ভালোবাসা_ফিরে_আসে,পর্বঃ ৮

#ভালোবাসা_ফিরে_আসে,পর্বঃ ৮
লেখা : মান্নাত মিম

নিজ স্বামীর ভিটা থেকে মেয়েদের বিদায় কেবল লাশ হয়ে বের হয়, তাছাড়া নয়। কিন্তু লিলিকে বের হতে হলো তার জীবন্ত অবস্থায়, তবে সে তো বেঁচে থেকেও মৃত সমান। তাই তার অনুভূতি ছিলো শূন্যতর, নির্জীব, নিষ্প্রাণ। তবে ভালোবাসার মানুষটার স্মৃতি তো সেই বাড়ি জুড়েই ছিল। সেজন্য কষ্টানুভূতি খুঁচাতো বুকে কিন্তু যেখানে তার অস্তিত্বটা’কেই ধরে রাখতে পারল না, সেখানে এই কষ্টকে মাটি চাপা দিতে হলো। এদিকে তার মা মিসেস সালেহা রেগে আছেন, কেন লিলি নিজ ইচ্ছেতে স্বামীর বাড়ি ছাড়ল? সেখানে তারও তো অধিকার আছে। কিন্তু লিলির কথা, যেখানে তার স্বামী’ই নেই, সেখানে তার সম্পদে কীভাবে অধিকার হয়? আবার মামা-মামীদের সাথে জোড়ও করা যাবে না। স্বামী হলো স্ত্রী’দের শক্তি। লিলি কীভাবে তার স্বামী নামক শক্তি ছাড়া লড়াই করবে? এসব যুক্তি শুনে মিসেস সালেহা দমে গেলেন। নিরস্ত্র সৈনিকের মতো ফিরে এলেন পুরানো জীবনে। যেখানে আগের থেকেই ছিল দারিদ্র, দুর্দশার পরিবেশ। তবুও লিলি চেষ্টা করে কয়েকটা টিউশন জোগাড় করল ইমুর মাধ্যমে। এসে-যেয়ে কয়েকটা টিউশনে মা-মেয়ের জীবনপাত ভালোই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু….

‘মেয়ে মানুষের জীবন বরই গাছের মত। সবাই-ই এসে ঢিল ছুঁড়ে।’

কয়েকদিন পর থেকেই ঘটক আসা শুরু করে। আবার কিছু বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে নানা ধরনের মন্দ মন্তব্য করতে লাগলেন। মেয়ে নাকি বাইরে পড়ার নাম করে কুকীর্তি করে বেড়ায়। এসব মেয়েকে সমাজে রাখলে অন্যরাও দেখে দেখে তা শিখবে। পাড়ার ছেলেপেলেরাও সুযোগ পেয়ে তাকে পথে-ঘাটে হেনস্তা করে। এসব যখন সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল দেখে, লিলির মা তখন তার বিয়ে ঠিক করেন। তাও আবার বয়স্ক লোকের সাথে যার এখন নাতি-নাতনী হওয়ার সময়। মা’য়ের এমন কর্মে বেশ ক্ষুব্ধ হলো লিলি। কোনভাবেই তার মা’কে দমানো গেল না। তাই সে মিলির বাসায় এসে পড়েছিল টিউশন ছেড়ে দিয়ে। কয়েকমাস সেখানে থেকে গেল যে পর্যন্ত তার গ্রামের পরিবেশ ঠান্ডা না হয়। এভাবেই কেটে গেল ভালোবাসার মানুষ শাহেদ বিহীন জীবন।
______

ধপ করে মাটিতে বসে এতবছরের জমিয়ে রাখা কষ্টের অশ্রু ছেড়ে দিলো লিলি। বেদনারা যেন আজ ছুটি পেয়েছে তার হৃদয় নামক বন্দিশালা থেকে। নির্মম সত্যটা যেন আজ বলতে চাইছে, ‘ভালোবাসার মানুষ বিহীন তুমি নিঃস্ব।’

মেজবাহ পার্কের বেঞ্চ থেকে ওঠে গিয়ে সবুজ ঘাসে লিলির সামনে বসে জড়িয়ে ধরল। হুট করে জড়িয়ে ধরায় কান্না থেমে গেল লিলির। মনে পড়ে গেল শাহেদ-ও তো তাকে ক্রদনরত অবস্থায় এভাবে জড়িয়ে ধরে কান্না থামাত। কিন্তু এ-তো তার ভালোবাসার শাহেদ নয়। তাহলে কেন ধরবে? ভেবেই জোরে ধাক্কা দিলো মেজবাহকে। লিলির ধাক্কায় তার ডান হাত গিয়ে পড়ল ঘাসের মাঝে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরাতে। ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে শব্দ করে উঠল। লিলি হকচকিয়ে গেল! কী থেকে কী হয়ে গেল তার বোধগম্য করতে পারল না কিছু পল। রক্তের ফোয়ারায় সবুজ ঘাস লাল রঙে তলিয়ে গেল। যখন বুঝতে পারল তার দ্বারা কেউ আঘাত পেয়েছে, তখন তাড়াতাড়ি করে অপর ব্যক্তিকে ধরে উঠিয়ে বেঞ্চে বসালো লিলি। নিজের সাথে আনা ভ্যানিটিব্যাগ থেকে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার সরঞ্জামের মাধ্যমে কেটে যাওয়া স্থান থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করল।

