স্বর্নাভ_সুখানুভূতি। (পর্ব-১৭)

#স্বর্নাভ_সুখানুভূতি। (পর্ব-১৭)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা

জাওয়াদের মাত্রাহীন রাগটা বিস্ময়ে রূপ নিল রুমে পা রাখার পরপরই। ওর বদ্ধমূল ধারণা ছিল, মুশরাফা রাগত মুখে থাকবে, ওকে দেখলেই মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝুলি খুলে বসবে। তখনই জাওয়াদ নিজের রাগ ঝাড়বে। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছিল ও। কিন্তু রুমে ঢুকেই তার ধারণা ভুল প্রমাণ হলো। মুশরাফা রাগত চেহারায় বসে নেই। সে প্রফুল্ল মনে, মুখে ফেসপ্যাক মেখে কাউচে আরাম করে বসে আছে । চোখ বন্ধ, কানে ইয়ারফোন। হাতে ফোন, সম্ভবত গানটান শুনছে। অন্যসময় তো খুব হাদিস ঝাড়ে, এখন নিজে গান শুনছে! এত অধঃপতন! তার মাকে কষ্ট দিয়ে এখানে গুর্তি করছে! কত খারাপ মেয়ে!

জাওয়াদ ক্ষুদ্ধ চোখে তাকিয়ে কত কী ভাবল! আকস্মিক রাগটা আবার চলকে উঠল। তার মা ওখানে কান্না করছে, আর এই মেয়ে এখানে গান শুনে ফুর্তি করবে তা তো হবে না। এই মেয়েকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে। নিজের উপস্থিতি জানান দিতে জাওয়াদ শব্দযোগে দরজা লাগাল। সেই শব্দ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন দেয়াল কেঁপে উঠল, বিকট এক শব্দ হলো। মুশরাফা চমকে উঠল। চোখ খুলে জাওয়াদকে দেখতে পেল। ওকে বিস্মিত দেখাল না একটু ও। আর না ওর চোখে কোন ভয় দেখতে পেল জাওয়াদ। একবারে স্বাভাবিকভাবে প্রসন্ন হেসে সালাম দিল,
‘আসসালামু আলাইকুম। ‘

জাওয়াদ উত্তর দিল না। চোখ মুখ লাল করে বলল,
‘সমস্যা কী তোমার?’

মুশরাফা ওর রাগের পরিমাপ আন্দাজ করে হাসল। উঠে দাঁড়াল, কান থেকে ইয়ারফোন সরিয়ে হাতে নিল। সেন্টার টেবিলে থাকা জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসটা টেবিলে রাখল আবার। তারপর ফোন হাতে জাওয়াদের দিকে এগিয়ে গেল। জাওয়াদকে টেনে বসাল খাটে। সদ্য কান থেকে খুলে রাখা ইয়ারফোন দুটো জাওয়াদের কানে গুজে বলল,
‘ আপনি বসুন। আমি মুখ ধুয়ে আসি। ‘

জাওয়াদকে কিছু বলতে না দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। মেয়েটা ওকে ইগ্নোর করছে! রাগের মাত্রা বাড়ল। ক্রুদ্ধ হয়ে তাকাল ওর দিকে। কিছু বলতে মুখ খোলার আগেই কানে গুজানো ইয়ারফোনে মধুর সুরে কুরআন তেলাওয়াত বেজে উঠল। জাওয়াদ আকস্মিক থেমে গেল। হতভম্ব চোখে তাকাল ফোনের দিকে। ফোন বিছানায় রাখা। সুরা আর রাহমান বাজছে। অনেকটুকু শোনা হয়েছে। এর মানে এতক্ষণ মেয়েটা গান নয় কুরআন তেলাওয়াত শুনছিল! জাওয়াদের খানিক আগের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ হলো।

