বর্ষার এক রাতে,পর্ব-১২,১৩

বর্ষার এক রাতে,পর্ব-১২,১৩
সাদিয়া
১২

রনি বলল
“আমারে কি ভয় পাইতাছোস তূবা?”
“তোকে ভয় পাবার কি আছে? সামনে থেকে সরে দাঁড়া।”
“….
“পথ ছাড়।”
“তুই নাকি চাকরি পাইছোস?”
“…
“কিরে কো।”
“দেখ রনি সামনে থেকে যা। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“দেরি হোক তূবা। আগে আমার কথার জবাব দিয়া যা।”
“হ্যাঁ করি। তো? তুই আমার অন্ধকার জীবনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিস। আর কিছু শুনতে চাস?”
“রাইতের বেলা তোর কিয়ের কাম? আজ থেইকা তুই কামে যাইবি না। তোর বাসাত আমি সময় মতো বাজার দিয়া আইয়াম।”
“ফালতু কথা বাদ দিয়ে আমার রাস্তা ছাড়।”
“আমি তোরে কি কইলাম শুনছোস না?”
“শুনার দরকারও নাই আমার। তুই যা এখান থেকে।”

রাগে রনি তূবার হাত খপ করে ধরে ফেলল।
“আগে যা করছিলাম না ওহন তোর সাথে এইডাই করোন লাগব?”
“রনি হাত ছাড় আমার। এবার কিন্তু আমি চুপ থাকব না। আমি পুলিশ ডাকব।”
হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে বলল তূবা।
“পুলিশের বাপ রে ডাক আমি তোরে আজীবন ধইরা রাখবাম। কি করতে পারবি তুই?”
“ভালো চাইলে হাত ছেড়ে দে রনি।”
“….

গাড়ির প্রচন্ড হর্নের আওয়াজে রনি বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। খুব কাছেই একজন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রনি বিরক্ত হয়ে বলল
“আরে ভাই যা না রাস্তা ফাঁকা আছে চোখে দেহোচ না? এমনে শব্দ করতাছোস কেরে?”

তূবা সামনে তাকিয়ে দেখল। আহফিন গাড়িতে চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে। তূবার ভয় হলো। কি ভয়ংকর চাউনি। রনিও হাত ছাড়ছে না।

আহফিন গাড়ি থেকে নেমে এসে রনির সামনে দাঁড়াল। রনি কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

“হাত টা ছাড়।”
“কি?”
এবার আহফিন রনির গালে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। রনি ছিটকে গিয়ে দূরে পড়ল। ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে তার। সে এসে আহফিনের কলার ধরল। দুজনের ধস্তাধস্তি হতে লাগল। ভয়ে তূবার শরীর কাঁপছে। রনি তো বখাটে ছেলে সবসময় মারামারি করে কাউকেই ভয় পায় না। আহফিন কে যদি..

তূবা দৌড়ে গেল। রনির হাত ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। তূবা বারবার করুণ স্বরে বলতে লাগল “রনি ছাড় উনাকে ছেড়ে দে। আল্লাহর দোহাই লাগে ছাড়।”
তূবার আকুতি দেখে রনি তার দিকে তাকাল। তূবা কান্না করছে। মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। আহফিন এবার রনির বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। রনি খুব ব্যথাও পেয়েছে। তবুও সে তূবার দিকে তাকিয়ে রইল। তূবা ব্যস্ত হয়ে আহফিন কে জিজ্ঞাস করল “আপনি ঠিক আছেন?”
আহফিন শান্ত চোখে বুঝিয়ে দিল সে ঠিক আছে। তারপর তূবার এক বাহুতে হাত ধরে বলল “তোমার লাগে নি তো?”
“না।”
“চলো।”

রনি তখনো ফ্যালফ্যাল করে তূবা কে আর নাম না জানা লোকটাকে দেখছিল। লোকটার জন্যে তূবার ব্যস্ততা, ভয় তাকে একদম থমকে দিয়েছে। তার চোখের পাতা পড়ছে না। কিছু বলতেও পারছে না। চুপচাপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিল। ভেতরে চাঁপা একটা কষ্ট কাজ করছিল তার।

