মায়াজাল ১৩তম পর্ব

মায়াজাল
১৩তম পর্ব
লেখনীতে : নুসরাত তাবাস্সুম মিথিলা

আজ রূথিলার কারামুক্তি। দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাভোগ শেষে আজ তার মুক্তি ঘটতে চলেছে। মাঝে কেটেছে বেশ লম্বা একটা সময়। বদলেছে অনেক প্রক্ষাপট। পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে এক মারাত্মক ভাইরাসের মহামারী। যা প্রায় পুরো পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। তবে শত হতাশার মাঝেও আজ সকল বাধাকে অতিক্রান্ত করে এই অন্ধকার কারাকক্ষ ছাড়বে রূথিলা। যদিও তার সাজার মেয়াদ ১০ বছর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিজ্ঞ আদালত সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ বিচার বিশ্লেষণ করে রূথিলার সাজা মওকুফের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সাজা কমিয়ে অর্ধেকে এসে ঠেকে। বিজ্ঞ বিচারকের ভাষ্যমতে,

” রূথিলা যেহেতু তার কাজের জন্য অনুতপ্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তাই তাকে আরো একবার সুযোগ প্রদান করা প্রয়োজন। এছাড়া প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে পরিস্থিতির শিকার হয়ে। তাই রূথিলা যেহেতু এক বছর কারাভোগ করেছে তাই তাকে আরো চার বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হবে যদি রূথিলা বেঁচে ফিরতে পারে। ”

যেহেতু রূথিলা ভাগ্যের জোড়ে সেই যাত্রায় বেঁচে ফিরতে সক্ষম হয়েছিল তাই তাকে কারাবরণ করে নিতে হয়। সেদিনের সেই মৃত্যুযাত্রা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রূথিলার জন্য। পরবর্তীতে সে নিজের ভুল বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে আর যাই হোক আত্মহনন কোনো কিছুর সমাধান হতে পারে না। দয়াময় আল্লাহর কাছে রূথিলা তার এহেন অপরাধের জন্য বহুবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। সে অনুতপ্ত, তবে তার বিশ্বাস নিশ্চয়ই যা কিছু ঘটেছে তা ভালোর জন্যই ঘটেছে। রূথিলার আজ একটা মানুষের কথা খুব মনে পড়ছে। সেই মানুষটার রক্ত পেয়েছে বলেইতো রূথিলা আজ জীবিত। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই মানুষটা অর্থাৎ দিশা পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে পরপারের বাসিন্দা হয়েছেন তা প্রায় বছরখানেক হতে চললো। ঘাতক করোনা ভাইরাস হাজারো মানুষের সাথে দিশাকেও কেড়ে নিয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে। তবে করোনা ভাইরাস তো কেবল দিশার মৃত্যুর উছিলা মাত্র। পৃথিবীর বুকে সময় ফুরিয়েছে বলেই না সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে রূথিলা একটা বিষয়ে খুব ভাবে ” পৃথিবী ছাড়তে চেয়েছিল কে অথচ ছাড়লো কে? ” এ যেন এক গোলকধাঁধা! যার যাওয়ার সে চলে গিয়েছে আর যার থাকার সে রয়ে গিয়েছে। তাই এসব ভেবে আর রূথিলার কাজ নেই। আর সাগ্রতের বদলি হয়েছে অন্য থানায় তা প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু সাগ্রত ভুলতে পারেনি রূথিলাকে। শত ব্যস্ততা ফেলে ছুটে আসত প্রতি মাসে একটি বার রূথিলার সাথে দেখা করবে বলে। মেয়েটাকে সাগ্রত ভালোবেসে ফেলেছে। তবে কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি। আজ রূথিলার সাথে দেখা করার জন্য সাগ্রত ছুটি নিয়েছে। অপরদিকে রূপক এখন মৃত্যু পথযাত্রী। যৌবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে তার অবৈধ মেলামেশা করে, যার ফলশ্রুতিতে তার শরীরে বাসা বেধেছে মরণব্যাধি এইডস। যার কোনো প্রতিকার এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও আবিষ্কার হয়নি। তবে একটা বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন ঈশানীর মৃত্যুর পর রূপক আর কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়ায়নি। কিন্তু কথায় আছে না – ” পাপ বাপকেও ছাড়ে না। ” ঠিক তাই ঘটেছে রূপকের সাথে। রূপক এখন রূথিলার ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারছে। আর এইডস সংক্রামনের ঘটনাটি সে জানতে পেরেছে গত ছ’মাস পূর্বে। জীবন খুঁজে নিয়েছে আপন গতি। কারোর জন্য কেউ থেমে নেই। সবাই ছুটে চলেছে আপন ঠিকানায়।

