায়।

আমি রিয়াদের কাছ থেকে সরে চলে এলাম। আমার কখনোই ভালো লাগে না বাবা-মাকে নিয়ে কোনো কথা শুনতে। কিন্তু বরাবরই আমাকে এসব শুনে আসতে হয়। নাকীবেরও একই সমস্যা ফেইস করতে হয়। আমরা যে নিজ থেকে ফ্রেন্ডদেরকে বলি তা’না। ওরা নিজেরাই আমার বাবা-মাকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সিচুয়েশনে ঝগড়া করতে দেখেছে। কিন্তু ওদের ভালোবাসাটা কেউ দেখেনি। ওরা ভালোবাসে গোপনে, ঝগড়া করে প্রকাশ্যে। এক অদ্ভুত জুটি তারা। আমার জীবনে দেখা অন্যরকম ভালোবাসাময় ঝগড়ুটে জুটি।

বাসায় এসে দেখি সব শান্ত। বাবা-মা মুখোমুখি বসে মিষ্টি খাচ্ছে। মা বানিয়েছে নিশ্চয়ই। এখনই খেয়ে বাবা বলবে,
‘এই মিষ্টির স্বাদ, বড়ই বিস্বাদ!’
এটা বাবার ফেমাস ডায়লগ। মা কিছু বানালেই বাবা এরকম বলে। মা-ও যেন এটাই শুনতে চায়।

আমি চুপচাপ দেখতে থাকি ওরা কি করে। আজ কেন যেন ওদেরকে মন ভরে দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখলাম, বাবা মিষ্টি খেয়ে চুপচাপ চলে গেলেন। টু শব্দও করলেন না। মা ফ্যালফ্যাল করে বাবার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।

আমি এসে বাবার চেয়ারেই বসলাম। জগ থেকে পানি ঢেলে পান করলাম। মা ধুম করে চেয়ারে বসে বললো,
‘হৃদি রে! তোর বাবার কি হয়েছে বলতো?’
‘কি হয়েছে মা?’
‘আজ বললো না তো, এই মিষ্টির স্বাদ, বড়ই বিস্বাদ।’
‘মা! এটা নিয়ে এখন টেনশন করছো? বাবার হয়তো আজ মিষ্টি ভালো লেগেছে।’

‘ভালো লাগেনি বলেই তো বলেনি।’ মা খানিকটা বিরক্ত হলো বলে মনে হলো।
‘ভালো লাগেনি বলে বলেনি? কি বলছো মা? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’
‘তোর বুঝতে হবে না তো। আমি যাই গিয়ে বরং রসমালাই বানাই। মানুষটা খেতে বড্ড ভালোবাসে।’

মা চলে গেল। আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘আহারে ভালোবাসা। এমন ভালো কয়জন বাসে? সারাদিন যতই ঝগড়া করুক, পরিশেষে লোকচক্ষুর আড়ালে ওরা দুজন দুজনকে সীমাহীন ভালোবাসে।’

বিকেলের দিকে হুট করে রাফিনের ফোন আসে। ও সচরাচর ফোন করে না আমাকে। মাসে দু’তিনবার কিংবা তারও কম আমাদের ফোনে কথা হয়। আজকাল দেখাও হয় না খুব একটা। ও সবসময় নিজের মতো বিজি থাকে। খুব দরকার ছাড়া আমরা ফোনালাপ করি না। তবে রাফিন সবসময় নিজ থেকেই ফোন করে। আমার দিক থেকে ফোন করার কোনো নিয়ম নেই। সেই নিয়ম রাফিন রাখেনি৷ আমার ফোন করার দরকার হলে আগে থেকে ওকে ইনবক্সে বলে রাখতে হয় যে, আজ তোমার একটু সময় হবে? ও যদি বলে সময় হবে তবেই কথা বলতে পারি আমি। তাও ফোনটা ও নিজের সময়মতোই করে।
সম্পর্কের শুরুতে আমি প্রায়ই ওকে ফোন করতাম। কিন্তু ও কখনোই রিসিভ করতো না। কল কেটে ব্যাক করতো। এখন তাও করে না। আমি ফোন করলে ও সবসময় কেটে দেয়। কখনোই রিসিভ করে না। তাই আমি নিজ থেকেই কল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি৷ ওর ইচ্ছে হলে কথা হয়, নয়তো না।

ফোন বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। আমি দ্রুত রিসিভ করে সালাম দিলাম। সালাম দিতেই রাফিন জবাব দিয়ে বললো,
‘কি করছিলে?’
‘তেমন কিছু না। বসে আছি বারান্দায়।’
‘আজকে কাশবনে আসছো না?’
‘কাশবনে? কেন তুমি আছো ওখানে?’
‘হ্যাঁ তো।’
‘তাহলে এখনই আসছি আমি।’
‘আরে না, আসতে হবে না। বাদ দাও।’
‘না, না বাদ দিবো কেন? আসি আমি। বাসায় ভালো লাগছে না এমনিতেই।’ কথাটা বললাম বানিয়ে। ওর সাথে দেখা করবো বলে।