আহফিন তুসির কাছে গিয়ে হুইল চেয়ার টেনে গাড়ির সামনে নিয়ে গেল। তুসি কে বসিয়ে দিয়ে সে সামনের সিটের ডালা খুলে দিল। তূবা একবার রনির দিকে তাকাল। ওর ওমন চাউনি দেখে তূবার মায়া হলো। সে গাড়িতে উঠে বসে পড়ল। আহফিন রাগান্বিত ভাবে তাকাল রনির দিকে। তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটে গেল।

রনি শূন্যে তাকিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। ওখানেই ধপ করে রাস্তায় বসে পড়ল। ভেতরে যে কি রকম আগুন জ্বলছে সে কাউকে বুঝাতে পারবে না। তবুও সে চুপ আছে। মনে হচ্ছে কেউ তার উপর কয়েক মণ ওজনের পাথর চাঁপা দিয়ে রেখেছে। রনির মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। তার শরীর কাঁপছে। কাঁপা ঠোঁট দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। অতি কষ্টে শুধু মুখ দিয়ে বের করল “তূবা তূবা রে।”

আহফিন গম্ভীর হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তাকে দেখে তূবার মনে হলো সে রেগে আছে। ভয়ে ভয়ে তূবা বলল
“আ.আপনি না বললেন আসবেন না।”
“…
আহফিন বলল না কিছু। অনেকক্ষণ পর বলল
“কাজ টা আরেক জনের কাছে দিয়ে এসেছি।”
এতক্ষণ আহফিন কে একটা রোবট ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছিলো না। তূবা আর কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল।

পিছন থেকে তুসি নিচু স্বরে তূবা কে ডাকল।
“আপা।”
তূবা ঘাড় ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল “তোর অসুবিধা হচ্ছে তুসি?”
সে মাথা নাড়িয়ে বলল না। তুসি আহফিনের দিকে তাকাল। সামনের লুকিং গ্লাসে আহফিন তুসির চোখ দেখল। তূবা একবার আহফিনের দিকে তাকিয়ে আবার তুসির দিকে তাকাল। হাসার চেষ্টা করে আমতাআমতা স্বরে বলল
“তুসি উনি..”
পাশ থেকে আহফিন সোজাসুজি জানিয়ে দিল
“তোমার বোন আমার এখানে কাজ করে। আর তুমি আমাকে তোমার বড়ভাই ভাবতে পারো।”
সে পিছন ফিরে তুসির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তূবা অবাক হয়ে দেখছিল দুজন কে। তুসির মুখেও খুশির হাসি। তূবা আর কিছু বলল না। একবার আহফিনের দিকে তাকাল। বিনিময়ে আহফিন তার দিকে তাকিয়ে চোখ ইশারা করে হাসল। কি অমায়িক হাসি!

তুসি কে ডক্টর আজ অনেক গুলি পরীক্ষা দিয়েছেন। কিছু জানান নি। তিন দিন পর রিপোর্ট দিবে। যা জানানোর দরকার তখনি ডক্টর জানাবেন। আহফিন সবটা সময় তূবা আর তুসির পাশে ছিল। কাজ সেরে তূবা আর তুসি কে গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে গেল। যাওয়ার আগে জানিয়েছে, “আমি কল দিলে বাসা থেকে বের হবে। এখানেই অপেক্ষা করব আমি।”

—-
আহফিন ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। তূবা ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গেছে। আহফিন নিরমল বাতাসে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছে। তাকে কেমন উদাসীন লাগছে।

তূবা ঘরে ঢুকতেই আহফিন তার দিকে না তাকিয়ে ডাকল।
“তূবা।”
“বলুন।”
“এদিকে আসো।”
তূবা গিয়ে আহফিনের কাছে দাঁড়াল। আহফিন বাহিরে মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে বলল
“আরেকটু কাছে আসো।”
তূবা মুচকি হেসে পাশে এক পা ফেলে তার দিকে আরেকটু এগিয়ে যায়।

“তূবা তুমি তো কখনো জানতে চাও নি আমি কেন তোমাকে নিজের বাসায় এনে তোমার সাথে মিলিত হয়েছি।”
আহফিনের কথায় তূবার মুখ টা মলিন হয়ে গেল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যেন কেউ তার পুরোনো ঘায়ে খুঁচা মেরেছে।

