সুখের_অ-সুখ-১৬,১৭

#সুখের_অ-সুখ-১৬,১৭
#মম_সাহা
পর্বঃ ষোলো

বর্ষার মৌসুম, ঝড় বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক কিন্তু তাই বলে ঢাকার মতন শহরে কারেন্ট চলে গিয়ে আধাঁরে ডুবে যাওয়াটা বেশ অস্বাভাবিক লাগলো সুখের। এই দেশের রাজধানী, ঢাকা। যা অধিক জনসংখ্যার শহর এবং উন্নতও,কিন্তু সেখানে এমন অনুন্নত ঘটনায় বেশ অবাক সুখ। বাথরুম’টা যেনো ভয়ঙ্কর আধাঁরে নিমজ্জিত হলো। নতুন জায়গা,নতুন পরিবেশ, পুরোনো শত্রু- একটু ভয় হওয়াটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু ততক্ষণে ঝর্ণার পানিতে সে ভিজে গেছে অনেকটা। বাহিরে গিয়ে দাঁড়ানোরও উপায় নেই। রুমে কারো উপস্থিতি টের পাওয়া গেলো,এতে ভয়টা দ্বিগুণ হলো সুখের ৷ মানুষটা মসৃন নয়তো?

সুখ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন তুললো,
-‘কে আছে বাহিরে?’

বিপরীত দিক থেকে কোনো উত্তর আসলো না। সুখ বুঝলো ঝর্ণার শব্দ, বাহিরের তুমুল বর্ষণ ছাপিয়ে তার কথা হয়তো বিপরীতে থাকা ব্যাক্তির কর্ণগোচর হলো। সুখ গলার স্বর আরেকটু উঁচুতে তুলল,ভয়ে ভয়ে বলল,
-‘বাহিরে কী কেউ আছেন?’

তবুও কোনো আশানুরূপ সাড়া পেলো না সুখ। মনে মনে ভয়টা প্রকোপ হলো। মেঘ হলে এতক্ষণে সাড়া দিতো। সুখের মনের ভয়টা আরও গাঢ়ো হলো যখন বারান্দার দরজাটা ঠাস করে শব্দ হলো। সুখ আর টিকতে পারলো না নিকষ,কালো আধাঁরে। কোনোরকমে বাথরুমের ছিটকিনি টা খুলেই বাহিরে এলো। এতটুকু সময়েই যেনো ভীষণ ঘামিয়ে গেলো, হাপিয়ে উঠলো পুরো শরীর।

সুখের শরীর তড়তড় করে কাঁপছে। বারান্দায় কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে সে কোনোরকম অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
-‘মেঘ সাহেব হ্যাল্প মি। আ’ম এফরেইড। মেঘ সাহেব প্লিজ কাম। প্লিজ।’

তুমুল ঝড় হচ্ছিলো বিধায় মেঘ নিজের ঘরের চারা গাছ গুলো বারান্দার তাক থেকে নামিয়ে নিচে রাখতে এসেছিলো যেনো বাতাসে পরে ভেঙে না যায়। হঠাৎ রিনরিনে মেয়েলী কন্ঠ ভেসে আসে রুম থেকে। পরিচিত কন্ঠ। অপরিচিতার আতঙ্ক বিরাজিত স্বর এটা। মেঘ এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে দ্রুত রুমে প্রবেশ করলো। রুমে ঢুকতেই ওয়াশরুমের পাশে গুটিশুটি মেরে বসে থাকতে দেখলে এক সিক্ত নারী দেহ’কে। দু’হাত দিয়ে ঢেকে রেখেছে তার ছোট্ট মুখমন্ডল। দেহভঙ্গি বলে দিচ্ছে রমনী বেশ ভীত।

মেঘ এগিয়ে গেলো, নিজের পুরুষালী সুঠাম ডান হাতটা দিয়ে আশ্বাসের ছোঁয়া দেয় সুখের বাহুতে। সুখ আরও আৎকে উঠে। কেঁপে উঠে আরও বেশি। চিৎকারের আগেই মেঘ আশ্বাসের স্বরে বলে,
-‘কাম অন অপরিচিতা, ইট’স মি। মেঘ সাহেব। ওপেন ইউ’র আই’স। কুল ডাউন।’

