স্বর্ণাভ_সুখানুভূতি। (পর্ব-১৮)

#স্বর্ণাভ_সুখানুভূতি। (পর্ব-১৮)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা

জৈষ্ঠ্যের এক মধ্য প্রভাত। রূপালী মেঘে চিরে বাংলার বুকে নেমে এসেছে রক্তিম সূর্য। জাওয়াদের বাসা থেকে কিছুটা দূরে একটা রাধাচূড়া গাছ। হলদে ফুলে সেজেছে গাছটা। গাছের নিচটাও হলুদ হয়ে আছে। হলুদে ছেয়ে গেছে চারপাশ, তার মাঝে এক টুকরো রক্ত ঢেলে দিয়েছে যেন কেউ। রক্তিম বৃত্তাকার সূর্যটা গাছটার পেছনে এসে ঠায় নিয়েছে। কী চমৎকার লাগছে! নামাজ পড়ে সূর্যোদয় দেখতে এসে দৃশ্যটা চোখে পড়ল মুশরাফার। বিমোহিত দর্শকের মতো চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরপরই রুমে ছুটে গেল। নামাজ পড়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল জাওয়াদ। মুশরাফা বলল,
‘ একটু বারান্দায় চলুন না।!’

জাওয়াদ চোখ খুলে ভ্রু কুঁচকাল, ‘কেন!’

‘ আপনার সাথে সূর্যোদয় দেখব।’ সরল আবদার মুশরাফার। জাওয়াদের কপালে বিরক্তির রেখা টানল । বিরক্তিভরে বলল,
‘ রাতে ঘুমাতে পারিনি। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাব।’

‘দুই মিনিট পরে ঘুমালে কী হয়? আসুন না! ‘ অনুরোধের সুরে বলল মুশরাফা। জাওয়াদ চোখ বন্ধ করে বলল,
‘বারান্দায় মশা, আমি যাব না। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি যাও।’

‘আমি কয়েল দিয়েছি। মশা নেই।’ মুশরাফা বলল। জাওয়াদ আর বাহানা খুঁজে পেল না। চুপচাপ শুয়ে রইল।
মুশরাফা বলল,
‘ আর তো বাহানাও নেই। এবার চলুন। দুই মিনিট থেকে চলে আসবেন। জাস্ট দুই মিনিট। দুই মিনিটে কী এমন হবে? আসুন না।’ কেমন আদুরে শুনাল মুশরাফার স্বরটা। সে জাওয়াদের হাত ধরে রীতিমতো টানাটানি শুরু করে দিয়েছে। টিকতে না পেরে জাওয়াদ বারান্দায় গেল।

রাধাচূড়া গাছ আর সূর্য্যের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হওয়া অপরূপ সৌন্দর্য্য পরখ করতেই বিস্ময় হাতছানি দিল জাওয়াদকে। ওর কপালে থাকা বিরক্তির আভা চলে গেল তড়িৎ। চোখে মুগ্ধতা ভর করল। মুশরাফা এসে দেয়াল ঘেঁষে বসল। বসে থাকলে বাইরে থেকে মানুষ দেখা যায় না। নিজে বসার পর জাওয়াদকে আহ্বান করল,
‘এখানে বসুন।’

জাওয়াদ বসে পড়ল। মুশরাফা ওর গা ঘেঁষে বসে কাধে মাথা রাখল। তারপর উৎফুল্ল হয়ে বলল,
‘ আমি যতবার সূর্যোদয় দেখেছি, ততবার আজকের দিনের অপেক্ষা করেছি। অবশেষে এলো সেই দিন।’
।’

জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল মুশরাফার পানে। সূর্য্যের কোমল আলোর চিটা এসে পড়ছে মুশরাফার শুভ্র গালে। রূপের ঝিলিক চোখে লাগল। ঠিক প্রথমদিন দেখা ছাদের মতো। জাওয়াদ তড়িৎ চোখ সরাল। তারপর সূর্যোদয় দেখায় মন দিল। রবি রক্তিম আভা ছাড়িয়ে সোনালী রূপ ধারণা করছে, রোদের তেজ বাড়ছে। ধীরে ধীরে উঠে আসছে রাধাচূড়ার কোল থেকে। জাওয়াদ মুগ্ধ চোখে দেখে গেল।
এই সময়টা ঘুমেই কাটে ওর। না ফজর নামাজ পড়া হয়, আর না সূর্যোদয় দেখা হয়। শেষ কবে সূর্যোদয় দেখেছে ওর মনে নেই। ভার্সিটি লাইফে একবার বন্ধুরা মিলে দার্জিলিং ট্যুরে গিয়েছিল। সেখানে টাইগার হিলে উঠে সূর্যোদয় দেখেছে। এর পর আর সেভাবে দেখা হয়নি। এত গার্লফ্রেন্ড ছিল, কতজন কাধে মাথা রেখেছি, কিন্তু কাউকে নিয়ে এভাবে সুর্যোদয় দেখা হয়নি। সে হিসেবে আজকের অভিজ্ঞতাটা একবারেই নতুন। এই মেয়ের পাল্লায় পড়ে কত কী অভিজ্ঞতা হচ্ছে ওর! অবাকই হলো জাওয়াদ।

মুশরাফা সূর্যোদয় দেখতে দেখতে বলল,
‘ কক্সবাজারের বিচ কিংবা সাজেকের মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায়, কিংবা রুমের বারান্দায়, আমি সবসময় সুর্যোদয়টা একাই দেখেছি। জীবনে জীবন জুড়ে জাওয়ার পর, আর একাকী সুর্যোদয় দেখতে ইচ্ছে করছে না। এভাবে বসে আমি আপনার সাথে সুর্যোদয় দেখতে ইচ্ছে করছে। আপনি কি আমার সুর্যোদয় দেখার সঙ্গী হবেন? একদিন, দুইদিন প্রতিদিনের জন্য?’

মেয়েটা জাওয়াদের কাধে মাথা রেখে সূর্যোদয় দেখছে। আদুরে সুরে আবার প্রপোজ করে ও বসছে। এত রোমান্টিক কেন এই মেয়ে! পর্দা করা মেয়েগুলো এত রোমান্টিক হয়! আর একটা কথা। ও ঘুরতে ও যায়! জাওয়াদ ভাবল কত কী! তারপর উত্তর না দিয়ে বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল,
‘ তুমি ঘুরতে ও যাও!’

মুশরাফা ঠান্ডা গলায় বলল,
‘ এত অবাক হওয়ার কী আছে? পর্দায় থেকে অনেক কিছুই করা যায়। সবাই ভাবে একটা মেয়ে পর্দা করে মানে তার জীবনে কোন শখ আহ্লাদ নেই, সে কোথাও ঘুরতে যাবে না। মূলত, ইসলাম বলে, পর্দায় থেকে মাহরামকে নিয়ে নারী যে কোথাও ঘুরতে যেতে পারবে। এটা গুনাহ নয় বরং সাওয়াবের কাজ। আল্লাহর নিদর্শন দেখতে ভ্রমণ করা একটা আনন্দময় ইবাদত। আল্লাহ তার নিদর্শন গুলো মানুষকে দেখতে বলেছে, ভ্রমণ করতে বলেছে।

বাংলাদেশের খুব কম পর্যটন এরিয়া আছে, যেখানে আমি যাইনি। আমি নিজেকে পর্দায় ঢেকে বিচের বালিতে বসে সুর্যোদয় দেখেছি, পর্দায় ঢেকে পাহাড় চড়েছি, পর্দায় ঢেকে মেঘ ছুঁয়েছি। ‘