একবারও আহফিন তূবার দিকে ফিরল না। বাহিরের উদাসীন ভাবে তাকিয়ে কফির মগে চুমুক দিল। অনেকক্ষণ পর সে বলতে শুরু করল
“আমি বাবা মা ছাড়া বড় হয়েছি তূবা। এই দুনিয়াতে আমার আপন বলতে কেউ ছিল না। ৬ বছর বয়সে ৫ মাস ১২ আমি কোমায় ছিলাম আমি। বাবা মা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন। আমিও ছিলাম সেদিন। আল্লাহ আমাকে সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এতদিন পর নিজের জ্ঞান ফিরে আমি বাবা মা কে খুঁজি। পায় নি। ফরিদা আন্টি ছিলেন বাবার বন্ধুর স্ত্রী। উনি উনার পরিবার আর ম্যানেজার মিলে আমার লেখাপড়া, বড় করার দায়িত্ব নেন। তখন থেকে আমার দুনিয়াটা কঠিন হয়ে যায়। একা একা বড় হয়েছি। ছোট বেলা থেকে একা বাঁচতে বাঁচতে ক্লান্ত হয়ে যাই আমি। জীবনের প্রতি মায়া উঠে যায় আমার। নিজের প্রতিই বড্ড বিরক্ত হয়ে যাই আমি। ঠিক তখন আমার জীবনে লুবনা আসে।”
আহফিনের মুখ থেকে এমন একটা কথা শুনবে তা তূবা কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি। তব্দা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। শরীর টা একদম নেতিয়ে আসছে যেন। কি বলল এটা? গলায় কান্না এসে ঠেকেছে তূবার। শ্বাস নিতে বেগ পেতে হচ্ছে তার। দম টা বন্ধ হয়ে আসছে।
আহফিন আবার বলতে শুরু করল।
“আমি এতটাই ডিপ্রেশনে থাকতাম আমার কিছুই ভালো লাগত না। বারবার মনে হতো কেন সেদিন মারা যায় নি আমি? বাবা মা ছাড়া দুনিয়াটা কত কঠিন তা আমি প্রতিদিন বুঝতে পারতাম। ভার্সিটি তে লুবনার সাথে দেখা। সে এসে আমায় সময় দিত। নিজ থেকে বারবার কথা বলত। আমি এড়িয়ে যেতে চাইলেও তার ব্যবহারে পারতাম না। লুবনা কে আমার ভালো লাগতে শুরু করল। ওকে পেয়ে কষ্ট গুলি একটু ভুলে থাকতে পারতাম। তারপর ঠিক করলাম আমরা বিয়ে করব।”

তূবা এগুলি যেন আর নিতে পারছিল না। কানে যেন আহফিন লাভা ঢেলে দিচ্ছে। তার নিশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট লাগছিল। বুকে এত কষ্ট হচ্ছে যেন এখনি দম টা তার দেহ থেকে বের হয়ে যাবে। তূবার চোখ গুলি পানিতে টুইটুম্ভুর হয়ে গিয়েছে। খুব কষ্টে গলা থেকে কষ্ট গুলি সে ভেতরে ঠেলে দিল। মাথাটাও কেনো যেন ঘুরছে। এক বিন্দু শক্তি যেন সে দেহে পাচ্ছে না।

