ভালোবাসা_ফিরে_আসে,পর্ব ৪

#ভালোবাসা_ফিরে_আসে,পর্ব ৪
লেখা : মান্নাত মিম

ভোর সকাল। স্নিগ্ধতায় ভরপুর চারিদিক, কলহ মুক্ত পরিবেশ, ঠান্ডা আবেশের রেশ। চলেই তো যাবে তাই শেষবারের মতো আসা পার্কে, একটু শান্তির জন্য শান্ত পরিবেশে। পার্কের বেঞ্চে বসে প্রকৃতিকে উপভোগ করছে লিলি দু-চোখ বদ্ধ করে। এমন সময় আবির্ভাব ঘটে মেজবাহর। তার পাশে এসে ধুপ করে বসে। বসার শব্দে লিলির চোখ-মুখ কুঁচকে আসে বিরক্তিতে, তবুও বসে রয় অনড়ভাবে। পাশে বসা মেজবাহ তখন বেশ চিন্তিত ভান নিয়ে বলে,

‘তা আজকাল দেখি আপনি ঝিনুকে থাকা মুক্তোর মত হয়ে গেছেন। যার দেখা মিলা ভারি মুশকিল ব্যাপার-স্যাপার।’

লিলিকে নিরুত্তাপ উদাসীনতা মুখ নিয়ে বসা থাকতে দেখে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মেজবাহর। আবারও লিলির মৌনতা কাটাতে অনর্থক চেষ্টার হিসেবে বলে,

‘আজ যে বাইরে বের হলেন? মন খারাপ?’

এবার মিখ খুলল লিলি। আজই তো শেষ আলাপ, সবকিছুরই। উদাসীন মুখে পাশ ফিরে একবার মেজবাহর দিকে একবার তাকিয়ে বলল,

‘মন খারাপ হলেও আপনার তাতে কী?’

‘ভালোবাসার মানুষ হিসেবে না হলেও মনুষ্যত্ব বোধ থেকে আপনার মন ভালো করার চেষ্টা করতে পারি।’

ভালোবাসার কথা শুনে গরম চোখে তাকায় লিলি তার দিকে, পারলে চিবিয়ে গিলে খেয়ে নেয়। মেজবাহ ভাবে, মেয়েটার ভালোবাসায় এত এলার্জি ক্যান ভাই? এতটুকু শরীরে কত তেজ! মেয়েটার মনে ভালোবাসার ফুল ফোটানো যেন পাথরে ফুল ফোটানোর মতো হয়ে গেল। অথচ সে সবসময় শোনে এসেছে, মেয়েদের মন নাকি নরম; তাহলে লিলির মন কেন এত গরম? ভাববার বিষয়। সেই ভাবনার বিষয় টুকরোতে পরিণত করে লিলির পরের বাক্যগুলো।

‘মন ভালো না থাকার তো হাজারো কারণ আছে। কয়টার সমাধান দিয়ে মনকে ভালো করতে পারবেন?’

একবুক কষ্টের পশরা সাজানো দেখতে পেল লিলির অক্ষিযুগলে। মেজবাহ সবসময় হাসিখুশি থাকা মানুষ। মন খারাপ-রা তাকে কখনো ছুঁয়ে দেখেনি বলতে গেলে মন খারাপ হতে দেয়নি মন’কে। কিন্তু লিলির চোখের কষ্টের পসরা সাজানো দেখে কেন বুকে ব্যথার আগমন হচ্ছে? এ কীসের কষ্ট! কাউকে হারাবার কষ্ট কি? মনে মনে দ্বিধান্বিত চোখে তাকায় লিলির দিকে। লিলি হেসে ওঠে দাঁড়িয়ে বলে,

‘চোখের সমানেই দেখে নিন, আমার মন খারাপের জন্ম নেওয়া প্রধান উৎসকে। যে আমার সুখের অস্তিত্বে গ্রহণ লাগিয়েছে।’

প্রথম দেখা থেকে এপর্যন্ত মেজবাহ তাকে দেখে এসেছে প্রায়শই সফেদ রঙের কামিজ পরিধানকৃত অবস্থায়। শুভ্র ও পছন্দ রং ভেবে অত গা করেনি কিন্তু আজ খেয়াল যায় লিলির পরনের পোশাকের দিকে, অবশ্য লিলির বলার ভঙ্গিতেই তাকে তীক্ষ্ণভাবে খেয়াল করতে বাধ্য করেছে। মেজবাহ চমকে তাকায় লিলির পানে মুখ নিসৃত শব্দরা যেন হারিয়ে গেছে কোথাও। তবুও গলা দিয়ে এক ঢোক গিলে বহু কষ্টে উচ্চারণ করল সে,