রমনী’র কম্পিত শরীর থেমে যায়। বিশ্বাসের হাত’টা পেয়ে বোধহয় ভয় গুলো গুটিয়ে যায়। মুখ থেকে হাতটা সরায়। কাঙ্খিত মানুষটাকে দেখে দেহ জুড়ায়। শরীরটাকে স্বাভাবিক করার জন্য উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে পুরুষটিকে। বাহিরে ভারী বর্ষণ। রুমের এক কোনায় বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে খুব স্বল্প আলো নিয়ে টিকে থাকা মোমবাতি আর প্রেমিক পুরুষের বুকের বা’পাশে তার সাত জন্মের প্রেয়সী। মাটির থেকে উঠে আসা ভেজা স্নিগ্ধ ঘ্রাণ,বারান্দায় দুষ্টু বেলীর মোহনীয় সুভাস, আর বাতায়নের (জানালা) ফাঁকা দিয়ে শুভ্র রাঙা অবগুন্ঠন (পর্দা) গুলো উড়িয়ে শীতল বাতাস’টা পরিবেশ’কে করেছে মোহনীয়। মনের সুপ্ত কোণে এক গুপ্ত ইচ্ছের উদয় হয় প্রেমিক পুরুষের। সিক্ত তার অপরিচিতার কোমলতায় তার প্রেমিক হওয়ার লুকায়িত গুন গুলো বের করতে চাচ্ছে।

এক, দুই, তিন মিনিট করে অতিবাহিত হলো নিরব,মোহনীয় কিছু সময়। অপরিচিতা এখন কিছুটা নিজেকে ধাতস্থ করেছে। প্রেমিক পুরুষ সংযত করেছে নিজেকে। রমনী তো তারই,গুপ্ত ইচ্ছে গুলো একদিন পূর্ণতা পাবে প্রকৃতির সাথে সাথে রমনীর সম্মতিতে।

নিরবতা ভেঙে শীতল কন্ঠে মেঘ বলল,
-‘অপরিচিতা! ভয় পেয়েছিলেন? এইতো,আমি এখানে। উঠুন তো একটু,ভেজা শরীরে আছেন ঠান্ডা লাগবে। উঠুন। আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি,আপনি ভিতরে গিয়ে জামা কাপড় বদলে আসুন।’

সুখের মস্তিষ্কের নিউরন গুলো হঠাৎ করে সজাগ হলো। মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তার লজ্জাহীন কার্যের কথা। ভয় পেয়ে মাথার ভেতর যে ভয়ানক কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিলো, তার’ই প্রমাণ হিসেবে সে এই পুরুষটার বুকে।

সুখ তড়িঘড়ি করে সড়ে যায়। শাড়ি’টা ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। আশ্চার্যজনক ভাবে হলেও এটাই সত্যি যে,এখন আর তার ভয় লাগছে না। সুখের মস্তিষ্ক রসিকতা করে বলে উঠলো যেনো- ওগো সুখপাখি, তোর বুঝি নির্লজ্জতার বাঁধ ভেঙেছে? এ আবার কেমন ভয় রে! উষ্ণ আলিঙ্গনে উধাও হয়ে যায়? নাকি সব আলিঙ্গনের বাহানা?

সুখ চোখ বড়বড় করে তাকায়। তার মন’টা ভীষণ বাজে বকছে আজকাল। ভীষণ ভাবে শাসায় তার মনকে। সে কী আজগুবি কান্ড করছে আজকাল? পাগল হলো না তো?

মেঘ গোপনে হাসে কিন্তু বুঝতে দেয় না সুখকে। মেয়েটা যদি অতি লজ্জায় তার সাথে পরে কথা না বলে তখন কী হবে?

