সুখের_অ-সুখ-২২,২৩

#সুখের_অ-সুখ-২২,২৩
#মম_সাহা
পর্বঃ বাইশ

দরজার সামনে নিজের সহধর্মিণী’কে দেখে ভীষণ বাজে ভাবে চমকে যায় লিয়াকত আলী অর্থাৎ রেদোয়ানের বাবা। চমকে যাওয়া কণ্ঠে ক্ষানিকটা বিষ্ময় মাখিয়ে বলে,
-‘লিলুয়া,তুমি এখানে!’

লিলুয়া নামের রমনী উত্তর দেয় না। কিছুটা সময় মৌণ কাটায়। লিয়াকত আলী পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের বিন্দু বিন্দু ঘাম টা মুছেন কম্পমান হস্তে। বহু পুরোনো ধূলোমাখা অতীত আকষ্মিক বের হয়ে আসতে পারার ভয়ে ক্ষানিকটা কেঁপে উঠে সে।

সুখ হাসে, ভীষণ প্রকাশ্যে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলায় ঠোঁটের কোণে। তাচ্ছিল্য মাখা কণ্ঠে বলে,
-‘ভয় হচ্ছে ফুপা? বড্ড ভয়? কী করেছিলেন ফুপা আমার মায়ের সাথে? বেঁচে আছে মানুষটা!

লিয়াকত আলী সুখের প্রশ্নের উত্তর দেন না বরং স্ত্রী’র পানে তাকিয়ে জোড় করে একটু হাসার চেষ্টা করে বললো,
-‘দেখেছে লিলু! মেয়াটা পাগল হয়েছে বোধহয়, কী যা তা বলেছে।’
-‘খুব কী ভুল বলছি ফুপা? আমার মায়ের ডায়েরি’তে সে ভীষণ যত্নে তার অভিযোগ গুলো লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলো, তা কী মিথ্যে ছিলো?’

সুখের জেরা করার ভঙ্গিতে লিয়াকত আলী বুঝলেন যে ছাড় পাবেন না। সে আবার আগের ন্যায় সোফায় বসে পড়লেন। সুখ এগিয়ে গিয়ে লিলুয়াকেও সবার মাঝখানে নিয়ে আসলো। লীলাবতী সুখের দিকে এগিয়ে আসলো, প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-‘কী বলছো আপা? বড় মা তবে পালিয়ে যায় নি?’
-‘না রে লীলা।’
-‘তবে? তুমি কীভাবে জানলে এই চির লুকায়িত রহস্যের খোঁজ?’

সুখ ছোট্ট শ্বাস ফেলে। তার চোখ ভেঙে অশ্রুকণা বাহিরে আসার তীব্র ইচ্ছে জাগায় কিন্তু সে সামলে নেয় নিজেকে। অনেক তো কাঁদিয়েছে জীবন তাকে আজ সব কিছু সুদে আসলে ফেরত নেওয়ার পালা। কেনো তার জীবনটাই সুখহীনতায় কাটাবে? যেহেতু এতটা বিসর্জনের পরও জীবন তার প্রতি নরম হয় নি তবে এবার তার শক্ত হওয়ার পালা। কিছু জিনিস ছিনিয়ে নিতে হয়। দাদীজান একটা কথা বলো, “মেয়ে হয়েছো বলে তুমি সব মেনেই নিবে মানিয়েই নিবে তা তো হতে পারে না,মেয়ে হয়েছে বলে কী বাঁচার শখ জাগে না! বাঁচার জন্য কখনো কখনো স্রোতের বিপরীতে গাঁ ভাসানোই উচিৎ।” আজ দাদীজানের কথা’টা ফলানোর দিন। অনেক তো হলো মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া।

সুখ একটা চিঠি, রুমাল আর ডায়েরি ছোট্ট টেবিলটার উপর রাখলো। লীলাবতী’র দিকে তাকিয়ে বললো,
-‘মনে আছে লীলা, প্রায় মাস খানেক আগে লাইব্রেরী’র রুমে একটা চিঠি পেয়েছিলাম! সে কার লিখা জানিস?’
-‘না তো আপা। আমাদের বাড়ির কারো লিখা তো ছিলো না।’

সুখ রুমালটা উঠায়, লীলাবতী’র সামনে রুমালে সুক্ষ্ম লিখা গুলো মেলে ধরে বলে,
-‘দেখতো এ লিখা গুলো চিনিস কী না?’