কানে ইয়ারফোন গুজে কুরআন তেলাওয়াত শুনলে প্রতিটা আয়াত হৃদয়ে গিয়ে লাগে, আকস্মিক মনে প্রশান্তি বয়ে যায়। চোখ বুজে আসে, কেমন শান্তি শান্তি লাগে। একটা অশান্ত মানুষ ও কেমন শান্ত হয়ে যায়। রাগটা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। যখন কুরআন তেলাওয়াত শোনা হয়, তখন শয়তান সাথে থাকে না। শয়তান দূরে যাবার সময় রাগটাও নিয়ে যায়। রুমে আসার সময় সাথে করে যেই রাগ নিয়ে এসেছিল, সেই রাগটা কমতে শুরু করল হঠাৎ। জলন্ত লাভার মতো প্রবাহিত হওয়া রাগের উপর যেন কেউ পানি ঢেলে দিল। জাওয়াদ একবার চাইল তেলাওয়াদ বন্ধ করে দিতে, কিন্তু কী যেন তাকে বাধা দিল। সে পারল না, শুনে গেল। মন মস্তিষ্ক শান্ত হয়ে আসছে ওর। কখনো এভাবে শোনা হয়নি এই তেলাওয়াত!

মিনিট পাঁচেক বাদে মুশরাফা মুখ ধুয়ে বের হলো। জাওয়াদের কানে ইয়ারফোন দেখেই বিড়বিড় করে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ল। তারপর জাওয়াদের দিকে এগিয়ে এলো। ফোন তুলে তেলাওয়াত বন্ধ করল। জাওয়াদ চোখে মেলে তাকাল। মুশরাফা হাসল। একগ্লাস পানি এনে হাতে দিল। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো স্বরে বলল,

‘রাগ সম্পর্ককে ধ্বংস করে। রাগের বশে মানুষ নিজের অজান্তেই ‘তালাক’ এর মতো শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে। রাগ কোন সমস্যার সমাধান করে না, বরং সমস্যা সৃষ্টি করে। রাগের বশে আপনি আমাকে বকাঝকা করবেন, হয়তো গায়ে হাত ও তুলতে পারেন। রাগ চলে গেলে, আপনি হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পারবেন, ক্ষমা ও চাইবেন। কিন্তু আমি হয়তো ক্ষমা করতে পারব না। আপনার জন্য আমার মনে থাকা ভালোবাসা, সম্মান উঠে যাবে। তার পরিবর্তে একটা তিক্ততা সৃষ্টি হবে। যা চাইলেও আমি মুছতে পারব না। এই তিক্ততা সম্পর্ককে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়। আপনার মনে আমার জন্য রাগ আছে, আপনি তিক্ত কথা বলবেন, শাসন করবেন। কিন্তু সেটা রেগে নয়, ঠান্ডা মাথায়। ঠান্ডা মেজাজে আপনি আপনার সব অভিযোগ পেশ করুন, আমি শুনব। আমার ইসলাম যদি বলে আমি অন্যায় করেছি তবে আমি ক্ষমা চেয়ে শুধরে নিব। কিন্তু রাগের মাথায় আমি আপনার সাথে সংলাপে বসে সম্পর্কটাকে ভাঙতে চাচ্ছিনা।’

থামল মুশরাফা। পরপরই বলল,
‘ বাইরে থেকে এসেছেন। আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শাওয়ার নিয়ে নিন। ফ্রেশ লাগবে। মেজাজ ও ঠান্ডা হবে। আমি অপেক্ষা করছি, আপনি ফ্রেশ হয়ে আসলে আপনার কথা শুনব। আপনার তিক্ততা, অভিযোগ সব শুনব। যান।’

জাওয়াদ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কিছুই বলল না। মুলত সে বলতে পারছে না। তার রাগ সব উধাও, পয়েন্ট ভুলে গিয়েছে। খানিক বসে উঠে দাঁড়াল। কথা সাজানো দরকার। মেয়েটার সাথে একটা রফা দফা করতেই হবে। মুশরাফা নিজেই স্বামীর কাপড় এনে দিল। লম্বা শাওয়ার নিল জাওয়াদ। শাওয়ারের মাঝে কথাও সাজিয়ে নিল। বেরিয়ে দেখল মুশরাফা বসে আছে খাটে। ওকে দেখেই হেসে বলল,
‘এবার আপনার অভিযোগ পেশ করুন। ‘

জাওয়াদ চোখে মুখে গম্ভীরতা টেনে খাটে বসল। কথার বলার সময় টের পেল, ওর ভেতরে রাগ নেই। হাতড়িয়ে রুমে আসার সময়কার রাগটা খুঁজে পেল না। সেই রাগ উধাও হয়ে গেছে। জাওয়াদ শান্ত সুরে বলল,
‘ জিশানের সাথে তোমার সমস্যা কী? ওকে না দেখে ওর গায়ে খারাপের ট্যাগ লাগানোর সাহস কী করে পাও তুমি? আসতে না আসতেই এত অশান্তি শুরু করার মানে কী?’

