#প্রেমোত্তাপ #মম_সাহা পর্বঃ ৪

#প্রেমোত্তাপ
#মম_সাহা

পর্বঃ ৪

হৈচৈ এ পরিপূর্ণ রুমটা মুহূর্তেই নিশ্চুপতায় মগ্ন হলো। টিক টিক করে ঘড়ির কাঁটা শব্দ করে জানান দিলো সময় অতিবাহিত হওয়ার গল্প। বাহার দাঁড়িয়ে আছে রণমুর্তি ধারন করা একজন মানুষের সামনে, চিত্রা তার পিছনেই গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার গাল লাল হয়ে আছে, চোখে অশ্রুদের মাখামাখি। মৃন্ময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলে উঠলো,
“আঙ্কেল, ও মজা করছিলো। চ ড় দেওয়ার মতন,,,,”

মৃন্ময়ের কথা শেষ করার আগেই শক্ত পুরুষ মূর্তি টা থামিয়ে দিলো তাকে। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন
“শাক দিয়ে মাছ ঢাকার দরকার নেই, মৃন্ময়। আমি নিজের চোখে দেখেছি সবটা।”

নুরুল সওদাগরের রাগী কণ্ঠ পরিস্থিতি আরও বিপরীতে নিয়ে গেলেও উপস্থিত একজনের মুখে হাসি ফুঁটে রইলো। অগোছালো সেই লোকটা হাসে কম আর যতটুকু হাসে তা ভুল জায়গায় তবে সঠিক হাসি। এখনও তাই হলো। হাসতে হাসতে সে কিছুটা হেয়ালি করে বললো,
“সমস্যা টা তো এখানেই, স্যার। আপনারা নিজের চোখে যা দেখেন তা দেখেই বিচার করতে উঠে পড়ে লেগে যান। চোখের আড়ালেও যে গল্প থাকে, সেটা আর জানার কিংবা বোঝার চেষ্টা করেন না।”

নুরুল সওদাগর বোধহয় আরেকটু রাগলেন। রুক্ষ কণ্ঠে বললেন,
“তোমাকে নাক গলাতে বলা হয় নি এখানে। সো শাট আপ।”

“আচ্ছা! আপনার কী মনে হয়, মানুষ কিছু করতে বলবে এরপর আমি সেটা করবো!”

নুরুল সওদাগর আরেকটু রাগলেন। হাত বাড়িয়ে বাহারের পেছনে লুকিয়ে থাকা চিত্রাকে ধরতে নিলেই হাত টা ধরে ফেললো বাহার। বেশ গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
“আহা স্যার, এত নিজের মন মতন নাচবেন না তো। আপনার অনেক ক্ষমতা আছে বুঝলাম কিন্তু বাহার যেখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে ক্ষমতা দেখানো নেহাৎ ই বোকামি।”

“ক্ষমতা দেখাবো আমি। কী করবে তুমি? কী করবে হ্যাঁ?”

কথাটা বলেই বাহারের দিকে তেড়ে গেলেন নুরুল সওদাগর কিন্তু বেশি কিছু করতে পারলেন না, তার আগেই তুহিন এসে পড়লো। বেশ শান্ত কণ্ঠে বাবার উদ্দেশ্যে বললো,
“আপনি সিনক্রিয়েট করতে ভালো জানেন সেটা আমাদের জানা আছে কিন্তু তাই বলে বাহিরের মানুষের সামনে ঘরের মেয়েকে অপমান করার কোনো অধিকার আপনার নেই।”

নুরুল সওদাগর কিছুটা দমে গেলেন ছেলেকে দেখে। কিন্তু পুরোপুরি থেমে গেলেন না। সে কড়া চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে বিশ্লেষণ করে বললেন,
“তোমার বোন কী করেছে জানো? আমি দরজার সামনে এসে শুনি সে হিংস্র চোখে শাহাদাৎ এর দিকে তাকিয়ে মৃন্ময়কে বলছে, এমন ব্রিলিয়ান্টের ধার নাকি সে ধারে না। শাহাদাৎ নাকি মানুষ ভালো না। বাড়িতে ডেকে এনে মেহমানকে অপমান করার শিক্ষা কোথা থেকে পেলো সে?”