‘বারবার বলছি দূরে সরে যান আমার থেকে। আমি এক জ্বলন্ত অগ্নি শিখার ন্যায়। আমার কাছে যে-ই আসবে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। তাই বিনীত অনুরোধ আমার সাথে নিজের জীবন জড়াবেন না।’

কথাগুলো নম্রস্বরে বলে ওঠে চলে যেতে নিলেই তার হাত টেনে ধরে মেজবাহ। পিছনে ফিরে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় যার অর্থ; এত বলার পরও ছেলেটার মাথা ঠিক হলো না। সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে মেজবাহ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,

‘জীবন একটাই আর সেই এক জীবনে ভালোবাসা একটাই বেসেছি। আর সেটা হলো তুমি। একবার যখন জড়িয়ে গিয়েছি তখন আর পিছু হটে যাওয়ার মানুষ আমি নই। এখন থেকে তুমি আমার আপন থেকেও আপনতর তাই তুমি করে বলব।’

বলেই হতভম্ব লিলির গালে নিজের ওষ্ঠ ছুঁয়ে দেয়। আর তা লিলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই। অতঃপর তার হাত ছেড়ে দিয়ে পার্কের গেইট দিয়ে চলে যায়। লিলি ঠাঁই সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। আর এলোমেলো মাথায় পরিকল্পনা করতে থাকে মেজবাহর থেকে পিছা ছুটানোর। আজ যা করল সে তাতে লিলির মন চাচ্ছে, দ্বিতীয়বার মেজবাহর গালে থাপ্পড় নয় জেল-হাজত করাতে।
______

সকালের টিকিটে’ই লিলি নিজ বাড়িতে পদার্পণ করল। আসতে মন চায়নি অবশ্য। গ্রামীণ জনপদের পরিবেশ তো বলার কিছু রাখে না যে, তাকে কি নজরে দেখে সবাই! তবুও আসতে হলো মেজবাহর কারণে। মনঃক্ষুণ্ন হয়ে আছে রিম্পির জন্য। মেয়েটার সঙ্গ তার ভালো লাগে। তাও আবার বিশেষ করে মন খারাপের সময়টাতে।

‘মিলি ফোন করে বলল, তোর নাকি ওদের ওখানে থাকতে ভালো লাগছিল না। তাই এসে পড়লি। তা কী এমন হয়েছে সত্যি করে বলবি? কারণ হঠাৎ করে ভালো না লাগার কারণ ওখানে তৈরি হওয়ার মতো নয়। মনে হচ্ছে অন্যকিছু ঘটনা সেখানে জড়িত।’

মিসেস সালেহা সন্দেহের নজরে মেয়েকে পরখ করছেন।

‘এক জায়গা থেকে মাত্র আসছি। এরমধ্যে তুমি আবার শুরু করো না। এখানে তো সবার আগে তুমি অশান্তি শুরু করো।’

উচ্চস্বরে কথাগুলো বলে রাগান্বিত হয়ে গটগট করে চলে গেল সে নিজের রুমে। একতলা ছাদযুক্ত পাকা বাড়ি স্বামীর রেখে যাওয়া একটু ভিটেমাটিতে থাকে মা-মেয়ে। লিলি বেশ গুছানো ধরনের মেয়ে। তাই তার রুমে সবকিছু পরিপাটিই পাওয়া যায়। নিজ রুমে গিয়ে একসেট সাদা সালোয়ার-কামিজ নিয়ে লাগোয়া ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ভিজে কাপড়-চোপড় উঠানের দড়িতে রোদ দিতে গিয়ে দেখে, পাশের বাড়ির খালাম্মা তার মা’য়ের সাথে বসে পান চিবুচ্ছে আর কথা বলছে। আসা মাত্রই অতবেশী-প্রতিবেশীর পাদচারণ শুরু হয়ে গেল। শান্তি আর মিলেছে, যেখানে সে অশান্তির মাঝেই বসবাস করছে। এরমধ্যে মহিলাটির নজর তারউপর পড়ে। দেখেই হাঁক ছেড়ে ডাক দিলেন। অগত্যা তাকেও যেতে হলো মহিলাটির সামনে। গিয়ে যতটুকু লিলি শুনতে পেল,

‘তা তোমার ছোড মাইয়াডারে কি আবার বিয়া দেওনের কোন ইচ্ছা নাই? আর কত ঘরে বহায় রাখবা? একে তো মাইয়া মানুষ কুড়িতে বুড়ি। হের উপ্রে আবার বিধবা!’

চলবে……….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here