মেঘ উঠে দাঁড়ায়। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-‘হয়েছে আপনার ভাবনাচিন্তা? হয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি শাড়ি’টা বদলিয়ে আসুন, তাড়াতাড়ি।’

সুখ ড্যাবড্যাব করে তাকায়। মেঘ এবার কেমন জেনো অদ্ভুত কন্ঠে বলল,
-‘এখন আপনার জন্য আমি শাড়ি’টা পাল্টাতে বলি নি, আমার জন্যই বলেছি। আপনার সিক্ত রূপ রক্তাক্ত করছে আমার হৃৎপিণ্ড। স্নিগ্ধতা দিয়ে মেরে ফেলার ইচ্ছে আছে? এই পুরুষটার করুণ অবস্থাও বুঝুন। না আছে আপনাকে এ রূপে দেখার অনুমতি, না চোখ শুনে বারণ। আমি পড়েছি সব জ্বালায়।’

সুখের চোখ যেনো বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম। নিজের অবস্থানের কথা তৎক্ষণাৎ মাথায় খেলে গেলো। গাল গুলো লাল হয়ে গেলো। দ্রুত বাথরুমে প্রবেশ করলো সে।বুকে হাত দিয়ে ভাবছে, এ কেমন মিষ্টি লজ্জা?

দীর্ঘক্ষণ মিষ্টি নিরবতার এই রজনী মেঘের কাছে যেনো স্বপ্ন ছিল। অপরিচিতা’কে এতটা অনুভব করার রাত এ জীবনে তো প্রথম। মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল,
-‘রমনীরা কী জানে, তাদের কোমল প্রতিচ্ছবি ভীষণ বিপর্যয় ঘটায় শক্ত প্রেমিকের বুকে? হাজার জনমের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেয় তাদের গালের লাল আভা। রমনীরা জানেনা, প্রেমিক’রা তাদের সব রূপে আহত-নিহত হয়। আর যদি দেহ থাকো সিক্ত,হৃদয় হয় ভীষন রক্তাক্ত।’

বেশ খানিক’টা সময় পর সুখ ওয়াশরুমের বাহিরে আসে। ততক্ষণে মেঘ নিজেকে বেশ স্বাভাবিক করে নেয়। স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
-‘আপনি একটু খাটে বসুন অপরিচিতা, আমি জামা’টা পাল্টে আসি। ভয় পাবেন না তো?’

সুখ দৃষ্টি ফ্লোরে’র দিকে নিবদ্ধ করে মাথা নাড়ালো, যার অর্থ ‘না’। মেঘ মুচকি হাসলো সুখের কান্ডে,মেয়টা এত লজ্জা পাচ্ছে কেন? লজ্জা নারীর ভূষণ বলে তার এত বহিঃপ্রকাশ করতে হবে নাকি! নিজের ভাবনায় আবার হাসে মেঘ। তারপর আরেকটা টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ওয়াশরুমের দরজা’টা লাগানোর আগ মুহূর্তে টিটকারি মেরে বলল,
-‘ওহে অপরিচিতা, এই আহত পুরুষের বুকের বা’পাশ থেকে শুরু করে পুরোটা মানব’ই আপনার। এতে লজ্জা না, অধিকারবোধ রাখুন। নিজের অধিকার একটু ছুঁয়েছেন পর মানুষের তো না। আমি পুরোটাই আপনার মানুষ।’

সুখ মুখ ভেংচি দিলো। একটা গম্ভীর পুরুষের উচ্চস্বরের হাসি ভেসে এলো। সুখও মুচকি হাসলো ক্ষানিকটা।

বেলী ফুলের গন্ধে শেষমেশ নিজেকে আটকে রাখতে পারে নি সুখ। আধাঁরের মাঝেও তার মনে বেশ ইচ্ছে জাগলো নিশি’র বেলীফুল গুলোকে একটু ছুঁয়ে দেখার। যেমন ভাবনা,তেমর কাজ। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো,বারান্দার দিকে। তাদের বারান্দা’টা বাড়ির পিছের দিকে। সুখ ভেজা শীতল বেলীফুল গুলোর সুগন্ধি একটু শুসে নিলো,ছুঁয়ে দিলো একটু শীতলতা। একদম মুগ্ধ মনে যখন বাহিরের দিকে দৃষ্টি দিলো তখন হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে গেলো তাদের রুম বরাবর বাহিরে কিছুটা দূরে একটা আধাঁরিয়া কুঠিরের মতন ঘর দেখে। সুখের ভ্রু আপনা-আপনি কুঁচকে এলো। বেশ গভীর দৃষ্টি দেয় কুঠিরের দিকে। হঠাৎ চমকে উঠলো সুখ,মনে হলো ভারী বর্ষণের শব্দ ভেদ করে একটা দুর্বল নারীকন্ঠ আর্তনাদ ভেসে এলো কোথা থেকে যেনো। সুখের মনে হলো ঐ ঘরটা থেকেই শব্দ এলো। তারপর আবার সব চুপ। এর মাঝেই কুঠিরের থেকে কেউ একজন গটগট পায়ে বেড়িয়ে এলো বোধহয়। সুখ আৎকে উঠে। এই বৃষ্টির মাঝে একটা মানুষের অবয়ব কেবল বোঝা গেলো কিন্তু কে এ মানুষ? আর ঐ কুঠির’ই বা কী?