আহফিন তূবার দিকে তাকাল না কেন যেন। তূবার ফুঁপিয়ে ছাড়া নিশ্বাস গুলির আওয়াজ সে পাচ্ছে। আহফিনের বুকে ভার কিছু অনুভব করল। সে জানে এই গুলি সব বুক ভরা কষ্ট। কিন্তু আজ সে তূবা কে সব বলতে চায়। বলা দরকার। তাই আবার বলতে লাগল সে।
“লুবনা কে পেয়ে দিন গুলি ভালোই কাটছিল আমার। লুবনা ছিল দেখতে সুন্দরি মর্ডান। সে ছিল আধুনিকতায় পরিপূর্ণ। যে কেউ তাকে দেখে মুগ্ধ হতো। লুবনার বাবা ছিলো না। তার মা আর সে। তাদের সংসারের খরচ আমি চালাতাম। লুবনা কে আমার বেশ পছন্দ ছিল লাইফ পাটনার হিসেবে। আমরা তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলতে চেয়েছি। কারণ তার সাথে দেখা হওয়ার দুইবছর আমার পাড় হয়ে গিয়েছিল। ভার্সিটিও শেষ। লুবনার সাথে তেমন দেখা হয় না। কারণ অফিসে আমাকে জয়েন্ট হতে হয়েছে। তাই ভেবেছি তাকে বিয়ে করে নিলে আমার একাকীত্ব কমে যাবে। লুবনা কে বিয়ের কথা বলার পর সে রাজি হয়। কিন্তু তার মাঝে আমি আমার জন্যে দেওয়া আগের সময় বা গুরুত্ব টা দেখতে পেতাম না। তার চিন্তিত মুখ আমাকে বিষণ্ণতায় ফেলে দিত। লুবনা কে দুই বছরেও আমি একটা কিস পর্যন্ত করি নি। কারণ তাকে তার জায়গা টা আমি দিতে চেয়েছিলাম। অবশ্য দুই তিন বার সে জড়িয়ে ধরে আমার গালে কিস করেছে। এক বৃষ্টির রাতে সে বাড়ি ফিরতে পারে নি। দুজনে এক বাড়িতেই ছিলাম আমরা।”

এই মুহূর্ত তূবার মনে হচ্ছে তার যদি মরণ হতে। যদি খারাপ কিছু শুনতে না হতো যাতে যে আবারো কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়। তূবা চোখ বন্ধ করে নিলে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ভেতরের উত্তপ্ত টা নিতে পারছে না সে।

“সেদিন তার ব্যবহার ছিল অন্য রকম। আমাকে নিজের দিকে টানার আভাষ দেখতে পেয়েছিলাম তার ব্যবহারে। আমি একটা ছেলে আমার ভেতরেও পশুর মতো একটা মানব লুকিয়ে থাকে। সব পুরুষের মাঝেই থাকে। আমারও কিছু কামনাবাসনা থাকতে পারে। টগবগে রক্ত আর শয়তানের তাড়নায় আমি লুবনার সাথে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। যখনি তার সাথে গভীর হতে যাবো তখন হয়তো আল্লাহর রহমতে আমার বিবেক জেগে উঠে। ঠেলে দূরে সরিয়ে আমি অন্য রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কেঁদে দেই। আল্লাহর কাছে মাফ চাই নামাজ পড়ে। আমাকে যেমন দেখছো আমি তখন মুটেও এমন ছিলাম না। সেদিন রাত টা আমার কঠিন গিয়েছিল। এক কানে শয়তান প্ররোচনা দিচ্ছিল অন্য কানে আল্লাহর ফেরেশতা আমায় সঠিক পথ দেখাচ্ছিল। এর পাঁচদিন পর আমাদের বিয়ে। লুবনা এই ঘটনার পর থেকে পুরোপুরি ভাবে আমাকে এড়িয়ে চলল। দুই দিন কথা বলেনি আমার সাথে। তিনদিনের মাথায় আমি ওর বাসায় যাই। ও নিজের ব্যস্ততা দেখিয়ে আমাকে চলে আসতে বলে। রাগ কষ্ট দুটোই হচ্ছিল আমার। এর পর দিন আমি তার বাড়ি গেলে দারোয়ান জানায় তারা বাসা ছেড়ে চলে গেছে। আমি লুবনার নাম্বারে কল করতেই থাকি কিন্তু বন্ধ পাই। দিশেহারা হয়ে পড়ি আমি। মাথা আমার কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। জানি লুবনা ইচ্ছা করেই চলে গেছে তবুও আমি ঢাকা শহরে খুঁজতে থাকি তাকে। পাই না। আমার মন ঘুরে যায়। মদের মাঝে ডুবে পড়ি আমি। একদিন এক আননোন নাম্বার থেকে একটা ম্যাসেজ আসে।
‘আহফিন আমি বুঝতে পেরেছি তোমার মাঝে হয়তো শারীরিক কোনো সমস্যা আছে। নাহলে আমার মতো একজন কে সেরাতে পেয়েও কে দূরে ঠেলে দেয়? আমি তোমাকে নিয়ে চলতে পারবো না। আর এমনিতেও তুমি আমার সব ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে না আমি জানি। আমি ইয়োকের সাথে বিদেশ চলে যাচ্ছি। সে আমাকে সুখে রাখবে। ভালো থাকো তুমি।’
এই কথা শুনে সেদিন ফোন টা ভেঙ্গে ফেলি। তার যত ছবি স্মৃতি ছিল সব পুড়িয়ে ফেলি। সারারাত ড্রিংকের সাথে অন্য নেশা করি। নেশায় টান বেড়ে যায়। লুবনার প্রথম কথার জিদ আমায় পেয়ে বসে। অফিসের একজনের কাছ থেকে লিলার নাম্বার পেয়ে কল করি। সেদিন তুমি এলে। তোমার উপর নিজের সব টা রাগ হিংস্রতায় ঠালি। সেদিন তোমাকে শুধু..!”

