রাগি_বউ,পর্ব_৬

রাগি_বউ,পর্ব_৬
শামিয়া খানম জিনিয়া ✍️🌺

আমাকে চিন্তিত থাকতে দেখে ও আমাকে বললো,
” সাদিয়া অনেক ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে ওর দিংগুলা কাটায়,,,,,,এজন্য আমাদের বিয়েতে ও হয়ত আসতে পারিনি……….!!!!”
মাহাদির কথায় সেদিন সন্তুষ্ট হতে পারিনি……….

বাবার বাড়ি আর বেশিদিন থাকা হলোনা চলেই আসলাম শশুর বাড়িতে…..
এটা শশুর বাড়ি বলা যায়না, শশুর শাশুড়ি যে আমার মা বাবাই…….
কাউকে নিজের বলে ভেবে নিলেই সে নিজের হয় অন্যথায় নয়……

একদিন আমার শাশুড়ি আর ননদ আত্নীয় বাড়িতে বেড়াতে গেল, তাই রান্নাঘর এ আমাকেই ঢুকতে হলো…..

বিয়ের পর প্রথম রান্নাঘর এ ঢুকেছি।।
যেহেতু শাশুড়ি মা নেই, তাই আমাকেই রান্না করতে হবে। রান্না করে, নামাজ পড়ে ঘরে এসে বসলাম। পুরা বাড়িতে আমি একা……
মাহাদি ও নেই বাড়িতে, সে ব্যবসার কাজে বাইরে গেছে…..

কি করবো বুঝে উঠতে না পেরে ইউটিউব এ গিয়ে গান শোনা শুরু করি।
এই ছেলেটার জন্য তো একটু গান শোনার ও উপায় নাই…….
গানের প্রতি আমি এতটাই মগ্ন হয়ে গেছিলাম যে ও কখন বাড়িতে ঢুকেছে সেটা খেয়াল ও করিনি………
তাড়াতাড়ি ওকে দেখে গান অফ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। কি রাগ ছিল সেই চেহারার মধ্যে…..

” আচ্ছা আপনার আবার কি হলো??? নিজেই তো বলেন এত রাগ ভালোনা…..”

” তুমি গান কেন শুনছো???”

” তার জন্য এত রাগ? মনে হচ্ছে আপনার কোনো বড় ক্ষতি করেছি আমি…….”

“ক্ষতিই তো করেছো, অনেক বড় ক্ষতি!”

” মানে কি? বুঝিয়ে বলুন”

” গান শুনা হারাম।একদা ইবন উমার (রাঃ) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে তাঁর কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেন। তিনি সেখান থেকে দূরে গিয়ে আমাকে বলেনঃ হে নাফি! তুমি কি এখনও কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছ। আমি বলিঃ না। তখন তিনি তাঁর কান থেকে আঙ্গুল বের করে বলেনঃ একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম, তিনি এরূপ শব্দ শুনে-এরূপ করেন।
(আবু দাউদ ৪৮৪৪)

যেখানে আমাদের নবী বাদ্যযন্ত্র শুনে কানে আঙুল দিতেন, সেখানে তোমার সাহস কি করে হল গান শুনার। হাদিসে আরো আছে,

‘মিউজিক ‘ঘন্টা বা ঘুঙুর হল শয়তানের বাঁশি।’’
(মুসলিম ২১১৪, আবূ দাঊদ ২৫৫৬, আহমাদ ২/৩৬৬, ৩৭২, বাইহাকী ৫/২৫৩’

আর এতে আমার ক্ষতি টা কি করেছে জানো???

তুমি আমার স্ত্রী, আর তোমার ক্ষতি মানেই তো আমার ক্ষতি……
আজ যদি এইই অবস্থাতেই তোমার মৃত্যু ঘটতো????
যদি আমি আসার আগেই তুমি বিদায় নিতে এই দুনিয়া থেকে???
তখন আল্লাহরর কাছে কি জবাব দিতে???”

মৃত্যুর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছিলাম,,,,,,,,
সত্যিই তো মারা গেলে তো কিছুই আমার সাথে যেতনা, সব ফেলে রেখেই অজানা দেশে পাড়ি দিতে হত আমায়,,,,,,,
মাহাদির কাছে ক্ষমা চাই আমি!!!
ও আমায় বলল,
” আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে তো লাভ হবেনা। ক্ষমা চাইতে হলে চাও ওই মহান রবের কাছে। আমার কাছে নয়।”
আল্লাহর কাছে সেদিন অনেক তাওবা করেছিলাম,,,,,
মাহাদিকে দুপুরের খাবার খেতে রান্নাঘর এ ডাক দিই,,,
মাহাদি একটু বেশিই এক্সাইটেড ছিল। কারন আমার রান্না তো আগে কখনো খাইনি। প্রথম রান্না করেছি।