শেষের দিকে ওর স্বরটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। জাওয়াদ যেন এবার বিস্ময়ের চূড়ায় পৌঁছল। সেদিন রেস্টুরেন্টে যাবার পর ওর ধারণা জন্মেছিল, এই মেয়ে সারাদিন ঘরে পড়ে থাকে, বাইরে যায় না। ঘুরাঘুরি তো অনেক পরের কথা। সে যদি কখনো ঘুরাঘুরির কথা বলে তবে স্পষ্ট জানিয়ে দিবে, এসব গুনাহ, জায়েজ নেই। আমি পারব না।
কিন্তু এই ক্ষণে ওর এই ধারণা ও ভঙ হলো। মেয়েটা সাদাফের ধারণা মাফিক সেই মানুষের মতো নয়। এই মেয়েটা ভীষণ রসিক। পর্দায় থেকে সব করে। তাও ইসলামের বিধি মেনেই। জাওয়াদ আবার প্রশ্ন করল,
‘কার সাথে গিয়েছো?’

‘ মামা ভ্রমণপিয়াসু। ছুটি পেলেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে চলে যান। মামা মামীর সাথেই যাওয়া হয়েছে সব জায়গায়। ‘

আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল মুশরাফা। জাওয়াদের মনে প্রশ্ন জাগল, মুশরাফার সব কিছুতে মামা মামী থাকে। মা বাবার অস্তিত্ব নেই কেন? বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে নাজমুল সাহেব ওকে কল দিয়ে খবর নেন। ফরিদা ও কল দেন। কিন্তু মুশরাফা বাবা মায়ের কাছ থেকে একটা কল ও আসেনি। কেউ কল দিয়ে জিজ্ঞেস করেনা। পরিবারের সাথে সম্পর্ক ভালো নেই না কি! কৌতুহলী মনে হরেক ভাবনা এলো। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু সেদিনের এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভেবে করল না।
জাওয়াদ বলল,
‘ আমি ভাবিনি তুমি ঘুরতে ও যাও।’

মুশরাফা হেসে বলল, ‘আপনি আমাকে যেমন ভাবেন আমি তেমন নই। আমি আপনার মনের মতন। আপনি দৃষ্টি ঘুরালেই টের পাবেন। শুধু দৃষ্টিকোণটা বদলান। ‘

জাওয়াদ শুনল সে কথা। প্রতিত্তোর করল না। মুশরাফা বলল,
‘ আমার উত্তর দিন। আপনি আমার সূর্যোদয় দেখার সঙ্গী হবেন?’

জাওয়াদ নিরবতায় গা ঢাকল। যেন সে শুনতেই পায়নি। আকাশের দিকে নজর দিল। সূর্য্য তার পূর্ণ দৃষ্টি মেনে তাকিয়েছে। রোদের তাপ ধারালো হয়েছে, গায়ে বিধছে সূচের মতো। তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। জাওয়াদ চোখ নামিয়ে বলল,
‘ দুই মিনিট শেষ। এবার সরো। আমি ঘুমাব।’

‘আর কিছুক্ষণ থাকি!’

‘রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে আমার।’

‘আমি আপনার জন্য সানবার্ণ এনেছি। লাগিয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।’ ঠায় বসে বলল মুশরাফা। জাওয়াদ কী যেন ভাবল।
তারপর বাঁকা হেসে বলল,
‘ আমি নিজেকে মুনাফিকের খাতায় নাম লিখাতে পারব না।’

মুশরাফা ভ্রু কুঁচকাল, ‘এখানে মুনাফিকের কথা কোথা থেকে আসছে?’

জাওয়াদ বলল,
‘রোদে আমার গা পুড়ে যাচ্ছে। এতে ঘামাচি হবে, চামড়া কালো হয়ে যাবে। রক্তচাপ কমে অ্যাটাক প্যাটাক ও হতে পারে। কত বড় ক্ষতি! তুমিই আমাকে ওয়াদা করিয়েছিলে, আমি নিজের ক্ষতি করতে পারব না। এত বড়ো ক্ষতি হবে জেনেও আমার রোদে বসে থাকা মানে ওয়াদা খেলাপ করা। ফলাফল আমাকে মুনাফিকের খাতায় নাম লেখাতে হবে। আমি পারব না, নিজের এত বড় ক্ষতি করতে। আমি চললাম।’

জাওয়াদ উঠে দাঁড়াল। মুশরাফা নিজের কথায় নিজেই জব্দ হলো। হতবাক হয়ে তাকাল জাওয়াদের পানে। লোকটা কী ধুরন্ধর! তার কথায় তাকেই প্যাঁচিয়ে দিল!