‘আচ্ছা তাহলে এসো।’
‘হুম আসছি।’
‘আর শোনো, সাইকেল নিয়ে এসো না অকে?’
‘হেঁটে যাবো অতদূর?’
‘নো ম্যাম, আপনি বাসার নিচে নামলেই হবে। আমি আসছি।’
‘সত্যি?’ খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম। রাফিন কখনো আগ বাড়িয়ে এত কথা বলে না। আর বাসার নিচে এসে আমাকে নিয়ে যাওয়া সে-তো স্বপ্নের মতো।

‘সত্যি রে বাবা! তাড়াতাড়ি নামো।’
‘আমি এক্ষুনি আসছি।’

ফোন রেখেই ঝটপট টপস-স্কার্ট পড়ে নিলাম। হিজাব পরে স্কার্ফটা গলায় পেঁচিয়ে উড়ন্ত গতিতে দূরন্ত বেগে নিচে নেমে এলাম। রাফিন সামনেই বাইকে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমাকে দেখেই মুচকি হাসলো। ওর সামনে যেতেই ফিসফিস করে বললো,
‘লুকিং সো কিউট!’

মনে মনে আবার একটা ধাক্কা খেলাম। রাফিন কখনোই আমার প্রশংসা করে না। সবসময় সত্যিটা বলে। মন রাখার জন্য কোনো কথা ও বলতে জানে না। ও রোবট টাইপের একটা ছেলে। যন্ত্রের মতো চলে, ভেতরে কোনো ফিলিংস নেই। মাঝেমধ্যে ওর জন্য আমার করা অত্যাধিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে কিঞ্চিৎ পরিমাণ ফিলিংস আসলেও সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকে না। আবার মাঝেমধ্যে আমার অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে ধমকাতেও ছাড়ে না আমাকে। সেই ছেলের আজ কি হলো বুঝতে পারছি না। আমি ভয়ে ভয়ে কাঁপা হাতে ওর কপালে হাত রাখলাম। ও আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, ‘কি?’

আমি চট করে হাত সরিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়ালাম। ও মুচকি হেসে বাইক স্টার্ট দেয়। একটানে কাশবনে চলে আসি আমরা।

রাফিন প্রতিদিন কাশবনে আসে ঠিকই। কিন্তু ইদানিং ও বাইক রাইড করে না। কাশবনের ফুরফুরে সুন্দর পরিবেশে বসে সে মনের আনন্দে পাবজি খেলে। তখন ওর আশেপাশে আমি থাকলেও ও কোনো পাত্তা দেয় না। তাই কাশবনে আসাও আমি বন্ধ করে দিয়েছি। ও আমার সামনে আছে অথচ কথা বলছে না, আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না ব্যাপারটা আমি একদমই মানতে পারি না৷ এটার জন্যও আমি কম ধমক খাইনি ওর কাছে। ধমক না খাওয়ার জন্য, এত ব্যাথা সহ্য না করার জন্য ওর মুখোমুখি হওয়াই আমি ছেড়ে দিয়েছি। ওকে ওর মতো থাকতে দিয়েছি৷ তাই কাশবনে আসতেই আমার মনে একটা প্রশ্ন কুইকুই করতে থাকে। রাফিন আজকেও অন্যদিনের মতো পাবজি খেলতে বসে যাবে না তো? তাহলে আমার সুন্দর মুডটা ফুশশ করে নষ্ট হয়ে যাবে। রাফিনকে প্রশ্নটা করার খুব ইচ্ছে থাকলেও করতে পারলাম না।

অনেকটা ভেতরে ঢুকে বাইক থামায় রাফিন। আমার হাত ধরে নিয়ে যায় কাশবনের ভেতর। চারপাশে হাজার হাজার কাশফুলে ছেঁয়ে আছে। তার মাঝখানে আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি৷ এসব কিছু আমার জন্য অনেক বেশি আশ্চর্যের বিষয়৷ এরকম ঘটনার মুখোমুখি অনেকদিন হইনি আমি৷ রিলেশনের প্রথমদিকে এরকম ঘটনা অহরহ ঘটলেও এখন সেসব শুধুই স্বপ্ন। রাফিন আমাকে নিয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে যায়। এখানে সুদীর্ঘ দুটো রেললাইন আছে। ও রেললাইনের একপাশে বসে আমাকেও বসতে বলে। আমি বসতেই বললো,
‘আজকে তোমার জন্য একটা বিশাল সারপ্রাইজ আছে।’