মুশরাফা অবাক হলো না। যেন সে জানতো জাওয়াদ এমন কিছু বলবে। সে ধীর স্বরে বলল,
‘আমি উনাকে খারাপ বলিনি। শুধু বলেছি আমি উনার সাথে দেখা করতে পারব না।’

‘কেন পারবে না? মা এতবার ডেকেছে যাওনি কেন?’

‘উনি গায়রে মাহরাম। উনার সাথে দেখা দেয়া জায়েজ নেই। অতিব প্রয়োজন না হলে উনার সামনে যাওয়ার অনুমতি নেই আমার। মা শুধুমাত্র আলাপচারিতার জন্য ডেকেছেন, যেখানে ফিতনার আশঙ্কা ছিল। এটা অতিব প্রয়োজনের কাতারে পড়ে না। উনার সাথে আমার দেখা না হলে খুব একটা অসুবিধা হবে না, বা বিপদ হবে না। তাই আমি উনার সামনে যাওয়া অনুচিত মনে করেছি।’ শান্ত স্বরে বলল মুশরাফা।

জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকাল, ‘ এক বাসায় থেকে তুমি মুখোমুখি হবে না? দেখা তো হয়েই যাবে, তখন কী করবে?’

‘ ধরুন, এমন প্রয়োজন যখন উনার সাহায্য ছাড়া আমার চলছে না বা উনার মুখোমুখি হওয়া অবশ্যকরণীয় হয়ে উঠবে তখন পর্দায় থেকে যাব। জুরুরি না হলে উনার মুখোমুখি হবো না। আর হুটহাট দেখা হওয়া থেকে বাঁচাতে আমি নিজেকে পর্দায় রেখে রুম থেকে বেরুব। খুব সাবধানে চলব, যাতে উনার সামনে না পড়তে হয়।’

‘ এখন কি তুমি ঘরে ও জুব্বা পরে ঘুরে বেড়াবে? নাকি নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলবে?’ কেমন কটাক্ষ শুনাল জাওয়াদের স্বর। মুশরাফা উত্তর দিল না। কথাটা ওর খারাপ লেগেছে কেন যেন।

খানিক বাদে বলল,
‘পর্দা মানেই বোরকা নয়, যে পোশাকের দ্বারা আপাদমস্তক ঢাকা যায়, শরীরের অঙ্গ বুঝা না যায় সেই পোশাককে পর্দা বলা হয়। ঘরে হয়তো সারাদিন বোরকা পরে থাকতে পারব না, তবে নিজেকে ঢেকে রাখব। এভাবেই রুমের বাইরে যাব।’

‘ জিশান আমার ভাই। তোমার ছোটো ভাইয়ের মতো। ঘরের মানুষের সামনে পর্দা করাটা কেমন দেখায় না? ও জানতে পারলে কী ভাববে? বাসায় অন্তত এসব করো না। ভাবি ও তো আছে বাসায়। তিনি তো আমাদের ভাইয়ের মতো দেখেন। আমাদের সামনে পর্দা করেন না। দেখা দেন, আমরা ও তাকে বোনের মতো দেখি। এতে সমস্যা কী!’ জাওয়াদের স্বর তখনো শান্ত।

মুশরাফা ধীরেই বলল,
‘ আপনি মানুষের দিকে না তাকিয়ে শরীয়তের দিকে তাকান। শরীয়তে, এই দেবর ভাবির সম্পর্ককে বিপদজনক বলা হয়েছে। যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে বলেছে। ‘

জাওয়াদ আকস্মিক গম্ভীর হলো। বলল,
‘ সবে সংসারে এসেছো। এসেই অশান্তি জুড়ে দিয়েছো। এসব বাদ দাও। কাকন ভাবি যেভাবে চলছে সেভাবে চলো। নিজেও শান্তিতে থাকো, আমাদের ও শান্তিতে থাকতে দাও। তোমার জন্য আমার মা কষ্ট পাচ্ছেন, উপোষ হয়ে আছেন। মায়ের কষ্ট আমি সহ্য করব না। ভালো হয়ে যাও।’

