মেঘের_উল্টোপিঠ,০২,০৩

#মেঘের_উল্টোপিঠ,০২,০৩
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
[০২]

পূর্বের বর্তমান বলা কথাটি শুনে হটাৎই উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসলো।ত্রস্ত পায়ে দু’কদম পিছিয়ে যেতেই তিনি কপালে সুক্ষ্ম ভাজ ফেললেন। তার হাবভাব এমন, সে বুঝতে পারছে না তার সামনের ব্যাক্তির বর্তমান মনোভাব। পূর্ব জ্বরাক্রান্ত কন্ঠে থেমে থেমে বলল,

‘ পিছে নয় সামনে, কাছে আসতে বলেছি তোমায়। তুমি কি কানে কম শুনো?’

আমি থমকে দাঁড়াই। আমি কিভাবে বলবে আমার অস্বস্তি হচ্ছে? খানিক বাদে পূর্ব বোধহয় কিছু আন্দাজ করতে পারল। তাই সে বিরক্তি মিশ্রিত তপ্তশ্বাস ফেলে চিবিয়ে বললেন,

‘ স্টুপিড! ফোনটা এগিয়ে দেওয়ার জন্য ডাকছি তোমায়। উল্টোপাল্টা চিন্তা কেনো করো?’

প্রশান্তির শ্বাস ফেলে আমি লজ্জায় নতজানু হই। ইশ! কি কি ভাবছিলাম আমি। পূর্বের আমার মনোবস্থা বুঝে যাওয়াতে লজ্জাটা ক্রমশ যেনো দ্বিগুণ হলো। স্বাভাবিক গতীতে এগিয়ে গিয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে পূর্বের ফোন এগিয়ে দেই। ফোন এগিয়ে দেয়ার পর আলত আঙুলের ছোঁয়ায় ধাতস্থ হই পূর্বের বেশ জ্বর আছে এখনো শরীরে। চটজলদি অস্থির হয়ে বলি,

‘ আপনার তো জ্বর এখনো অনেক। ঔষধ খাননি?’

পূর্ব ফোন স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখে তার স্বভাবরত রাশভারী কন্ঠে উত্তর দেয়,

‘ না। ‘

‘ কেনো? ‘

‘ আমার জ্বর এমনিই কমে যাবে। তুমি নিজের রুমে যাও। ‘

হটাৎ অপমানিত বোধ হলো। ফুঁসে ওঠে আঁড়চোখে তাকাতেই স্বরণ হলো এই লোকের কথার ধরণ সম্পর্কে। পূর্ব প্রয়াসই এভাবেই কথা বলে। খোঁচা মেরে! আজ অব্দি দেখিনি পূর্ব কারো সাথে রাশভারী কন্ঠ ছাড়া নম্র, স্বাভাবিক স্বরে কথা বলেছে।

‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো?’

হকচকিয়ে আমি পূর্বের পানে তাকাই। অতঃপর পিছন ফিরে দরজার কাছে আসতেই দরজা বাহির থেকে লক দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম ! দুই একবার ধাক্কাধাক্কি করেও বিশেষ কোনো লাভ হয়না। পূর্ব বিরক্তি চাহনি নিক্ষেপ করে আমার সকল কার্যক্রম যে মৌন রূপে দেখছে তা বেশ বুঝতে পারছি। পরিশেষে সে ধৈর্যের বাধ ভেঙে বলল,

‘ কি হয়েছে? দরজা ধাক্কাধাক্কি করছো কেনো?’

আমি পিছন তাকিয়ে বিরস মুখে বলল,

‘ দরজা মেবি লক হয়ে গিয়েছে। এই দরজাটায় একটু প্রবলেম আছে। পুরোপুরি লাগালে অটোমেটিক লক হয়ে যায়। ‘

পূর্ব এবার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। চোখ বন্ধ করে নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে রইল। নিজ স্বভাবরত কন্ঠে বললেন,

‘ এখানে এসে বসো। এতো রাতে কাকে ডাকাডাকি করবে?সবাই নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত আজ! ‘