বাবার কথায় ভ্রু কুঁচকালো তুহিন। বোনের দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক কণ্ঠেই বললো,
“আমার চিতাবাঘ, তুই তো এসব এমনি এমনি বলার মেয়ে না। কী জন্য বলেছিস এমন?”

“তুহিন, তুমি আশকারা দিচ্ছো ওকে। ঘরের মানুষ, বাহিরের মানুষ সবাই মিলে আমাকে অপদস্ত করার খেলায় মেতেছো দেখি!”

বাবার ভরাট কণ্ঠের বিপরীতে তুহিন তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিলো, “যে নিজে যেচে অপদস্ত হতে চায়, তাকে তো সেটাই করা হবে। অহি, বল তো কী হয়েছে এখানে।”

শেষের কথাটা তুহিন অহির দিকে তাকিয়ে বললো। অহি ভীতু ভীতু চোখে একবার নুরুল সওদাগরের দিকে তাকালো অতঃপর ঢোক গিলে বলতে লাগলো,
“সবাই ই কথা বলছিল। বাহার ভাই ও এসেছিলেন চিত্রাকে পড়াতে। এর মাঝেই চাঁদ আপা নিলা ভাবীকে বললো ‘নিলা, তোমার শাড়িটা তো বেশ সুন্দর। লাল টকটকে। নতুন বিয়ে হয়েছে, শাড়ি দেখলেই বোঝা যাবে।’ তখন মৃন্ময় ভাইয়া ফোড়ন কেটে আপাকে বললেন, ‘ওর না-হয় নতুন বিয়ে হয়েছে বলে লাল শাড়ি পড়েছে তা আপনার কী জামাই মারা গেছে যে সাদা ধবধবে একটা শাড়ি পড়ছেন বুড়িদের মতন।’ বাহার ভাই আবার মৃন্ময় ভাইয়ার কথার পিঠে বলেছেন ‘হ্যাঁ স্বামী মারা গেছে বলেই পড়েছে। কোথায় সৃষ্টি তো কোথাও ধ্বংস। কারো গায়ে সৃষ্টির মেলা কারো বা ধ্বংসের খেলা।’ এরপর আরেকটু কথা কাটাকাটি হয় মজার ছলেই তখন চিত্রা রেগে গিয়ে মৃন্ময় ভাইয়াকে বলে, ‘শাহাদাৎ ভাইয়ার কোনো যোগ্যতা নেই ভালো মানুষ হওয়ার। আপার সাথে তার তুলনা চলে না। এমন ব্রিলিয়ান্টের কেথায় আগুন যদি সে মানুষই না হতে পারে।’ আরও অনেক কিছু বলে। এর মাঝেই মেঝো বাবা এসে পড়ে এবং চিত্রাকে ধরে চ ড় মেরে বসে।”

তুহিন চুপ করে একবার চিত্রাকে পর্যবেক্ষণ করলো। মেয়েটা লজ্জায়, অপমানে যে একবারে মূর্ছা গেছে তা বুঝাই যাচ্ছে। তার আরেকটু দূরে চাঁদনী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মৃন্ময়েরও মাথা নত করা। সাথে শাহাদাৎ আর নিলাও স্তব্ধ। তুহিন সবসময়ই বুদ্ধিমান ছেলে। বাবার এমন বিবেকহীন কাজটা তার ভীষণ অপছন্দ হলেও সে আর কথা বাড়ালো না বরং বেশ গম্ভীর কণ্ঠে শাহাদাৎ এর উদ্দেশ্যে বললো,
“শাহাদাৎ ভাইয়া আর ভাবী, কিছু মনে করবেন না। আমার পরিবারিক সমস্যার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী।”

অতঃপর সে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
“কিছু মনে করবেন না আব্বু, আপনার আচরণ দিন দিন বাজে হচ্ছে। নিজেকে সুস্থ করুন। আর বাহার ভাই, আব্বুর হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি আমি। আমার বোনকে রক্ষা করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।”

বাহারের ঠোঁটে তখনও বাকি হাসি। শার্টের কলারটা সে পিছে ঠেলতে ঠেলতে বললো,
“মনুষ্যত্ব ছাড়া নাকি মানুষ হওয়া যায় না, স্যার? অথচ আপনাকেও নাকি লোকে মানুষ বলে! হাস্যকর। শালা, পৃথিবীতে সব এতো হাস্যকর ক্যান? টাকাই সব, টাকাই রব।”

