মেঘে_ঢাকা_আকাশ #পর্ব-১৫

#মেঘে_ঢাকা_আকাশ
#পর্ব-১৫
#আমিনুর রহমান

স্পৃহার সাথে বিকেলে কথা হল,তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারলাম অবনির এক ডাক্তার ছেলের সাথে বিয়ে। তখন পর্যন্ত জানতাম না আমি এই ছেলেটা কে,কার সাথে অবনির বিয়ে। রাতে যখন রাশেদ ফোন করে তাঁর বিয়ের কথা জানালো তখন আর বুঝতে বাকি রইল না অবনির সাথেই রাশেদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়েটা হুট করেই ঠিক হয়ে গেছে তাই আমাকে জানাতে দেরি করেছে। রাশেদকে আমি যতটুকু চিনি জানি ছেলে হিসেবে অনেক ভালো। সেক্ষেত্রে অবনির জন্য ভালোই হয়েছে। একটা মেয়েকে ভালো রাখার মতো সবকিছুই রাশেদের মাঝে রয়েছে।

দুইদিন পর আমি স্পৃহাকে নিয়ে অবনির বিয়েতে গেলাম। স্পৃহা যেভাবে বলেছিল বিয়েতে খুব বেশি মানুষ দাওয়াত দেওয়া হবে না। আসলে বিষয়টা তেমন না। আমরা ছাড়াও অনেক মানুষ এসেছে। কেন জানি মনে হতে লাগল স্পৃহার বাবা মাও হয়তো বিয়েতে এসেছে। আজকে আর আমাদের রেহাই নেই। তবে তারা আসেনি। আসলে আমার জন্য ভালোই হতো,তবে আমার ভালোটা কেন জানি হয় না। অবনিকে বউ সাজে খুব ভালো লাগছে না আমার কাছে। তবে খারাপও লাগছে না। সব মেয়েকে বউ হিসেবে ভালো লাগে না কিন্তু এই মেয়েটাকে লাগার কথা ছিল তবে লাগছে না। এমনিতেই যতটা সুন্দর লাগে আজকে বউ সাজার পর ততটা সুন্দর লাগছে না। স্পৃহার ক্ষেত্রে বিষয়টা তেমন না। স্পৃহাকে যেদিন প্রথম বউ সাজে দেখেছিলাম সেদিনই বুঝেছিলাম এটাই এই মেয়ের সর্বোচ্চ ভালো লাগার মতো রুপ। এর থেকে ভালো লাগার মতো রুপ তাঁর আর হতে পারে না। স্পৃহাকে বউ সাজলে যতটা সুন্দর লাগে অবনিকে ততটা লাগছে না তবে সুন্দর লাগছে।

কোনরকম ঝামেলা ছাড়াই বিয়েটা হয়ে গেল। আমাদেরও কোন সমস্যাই পড়তে হল না। বিয়ে শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। বাসর ঘর সাজালাম আমি আর স্পৃহা দুজন মিলে। স্পৃহা খুব সুন্দর করে বাসর সাজিয়েছে এতটা সুন্দর করে হয়তো তাঁর নিজের বাসর কেউ সাজায়নি। সবসময় দেখে এসেছি বাসরটা সাধারণত ছেলেদের বাড়িতেই হয়। মেয়ের বাড়ি থেকে মেয়েকে নিয়ে যাবে তারপর ছেলের বাড়িতে বাসর সাজানো হবে। কিন্তু এখানে ব্যপারটা ভিন্ন। রাশেদের তেমন আপন বলতে কেউ না থাকায় বাসরটা অবনিদের বাসাতেই করতে হচ্ছে। যেমনটা আমাকে করতে হয়েছিল। যদিও আমার ওটাকে বাসর বলা চলে না। কেন না বাসর রাতে যা যা করে মানুষ তাঁর কিছুই আমরা করিনি।

রাত প্রায় বারটা পাড় হয়ে গিয়েছে। অবনি আর রাশেদকে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আসার পর অবনির বাবা আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন ছোট্ট একটা রুমে। কারণ তিনিও জেনে গিয়েছেন আমরা স্বামী স্ত্রী। তবে এটা জানেন না যে আমরা শুধু নামে স্বামী স্ত্রী কোন কাজের না। স্পৃহার সাথে বিয়ের পর এই প্রথম এক বিছানায় ঘুমাতে হচ্ছে আমাদেরকে। বাসর রাতে পালিয়ে আসার পর সবসময় আলাদা বিছানাতেই আমরা ঘুমিয়েছি। কিন্তু আজ সেই সুযোগ নেই। রুমটাও খুব ছোট নিচে ঘুমানোর মতো তেমন কোন জায়গা নেই। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম তাই বিছানা দেখার সাথে সাথে নিজের গা এলিয়ে দেই। ঠিক তখনই স্পৃহা বলে উঠে।

“আমরা এখানে একসাথে ঘুমাবো?”

