অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ১৫,১৬

#অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ১৫,১৬
নাফীছাহ ইফফাত
পর্ব ১৫

কাশবনে বসে যথারীতি গেইমস খেলছে রাফিন। ওকে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। চুলগুলো খাঁড়া, তার ভেতরে সুন্দরভাবে সানগ্লাসটা আটকানো। হাতে মোবাইল। ঠাস ঠাস করে আওয়াজ আসছে ফোন থেকে। থেকে থেকে ওর ঠোঁট নড়ছে। কথা বলছে বোধহয়। ব্ল্যাক জিন্সের সাথে হোয়াইট টি-শার্ট। টি-শার্টের ওপর বেগুনী, সাদা ও গোলাপী রংয়ের সংমিশ্রণে দাগকাটা শার্ট পরেছে। শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা। আগেরবারের রাফিনের সাথে আজকের রাফিনের আকাশ পাতাল ফারাক।
আমি হয়তো অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। এরমধ্যেই ওর খেলা শেষ হয়ে গেল। আমাকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক দিলো। আমিও এগিয়ে গেলাম। ওর পাশে বসতেই সানগ্লাসটা মাথা থেকে নামিয়ে চোখে পরলো। আমার দিকে একনজর তাকিয়ে বললো,
“তোমার আজকের গেটআপটা অসাধারণ। অলওয়েজ এমন থাকতে পারো না?”

বলা বাহুল্য, আমি আজও নেকাব করে এসেছি। বাট রাফিন আমাকে চিনলো কি করে? জিজ্ঞেসও করে ফেললাম,
“তুমি আমাকে চিনলে কিভাবে?”

রাফিন একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,
“ম্যাম, এটফার্স্ট ঐ চোখজোড়ার প্রেমে পড়ছিলাম আমি। না চিনি কি করে?”

আমি হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে সরে বসলাম। ও খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথার পেছনে হাত নিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো।

আমি বললাম, “কি যেন বলবে তুমি?”
“আমার মনে হচ্ছে তোমারও কিছু বলার আছে। আগে তোমার কথা শুনি?”
“উঁহুম! আগে তুমি বলবে। কারণ তুমি ডেকেছো। স্ক্রু ঢিলা যার মাথার তার বেশি কথা বলা উচিত না।”

রাফিন কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললো, “স্যরি বললাম তো। আমি টায়ার্ড হয়ে বাসায় গিয়ে তোমাকে কল দিলাম। কোথায় সুন্দর করে কথা বলবে তা না তুমি বারবার এক কথা বলে চলেছো। মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”

“তোমার সাথে মিষ্টি কথা বলা যায়? এক ধমকে রাতের ঘুম হারাম করে দাও আমার।”

রাফিন হো হো করে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে বললো,
“এত সিরিয়াসলি নাও আমার ধমক?”

স্মিত হেসে জবাব দিলাম, “জাস্ট একটা ধমক দিলে সেই রাতে আমার ঘুম হয় না আর। সারারাত কান্না করি। শত চেষ্টা করেও থামে না চোখের জল।”

রাফিন মনে হলো হালকা নরম হয়ে গেল। মৃদু কন্ঠে বললো,
“স্যরি! জানোই তো আমার মেজাজ…”
“হু। আমি কিছু মনে করি না। পরেরবার তোমার সাথে মিট করলেই ভুলে যাই সব।”

“আচ্ছা বলতো সেদিন কি হয়েছিল? সত্যিই কেউ এসেছিলো? আমি যে না সেটা তো শিউর।”
“কিছু না। বাদ দাও সেসব।”

সানগ্লাস খুলে টি-শার্টে ঝুলিয়ে রেখে ঠোঁট কামড়ে মিনিট দুয়েক আকাশপানে তাকিয়ে রইলো রাফিন।
আমি বললাম,
“তোমার না কি বলার ছিলো?”
“পরে বলবো, আজ থাক। আজ বরং তুমিই বলো। তোমার চোখেমুখে হাজারো প্রশ্ন, হাজারো জিজ্ঞাসা, আর ভয় সাথে উৎকন্ঠা কাজ করছে। কি নিয়ে এত এক্সাইটেড তুমি? দ্রুত বলে ফেলো।”

