সূর্যোদয় #পর্ব_১৩ #কারিমা_দিলশাদ

##সূর্যোদয়
#পর্ব_১৩
#কারিমা_দিলশাদ

হাসপাতালে গিয়ে দেখে ইতোমধ্যে বিজয়, সৌরভ উপস্থিত। ওরা যেতেই আশাকে ধরে ধরে নামাতে সাহায্য করে। স্ট্রেচারও রেডি করে রেখেছিল। আশাকে স্ট্রেচারে শুয়িয়ে দিয়ে দ্রুত ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল বলে কথা। সেবা কি আর এতো সহজে পাওয়া যায়। এখানে থেকে ওখানে যাও ওখানে থেকে এই টোকেন নিয়ে আসো কত কি।

এরমধ্যে অনিক, কবিতা আর প্রীতিও চলে আসে। আশার বাসায় তখনো খবর দেওয়া হয় নি। ওর বাসায় আপাতত কেউ নেই। সবাই আশার নানুবাড়িতে গেছে। আর এই খবরটা কে কিভাবে দিবে সেটাও তাদের সাহসে কুলাচ্ছে না৷ এরপর ঠিক করে বিষয়টা আরেকটু দেখে তারপর জানাবে।

এরমধ্যে আশাকে নিয়ে কিছু হাসপাতালের স্টাফ এবং নার্সরা ওকে নিয়ে ভিতরে যায়। সৌরভ উঁকিঝুঁকি দিয়েও নাকি কোনো ডাক্তারকে দেখতে পায় না। এরইমধ্যে আবার একজন নার্স এসে কিছু ওষুধ এর নাম ধরিয়ে দিয়ে ওষুধ আনতে বলে। অনিক আর বিজয় ওষুধ আনতে চলে যায়৷ ওদের কাছে টাকা আছে কিনা জানে না ঐশী। তাই ওদের পিছু ডাকে। কিন্তু ওরা ততক্ষণে একটু দূরে চলে গেছে। তাই ঐশী দৌড়ে ওদের পিছু নিতে গেলে একজনের সাথে অল্পের জন্য ধাক্কা লাগতে লাগতে গিয়েও লাগে না৷ ঐশী কোনোরকমে সরি বলে যেতে নিলে পিছন থেকে তার নাম ধরে কেউ ডেকে উঠে।

ঐশী পিছনে তাকিয়ে দেখে লোকটা জয়। এপ্রোন গায়ে, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে চোখেমুখে একরাশ অবাকতা নিয়ে তারদিকে তাকিয়ে আছে। ঐশী একবার অনিকদের যাওয়ার দিকে তাকায়, দেখে ওরা কেউ নেই। এরপর আবার জয়ের দিকে তাকায়। ঐশীকে এখানে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে জয় বেশ অবাক হয়। সে ঐশীর দিকে এগিয়ে প্রশ্ন করে,

“ ঐশী আপনি এখানে? আপনি ঠিক আছেন তো? কার সাথে এসছেন?”

“ আ আমার আমার ফ্রেন্ড। ওর এক্সি’ডেন্ট হয়েছে। কেউ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেক্ক্ষণ হলো নিয়ে এসছি। ডাক্তার সাহেব আপনি প্লিজ একটু ওকে দেখুন না। প্লিজ ডাক্তার…….”- জয়কে দেখে ঐশী যেন আশার আলো খোঁজে পেয়েছে। সে আকুল হয়ে হাতজোর করে অননুয় করছে জয়ের কাছে। ঐশীকে এমন ভাঙাচোরা অবস্থায় দেখতে জয়ের একদমই ভালো লাগলো না।

সে ঐশীকে শান্ত করে তাকে ওখানে নিয়ে যেতে বললে। ঐশী জয়কে নিয়ে সেখানে যায়। এরপর জয় নিজেই আশাকে ভালো করে চেক করে, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এক্সরে করতে পাঠায়। এছাড়াও অন্যান্য যাবতীয় কাজে ঐশীদের সাহায্য করে। এরমধ্যে জয় একবার জিজ্ঞেস করে এক্সি’ডেন্টটা কিভাবে হয়েছে তখন ঐশী দূর্ঘট’নাটার কথা বলে। এছাড়া প্রয়োজন ব্যতীত জয় আর ঐশীর মধ্যে তেমন কোনো কথা হয় নি।

রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সব ফর্মালিটি এবং চিকিৎসা দেওয়ার পর জয় জানায় পা’য়ের জয়েন্টটা খুলে গেছে। প্লাস্টার করা হয়েছে কয়েকদিন হাসপাতালেই থাকতে হবে।

দৌড়ঝাঁপের মাঝেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আশার বাসা থেকেও লোকজন এসে গেছে। আজকে আশার ফ্যামিলির সাথে অনিক আর বিজয়ও থাকবে বলে জানায়। কিন্তু আশার মা বাবা ওদের অনেক জোর করে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। একপর্যায়ে তাদের সাথে না পেরে বিজয় আর অনিক মেনে নেয় তাদের কথা। ওদিকে ঐশী বাসায় এক্সি’ডেন্টের কথা বলায় তার মা তখন তেমন কিছু বলে নি। এখন বাসায় যাওয়ার পর কি হবে কে জানে…….

একে একে ফ্রেন্ডরা সবাই আশার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যায়। কেবল ঐশীই থেকে যায়। ও একটু পরে বের হবে বলে জানায়। ঐশী গিয়ে আশার বেডের পাশে গিয়ে বসে। হাসপাতালে বেড পাওয়াও মুশকিল। তবে জয় থাকায় সেই ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। স্টাফ নার্সরাও বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখছে। কারণ জয় বলেছে পেশেন্ট তার আত্মীয়। ভদ্রতার খাতিরেই বলেছে কথাটা।

ঐশী আশার পাশে বসে একধ্যানে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। বাম পায়ে প্লাস্টার। ডান হাতের কনুইটা ছিলে গেছে। মুখের দিকটাতেও হালকা ঘষা লেগেছে। একদিনেই মুকটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ঐশী আশার মাথায় হাত রাখতেই আশা চোখ মেলে তাকায়। ঐশীকে দেখে মলিন মুখে হালকা হাসি রেখে বলে,

“ কিরে তুই এহনও যাস নাই? যা গা, আন্টি ব’কা দিব…”

“ দিক, দিলে একটু ব’কা নাহয় খাইলাম। সমস্যা নাই।”- এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“ দোস্ত সরি রে। ভীষণ সরি।”

“ থা’পড়া খাবি হা*রামি। ফর্মালিটি মা*রাইস না৷ এক্সি’ডেন্ট জাস্ট এক্সি’ডেন্টই। যেকোনো সময় যেকোনো কারো সাথে হইতে পারতো। ওইটা ব্যাপার না। বাট তুমি আজকে সারাদিন হাসপাতালে। যেই তুমি কিনা টিকা দিবারও আসবার চাও না এইনে। মনে আছে কেমনে তোরে নিয়া আইয়া এইনে টিকা দেওয়াইতাম?”

আশার কথায় ঐশী হেসে ফেলে। হাসপাতাল জিনিসটা ঐশীর দুশ’মন। হাসপাতালের নাম শুনলেও তার গা গুলানো অবস্থা। কলেজে থাকতে সবাই মিলে যখন টিকা দিতে আসতো কত্তো যে বাহানা কত্তো জোরাজুরি যে করতে হতো ঐশীকে। আশার জবাবে ঐশী বলে,

“ দেখ তাইলে তুই কতো লাকি তোর মতো ছাগলের জন্য আজকে সারাটাদিন আমি এইনে। চারপাশ দেখছস ছি: কি নোংরা! বাট আমার জন্য তুই এইনে শুয়ে আছস। আই ফিল গিল্টি।”

“ যা বা**ল। ঢং করিস না। তোরে এমনে মানায় না। তুই খামখেয়ালি করবি, ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়া থাকবি এইটাই যায় তোর সাথে। ইমোশনাল হইলে তোরে একদম মানায় না৷”- দুই বান্ধবীর কথার মাঝেই জয় আসে আশাকে দেখতে।

