শেষ_বিকালের_আলো (৮ম পর্ব)

#শেষ_বিকালের_আলো (৮ম পর্ব)

অরণ্য যখন দেখলো অবনী এত রাত হয়ে গেছে তাও বাসায় ফিরছেনা সে তখন বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো।

অরণ্য সারাদিন অনেকবার ফোন করেছে অবনীকে কিন্তু মোবাইল বন্ধ বলছে।প্রথমদিকে মোবাইলে চার্জ নেই এমনটি ভাবলেও এখন আর তা ভাবতে পারছেনা অরণ্য।

অরন্য বুঝতে পেরেছিলো অবনী হয়তো রাগ করেই বাড়ি থেকে চলে গিয়েছে।

আজকের সকালের ঘটনাটার জন্য অরণ্য একেবারেই প্রস্তত ছিলোনা।সাদিয়াটা হুট করেই না বলে কয়ে বাসায় চলে আসলো। এই মেয়েটার জন্যই এত বড় ঝামেলাটা লাগলো।

অরণ্য অবনীকে একটু ধীরেসুস্থে সাদিয়ার কথা জানাতে চেয়েছিলো। যেহেতু সাদিয়াকে এই বাসায় রাখতে হবে তাই একটু সময় নিয়ে অবনীকে বলতে চেয়েছিলো।

কিভাবে বলবে এই করতে করতেই অনেকদিন চলে গেলো।সকালবেলা সাদিয়াকে হঠাৎ বাসায় দেখে অরণ্য এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলো যে অবনী কি ভাবছে সেই দিকে আর খেয়াল করা হয়নি।যখন খেয়াল করলো তখন দেখলো অবনী আর বাচ্চারা কেউ বাসায় নেই।

প্রথমে ভেবেছে ওরা স্কুলে গিয়েছে।যখন বিকাল হয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলো তখন ভাবছে হয়তো শপিংয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন আর কিছু ভাবতে পারছেনা…

অরণ্য কোন মতে রাতটা না ঘুমিয়ে পার করলো। সারাদিনের এত ধকল যাওয়ার পরেও অরণ্যের কোন ভাবেই ঘুম আসলোনা।শেষ কবে অরণ্য নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে অরণ্যের তা মনে পড়েনা।

ফজরের আযান দেয়ার সাথে সাথেই অরণ্য বাসার বাইরে বের হলো। অবনীর ফোনে ট্রাই করতে লাগলো।ফোন সুইচড অফ বলছে।

কোথায় যেতে পারে অবনী! ওদের বাসায় গিয়েছে হয়তো এই ভেবে শ্বশুর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো।কাউকে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়নি।কারণ অরণ্য চাইছেনা এই ব্যাপারটা কেউ বুঝে ফেলুক।

বাইরের আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধুমহলের সবাই জানতো অরণ্য আর অবনীর সুখের সংসার।অরণ্য ভাবতে ভাবতেই হাঁটছে, আসলে কি তাহলে! তাদের কি সুখের সংসার নয়! তারা কি তাহলে সবার সামনে নাটক করে বেড়াচ্ছে। তাদের এই সুখী সংসার কি সোসাল মিডিয়া আর বাইরের জগৎ ঘিরে প্রতিষ্ঠিত!

অবনীদের বাড়ি খুব দূরে নয়। অরণ্য এত সকালে কোন রিকশা না পেয়ে হেঁটেই চলে এসেছে কাছাকাছি।

অবনীদের বাড়িতে এসে কলিংবেল দিতেই অবনীর মা দরজা খুলে দিলেন। এত সকালে অরণ্যকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন!

অরণ্য বাবা এত সকালে তুমি? কোন সমস্যা হয়নিতো আবার! অবনীর মায়ের এমন কথা শুনেই অরণ্য বুঝে ফেলল অবনী এই বাড়িতে আসেনি।

অরণ্য কি বলবে ইতস্তত করছিলো! অবনীর মা বলল,তুমি ঘরে এসে বসো বাবা! এত ঘামছো কেন? কি হয়েছে?