জাওয়াদ উঠে দাঁড়াল। তৈরি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল চলে গেল। ওর প্রতিটা কথা মুশরাফাকে আঘাত করেছে। হতাশ চোখে জাওয়াদ যাওয়ার পানে তাকাল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘আপনি কবে আমাকে একটু বুঝবেন বলেন তো! আমার পর্দাকে সাপোর্ট করবেন!’

এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল মুশরাফা। রাতের খাবার তৈরি করতে হবে। কাকন জিহানকে পড়াতে বসিয়েছে। এই বেলায় রান্নার ঘরে যাবে না। মুশরাফা আসার পর থেকে বিশ্রামে আছে সে। রান্নাঘরে খুব একটা দেখা যায় না ওকে। মুশরাফা বড়ো ওড়নায় সতর ঢাকল, তারপর রুম থেকে বের হলো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল রান্নাঘরে। সেখানে গিয়ে হাফ ছাড়ল। রান্নায় হাত লাগাল।

জাওয়াদ বসে আছে রেস্টুরেন্টে। এক বন্ধুর ব্যাচলর পার্টি উপলক্ষে বন্ধু সমাজের সবাই এক হয়েছে। অনিক ও এসেছে সাথে। দুজন পাশাপাশি বসে আছে। জাওয়াদের চোখমুখ গম্ভীর। অনিক চুপচাপ ওকে পরখ করছে।
খানিক বাদে বলল,
‘কাহিনী কি মামা? মুখটা বাংলা পাঁচ কইরা রাখচোস কেন?’

জাওয়ার বিরস মুখে বলল,
‘শালা বিয়া কইরা জীবন শেষ। রাগ লাগতেছে।’

‘হইছে টা কী তা তো ক।’ অনিক ভ্রু কুঁচকে বলল।

জাওয়াদ বলল,
‘কী আর হবে? জিশান আসছে বাসায়, মুশরাফাকে দেখতে চাইছে। মা ডাকছে, দেখা করেনি ও। জিশানকে না কি খারাপ বলছে। এই নিয়ে ঝামেলা শুরু হইছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম সমস্যা কী, বলে জিশানের সাথে না কি দেখা দিতে পারবে না। দেবর ভাবির সম্পর্ক না কি বিপদজনক। এসব কথার কোন মানে হয়? এই মেয়ের মাথায় যে কী, আল্লাহ জানে। কীসব পর্দা পর্দা করে সারাদিন। রাগ লাগে। সবার সাথে মিলেমিশে থাকলে কী সমস্যা? একদিন আমার বন্ধুদের সাথে দেখা করবে না, একদিন আমার ভাইয়ের সাথে দেখা করবে না। মান ইজ্জত আর রইল না কিছু। কোন দুঃখে যে এই মেয়ে বিয়ে করছি!’
ক্ষিপ্ত মনে কত কী বলে দিল জাওয়াদ।

অনিক শুনল মনোযোগ দিয়ে। তারপর কিছু বলতে গেল। পারল না। কোথা থেকে বন্ধুরা সব এদিকে এসে জড় হলো। যার ব্যাচলর পার্টি তার নাম রবিন। রবিন এসে সবার সাথে কুশল বিনিময় করল। সফট ড্রিংক দিল। আড্ডা বসল সবার মাঝে। খানিক বাদে রবিনের ফোন বেজে উঠল। রবিন উঠে অন্যপাশে চলে গেল।
সে যেতেই ফুয়াদ নামের এক বন্ধু ধীর স্বরে বলল,
‘রবিনের বউ দেখছস তোরা?’