খানিক সম্মতি জানাই।তবে গহীনে আমি বিষাদ মনে কুপোকাত। যা চাইছিলাম না, তাই কাকতালীয় ভাবে ঘটলো আমার সাথে। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে পূর্ব এবং আমার মাঝে বেশ ব্যাবধান বজায় রেখে এক কোনায় বসে পড়ি। অতঃপর সময় পার হতে গোঙানির সুর কর্ণপাত হয় আমার। চট করে পূর্ণ দৃষ্টি পূর্বের মাঝে আবদ্ধ করতেই দৃশ্যমান হয় তিনি তার দু’হাত দ্বারা মাথা চেপে ধরে মৃদু স্বরে কিছু বলছেন।

হতভম্ব হয়ে চিন্তিত চাহনি নিক্ষেপ করার এক পর্যায়ে বিশাল সঙ্কোচকে দূরে ঠেলে পূর্বের খানিক কাছে গিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললাম,

‘ আপনি ঠিক আছেন? ‘

পূর্ব জবাব দিলো না। পিটপিট করে তাকিয়ে ব্যাথাতুর কন্ঠে বললেন,

‘ মাথা ব্যাথা করছে একটু। তাছাড়া ঠিক আছি!’

অতঃপর নিশ্চুপতা! পূর্ব আর একবারও কোনো শব্দ করলেন না। তবে তার ফর্সাটে মুখ কেমন শুকিয়ে আসছে। অসুস্থতার প্রমাণ তার মুখশ্রী প্রমানিত করছে। হুট করেই সকল জরতা পিছু ফেলে তার দিকে এগিয়ে যাই। আলত করে একহাত তার কপালে রাখতেই সে চমকে বদ্ধ নেত্রপল্লব উন্মুক্ত করে। আমার দিকে আশ্চর্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে ফের নেত্রপল্লব বন্ধ করে নিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,

‘ আমার সেবা করে নিজে অসুস্থ হওয়ার কোনো দরকার নেই। বেশি রাত জাগলে তার মাথা ব্যাথা করে এটা মনে থাকা উচিত! ‘

বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে পূর্বের দিকে তাকিয়ে আছি। এই লোক জানলো কিভাবে রাতের বেলা বেশিক্ষণ জেগে থাকলে আমার মাথা ব্যাথা করে?

________________________

সকাল হতেই পূর্বের বাবা, মা জরুরি কাজ থাকায় ঢাকার বাহিরে চলে যায়।পূর্ব এখনো আমাদের বাসায় ঘুমে মগ্ন! আমি বিরস মুখে বারংবার আম্মুর দিকে দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করার পরও আম্মু তাতে ভাবলেশহীন ভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। পরিশেষে ব্যাকুল হয়ে বলি,

‘ আম্মু প্লিজ আমি পূর্বের সাথে মেডিকেল যাবোনা। সবাই আমাদের একসাথে দেখলে কি বলবে বলো তো? পূর্ব আমার টিচার হয় আম্মু যতই বিয়ে হোক না কেনো আমাদের। এটা তো আর মেডিকেলে কেও জানেনা। ‘

আম্মু ব্যাস্ততার ভঙ্গিতে বলল,

‘ কলেজের সবাই অলরেডি জেনে গিয়েছে। পূর্বের বাবা, তোর শশুর সবাইকে বলে ফেলেছে। সবাইকে বলতে টিচারদের। তাদের থেকেই আস্তে আস্তে পুরো মেডিকেল কলেজে ছড়িয়ে পড়েছে তোদের কথা। ‘

মুখশ্রী পাংশুটে আকার ধারণ করে বিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। কলেজে যাওয়ার পর কি হবে কে জানে?টিচারকে বিয়ে করেছি! নিশ্চিত এ নিয়ে পুরো কলেজে সমলাচোনা তৈরি হবে। কিছু খোঁচা মারা স্টুডেন্ট খোঁচা দিতে শুরু করবে। সবথেকে বড় কথা সমাজ অতি বিশ্রী কথা রটিয়ে ছাড়বে। টিচার বিয়ে করেছে স্টুডেন্ট কে! নিশ্চিত তারা চুপ থাকবে না। আফটার অল বাঙালিদের সমাজ এটা।
আম্মুরও হটাৎ করে পূর্বের সাথে আমায় কলেজ পাঠানোর রিজনটা বোধহয় এটাই। পূর্ব পাশে থাকলে কেও ‘টু’ শব্দ অব্দি করতে পারে না। কিন্তু পূর্ব পাশ হতে চলে যাওয়ার পর?তখন কি করে সামাল দিবো?