আমি চমকে রাফিনের দিকে তাকালাম। এত ইজিলি আমার চোখের ভাষা পড়ে নিলো? আজ নিকাব করে আছি বলে? শুধু চোখ দেখেই সব বুঝে নিলো? এমন মানুষকে ছাড়ার প্রশ্নই আসে না, বরং চিরতরে জীবনের সাথে বেঁধে ফেলা যেতে পারে।

“বলার তো অনেককিছুই আছে। বাট তুমি বিষয়গুলোকে কিভাবে নিবে সেটাই মূল ব্যাপার।”
“বলো শুনছি। নরমালি নেওয়ার ট্রাই করবো।”

“প্রথমত, পাবজি খেলে আর কতদিন? তোমার তো যথেষ্ট বয়স হয়েছে আয়-রোজগার করার। এখনই যদি কিছু শুরু না করো তাহলে কিভাবে হবে?”

রাফিন হেসে বললো, “আ’ম ফাইন আরোহী। মাই ফাদার হ্যাভ আ লট অফ মানি। এত টাকা আমি সারাজীবন খেয়েও শেষ করতে পারবো না। তো কেন এখনই আমাকে কোনোকিছু করা নিয়ে ভাবতে হবে? আরও কিছুদিন যাক।”

“তুমি এরমধ্যেই দুটো ভুল কথা বলেছো।”
“ওহ রিয়েলি? আজকাল তুমি আমার ভুল ধরাও শিখে গিয়েছো দেখছি। ওকে ফাইন বলো কি ভুল বলেছি?”

“প্রথমত, তুমি বলেছো তোমার অনেক সম্পদ। এত সম্পদ তুমি সারাজীবন খেয়েও শেষ করতে পারবে না। অথচ তুমি জানো না, আল্লাহর কাছে এই সম্পদ কেড়ে নেওয়া দু’সেকেন্ডেরও ব্যাপার না। আর সারাজীবন খেয়েও শেষ করতে পারবে না এটা কেমন কথা? আল্লাহর তো এই সম্পদ নিয়ে নিতে সেকেন্ডও লাগবে না।”

রাফিন সাথে সাথে বললো,
“তাহলে আমি যদি কোনো কাজ স্টার্ট করি সেটাও তো আল্লাহ কেড়ে নিতে পারেন। তখন কি হবে?”
“সেটা ভেবে এখন থেকে বসে থাকলে তো চলবে না। ঠিক তেমনই তোমার বাবার সম্পদ আজীবন থাকবে ভেবেও বসে থাকা যাবে না। আল্লাহ কখনোই বলেননি বসে বসে খেতে। বরং খেঁটে খাওয়ার কথা বলেছেন।”

রাফিন কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তারপর বললো,
“ইউ হ্যাভ আ লট অফ চেঞ্জড মিস আরোহী! এনিওয়ে, পরের ভুলটা বলো।”

“দ্বিতীয় ভুলটা হলো, তুমি নিজেকে এখনও অনেক ছোট ভাবছো। ভাবারই কথা। আফটার অল, তুমি তোমার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। বাট অন্য সবার কাছে তুমি তো ছোট না। তুমি যথেষ্ট ম্যাচিউর্ড। নিজে কিছু একটা করার মতো টাইম তোমার হয়ে গেছে।”

“তুমি কি বলতে চাইছো ক্লিয়ারলি বলো।”

অনেকক্ষণ নিরব থেকে চোখ বন্ধ করে বলে ফেললাম,
“আই ওয়ান্ট টু মেরি ইউ।”
“হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি?” রাফিন যেন আকাশ থেকে পড়লো।

“এতদিন ছিলাম, নাউ আই এম কমপ্লিটলি ওকে। আমি আমাদের অবৈধ রিলেশনটাকে বৈধ করতে চাইছি। এভাবে প্রতিনিয়ত গুনাহ করার তো কোনো মানে হয় না।”

“ওহ আচ্ছা। গুনাহ করছো সেটা তোমার আজ মনে হলো? কেন আমি তো তোমাকে আগেও বলেছি এসব কথা। তখন তো পাত্তা দাওনি। আমি রোমান্টিক না বলে কত কথা বলেছো।”

“সেটাই তো বলছি। এতদিন ভুল ছিলাম। ভুল বুঝতে পেরেছি তাই সংশোধন করতে চাইছি।”

“তোমার ভুল সংশোধন করার জন্য এখন আমার লাইফ, আমার রুলস ব্রেক করে বিজনেস করতে বলছো?”
“বিজনেস তো আমার জন্য করতে বলছি না। বলছি তোমার জন্যও। তোমার তো নিজে কিছু করার মতো ম্যাচুরিটি, বয়স হয়েছে। তাহলে শুধু শুধু কেন বসে থাকবে?”