জয়কে দেখে ঐশী দাঁড়িয়ে পড়ে। জয় ঐশীর দিকে একবার গভীরভাবে তাকিয়ে দেখে নেয়। চোখের পাপড়িগুলো ভিজে একটার সাথে আরেকটা লেগে আছে। নাক এবং ঠোঁট লাল হয়ে আছে। মুখটা শুকিয়ে গেছে সারাদিনে। জয় নিজের দৃষ্টি সংযত করে ফেলে। এভাবে একটা মেয়ের দিকে তাকানোটা তার মোটেই উচিত না। সে তার কাজে মনোনিবেশ করে। আশাকে আবার চেক করে নার্সকে বলে একটা ইন’জেকশন পুশ করে দিতে।

নার্স জয়ের কথামতো কাজ করে ফেলে। এরপর জয় অন্যান্য পেশেন্টদেরও চেক করতে যায়। দুই বান্ধবীর মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। আশার না এসে মেয়ের সাথে কথা বলছে আর ঐশী পাশে দাড়িয়ে তাদের কথোপকথন শুনছে।

এরমধ্যে জয় আবার আশার বেডের কাছে ফিরে এসে বলে,

“ রোগীকে ঘুমের ইন’জেকশন দেওয়া হয়েছে এখন ওর ঘুমানো উচিত। আন্টি আপনারা বরং বাইরে গিয়ে বসে থাকুন।” – এরপর ঐশীকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ আপনার বাকি ফ্রেন্ডরা কোথায়? আপনি কি আজ এখানেই থাকবেন?”

“ না না আমিও এখন বের হবো।” -এরপর আশা এবং আশার মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নেয় এবং বলে যেকোনো দরকারে বিনা দ্বিধায় যেন তাকে ফোন দেয়। এরপর সে বাসার উদ্দেশ্য রওনা হয়।

অল্প একটু যাওয়ার পথেই পিছন থেকে জয় ডাক দেওয়ায় থেমে যায় ঐশী।

—————-

এপ্রোন গায়ে হাতে স্টেথোস্কোপ নিয়ে হালকা দৌড়ে ঐশীর পাশে এসে দাঁড়ালো জয়। ঐশীকে জিজ্ঞেস করলো,

“ চলে যাচ্ছেন??”

“ হ্যা। ”

“ আমিও এখন বাসায় যাব। যদি কিছু মনে না করেন একসাথেই বের হই?”

“ ওমা৷ এতে মনে করার কি আছে? চলুন না। ”

“ জ্বি চলুন। তার আগে আমাকে আমার ব্যাগটা নিতে হবে। একটু ওয়েট করুন প্লিজ।”

“ অবশ্যই।”

জয় ব্যাগ নিয়ে আসলে দুজনেই বের হয় হসপিটাল থেকে। হাটতে হাটতে দুজনে টুকটুক করে কথা বলছে।

জয় বলে,

“ আপনি ফ্রেন্ডকে নিয়ে বেশ মনোযোগী তাই না? না মানে আপনাকে যতদিন দেখেছি বেশ স্ট্রং হিসেবেই দেখেছি। বাট আজকে প্রথম যখন আপনাকে দেখলাম বেশ বিধ্বস্ত। বোঝা গেল আপনার মাঝেও ইমোশন আছে।”

“ ইমোশন আছে মানে? আপনার কি মনে হতো আমি ইমোশনলেস?”

“ না না আমি ওটা বলি নি। আপনি ভুল বুঝছেন। আসলে আমি, আমি আসলে বুঝাতে চাচ্ছিলাম যে আপনার সাথে কথাবার্তায় মনে হয়েছে আপনি সব বিষয় খুব ইজিলি মেনে নিতে পারেন, যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। ভেঙে পড়েন না। এটা বুঝাতে চাচ্ছিলাম আরকি।”