.
পূর্ব ঘুম থেকে ওঠার পর আম্মু তাকে জানালেন আমাকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার কথা। পূর্ব কোনো রূপ ভনিতা ছাড়া আলত হেঁসে স্বীকৃত জানালেন তিনি আমায় তার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। ক্লাস ৭ টা থেকে শুরু হলেও ৬ টা বাজেই বের হতে হচ্ছে পূর্বের রোগী দেখার তাড়া থাকায়। আম্মুর সাথে একান্ত কিছুক্ষন কথা বলার পর পূর্ব এসে ড্রাইভিং সিটে বসলেন।আমি তার পূর্বেই ফ্রন্টসিটে বসে পড়েছিলাম। গাড়ি স্টার্ট না দেয়ায় পূর্বের পানে অবলোকন করার পর থতমত খেয়ে যাই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে। আমি কিছু বলার আগেই তিনি বললেন,

‘ ফ্রন্টসিটে বসে সিটবেল্ট না লাগিয়ে নিজেকে প্রতিবার ডাফার প্রমাণিত করতে ভালো লাগে তোমার? ‘

বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকাতেই পূর্ব বাঁকা হাসে! আমার দৃষ্টির পরোয়া না করে সে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে তাড়া দেয় সিটবেল্ট লাগানোর জন্য। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে এখনো বিষ্ময়ের রেশ কাটাতে পারিনি। সে আমার ব্যাক্তিগত অভ্যাসগুলো সম্পর্কে অবগত হলেন কি করে?হাউ?
.

গাড়ি কিছু দূর অব্দি যেতেই আমি আমতা আমতা করে পূর্বকে জিজ্ঞেস করলাম,

‘ শরীর কেমন এখন আপনার?’

দু’সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর পূর্ব ফিচেল কন্ঠে বললেন,

‘ ভালো। কাল রাতে কতক্ষণ অব্দি জেগে ছিলে?’

‘ বেশিক্ষণ না। আপনি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর-পরই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ‘

পূর্ব আর কিছু বলল না। আমি তা দেখে নিঃশব্দে সিটে মাথা এলিয়ে চারপাশ দেখায় মত্ত হই! সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছতেই গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাম দিকে কাত হওয়ার পর হটাৎ পূর্ব বললেন,

‘ ওয়েট! এতো তাড়া কিসের তোমার?’

আমি হতভম্ব হয়ে বলি, ‘ এসে পড়েছি তো। ‘

‘ সেটা আমিও জানি। ‘

পূর্বের কথা মতোন চুপ করে বসে থাকাকালীন সে গাড়ি থেকে নেমে এসে আমার পাশের গাড়ির দরজা খুলে দেয়। বিশাল চমকে তাকাতেই পূর্ব নেত্র দ্বারা ইশারা করে নামতে বলল। আমি কোনোমতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি! অবাকের সীমারেখা যেনো মিটছেই না। এ যেনো রীতিমতো এক নতুন পূর্বকে ক্ষনে ক্ষনে আবিস্কার করছি।

গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানোর পর খেয়াল হলো পুরো মেডিকেল কলেজের সকলে আমাদের দু’জনের দিকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। পিয়ন থেকে শুরু করে সিনিয়র ডাক্তার, টিচার্স, স্টুডেন্ট সকলে!অস্বস্তিতে নতজানু হয়ে আঁড়চোখে পূর্বের পানে অবলোকন করতে তাকে স্বাভাবিক দেখা গেলো। সে হুট করে আমার একহাত আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। মাঝেপথে কেও কেও ফিসফিস করলেও সামনে এসে পূর্বকে মুখোমুখি জিগ্যেস করার মতোন সাহস কারো হলো না। পরিশেষে পূর্বের সিনিয়র একজন ডাক্তার এসে বললেন,

‘ দোলের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে শুনলাম। কাল তোমার বাবা জানালো। নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল পূর্ব। ‘

পূর্ব তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে ম্লান হাসি বিনিময় করলেন। অতঃপর সেই ডাক্তার প্রস্থান করার পর তার বান্ধবী হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,

‘ মেয়েটা কে পূর্ব? তুই পুরো কলেজের সামনে ওর হাত ধরে আছিস কেনো?’