হঠাৎ তার পিছে উপস্থিত হয় মেঘ। ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলল,
-‘অপরিচিতা,চলুন খেতে ডাকছে। আসুন।’

সুখ রহস্যময় কুঠিরটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো মেঘের দিকে,
-‘আচ্ছা মেঘ সাহেব, ঐ ঘরটাতে কে থাকে?’

মেঘ সুখের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকায় তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
-‘ ওহ্ এটা, এটা পরিত্যক্ত এখন। আগে আমাদের স্টোর রুম ছিলো৷ এখন অবশ্য খালি’ই।’

-‘কেউ যায় না সেখানে?’

-‘নাহ্ যায় না। কিছু নাই তো সেখানে। কেনো বলুন তো?’

সুখ গভীর কিছুর সংমিশ্রণ উপলব্ধি করে। এ বাড়ির পিঠ পিছে গভীর খিচুড়ি পাকানো হচ্ছে কিন্তু সেটা সবাই জানেনা। কিছু তো একটা আছে এ বাড়িতে। তারপর কোনো কথা না বলে মেঘের সাথে সে খেতে চলে যায়। নিবিড় ভাবে খুঁটি বসিয়ে বাড়ির খুঁটিনাটি বের করতে হবে।

খাবার টেবিলে মসৃন বাদে সবাই ই আসলো। কাজের মেয়েটা সুখের দিকে একবারও তাকালো না বরং ওড়না দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে রাখলো। কেমন যেনো একটা পালায় পালায় ভাব। কিছু লুকানোর গভীর চেষ্টা তার অঙ্গভঙ্গিতে। সুখের যেনো মনে হলো আস্ত এক রহস্যের গোডাউনে সে এসে পড়েছে তবে,মেঘ সাহেব সব কিছুর বাহিরে।

________

সকালে ঘুম ভাঙতেই হিমা’র চেহারাটা দর্শন করলো সুখ। হা হয়ে গেলো বিষ্ময়ে। সকাল সকাল সর্বনাশের সংবাদ শুনতে হবে না তো?

#চলবে

#সুখের_অ-সুখ
#মম_সাহা
পর্বঃ সতেরো

সুখ কতক্ষণ চুপ রয়,নিরবতায় ব্যয় হয় কতটা সময়। ঘুমিয়ে থাকা শরীরের প্রতিটা অঙ্গ জাগ্রত করার সময় দেয়, মস্তিষ্কটা সচল করার পর শরীরে আলাদা অনুভূতি খেলে গেলো। আকষ্মিক ভয়টা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে কিছু হারানোর তীব্র আতঙ্ক। নিজেকে ধাতস্থ করে, হিমার দিকে তাকিয়ে সুখ বিষ্ময়মাখা কন্ঠে বলল,
-“তুই সকাল সকাল সেই যশোর থেকে ঢাকা কীভাবে এলি? আর হঠাৎ এখানে কেনো এসেছিস? কোনো সমস্যা হয়েছে হিমা?”