লীলাবতী কতক্ষণ লিখা গুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে তড়িৎ বেগে মাথা নাড়িয়ে বিষ্মিত কণ্ঠে বলে,
-‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আপা, এই লিখা গুলো আমি চিনি। লাইব্রেরী’র রুমে পাওয়া চিঠির লিখা আর এগুলো প্রায় এক। প্রায় বললে ভুল হবে, পুরো একরকম। কার লিখা আপা এগুলো?’
-‘আমার মায়ের।’

লীলাবতী অবাক নয়নে তাকায় সুখের দিকে, দু’কদম পিছিয়ে যায় যেনো। নিজের ভিতরে উত্তেজনা চাপিয়ে না রেখে সে তৎক্ষনাৎ সেটা প্রকাশ করে বলে,
-‘ছেলেদের প্রতি এমন তীব্র ধিক্কার মাখানো চিঠিটা তবে বড় মায়ের ছিলো! কিন্তু আব্বু তো এমন মানুষ ছিলেন না। তবে! ধিক্কারটা কার প্রতি ছিলো?’

-‘আব্বু বাদেও পৃথিবীতে অনেক নরপশু আছে। তাদের’কেই বলেছে আম্মু। আর দুর্ভাগ্যবশত এমন মানুষ আমাদের পরিবারেই উপস্থিত ছিলো। যা আমার মা বুঝতে পেরেছিলো যার দরুন সে এখন চরিত্রহীনার ট্যাগ লাগিয়ে উধাও হওয়া মানবী। আদৌও সে চরিত্রহীনা ছিলো কিনা কেউ জানার চেষ্টাও করলো না রে লীলা। আসলে নারী জাতদের সমাজে এই অবস্থানই, কোনো কিছু না করলেও তারা দোষী। নারীর হাজারটা ভালো কাজ তারা এক নিমিষে ভুলে যায় যখন সামান্য মশলা মাখানো খারাপের আভাস পায়। যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনও বোধ করে না।’

এবার লিলুয়া মুখ খুললো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
-‘কুহেলিকা মানে সুখের মায়ের সাথে বড্ড অন্যায় হয়েছে, আর সে অন্যায় কত বছর আগে আমার স্বামী করেছিলো। আমি সবটা জেনে বুঝেও চুপ ছিলাম যার ফলস্বরূপ আমিও অন্যায়ের অংশীদার হয়ে গেছি।’

লিয়াকত আলী সবাই কিছু বুঝার আগেই তার সাথে থাকা পিতলের ফুলদানি’টা উঠিয়ে লিলুয়ার দিকে ছুঁড়ে মারলো। আর দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ফুলদানী’টা লিলুয়ার কপালে ছিটকে পড়ে। ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে ভয়ংকর রক্ত সাথে লিলুয়ার ব্যাথাময় আর্তনাদ। লিয়াকত আলী ফুঁসে ওঠে বলে,
-‘সেদিন তোকেও পুঁতে ফেলা উচিৎ ছিলো। তাহলে আর তুই আমার কাল হয় দাঁড়াতি না।’

লিলুয়ার মাথায় রক্তের জোয়ার দেখে সুখ এগিয়ে যেতেই লিলুয়া থামিয়ে দেয় তাকে,কপালে হাত দিয়ে রক্ত টা মুছে নেয়। তবুও রক্ত টপ টপ করে পড়ছে। লিলুয়া স্বামীর দিকে এগিয়ে যায়,সবাই’কে অবাক করে দিয়ে তার নরম হাতের শক্ত চড় লাগায় স্বামীর গালে। সবাই রীতিমতো হতবাক। সবসময় লিলুয়া স্বামী প্রীতি দেখাতো এবং তা অতিরিক্তই ছিলো। আর আজ! এমনকি লিয়াকত আলীও লিলুয়ার এহেন আচরণে অবাক।