বাহার আর দাঁড়ালো না। অলস পায়ে ঘরে এলেও বেরিয়ে যাওয়ার সময় ছিলো তার রাজ্যের ব্যস্ততা। ভাব এমন, কোনো একটা রাজ কার্য করতে যেন যাচ্ছে। নুরুল সওদাগর সেখানে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে ছোটো কণ্ঠে বললেন, “বেয়াদব ছেলে” অতঃপর বেরিয়ে গেলেন সেও। তুহিন, শাহাদাৎ আর নিলাকে নিয়ে গেলো। অহিও দ্রুত রুম ত্যাগ করলো। পুরো রুমে দাঁড়িয়ে রইলো চিত্রা, মৃন্ময়, বনফুল আর চাঁদনী। মৃন্ময় আমতা-আমতা করে চিত্রাকে বললো,
“আমার চিতই পিঠা, রাগ করো না।”

চিত্রা অগ্নি দৃষ্টি ফেলে তৎক্ষণাৎ রুম ছাড়লো। মৃন্ময়কে আর কিছু বলার সুযোগও দিলো না। চিত্রার পেছন পেছন বনফুলও চলে গেলো। চাঁদনী আগের জায়গায় মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো। মেয়েটাকে শাড়ি নিয়ে বলার পর থেকে এতই চুপ করলো যে আর একটা শব্দ করলো না। মৃন্ময়ের খারাপ লাগছে, মজা করতে গিয়ে হয়তো বাজে মজাই করেছে নাহয় পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। মৃন্ময় দু’পা এগিয়ে এলো চাঁদনীর দিকে। অপরাধীর ন্যায় বললো,
“আপনাকে আমি কষ্ট দিতে চাই নি, ইন্দুবালা।”

“সমস্যা নেই, ঠিক আছি আমি।”

আজ চাঁদনী রাগ দেখালো না, ধমকালো না। মৃন্ময়ের অপরাধ বোধ আরও বাড়লো। সে ক্ষীণ স্বরে বললো,
“আপনাকে বুড়ি বলা উচিৎ হয় নি।”

“বুড়িকে বুড়ি বলবে সেটাই তো স্বাভাবিক তাই না? আমি কিছু মনে করি নি। তুমি সত্যি বলার সৎসাহস রাখো সেটাই অনেক।”

“কে বলেছে আপনি বুড়ি? আপনি হাসি দিলে পুরো দুনিয়া আপনার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়বে আর আপনি বলেন আপনি বুড়ি।”

চাঁদনী মুচকি হাসলো মৃন্ময়ের কথায়৷ ছেলেটার কোঁকড়া চুল গুলো আলগোছে এলোমেলো করে দিয়ে আদুরে স্বরে বললো,
“তোমার কথায় আমি কষ্ট পাই নি। তবুও তুমি আমাকে হাসানোর চেষ্টা করেছো তাই নির্দ্বিধায় তুমি পৃথিবীর সুন্দর মনের মানুষের মধ্যে একজন। তোমার আশেপাশের মানুষ গুলো এমন সুন্দর হলে হতোই।”

“আমার আশেপাশের মানুষ গুলো কে?”

চাঁদনী জবাব দিলো না। ধীর পায়ে চলে যেতে নিলেই মৃন্ময়ের হেয়ালি কণ্ঠে বললো,
“আশেপাশের মানুষটা কী আমার ভাই?”

চাঁদনী তৎক্ষনাৎ থেমে গেলো। বিদ্যুৎ খেলে গেলো তার শরীরে। ভ্রু কুঁচকে বললো, “মানে!”

“চাঁদের হাঁটে পাপের উৎসব
ভুল ছোঁয়ার অপরাধে,
প্রেমিক তবু ভালো থাকে
প্রেমিকা বাঁচে অবসাদে।” (মম)

মৃন্ময়ের চোখে-মুখে দুষ্টু হাসি। চাঁদনী কেবল তাকিয়ে রইলোই। ছেলেটা কী বুঝাতে চাইলো!