জাওয়াদ বিজয়ী হেসে রুমের দিকে পা বাড়াল। আচ্ছা জব্দ করা গেছে পাজি মেয়েটাকে। শান্তি লাগছে। জাওয়াদ এসে শুয়ে পড়ল। মুশরাফা রুমে এলো খানিক বাদে। ছোটো ছোটো চোখ করে তাকাল জাওয়াদের দিকে। তা দেখে ভীষণ হাসি পেল জাওয়াদের। হাসি চেপে রাখল বহু কষ্ট। হাসলে আবার মেয়েটা লাই পেয়ে যাবে।
মুশরাফা বলল,
‘সাতটা বাজে। আপনি এখন ঘুমাবেন?’

মুশরাফাকে জব্দ করে জাওয়াদের মেজাজ বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠেছে। মজা করতে ইচ্ছে হলো ওর। করে ও ফেলল,
‘শুয়ে শুয়ে ঘুমাব না, ডান্স করব। দেখবে?’

লোকটা ওর সাথে মজা করছে! সহজ হতে শুরু করেছে ভেবেই আনন্দ হলো মুশরাফার। মজায় ঘি ঢেলে সে কাউচে গিয়ে প্রাচীন জমিদারদের মতো বসল। এক পা মেঝেতে, আরেক পা কাউচে। হাটুর উপর হাত রেখে নবাবী হালে বলল,
‘ জাহাপনা নৃত্য প্রদর্শন করবেন, আমি দেখব না। তা কী করে হয়! অবশ্যই দেখব। আপনার নৃত্য দেখবার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। শুরু করুন। ‘

এই মেয়ে তার থেকে এক ধাপ উপরে। কী পাজি মেয়ে! কৌতুকে বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও ওর অঙ্গভঙ্গি দেখে মজা পেল জাওয়াদ। মজা করতেও পারদর্শী এই মেয়ে। হাসিটা বাধাছাড়া হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলে হেসে ফেলবে। হাসিদের বাধা দিতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওকে চোখ বন্ধ করতে দেখে মুশরাফা বলল,
‘জাহাপনা, আপনি না নৃত্য প্রদর্শন করছেন?’

জাওয়াদ তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল না। খানিক বাদে নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে বলল,
‘ দেখছো না স্বপ্নে নাচ করছি। ‘

মুশরাফা ফিক করে হেসে ফেলল। মৃদু শব্দ হলো ওর হাসির। পরক্ষণেই হাসির শব্দটা বিলীন হলো। চওড়া গালে ঠোঁট চেপে হাসছে। জাওয়াদ নেত্রপল্লব আলগা করে তাকাল এক পলক। পরক্ষনেই চোখ সরাল। এই হাসির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা বিপদজনক।

মজার পাট চুকাল। মুশরাফা হাসি থামিয়ে বলল,
‘ এখন ঘুমালে অফিসের জন্য দেরি হয়ে যাবে। ঘুমাবেন না। উঠে বসুন।’

জাওয়াদ নড়ল না। চুপচাপ শুয়ে রইল। মুশরাফা আবার বলল,
‘চা খাবেন? আমি চা করে আনি?’