-“কেনো তুই জানিস না,কোনো এখানে এসেছি? মেঘ ভাইয়া’কে ছাড়া আমার চলবেই না সুখ। তুই তো কাল আর আমার সাথে যোগাযোগ করলি না তাই বাধ্য হয়ে ছুটে আসলাম।”

সুখের ছোট্ট মাথা’টা মানতে পারলো না বোধহয় কথা’টা। কম্পিত হলো বক্ষ মাঝে হৃৎপিণ্ডটা,আতঙ্কিত হলো শরীরে প্রতিটা শিরা-উপশিরা গুলো। কন্ঠের মাঝে কত গুলো অব্যক্ত কথা দলা পাঁকিয়ে গেলো যেনো। কী বলবে,কোথা থেকে শুরু করবে, হিসাব মেলাতে পারে না সুখ। কেবল ধীর কন্ঠে সুক্ষ্ণ কন্ঠ’নালী থেকে বের হয়ে আসলো,
-“তুই জানলি কীভাবে উনাদের বাড়ির ঠিকানা? আর একা একা এতটা পথ পাড়ি দিলি কীভাবে? আর কেন’ই বা এতটা তাড়া? একটু অপেক্ষায় থাকার মতন সময়ের কেনই বা এত স্বল্পতা?”

হিমা সুখের ডান পাশে এসে বসে। ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলে,
-‘কারণ আমি পালিয়ে এসেছি। বাড়িতে থাকলে বিয়েটা হয়েই যেতো। আমি পারতাম না নিজের পছন্দের মানুষটাকে ছাড়া ভালো থাকতে। তাই, অবশেষে বাড়ি ছাড়লাম।”

সুখ আৎকে উঠে। পছন্দের মানুষের জন্য তার সই বাড়ি ছেড়েছে কিন্তু সেই মানুষটা যে অন্য কারো। কীভাবে মেয়েটাকে চরম সত্য টা জানাবে? ঠিক থাকবে তো মেয়েটা? কিন্তু না জানিও যে উপায় নেই। আর যা’ই হোক,মেঘ তার স্বামী। মনের সম্মতিতেই হোক বা অসম্মতিতে,মেঘ যে তার জনম জনমের সঙ্গী হয়ে গেছে। আজ নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে সুখের। কারণ একমাত্র তার বিয়ের কথাটা না জানানোর জন্যই আজ এ অবস্থা।

সুখের ভাবনার মাঝে হিমা সুখের হাতটা টেনে নেয় আলগোছো। সুখের ভাবনার সুতোয় টান পড়ে। হিমা সুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কন্ঠে বলল,
-“দিবি না, মেঘ ভাইয়া’কে আমায়?”

সুখ অথৈ সাগরে পড়ে যায়। কী উত্তর দিবে? শৈশবের সই নাকি জনম জনমের সঙ্গী’কে বেছে নিবে সে? মন বলল- স্বামী ছাড়া যাবে না, বিবেক বলল- শৈশবের সই এতই তুচ্ছ তবে?

মন আর বিবেকের তুমুল যুদ্ধে বিবেকের কথাটা গাঢ়ো ভাবে মস্তিষ্কে দাঁগ কাটিয়ে মনকে জিতিয়ে দিয়ে বলল,
-“প্রেমিক’কে হস্তান্তর করা যায় হয়তো কোনো কিছুর বিনিময়ে কিন্তু স্বামী, স্বামী’কে পুরো সাতজন্ম না হওয়া অব্দি ছাড়া যায় না। তোর মেঘ ভাইয়া আমার সাত জন্মের সঙ্গী রে হিমা। সাত জন্ম পরে না’হয় তুই নিস।”

কথাটা বলার পর মাথা নিচু করে রাখে সুখ। একটা বিস্ফোরণ হবে যে এখানে সেটা তার মন বলছে। নিজেকে প্রস্তুত করছে সেই মোতাবেক। এক দুই তিন করে সেকেন্ডের কাটা’টা ঘুরে মিনিটে পৌঁছালো কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্যি যে হিমার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না।

সুখ অপরাধী কন্ঠে বলল,
-“আমি দুঃখীত হিমা, তোদের কাছ থেকে সত্যি’টা লুকানো কখনো উচিৎ হয় নি। আমি ভেবেছিলাম আগে বিয়ে নামক বন্ধনটাকে গুছিয়ে নেই নিজের মাঝে তারপর সবাইকে জানাবো। কিন্তু, তোর যে উনার প্রতি দুর্বলতার বিশাল পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে তা তো বুঝি নি রে।”

হিমা তবুও কোনো কথা বললো না। সুখ ভাবে হয়তো মেয়েটা মানতে পারে নি এই অপ্রত্যাশিত সত্যি টা। কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে হিমা সেই ভেবে সুখের গলা শুখায়। হিমা কী কান্না করবে? তার সাথে আর কথা বলবে না?

