Wednesday, April 15, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প রক্তচোষা রক্তচোষা,পর্বঃদুই

রক্তচোষা,পর্বঃদুই

গল্পঃরক্তচোষা,পর্বঃদুই
লেখাঃMd Tarajul Islam(Shihab)

রফিক কাজ থেকে বাসায় ফিরে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে থেকে একটু আরাম করছিলো।এমন সময় বাড়ির দরজায় কে যেন নক করলো।রফিক তার স্ত্রী শারমিনকে বলল
->যাও তো গিয়ে দেখো তো কে এসেছে?
রফিকের কথা মতো শারমিন দরজা খুলে দেখলো একটা ডাকপিয়ন এসেছে।শারমিনকে দেখে বলল
->রফিক কি বাসায় আছে?
->হ্যাঁ আছে তো।কিন্তু আপনি?
->উনার নামে একটা নোটিশ আছে।উনাকে একটু ডাকুন।উনার স্বাক্ষর লাগবে।
শারমিন চিন্তিত হয়ে রফিককে ডাকলো।রফিক পিওনের কাছে স্বাক্ষর দিয়ে নোটিশ নিলো।ঘরে এসে রফিক নোটিস খুলে দেখলো এটা একজন উকিল পাঠিয়েছে শামসুদ্দিনের পক্ষ থেকে।রফিক পুরো নোটিশ পড়ে ধপাস করে বিছানার ওপর বসে পড়লো।রফিককে বসে পড়তে দেখে শারমিন বলল
->কি গো কি হলো তোমার তুমি এরকম করে বসে পড়লে কেন?কি আছে নোটিশে?
রফিক কোন কথা না বলে নোটিশ শারমিনের দিকে এগিয়ে দিলো।শারমিন পুরো নোটিশ পড়ে নিজেও চমকে উঠলো তারপর বলল
->মানুষ এতটা শয়তান কি করে হতে পারে।মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকার মামলা করেছে ছিঃ
রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
->পাঁচ মাসে পচাত্তর হাজার সুদ দিয়েছি।দুই মাস হলে দিতে পারিনি আর তাই এই অবস্থা।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েও এসব জালিয়াতি কাজ করে।
->চেক দিয়ে টাকা নেওয়াটায় ভুল হয়ে গেছে।আজ আমার জন্য তোমার এই অবস্থা।
শারমিন মাথা নিচু করে আক্ষেপ করতে লাগলো।রফিক শান্তনা দিয়ে বলল
->আরে চিন্তা করো না।কিছুই হবেনা।ওই চাইলেই কি এত টাকা আদায় করতে পারবে নাকি?
->জানি না তারপরেও ভয় হচ্ছে।খুব যদি তোমার এতে জেল হয় তখন কি হবে?
->ভয় নেই আমি গিয়ে কথা বলবো।

রফিক আজ থেকে ৭-৮ মাস আগে তার স্ত্রী শারমিনের চিকিৎসার জন্য শামসুদ্দিনের থেকে চেক দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়েছে।যার সুদ মাসে পনেরো হাজার দিতে হয়।রফিক ছোটখাটো একটা ব্যবসা করে।ঠিক সে মুহুর্তে রফিকের কাছে শারমিনের চিকিৎসা করার মতো হাতে অত টাকা ছিলো না তাই স্ত্রীর জীবন বাচানোর জন্য টাকা নিতে বাধ্য হয়।আজ দুই মাস হলো সুদ দিতে পারেনি আর তাই চেকে নিজের মন মতো টাকার অংক বসিয়ে কেস করেছে।
বিকেল বেলা রফিক শামসুদ্দিনের বাসায় আসলেন।শামসুদ্দিন উঠানে বসে থেকে পান চিবোচ্ছে।রফিককে দেখে শামসুদ্দিন বললেন
->আরে রফিক যে আমি তো তোমার অপেক্ষায় করছিলাম।এসো এসো বসো এখানে?
রফিক এসে শামসুদ্দিনের সামনে এসে দাড়িয়ে বলল
->মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য আপনার এভাবে পাঁচ লক্ষ টাকার কেস করা ঠিক হলো?
->কি করবো বলো সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল তো বাঁকাতে হবে।
->আমি কিছুদিনের মধ্যে আপনার পুরো টাকা শোধ করে দিবো আপনি কেস তুলে নিন।
->হুম টাকা দিলে অবশ্যই কেস তুলে নিবো আমায় দেড় লক্ষ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
->কিহ?পঞ্চাশ হাজার টাকার জায়গায় দেড় লক্ষ টাকা দিবো?আপনারা মানুষ নাকি?
->দেখো রফিক।পাঁচ লক্ষ টাকার কেসে তোমার জেল হবে ছয় মাস-এক বছর।আর পঞ্চাশ ভাগ অর্থাৎ আড়াই লক্ষ টাকা কোর্টে না দেওয়া পর্যন্ত তোমার জামিন হবেনা।তাই বলছি আড়াই লক্ষ টাকার পরিবর্তে দেড় লক্ষ টাকা দাও।তুমিও বাঁচো আমিও বাঁচি।
রফিক রেগে গিয়ে বলল
->আমি আপনাকে পঞ্চাশ হাজারের এক টাকাও বেশি দিবো না।আর বললেন না সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাকাতে হয়।তো দেখবেন আবার যেন আঙ্গুল বাঁকাতে গিয়ে পুরোটায় ভেঙ্গে না যায়।