সাদাফ বলল,
‘ হো, দেখছি। পুরাই আগুন। কই থেইকা পটাইছে এই মেয়ে? আমি আগে দেখলে আমি পটিয়ে ফেলতাম।’

ফুয়াদ, সাদাফ প্লে বয়। ফুয়াদ আগ্রহী গলায় বলল,
‘ আমাকে দেখা ত।’

সাদাফ ফেসবুক থেকে ছবি নামিয়ে দেখাল। ফুয়াদ তীক্ষ্ম চোখে পরখ করল কিছুক্ষণ। তারপর অবাক হয়ে বলল,
‘ অস্থির। রবিন শালা চুপারুস্তম, কোনদিন দেখা করাল না। ‘

সাদাফ বলল,
‘ ছবি থেইকা সামনা-সামনি আর জোশ। রবিনের বোনের বিয়াতে গিয়েই দেখছি আমি। দেখে তো আমি হা। মাথায় আগুন জ্বলে উঠছিল। শালা বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড না হইলে আমি সেইদিনই তুইল্যা নিয়া যাইতাম। সেই এক জিনিস পটাইছে রবিন।’

এমন কথোপকথন চলছিল দুজনার মাঝে। বাকিরা কেউ সায় দিচ্ছিল, কেউ হাসছিল, কেউ চুপ ছিল। জাওয়াদ আর অনিক চুপচাপ বসে সবার কান্ড দেখছিল। অনিক নিচু স্বরে জাওয়াদের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ সেদিন ভাবি ওদের সামনে গেলে ভাবিকে নিয়ে ও কিন্তু এমন কথা উঠতো। একবার ভেবে দেখ, বিষয়টা কেমন হতো? ‘

জাওয়াদ রবিনের গার্লফ্রেন্ডের জায়গায় মুশরাফাকে বসাল। ওর বন্ধুরা মুশরাফাকে নিয়ে কীসব বলছে ভেবেই মাথায় রাগ চাপল। রেগে বলল,
‘এর মাঝে মুশরাফাকে টানছিস কেন?’

অনিক যেন সুযোগ পেল। সে বলে গেল,
‘আমি টানিনি, তুই টানছিস। ভাবি গায়রে মাহরাম কারো সামনে আসতে চায় না। তিনি শুধু তোর জন্য রিজার্ভ। এতে তোর খুশি হওয়ার কথা থাকলেও তুমি খুশি না। রেগে আগুন। তোর অভিযোগ ভাবি কেন সবার সামনে যায় না? তোর বন্ধুদের সামনে যায় না? এর ওর সামনে যায় না। ধর, তুই তোর বন্ধুদের সামনে বা যে কোন ছেলের সামনে ভাবিকে নিলি। ভাবি ও সবার সাথে মিলেমিশে কথা বলল। তারপর কী হবে? ফেরার পথে সাদাফ আর ফুয়াদ এর মতো ছেলে ভাবিকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করবে। করবেই। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারব। কেউ ভাবিকে এমন কথা বললে পারবি মানতে?’

জাওয়াদ চুপ করে রইল। তবে ওর চেহারা বলে দিল পারবে না। অনিক বলল,
‘ এর পর ও তোর মনে হবে, ভাবির তোর বন্ধুদের সামনে যাওয়া উচিত ?’

জাওয়াদ থমথমে গলায় বলল,
‘ এসব কথা বাদ দে। ভালো লাগছে না।’

অনিক হাসল। জাওয়াদের কাধ চাপড়ে বলল,
‘ এইসব ফেতনা থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা’আলা পর্দার বিধান তৈরি করেছেন। একজন মানুষ শুধুমাত্র তার জীবনসঙ্গীর জন্য রিজার্ভ করেছেন। তার রূপ সৌন্দর্য, সব কিছু হবে জীবন সঙ্গীকে ঘিরে। নারীর নিরপত্তার জন্য ১৪জন পুরুষের সাথে দেখা করাকে জায়েজ করেছেন। যাদেরকে বিয়ে করা জায়েজ, তাদের সাথে দেখা করা হারাম। পুরুষদের ও তেমন। তারমধ্য একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ ওই একজনই। দুজনার প্রেম দুজনা কেন্দ্রিক হবে। ভাবি নিজেকে তোর জন্য রিজার্ভ করেছেন। ভাবি যে বেশভূষায় বের হন, সেই বেশভূষায় সাদাফ, ফুয়াদ কেন কেউ তার রূপ সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারবে না। তাকে বাজে মন্তব্য করার সু্যোগ পাবেনা। তোর উচিত ভাবিকে মাথায় তুলে নাচা। আর তুই অসম্মান করিস! একজন নেককার স্ত্রীকে দুনিয়ার এক টুকরো জান্নাত বলা হয়। তুই হেলায় ফেলে দিচ্ছিস। সময় থাকতে মূল্য দে। নাহলে পস্তাবি। শালা, একটু রিজার্ভ হ এবার, সেইসাথে মানুষ হ। আর কতকাল লোকাল থাকবি?’