আমি শুয়ে থাকা অবস্থাতেই বললাম।

” তাছাড়া আর তো কোন উপায়ও নেই।”

তখন স্পৃহা কপাল কুচকে বিছানার দিকে আগাতে আগাতে বলল।

“উপায় থাকবে না কেন? নিচে তো একটু জায়গা আছে ওখানে ঘুমান আপনি। আমি ওপরে ঘুমাই।”

স্পৃহার এমন কথা শুনে একটুও অবাক হলাম না। কারণ এই মেয়েটা এমনই। সবসময় নিজের বুঝ বুঝে খুব স্বার্থপর একটা মেয়ে। আমি তখন বিছানা থেকে উঠে বসে পড়লাম আর বললাম।

“আমি কেন নিচে ঘুমাবো? শুধু শুধু কেন মশার কামড় খাবো? এমন না তো যে নিচে ঘুমালে আমার অনেক লাভ কিংবা না ঘুমালে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”

তখন স্পৃহা মন খারাপ করে বলল।

“আমি একটা মেয়ে। আর একটা মেয়েকে সেফ রাখার দায়িত্ব আপনার। পুরুষরা চাইলে অনেক কিছুই পারে যা মেয়েরা পারে না। আমার নিচে ঘুমালে ঘুম আসবে না। প্লিজ আপনি নিচে ঘুমান আমার জন্য হলেও।”

আমি কোন ভাবান্তর না করে স্পৃহার দিকে তাকিয়ে বললাম।

“মেয়েরা সব কাজই পারে। দেখেন না সমান অধিকার দাবি করে। তাই ছেলেরা যে কাজ পারবে ওটা তো মেয়েদেরকেও পারতে হবে। আর আমি কেন আপনার কথায় নিচে ঘুমাব? আপনি তো আমার কেউ না। মানুষ তাঁর আপন মানুষের জন্য সব কষ্ট সহ্য করতে পারে,সবকিছু সয়ে যেতে পারে। আপনি তো আমার আপন কেউ না তাহলে আমি কেন আপনার জন্য এসব করতে যাব? কে হন আপনি আমার?”

মনের ভিতর অনেক অনেক অভিমান নিয়ে কথাগুলো বললাম আমি। আমারও ইচ্ছে করছিল তুলতুলে নরম বিছানাতেই ঘুমাক মেয়েটা। এরকম ফুলের ন্যায় কোমল একটা মেয়েকে কংক্রিটের শক্ত ফ্লোরে ঘুমাতে দিতে পারি না আমি। কিন্তু ওই যে অভিমান বড্ড খারাপ জিনিস। কেউ বুঝতে চায় কেউ বা চায় না। স্পৃহাও আমার অভিমানভরা কথাগুলো বুঝতে পারল কিনা বুঝতে পারলাম না। তবে সেও অনেকটা মন খারাপ করে অভিমানি কণ্ঠে আমাকে বলল।

“আমি আপনার বউ হই। আর নিজের বউয়ের জন্য এটা করা আপনার কর্তব্য।”

এই কথা শুনে আমার অনেক রাগ হল। ইচ্ছে করছিল স্পৃহাকে গালি দেই বকা দেই। কিন্তু সেটা করতে পারলাম না। আমি রাগে গড়গড় করতে করতে বললাম।

“কিসের বউ আপনি আমার? বউ মানে বোঝেন? প্রয়োজনের সময় জামাই মানবেন আর যখন প্রয়োজন থাকবে না তখন মানবেন না। বাহ আপনাকে তো নিজের ভালো বোঝার জন্য নোবেল দেওয়া উচিত। কখনো বউয়ের মতো আচরণ করেছেন আমার সাথে? স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যা হয় তেমন কিছু কি ভুলেও আমাদের মধ্যে হয়েছে? হয়নি। তাহলে কেন আপনি ওই সম্পর্কের কথাটা তুলছেন যেটার অস্তিত্ব শুধু কাগজে কলমেই রয়েছে বাস্তবে না। কয়দিন পরে তো ঠিকই ওই হাসানের কাছে চলে যাবেন। ওনি হবে আপনার স্বামী আপনার কলিজা,আপনার আত্মার আত্মা। আর আমি হব পর,আমি তো শুধু আপনার প্রয়োজনের স্বামী। ভালোবাসার স্বামী তো হবে অন্য কেউ। আমাকে আপনি এসব বলবেন না,কখনো না।”