ওকে খাবার খেতে দিই, তারপর ও আমাকে মুচকি হেসে বলে,
“রাগি বউ! মাশ আল্লাহ, রান্না সুন্দর, কিন্তু একটু লবন আর ঝাল বেশি হয়ে গিয়েছে।”

কথা বলতে বলতেই ও বাকি খাবার গুলা খেয়ে ফেলেছিল। আমি জানি আমায় খুশি করার জন্য ও ওমন করেছিল। ইচ্ছা করে যে লবন আর ঝাল মিশিয়েছিলাম, সেটা ওকে বলিনি।
প্রতিদিন রান্না করতে হবে এই ভয়ের কারনে ওমন কাজ করেছিলাম।
পরে অবশ্য ওর জন্য খারাপ লেগেছিল। এমন টা করা আমার উচিত হয়নি।

এদিকে আমার শাশুড়ি মা বাড়ি আসলো…….
ওনি আমায় দেখে বললেন,
” মা’রে! কটা দিন তোকে বড্ড কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাইনা???”

” না মা! আপনি কেন কষ্ট দিবেন? আপনার ছেলেটাই তো আমায় কষ্ট দিয়েছে। ওকে বলেছিলাম একটু হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে, তো আনলইনা।”

ও পাশ থেকে বলে উঠে,
” মা’ তুমি তো জানো হোটেলের খাবার আমি একদম খেতে পারিনা। তাছাড়া তোমার বউয়ের রান্না তো মাশ আল্লাহ ভালো, প্রথমদিন একটু লবন আর ঝাল বেশি দিয়েছিল। তারপর থেকে তো আমিই ঝালের ও লবনের পরিমাণ দেখিয়ে দিতাম।”

” ঠিক আছে বউমা! তোমার তো বয়স কম এখন ও। তোমাকে এক্ষুনি অত কষ্ট করতে হবেনা।”

” মনে মনে ভাবলাম যাক বাবা বাঁচা গেল।”

ওকে বললাম,
” কি হলো মায়ের সামনে বেশি প্রশংসা করে? সেই তো আমিই জিতে গেলাম।”

” হ্যা! তুমি তো মায়ের আদরের বউমা। যাও যাও তোমার হাতের রান্না খাবইনা।আড়ি তোমার সাথে।”

” হুম আড়ি। ”

” এই তোরা দুটোতে কি শুরু করলি বলতো???
ঘরে যা তো……….!!!!”

” হুম মা যাচ্ছি! আপনার ছেলেকে খেয়ে নিতে বলুন, আমি খাবোনা ওর সাথে।”

” হ্যা! যাও খেতে হবেনা। আমি ও খাবোনা তুমি না খেলে।”

” নে হয়েছে! আর ঝামেলা করিস না তো! ”

” তোমার বউমাকে চুপ করতে বল মা।”

হাসি, খুনসুটিতেই আমাদের সুখের সংসার চলছিল। ধীরে ধীরে মাহাদির প্রতি আমার ভালোবাসা টা বেড়ে যেতে থাকে……..

হঠাৎ ই বড় ধরনের ডেঙ্গু জ্বর আমাকে ঘিরে ফেলে। সারারাত জেগে মাহাদি আমার খেয়াল রাখতো। জ্বরের মাত্রা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। কমার কোন লক্ষন দেখছিলাম না।

মনের ভিতরে মৃত্যু ঝনঝনানি শব্দ বাজতে থাকে আমার। ভাবিনি ওই জ্বর থেকে মুক্তি পাবো। আমি যে সেদিন ইচ্ছা করে তরকারিতে ঝাল মিশিয়েছিলাম, সেটা ওকে বলে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। ও আমাকে বলেছিল এভাবে প্রতারনা করা মুসলমানের বৈশিষ্ট্য না। আমি ক্ষমা চেয়েছিলাম ওর কাছে।

বাড়ির সবার বুঝতে খুব কষ্ট হত আমি অসুস্থ নাকি ও অসুস্থ………????

” আমিই উলটে ওকে বুঝ দিতাম। বিপদে ধৈর্য হারা হওয়া উচিত না।”

আমার অসুস্থতা আমাকে বদলে দিয়েছিল। আমার প্রভুর নিকটবর্তী হতে সাহায্য করেছিল।
এমতাবস্থায় আমার বড় ননদ আমাদের বাসায় চলে আসে……..
আমাদের ঘরে ঢুকেই ও সালাম দিল। ওর চোখ দুটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। যেমন ভাই তার তেমনি বোন………

আমি ওকে বলি
“কয়টা দিন থাকতে হবে কিন্তু। কোন অজুহাত শুনবনা আমি………!!!!”

” কেন ভাবি আমায় একেবারে রাখা যাবেনা……….???
কয়টা দিন কেন……..???”

” মানে কি…….???”

” এমনি ই বললাম!”

জানিনা সাদিয়ার চাহনি বড় অদ্ভুত ছিল। ওর কথায় খুব সন্দেহ ছিল। কি হতে চলেছে আসলে………???

চলবে????

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here