লিলুয়া তার স্বামীর বা’গালে আরেকটা চড় দিয়ে উচ্চস্বরে ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
-‘এই চড় গুলো যদি অনেক বছর আগে দিতাম তাহলে হয়তো আজ কুহেলিকা এখানে থাকতো। সবার জীবন ধারা থাকতো অন্যরকম। সুখের জীবনটাও অন্য ধারায় বইতো। তুমি এখন অস্বীকার করো সবটা! এত বড় কলিজা যে এত বড় মিথ্যা টা অস্বীকার করো? তোমার সব সত্যি’র প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি। আমার সামনে অন্তত বুক কাঁপা উচিৎ ছিলো তোমার। তুমি কুহেলিকা ভাবী’রে অসম্মান করো নি? ভাইয়ার মনে কুহেলিকা’র নামে সন্দেহ প্রবেশ করাও নি? ওদের সংসারে আগুন লাগাও নি? পবিত্র মানুষটা আজও চরিত্রহীনা নামে আখ্যায়িত হচ্ছে কেবল তোমার জন্য। মানুষটাকে তো তুমিই বাঁচতে দিলে না।’

পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। সবার মুখে যেনো কুলুপ এঁটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শুনলে প্রতিক্রিয়া তো এমনই হওয়া উচিৎ।

লিয়াকত আলী এবার সোফার হ্যান্ডেল ধরে বসে পড়লেন। আজ তার স্ত্রী’র পরিবর্তন তার গালে যেনো হাজার চড় ফেলেছে। মাথা নত করে সে বললো,

-‘হ্যাঁ হ্যাঁ সব আমিই করেছি। আমি করেছি সব। কি করতাম আমি! কুহেলিকা’র প্রতি আমার আকর্ষণ কাজ করতো। কিন্তু যখন তাকে সেটা জানালাম অনেক সুখে থাকার অঙ্গীকার দিলাম সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আমাকে ভয় দেখালো সে সব আজাদ শেখ মানে সুখের বাবা’কে বলে দিবে। আমার এত মান সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যাবে ভেবে আমি ভয়ে ছিলাম। লিলুয়া কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলো। কিন্তু ততদিনে কুহেলিকা’র রূপ যৌবন আমার সর্বনাশ করে ফেলেছে। তাকে আমার একটুর জন্য হলেও প্রয়োজন এমন একটা রাগ মাথা চড়ে বসেছিলো। অবশেষে একদিন সবাই যখন পুরো বাড়ি খালি রেখে বিয়ের আয়োজনে গেলো আমি সে সুযোগটার কাজে লাগালাম। নিজের অনেক দিনের মনোবাসনা পূরণ করলাম। মাথায় যখন নিজের করা কাপুরুষতা’র কথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ততক্ষণে অনেক দেড়ি হয়ে গিয়ছিলো। ছোট্ট সুখ তখন খাটে চিৎকার করছে। কুহেলিকা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে ছিলো। লিলুয়াও সে মুহূর্তে সেখানে হাজির হয়, এটা দেখে ফেলে। তাকে আমি ভয় দেখিয়ে আরেকটা রুমে আটকিয়ে রাখি। বলেছি সে যদি এটা কাউকে জানায় তবে রেদোয়ান’কে আমি মেরে ফেলবো। লিলুয়া ততক্ষণে ভয়ে মূর্ছে যায়। আমি কী করবো ভেবে না পেয়ে, মেরে ফেলি কুহেলিকা’কে। তারপর আলমারি থেকে তার কিছু স্বর্ণ গয়না বের করে তাকে সহ একটা বস্তায় ভরে পুঁতে রাখি তোমাদেরই বাড়ির পিছের জায়গাটাতে। কারণ সেখানটা তখন আরও জঙ্গলের মতন ছিলো। লিলুয়া’কে নিয়ে চলে যাই নিজের বাড়ি। লিলুয়া নিজের ছেলের ভয়ে মুখ খুলে নি। অতঃপর কুহেলিকা’কে পাওয়া যাচ্ছে না জানাজানি হলে আমিই প্রথম তুলি যে সে আরেকজনের সাথে পালিয়েছে। যেহেতু আজাদের মনে আগেই সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম সেহেতু আজাদও ধীরে ধীরে এটা বিশ্বাস করে। আর এভাবে পৃথিবী থেকে আমি লুকিয়ে ফেলি আরও একটা সত্যি।’