সুখের ভাবনার মাঝে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো হিমা। সুখ হতবাক, সে ভেবেছিল তুমুল রাগে হয়তো ফেটে পরবে হিমা কিন্তু হলো তার বিপরীত? মেয়েটা কী পাগল হয়ে গেলো?

সুখ অবাক কন্ঠে বলল,
-“পাগল হলি হিমা? হাসছিস কেন? আমি সত্যি বলছি মেঘের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।”

-“বিয়ে না হলে বুঝি দিয়ে দিতিস? মানলাম প্রেমিক হস্তান্তর করা যায় তাই বলে মনের কোণে যার জন্য মিষ্টি প্রেমময় অনুভূতির জন্ম হয় তাকেও দিয়ে দেওয়া যায়? সব থেকে বড় কথা, একজন মানুষ কী কখনোই হস্তান্তরযোগ্য?”

সুখের এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। আসলেই তো,মানুষ’কে কী কখনো দেওয়া যায়! কিন্তু তাই বলে হিমা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না? অন্তত অবাক তো হওয়া উচিত ছিলো। সুখ বিষ্ময়মাখা কন্ঠে বলল,
-“তুই কোনো রিয়েক্ট করলি না কেনো হিমা? তোর অন্তত অবাক তো হওয়ার কথা ছিলো।”

-“যে জিনিস জানি আগেই, সেটাতে অবাক হবো কেন?”

যেখানে অবাক হওয়ার কথা হিমার ছিলো,সেখানে সুখ অবাক হলো। বিষ্ময়মাখা কন্ঠে বলল,
-”মানে! আগেই জানতি মানে? কীভাবে জানলি? আমি তো বলি নি। তাহলে?”

হিমা চুপ রয় কিছুকাল তারপর হেসে বলে,
-“মেঘ ভাইয়া’ই বলেছিলো,বোধহয়। বাদ দে ও কথা, আগে বল তুই কেন আমাদের জানালি না এটা? তোর বিয়েতে নাহয় একটু বিরিয়ানি’ই খেতাম তাই বলে দাওয়াত দিলি না! ছিহ্ সুখ, এত কিপ্টা হলি কীভাবে?”

সুখ হিমার এহেন আচরণে অবাক। কাল সকালেই তো এ মেয়েটা কেঁদে কেটে যেভাবে বলল মেঘকে তার প্রয়োজন এক মুহূর্তের জন্য সত্যিই মনে হয়েছিলো মেঘ’কে ছাড়া মেয়েটা বাঁচবে না কিন্তু এখনের ভাবভঙ্গি পুরো উল্টো?

সুখ হতবাক হয়ে বলল,
-‘তার মানে তুই সব’টা জানতি? তাহলে কাল সকালে যে কান্নাকাটি করলি সেটা?’

-‘ওটা তো কেবল তোকে বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য। দেখলাম আমার বান্ধবী কী করে। ওমা, এখন দেখি বান্ধবী তার উনার প্রতি একদম চিৎপটাং। একটু ভাগ দিবে না বান্ধবীদের।’

-‘তুই বলতে চাচ্ছিস কালকের চোখের জল মিথ্যে ছিলো? এটা কেমন মজা হলো? আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। এমন মজা কেউ করে?’

-‘হিমা করে।’

কথা’টা বলে খিলখিল করে হেসে দিলো হিমা। সুখের বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেলো যেনো। এমন মজা কেউ করে? আর একটু হলে সে দ্বিধার সমুদ্রে ডুব মারতো। তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই সুখ বলে উঠলো,
-‘কিন্তু কাল যে বললি তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে? সেটাও মিথ্যে? একটু আগের বলা সবই মিথ্যে?’
-‘সব মিথ্যা না। বিয়ে ঠিক হয়েছে এটা সত্যিই আর বাকি গুলো একদম ডাহা অভিনয়। বাহ্ কি সুন্দর অভিনয় জানি আমি।’

সুখ বান্ধবীর বাহুতে একটা চড় লাগায়। মেয়েটা বুঝি একটু সিরিয়াস হতে পারবে না? হঠাৎ রুমে দু’জন মানুষের আবির্ভাব ঘটে। একজন মেঘ কিন্তু মেঘের পাশেরজনকে দেখে সুখ হা হয়ে গেলো। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। অবিশ্বাস্যকর ভঙ্গিতে বলল,
-‘ইউসুফ ভাই,আপনি! এত সকালে আপনি এখানে? আমি কী এসব স্বপ্ন দেখছি?’