পূর্ব ভনিতা ছাড়া রাশভারী কন্ঠে বললেন,

‘সি ইজ মাই ওয়াইফ! মিসেস.ফায়াজ আবরার পূর্ব। ‘

ফারাহ্ আপু দ্বিতীয়বার কোনো কথা বলল না। তার মুখশ্রীতে আহত দৃষ্টি খেয়াল করে আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম তার এরূপ দৃষ্টির কারণ। ক্লাসের সামনে আসার পর জরতা নিয়ে পূর্বকে উদ্দেশ্য করে বলি,

‘ আমার হা..হাত..’

ছিটকে হাত ছেড়ে দেয় সে! দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়ে কাঠ কাঠ কন্ঠে বলল,

‘ হাত ধরার ইচ্ছে ছিলো না। জাষ্ট সবাইকে জানানোর জন্য তুমি আমার ওয়াইফ এন্ড উই এক্সেপ্ট দিস ম্যারেজ, দ্যাট’স ইট! ক্লাসে কেও কোনোরকম ডিস্টার্ব করলে আমায় কল করবে। নিজের খেয়াল রেখো। ‘

পূর্ব কথার সমাপ্তি টেনে দিক-বেদিক না দেখে নিজের চেম্বারের দিকে যেতে থাকেন।তার যাওয়ার পানে এক নজর অবলোকন করে পাথর মূর্তির ন্যায় তাকিয়ে থাকি। সবকিছু যেনো আমার ভাবনার থেকে উল্টো ঘটছে! অপরিচিত পূর্ব আবিষ্কার করছি বারংবার। এ কোন পূর্ব?

ক্লাসে যেতেই নীরব, আদ্রাফ দুজন মিলে হুট করে বিয়ে করার কারণে স্লাং ওয়ার্ড ইউজ করে ভাষণ ছুড়লো।
পরিশেষে বিরস মুখে অরিন বলল, ‘ সেটা ছাড় আদ্রাফ। দোল যে এতো হ্যান্ডসাম একটা বর পেয়ে গেলো এখন আমার কি হবে?আমি তো পূর্ব স্যাররে্ নিজের ফুটবল টিমের লিডার বানায় ফেলছিলাম মনে মনে। ‘

তিনজনের বিদঘুটে মতবাদে কান না দিয়ে নিজের কাজে মত্ত হই আমি! পূর্বের নতুন রূপ ক্ষনে ক্ষনে উন্মাদে পরিণত করছে আমায়।
চিন্তামগ্ন কালে ফোন টুংটাং ম্যাসেজ আসার শব্দ কর্ণধারে এসে প্রতিফলিত হয়। ম্যাসেজটা পূর্বের নাম্বার থেকে এসেছে। ম্যাসেজ ওপেন করার পর মূর্হতেই ভড়কে যাই!

চলবে…

#মেঘের_উল্টোপিঠ
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
[পর্ব-০৩]

রৌদ্র্যজ্বল দুপুর!রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার অবস্থা কাহিল! একে তো পা ব্যাথা করছে তার ওপর তপ্ত রোদের উত্তাপ! পরিশেষে এই মূর্হতে ‘ পূর্ব ‘ নামক ব্যাক্তিটাকে ভয়ংকর কিছু কথা শোনাতে ইচ্ছে করছে। এই লোক আমায় টিএসসি তে আসতে বলে নিজে গায়েব! আধা ঘন্টা হতে চলল, কিন্তু তার দেখা নেই। আসবে কিনা কে জানে?তবুও কেনো যেনো ঠায় দাড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছি।

ক্লাসে পূর্ব ম্যাসেজ দিয়েছিলো যাতে ক্লাস শেষে টিএসসি তে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করি। আমায় নিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই সময় ম্যাসেজটা দেখে ভড়কে গিয়েছিলাম। তার সাথে আগে কখনোই একা কোথাও যাওয়া হয়নি। কারণটা হয়তো তাই।