“সেটা আমার ব্যাপার আমাকেই ভাবতে দাও।”

“তাহলে কি বিয়ে করবে না আমাকে?” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম।

এই কথা শোনার পর রাফিন সীমাহীন রেগে গেল।
“আরোহী, ইউ নো বেটার, কারো জন্য আমি নিজেকে একচুল পরিমাণও বদলাতে পারবো না। থাকতে হলে থাকো নাহলে চলে যাও। এটা তোমাকে আমি আগেও বলেছি। আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো। তোমাকে বিয়ে করার জন্য নিজেকে চেঞ্জ করা পসিবল না আমার পক্ষে। পারলে তোমার বাবা-মাকে রাজি করাও। বলো যে, আমার কোনো জব নেই। বাবার বিশাল সম্পত্তি আছে বাট ছেলে বেকার। এমন একটা মেয়েকে ওরা মেয়ে দিবে কিনা জানতে চাও।”

রাফিনের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম আমি। চোখ জ্বালা করছে প্রচুর। মনে হচ্ছে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। হৃদয় ভাঙ্গার যন্ত্রণা অনুভব করছি। পুরোটা হৃদয়ই যে ওকে দিয়ে বসে ছিলাম। এখন তীব্র কথার আঘাতে সেই হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে।

আমি বললাম,
“তুমি রাজি কিনা বলো। তুমি রাজি থাকলে আমার বাবা-মাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।”

ও আবার বললো,
“তুমি আর কি রাজি করাবে? ওরা নিজেরাই তো ঝগরুটে, ওরা আর কি করবে? নিজেরাই ঝগড়া বাঁধিয়ে বসে থাকবে৷ তোমার ব্যাপারটা আর মাথাতেই রাখবে না।”

রাফিনের কথা শুনে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম আমি৷ চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো। কিছুতেই আটকাতে পারলাম না। কোনোরকমে বললাম,
‘তুমি আমার বাবা-মাকে নিয়ে এটা বলতে পারলে?’

ও নির্লিপ্ত গলায় বললো,
‘না পারার কি আছে? যেটা সত্যি সেটাই বললাম।’

এরপর আর কোনো কথা হয় না। আমি সবকিছু ঝাপসা দেখছি। রাফিনের সাথে আর একটাও কথা না বলে আমি সামনে অগ্রসর হলাম। তাৎক্ষণিক মনে হলো অন্তত কিছু একটা বলা উচিত।
পেছন ফিরে বললাম, “তুমি নিজেই বিয়ে করবে না সেটা বলে দিলেই হতো৷ আমার বাবা-মা কখনোই দ্বিমত করতো না। ওরাও আমার পছন্দকে পছন্দ করতো। অন্তত তোমাকে নিয়ে কিংবা তোমার বাবা-মাকে নিয়ে বাজে কথা বলতো না।”

এরপর দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলাম। চোখের জল তখনও গড়িয়ে পড়ছে। আমি ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের ঝগড়া দেখে আসছি। তাই সবসময় সব জায়গায় ঝগড়া মিটানোর চেষ্টা করি। বিশেষ করে, রাফিনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ও সবসময় রেগে থাকে। আমার মতে, সম্পর্কে যেকোনো একজন সেক্রিফাইজ করলে সম্পর্কটা সুন্দরভাবে টিকে থাকে। সম্পর্কে যদি একজন রাগান্বিত হয় তাহলে অন্যজনকে শান্ত হতে হয়। কেননা একজন আগুন হলে অপরজনকে পানি হওয়া প্রয়োজন। আগুনে আগুন ঢাললে তো সব পুড়িয়ে ছারখার হয়ে যাবেই। বাবা-মায়ের কেউই সেক্রিফাইজটা করতে চায় না বলেই ওদের মধ্যে এত ঝগড়া হয়। সেই ঝগড়া থেকে শিক্ষা নিয়েই আমি সবসময় যেকোনো মূল্যে ঝগড়া মিটমাট করে ফেলি। কিন্তু রাফিন মাঝেমধ্যে এমন রুড বিহেইভ করে যেটা মেনে নিতে খুব কষ্ট লাগে। আজকে তো ও মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেষমেশ আমার বাবা-মাকে নিয়ে ও কথা বললো?