“ তো! ইমোশন সব মানুষের ভিতরেই আছে। কারো মাঝে কম কারো মাঝে বেশি। ব্যাস এইটুকুই তো। এটা আপনি ছাড়া ভালো আর কে বুঝবে বলুন তো?
আর সত্যি বলতে আশা আমার খুব ক্লোজ। এতটাও ঘাবড়ে যেতাম না যদি না ঘটানাটা আমার সামনে ঘটতো। আমার চোখের সামনে সবটা ঘটায় তখন আমার মাথা একদম ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো ঘটনার সম্মুখীন এর আগে কখনো হয় নি৷ আর চাইও না হতে।”

একটু থেমে আবার বলে,

“ আপনি আমার মাঝে ইমোশন দেখে অবাক হচ্ছেন আর ওদিকে আমার ফ্রেন্ডরা আমাকে ইমোশনলেস বলছিল। আমার মাঝে ভয় ডর নেই, টেনশন নেই আরও কত কি…” -ঐশীর কথায় জয় এবার হেসে ফেলে। আর বলে,

“ আমি আপনার ইমোশন দেখে অবাক হয় নি। আসলে কথাটা বুঝাতে গিয়ে আমার ভুল হয়েছে। অন্যভাবে বলা উচিত ছিল। আসলে আপনাকে অমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে অবাক হয়েছি। সাধারণত ফ্রেন্ড’দের জন্য কেউ এতটা করে না। তবে আপনাদের ফ্রেন্ড সার্কেলটা সুন্দর। এমন ফ্রেন্ড সার্কেল এখন আর অতটা হয় না। তবে আমি আবার খুব লাকি বুঝলেন। আমার ফ্রেন্ডরাও আবার পজিটিভলি খুব পজেসিভ। বিপদে আপদে পাশে পাওয়ার মতো ফ্রেন্ড সার্কেল পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।

বাট আই মাস্ট স্যা ইউ আর ভেরি স্ট্রং দ্যান আদার গার্লস। আপনার বাকি দুটো বান্ধবীই তো কেঁদে কুটে শেষ আর আপনি খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু হ্যান্ডেল করেছেন। ”

জয়ের প্রশংসায় ঐশী কেবল একটা মুচকি হাসি দেয়। এভাবে আরও টুকটাক কথা বলতে বলতেই ঐশী আর জয় চরপাড়া মোড়ে চলে আসে। অন্য সময় হলে ঐশী রিকশাই নিতো। কিন্তু হাতে টাকা কম থাকায় রিকশা দিয়ে যাওয়া যাবে না। কেনাকাটার জন্য যে টাকা নিয়ে এসেছিল সবশেষ। তাই এখন অটো দিয়ে বাসায় যেতে হবে। সেজন্য মোড়ে আসা।

মোড়ে এসে ঐশী জয়কে বলে,

“ ডাক্তার সাহেব এবার আমাকে অটোতে উঠতে হবে। তাহলে আজকে আমি আসি। ইনশাআল্লাহ্ কালকে দেখা হবে।”

“ জ্বি জ্বি অবশ্যই। কালকে চেকআপ করতে তো যাবই।”

“ আসি তাহলে, আল্লাহ হাফেজ। ”

“ আল্লাহ হাফেজ। ”

বলে ঐশী অটোতে উঠে পড়ে। অটো যাওয়া অবধি জয় দাড়িয়ে ছিল। এতোক্ষণ তো ভালোই লাগছিল ঐশী যেতেই অটোমেটিক জয়ের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

যদিও জয়ের ইচ্ছে করছিল ঐশীকে বাসায় ড্রপ করে দিতে। কিন্তু এই মেয়ে নিশ্চিত কখনোই রাজি হবে না তার বাইকে যেতে। আর ঐশীকে অফার করতে তারও লজ্জা লাগছিল। তাই আর বলে নি। কিন্তু তার বাইক কোথায়?

জয়ের এতক্ষণে খেয়াল হলো সে ঐশীর সাথে কথা বলতে বলতে মোড়ে এসে পড়েছে। আর তার বাইক তো হসপিটালে রাখা। সে এসব ভেবেই ঐশীর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে একটা হাসি দেয়। অথচ ঐশী তো কখন চলে গেছে। মনে একটা ভালো লাগার আভাস নিয়ে জয় আবার হসপিটালে ব্যাক করে।

#চলবে…………..