ক্ষনিক বাদে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে রোডে আসার পর আমার ঠিক সামনে, রাস্তার ওপারে থাকা ছেলেটাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায়। এই ছেলেকে প্রায়ই দেখি আমি যেখানে সেও সেখানে হাজির। ছেলেটা যখন আমার দৃষ্টি তার ওপর বুঝতে পারলো তখন সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসলো। পাশে দাঁড়িয়ে একগাল হেঁসে বলে,

‘ভালো আছেন ভাবী?আমি ফুয়াদ! ‘

ফুয়াদের কথায় কৃত্রিম হেঁসে বলি, ‘ জি ভালো আছি। আপনি কি আমায় চেনেন? আপনাকে প্রায়ই দেখি আমায় ফলো করতে। কারন কি?সঠিক উত্তর দিবেন নয়তো আমি আপনাকে পুলিশে দিবো।’

ফুয়াদ প্রশস্ত হেঁসে বলল,’ পুলিশের থেকে বড় পদে চাকরি করি আমি। চাইলে আপনি আমায় নিজের কাছেই ধরিয়ে দিতে পারেন। হা হা! আচ্ছা যাইহোক ভাবী। আপনাকে আমি চিনি কয়েক বছর ধরে। তবে আপনি মেবি আমায় কিছুদিন যাবৎ ধরে খেয়াল করেছেন।আপনাকে ফলো করা ভাইয়ের আদেশে! ভাগ্য করে এমন প্রেমিক পেয়েছেন ভাবী।’

ফুয়াদের কথা শ্রবণ করামাত্র আশ্চর্যের সীমা অতিক্রম করে হা করে তাকিয়ে আছি। ছেলেটা বলে কি?বিষ্ময় নিয়ে প্রশ্ন করতে নিবো তৎক্ষনাৎ পিছন হতে ভরাট কন্ঠ ভেসে আসে কর্ণধারে। পিছন ফিরে দৃর্ষ্টিতর হয়।তিনি আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শ্বাস টেনে বললেন,

‘ বেশি লেট করে ফেললাম মেবি। এক্সট্রিমলি সরি! ‘

আচানক ফুয়াদের ব্যাপার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে আশ্চর্য ভঙ্গিতে বলি,

‘ আপনি আমায় সরি বললেন? লাইক সিরিয়াসলি! ভুল শুনলাম না তো আমি। ‘

পূর্ব রাশভারী কন্ঠে বলল, ‘ ষ্টুপিডের মতো আচরণ করবে না। গাড়িতে উঠো। ‘

হুঁশে এসে পিছন তাকাতে জায়গা শূন্য দেখে চমকে গেলাম। অস্ফুটস্বরে বলি, ‘ ছেলেটা কই গেলো?’

পূর্ব এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। আমি তার দৃষ্টি উপেক্ষা করে চারপাশ সচেতন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।

পূর্ব আচানক বললেন,’ আমি যখন এখানে এসেছিলাম তখন তুমি বাদে আর কাওকেই দেখিনি দোল! ‘

ফুয়াদ চলে গেলো?কখন? ইশশ ধুর! এই ছেলেটাকে আরো কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো। অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটছে কয়েকমাস ধরেই আমার সাথে। হয়তো সেই অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখা এবং সমাধান ফুয়াদ দিতে পারতো। কিন্তু এই লোক এভাবে উধাও হয়ে গেলো কেনো?
একবার মনে হলো পূর্বকে ফুয়াদের কথা খুলে বলি।তবে পরবর্তীতে কিছু মনে করে আর বলা হলোনা। নিম্ন কন্ঠে তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

‘ চলুন! চলে গিয়েছে হয়তো আমি যার কথা বলছি।’