-‘আদৌও সত্যি লুকাতে পেরেছেন মি.লিয়াকত!’

গম্ভীর আর ভরাট পুরুষালী কণ্ঠে লিয়াকত সেখানে ফিরে তাকায়। কণ্ঠটা মেঘের ছিলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেঘ, ইউসুফ এবং কিছু সংখ্যক পুলিশ।

লিয়াকত দাঁড়িয়ে যায়। সুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে বললো,
-‘তুমি তবে আমাকে ফাঁসিয়ে দিলে?’

সুখ ততক্ষণে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
-‘আমি আপনাকে ফাঁসিয়েছি? আপনি চিরতরের জন্য সুখের জীবনে অ-সুখে ডুবিয়েছেন সেটা? আজ আমি সন্দেহের বশে মায়ের এতদিন যাবত বন্ধ থাকা রুমটা খুলে অনেক ঘেটে খাটের নিচে ট্রাঙ্ক থেকে এই ডায়েরি’টা ভাগ্যিস খুঁজে পেয়েছিলাম। তাই তো আমার মা নামক অভাগীনির কলঙ্কের দাঁগ একটু মোচন করতে পারলাম। তার ডায়েরিতে ধোঁয়াশা না রেখে ভাগ্যিস লিখেছিলো লিয়াকত নামক পুরুষে আজকাল তার বড্ড ভয় হচ্ছে। ভাগ্যিস, এত বছর পর আমার ফুপি’র আমার জন্য মন গললো, তার পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য সব স্বীকার করলো নাহয় সারাজীবন চরিত্রহীনা’র মেয়ে শুনেই মরতে হতো।’

লিলুয়া চুপ রইলো। মেঘ সুখের পাশে এসে দাঁড়ালো। সুখের হাত পা ভীষণ কাঁপছে। ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি বোধহয় ফুরিয়েছে। মেঘ শক্ত হাতে সুখ’কে আগলে ধরে। সুখ অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। তার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে লুটিয়ে পড়ে মেঘের বাহু বন্ধনে। মেঘের শার্টের এক কোণা আকড়ে ধরে বলল,
-“পুরুষের আকর্ষণ বুঝি এতই খারাপ! নারীদের বুঝি সুন্দর ভাবে বাঁচার অধিকার নেই?”

#চলবে

#সুখের_অ-সুখ
#মম_সাহা

পর্বঃ তেইশ

সুখ পাগলের মতন কান্না করছে, মায়ের মৃত্যু রেশ যেনো তাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মা’কে নতুন করে একটু দেখা আর ছোঁয়ার ইচ্ছায় মরুভূমি হচ্ছে হৃদয় জমিন। জ্ঞান ফেরার পর প্রায় ঘন্টাখানেক সে চিৎকার করেই কেঁদেছে। ভীষণ কান্না যাকে বলে, দমবন্ধকর কান্নার দাপটে নড়ে উঠেছে পরিবারের প্রতিটা সদস্য। অবশেষে কাটখোট্টা’র ন্যায় সানজিদা বেগমের কঠোরতার দেয়াল ভাঙলো। সুখের কাছে এসে পরম মমতার আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিলো তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে রাজ্যের স্নেহ ঢেলে দিয়ে বললো,
-‘আমি কখনোই তোমার মা হতে পারি নি। সত্যি বলতে আমি মা কিংবা স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা রাখি নি। আমি আদৌ মানুষ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ। তবুও আমি তোমায় বলছি, পৃথিবীতে ভালো মানুষ খুব অল্প সময়ই বেঁচে থাকে। তোমার মায়ের চলে যাওয়াটা হয়তো নির্মম ছিলো,কিন্তু বিশ্বাস করো সে আজও আমাদের আশেপাশে আছে। অনুভব করলেই তুমি বুঝবে তোমার মা কত গোপনে লুকিয়ে আছে তোমার হৃদয় মাঝে। মায়েরা কখনো মরে না।’