কথাগুলো বলতে বলতে কখন যে চোখের এককোণে জল চলে আসল বুঝতেই পারলাম না। তবে স্পৃহা আমার চোখের জলটা দেখতে পারল না। আমি তাকে দেখাতেও চাই না। যে ভালোবাসার সে এমনিতেই বাসবে। কোনকিছু দেখে নয়। চোখের জল দেখে আজকাল আর কেউ ভালোবাসে না। ভালোবাসে মুখের হাসি দেখে আর সত্য এটা আমি হাসতে পারি না।

স্পৃহা আমার কথাগুলো শুনে যে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে সেটা আমি বুঝলাম কিন্তু আমার কিছু করার নেই। কারণ এমন কষ্ট আমি অনেকদিন থেকেই পেয়ে আসছি। যে মানুষগুলোকে কখনো কাঁদাতে চাইনি,দুঃখ দিতে চাইনি সে মানুষগুলোই আমাকে তিলে তিলে কষ্টের আগুনে পুড়িয়েছে। আমিও পোড়াতে জানি,আমিও কষ্ট দিতে জানি৷ স্পৃহা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। অথচ চাইলে সে একটু ভালোবাসাও দিতে পারত৷ কিন্তু দেয়নি। সে তাঁর প্রেমিকের বিশ্বাস অর্জন করা নিয়ে ব্যস্ত। আমিও আগের থেকে নিজেকে বদলে নিয়েছি যখন দেখেছি আমার এমন সরাসরি ভালোবাসার বিপরীতে স্পৃহার কোন পরিবর্তন হয়নি। আমি আর কারো জন্য মায়া কান্না কাঁদতে চাই না। কারো জন্য বাঁচতে চাই না। যদি বাঁচতে হয় নিজের জন্যই বাঁচব। এই পৃথিবীর মানুষগুলো বড় স্বার্থপর। তারা ভালোবাসার মানুষগুলোকে বুঝতে চায় না।

আমার কথা শুনে স্পৃহা একটা বালিশ নিয়ে নিচে ঘুমিয়ে যাই। আমিও তাকে না বলি না। আমার মন খারাপের মাত্রাটা আরও বাড়তে। আমিও দেখতে চাই মাত্রাটা কত তীব্রতর হতে পারে। ভেবেছিলাম স্পৃহাকে সব বলব,বলব হাসান ছেলে হিসেবে ভাল না,তাঁর চরিত্রে সমস্যা আছে। কিন্তু এখন আর বলব না। ভালোবাসার মানুষকে অনেক বেশি ভালোবাসার পরেও যখন তাঁর কাছ থেকে অবহেলা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না তখন আগের মতো সেই স্বার্থহীন ভালোবাসাটা আর থাকে না। আমার ক্ষেত্রেও তেমনি হয়েছে। জ্বর হওয়াতে সে আমার সেবা যত্ন করেছিল তাঁর প্রয়োজনেই। কারণ তখনও আমাকে তাঁর দরকার ছিল। অথচ আমি ভেবেছিলাম ভালোবেসে এসব করেছে সে৷ কিন্তু না সে আমাকে ভিতর থেকে কখনো ভালোবাসতে পারেনি। তাঁর ভিতরটা অন্য কাউকে চায়। আমাকে চায় না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি স্পৃহা নেই। বুঝলাম রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। বাহিরে গিয়ে দেখলাম বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আছে। কাছে যেতেই তাঁর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম কাল রাতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। মশার কামড়ে ফরসা গাল দুটো লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে৷ আমি তাঁর কাছে গেলেও সে আমার সাথে কোন কথা বলল না। দুইদিন পর আমরা বিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসলাম।