-‘আর কী করবো বলেন ভাবী? আপনার এমন উদ্ভট বান্ধবী’র জন্য সারা রাত গাড়ি চালিয়ে আসতে হলো।’

হিমা তেড়ে গেলো। ঝগড়ুটে ভাবে বলল,
-‘এই এই কী বললেন আপনি? আমি ঝগরুটে? আমি!’

সুখের জেনো কিছু বোধগম্য হলো না। কপাল কুঁচকে বলল,
-‘একটু সব খুলে বলবে কেউ! কি হচ্ছে কিছুই বুজছি না। হিমা’কে আপনি নিয়ে আসছেন? কিন্তু কেনো?’

হিমা এগিয়ে আসলো, সইয়ের বাহু জড়িয়ে বলল,
-‘আরে মোর সুখ পাখি, আমি বলছি তোকে সব। আসলে কাল তোর সাথে রাস্তায় দেখা হলো না? আমি তখন বাড়ি ছেড়ে চলে এসে ছিলাম। বিয়ে করবো না বলে রাগারাগি করেছি। ভেবেছিলাম অনুর বাড়িতে থাকবো। তা’ই করলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো অনুর বাড়ি আমার পরিবার চিনবে তাই তাড়াতাড়ি তোদের বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে মনে পড়লো তুই তো তোর শ্বশুর বাড়ি চলে এসেছিস। তারপর ভাবলাম সিলেট মামার বাড়ি যাবো। মামার বাড়ির সাথে আমাদের বাড়ির তেমন সম্পর্ক নেই তাই বাড়ির মানুষ জানতেও পারবে না আর আমিও আরামে ক’দিন কাটাতে পারবো। কিন্তু তখনই মনে হলো তোকে উল্টোপাল্টা কত কিছু বলেছি, তা মনে করে যদি সংসারে অশান্তি হয়। তাই অত রাতে তোর ক্যাবলা মার্কা ইউসুফ ভাইকে হাতে পায়ে ধরে সারা রাতে জার্নি করে এখানে এলাম।’

সুখ বড় এক নিঃশ্বাস ফেলল। যাক,সবটাই মজা ছিলো। সইও রইল স্বামীও রইল। সুখ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-‘চল নাস্তা তো করিস নি, আয় আগে খেয়ে নে।’

-‘না না ভাবী, আমরা নাস্তা করেছি। এখন আপনার বান্ধবী’কে বাস স্ট্যান্ড অব্দি পৌঁছে দিয়ে আমি আবার যশোর চলে যাবো। স্যার নেই ওখানে,আমাকে’ই তো সামলাতে হবে।’

সুখ কপাল কুঁচকে বলে,
-‘চলে যাবে মানে? হিমা আজ কোথাও যাবে না। সারা রাত ঘুম নেই। আপনিও কোথাও যাবেন না। আজ নো যাওয়া। মেঘ আপনি কিছু বলেন।’

মেঘ এতক্ষণ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলো,সুখের কথায় ঠোঁট উল্টে বলল,
-‘ঘরণী যা বলে, কর্তার তাতেই সম্মতি।’

ইউসুফ আর হিমা হেসে দেয় মেঘের কথায়। সুখ মেঘের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে হেসে দেয়। তারপর বেশ খানিকক্ষণ হ্যাঁ না করে অবশেষে সুখ পরাজিত হলো। গেইট অব্দি এগিয়ে দিলো হিমা আর ইউসুফ’কে। এর মাঝে মসৃন’কে অবশ্য হিমা দেখে নি। এতে বাঁচা গেছে নাহয় আরেক ঝামেলা হতো। হিমা গাড়ির জানালা দিয়ে ছোট্ট মুখটি বের করে উচ্চস্বরে বলল,
-‘সুখপাখি, আমরাও কিন্তু সাত জন্মের সই। কেবল স্বামী না,সইও সাতজন্মের হয়। প্রতিজন্মে তোকে চাই আমার সুখপাখি। আমরা সাত জন্মের সই।’