সুখ থামে না, বরং এ কথা গুলো তার কান্নার পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেয়। এই জীবনে এত কান্না সে কখনো কাঁদে নি। আজ কাঁদছে। মা’কে সে কখনো দেখে নি কিন্তু তবুও কাঁদছে। মায়ের সাথে সন্তানের টান যে এখানেই।

চারপাশে আঁধার করে ভীষণ বাতাস, ধুলোবালি উড়ছে। বিকেল বেলা’টা যেনো গভীর রাতে রূপান্তরিত হলো। সুখ আচমকা খাট থেকে নেমেই ছুট লাগালো। হঠাৎ এমন কান্ডে হতভম্ব সবাই। তৎক্ষণাৎ তার পিছু ছুট লাগালো সবাই। মেয়েটা না আবার কিছু করে বসে ভেবে বুক কাঁপলো মেঘের।

বাড়ির পিছন দিকে এসে একটু থমকালো সুখ। ফুপা মা’কে ঠিক কোথায় পুঁতে ছিলো ভেবে পায় না সে। দিক বেদিক দিশেহারা’র মতন খুঁজে গাছের আড়াল থেকে কোদাল টা তুলে নিলো। বাতাস,ধুলোবালিতে প্রায় জবুথবু হলো কিন্তু থামালো না মাটির উপর কোদালের কোপ। কখনো এখানে একটু গর্ত খুঁড়ছে, কখনো ওখানে।

মেঘ দ্রুত এসে সুখের হাত ধরলো। বোঝানোর চেষ্টা করে বললো,
-‘পাগল হলেন অপরিচিতা! কী করছেন এগুলো?’

-‘আমার মা’কে আমি একটু দেখবো মেঘ সাহেব। আমি একটু ছোঁব তাকে। এই, এই মাটির নিচেই তো তাকে রেখেছিলো। আমি খুঁজে বের করবো। মা নামক স্বর্গের স্বাদ আমি নিবো। ঐ সৃষ্টিকর্তা বড্ড নিষ্ঠুর মেঘ সাহেব। বড্ড নিষ্ঠুর। সে আমায় বাঁচার কারণ কেড়ে নিয়েছে অথচ মৃত্যু দেয় নি।’

-‘আপনার মা’কে এখানে মাটি দেওয়া হয়েছে প্রায় একুশ বছর আগে। এতদিনও সে এখানে থাকবে? হাড় গুলোও বোধহয় মিশে গেছে।’

-‘ না, নাহ্। মোটেও এমন কথা মুখে আনবেন না। আমি মা’কে দেখবো। আমি জানি আমার মা এখানেই আছে। আমি খুঁজবো।’

সুখের পাগলামি ততক্ষণে আকাশ ছুঁয়েছে। সে কারো কথা শুনছে না। পাগলের মতন এখানে ওখানে গর্ত করছে। হঠাৎ একটা গর্ত করার সময় কোদালের সাথে জেনো কিছু একটা সংঘর্ষ হলো। সুখ অবাক হলো, আবার কোপ দিতেই শব্দটা দ্বিগুণ হলো। এবার বাকি সদস্য রাও হতভম্ব। মেঘ সুখের বাহু ধরে একটু দূরে নিয়ে স্বান্তনার স্বরে বললো,
-‘আপনি দাঁড়ান, আমি দেখছি। আমি খুঁজছি।’