স্পৃহার সাথে সম্পর্কটা আবার আগের মত হতে লাগল। পাশাপাশি রুমে থাকলেও খুব একটা কথা হয় না। আমি বুঝতে পারি ওইদিন রাতে সে অনেক রাগ করেছে অনেক অভিমান করেছে আমার ওপর। সেই অভিমানটা হয়তো তাকে আমার থেকে দূরে সরে যেতে সাহায্য করছে। কারণ অভিমানও মানুষকে দূরে ঠেলে দিতে পারে,পর করতে পারে। আমারও ইচ্ছে নেই তাঁর অভিমানটা ভাঙানোর। কারণ অভিমান ভাঙানোর জন্য একটা অধিকার থাকা দরকার। সেই অধিকারটা সে আমাকে কখনো দেয় নাই।

একমাস পরের কথা,

স্পৃহা একদিন আমার রুমে এসে আমাকে বলল।

“কাল আমি চলে যাচ্ছি। হাসান আমার জন্য অপেক্ষা করবে বলেছে। আমি সবসময়ের জন্য তাঁর কাছে চলে যাচ্ছি। আপনার সাথে অনেকদিন ছিলাম আমি। আপনি আমার কাছে অনেক পাওনা আছেন। আপনি না থাকলে হয়তো এই পথটা আমি পারি দিতে পারতাম না। আপনার আমার পেছনে যত টাকা খরচ হয়েছে আমি সব দিয়ে দিব। আপনার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি আমি সেগুলোর জন্যও দুঃখিত। অনেক সময় আপনাকে অনেক আপন মনে হয়েছে,ভালোবাসি বলেও মনে হয়েছে। এখনো কেন জানি মনে হয় আপনি আমার অনেক আপন কেউ। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন জিনিস। আপনার সাথে বিয়েটা ছিল একটা দূর্ঘটনা। আমি জানি না আমি কি করছি ভুল করছি না সঠিক করছি সেটাও জানি না। তবে আপনার কাছে আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব,মনে রাখব। আমিনুল নামে একজন মানুষ ছিল যে মানুষটার সাথে এতটা দিন একসাথে থাকার পরেও কখনো আমার দিকে কখনো খারাপ চোখে তাকায়নি,বিয়ে করা বউ হওয়ার পরেও কখনো স্বামীর দাবি নিয়ে আমার ওপর অধিকার দেখাতে আসেনি। আপনি সত্যি অসাধারন একজন মানুষ৷ আপনি কি আমার শেষ একটা অনুরোধ রাখবেন?”

স্পৃহার দিকে তাকিয়ে বললাম।

“মেয়েরা অসাধারণ মানুষ আমি।”

তারপর আমি কিছু বলি না অবাক চোখে স্পৃহার দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবতে থাকি আমি মানুষটা কতটা অবহেলার পাত্র। জীবনে কমবেশি সবার কাছেই অবহেলার স্বীকার হয়েছি আমি। বাবা মা বোন বন্ধু বান্ধবী ভালোবাসার মানুষ সবাই আমাকে কোন না কোন কারণে অবহেলা করেছে। কারো ক্ষেত্রে হয়তো আমাকে অবহেলা করার কোন কারণ ছিল কারো ক্ষেত্রে হয়তো ছিল না। তবে করেছে সবাই। স্পৃহাকে দেখে আমার ওই কথাটা মনে হচ্ছে। আমিনুর রহমান একটা গল্পে বলেছিলেন।

যে চলে যেতে চায় তাকে যেতে দিন এটাই আপনার জন্য ভালো। আপনি তাকে ভালোবেসে ভালো রাখার দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে বিশ্বাস করে আপনার থেকে অন্য কেউ তাকে ভালো রাখবে। কি দরকার? যে মানুষগুলো থাকতে চায় না তাদেরকে রেখে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করার? যে আপনাকে সত্যিই ভালোবাসে কোন না কোন কারণ দেখিয়ে সে আপনার কাছে থেকে যাবে৷ আর যে ভালোবাসে না কিংবা ভালোবাসার মতো অভিনয় করে নিজের প্রয়োজনে,সে আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য কারণ খুঁজবে থেকে যাওয়ার জন্য না।

আমি যখন কিছু বললাম না তখন আবার স্পৃহা আমাকে বলল।

“ওর ট্রান্সফারটা হয়নি। কাল স্টেশনে আসবে আমাকে নেওয়ার জন্য৷ আমাকে ওখানে থাকতে বলেছে৷ একা তো আর এতকিছু নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই বলছিলাম আপনি যদি একটু সাহায্য করতেন। ”

আমি স্পৃহার দিকে তাকিয়ে হাসি স্পৃহা আমার হাসির কারণটা বুঝতে পারে না।

চলবে………..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here