( কপি করা নিষেধ। তবে শেয়ার করতে পারেন।)
হাসপাতালে গিয়ে দেখে ইতোমধ্যে বিজয়, সৌরভ উপস্থিত। ওরা যেতেই আশাকে ধরে ধরে নামাতে সাহায্য করে। স্ট্রেচারও রেডি করে রেখেছিল। আশাকে স্ট্রেচারে শুয়িয়ে দিয়ে দ্রুত ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল বলে কথা। সেবা কি আর এতো সহজে পাওয়া যায়। এখানে থেকে ওখানে যাও ওখানে থেকে এই টোকেন নিয়ে আসো কত কি।

এরমধ্যে অনিক, কবিতা আর প্রীতিও চলে আসে। আশার বাসায় তখনো খবর দেওয়া হয় নি। ওর বাসায় আপাতত কেউ নেই। সবাই আশার নানুবাড়িতে গেছে। আর এই খবরটা কে কিভাবে দিবে সেটাও তাদের সাহসে কুলাচ্ছে না৷ এরপর ঠিক করে বিষয়টা আরেকটু দেখে তারপর জানাবে।

এরমধ্যে আশাকে নিয়ে কিছু হাসপাতালের স্টাফ এবং নার্সরা ওকে নিয়ে ভিতরে যায়। সৌরভ উঁকিঝুঁকি দিয়েও নাকি কোনো ডাক্তারকে দেখতে পায় না। এরইমধ্যে আবার একজন নার্স এসে কিছু ওষুধ এর নাম ধরিয়ে দিয়ে ওষুধ আনতে বলে। অনিক আর বিজয় ওষুধ আনতে চলে যায়৷ ওদের কাছে টাকা আছে কিনা জানে না ঐশী। তাই ওদের পিছু ডাকে। কিন্তু ওরা ততক্ষণে একটু দূরে চলে গেছে। তাই ঐশী দৌড়ে ওদের পিছু নিতে গেলে একজনের সাথে অল্পের জন্য ধাক্কা লাগতে লাগতে গিয়েও লাগে না৷ ঐশী কোনোরকমে সরি বলে যেতে নিলে পিছন থেকে তার নাম ধরে কেউ ডেকে উঠে।

ঐশী পিছনে তাকিয়ে দেখে লোকটা জয়। এপ্রোন গায়ে, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে চোখেমুখে একরাশ অবাকতা নিয়ে তারদিকে তাকিয়ে আছে। ঐশী একবার অনিকদের যাওয়ার দিকে তাকায়, দেখে ওরা কেউ নেই। এরপর আবার জয়ের দিকে তাকায়। ঐশীকে এখানে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে জয় বেশ অবাক হয়। সে ঐশীর দিকে এগিয়ে প্রশ্ন করে,

“ ঐশী আপনি এখানে? আপনি ঠিক আছেন তো? কার সাথে এসছেন?”

“ আ আমার আমার ফ্রেন্ড। ওর এক্সি’ডেন্ট হয়েছে। কেউ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেক্ক্ষণ হলো নিয়ে এসছি। ডাক্তার সাহেব আপনি প্লিজ একটু ওকে দেখুন না। প্লিজ ডাক্তার…….”- জয়কে দেখে ঐশী যেন আশার আলো খোঁজে পেয়েছে। সে আকুল হয়ে হাতজোর করে অননুয় করছে জয়ের কাছে। ঐশীকে এমন ভাঙাচোরা অবস্থায় দেখতে জয়ের একদমই ভালো লাগলো না।

সে ঐশীকে শান্ত করে তাকে ওখানে নিয়ে যেতে বললে। ঐশী জয়কে নিয়ে সেখানে যায়। এরপর জয় নিজেই আশাকে ভালো করে চেক করে, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এক্সরে করতে পাঠায়। এছাড়াও অন্যান্য যাবতীয় কাজে ঐশীদের সাহায্য করে। এরমধ্যে জয় একবার জিজ্ঞেস করে এক্সি’ডেন্টটা কিভাবে হয়েছে তখন ঐশী দূর্ঘট’নাটার কথা বলে। এছাড়া প্রয়োজন ব্যতীত জয় আর ঐশীর মধ্যে তেমন কোনো কথা হয় নি।

রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সব ফর্মালিটি এবং চিকিৎসা দেওয়ার পর জয় জানায় পা’য়ের জয়েন্টটা খুলে গেছে। প্লাস্টার করা হয়েছে কয়েকদিন হাসপাতালেই থাকতে হবে।

দৌড়ঝাঁপের মাঝেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আশার বাসা থেকেও লোকজন এসে গেছে। আজকে আশার ফ্যামিলির সাথে অনিক আর বিজয়ও থাকবে বলে জানায়। কিন্তু আশার মা বাবা ওদের অনেক জোর করে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। একপর্যায়ে তাদের সাথে না পেরে বিজয় আর অনিক মেনে নেয় তাদের কথা। ওদিকে ঐশী বাসায় এক্সি’ডেন্টের কথা বলায় তার মা তখন তেমন কিছু বলে নি। এখন বাসায় যাওয়ার পর কি হবে কে জানে…….

একে একে ফ্রেন্ডরা সবাই আশার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যায়। কেবল ঐশীই থেকে যায়। ও একটু পরে বের হবে বলে জানায়। ঐশী গিয়ে আশার বেডের পাশে গিয়ে বসে। হাসপাতালে বেড পাওয়াও মুশকিল। তবে জয় থাকায় সেই ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। স্টাফ নার্সরাও বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখছে। কারণ জয় বলেছে পেশেন্ট তার আত্মীয়। ভদ্রতার খাতিরেই বলেছে কথাটা।

ঐশী আশার পাশে বসে একধ্যানে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। বাম পায়ে প্লাস্টার। ডান হাতের কনুইটা ছিলে গেছে। মুখের দিকটাতেও হালকা ঘষা লেগেছে। একদিনেই মুকটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ঐশী আশার মাথায় হাত রাখতেই আশা চোখ মেলে তাকায়। ঐশীকে দেখে মলিন মুখে হালকা হাসি রেখে বলে,

“ কিরে তুই এহনও যাস নাই? যা গা, আন্টি ব’কা দিব…”

“ দিক, দিলে একটু ব’কা নাহয় খাইলাম। সমস্যা নাই।”- এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“ দোস্ত সরি রে। ভীষণ সরি।”

“ থা’পড়া খাবি হা*রামি। ফর্মালিটি মা*রাইস না৷ এক্সি’ডেন্ট জাস্ট এক্সি’ডেন্টই। যেকোনো সময় যেকোনো কারো সাথে হইতে পারতো। ওইটা ব্যাপার না। বাট তুমি আজকে সারাদিন হাসপাতালে। যেই তুমি কিনা টিকা দিবারও আসবার চাও না এইনে। মনে আছে কেমনে তোরে নিয়া আইয়া এইনে টিকা দেওয়াইতাম?”

আশার কথায় ঐশী হেসে ফেলে। হাসপাতাল জিনিসটা ঐশীর দুশ’মন। হাসপাতালের নাম শুনলেও তার গা গুলানো অবস্থা। কলেজে থাকতে সবাই মিলে যখন টিকা দিতে আসতো কত্তো যে বাহানা কত্তো জোরাজুরি যে করতে হতো ঐশীকে। আশার জবাবে ঐশী বলে,

“ দেখ তাইলে তুই কতো লাকি তোর মতো ছাগলের জন্য আজকে সারাটাদিন আমি এইনে। চারপাশ দেখছস ছি: কি নোংরা! বাট আমার জন্য তুই এইনে শুয়ে আছস। আই ফিল গিল্টি।”

“ যা বা**ল। ঢং করিস না। তোরে এমনে মানায় না। তুই খামখেয়ালি করবি, ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়া থাকবি এইটাই যায় তোর সাথে। ইমোশনাল হইলে তোরে একদম মানায় না৷”- দুই বান্ধবীর কথার মাঝেই জয় আসে আশাকে দেখতে।