জাওয়াদের কোন ভাবান্তর হলো না। মুশরাফা খানিক ভাবল। তারপর নিজের ফোন আর হেডফোন তুলে নিল। কুরআন তেলাওয়াত ছেড়ে, জাওয়াদের কানে ইয়ারফোন গুজে বলল,
‘ আপনি তেলাওয়াত শুনুন, মনোযোগ দিয়ে। ঘুমাবেন না। এই তেলাওয়াত শেষ হওয়ার আগেই আমি চা নিয়ে ফিরছি। ‘

ওড়নায় গা ঢেকে মুশরাফা চলে গেল। চা বসানোর পর বাইরে জায়নাল আবেদীনের কথা শোনা গেল। ফজর নামাজ পড়ে হেঁটেহুটে বাইরে থেকে ফিরছেন। মুশরাফা বের হয়ে চারদিক চোখ বুলাল। জয়নাল আবেদীন ছাড়া কেউ নেই। মুশরাফা শ্বশুরের সামনে গিয়ে সালাম দিল,
‘আসসালামু আলাইকুম বাবা।’

জয়নাল আবেদীন চমকালেন। তারপর হেসে উত্তর নিলেন,
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এত সকালে রান্নাঘরে কী করছো?’

‘চা করছিলাম। আপনাকে এক কাপ দিব?’ নমনীয়তার সাথে জিজ্ঞেস করল। জয়নাল আবেদীন খুশি হলেন। প্রসন্ন হেসে বলল,
‘দিলে মন্দ হয় না। চায়ে চিনি কম দিও। আমি ড্রয়িংরুমে বসছি। তুমি চা আনো।’

জয়নাল আবেদীন চলে গেলেন। মুশরাফা তিন কাপ চা বানিয়ে একটা ট্রেতে নিল। সাথে এক প্লেট বিস্কুট ও নিল। বসার ঘরে গিয়ে শ্বশুরকে চা দিল। চা নিতে গিয়ে বাকি দু’কাপে নজর গেল। একটা মুশরাফার, আরেকটা কার? এই বাসায় এত সকালে আর কে উঠে? জয়নাল আবেদীন কৌতুহলী জানতে চাইলেন,
‘আরেক কাপ চা কার জন্য ?’

মুশরাফার লাজুক স্বরে বলল,
‘ উনার। ‘

জয়নাল আবেদীন অবাক হয়ে বলল,
‘এই সাতসকালে জাওয়াদের ঘুম ভেঙেছে!’

মুশরাফা ধীর স্বরেই বলল,
‘নামাজের জন্য উঠেছিল। আর ঘুমায় নি।’

জাওয়াদ নামাজ পড়েছে! জয়নাল আবেদীনের মনে হলো তিনি জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য জেনেছেন। যেই ছেলেকে বিগত কয়েকবছর যাবত টেনেহিঁচড়ে ও নামাজ পড়াতে পারেন নি সেই ছেলে নামাজ পড়ছে! এরচেয়ে আশ্চর্য কথা কী হতে পারে! জয়নাল আবেদীন অবিশ্বাস্য সুরে আবার পুনরাবৃত্তি করলেন কথাটা,
‘ জাওয়াদ নামাজের জন্য উঠেছে!’

মুশরাফা বলল, ‘জ্বি বাবা। ‘

থেমে বলল, উনি তো বাসায় পড়েন নামাজ। মসজিদে নামাজ পড়া হয়না। আপনি কাল থেকে নামাজ পড়তে যাবার সময় উনাকে ডেকে নিয়েন। ‘

পুরুষদের অতি প্রয়োজন বা কঠিন পরিস্থিতি ছাড়া বাসায় নামাজ পড়ার বিধান নেই। ওকে নামাজে অভ্যস্ত করার জন্য মুশরাফা বাসায় পড়তে বলেছে। মসজিদে পাঠালে হয়তো নামাজই পড়তো না।