সুখ শান্ত হলো। মনের কোণে যুক্তিহীন ক্ষীণ আশা জেগে উঠলো। মেঘ মাটি খুঁড়তে যাওয়ার আগেই ইউসুফ সেখানে চলে যায়। আশ্বাসের স্বরে বললো,
-‘আপনি ভাবী’কে ধরে দাঁড়ান আমি দেখছি।’

মেঘ মাথা নাড়িয়ে সুখ’কে ধরে দাঁড়ালো। এবার সুখ না, উপস্থিত সবার মাঝে ভীষণ অনাকাঙ্খিত কৌতূহল জেগে উঠলো। ইউসুফ মাটি টা একটু ভালো করে সরাতেই একটা বড় ধারালো রামদা চোখে পড়লো। ইউসুফ কী ভেবে পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে রামদা’টা মাটি থেকে তুললো। রামদা’টাই এখনো কালো হয়ে কিছু একটা লেগে আছে। খুব সম্ভবত রক্ত।

সবাই আৎকে উঠলো। দু’পা পিছিয়ে গেলো উত্তেজনায়। কেবল একজনের উত্তেজনা জাগে নি, জেগেছে ভয়। এবার বুঝি তার সত্যিও বেড়িয়ে আসবে! পাপ যে বাপকেও ছাড়ে না।

রামদা’টা দেখেই সবাই আন্দাজ করতে পেরেছে এটা দ্বারা কি কাজ করা হয়েছে। সানজিদা বেগম দ্রুত পুলিশ অফিসার’কে কল লাগায়। সুখ চুপ করে রয়। আবারও নতুন ঝড় আসবে। টিকে থাকতে পারবে তো সে! নাকি নতুন ভাবে ভেঙে গুড়িয়ে যাবে সে! সুখের জীবন তবে এমন অ-সুখে’ই কাটবে!

——

গতকালকের দিনটা খুবই বিশ্রী ছিলো। তবে,আজ শুভ্র রাঙা রোদ উঠেছে। সুখ বেশ স্বাভাবিক। নিজের স্বামীর বাড়ি ফিরে এসেছে। ঐ বাড়ি’তে থাকলে তার নাকি দমবদ্ধ মনে হয়। সকাল সকাল উঠে স্বাভাবিক ভাবে সব কাজকর্ম সম্পন্ন করেছে। বিকেলে আবার ঐ বাড়িতে যেতে হবে রামদা’র রহস্য জানার জন্য। পুলিশ অফিসার আজকে সবাই’কে থাকতে বলেছে।

ঘামে চুপ চুপ শরীরটা’কে বিশ্রাম দিতে চলে যায় স্নানাগারে। দীর্ঘ এক স্নানের পর রুমে আসতেই ড্রয়িং রুম থেকে কথার শব্দ ভেসে আসলো। মিনা’র, ছোটমা’র,ইউসুফ এমনকি মেঘের কথা’র শব্দও ভেসে আসছে। সুখ অবাক হয়। এত তাড়াতাড়ি বাড়ি আসার কথা তো মেঘের ছিলো না, তবে!

দ্রত পায়ে এগিয়ে যায় ড্রয়িং রুমের দিকে। বেশ কথা কাটাকাটি হচ্ছে মেঘ ও ছোট মায়ের মাঝে। সুখ সেখানে উপস্থিত হতে মেঘ অভিযোগে’র স্বরে বললো,
-‘দেখেন না অপরিচিতা, ছোট মা নাকি এ বাড়িতে আর থাকবে না। সে নাকি কোনো এতিমখানায় থাকবে।’

সুখ কিছু বলতে উদ্যোত হতেই রুমি বেগম তাকে থামিয়ে দেয়, শীতল কণ্ঠে বলে,
-‘না সুখ, আমি স্থির করে নিয়েছি। এ বাড়িতে আমি আর থাকতে পারছি না। আমার খালি ওদের কথা মনে পড়ে। আমি বাকি জীবন’টা কোনো এতিমখানায় কাটিয়ে দিবো। তাদের মাঝে আমি তোদের প্রতিচ্ছবি গড়ব, কাটিয়ে দিবো বাকি কয়েকটা বছর। আর না করিস না।’