_

গভীর রাত, চারপাশ তুমুল নিরবতায় আচ্ছন্ন। অহির ঘরে লাইটের আলো জ্বলজ্বল করছে। মেয়েটা মনযোগ দিয়ে পড়ছে। ঘরে অন্য আরেকজনের উপস্থিতি অনুভব করতেই অহি মাথা তুললো। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো অবনী বেগম হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক গ্লাস দুধ। অহি তেমন পাত্তা দিলো না, আগের ন্যায় বইয়ে মুখ গুঁজলো। তা দেখে গোপনে হতাশার শ্বাস ফেললো অবনী। দুধের গ্লাসটা অহির টেবিলে রেখে মিষ্টি হেসে অহির মাথায় হাত রাখলো। সাথে সাথেই হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলো অহি। বিরক্ত কণ্ঠে বললো,
“ডিস্টার্ব করছেন।”

“দুধটা খেয়ে নেও, অহি।”

“আপনাকে অত নাটক করতে হবে না। যান, নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমান।”

অহির কণ্ঠে কেমন তিক্ততা! অবনীর চোখ টলমল করে উঠলো কিন্তু কণ্ঠ কোমল। নিবিড় কণ্ঠে বললেন,
“খেয়ে নেও দুধটা, আমি গ্লাসটা নিয়ে যাই।”

“আপনার এসব আমার পছন্দ না। বার বার বলার পরও কী বুঝেন না? যত্তসব।”

“অহি, ভদ্র ভাবে কথা বলো। আমি তোমার মা।”

অবনীর দৃঢ় কণ্ঠের বিনিময়ে অহির তাচ্ছিল্য ভেসে এলো। হো হো করে হেসে বললো, “মা!”

_

বাহার চিলেকোঠার ঘরে মাত্রই প্রবেশ করলো। ওদের ছাঁদটা অন্ধকার। ও ঘরে ঢুকেই ছাঁদের হলুদ বাতিটা জ্বালিয়ে দিলো। ঘরের বাতি জ্বালালো। ঘড়ির কাঁটা গিয়ে থেমেছে দুইয়ের দিকে। তার মানে রাত দু’টো বাজছে। বাহার নিজের খাটে বসলো। সারাদিন প্রচুর খাটাখাটুনির পর সে ক্লান্ত। টি-শার্ট নিয়ে চলে গেলো গোসলে। এটা তার সবসময়ের স্বভাব। যখনই ঘরে ফিরবে তখনই গোসল করবে।

গোসল সেড়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় বসলো সে। চোখ জুড়ে ঘুম আসছে কিন্তু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। তার ইচ্ছে গুলোই বড়ো অদ্ভুত। বাহার তার বইয়ের টেবিলের পাশ থেকে গিটার টা তুলে নিলো। মাঝরাতে তার গিটার বাজাতে ভীষণ ভালো লাগে। এক প্রকার তৃপ্তি পায় সে। এই মহল্লাটা শান্তি প্রিয়। কোনো হৈচৈ তাদের পছন্দ না। বাহারের এই গিটার বাজানো নিয়ে কয়েকজন প্রায় কমপ্লেইন করতো আগে কিন্তু বাহার কারো কথা পাত্তাই দেয় নি। বরং কেউ তাকে বুঝাতে এলে সে বলে দেয়, যা তাকে সুখ দেয় সে তা করবেই। মানুষের তো স্বভাবই, অন্যের সুখে বাঁধা দেওয়া। সেসব ভাবলে সুখী হওয়া যায় না। লোকে বলে সবাইকে নিয়ে সুখী হতে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবাইকে নিলে আর সুখী হওয়া যায় না।

ছাঁদের চওড়া রেলিঙে আরাম করে বসলো বাহার। কেবল একটা আঙ্গুল ছুঁয়ে দিলো গিটার। ঠিক সে মুহূর্তে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“বাহার ভাই, খাবেন না?”

এমন রাতে মেয়েলি কণ্ঠ শুনে বাহারের ভীষণ রকমের চমকে যাওয়ার কথা কিন্তু বাহার চমকালো না। বরং চোখ গিটারে রেখেই পা ঝুলাতে ঝুলাতে বললো,
“এত রাতে এখানে কী?”

মেয়েলি অবয়বটা এগিয়ে এলো। ভাবুক স্বরে বললো,
“আপনি চমকালেন না কেন?”

“এত রাতে এখানে কী?”