মুশরাফার কথাগুলো শুনে জয়নাল আবেদীনের অন্তরাত্মা শীতল হয়ে এলো। বাধহারা খুশিতে ছুঁলো মনকে। চোখে মুখে আনন্দের রেশ ছেয়ে গেল। ঠোঁটে খুশির আভা ফুটে উঠল। সন্তানকে ভালো হতে দেখার আনন্দ বোধহয় এমনই। উৎফুল্ল গলায় বললেন,
‘ কত করে চাইলাম ছেলেগুলোকে নামাজী বানাতে। একটাকে ও বানাতে পারলাম না। মা টাও হয়েছে তেমন। তোমাকে পুত্রবধূ হিসেবে দেখে আমার মনে হয়েছিল, তোমার সাথে থাকলে ছেলেটা ভালোর পথে আসবে। আমার ধারণা মিথ্যা হয়নি। আল্লাহ তোমার ভালো করুক। আমি যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছি বলে বুঝাতে পারব না। ‘

মুশরাফা হাসল। জয়নাল আবেদীনের উৎফুল্ল মুখ দেখে ভালো লাগছে। মুশরাফা বলল,
‘উনাকে ডাকব? চায়ের সাথে গল্প করুন! ব্যস্ততার জন্য তো সেভাবে সময় কাটানো হয়না। বাবা ছেলের সময় কাটুক কিছুক্ষণ। আপনারা চাইলে ফজরের পর গল্প করতে পারেন। সময়টা কিন্তু অবসরের।’

জয়নাল আবেদীন ভাবলেন, আসোলেই ছেলেদের সাথে সেভাবে বসে গল্প করা হয়না। সকালে অফিসে যান, রাতে ফিরেন। ছেলেরাও সবাই কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। যখন তিনি বাড়িতে থাকেন, তখন ছেলেরাই বাইরে থাকে। ছেলেরা বাড়িতে থাকলে তিনি বাইরে থাকেন। ব্যস্ততার কারণে সেভাবে গল্প করা হয়ে উঠে না। একটা দূরত্ব এসে গেছে। সময় হলেও গল্পটা আসেনা। পুত্রবধূর কথা শুনে ভালো লাগল। আজকালকার মেয়েরা স্বামীকে নিজের আয়ত্তে রাখতে চায়। শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে সখ্যতা গড়তে দেয়না স্বামীকে। আর এই মেয়ে স্বামী শ্বশুরকে আড্ডায় বসাচ্ছে? জয়নাল আবেদীনের মনে মুশরাফার জন্য একটা আন্তরিকতা জন্ম নিল। তিনি হেসে বললেন,

‘ডাকবে? ডাকো। অনেকদিন সেভাবে কথা হয়না ওর সাথে। ‘

মুশরাফা এক কাপ চা তুলে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াল। গিয়ে দেখল জাওয়াদ শুয়ে আছে। চোখের পাতা নড়ছে, এর অর্থ জেগে আছে। মুশরাফা বলল,
‘ আপনাকে বাবা ডাকছেন। ‘

কেন তা বলল না। জাওয়াদ চট করে উঠে দাঁড়াল। ওর ভাবনা মুশরাফা বাবাকে ওর নামে বিচার দিয়েছে। রেগে তাকাল ওর দিকে। বাবাকে ভয় পায় সে। ঠিক ভয় না, সমীহ করে চলে। গম্ভীরমুখে বলল,
‘কী বলেছো বাবাকে?’

মুশরাফা ওর ভয় বাড়াতে বলল,
‘ সিক্রেট, বলা যাবে না। আমি বলার পরেই তো বাবা আপনাকে ডাকলেন। যান, গিয়ে দেখে আসুন। বাবা, আপনার জন্য বসে আছেন।’

জাওয়াদ ক্ষিপ্ত হয়ে ওর দিকে তাকাল। পরপরই ভীত পায়ে রুমের বাইরে চলে গেল। গিয়ে দেখল সত্যিই জয়নাল আবেদীন সাহেব বসা। হাতে চায়ের কাপ। ছেলেকে দেখেই হাসলেন। এক গাল হেসে বললেন,
‘আয় বস। একসাথে চা খাই।’

জাওয়াদের ভয় উবে গেল। বিস্ময় দেখা দিল চোখে। অবাক হয়ে তাকিয়ে বাবার পাশের সোফায় বসল। জয়নাল আবেদীন সাহেব নিজে চায়ের কাপ তুলে দিলেন ছেলের হাতে। তাকে ভীষণ খুশি আর সুখী দেখাচ্ছে। জাওয়াদ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘হঠাৎ ডাকলেন কেন, বাবা?’

