মায়াবিনী মানবী,”বোনাস পর্ব”

মায়াবিনী মানবী,”বোনাস পর্ব”
হুমাশা_এহতেশাম

–দোস্ত এইটা এডিট না তো?

জায়েফ কথাটা ব্যাপক সন্দেহ নিয়ে বলল।আলআবি জায়েফ এর কথায় হো হো করে হেসে উঠলো। গায়ের কোর্টটা খুলে গাড়ির পিছন সিটে রাখতে রাখতে বলল…

–পিছনে দেখ আমার মায়ের বাণী লেখা আছে।

জায়েফ দ্রুত করে ছবির পিছনের লেখা পড়ল।লেখা টা পড়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।আলআবি গাড়ি স্টার্ট দিল।জায়েফ হাসতে হাসতে আলআবি কে বলল…

–এই না হলো কর্ণেলের স্ত্রী!

আলআবি ড্রাইভ করতে করতে বলল…

–কর্ণেলের স্ত্রীর জন্য ই তো ওকে পেলাম।

–তা তোর কর্ণেল বাপ কই? অনেক দিন আঙ্কেল এর সাথে দেখা হয় না।(জায়েফ)

–দুই দিন আগে মিশন থেকে এসেছে।আর কয়েকদিন পর রিটায়ার্ড হবে।(আলআবি)

অনেককাল নীরবতার পর জায়েফ আবার বলে উঠলো…

–আলুবাবু তোর জুলিয়েটের সঙ্গে বিয়েটা হয়ে গেলে আমার লাইনটা ও ক্লিয়ার করে দিছ।

আলআবি জায়েফ এর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই জায়েফ মুখে নকল হাসি আনার চেষ্টা করতে লাগলো।আলআবি দাঁতে দাঁত চেপে বলল…

–তুই চিরকুমার থাকবি।জীবনে ও তোর বিয়ে হইতে দিব না।

জায়েফ দ্রুত বলে উঠলো…

–আরে সরি! সরি!মুখ দিয়া আর ভুলেও আলুবাবু বের হবে না।এখন থিকা আমি কোন আলুবাবুরে চিনি না।

আলআবি বাড়ির সামনে এসে খুব জোরে গাড়ি ব্রেক মেরে বলে…

–আমিও কোন জায়েফরে চিনি না। যা ভাগ।

–ভাই এমন অন্যায় করিছ না আমার সাথে। সাদিয়ার বাচ্চার বাপ হইতে হইব আমার। বাচ্চা গুলা আমার অপেক্ষায় আছে। (জায়েফ)

–কার বাচ্চার বাপ হবি পরে দেখা যাইব।শালা নাম এখন।(আলআবি)

গাড়ি গ্যারেজে পার্ক করে দুজন বাড়ির ভিতর ঢুকে পরলো। ড্রইংরুমে আলআবির মা বাবা আর ভাই ভাবি ওদের অপেক্ষায় ছিল। ঢুকতে ই আলআবি গিয়ে তার বাবা কে জড়িয়ে ধরলো।

সিরাজ সাহেব ছেলের সংবাদ পেয়ে বেজায় খুশি। বন্ধু মহলেও ছেলেকে নিয়ে তার খুব গর্ব।এই গর্বের পিছনে তার আর মিসেস পারভীন এর অবদান অনেক বেশি। ছোট থেকে ই সিরাজ সাহেব দুই ছেলেকে অনেক যত্নে লালন পালন করেছেন।তিন বাপ ছেলের সম্পর্ক বন্ধুর ন্যায়।

আলআবির বড় ভাই ফারাবী যেদিন মিথিলা কে প্রপোজ করে সেদিন সবার আগে নিজের বাবা আর ছোট ভাইকেই বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।সেদিন ফারাবী বাড়ি ফেরার পর নিজের বাবাই সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করেছিল-“কি ইয়াং ম্যান?সে কি আমার বউমা হতে রাজি হয়েছে?” ফারাবী হেসে উত্তর দিয়েছিল-“তোমার মতো হ্যান্ডসাম বুড়োর এই হ্যান্ডসাম ছেলেকে কি না করতে পারে?”