বাহারের একই প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হলো চিত্রা। কোমড়ে দু-হাত চেপে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
“আপনার জন্য খাবার এনেছি।”

“ফিরিয়ে নিয়ে যাও।”

বাহার এখনো চিত্রার দিকে তাকালো না। চিত্রা ভীষণ বিরক্ত হলো। সিঁড়ির কাছটাতে কাঠের মোড়ায় ঢেকে রাখা প্লেটের খাবারটা নিয়ে এলো। বাহারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“আজ তো আপনাদের দাওয়াত ছিলো আমাদের বাড়ি। আপনি তো গেলেন না পরে আর। তাই আপনার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম।”

“অপেক্ষা না করে পড়াশোনা করলে কাজে দিতো না? যাও বাড়ি। অনেক রাত হয়েছে।”

“আপনি খাবেন না? অনেক কষ্ট করে লুকিয়ে এনেছিলাম।”

“খাবো না বলেই তো বলছি নিয়ে যেতে। আমরা পান্তা ভাতের পেট নিয়ে এসেছি, বিরিয়ানি সহ্য করতে পারবে না। যাও, মেয়ে।”

চিত্রা ঠোঁট ফুলালো। অভিমান করলো। সেও তো খায় নি, লোকটা কী জানে সে কথা? একটা বার জিজ্ঞেস করলে কী ক্ষতি হতো শুনি!

বাহার এবার কণ্ঠ উঁচুতে তুললো, কিছুটা ধমকের স্বরে বললো,
“রাত বিরাতে এমন মানুষের বাড়ি আসবে না। লোকে কী বলবে সেটা ভেবে বলছি না, আমার ভালো লাগে না তাই বলছি। যাও।”

চিত্রার তো কান্না এসে পড়লো। লোকটা পাষাণ, বড্ড পাষাণ। কিন্তু চিত্রা যে বড্ড কোমল! সে তাও ক্ষীণ কণ্ঠে বললো,
“আপনি খাবেন কী তাহলে?”

“বনফুল ভাত আর ডিম ভাজি রেখে গেছে। খেয়ে ফেলবো।”

“তাও আমার আনা খাবার খাবেন না?”

“এক কথা বার বার কেন বলছো? না এর কোনো সমার্থক শব্দ আছে? থাকলে সেটা দিয়েও বলছি, আমি খাবো না। যাও।”

চিত্রা ভীষণ অভিমান করলো। খাবার হাতেই নেমে গেলো দ্রুত। বাহার আকাশ পানে তাকিয়ে গিটারে সুর তুললো। কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে বের হলো না কোনো সুর, ছন্দ। বাহার ঘাড় ঘুরিয়ে পথের দিকে তাকালো। মেয়েটা ছুটে যাচ্ছে নিজের বিল্ডিং এর দিকে। বাহার হাসলো। কোমল কণ্ঠে বললো,
“রঙ্গনা, এমন মিষ্টি অভ্যাস হয়ে এসো না আমার কাছে। পরে হারিয়ে গেলে আমার শূন্যতা জাগবে। সব শূন্যতা পূরণ করা গেলেও তোমার শূন্যতা কখনো পূরণ করা যাবে? শুনছো মেয়ে, তুমি চাঁদ দেখো দশ তলা বিল্ডিং এ শুয়ে, আর আমি চাঁদ দেখি চিলেকোঠার জানলার ফাঁকে। আমাদের আলাদা করতে এর চেয়ে বড়ো পার্থক্য হয়? তুমি যেই আকাশের চাঁদ আমি সেই আকাশের নিচে বসে থাকা সর্বস্ব হারা এক পথিক। আমাদের যে বড্ড তফাত, বড্ড পার্থক্য! রঙ্গনা, তুমি তোমার অবুঝ আবেগ সামলে নিও, তোমার প্রেমিক যে বাস্তবতার বেড়াকলে বড্ড বেশিই পাষাণ, হৃদয়হীন।”

চিত্রা বিল্ডিং এর ভেতর ঢুকে পড়তেই বাহার গলা ছেড়ে গান ধরলো,
“বন্ধু মন ভাঙিয়া চইলা গেলে
সুখ মেলে না মেলে না,
প্রেম করিয়া ছাইড়া গেলে
সুখ মেলে না মেলে না
প্রেম করে মন দিলা না,
আমি মরলে একটুও কানবা না।”

#চলবে

ছবিয়ালঃ মায়া❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here