পূর্ব গাড়িতে উঠে বসলো চটপট। আমি তার পাশে বসে চিন্তিত চাহনি বাহিরে নিক্ষেপ করে আছে। তবে হুট করে গালে উত্তপ্ত শ্বাস পড়ায় সামনে পড়লো পূর্বের মুখশ্রী। ভড়কানো দৃষ্টিতে তাকাই তার পানে। পূর্ব সিটবেল্ট লাগিয়ে দিতে নিলে নেত্রপল্লব বন্ধ করপ নিজেকে শ’খানেক গালি দেই। অস্বস্তি হচ্ছে!এই সিটবেল্ট লাগানোর কথা কেনো কখনোই আমার মনে থাকে না? পূর্বকে এতো কাছে, এই মূর্হতে কাম্য করিনি। কোনো মূর্হতেই করিনা কাম্য। সিটবেল্ট লাগিয়ে পূর্ব সরে গিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,

‘ কেয়ারলেস মেয়ে একটা। নিজে আঘাত পেয়ে অন্যকে দহনে পোড়াতে প্রতিনিয়ত তার ভালো লাগে। ষ্টুপিড কোথাকার! ‘

পূর্বের বিড়বিড় করে বলা কথা আবছা কানে এলো।তবে তার কথায় পাত্তা দিলাম না মাথায় আগ হতেই ডজন খানেক টেনশন থাকায়। বর্তমানে আমার মাথায় ঘুরছে ফুয়াদের কথাগুলো। কি বলল সে?

গাড়ি এসে থামলো আলিশান এক বাংলোর সামনে। বাংলোটাকে চিনি! আগেও বহুবার আশা হয়েছে এখানে বাবার সাথে। এটা পূর্বদের বাংলো। কিন্তু হটাৎ করে পূর্বের আমায় নিয়ে এখানে কেনো আগমন ঘটলো তা বোধগম্য হলো না। জিগ্যাসু দৃষ্টিতে পূর্বের পানে তাকাতে তিনি বললেন,

‘ আম্মু নিয়ে আসতে বলেছে তোমায়। তার নাকি জরুরি কাজ আছে তোমার সাথে। ‘

আমি স্বাভাবিক কন্ঠে বলি, ‘ আংকেল, আন্টিরা তো ঢাকার বাহিরে ছিলো। এসে পড়েছেন?’

‘ না! আসেনি এখনো তবে আম্মু বলেছিলো তোমায় আগে থেকেই আমার সাথে নিয়ে আসতে। তারা রাস্তাতেই আছে। এসে পড়বো হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে। ‘

‘ অহ। ‘

পূর্ব তার দু’হাতে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল,

‘ ভেতরে চলো জলদি। বৃষ্টি আসবে বলে মনে হচ্ছে।’

আকাশে মেঘের গর্জন শুনে দ্রুত পায়ে পূর্বের পিছু যেতে থাকি। তবে শেষ রক্ষা বুঝি হলোনা। বাংলো তে প্রবেশ করার সরু রাস্তাটা এতোটাই লম্বা যে পথিমধ্যে যেতেই বর্ষণ নেমে আসে ধরনীতে। মেঘের গর্জন, কালশিটে আঁধারে ছেয়ে থাকা চারিপাশ, তার সঙ্গে বৃষ্টি! প্রেমিক – প্রেমিকাদে মত অনুসারে এটাকে ‘ রো-মা-ন্টি-ক ওয়েদার ‘ বলে গণ্য করা হয় কিন্তু আমার মত অনুসার এটাকে আপাতত ‘বাঁশ ওয়েদার ‘ বলবো। পূর্বের সামনে এভাবে ভিজে জুবুথুবু অবস্থায় থাকতে হটাৎই ভিষণ লজ্জা কাজ করছে!

খানিক বাদে পূর্ব হুট করে আমার এক হাত আঁকড়ে ধরলেন। সামনের দিকে দ্রুত পায়ে অগ্রসর হতে হতে তাড়া দিয়ে বললেন,

‘ কাম ফাষ্ট! ভিজে যাচ্ছো তুমি। ‘

বাংলোতে প্রবেশ করা মাত্র দু’চারবার হাঁচি দিয়ে চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কোল্ড এলার্জি আছে আমার। আজকের দিনটা কতটা বাজে যাবে তা ভাবতেই কেঁপে উঠছি! পূর্ব হাত দিয়ে চুলের পানি ঝেড়ে ফেলে আমার দিকে অবলোকন করে বললেন,