আহফিন কথা শেষ করার আগেই তূবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে। আহফিন নিচে তাকিয়ে “তূবা” বলে চিৎকার করে উঠল।

চলবে♥

#বর্ষার_এক_রাতে
#সাদিয়া

১৩
তূবার জ্ঞান ফিরে অনেক পরে। তার পাশে বসে আহফিন শক্ত হাতে তার হাত ধরে রেখেছিল। তূবা চোখ খুলতেই আহফিন তার মাথায় হাত রাখে। আলতো হাতে মাথায় হাত বুলাতে লাগল আহফিন। তূবা একবার আহফিনের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। বড্ড কষ্ট লাগছে তার। লোকটার প্রতি পিনপিনে রাগ টা বাড়তে লাগল তূবার।

আহফিন তূবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলল
“আগের কথাটাই শুনলে এর পরেরটা শুনবে না? আগের টা যেহেতু শুনতে পেরেছো পরের কথাও শুনতে হবে তোমার।”
“…
তূবার চোখ মুখ ফেটে কান্না আসছিল। নাক টেনে কান্না আড়াল করার চেষ্টা করল সে।
“আমি শুনতে চাই না।”
তার কথায় কান না দিয়ে আহফিন নিজের মতো বলতে লাগল।

“লুবনার প্রতি আমার ফিলিংস টা শুধু ভালো লাগার ছিল। ভালোবাসার মানে তো আমি তোমার সংস্পর্শে বুঝতে পেরেছি। হ্যাঁ এটা স্বীকার করতে কোনো অসুবিধা নেই যে প্রথম রাতে আমি শুধু রাগের বশে তোমার সাথে মিলিত হয়েছি। সে রাতে আমার রাগের মাত্রা এত যেন প্রতিটা মুহূর্তে আমি তোমাকে লুবনা মনে করে মারতে চেয়েছিলাম। কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম। ভেতরের রাগ টা সবটা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু যখন তোমার মুখের দিকে তাকাতাম তখন কষ্ট দিতে পারতাম না। প্রথম দিন রাতে ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। লুবনার উপর রাগে আমি তোমার গলা চেঁপে ধরতে যাই কিন্তু তখন তুমি ঘুমে ছিলে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আমার হাত আর চলল না। স্নিগ্ধ একটা বাতাস পাই বুকে। পাশ ফিরে শুয়ে পরেছিলাম তখন। সকালে যখন তোমাকে পাই নি কেমন অধৈর্য হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল কিছু চলে গেছে নিজের থেকে। সেদিন সারাটা দিন আমি তোমার কথা ভেবেছি। তোমার মুখশ্রী আমার চোখের নাগালে ছিল। ভাবছিলাম কখন রাত হবে তোমায় চোখের সামনে পাবো। মায়াবী মুখের আঁচে বুকটা খানিক শীতল হবে। এরপর থেকে আমি তোমার কাছে যাই শুধু নিজের জন্যে। আমার ছুঁয়ায় আমি হিংস্রতার বদলে কোমলতা দিতে চাইতাম। দিনদিন তোমার প্রতি আমার একটা আকর্ষণ বেড়েই উঠছিল। একটা টান, একটা মায়া, সেই ঝড় সৃষ্টি করা অনুভূতি। তোমাকে দেখার তৃষ্ণা বাড়তেই লাগল আমার। আমি বুকে তোমার প্রতি অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। তোমার স্পর্শ পেলে আমার শরীরে অদ্ভুত শিহরণ লাগে। তোমার প্রতি আমার যে অন্যরকম অনুভূতি তার নাম আমি জানি না। কবিরা বলে গেছে এমন অনুভূতির নামই নাকি ভালোবাসা। তবে বলব আমি তোমার জন্যে আমার বুকে বাসা বেঁধেছি। ভালোবাসার একটা বাসা।”