রফিক রেগেমেগে শামসুদ্দিনের বাড়ি থেকে চলে গেলো।শামসুদ্দিন বিদ্রুপের হাসি দিলো।রফিক বাসায় এসে ভাবছে সে এখন কি করবে?ছয় মাসের যদি জেল হয়ে যায় তাহলে তার অবর্তমানে তার স্ত্রী সন্তান কি করবে?রফিক থানায় গেলো এটা ভেবে যদি কোনো সাহায্যে পায়।
জোহান ফয়েজের কেস নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে আছে।খুনির ব্যাপারে একটু যদি সুত্র পেতো তাহলে কাজ হতো কিন্তু এখন পর্যন্ত খুনির ব্যাপারে কোনো সুত্র ওদের হাতে আসেনি।এমন সময় রফিক বেশ হন্তদন্ত হয়ে জোহানের কেবিনে এসে বলল
->স্যার আপনি আমায় সাহায্যে করুন।
->কি হয়েছে বলুন আপনি।
রফিক জোহানকে শামসুদ্দিনের ব্যাপারটা জানালো।সব শুনে জোহান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।তারপর রফিককে বলল
->আমি কিভাবে সাহায্য করবো বলুন।এটা যেহেতু কোর্টের ব্যাপার তাই উকিল ধরে আপনার এই ব্যাপারটা কোর্টে প্রমান করতে হবে।
->তার মানে আপনি কোনো সাহায্যে সহযোগিতা করতে পারবেন না তাই তো?
->আসলে তা না?যদি উনি আপনাকে কোনো ভাবে গায়ে হাত তুলতো তাহলে একটা ব্যবস্থা নিতে পারতাম।কিন্তু এমন কিছু তো হয়নি।
রফিক তখন আর কিছু না বলে সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন।
জোহান মনে মনে ভাবছে,এই মানুষ গুলো আসলেই রক্তচোষা বাদুড়।এরা সাধারন মানুষের রক্ত চুষে নিজের সম্পদ গড়ে।
রাতে শামসুদ্দিন শহর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় আসছিলেন।তখন রাত আনুমানিক পৌনে নয়টা বাজে।শীতের কারনে এই সময়টায় অনেক রাত বলা চলে তার মধ্যে আজ আবার কুয়াশা পড়েছে।রাস্তা ঘাটে মানুষের আনাগোনা খুব কম।হঠাৎ শামসুদ্দিন দেখলো ওর থেকে একটু দুরে মানুষের মতো কেউ দাড়িয়ে আছে।শামসুদ্দিন হর্ন বাজাতে লাগলো কিন্তু তার সেখান থেকে সরে যাওয়ার কোনো নামই নেই।তাই ওই মানুষটির থেকে একটু আগে মোটরসাইকেল দাড় করিয়ে মোটরসাইকেলের ওপর বসা থেকে বলল
->কে ভাই তুই এই ভাবে রাস্তার ওপর পথ আটকে দাড়িয়ে আছিস কেন?
শামসুদ্দিনের কথা শুনে সে হেঁটে সামনে এগিয়ে আসলো।লোকটির মাথা হতে পা পর্যন্ত আটশাট পোশাকে ঢাকা।হাতে একটা বেশ লম্বা খাপ।শামসুদ্দিন তাকে দেখে ভাবতে লাগলো নিশ্চয় এ ছিনতাইকারী।এটা ভেবে শামসুদ্দিন একটু ভয় পেয়ে গেলো।শামসুদ্দিন ঢোক গিলে বলতে লাগলো
->দেখো ভাই আমি গরীব মানুষ আমার কাছে এই মোটরসাইকেল ছাড়া আর কিছু নেয়।
->যার যত বেশি থাকে সে নিজেকে তত বেশি ফকির মনে করে।
এরপর শামসুদ্দিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই সে খাপ হতে ওই তলোয়ার বের করে শামসুদ্দিনের গলার ভিতরে ঢুকে দিলো।শামসুদ্দিনের মুখ থেকে হালকা আওয়াজ বের হলো।লোকটি তলোয়ার শামসুদ্দিনের গলার মধ্যে ঘুরাতে লাগলো।তলোয়ার গলা হতে বের করতেই শামসুদ্দিন বাইক সহ নিচে পড়ে গেলো।শামসুদ্দিন মাটিতে পড়ে থেকে শুধু হা করছে।তখন সে তলোয়ার একদম শামসুদ্দিনের বুকের বাম পাশে ঢুকিয়ে দিলো।ওর কাজ শেষে তলোয়ার নিজের খাপে ঢুকিয়ে কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে গেলো।