জয়নাল আবেদীন সাহেব হেসেই বললেন,
‘ অনেকদিন কথা হয়না তোর সাথে। ভাবলাম কিছুক্ষণ কথা বলি। তারপর বল, কী অবস্থা তোর? কাজকর্ম কেমন চলছে?’

জাওয়াদ বরাবরই বাবার অবাধ্য সন্তান। ওর বাউণ্ডুলে কাজকর্মের জন্য ছোটো বেলা থেকে বাবা ওকে বাঁকা চোখে দেখেন। সবসময় ধমকের উপর রাখেন। । বড়ো হওয়ার পর, আত্মীয় স্বজনের মুখে শোনা ছেলের কুকর্মের কথা, রাত করে বাসায় ফেরা, পড়ালেখায় মনোযোগীতা, শিক্ষকদের কাছ থেকে আসা অভিযোগ, ধর্ম বিমুখতা, সব মিলিয়ে একটা চাপা রাগ জন্মে গিয়েছিল ওর প্রতি। হাজার চেষ্টার পর ও যখন ছেলেকে ভালো করতে পারেন নি, তখন আশা বাদ দিয়েছেন। ছেলের সাথে সেভাবে কথা বলা ও বন্ধ করে দিয়েছেন।
জাওয়াদের দৃষ্টিকোণ থেকে জাওয়াদ বাবার শাসন ছাড়া আদর পায়নি। বাবা ধমক ছাড়া ওর সাথে কথা বলেনি। কথার মাঝে অপদার্থ উচ্চারণ করেছেন হাজার বার। বাকি ভাইবোনদের মতো সেভাবে পায়নি বাবাকে। মানষিক একটা দুরত্ব এসে গেছে বাবার সাথে। বাবার সাথে সেভাবে ধরা দিত না।
বাবার সাথে এভাবে বসে চা খাওয়া হয়নি ওর। আজ এতগুলো বছর পর বাবা যখন পাশে বসিয়ে ওর খোঁজ নিলেন, জাওয়াদের বুক কাঁপল। বিস্ময়, আনন্দ দুটোই যোগ হলো। স্বর দিয়ে কথা বেরুল না। উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাল ওকে। চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল।
খানিক বাদে বলল,
‘ ভালো। ‘

জয়নাল আবেদীন ছেলের কাধ চাপড়ালেন। তারপর বললেন,

‘Early to bed and early to rise makes a man, healthy, wealthy and wise.

জাওয়াদ অবাক হয়ে চাইল। ছোটোবেলায় বাবা ওকে সকাল সকাল ঘুম থেকে তুললে, ও যখন বিরক্তিমাখা চোখে বাবার দিকে তাকাতো তখন বাবা ওর কাধ চাপড়ে এ কথা বলতেন। তার চোখে তখন আনন্দ থাকতো, কোন বিতৃষ্ণা থাকতো না। এতগুলো বছর পর সেই সুন্দর মুখখানা আজ আবার দেখল। জাওয়াদের ছোটোবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেল হঠাৎ। ছোটোবেলার বাবাকে যেন আজ আবার পেয়েছে। জাওয়াদের মাঝে একটা সুখীবোধ জন্ম নিল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। জয়নাল আবেদীন ও হাসছেন। ওর এই সকালে জাগাটা যে বাবার হাসির কারণ তা উপলব্ধি করতে সময় লাগল না জাওয়াদের। অনেক গুলো বছর পর বাবার চোখে নিজের জন্য সন্তুষ্টি দেখে অবাক হলো, খুশি ও হলো। জাওয়াদ মাথা নিচু করে হাসল একটু।