‘ জলদি ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসো। যদিও বিশেষ কোনো লাভ হবে বলে মনে হচ্ছেনা। অলরেডি চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে তোমার। ড্যাম! কোল্ড এলার্জি আছে যে আপনার তা জানা সত্বেও এতোটা কেয়ারলেস কিভাবে হলে দোল? এতো ধীর গতীতে না হাঁটলে এভাবে ভিজতে? গো ফাষ্ট নাউ (now)! ‘

আমি ইতস্তত বোধ করে বললাম,

‘ ড্রেস কোথাও পাবো? ‘

পূর্ব তপ্তশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ Come with me! ‘

সিঁড়ি বেয়ে দুই তলার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ডানে গিয়ে একটা রুমে ঢুকে তিনি আমায় ইশারা করে বললেন তার সামনে এসে দাঁড়াতে। আমি তার সামনে দাঁড়ানোর পর সে পিছন হতে হাত এগিয়ে কাবার্ড খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে নেত্রপল্লবের সামনে ভেসে ওঠে বাহারি ধরনের, এক্সপেন্সিভ বেশ কয়েক শাড়ী! বেশ কয়েক বলতে এখানে এটলিষ্ট ১৫,২০টার মতো শাড়ী আছে তা নিশ্চিত। শাড়ীগুলোতেও বেশ ইউনিক কাজ করা, বলতে গেলে চমৎকার দেখতে! আমি সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে বলি,

‘ আপনি কি শাড়ীর ব্যাবসা করেন?’

পূর্ব ঠোঁট বাকিয়ে বললেন, ‘ হোয়াট?’

‘ না মানেহ্ এতো শাড়ী কেনো এখানে? বিক্রি করেন এগুলো?’

‘ শাট আপ! এখান থেকে নিজের পছন্দ মতো একটা শাড়ী চুজ করে জলদি ফ্রেশ হয়ে আসো। ‘

তার কথা মতোন কালো রঙের একটা শাড়ী নিয়ে চটজলদি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ি। কিয়ৎক্ষন পর নিজের কার্য সমাপ্ত করে ওয়াশরুম থেকে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছে খেয়াল হলো পুরো রুমে শূন্যতা বিরাজমান। প্রশান্তির শ্বাস ফেলে নিজের কাজে ব্যাস্ত হই। থ্যাংক গড পূর্ব গিয়েছে। নয়তো কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারতাম না।

_______________________

কাঁটায় কাঁটায় আধা ঘণ্টা পার হওয়ার পর রুমে আগমন ঘটে পূর্বের। কেমন থমকে তাকিয়ে আছে আমায় দেখা মাত্রই! আমায় দেখে ভূত দেখার মতো চমকানোর মতো কোনো ভ্যালিড রিজন না পেয়ে আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। নিজেকে একবার পরখ করে নিয়ে পূর্বকে বললাম,

‘ কিছু বলবেন ?এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?’

পূর্ব আশপাশে দৃষ্টি দিয়ে শীতল কন্ঠে বললেন,

‘ আব্বু, আম্মু আজকে আসতে পারবে না। গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই তারা সেখানকার একটা হোটেলে উঠেছে। বৃষ্টি প্রচুর তাই আর বের হবেনা আজ। ‘

আমি ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে বলি, ‘ তাহলে আমি বাসায় চলে যাই?’

‘ বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে। আজ যাওয়ার দরকার নেই। বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয়না। একবার বৃষ্টিতে ভিজেছো তুমি । চোখ লাল হয়ে আছে তার দিকে খেয়াল আছে?’

আড়চোখে আয়নায় অবলোকন করার পর দৃশ্যমান হলো আমার রক্তিম নেত্রপল্লব। আসলেই এখন যাওয়া উচিত নয়! কিন্তু পূর্বের সাথে একা থাকবো?যদিও সে ধর্মীয় মতে আমার হ্যাজবেন্ড তবুও যেনো অস্বস্তি। সবকিছু তো মন হতে কবুল করিনি এখনো। মুখে কবুল বললে কিইবা হবে?