অরণ্য বলে ফেলল,আসলে আম্মা,আমি একটু মর্নিংওয়াকে বের হয়েছিলাম।আপনাদের বাসার কাছে চলে এসেছি তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে একটু দেখা করে যাই।

অবনীর মা অনেক জোরাজোরি করলেও অরণ্য আর বাসার ভেতরে না ঢুকেই কুশল বিনিময় করে চলে আসলো।

অরণ্য এবার লিনসার স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো।সেখানে গিয়ে টিচার্স রুমের দিকে যেতেই লিনসার ক্লাস টিচারের সাথে দেখা হয়ে গেলো।
অরণ্য সালাম দিয়ে কিছু বলার আগেই টিচার জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে ভাই? কোন সমস্যা?

লিনসার গতকাল একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস টেস্ট ছিলো।আসেনি কেন? লিনসা তো কখনও ক্লাস টেস্ট মিস করেনা।

অরণ্য অস্থির হয়ে বলল, আসলে একটু সমস্যা হয়েছে এই বলেই অরণ্য হন্তদন্ত হয়ে টিচারকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ওখান থেকে চলে গেলো।

অরণ্য এবার একটু একটু ভয় পেতে শুরু করেছে।অবনীর আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও যত পরিচিত বন্ধু আছে অরণ্য তার মোবাইল চেক করে করে সবাইকে ফোন দেয়া শুরু করলো।

অরণ্য সবার সাথে এমনভাবে কথা বলল যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে সে অবনীকে খুঁজতে ফোন করেছে।অরণ্যের কাছে সবার নাম্বার নেইও ঠিকঠাক।

ফোন দেয়ার পরে অনেকেই অনেক প্রশ্ন করেছে….
কেউ জিজ্ঞেস করেছে হঠাৎ এতদিন পরে কি মনে করে!
কেউ জিজ্ঞেস করেছে,অবনী আর বাচ্চারা কেমন আছে!
কেউ আবার অরণ্য এর পরিচয় দেয়ার পরে চিনতে পেরেছে!

অনেকেই একটু সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলেও অরণ্য কাউকেই বলল না আসল ব্যাপারটা কি!

অরণ্যের মনের মধ্যে ভয় হঠাৎ ক্ষোভে পরিণত হলো।অবনী কেন এমন করলো! সবার সামনে এবার মুখ দেখাবে কিভাবে সে!

কিন্তু অবনী গেলোটা কই! কোথায় খুঁজবে তাকে! নিজে গেছে তো গেছে সাথে করে মেয়ে দুটোকে নেয়ার কি দরকার ছিলো!

এলোমেলো ভাবতে ভাবতে অরণ্য বাসায় আসলো।মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।অফিসে আর গেলোনা।এসে বিছানায় শুয়ে পরলো।
রাতে একদমই ঘুম হয়নি তাই বিছানায় শুতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলো অরণ্য।

ফোনের শব্দে অরণ্যের ঘুম ভেঙে গেলো। অফিস থেকে ফোন এসেছে। অরণ্য ফোন ধরলো না।প্রচন্ড মাথা আর ঘাড় ব্যথা করছে অরণ্যের। প্রেশার মেবি হাই হয়ে গিয়েছে!

দুপুর হয়ে গিয়েছে।প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে অরণ্যের। বাসায় খাওয়ার মত কি আছে অরণ্য কিচ্ছু জানেনা।

অরণ্য ডাইনিং এ গিয়ে প্রথমে ফ্রীজ খুলল।ফ্রীজে পেস্ট্রি কেক আর ফল দেখতে পেল।অরণ্য কেক আর ফল বের করলো খাওয়ার জন্য।

লিনসা আর লিনিয়া পেস্ট্রি কেক খুব পছন্দ করে।প্রতি সপ্তাহে তাদের বাবার কাছে আবদার থাকতো পেস্ট্রি কেকের।অরণ্য যে কেকটা বের করলো এটা ২ দিন আগের আনা।এখনও কেটে খাওয়া হয়নি।
কেকের উপরে লেখা আছে “For my loving Linsa and Liniya mamoni”