সুখ কেবল মুচকি হাসলো। ইউসুফদের গাড়ি চলতে শুরু করলো। মেঘের ফোন আসাতে মেঘ ফোন ধরে একটু সাইডে চলে গেলো। সুখের নজর গেলো গাছের আড়ালে,বাড়ির পিছনের কুঠির’টার দিকে। মেঘও অন্য ধ্যানে ব্যস্ত।এখনই মোক্ষম সময় ও ঘরটা দেখে আসার। যেমন ভাবনা তেমন কাজ।

ইউসুফের গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গাড়ির মাঝে দু’জন মানব মানবী নিরব। গাড়ি নিজের গন্তব্য এসে পৌঁছালো। ইউসুফ চাইলে সিলেট অব্দি পৌঁছে দিতে পারতো হিমা’কে কিন্তু যেহেতু গন্তব্য আলাদা, শেষ অব্দি আলাদা দু পথে পা বাড়াতে হবে দু’জনকে সেহেতু আগে থেকেই মায়া বাড়ানোর আগে বিচ্ছেদ আসুক।

বাস স্ট্যান্ড অব্দি আসতেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো হিমা। ইউসুফ শীতল স্বরে বলল,
-‘ধন্যবাদ হৈমন্তিকা। ভাবী আর স্যার এর নতুন পথ চলা’টা বিবর্ণ না করে রঙিন করার জন্য।’

-‘ধন্যবাদ তো আপনার প্রাপ্য ক্যাবলাকান্ত। যদি কাল সুখের বিয়ের কথাটা না জানাতেন তাহলে নিজের অজান্তেই সইয়ের সুখের কাটা হতাম। তবে,আপনার মনে হয়েছিলো আমি নাটকের খলনায়িকাদের মতন করবো এসব জানার পর? আমি সই,সাতজন্মের সই।’

-‘তাহলে আমিও চাই প্রতি জন্মে আমার সাথে আপনার দেখা হোক।’

হিমার হাসি’টা চওড়া হলো। মাথা কাত করলো। তারপর যেতে যেতে বলল,
-‘অমন কথা বলবেন না ক্যাবলাকান্ত। প্রতিবার যদি নিয়তি এক হয় তবে প্রতিবারই আমরা দুজন দু’পৃথিবীর মানুষের গন্তব্য একটা’ই হবে। অপ্রাপ্তির দহন।’

হিমা চলে যাচ্ছে, আবার দেখা হবে কিনা জানা নেই। ইউসুফের বুকের বা’পাশে তুমুল ব্যাথা শুরু হলো। কেউ জানবে না এক লুকায়িত অপ্রাপ্তির কাহিনী। কাল যখন মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল মেঘকে ভালোবাসে সে, তখন ইউসুফের যে কী রক্তক্ষরণ হলো হৃদয় মাঝে কারণ সেও যে ভালোবেসে ফেলেছিলো এই উড়ন্ত, ছুটন্ত হৈমন্তিকা’কে। তখন মেঘের বিয়ের কথা থেকে শুরু করে নিজের হৃদয়ের কথা’টাও জানালো। মেয়েটা যে এক রাতের মাঝে সামলে উঠবে ভাবতে পারে নি সে। সে হয়তো পাবে না তার মানুষটা’কে। থাক না কিছু অপ্রাপ্তি, ভীষণ গোপনে। ভালোবাসি হৈমন্তিকা, ভীষণ ভালোবাসি।

হিমা জানালার পাশে সিট টাতে বসে বাহিরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই দেখলো একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। হিমা মুচকি হাসলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
-‘আবার আপনাদের শহরে আসা হবে না হয়তো মেঘ সাহেব। খুব গোপনে সবার আড়ালে বলছি, ভালোবাসি মেঘ সাহেব, ভালোবাসি। ক্যাবলাকান্ত,আপনিও ভালো থাকেন। তবে বড্ড ভালো মানুষেরা বোধহয় কম’ই ভালো থাকে। আপনিও আজ থেকে তার দলের। আমিও পুড়বো কারো অনীহায়। আপনিও পুড়েন।’

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here