শেষ_বিকালের_আলো (১ম পর্ব)

#শেষ_বিকালের_আলো (১ম পর্ব)

বেশ কয়েকদিন ধরেই ভালো লাগছে না অবনীর।মনে হচ্ছে শরীর মন দুটোতেই জং ধরেছে।প্রতিদিনের মত একই রুটিন,একঘেয়েমি লাগছে খুব।

একবার মনে হচ্ছে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু যখনই চিন্তা করছে ঘুরতে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছানো আবার জার্নি করতে হবে তখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছেনা।অবনী ভাবছে যদি এমন হতো যে যেখানে যেতে মন চাচ্ছে টুপ করে সেখানে গিয়ে পরতো,ঘুরতো,ফিরতো খেয়েদেয়ে চলে আসতো।কোন রুটিন থাকতোনা,কোন আদেশ,নিষেধ থাকতোনা,থাকতোনা কোন চিন্তা আর দু:শ্চিন্তারা।

অরণ্য এসেই ঝাঁকি দিলো,কতক্ষণ শুয়ে থাকবা!সন্ধ্যা হয়ে গেছে চা দাও তাড়াতাড়ি, বাইরে যাবো ফোন আসতেছে বার বার।সবাই অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
হুম! বলে উঠলো অবনী, চা করে দিলো।চা খেয়ে অরণ্য বাইরে চলে গেলো।

বিয়ের ১০ বছর চলছে…অবনীর রুটিনের যেমন পরিবর্তন নাই তেমনি অরণ্যের রুটিনেও কোন পরিবর্তন নাই,ওর প্রতিদিনকার রুটিন সন্ধ্যার পরে বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়া।মজার ব্যাপার হলো এই ১০ বছরে সব বন্ধু পরিবর্তন হয়েছে,কেউই নাই অরণ্যের মত যে ১০ বছর পর্যন্ত এই আড্ডা ধরে রেখেছে।একমাত্র অরণ্য সেরা যে কিনা তার বন্ধুত্ব ধরে রাখতে পেরেছে।তাকে বাহবা না দিয়ে পারা যায়না।অবনীর বন্ধুরাও যে যার মত আছে,কেউ কেউ আড্ডা দেয় সময় পেলে আর বাকিদের হয়তো অবনীর মত শরীরে আর মনে জং ধরেছে।

লিনসা আর লিনিয়া বাড়ির ছাদে খেলতে গিয়েছে,এখনই চলে আসবে।একজনের বয়স সাত, আর একজন চার।ওদের জন্য নাস্তা তৈরি করতে হবে তারপর পড়াতে বসাতে হবে।হাতে সময় নেই একদম।কিচ্ছু তৈরি করতে ইচ্ছে করছেনা অবনীর তাই ফ্রোজেন নাগেট ভেজে কিছু ফল কাটলো।

রাত ১০ টা বাজে।বাচ্চাদের রাতের খাওয়া,পড়া শেষ। দুস্টামি করছে ওরা।কলিংবেল এর আওয়াজ, অরণ্যর সময় হয়েছে বাসায় আসার।প্রচন্ড টায়ার্ড লাগছে অবনীর৷ তার মনে হচ্ছে যদি বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিতে পারতো।কিন্তু এই ভুবনে আসলে তার জন্য অনুচিত নীতিবিরুদ্ধ কাজ হবে এটা।অরণ্য এসে টিভি দেখলো কতক্ষণ আর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত রইলো এরপর হাতমুখ ধুতে চলে গেলো।

বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে এসে অবনী দেখলো অরণ্য ল্যাপটপে তার অফিসের কাজ করছে।জিজ্ঞেস করলো এখন খাবা?
অরণ্য: কয়টা বাজে?এখন খেতে বলছো।অফিসের কাজ করছি দেখোনা!
অবনী: রাত ১১ টা বাজে,সকালে উঠতে হবে আমার!
অরণ্য: আমার কি সকালে উঠতে হবেনা নাকি! আমার কি অফিস নাই! নাকি তুমিই একা সকালে ওঠো।রাত ১২ টা ছাড়া খাই আমি!!!
অবনী : প্রতিদিনই কি ১২ টায় খেতে হবে! আমার টায়ার্ড লাগছে,আমি ঘুমাতে গেলাম তুমি খেয়ে নিও।টেবিলে খাবার দেয়া আছে।
অরণ্য: তোমার তো একই কথা সারাক্ষণ টায়ার্ড লাগছে।সারাদিন করোটা কি!!!