___________
অতীত : (চার বছর পূর্বে)

দিশা বেড ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। আশেপাশে সে তাকিয়ে দেখে সাগ্রত একটা বেঞ্চে বসে ঘুমিয়ে রয়েছে আর রূপক বসে বসে ঝিমুচ্ছে। দিশা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রূথিলার কেবিনের দিকে। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। কেবিনে ঢুকল দিশা। মলিন হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল খানিকটা সময়। এইটুকু জীবনে কত কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা! রূথিলার বয়সী একটা ছোট বোন ছিল দিশার। কিন্তু সে মাতৃত্বকালীন জটিলতায় মারা গিয়েছে। তাই রূথিলাকে দেখলেই নিজের ছোট বোনের কথা স্মরণ হয় দিশার। রূথিলাকে বড্ড আপন মনে হয় তার। যেন আপন ছোট বোন। নিরবে অশ্রু বিসর্জন করছে দিশা। কেটে যায় অনেকটা সময়। করিডোরে কোলাহল বেড়েছে। বেলা বাড়ছে সাথে ব্যস্ততাও। হঠাৎ রূথিলা হালকা নড়েচড়ে উঠে। এটা দেখামাত্র দিশা চিৎকার করে নার্স ও ডাক্তারকে ডাকে। নার্স আর ডাক্তারের সাথে রূপক ও সাগ্রতও ছুটে আসে। ডাক্তার সব পরীক্ষা করে জানান রূথিলা বিপদমুক্ত তবে তাকে নিবিড় পরিচর্চায় রাখতে হবে। কোনো ভাবেই উত্তেজিত করা যাবে না। প্রয়োজনে রূথিলাকে কিছুদিন মানসিক চিকিৎসা করাতে হতে পারে যেহেতু সে মেন্টাল ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে বিপদমুক্তির কথা শুনে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

এরপর পেরিয়ে যায় এক সপ্তাহ। অতঃপর রূথিলাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হয়। মানসিক সুস্থতার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া হয়। দু’মাসের মধ্যেই রূথিলা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। এই দু’মাস রূপককে রূথিলার কাছে ঘেষতে দেয়নি সাগ্রত। কেননা রূপককে দেখলে রূথিলা উত্তেজিত হয়ে পড়লে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে। এতে রূপক প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় কিন্তু কী আর করার! প্রায় প্রতিদিন রূপক থানায় আসতো তবে একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে যেত। রূথিলা নিজের মনকে কঠোরভাবে শাসন করেছে, কোনোভাবেই রূপকের প্রতি দুর্বল হলে চলবে না। এভাবেই নানান টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে রূথিলা তার কারাবন্দী সময়টুকু পার করেছে।

_________
বতর্মানে,
অফিসার সাগ্রত কারাগারের বাইরে রূথিলার জন্য অপেক্ষা করছে। এখন প্রায় বেলা ১১টা বাজতে চলল। সবটা ঠিক থাকলে আর অল্পকিছু সময় পরেই রূথিলার দেখা পাওয়া যাবে। হঠাৎ সাগ্রত রূথিলাকে দেখতে পেল। তারপর এগিয়ে গেল রূথিলার নিকট। তারপর মৃদু হেসে বলল,