তূবা আহফিনের দিকে মুখ ফিরিয়ে কেঁদে ফেলল। আহফিন কান্না ভরা চোখে তূবার পানি মুছে দিল।
“তূবার চোখের পানি বুকে ছুরিকাঘাত করে যে। কাঁদবে না কোনোদিন আমার সামনে। ভেতরে খুব জ্বালা হয়।”
“…
তূবা কেঁদেই যাচ্ছে।
আহফিন হাত দিয়ে তার চোখের পানি গুলি মুছে দিচ্ছিল।
“তোমাকে ভালোবেসে বুকে ভালোবাসার ঘর বেঁধেছি। সেখানে থাকবে তূবা?”
সে উঠেই আহফিন কে জড়িয়ে ধরল কেঁদে। আহফিন চোখ বন্ধ করে তূবা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দুই ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার। এ কিসের অশ্রু তা জানা নেই। তূবার মাথা টা নিজের সাথে চেঁপে রেখেছে যেন কখনো ছাড়বে না। আহফিন চোখের পানি ছেড়ে তূবার মাথায় চুমু দিল।

তূবার কপালে গভীর চুম্বন করল আহফিন। তূবা কেঁদে আবার জড়িয়ে ধরল আহফিন কে।
“আমাকে ছেড়ে চলে গিয়ে একা করে দিবে না তো তূবা?”
“আমি যেন শেষ নিশ্বাস আপনার বুকের মাঝেই ছাড়তে পারি আহফিন।”

“তূবা।”
“হুম?”
“জানো কেন তোমাকে আমি এসব কথা আজ বলেছি?”
“না জানি না।”
আহফিন তূবা কে বুক থেকে তুলে মুখামুখি হয়ে বসল।
“লুবনা কাল আমায় কল করেছে।”
তূবার হাসি আনন্দ আবার মিলিয়ে গেল। আহফিনের দিকে অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল।
“ওই পাগলি তুমি মন খারাপ করেছো কেন? আল্লাহ কখনো কাউকে ছেড়ে দেয় না। কিছু পাপের শাস্তি তিনি দুনিয়াতেই দিয়ে দেন।”
“….
“লুবনা আমার সাথে যা করেছে ঠিক তার সাথে ইয়োক তা করেছে। ইয়োক তাকে ব্যবহার করে ছেড়ে দিয়েছে। সে এখন দেশে এসে আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমার কাছে ফিরে আসতে চায়।”
“…
“পাগলি তোমার কি মনে হয় আমি রাজি হবো? আমি আমার তূবা কে ছাড়া আর কিছু বুঝি না। বুঝতে চাইও না। তূবা আমার একটা পৃথিবী।”
তূবা বজ্রের গতিতে আহফিন কে আবার জড়িয়ে ধরল।

তূবা সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেল এক জোড়া চোখ তার উপর নিবদ্ধ। চমকে উঠেছে তূবা। ভীত স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“তাকিয়ে আছেন যে?”
“…
“মাথা নাড়াচ্ছেন কেন?”
আহফিন মুচকি হাসল তার দিকে তাকিয়ে।
“ঘুম থেকে উঠলেন কখন?”
“ঘুমালে তো ঘুম থেকে উঠব।”
“মানে কি আহফিন?”
“রাত জেগে আমি আমার জীবনের জ্যোৎস্না কে দেখেছি।”
তূবা কি বলবে জানে না। কিন্তু মানুষটা বদ্ধ পাগল বৈ আর কিছু না। এমন পাগলামি গুলি তার বুকে আনন্দের ঝড় তুলে দেয়।