রাতে ডিনারে আলআবির সব পছন্দের খাবার দিয়ে টেবিল সাজানো হয়েছে।খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসে খাচ্ছে। এমন সময় মিসেস পারভীন আলআবি কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো…

–আলআবি কালকে তুমি জুইঁ এর সাথে গিয়ে দেখা
করে আসবে।

আলআবি প্রশ্নসূচক চাহনি দিয়ে মিসেস পারভীন কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো…

–জুইঁ কে?

আলআবির প্রশ্নে জায়েফের পানি খেতে গিয়ে কাশি উঠে যায়।মিসেস পারভীন তারাতাড়ি উঠে এসে জায়েফ এর পিঠে হালকা করে চাপড় দিতে লাগেন।ফারাবী সন্দেহের রেশ টেনে বলে…

–জায়েফ?তোর কি হলো?মেয়ে দেখতে যেতে বলেছে আলআবি কে তুই বিষম খেলি কেন?

জায়েফ স্বাভাবিক হয়ে মেকি হেসে বলল…

–না মানে আলআবির বিয়ের কথা চলছে তো তাই খুশি আরকি বিষম লেগে গেল।

আলআবির ভাবি মিথিলা বলে উঠলো…

–যার বিয়ে সেই তো বিষম খেল না।ব্যাপার না,জুইঁ কে সামনাসামনি দেখে বিষম খেয়ে যাবে। আমার তো ওকে হেব্বি পছন্দ হয়েছে।

সিরাজ সাহেব রসিকতার ছলে বলে উঠলেন…

–আমাদের জায়েফ আর বাদ থাকবে কেন?ওর জন্যেও তো পাত্রী দেখতে বলতে হবে।

জায়েফ তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো…

–হ্যাঁ। হ্যাঁ অবশ্যই।

জায়েফ এর কথায় মাশরুখ পরিবারের প্রত্যেকে হেসে উঠলো।

রাতে ডিনার শেষে আলআবি, জায়েফ,ফারাবী আর সিরাজ সাহেব বসেছেন ছাঁদে ক্যারোম খেলতে।খেলতে খেলতে সিরাজ সাহেব বললেন…

–এই কি সেই মেয়েটা আলআবি?

আলআবি বাবার দিকে একবার তাকিয়ে রেড পকেটে ফেলে কিঞ্চিৎ ঠোঁট প্রসারিত করে বলে…

–ধরে ফেললে?

সিরাজ সাহেব বললেন…

–এমনি এমনি কি আর বাবা হয়েছি?

পাশ থেকে ফারাবী বলে উঠলো…

–তাহলে এবার বিয়ে ফাইনাল?

আলআবির আগেই জায়েফ বলল…

–একশোবার ফাইনাল।ধরতে গেলে তো কালকেই অর্ধেক বিয়ে হয়ে যাবে।

ফারাবী জায়েফ এর দিকে তাকিয়ে বলল…

–যার বিয়া তার খবর নাই এদিকে জায়েফ এহমাদ এর ঘুম নাই।

আলআবি আর সিরাজ সাহেব এদের দুজনের কথায় হেসে দিল।আলআবি বলল…

–ফারাবী ভাই, কালকে এই বান্দররে সাথে নিলে নিশ্চিত জনগণের ধোলাই খাইতে হবে।তাই আমি কালকে একাই যাব।

ছাঁদে বসে চারজন আরও কিছু সময় নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে নিচে নেমে আসে।ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১:৩০ মিনিট বাজছে।প্রতিদিনের মতো আজও আলআবি বের হলো সেই প্রিয় টঙ্গের দোকানটার উদ্দেশ্যে।আলআবির পাশে ই জায়েফ ফোনে অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে। এই কথা তার বন্ধ হবে ভোর বেলায়।সারারাত ফোনালাপ করে উঠবে দুপুর ১ টা ২ টায়।