কাঁদতে কাঁদতে এসব ভাবছিলাম। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাস্তায় ধুম করে পড়ে গেলাম। চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি সামনে রাফিন দাঁড়িয়ে আছে। ও বললো,
“এভাবে কোথায় ছুটছো আরোহী? আরে তোমার চোখে অশ্রু কেন?”

আমি চোখের পানি মুছে রাফিনের দিকে তাকালাম। ওকে তো মাত্রই পেছনে ফেলে এলাম। এরমধ্যেই ও আমার সামনে এলো কি করে? সাথে সাথে ওর মাথার দিকে তাকালাম। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। উফ! কি হচ্ছে আমার সাথে? রাফিন কিংবা রাফিনের মতো দেখতে মানুষটাকে পেছনে ফেলে দ্রুত বাসায় ছুটে গেলাম।

বাসায় এসে সোজা বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে পড়লাম। রাফিন আমাকে বিয়ে করবে না বলে দিয়েছে। এখন একটাই সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হবে, ওকে ছেড়ে আসা৷ ওর জন্য আমি দুটো অপশন রেখেছিলাম। এক. অবৈধ সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটিয়ে চিরতরে জীবনের সাথে বৈধভাবে বেঁধে ফেলা। দুই. চিরতরে ওকে ছেড়ে চলে আসা।
ও নিজ মুখেই বললো, থাকতে হলে থাকো নাহয় চলে যাও। এরপর আমি আর থাকি কি করে? আমাকে ও বাধ্য করছে দুই নাম্বার অপশন বেছে নিতে। ওর তো আমাকে আটকে রাখার কোনো চেষ্টাই নেই। যতক্ষন আমি ধরে রাখবো ততক্ষণ সম্পর্ক থাকবে। সবরকম চেষ্টা আমি করবো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার। আর ও একনিমেষে সব শেষ করে দিবে? এই সম্পর্কে ওর কোনো দায়িত্ব নেই? সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কি আমি একাই লড়বো? একটা সম্পর্ক তো একা একজন বয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এটা তো সম্ভব না কোনোভাবেই।

#Be_Continued__In_Sha_Allah ❣️

#অগত্যা_তুলকালাম
নাফীছাহ ইফফাত

পর্ব ১৬

ঘন্টাখানেক শাওয়ার নেওয়ার পর নাকীব এসে দরজায় হুলস্থুল নক করতে লাগলো।
“এ্যাঁই আপু, কি হয়েছে তোমার? আর কতক্ষণ শাওয়ার নিবে?”
“আসছি।” বলে তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে নিলাম যাতে চোখের ফোলা ভাবটা কমে। কাঁদতে কাঁদতে এবং বেশিক্ষণ ভেজায় চোখগুলো ফুলে একেবারে ঢোল হয়ে গেছে।

খানিকক্ষণ সময় নিয়ে তাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হলাম। বের হতেই নাকীবের প্রশ্নবিদ্ধ তীর আমার দিকে তেড়ে এলো। চোখজোড়া বড় করে ও বললো,
“তুমি কাঁদছিলে আপু? কেন?”
“কই? না তো!” অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম।

নাকীব চুপচাপ বসে রইলো। সাধারণত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আগে ও যেভাবে বসে। আমিও ফোলা চোখ লুকাতে চুল মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ পর নাকীব বললো,
“আপু, বৃষ্টি নামার আগমুহূর্তে কিন্তু আকাশ কালোমেঘে ঢেকে যায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে মেঘ গাঢ় হতে হতে ঘন কালো রংয়ে রূপ নেয়। এরপর ঝুম বৃষ্টি নামে। আবার বৃষ্টি যখন থামে তখন আকাশ ধবধবে সাদা হয়ে যায়। বোঝা যায় না যে, একটু আগেও এই আকাশে জমেছিল সহস্র অভিমানের মেঘ। কিন্তু পরিবেশ দেখে ঠিক বোঝা যায় খানিক আগেই ঝুম বৃষ্টি হয়েছিল। তোমার অবস্থাও এখন সেইম আপু।”