জয়কে দেখে ঐশী দাঁড়িয়ে পড়ে। জয় ঐশীর দিকে একবার গভীরভাবে তাকিয়ে দেখে নেয়। চোখের পাপড়িগুলো ভিজে একটার সাথে আরেকটা লেগে আছে। নাক এবং ঠোঁট লাল হয়ে আছে। মুখটা শুকিয়ে গেছে সারাদিনে। জয় নিজের দৃষ্টি সংযত করে ফেলে। এভাবে একটা মেয়ের দিকে তাকানোটা তার মোটেই উচিত না। সে তার কাজে মনোনিবেশ করে। আশাকে আবার চেক করে নার্সকে বলে একটা ইন’জেকশন পুশ করে দিতে।

নার্স জয়ের কথামতো কাজ করে ফেলে। এরপর জয় অন্যান্য পেশেন্টদেরও চেক করতে যায়। দুই বান্ধবীর মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। আশার না এসে মেয়ের সাথে কথা বলছে আর ঐশী পাশে দাড়িয়ে তাদের কথোপকথন শুনছে।

এরমধ্যে জয় আবার আশার বেডের কাছে ফিরে এসে বলে,

“ রোগীকে ঘুমের ইন’জেকশন দেওয়া হয়েছে এখন ওর ঘুমানো উচিত। আন্টি আপনারা বরং বাইরে গিয়ে বসে থাকুন।” – এরপর ঐশীকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ আপনার বাকি ফ্রেন্ডরা কোথায়? আপনি কি আজ এখানেই থাকবেন?”

“ না না আমিও এখন বের হবো।” -এরপর আশা এবং আশার মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নেয় এবং বলে যেকোনো দরকারে বিনা দ্বিধায় যেন তাকে ফোন দেয়। এরপর সে বাসার উদ্দেশ্য রওনা হয়।

অল্প একটু যাওয়ার পথেই পিছন থেকে জয় ডাক দেওয়ায় থেমে যায় ঐশী।

—————-

এপ্রোন গায়ে হাতে স্টেথোস্কোপ নিয়ে হালকা দৌড়ে ঐশীর পাশে এসে দাঁড়ালো জয়। ঐশীকে জিজ্ঞেস করলো,

“ চলে যাচ্ছেন??”

“ হ্যা। ”

“ আমিও এখন বাসায় যাব। যদি কিছু মনে না করেন একসাথেই বের হই?”

“ ওমা৷ এতে মনে করার কি আছে? চলুন না। ”

“ জ্বি চলুন। তার আগে আমাকে আমার ব্যাগটা নিতে হবে। একটু ওয়েট করুন প্লিজ।”

“ অবশ্যই।”

জয় ব্যাগ নিয়ে আসলে দুজনেই বের হয় হসপিটাল থেকে। হাটতে হাটতে দুজনে টুকটুক করে কথা বলছে।

জয় বলে,

“ আপনি ফ্রেন্ডকে নিয়ে বেশ মনোযোগী তাই না? না মানে আপনাকে যতদিন দেখেছি বেশ স্ট্রং হিসেবেই দেখেছি। বাট আজকে প্রথম যখন আপনাকে দেখলাম বেশ বিধ্বস্ত। বোঝা গেল আপনার মাঝেও ইমোশন আছে।”

“ ইমোশন আছে মানে? আপনার কি মনে হতো আমি ইমোশনলেস?”

“ না না আমি ওটা বলি নি। আপনি ভুল বুঝছেন। আসলে আমি, আমি আসলে বুঝাতে চাচ্ছিলাম যে আপনার সাথে কথাবার্তায় মনে হয়েছে আপনি সব বিষয় খুব ইজিলি মেনে নিতে পারেন, যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। ভেঙে পড়েন না। এটা বুঝাতে চাচ্ছিলাম আরকি।”

“ তো! ইমোশন সব মানুষের ভিতরেই আছে। কারো মাঝে কম কারো মাঝে বেশি। ব্যাস এইটুকুই তো। এটা আপনি ছাড়া ভালো আর কে বুঝবে বলুন তো?
আর সত্যি বলতে আশা আমার খুব ক্লোজ। এতটাও ঘাবড়ে যেতাম না যদি না ঘটানাটা আমার সামনে ঘটতো। আমার চোখের সামনে সবটা ঘটায় তখন আমার মাথা একদম ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো ঘটনার সম্মুখীন এর আগে কখনো হয় নি৷ আর চাইও না হতে।”