সুখ মনে মনে তাচ্ছিল্য হেসে বলে উঠলো,
-‘সে বাচ্চা গুলো নিষ্পাপ। তাদের ভিতর স্বয়ং ফেরেশতা। কিন্তু ছোটমা তোমার ছেলে, সে তো নর্দমার কীট। তার সাথে ওদের মিলাচ্ছো!’

কিন্তু আফসোস! সে কথা গুলো মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারলো না। আটকে গেলো কণ্ঠনালী অব্দি।

বেশ খানিকক্ষণ ইউসুফ, সুখ, মেঘ ভদ্রমহিলা’কে বোঝানোর চেষ্টা করলো কিন্তু সবাই ব্যর্থ। কেবল মিনা চুপ রইলো। রান্নাঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলো থম মেরে। ভুলবশত সে বড় ভুল করে ফেলেছে। এ ভুলের মাশুল না আবার সুখ’কে দিতে হয়।

বেশ বাকবিতন্ডার পর অবশেষে হার মানলো সবাই। রুমি বেগম বিদায় নিলেন চিরতরে। যাওয়ার আগে সুখ’কে ফিসফিস করে বললো,
-‘হঠাৎ করে তুমি আমার গলার কাঁটা হয়ে গেলে। তোমাকে না গিলতে পারছি, না উগড়ে ফেলতে পারছি। তবে,তোমাকে উগড়ে ফেলার করুন ইচ্ছেটা আমার ঠিক নেই। আজ অনুভব করছি, কিছু কাটাঁ থেকে যাওয়া ভালো। ভালো থেকো তোমার সাম্রাজ্যে।’

সুখ বুঝতে পারে নি রুমি বেগমে’র হঠাৎ এহেন তিক্ত কণ্ঠের কারণ। তবে তিক্ততা’র মাঝে বিষাক্ততা ছিলো না। কিন্তু এমনটা বলার কারণ কী!

——–

সুখের শরীর’টা বেশ খারাপ। ভীষণ মন খারাপ আর অসুস্থতা নিয়েও হাজির হয়েছে বাবা’র বাড়ি। দুইদিন আগে বলেছিলো খুনি’র ব্যাপারে জানা যাবে কিন্তু সেদিন বিকেলে খোঁজ আসলো কিছু সমস্যা’র কারণে তারা আসে নি। একবারে পাঁকা পোক্ত প্রমাণ নিয়েই নাকি আসবে। তাদের কাছে এখন যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ আছে।

সুখদের ড্রয়িং রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। মেঘেরও মন ভীষণ খারাপ। ছোটমায়ের চলে যাওয়া’টা সেও মানতে পারে নি।

সুখ বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়, ধীর পায়ে হেঁটে যায় বাবা’র লাইব্রেরীটার দিকে। ধূলোহীন বই গুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখে। কেউ একজন ভীষণ যত্ন নেই রুমটা’র। দেখেই বুঝা যাচ্ছে। খুব ভুল না হলে কাজ’টা লীলাবতী করে। মেয়েটা কেমন বদলে গেলো হঠাৎ করে। যেনো অগ্নি হঠাৎ করে জলে রূপান্তরিত হয়েছে।

হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো সেদিন রাতের মসৃনের সাথে বিরাট কথোপকথন। হ্যাঁ, এবার লীলাবতী’র কাছ থেকে সত্যি টা জানতে হবেই। লীলাবতী’র আড়ালে থাকা সত্যি টা এবার সবার সামনে আসা উচিত।

ইতিমধ্যে বাহির থেকে ভরাট পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে আসছে। অফিসার বোধহয় এসে গেছে। আচমকা সুখের বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠে। আচ্ছা, যদি মানুষটি মেঘ সাহেব হয়!