বলে নাকীব আমার দিকে তাকালো। আমি এতক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে ওর কথা শুনছিলাম। ও তাকাতেই ঝট করে চোখ সরিয়ে নিলাম। ও আবার বললো,
“আমি জানি না তোমার কি হয়েছে। তুমি না জানাতে চাইলে জানতে চাইবোও না। বাট এটুকু জেনে রাখো, পৃথিবীতে আমি সবকিছু সহ্য করতে পারলেও তোমার কান্নাভেজা দৃষ্টি আমার কিছুতেই সহ্য হয় না। তোমার মুখে হাসিটাই মানায়, কান্না বড্ড বেমানান।”

আমি জানি এই মুহুর্তে নাকীব আর কিছু বলবে না। আমি না বলা পর্যন্ত কিছু জানতেও চাইবে না। কিন্তু ওকে এখনই আমি সবকিছু খোলাসা করে বলতে চাই না আবার এসব কিছু থেকে আড়ালেও রাখতে চাই না। কারণ ইতিমধ্যেই ও ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে আমি জানি। তাই আকারে-ইঙ্গিতে বললেই যাতে বোঝা যায় সেভাবেই ওকে বিষয়টা জানাতে হবে।

নাকীব চলে যেতে উদ্যত হলেই আমি বললাম,
“রাফিনের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করিস না। ও যেন যোগাযোগ করতে না পারে তোর সাথে…”
“অকে।” কথা না বাড়িয়ে চলে গেল নাকীব৷

টানা তিনদিন আমি ফোন অফ করে রাখলাম। যদিও জানি রাফিন ফোন দিবে না। বাসা থেকেও বের হইনি একবারও। বাসায় বসে ছোটফুফির দেওয়া সব বই পড়ে শেষ করলাম।

সন্ধ্যায় বাবা-মা রুমে বসেছিলো। নাকীব এসে আমাকে ডেকে নিয়ে এলো বাবার রুমে। আমাকে পাশে বসিয়ে বাবা জানতে চাইলেন,
“তোমাকে বড্ড মনমরা দেখাচ্ছে। সারাক্ষণ দরজা বন্ধ করে বসে থাকো, বাইরে যাও না বেশ ক’দিন। কি হয়েছে তোমার?”

নাকীব আমার পাশেই বসেছিল। ও ফিসফিস করে বললো,
“হৃদয়ে রক্তক্ষরণ!”
আকষ্মিক কেঁপে উঠে ওর দিকে তাকালাম। অথচ ও অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে।

মা বাবাকে বললেন, “তুমি নাকি তোমার মেয়েকে কত ভালোবাসো। তোমার মেয়েও তো ভালোবাসে তোমাকে। তো কি সমস্যা সেটা খুলে বলছে না কেন?”

বাবা বললেন, “মেয়েরা সব কথা বাবাদের বলে না। মায়েরা সন্তানের বন্ধু হতে পারলে তবেই সবকিছু তারা মায়ের সাথে শেয়ার করে। বাবা যতই বন্ধু হোক দিনশেষে কিছু কথা তারা বাবাকে বলতে পারে না। সংকোচ থেকেই যায়। নরমাল বিষয়টাও জানো না?”
“তোমার মেয়ে তো সব কথা তোমাকেই বলে। আমাকে তো আর বলে না।”

“সব কথা বলে। এটাও বলবে যদি বলার মতো হয়। বলতো মা, তোর কি হয়েছে?”

“কিছু না বাবা। এমনি ভালো লাগছে না আমার।” আমি বললাম।
“এমনি ভালো লাগবে না কেন? এমনি এমনি আবার ভালো না লাগতে পারে নাকি?”

নাকীব বললো, “থাক না বাবা, ওকে ওর মতো থাকতে দাও। কয়েকদিন পর ও নিজেই নিজেকে সামলে নিবে। তাছাড়া আমি তো আছিই।”
“তুই চুপ কর। দু’দিনের ছেলে হয়ে তুই কি বুঝবি এসবের?” বাবা বললেন।

মা বললেন, “তুমি আমার ছেলেকে একদম ধমকাবে না তো।”
নাকীব বিরক্ত চোখে তাকালো বাবা-মায়ের দিকে। আমি শান্তস্বরে বললাম,
“বাবা, মা তোমরা তোমাদের ঝগড়াঝাঁটি কি কোনদিন বন্ধ করবে না? এভাবেই তুলকালাম চালিয়ে যাবে আজীবন?”