পূর্ব ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসলেন। বেলকনিতে গিয়ে টাওয়াল এনে হাত ধরে তিনি আমায় বেডে বসিয়ে দেন। হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকানোর পর সে ভুলেও আমার দিকে তাকালেন না। আস্তেধীরে মাথা মুছে দিচ্ছেন। আমি শিথিল হয়ে বলি,

‘ আমার কাছে দিন। আমি করে নিচ্ছি। ‘

পূর্ব খানিক তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

‘ কতটা যে করেছো তার প্রমাণ দেখতেই পাচ্ছি। এক্সাক্টলি কি প্রমাণ করতে চাচ্ছো দোল? আমি তোমায় শশুর বাড়ি এনে অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছি এটা দেখাতে চাও নাকি নিজে অসুস্থ হয়ে যন্ত্রণা দিতে চাও তাকে?’

আমি হকচকিয়ে বলি, ‘ আজব! কি বলছেন এসব?আর ‘ তাকে ‘ মানে? কার কথা বলছেন?’

পূর্ব ফিচেল কন্ঠে বললেন,

‘ Feel the days left behind then maybe you find him.’

পূর্ব বের হয়ে যায় রুম থেকে। আমি হ্যাবলার ন্যায় তাকিয়ে আছি সেদিকে। সবকিছু কেমন রহস্য, ধাধার মতো লাগছে। ফুয়াদের উদ্ভট বক্তব্য এখন আবার পূর্বের এমন বার্তা! আসলে হচ্ছেটা কি এসব?

___________________________

রাতের দিকে হাড় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। তবে জ্বরকে উপেক্ষা করে ফোনে থাকা নোট থেকে পড়া কমপ্লিট করতে হচ্ছে। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট এর রেস্ট বলে কিছুই নেই। সেটা হোক অসুস্থ হলেও। মেডিক্যাল লাইফ মানে লাইফ পড়াময়!

তবে ধৈর্যশক্তি ক্ষনে ক্ষনে যেনো কমে আসছে। কোনোরকম পড়াগুলো পড়ছি তবে মাথায় ঠিকমতো ঢুকছে কিনা জানা নেই।
খানিকক্ষন বাদে মাথা তুলে সামনে অবলোকন করতেই ভড়কে যাই। পূর্ব তার ডান ভ্রু উঁচু করে কাবার্ডের সাথে হেলান দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার পানে। আমি ভড়কানো কন্ঠে বলি,

‘ আপনি কখন আসলেন?’

পূর্ব নিজের স্থানে অটল থেকে বললেন,

‘ এসেছি হবে কয়েক মিনিট। জ্বর এসেছে তবুও এতো জোর করে পড়ছো কেনো?আজকের দিন রেস্ট নিলে কোনো ক্ষতি হয়ে যাবেনা। পড়া রেখে ঘুমিয়ে পড়ো। ‘

আমি তার কথা মতোন দূর্বল শরীরে শুয়ে পড়ি ঠিকি কিন্তু ঘুম আসছে না জ্বরের প্রকোপে। ক্ষনিক বাদে পূর্ব এগিয়ে আসলেন। কম্বল জরীয়ে দিতে নিলে আমি হিতাহিত জ্ঞান ফেলে তার একহাত আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ি। মাত্রাতিরিক্ত জ্বরের কারণে আপাতত কিছুই মাথায় আসছিলো না। না লজ্জা, না সঙ্কোচ!পূর্বকে দেখলাম সে আমার পাশে আধশোয়া হয়ে বসে রইল হতভম্ব হয়ে! পরবর্তীতে কানের পিঠে চুল গুঁজে দিয়ে কানের নিকট ফিসফিসিয়ে বললেন,

‘ ঘুমাও। আমি আছি তোমার পাশে! সর্বদা, সর্বক্ষণ! ‘

পূর্বের কথাগুলো ঠিক মতোন উপলব্ধি করার অবস্থায় নেই আমি। তবে ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে স্পষ্টত অনুভব করলাম কেও আমাকে লতা- পাতার ন্যায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে! ‘ কেও ‘ টা কে? পূর্ব কি? তিনি আমায় জরীয়ে ধরেছেন? মাই গড! তীব্র জ্বরে চোখ খোলার শক্তিটাও বুঝি লোপ পেয়ে গেলো আমার।দেখা হলোনা আদও আমার ধারণা সঠিক কিনা!

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here