‘বলুন, মিথ্যা বলছেন আপনি। যা দেখছি তা সত্যি নয়। চুপ করে থাকবেন না দয়া করে। বলুন প্লিজ।’

চোখ দিয়ে যেন রক্তের বন্যার ফোয়ারা ছুটতে চাইছে, চোখের শিরা-উপশিরায় রক্তাক্ত দাগ কেটে গিয়েছে। তবুও ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে লিলির উত্তরের আশায়। লিলি সেসব দেখেও না দেখার ভান করে বলল,

‘না এটা অমোঘ সত্য। আমার জীবনের চরম বাস্তব। আসলেই এটা যদি মিথ্যা হত। পৃথিবীতে আমার চেয়ে আর কেউ সুখী হতো না। কিন্তু না, এমন বাস্তব আমার জীবনে গলায় কাটা বিঁধার মতো হয়ে আছে। না পারি গিলতে আর না ফেলতে।’

আজ দু’জনেরই চোখে অশ্রুধারা বইছে। কিন্তু কারণ ভিন্নতর। কারো ভালোবাসার মানুষের জন্য। তো কারো ভালোবাসার মানুষের জীবনের সত্যতা জেনে। কিন্তু দু’জনেই এক সুতোয় গাঁথা আর তা হলো- ভালোবাসা।
______

শাহেদের খুব ভালো বন্ধু ইমন। আর ইমনের বোন ইমুর সাথে লেখাপড়া করে লিলি। দু’জনে একই ক্লাসে পড়াতে সুবিধাজনক হলো; কেউ একজন স্কুলে না গেলেও আরেকজনের কাছ থেকে পড়াগুলো সংগ্রহ করতে পারে। আর সেই সুবিধার বেশিরভাগই লিলির খাতায় জমা হয়। লিলি প্রায়শই স্কুলে যায় না। তাই ইমুর বাসায় আসা নোট সংগ্রহ করার জন্য। ইমন তখন তাদের উঠানে বসে শাহেদের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। এমন সময় শাহেদ সুশ্রী রূপের অধিকারী লিলিকে উঠান পেরোতে দেখে ইমনকে জিজ্ঞেস করে,

‘কিরে ব্যাটা এটা কে রে? আগে তো দেখিনি।’

‘দেখবি কেমতে! বেশিরভাগই তো কথা হয় বাইরে। বাড়িতে তো তোকে আনায়’ই যায় না।’

‘হয়েছে হয়েছে আজ কোন পূন্য করায় জানি তোর বাসায় এসে হুরপরীর দেখা পেলাম।’

শাহেদের চোখে খেলা করছে একরাশ মুগ্ধতা, যেটা প্রথম দেখায় ভালোবাসার সোপান হিসেবে কাজ করে। অবাক চোখে শাহেদের দিকে তাকিয়ে ইমন মজার ছলে বলে,

‘কি মামা প্রেম প্রেম গন্ধের আবির্ভাব পাচ্ছি!’

‘ব্যাটা পড়ে সব, আগে পরিচয় পেশ কর। মেয়েটা কে?’

শাহেদের মুখে অতিব আগ্রহ ঝরে পড়ে লিলুর সম্মন্ধে জানার জন্য। ইমন তখন লিলির জীবনবৃত্তান্ত শাহেদের কাছে তুলে ধরে।

‘ও’র নাম লিলি। এই তো কয়েক বাড়ির পরেই তাদের টিনশেডের পাকা বাড়ি। বাপ নেই তার, দু’বোনই তারা। বড়ো জন মিলির তো কিছুদিন হলো বিয়ে গেল। ভাগ্য ভালো ছেলেরা কিছু দাবি করেনি। তাই মেয়ে পার করতে পারল খাল্লামা। এখন এই ছোট্টটায় বাকি। ইমুর সাথে এক ক্লাসেই পড়ে, ক’দিন বাদেই এসএসসি দিবে।’

বেশ মায়া লাগল লিলির প্রতি তার। এদিকে লিলি ততক্ষণে ইমনদের ঘরে প্রবেশ করে ফেলেছে।

পড়ার সব নোট সংগ্রহ করে মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় লিলির মনে হলো, কেউ যেন তার পিছু নিয়েছে বোধহয়। ভূতটূতে ভয় পাওয়া মেয়ে সে নয়। গাঁয়ের মেয়ে, দিনে-রাতে একা চলে-ফিরে অভ্যাস যার। একবার মনের ভুল ভেবে আবার চলতে লাগল। কিন্তু নাহ পিছনে আরেকজনের হাঁটার শব্দ পাচ্ছে সে। এবার না থেমে হঠাৎই ঘুরে দাঁড়ালে অচেনা, অজানা এক সুঠাম দেহের পুরুষকে দেখেতে পায়। পুরুষ বলার অবশ্য কারণ-ও রয়েছে। তার মতো পঞ্চদশীর চোখে পঁচিশ বছরের ছেলেকে পুরুষ’ই মনে হয়ে থাকে।

‘এই মিয়া আপনি আমার পিছু নিচ্ছেন কেন?’