আজকে সারাদিন আলআবি বেশ খোশমেজাজে ই ছিল।আসরের নামাজ পড়ে গায়ে সেই আগের ন্যায় একটা শুভ্র বর্ণের পাঞ্জাবি চাপিয়ে বেড়িয়ে পরলো ক্যাফেটোরিয়ার উদ্দেশ্যে।জায়েফ যে এমনেও ওখানে এসে পড়বে তা আলআবির ভালো করে জানা আছে। প্রায় ১ ঘন্টার মতো পথ অতিক্রম করে ক্যাফেটোরিয়ার সামনে এসে আলআবি গাড়ি থামালো।গাড়ি থেকে নামার আগে মুখে মাস্ক জড়িয়ে নিল।

ক্যাফেটোরিয়ায় প্রবেশ করতে ই একেবারে ফিটফাট হয়ে বসে থাকা জায়েফের দিকে সর্বপ্রথম আলআবির নজর পরলো।আলআবি কে দেখা মাত্র ই জায়েফ ঠোঁটের কোণে চওড়া এক হাসি টেনে আনলো।জায়েফ এর সামানের চেয়ার টেনে আলআবি বসে পড়লো।

–সারপ্রাইজ কেমন দিলাম?

বলেই জায়েফ ভ্রুযুগল উপর নিচ করতে লাগলো।
আলআবি হাতের ফোনটা টেবিলে রেখে জায়েফ কে বলল…

–আজকে যদি সেন্টমার্টিনের মতো কোন গন্ডগোল পাকাছ তাইলে জীবনে ও তোরে বিয়ে করতে দিব না।আর সাদিয়ার কথা তো ভুইলাই যা।

–মাম্মা আজকে শুধু দেখবা এই জায়েফ এর কেরামতি।(জায়েফ)

–হইছে, কেরামতি দেখাইতে যাইয়া আবার আমার বিয়ে লাটে উঠাইছ না।আগের বার তো কম কেরামতি দেখাছ নাই।(আলআবি)

আলআবির সঙ্গে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ জায়েফ চমকে গিয়ে বলল…

–মাম্মা এইটা কোন পিছ?

আলআবি পিছনে ঘুরতেই চোখে পড়লো একটা মেয়ে ধীর পায়ে তাদের দিকেই আসছে। পড়নে তার হালকা নীল রঙা শাড়ি।স্তব্ধ দৃষ্টি তে আলআবি মেয়েটাকে দেখেই যাচ্ছে।আলআবির মনে হচ্ছে মেয়েটার চাহনি সব কিছু শীতল করে দিচ্ছে।অনেক দিন পর আজ সেই চোখের দেখা মিলল।মেয়ে টা ধীরে ধীরে এসে আলআবির সামনে দাঁড়িয়ে পরলো। তখনি হুট করে মেয়ে টার পাশে একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়ে পরলো। আলআবি ছেলেটাকে আপাদমস্তক দেখে নিল।

একেবারে ই ছিপছিপে গড়নের ছেলেটা। গায়ের বর্ণ অতিরিক্ত ফর্সা।এতোটাই শুকনো যে ওয়েট মাপার যন্ত্রে দাঁড় করিয়ে দিলে ছেলেটার ওয়েট ত্রিশ এর উপরে উঠবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে হচ্ছে তাদের সামনে কোর্ট প্যান্ট এর মধ্যে কেউ বাঁশ দিয়ে তা দাঁড় করিয়ে রেখেছে।কাকতাড়ুয়ার চেয়ে কম কিছু নয়।এতক্ষণে জায়েফ এসে আলআবির পাশের চেয়ারটায় বসে পড়েছে।

চলবে………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here