‘ কেমন আছেন রূথিলা? ‘
‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি? ‘
‘ হুম ভালো। তা এখন কোথায় যাবেন? ‘
‘ মায়াজালে। ‘
‘ আপনি রূপকের জীবনে ফিরে যাবেন? এত কিছুর পর! ‘ চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেছে সাগ্রতের।
‘ আমি আমার কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে যাব। রূপকের জীবনে ফিরতে নয়। ‘ আশ্বস্তের স্বরে বলল রূথিলা।
‘ তা এরপর কী করবেন? ‘
‘ আমার একটা বাড়ি আছে সিরাজগঞ্জে। নিজের কষ্টার্জিত টাকায় কিনেছিলাম ওখানে চলে যাব। আর রান্নাবান্না পারি টুকটাক। তাই ভাবছি হোমমেড ফুডের বিজনেস করব। এই করোনাকালীন সময়ে এটা কারো উপকারে আসতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ‘ কথাগুলো বলে থামল রূথিলা।
‘ অনেক সুন্দর চিন্তা আপনার। তা একটা প্রস্তাব রাখতে চাই। বলবো কি? ‘ সাগ্রতের আকুল আবেদন।
‘ হ্যাঁ বলেন। ‘ সরল উত্তর রূথিলার।
‘ আমি আপনাকে ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই। আমি জানি আপনি এরকম প্রস্তাবের জন্য অপ্রস্তুত, তবে বিশ্বাস করেন জীবনে হতাশ হবেন না। ‘
‘ ক্ষমা করবেন। আর কাউকেই বিশ্বাস করে নিজের জীবন নরক বানাতে চাই না। রূপককে ডিভোর্স দিয়েছি প্রায় তিন বছর আগে কিন্তু আমি আমার বাকি জীবন ওর স্মৃতি আকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে চাই। নাই বা হলো আমাদের একসাথে পথচলা! তবে ওর পুরনো স্মৃতির মায়াজালে হারিয়ে যেতে তো বাধা নেই। ভালো থাকবেন। কষ্ট দিয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ‘ কথাগুলো একনাগাড়ে বলে শ্বাস নিল রূথিলা।

সাগ্রত মন ভাঙার যন্ত্রণা নিয়ে কিঞ্চিৎ হাসার ব্যর্থ চেষ্টা চালালো। রূথিলাকে কিছু বলার ভাষা যেন হারিয়ে গেছে। এতগুলো দিনের সাজানো সুপ্ত অনুভূতি যেন কিছু ধারালো কথার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। রূথিলা সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে এগিয়ে চলল আপন লক্ষ্যে, খুঁজে পেতে আপন ঠিকানা। সবার ভাগ্যে সব চাওয়ার পূর্ণতা লেখা থাকে না। কিছু কিছু অপূর্ণতাকে মেনে নিয়ে জীবনে ছুটে চলতে হয়।

__________
সময় গড়িয়েছে অনেকটা। সাগ্রত ফিরে যাচ্ছে তার কর্মস্থলে।এই চেনা শহরকেও আজ তার বড্ড অচেনা ঠেকছে। পৃথিবীতে কি আর কোনো মেয়ে ছিল না? কেন রূথিলাকেই ভালোবাসতে সলো তার? কেন? উত্তরটা থাক না অজানা।

__________
রূথিলা পৌঁছে গিয়েছে তার ঠিকানায়। নিজ হাতে স্বপ্ন দিয়ে গড়া নীড়ে। তার ভালোবাসার মায়াজালে। কতগুলো বছর কাটিয়েছে এই ছাদের তলায়, কত খুনসুটিময় ভালোবাসা ছড়িয়ে রয়েছে এই বাংলোর প্রতিটি কোণে, কতই না মধুর ছিল সেই সময়গুলো। এসব ভাবতে ভাবতেই বেহায়া চোখজোড়া থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। অবাধ্য চোখজোড়াকে খানিকক্ষণ শাসিয়ে কলিংবেল বাজালো রূথিলা।
_________
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here