অরণ্য কেকের উপরে সব সময় বিভিন্ন উইশ লিখে নিয়ে আসে।এটা অবশ্য অবনীর বলে দেয়া। এতে নাকি বাচ্চারা খুব খুশি হয়।

অরণ্য কেক কাটতে গিয়েও আর কেটে খেতে পারলোনা।সে হাতে মুখ ঢেকে হু…হু করে কেঁদে ফেলল।

অরণ্য কিছুক্ষণ পর বাসার ছাদে চলে গেলো…কিছুই ভালো লাগছেনা অরণ্যের। ক্ষুধা বোধটাও চলে গিয়েছে এতক্ষণে।

অরণ্য ছাদে এসে ছাউনি দেয়া বেঞ্চির উপরে বসলো।অনেকদিন সময়ের অভাবে ছাদে ওঠা হয়না। গতকাল রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে তাই বাগানটা একদম ফ্রেশ লাগছে।

অরণ্য বসে বসে ভাবতে লাগল…এই বাগানের ম্যাক্সিমাম প্লান ছিলো অবনীর…অরণ্য আর অবনীর তিল তিল করে গড়ে তোলা এই বাগান।

অনেক ব্যস্ততার কারণে অরণ্য এখন ছাদে আসেনা বললেই চলে।অবনীই বাগান দেখাশোনা করতো।এতদিন পর বাগানে এসে তার খুবই ভালো লাগছে…

অরণ্য এক নাগারে বাগানের দিকে চেয়ে আছে তার ধোয়াশা চোখে অবনীকে বাগানে ঘুরেফিরে কাজ করতে দেখছে….অরণ্যের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমেই…

অরণ্যের ফোন বেজেই চলেছে…হঠাৎ অরণ্যের হুশ হলো…ফোনে দেখলো ১২ টা মিসড কল উঠে আছে।সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে অরণ্য তা টেরই পায়নি।কতক্ষণ যে সে এভাবে বসে ছিলো তা তার খেয়াল নেই।

আবার ফোন বেজে উঠলো…আবিরের ফোন।আবির তার কলেজফ্রেন্ড ছিলো।মাঝেমধ্যে চায়ের দোকানের সামনে আসলে অরণ্যকে ফোন দেয়।

অরণ্যের ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু ফোন না ধরলে ফোন দিতেই থাকবে তাই ফোন ধরলো।অরণ্য ফোনটা রিসিভ করলো…

আবির: কিরে শালা! তোরে কতক্ষণ যাবৎ ফোন দিতেছি…ফোন ধরিস না ক্যান!

অরণ্য: শরীর ভালো নেই।আজ বের হবোনা।

আবির অট্টহাসি দিয়ে বলল তুইতো ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও এখানে আড্ডা দিতে আসিস।আজ আবার কি এমন অসুস্থতা যে আসতি পারবিনা। যা শালা…বলেই আবির ফোনটা কেটে দিলো।

অরণ্যের মন মেজাজ দুটাই খারাপ হয়ে গেলো। মশা কামড়িয়ে পা ফুলিয়ে ফেলেছে।অরণ্য উঠে ধীরে ধীরে নিচে নামলো।

ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সেলফে রাখা বক্স খুঁজে বিস্কুট পেলো।কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে নিলো। এক কাপ চা খুব দরকার এখন।মাথা ব্যথা কমতো চা খেলে…

অবনী চা দাও বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলো….নিজে গিয়ে চা বানাবে তা ইচ্ছে করছেনা,আর বাইরে গিয়েও খেতে মন চায়না।

এই সন্ধ্যা বেলায় অবনীর হাতের চা ছাড়া অরণ্যের কোন চা ভালো লাগেনা…এটা বহু বছরে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বাসার কলিংবেল বেজে উঠলো…অরণ্য ঝট করে উঠে দরজা খুলতে গেলো…

চলবে….
লেখনী: #নুসু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here