মায়াজাল সূচনা পর্ব

মায়াজাল
সূচনা পর্ব
লেখনীতে : নুসরাত তাবাস্সুম মিথিলা

গভীর নির্জনতায় ছেয়ে গেছে চারিদিক , নিকষ কালোতে অন্ধকার পরিলক্ষিত হচ্ছে আশেপাশে । মাঝে মাঝেই বাতাসে ভেসে আসা রাস্তার কুকুরগুলোর আওয়াজে চারিপাশ মুখরিত হচ্ছে । কিন্তু এসব কিছুকে তোয়াক্কা না করে কেউ একজন এই গভীর রাতের আড়ালে নিজের করা অপকর্মকে মাটি চাপা দেয়ার জন্য একটি পরিত্যক্ত জমিতে নিরবে , চুপিসারে কবর খুড়ছে । তবে মাঝে মাঝে মাটিতে কুড়ালের আঘাতের শব্দে যেন নিস্তব্ধ প্রকৃতি কেপে উঠেছে । কবর খোঁড়া শেষ হতেই গাড়ির ভেতরে থাকা কালো পলিথিনে মোড়ানো অর্ধ গলিত লাশটিকে টেনে কবর পর্যন্ত নিয়ে আসে সেই ব্যক্তি । তারপর লাশটিকে কবরে রেখে মাটি চাপা দিয়ে উক্ত স্থান দ্রুত ত্যাগ করে সে । বিগত তিনদিন যাবৎ লাশের উটকো গন্ধে ঘরে টেকাটাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার জন্য । আর যাই হোক লাশের সাথে এক ছাদের তলায় বাস করা অসম্ভব । অবশেষে এই আপদটাকে বিদায় করে বেশ আত্মতৃপ্তি হচ্ছে তার । গাড়ি ড্রাইভ করে নিজের বাংলোতে ফিরে এলো সে । রাতের অন্ধকার কেটে সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে , সাথে পাখিদের কিচিরমিচিরে আন্দোলিত হচ্ছে চারিপাশ । স্নিগ্ধতায় পূর্ণ সকাল , যা একটি নতুন দিনের সূচনা । গভীর রাতের নির্মমতা , পাশবিকতা , নিষ্ঠুরতার মুখোশ পাল্টে ফেলতে , নিজেকে পাপমুক্ত করতে গোসলটা সেরে নিল সে । তার কাছে মনে হচ্ছে প্রতিটা জলের ফোটার সাথে তার ভেতরের পাপগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে আর সে পবিত্রতার চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে । দিনের বেলায় স্নিগ্ধ , সরল , হাসিখুশি চেহারার আড়ালে যে এক বহুরূপির বাস তা কেউ কল্পনাতেও ভাবতে পারবে না । ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে তলিয়ে গেল সে ।
___________________________
২০০৯ সাল । শিহরণ রেডিও স্টেশনে আরজে রূথিলা তাবাস্সুম এর সঞ্চালনায় চলছে একটি শো ।
সবাইকে আরো একবার স্বাগতম । আপনারা আছেন আরজে রূথিলার সাথে । আপনার পছন্দের গানটি শুনতে আমাকে এসএমএস করুন ৭৮৯ নম্বরে । এই মুহূর্তে প্লে করে দিচ্ছি সৃজন ভাইয়ের পছন্দের গান ” মাঝে মাঝে তব দেখা পাই “, সবাই সাথেই থাকুন ।
আমি আরজে রূথিলা তাবাস্সুম । বতর্মানে রেডিও শিহরণে আরজে হিসেবে কাজ করছি । বিগত ১ বছর যাবৎ এই পেশার সাথে যুক্ত রয়েছি । খুব অল্প সময়েই প্রচুর সাড়া পেয়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছি । এখনো আমার কণ্ঠ শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর । লোকমুখে আমার নাম প্রচলিত । আমার এই বিষয়টি বেশ ভালো লাগে । কিন্তু আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছনোর পথটা এতো সহজ ছিল না । আর কিছুদিন পর আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা । ইচ্ছে ছিল অনার্স কম্পলিট করেই জব খুঁজব তবে ইচ্ছেটা এখন মন থেকে হারিয়ে গেছে । কেননা আমার বর্তমান পেশা আমার নেশায় পরিণত হয়েছে । জড়িয়ে গেছি এক মায়াজালে । আমার ধ্যান ভাঙল রূপকের ডাকে ।
মিস রূথিলা আপনার শো আজকেও অনেক সাড়া আর হইচই ফেলেছে । আপনার কণ্ঠে জাদু আছে যা একজন মানুষকে বিমোহিত করতে সক্ষম । আপনার কণ্ঠের মায়াজালে রোজ নতুন নতুন শ্রোতা জড়িয়ে পড়ছে ।
ধন্যবাদ রূপক সাহেব ।
আপনি কি এখন বাসায় যাবেন ?
নাহ হোস্টেলে ।
ওহ , এখানে আপনার কোনো আত্মীয় নেই ?
আজ ১ বছর পর হঠাৎ আমাকে নিয়ে আপনার এতো জিজ্ঞাসা ।
না মানে এমনি । আপনি সবসময় কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তাই কখনো জিজ্ঞেস করে ওঠা হয়নি । আপনি বলতে না চাইলে থাক কোনো সমস্যা নেই ।
আসলে এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আমার কেউ নেই ।
আমি বুঝতে পারিনি , দুঃখিত ।
সমস্যা নেই । আপনার জিজ্ঞাসা করাটা স্বাভাবিক । আমি কিছু মনে করিনি । আমি আসছি ।
রূথিলা ……..
পিছু ডাক শুনে ফিরে তাকালাম ।
বলুন রূপক ।
চলুন আপনাকে আমি পৌঁছে দিয়ে আসি , রাত তো অনেক হলো ।
না প্রয়োজন নেই আমি চলে যেতে পারব ।
রূথিলা প্লিজ না করবেন না । আমি আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি ।
আচ্ছা চলুন ।
এতো রাতে হোস্টেলে ঢুকতে কোনো সমস্যা হয় না ? এখন তো প্রায় রাত ১ টা বাজতে চললো ।
আগে হতো তবে এখন হোস্টেল কর্তৃপক্ষ আমার জন্য নিয়ম কিছুটা শিথিল করেছে ।
ওহ আচ্ছা ।
আমরা এসে পড়েছি রূপক ।
ওহ হ্যাঁ আমি খেয়াল করিনি ।
আসি ভালো থাকবেন আর ধন্যবাদ ।
ধন্যবাদ দিয়ে লজ্জা দেবেন না ।
ওকে মনে থাকবে ।
_________________
কেটে গেছে আরো ৮টি মাস । আমার অনার্স শেষ হয়ে গিয়েছে । মাস্টার্সেও ভর্তি হয়ে পড়েছি আর পাশাপাশি আমার জবটাও খুব ভালোভাবেই চলছে । আমার জনপ্রিয়তা এখন বলা চলে আকাশচুম্বী । আরজে রূপক আহসানের সাথে আমার সম্পর্কের ঘনিষ্টতা আরো ছ-সাত মাস আগেই বন্ধুত্বের পরিধি ছাড়িয়ে গভীরতায় রূপ নিয়েছে । আপনিময় সম্পর্কটা এখন তুমিতে এসে ঠেকেছে । তবে একটা বিপত্তি ঘটেছে আর তা হলো আমি ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি । সে আমার সিনিয়র কলিগ এবং ৫ বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত রয়েছে । আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে ওর কাছ থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি । আমাদের একটা বিষয়ে বেশ মিল রয়েছে সেই বিষয়টি হলো…..

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here