জাওয়াদ নিশ্চুপ হয়ে শুনল। তারপর বলল,
‘ বন্ধুদের কথা না হয় বুঝলাম। কিন্তু জিশানের সাথে দেখা করতে কী সমস্যা? জিশান তো ওর ভাইয়ের মতো।’

‘ভাইয়ের মতো, ভাই তো নয়। জিশানের সাথে মুশরাফার বিয়ে হওয়া জায়েজ। তাই দেখা দেয়া জায়েজ নেই। আমার ভাবিকে আমি কখনো দেখিনি। তিনি আমাদের সাথে পর্দা করেন। ব্যাপারটা বিয়ের পরদিন ভাইয়া আমাদের বলে দিয়েছেন। আমরা ভাইয়েরা বাসায় গেলে সতর্ক থাকি। রুম থেকে বের হলে জোরে কথা বলে বের হই, উনি আওয়াজ শুনে সরে যান। উনি যেখানে থাকেন, আমরা সেখানেই যাই না। আমরা যেখানে থাকি উনি সেখানে আসেন না। আমরা খেয়ে চলে গেলে উনি খেতে আসেন। তখন আমরা রুমেই থাকি। আমরা সবাই উনার পর্দাকে সম্মান করি। আমরা চারভাই হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সংসারে পর্দা বিষয়ক ভাবির কোন অভিযোগ নেই। কোন ঝামেলা নেই। ‘

অনিক থামল। ওর হাতে কোকের গ্লাস। চুমুক দিয়ে গলা ভিজাল। তারপর ধীর স্বরে বলল,

“স্ত্রীর পর্দার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে স্বামী। ভাইয়ার মতো তুই জিশানকে বলে দিবি, ‘তোর ভাবি পর্দা করে, তোর সাথে দেখা দিবে না। ডাকিস না ওকে। ঘর থেকে বের হতে কথা বলে বের হোস। যাতে ও সরে যেতে পারে।’ ব্যাপারটা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলবি। তাহলে কোন ঝামেলা হবে না। আন্টিকে ও বুঝিয়ে বল। ‘জিশানের সাথে দেখা না হলে, কথা না বললে খুব অসুবিধা হবে না। তারা নিজের মতো থাকুক। ব্যাপারটা এমন না যে তাদের মাঝে শত্রুতা আছে, ব্যাপারটা হলো তারা ইসলামের সম্মানার্থে নিজেদের দূরে রেখেছে।’তুই স্ট্রং হ। তাহলে সংসারে অশান্তি হবে না। ”

ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলল অনিক। জাওয়াদ শুনল। বুঝল কি না বুঝা গেল না। টেবিলের উপর সিগারেটের প্যাকেট রাখা। ফুয়াদ রেখেছে খানিক আগে। জাওয়াদ প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট আর লাইটার নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সেখান থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে সিগারেট ধরাতে নিল। অনিক ও ওর পিছু গিয়ে দাঁড়াল। জাওয়াদ লাইটার দিয়ে সিগারেটের কাছে নিতে গিয়ে থেমে গেল। মস্তিষ্কের নিকোটিন সম্পর্কিত মুশরাফার কথা মাথায় এলো। অগ্নিচোখে তাকাল অনিকের দিকে।
ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
‘ আল্লাহ, তোর বিচার করবে। কী এক মেয়ে বিয়া করিয়ে দিয়েছিস। সিগারেটটা অবধি খেতে দিচ্ছেনা। কিসব ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে। ব/দ/মা/ই/শ মেয়ে। আমার জীবনটা শেষ করে দিল।’

রেগে সিগারেট ফেলে দিল জাওয়াদ। অনিকের মনটা প্রশান্তিতে চেয়ে গেল। জাওয়াদ সুপথে আসতে শুরু করেছে তবে! অনিক টিপে হাসল। হেসেই বলল,
‘ জীবন তোর, বউ ও তোর। দুটো নিয়ে সুখে থাক। ‘