লিলির ঝাঁঝাল উচ্চকণ্ঠে শাহেদের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ দেখা গেল না। সে যেন কিছু শোনেইনি। অদূরে চেয়ে দায়সারা ভাব নিয়ে বলল,

‘ও আচ্ছা তাহলে আমার ভুল হয়েছে। তোমার আগে আগে হাঁটা উচিত ছিল।’

কত বড়ো বেয়াদ্দব নাহলে তার মতো অপরিচিতের সাথে প্রথম দেখায়ই ‘তুমি, তুমি’ করে বলে! বিস্ময়টাকে লিলি চোখে-মুখে খেলা করতে না দিয়ে যথাসম্ভব মুখে দৃঢ়তা বজায় রেখে ফের তেজস্ক্রিয় স্বরে বলল,

‘আমার সাথে হাঁটবেন কেন?’

‘বললাম তো এবার তোমার আগে আগেই হাঁটব।’

আগে আগে হাঁটবে সে-তো ভালো কথা, তবে কেন তোমার লাগাচ্ছে ব্যাটা সেখানে? ঘাপলা আছে কোথাও। নারী পাঁচারকারী নয় তো? কল্পনাগুলো বেশ ভয়ংকর ভয়ংকর হয়ে এলো চোখের তারা’য়। এবার কিছুটা ভীতু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

‘আমি’ই কেন?’

সম্মুখে দণ্ডায়মান লিলির দিকে খানিকটা ঝুঁকে গিয়ে তার চোখের ওপর নেত্রযুগল এঁটে শাহেদ বলল,

‘কারণ তুমি’ই তো সবকিছুর জন্য দায়ী।’

এবার তো ভয় পেয়ে গেল লিলি। জানা নেই, চেনা নেই আগন্তুকের মুখে তাকে দোষী শুনছে। আচ্ছা কী দোষ করল সে? মনে মনে একঝাঁক প্রশ্ন নিয়ে তাকাল আগন্তুকের দিকে তখন আগন্তুক ভয়ানকভাবে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,

‘চুরির দোষ তোমার। তুমি আমার এক মহান জিনিস চুরি করেছ।’

কান্না পাচ্ছে লিলির। বাবা নেই বলে এমনও সময় পার করেছে; ক্ষুধায় পানি খেয়ে থেকেছে তবুও কোনদিন কারো পাতের ভাত চুরি করে খায়নি। আর আজ কি না চুরির দোষ দেওয়া হচ্ছে তাকে। শ্রাবণধারা অবিরাম বয়ে চলেছে তার চোখে। তা দেখে সামনে থাকা আগন্তুক হন্তদন্ত হয়ে নরম কণ্ঠে বলল,

‘প্লিজ প্লিজ কান্না কর না। আমি এমনই মজা করছিলাম তোমার সাথে।’

গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু রেখা মুছে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে লিল কষ্ট পাওয়া দুঃখি কণ্ঠে বলল,

‘আপনার উচিত হয়নি এমনটা করার। আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে কোন কারণে আমার সাথে এমন জঘন্যতম মজা করতে পারলেন? কোন নিষ্পাপ মানুষের চোখের জল ফেলতে আপনার বুক কাঁপল না। অভিশাপ দেব না। কারণ আমার বাবা-মা সেই শিক্ষা আমায় দেননি। কিন্তু আর কারো সাথে এমন করবেন না। তারা আবার না বড়ো ধরনের বিপদের সৃষ্টি করে।’

একদমে কথাগুলো বলে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল লিলি। আর ফেলে গেল আগন্তুক নামের একরাশ মুগ্ধতার চোখে তার চলে যাওয়ার পানে চেয়ে থাকা শাহেদকে। মেয়েটার অল্প বয়স হলে কী হবে, দুনিয়া যেন আগেই চিনে ফেলছে। সকল বাবা-মা যখন মারা যায়, তখন মনে হয় বাড়ির সকল মেয়ে সন্তান’রা দুনিয়ার সাথে নতুন পরিচিত হয়ে সেটার সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা করে নেয়। প্রত্যেকেরই উচিত, জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। তবে অধিকাংশ ব্যক্তিবর্গ সেটা আমলে নেন না। কাল করব কাজ, ফেলে রাখে আজ- অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজ ও সমাজে থাকা মানুষগুলোর। পর আর আসে না ফিরে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here