অবনী কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেলো।উত্তর দিয়ে আসলে কোন লাভ নেই কারণ অবনী কি কি করে রেগে গিয়ে অনেকবার বলেছে কিন্তু অরণ্য ওই সময় হয়তো কানে শুনতে পায়না তাই আর বলা ছেড়ে দিয়েছে।কারণ জেগে জেগে যারা ঘুমায় তাদের জাগানো খুব কঠিন।

রাতে হঠাৎ অবনী টের পেলো অরণ্য ধপ করে এসে পাশে শুয়ে পড়েছে এবং জাস্ট ২ মিনিটের মাথায় তার ঈষৎ নাক ডাকার শব্দ শুরু হয়েছে।কত শান্তি মনের মধ্যে থাকলে এত দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া যায়।অবনী ভাবছে সে এত টায়ার্ড থেকেও… আহা! ঘুম.. হয়তো হাজার হাজার বর্গমাইল দূরে অবস্থান করছে অবনীর থেকে। অবনী ভাবতে লাগলো ১৫ বছর আগের কথা…অরন্য এর সাথে কথা বলতে বলতে রাত ভোর হয়ে যেতো, অবনী ফোন রাখতে চাইলেও অরন্য রাখতে চাইতো না।আবদার করতো আর একটু কথা বলার।এখন সেই আবদারের দিনগুলোতে ধুলো জমেছে প্রচন্ড। তার বদলে তৈরি হয়েছে এক রাশ বিরক্তি।অবনী কোন কথা বলতে গেলে অরণ্য এর মুখে বিরক্তি ছাড়া কিছু দেখা যায়না।অবনী মাঝে মধ্যে ভাবে অরণ্য কি একদম ভুলে গেলো পুরানো সুন্দর স্মৃতিগুলো।অবনীর জায়গা অন্য কেউ কি দখল করে নিলো নাতো! মনে আসলেও একদমই পাত্তা দিলোনা অবনী।আর যাই করুক অরণ্য এমন কিছু করবেনা এতটুকু বিশ্বাস আছে অরণ্যর উপরে।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলো অবনী।

ঘুম ভাঙ্গলো সকাল ৬ টার এলার্মে।অরণ্য একটু নড়েচড়ে আবার ঘুম দিলো।অবনীর মনে হলো মাত্রই ঘুমালো এত তাড়াতাড়ি সকাল ৬ টা বেজে গেলো কিভাবে! আর ৫ টা মিনিট ঘুমাতে খুব ইচ্ছে হলো,মোবাইলে ১০ মিনিট এলার্ম বাড়িয়ে দিয়ে আবার চোখ বুজলো।হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে অবনীর ঘুম ভাংলো,অবনী সময় দেখলো এখনও ১০ মিনিট হয়নি,এলার্ম বাজেনি। অবনীর সাহায্যকারী আসে সকাল ৭ টায়।তাহলে এত সকালে কে আসলো!এই সময়ে তো আসার মত কেউ নাই,এগুলো ভাবতে ভাবতে আবার উচ্চস্বরে কলিংবেল বেজে উঠলো।অরণ্য বিরক্ত নিয়ে অবনীকে বলে উঠলো এখনো দরজা খুলছোনা কেন! কানে কি শুনতে পাওনা নাকি!
অবনী খুব দ্রুত উঠে দরজার সামনে গেলো….!!!
চলবে….

লেখনী: #নুসু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here