জাওয়াদ পার্টি শেষ করে যখন বাসায় ফিরল তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত দেড়টা। জিশানকে কল দিয়ে দরজা খুলিয়েছে। ওর ধারণা মুশরাফা ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তোবা। ধীর পায়ে রুমে গেল। রুমে পা রাখতেই কারো চাপা কান্নার শব্দ কানে এলো।
নীল রঙা ড্রিম লাইট জ্বলছে। মৃদু আলোয় চোখ বুলিয়ে মুশরাফাকে খুঁজল। বিছানায় নেই। কোথায় গেল মেয়েটা! কান্নার শব্দ আবার কানে এলো। শব্দের উৎস খুঁজে খাটের পাশে জায়নামাজ বসা মুশরাফাকে আবিস্কার করল। সেজদায় মাথা ঠেকিয়ে অঝোরে কাঁদছে মেয়েটা। কান্নার মাঝে কী যেন বলছে, বুঝা যাচ্ছে না। জাওয়াদ বিস্মিত হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। মুশরাফা নামাজ শেষ করল, লম্বা মোনাজাত ধরল। বিড়বিড় করে কেঁদেকেটে কত কী দোয়া করল, বুঝা গেল না।

মুশরাফার কান্নাটা জাওয়াদের ভালো লাগল না কেন যেন। সে দাঁড়াল না। পাশ কাটিয়ে চেঞ্জ করতে চলে গেল। ওয়াশরুম থেকে ফেরতেই মুশরাফার মুখোমুখি হলো। ওকে দেখে হেসে সালাম দিল,
‘আসসালামু আলাইকুম। কখন এলেন?’

জাওয়াদ অবাক হলো। যাওয়ার সময় মুশরাফার সাথে রুক্ষ আচরণ করে গিয়েছে। ফিরেছে রাত করে। এত কষ্ট দেয়ার পর ও সালাম আসছে কোথা থেকে! একটু আগে না কাঁদছিল, এখন হাসি আসছে কোথা থেকে! এই মেয়ে কী দিয়ে তৈরি? জাওয়াদের আজ কেন যেন সালামের উত্তর নিতে ইচ্ছে হলো। নিলো ও মনে মনে। মুখে বলল,
‘ মাত্র এসেছি। ঘুমাওনি কেন?’

‘ঘুম আসেনি।’ কেমন করে বলল মেয়েটা। জাওয়াদ স্পষ্ট টের পেল, মেয়েটা ওর জন্য ঘুমায়নি। ও বিছানায় গিয়ে বসল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
‘ অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘুমাও।’

মুশরাফা জায়নামাজ গুটিয়ে শুয়ে পড়ল ওর পাশে। কেটে গেল অনেকটা সময়। মুশরাফার চোখে ঘুম নামল না। জাওয়াদের চোখ বন্ধ। ঘুমিয়ে গেছে বোধহয়। তাও মুশরাফা ওর একটা হাত নিজের মাথায় নিয়ে বলল,
‘ ঘুম আসছে না। আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবেন? ‘

জাওয়াদের নড়চড় হলো না। নিশ্বাস ভারি তার। হাতটা আলগা রইল। মুশরাফা ধরে নিল, ও ঘুমিয়ে গেছে। হাত সরানোর মনস্থির করতেই টের পেল ওর মাথায় একটা হাতের বিচরণ, আলতো হাতে বিলি কাটছে কেউ। মুশরাফার মুখে হাসি ফুটল। আবেশে চোখ বুজল। একসময় ঘুমিয়ে ও পড়ল।

ভোরে এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙল ওর। নামাজের তাড়ায় উঠে বসল তড়িৎ। বাজতে থাকা এলার্ম বন্ধ করার সময় স্মরণে এলো, কাল রাতে ও এলার্ম দিয়ে ঘুমায়নি। আর ফোনটাও মুশরাফার নয়, জাওয়াদের। একরাশ খুশির ঝিলিক এসে ছুঁয়ে দিল মুশরাফার মুখে, মনে। কী যে আনন্দ হলো ওর!

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here