মা সাথে সাথে বললেন, “ঝগড়া করে তোর বাবা।”
বাবা হাত তুলে মাকে থামালেন। বললেন,
“আমরা তো সবসময় ঝগড়া করি। এটা নিয়ে তো কখনো তোমাদের সমস্যা হয়নি। দরজা বন্ধ করে বসে থেকেছো এমনটা তো কখনো হয়নি। তাছাড়া আমরা ঝগড়া করলে তুমি জিনিস ভাঙ্গো, রাগটা সামনাসামনি উগরে দাও। এভাবে দরজা বন্ধ করে তো কখনো থাকো না। তোমার কি সমস্যা হচ্ছে?”

“বাবা, সবসময় রাগ উগরে দেই আর কোনো অভিযোগ করি না বলে কিন্তু এই না যে, তোমাদের ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে আমাদের কোনো প্রবলেম ফেস করতে হয় না। বরং আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের কাছে আমরা প্রায়সময় তোমাদের ঝগড়াঝাঁটির জন্য প্রবলেমে পড়ি।” নাকীব বললো।

“তোমরা সবসময় ঝগড়া করো নরমাল কিছু বিষয় নিয়ে। যেটা একজন সেক্রিফাইস করলেই সল্ভ হয়ে যায় সেরকম বিষয়কেও তোমরা টেনে টেনে ঝগড়ার মাধ্যমে লম্বা করে ফেলো। তোমাদের ঝগড়াগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। আনলজিক্যালি ঝগড়া করেই যাও। তোমাদের এসব আনলজিক্যাল ঝগড়ার জন্য আমাদেরকে কতটা প্রবলেম ফেস করতে হয় বোঝোই না তোমরা। সারাক্ষণ তো ঝগড়াই করো। কখনো আমাদের সিচুয়েশন বোঝার ট্রাই করেছো? আমাদের ফ্রেন্ডদের সামনেও ঝগড়া করেছো তোমরা৷ তোমাদের এসব ঝগড়ার জন্য কত কি ফেস করতে হয় আমাদের জানো? জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোও শুধুমাত্র তোমাদের ঝগড়ার দোহাই দিয়ে জীবন থেকে হারিয়ে যায়। ঝগড়ার সময় আমাদের এই উইক পয়েন্ট ধরে কথা শোনাতে ভোলে না। তোমরা প্লিজ এসব বন্ধ করো, প্লিজ!”

এই পর্যায়ে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। কান্না করে দিলাম। রুমে এসে দরজা আটকে বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম সারা সন্ধ্যা। রাতে বাবা-মা, নাকীব, ছোটফুফি একে একে সবাই ডিনারের জন্য ডেকে গেলেন। কিছুতেই দরজা খুললাম না। সারারাত বসে বসে কাঁদলাম। কোনোকিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।

গভীর রাতে ফোন অন করলাম। অন রেখেই ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর চারটার দিকে ফোনের রিংটোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। সারারাত কান্না করায় চোখগুলো ফুলে আছে ভীষণভাবে। অনেক কষ্টে চোখ না মেলেই ফোন কেটে দিলাম। এত ভোরে কল করার মতো আহামরি কেউ আমার জীবনে নেই। যে আছে তার জন্যই আমার এই ক্রন্দন। চোখ বুজেই ছিলাম। আবার কল আসলো। এবার বেশ বিরক্ত হয়ে রিসিভ করলাম।
“কি সমস্যা? এত রাতে বারবার ফোন দিচ্ছেন কেন? আর কোনো কাজ নেই? বেকার নাকি? রাতে-বিরেতে কল দিয়ে মেয়েদের ডিস্টার্ব করা। ফালতু লোক!” বলে ফোন কেটে দিলাম।

একটু পর আবার কল এলো। আজব তো! এত অভদ্র কোনো মানুষ হয়? এবার উঠে বসে তারপর রিসিভ করে বললাম,
“কি সমস্যা আপনার? কল কেটে দিচ্ছি তাও কল করেই যাচ্ছেন? কে আপনি?”
“নাম্বারও ডিলিট করে দিয়েছো এরমধ্যেই?”