একটু থেমে আবার বলে,

“ আপনি আমার মাঝে ইমোশন দেখে অবাক হচ্ছেন আর ওদিকে আমার ফ্রেন্ডরা আমাকে ইমোশনলেস বলছিল। আমার মাঝে ভয় ডর নেই, টেনশন নেই আরও কত কি…” -ঐশীর কথায় জয় এবার হেসে ফেলে। আর বলে,

“ আমি আপনার ইমোশন দেখে অবাক হয় নি। আসলে কথাটা বুঝাতে গিয়ে আমার ভুল হয়েছে। অন্যভাবে বলা উচিত ছিল। আসলে আপনাকে অমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে অবাক হয়েছি। সাধারণত ফ্রেন্ড’দের জন্য কেউ এতটা করে না। তবে আপনাদের ফ্রেন্ড সার্কেলটা সুন্দর। এমন ফ্রেন্ড সার্কেল এখন আর অতটা হয় না। তবে আমি আবার খুব লাকি বুঝলেন। আমার ফ্রেন্ডরাও আবার পজিটিভলি খুব পজেসিভ। বিপদে আপদে পাশে পাওয়ার মতো ফ্রেন্ড সার্কেল পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।

বাট আই মাস্ট স্যা ইউ আর ভেরি স্ট্রং দ্যান আদার গার্লস। আপনার বাকি দুটো বান্ধবীই তো কেঁদে কুটে শেষ আর আপনি খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু হ্যান্ডেল করেছেন। ”

জয়ের প্রশংসায় ঐশী কেবল একটা মুচকি হাসি দেয়। এভাবে আরও টুকটাক কথা বলতে বলতেই ঐশী আর জয় চরপাড়া মোড়ে চলে আসে। অন্য সময় হলে ঐশী রিকশাই নিতো। কিন্তু হাতে টাকা কম থাকায় রিকশা দিয়ে যাওয়া যাবে না। কেনাকাটার জন্য যে টাকা নিয়ে এসেছিল সবশেষ। তাই এখন অটো দিয়ে বাসায় যেতে হবে। সেজন্য মোড়ে আসা।

মোড়ে এসে ঐশী জয়কে বলে,

“ ডাক্তার সাহেব এবার আমাকে অটোতে উঠতে হবে। তাহলে আজকে আমি আসি। ইনশাআল্লাহ্ কালকে দেখা হবে।”

“ জ্বি জ্বি অবশ্যই। কালকে চেকআপ করতে তো যাবই।”

“ আসি তাহলে, আল্লাহ হাফেজ। ”

“ আল্লাহ হাফেজ। ”

বলে ঐশী অটোতে উঠে পড়ে। অটো যাওয়া অবধি জয় দাড়িয়ে ছিল। এতোক্ষণ তো ভালোই লাগছিল ঐশী যেতেই অটোমেটিক জয়ের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

যদিও জয়ের ইচ্ছে করছিল ঐশীকে বাসায় ড্রপ করে দিতে। কিন্তু এই মেয়ে নিশ্চিত কখনোই রাজি হবে না তার বাইকে যেতে। আর ঐশীকে অফার করতে তারও লজ্জা লাগছিল। তাই আর বলে নি। কিন্তু তার বাইক কোথায়?

জয়ের এতক্ষণে খেয়াল হলো সে ঐশীর সাথে কথা বলতে বলতে মোড়ে এসে পড়েছে। আর তার বাইক তো হসপিটালে রাখা। সে এসব ভেবেই ঐশীর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে একটা হাসি দেয়। অথচ ঐশী তো কখন চলে গেছে। মনে একটা ভালো লাগার আভাস নিয়ে জয় আবার হসপিটালে ব্যাক করে।

#চলবে…………..

( কপি করা নিষেধ। তবে শেয়ার করতে পারেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here