টুকটাক কথা হলো বাবা ছেলের মাঝে। কথাবার্তা শেষে রুমে ফিরে এলো জাওয়াদ। মুশরাফা রুম গুছাচ্ছে তখন। জাওয়াদ ঢুকেই গম্ভীরমুখে বলল,

‘ আর কখনো আমার নামে কারো কাছে বিচার দিবে না।’

মুশরাফা থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
‘আমি কার কাছে আপনার নামে বিচার দিয়েছি? বাবার কাছে? নাহ, আমি বাবার কাছে বিচার দিই নি বিশ্বাস করুন! আমি শুধু বলেছি আপনি নামাজ পড়েছেন। আর আপনাদের একসাথে সময় কাটানো হয়না বলে বাবাকে বলেছি ফজর পর কিছু গল্প করতে। তাই আপনাকে ডেকেছেন বাবা। এ ছাড়া আর কিছু নয়। সত্যি বলছি। ‘

আত্মপক্ষ সমর্থনে বেফাঁস বলে দিল মুশরাফা। আজকের সংলাপের বুদ্ধিটা যে মুশরাফার তা এই ক্ষণে এসে ধরতে পারল জাওয়াদ। ভেতরে ভেতরে ও চমকাল । অনেকদিন পর বাবার সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেয়ায় ধন্যবাদ ও দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু দিল না। সবকিছু প্রকাশ করতে নেই।

জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে। তারপর বলল,
‘ আর কখনো কারো কাছে আমার বিচার দিবে না।’

ওয়াশরুমে চলে গেল জাওয়াদ। মুশরাফা ভাবুক মনে দাঁড়িয়ে রইল। কার কাছে কী বিচার দিয়েছে সে! মনে পড়ল না ওর।

ওর ভাবনার মাঝে ওয়াশরুম থেকে ডাক এলো,
‘ টাওয়াল ফেলে এসেছি। টাওয়াল দাও তো!’

মুশরাফা ভাবনা থেকে বের হলো। টাওয়ালের সাথে একটা ফেসওয়াশ ও আর একটা শ্যাম্পু এগিয়ে দিল। জাওয়াদ টাওয়াল নেয়ার সময় জিজ্ঞেস করল,
‘এগুলো কার?’

‘এগুলো আপনার জন্য অর্ডার করেছিলাম।’ ধীর স্বরে বলল মুশরাফা। জাওয়াদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সরে গেল। জাওয়াদ অবাক হলো। ফেসওয়াশ নড়েচড়ে দেখতে গিয়ে বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ল। ব্রুণের ফেসওয়াশ। ওর মুখে ব্রুণ উঠেছে এটা মেয়েটা খেয়াল করেছে! আবার ফেসওয়াশ ও নিয়ে এসেছে।
ফেসওয়াশটা গতকালই ওয়েবসাইটে দেখেছে। ব্রান্ডেড, রিভিউ ভালো।

শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে ড্রেসিংটেবিলে কাছে আসতে খেয়াল করল ড্রেসিংটেবিল বিউটি প্রোডাক্ট এ ভরা। কিসব ফেসমাস্ক ও আছে। কাল ও মুখে কিসব মেখেছিল মেয়েটা। এই মেয়ে রূপচর্চা ও করে! প্রোডাক্ট দেখে মনে হচ্ছে সৌন্দর্য রক্ষা সম্পর্কে বেশ ভালোই ধারণা আছে। এগুলো ও জায়েজ! আর কী বাকি আছে! এই মেয়ে দেখি সবদিক দিয়ে পারদর্শী। পর্দার মাঝে থেকে এত কী করা যায়! জাওয়াদ অবাক হলো। ওর মনে হলো, এটা মেয়ে নয় একটা মিস্ট্রি বক্স। যার পরতে পরতে নতুন অজানা তথ্য আছে। প্রতিবার নতুন করে জানছে ওকে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here