একটু বাদে সেদিক দিয়ে এক লোক সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলো।হঠাৎ সে শামসুদ্দিনের লাশ দেখতে পেয়ে যায়।দেরি না করে পুলিশকে ফোন করে।খবর পেয়ে কিছু সময়ের মধ্যে পুলিশ অফিসার জোহান আর সাবইন্সপেক্টর রাসেল ঘটনাস্থলে এসে পৌছালো।জোহান দেখলো শামসুদ্দিনের হাতেও সেইরকম সিল মারা “কিল বাই রন”এরকমটা ফয়েজের হাতে ছিলো।রাসেল বলল
->স্যার এটা তো স্পষ্ট যে,তিনজনের খুনি কিন্তু একজনই।ফয়েজ আর ফয়েজের স্ত্রীকে যে মেরেছে।এই লোককেও সেই মেরেছে।
->হুমম।বোঝায় যাচ্ছে সিরিয়াল কিলারের কাজ।খোঁজ নাও তো ইনাকে কেউ চিনে কি না?
জোহান খোঁজ নিয়ে শামসুদ্দিনের পরিচয় জানতে পারলো।মনে মনে ভাবছে এর বিরুদ্ধে তো আজ রফিক নামের এক লোক থানায় অভিযোগ করতে এসেছিলো।তাহলে কি রফিক মেরেছে?না না এটা হতে পারেনা কারন শামসুদ্দিনের সাথে ওর শত্রুটা ফয়েজের সাথে না।যেহেতু দুইজনের খুনের ধরন একই রকম প্রায়।হাতের ওপর একই সিল এর মানে এটা স্পষ্ট যে দুইজনের খুনি একজন।হঠাৎ রাসেল লাশ চেক করার সময় একটা কাগজ পড়ে থাকতে দেখলো তাতে লেখা,” এদের মতো রক্তচোষারা আমাদের সমাজে থাকার যোগ্য নয়,তাই এদের একে একে শেষ করে দিচ্ছি,এদের মতো এই এলাকার সব মানুষদের শেষ করবো”।
রাসেল কাগজটা এনে জোহানের হাতে দিলো।জোহান এটা পড়ে ওর দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল
->এটা এমন কেউ করছে যার এই সমস্ত সুদখোরদের প্রতি অনেক ঘৃণা কাজ করে।
->আমাদের তাহলে এরকম কারো খোঁজ নিতে হবে।
->হুম খোঁজ নাও+এই কাগজে থাকা সমস্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট তুলে ক্রিমিনাল রেকর্ডের সাথে ম্যাচ করাও।
->ওকে স্যার।

অন্ধকার রুমে বসে আছে এক লোক।তার সামনে টেবিলের ওপরে রাখা পাঁচজন মানুষের ছবি।সেখান থেকে লোকটি ফয়েজ আর শামসুদ্দিনের ছবি ছিড়ে ফেললো।বাকি থাকলো তিনজন।তার মধ্যে একজন হলো সাবইন্সপেক্টর রাসেলের বাবা রবিউল আলম।

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here