আমি একগাল হেসে বললাম,
‘আজকে তো সেই বিকেল থেকে একটার পর একটা সারপ্রাইজ পেয়েই চলেছি।’
‘মানে?’
‘প্রথমে তোমার ফোনকল, তারপর আমাকে নিতে আসা, প্রশংসা করা, হাত ধরে এই এতদূর নিয়ে আসা। সবকিছুই তো সারপ্রাইজ ছিলো আমার জন্য।’

‘তাই না?’ ঠোঁট টিপে হাসে রাফিন। তারপর বলে,
‘আরও একটা সারপ্রাইজ বাকি। এন্ড এটাই মেইন সারপ্রাইজ।’

রাফিন কাঁধ থেকে লম্বা একটা ব্যাগ নামায়। চেইন খুলে বের করে আনে সুন্দর গিটার। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলে,
‘তুমি একবার গান শুনতে চেয়েছিলে না? রিলেশনের শুরুর দিকে, মনে আছে?’

মনে থাকা সত্ত্বেও আমি বললাম, ‘না তো! আমার মনে নেই।’
‘তুমি বলেছিলে গান গাইতে, আমি তখন গাইনি। বলেছিলাম গিটারে সুর তুলে গেয়ে শোনাবো। মনে পড়েছে?’ আমাকে মনে করানোর ভঙ্গিতে বলে রাফিন।
‘হুম।’ আবেগে আপ্লুত আমি কথা বলার ভাষা হারিয়েছি।
ও বললো, ‘শুরু করি তাহলে?’
‘করো।’

ও গিটারে টুংটাং শব্দ তুলতে লাগলো। সাথে গাইতে লাগলো আমার প্রিয় গানটা।

“না বলা কথাগুলো দেখলে তোকে বলা হয়ে যায়,
হাজারো এলোমেলো চিন্তারা আজ থমকে দাঁড়ায়।
কেন রে দু’চোখে আসে না ঘুম
প্রতিটি পলকে আদুরে চুম
জানি না হয় রে কেন আমার এমন
মন খোঁজে মন, মনের মতো মন। (২)

অগোছালো আমি কেমন বদলে গেছি দেখ
আনমনে যা-ই বলি গল্পটা যে এক।
খোঁজে নে হৃদয়ের বাইপাসে
স্বপ্নেরা কত যায় আসে।
জানি না হয় রে কেন আমার এমন
মন খোঁজে মন, মনের মতো মন।”

গানের মাধ্যমে যেন ও ওর মনের না বলা সব কথা আমাকে বুঝিয়ে দিলো। পুরোটা সময় এত সুন্দর কেটেছে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছি।

রাফিন ওর বাইকে করেই আমাকে বাসায় পৌঁছে দিলো। বাইক থেকে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম ওর সামনে। চারদিকে অন্ধকার নেমেছে অনেক আগেই। ল্যাম্পপোস্টের মিটিমিটি আলোয় আলোকিত চারপাশ। আলো-আঁধারির মাঝে আমি মুগ্ধ হয়ে রাফিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও বাইকের হাতলে হাত রেখেই প্রশ্ন করে,
‘কিছু বলবে তুমি?’

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়ালাম। বললো, ‘বলো কি বলবে। রাত হয়ে যাচ্ছে তো।’

আমি আস্তে আস্তে বললাম, ‘কাছে আসতে হবে।’
‘হুম?’ রাফিন আমার দিকে চোখ বড় করে তাকালো।
আমি ওর দিকে সামান্য এগিয়ে বললাম, ‘অল্প কাছে।’
ও আমাকে ওর পাশে বাইকের সাথে ঘেঁষে দাঁড় করালো। বললো, ‘তাড়াতাড়ি বলো।’

আমি চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে দ্রুততর কন্ঠে বললাম, ‘ভালোবাসি’
রাফিন আমার হাত রীতিমতো ছুঁড়ে দিয়ে বললো, ‘এটা বলার জন্য এত্ত কাহিনী করতে হয়? কত্ত দেরী হয়ে গেল আমার। ধ্যাৎ! যাও বাসায় যাও।’

আমি তড়িৎ গতিতে ওর কাছ থেকে পিছিয়ে এলাম। ও চোখেমুখে বিরক্তি ভাব নিয়ে চোখের পলকে আমার সামনে দিয়ে বাইক নিয়ে চলে গেল। এই সামান্য ঘটনায় আমার সীমাহীন কান্না পেয়ে গেল। ডানচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুর লম্বা টান।

#Be_Continued_In_Sha_Allah ❣️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here