সুখ দ্রুত পা’য়ে বেড় হতে নিলেই দরজার পাশে থাকা টেবিলের কোণে ধাক্কা খায়। ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে সে। টেবিলে’র উপরে কিনারায় থাকা খোলা ডায়েরিটাই নজর যায় সুখের। পুরোনো হয়েছে বলে মলাট টা খুলে গিয়েছে। বাবার হাতের লিখা সেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে। সুখের ডায়েরির পাতা উল্টিয়ে দেখলো কতরকমের লিখা। খুব যতনে সংসার নাম রণক্ষেত্রের ছোটখাটো বিশ্লেষণ দেওয়া। ডায়েরী’টার ঠিক মাঝামাঝি পৃষ্ঠায় লিখা,
“জীবন যেথায় যেমন চলে,গাঁ ভাসাও তার তালে তালে,
রাজা হতে বিপরীতে যেও, কিন্তু তলিয়ে যেও না অতলে।”

সুখ ডায়েরী টাতে হাত বুলিয়ে খুব যতনে টেবিলের পাশটাতে রেখে ড্রয়িংরুমটাতে এগিয়ে গেলো।

ড্রয়িংরুমে সবাই উপস্থিত হতেই অফিসার বলে উঠলেন,
-‘আপনারা যে রামদা’টা দিয়েছেন, আপনারা পরীক্ষা করার আগেই হয়তো বুজেছেন সেটা দিয়ে কী করা হয়েছে। তবুও বলছি, এটাই সেই অস্ত্র যেটা দিয়ে ভিক্টিম’কে খুন করা হয়েছে।’

সবার ভিতরে চাপা থাকা সন্দেহ টা সত্যি’তে রূপান্তরিত হলো। একজনের তো গলা শুকিয়ে এলো।

সুখ নিরবতা ভেঙে শীতল কণ্ঠে বললো,
-‘খুনটা কে করেছে স্যার?’

-‘খুনটা কে করেছে তা আমরা একটু দ্বিধায় আছি। কারণ অস্ত্র টার মাঝে কারো হতের চিহ্ন ছিলো না। অনেক দিন কেটে গেলে ফিঙ্গার প্রিন্ট না থাকাটাই স্বাভাবিক।’

ড্রয়িং রুমের কোণায় থাকা মানুষ স্বস্তির শ্বাস ফেললো। পরক্ষণেই পুলিশ অফিসার বললো,
-‘তবে!’

সানজিদা বেগম অবাক কণ্ঠে বলে,
-‘তবে কী!’

-‘তবে আমাদের সন্দেহের তালিকায় একজন আছে। খুব বেশিই সম্ভাবনা খুনটা সে করেছে।’

সুখের ছোট চাচা বিষ্মিত কণ্ঠে বললো,
-‘কে সে?’

-‘সে হলো মেঘ।’

সুখ দু’কদম পিছিয়ে যায়। সোফার হ্যান্ডেল ধরে নিজেকে কোনরকম দাঁড় করিয়ে রেখে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
-‘মেঘ সাহেব!’

-‘হ্যাঁ মেঘ। আর যথেষ্ট কারণও আছে এ সন্দেহের। তাই আপাতত মেঘকেই আমরা এরেস্ট করবো।’

সুখ সোফায় বসে পড়ে। যা ভয় পেয়েছিল তবে কী তা-ই হবে! মেঘ সাহেবই তবে এ কাজটা করেছে!

সবার মাঝে যখন হঠাৎ বিস্ফোরণ হলো তখন ড্রয়িং রুমে উপস্থিত থাকা এতক্ষণের ভীত মানুষটা প্রচন্ড সাহসী হয়ে উঠলো। দু’কদম এগিয়ে এসে বললো,
-‘খুনটা আমি করেছি অফিসার।’

এ জেনো নিস্তব্ধ বজ্রপাত। সবার জেনো বিশ্বাসই হচ্ছে না। অথচ অফিসার রহস্যময় বাঁকা হাসি হাসলেন।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here