কন্ঠ শুনে বোবা হয়ে গেলাম আমি। চট করে ফোন স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি রাফিনের নাম্বার। আশ্চর্য! আমি এতক্ষণ নাম্বার না দেখেই কথা বলছিলাম? সেন্স কোথায় ছিল আমার?
কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে বললাম,
“এত রাতে মানুষ ঘুমে থাকে। ঘুমের ঘোরে ফোন পেলে নিশ্চয়ই মানুষ বিরক্ত হবে। ঘুম ভাঙ্গিয়ে এতরাতে কল করাটা কোনো ভালো মানুষের কাজ না। বেকারদের কাজ।”

রাফিন স্মিত হেসে বললো, ”ইউ মিন, বেকাররা খারাপ মানুষ?”
“না, বেকাররাও ভালো। যারা সারারাত গেইমস খেলে তাদের মাথার স্ক্রু তো কয়েকটা ঢিলে হয়ে যায়। তখন তারা ভাবে অন্যদের স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেছে। তারা যখন বেকার হয় তখন এরকম উল্টাপাল্টা কাজ করে। তারা সারারাত জেগে থাকে তো তাই ভাবে অন্যরাও জেগে আছে।”

“আরোহী স্টপ ইট! কি প্রবলেম তোমার? এতরাতে ফোন করেছি এটাই প্রবলেম তো? ফাইন, রেখে দিচ্ছি। দিনে কথা হবে।”

“তোমার কথামতো না সব? তুমি বললেই আমাকে তোমার লাইফ থেকে চলে যেতে হবে, তুমি বললেই ফিরে আসতে হবে। আবার তুমি চাইলে রাতে-বিরেতে কল দিতে পারবে, আমি চাইলেই সেন্টিমেন্টাল কাজ-কারবার হয়ে যাবে। তুমি চাইলেই আমাকে যখন তখন ডাকতে পারবে আর আমি বললে কত কাজ থাকে তোমার। খেলো তো সারাদিন গেইমস। কাজের দোহাই দিতে লজ্জা করে না?”

রাফিন ভীষণভাবে ধমকে উঠলো।
“স্টপ ইট আরোহী! হোয়াট’স রং উইথ ইউ?”
“রং শুধু আমি করি, তুমি কিছুই করো না। আসলে কি জানো তো, যাদের বাবার টাকার জোর আছে তারা মানুষকে নিজের কিনে নেওয়া ভাবে। নিজের তো দু’টাকা কামাবার মুরোদ নেই আবার আসে বাপের টাকার জোর দেখাতে। অন্যের বাবা-মাকে নিয়ে যা নয় তাই বলতে।”

“আরোহী, আই সেইড স্টপ। ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট।” দাঁতে দাঁত চেপে বললো ও।
“আমি লিমিটের মধ্যেই আছি।”

“ওকে লিসেন। তোমার সাথে এভাবে কথা বললে হবে না। তুমি আমার সাথে আজই মিট করবে। সকাল সকাল।”

আমি হো হো করে হেসে বললাম,
“রিয়েলি? তুমি এখনো এক্সপেক্ট করো যে আমি তোমার সাথে মিট করবো? মনে আছে লাস্ট ডে কি কি বলেছিলে? এরপরও তোমার মনে হয় আমি তোমার কথায় উঠবো আর বসবো? আমি একা ভালোবেসেছি তো তাই একাই সেক্রিফাইজ করছিলাম এতদিন। তুমি তো কোনদিনও সেক্রিফাইজ করোনি। শুধু অর্ডার করে গিয়েছো, আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনেছি। ব্যাপারটা এমন, তুমি গুরু আমি শিষ্য।”

রাফিন অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললো,
“আমি সেদিন রাতেই তোমাকে কন্টাক্ট করার ট্রাই করছি। বাট তোমার ফোন সুইচড অফ। আজ কিভাবে যেন ঢুকে গেল। এতদিন পর ফোনে পেয়ে ভাবলাম…”

“কি ভাবলে? ভাবলে আরেকটু ধমকে নিই। সেদিন কম হয়ে গিয়েছিল। শুধু বাবা-মাকে বলা উচিত হয়নি, চৌদ্দ গুষ্টিকে বলা উচিত ছিল। বলো বলো?”

“আমাকে এক্সপ্লেইন করতে দাও প্লিজ?”
“নো নিড টু ইউর এক্সপ্লেনেশন। আমি ঘুমাবো এখন। রাখছি।”

রাফিন দূর্বল গলায় ডাকলো, “আরোহী!”
আমি খট করে লাইন কেটে দিলাম। আমি নিজেই অবাক এত রুড ব্যবহার করে। জীবনে প্রথম মনে হয় রাফিনের সাথে এত রুডলি কথা বলেছি।

#Be_Continued__In_Sha_Allah ❣️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here