—-
সেদিন তূবা রাতে একাই আহফিনের বাসায় এলো। কিন্তু বাড়ি টা একদম নীরব। এমনিতে নীরবই থাকে। তবে আজ যেন আরো থমথমে লাগছে। কারণ সারা বাড়িতে একটুও আলো নেই। তূবার ভেতরে খানিক ভয় হচ্ছে। এমন কুচকুচে অন্ধকারে একা একটা মেয়ে ভয় পাওয়াটা এত অস্বাভাবিক নয়। সে শুকনো ঢোক গিলে ডাকল “আহফিন?” “আহফিন আপনি কোথায়?” “আহফিন আপনি কি বাসায় নেই?”
কোনো সাড়াশব্দ আসে না। এবার তূবা খানিক জোরালো ভাবে ভয় পেতে শুরু করেছে। কিন্তু তেমন পাত্তা না দিয়ে সে ব্যাগ থেকে নিজের ফোন বের করে ফ্লাশলাইট অন করল।

কিছুদিন আগে আহফিনই তূবার জন্যে ফোন টা নিয়ে এসেছে। তূবা একবার ইচ্ছা হয়েছিল একটা স্মার্টফোন চালানোর। কিন্তু টাকার অভাবে কিনতে পারেনি। ইচ্ছা কে অবশেষে মাটি চাঁপাই দিতে হয়েছে।
“এই পৃথিবী তে কত হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন নিজের ইচ্ছা কে নিরিহ ভাবে মাটি চাঁপা দেয় তা আয়ত্তের বাহিরে। এটাই জীবন। এই তো মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের সংগ্রাম।”
তূবা কে ফোন টা দেওয়ার পর সে স্তব্ধ হয়ে ছিল। আহফিন বিষয় টা বুঝেও হাল্কা ভাবে নিল। নিজ হাতে সারারাত তূবা কে একটা স্মার্টফোনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেদিন তূবা মুখ ফুটে আহফিন কে কিছু না বললেও সে মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল। লোকটার দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে ছিলো স্লান হেসে।


তূবা লাইট এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল আর আহফিন কে ডাকছিল। তূবার এই ডাক কেউ শুনতে পাচ্ছিল না।

তূবা আহফিনের ঘরের সামনে গিয়ে দেখতে পেল দরজা লাগানো। তূবার ভয়ে এবার শরীর কাটা দিতে শুরু করেছে। কি হচ্ছে আজ? আসার সময় তার আম্মা দুই তিনবার না করেছে এই দিনে কাজে যেতে। তবুও আজ এলো। না জানি কি হয়। তূবা ঢোক গিলে দরজা ঠেলে দিল। কাঁপা পায়ে ভেতরে গেল সে। আহফিন কে ডাকলও বার কয়েক। লাইটের সুইচ অন করল। কিন্তু আলো এলো না। তূবার ভেতরে ভয়ে ধরাক ধরাক শব্দ হচ্ছে। এবার সে আহফিনের নাম্বারে কল দিল। কিন্তু ফোন বন্ধ। তূবার আর মন সাই দিল না ভয়ে। সে পিছন ফিরে ঘুরার আগেই একটা শক্ত হাত তার মুখ চেঁপে ধরেছে। সঙ্গে মাগায় বোধহয় ছুরিও ঠেকিয়েছে। তূবার হাত থেকে ফোন টা ধপাস করে উল্টো হয়ে নিচে পড়ে গেল। চোখ বড়বড় হয়ে এসেছে তার। ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে ভয়ে। নিজেকে ছাড়ানোর জন্যে ছটফট করতে লাগল সে। বিনিময়ে গলায় রাখা ছুরি শক্ত চাঁপ অনুভব করল। তূবা সঙ্গেসঙ্গে নীরব হয়ে যায়। ভয়ে মাথায় কিছুই আসছে না তার। সব কিছু লোপ পেয়েছে। কান্না পাচ্ছে খুব। তার সুখের দিন গুলি খুব অল্পই হয়। এবার আবার কোন কালবৈশাখী ঝড় চলে এলো হঠাৎ? জীবন কে আবার এলোমেলো করে দিয়ে যাবে না তো? কেন যেন রনির কথা মনে আসছে। রনি আবার..!
তূবার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here