#প্রেমোত্তাপ #মম_সাহা ১৬.

#প্রেমোত্তাপ
#মম_সাহা

১৬.

গত দু’দিন যাবত প্রকৃতি প্রায় মন খারাপের রূপ নিয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হয় আবার কিছুটা বিরতি নেয়। তারপর আবার অঝোর ধারায় ঝরে। মানুষের প্রাত্যাহিক জীবন যাপনে কিছুটা মিলেছে বিশ্রাম। অনেকে বৃষ্টি দেখে স্কুল যাচ্ছে না, কলেজ যাচ্ছে না, কেউবা নিয়েছে কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি। আবার যাদের পেট চালানোর জন্য সবসময় পরিশ্রম করতে হয় তাদের এখন রিকশা নিয়ে রাস্তার কোণে ভিজতে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বৃষ্টিও ধনী গরীবের পার্থক্য বুঝে! তাই তো কেউ তাকে পেয়ে খুশি আর কেউ তার যন্ত্রণায় পেটে ক্ষুধা আর মনে আশা নিয়ে বসে আছে এই বুঝি রোজগার করতে পারবে কিছু।

সেই বৃষ্টি ভেজা এক অবসাদগ্রস্থ দিনে অহি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে। কর্দমাক্ত রাস্তা তাকে প্রায় নাজেহাল করেছে। তার উপর কোনো রিকশা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোনো গাড়িতে সিট খালি নেই অথচ তার আজ গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষা। পরীক্ষা দিতেই হবে তাকে। সাইকোলজির স্টুডেন্ট হয়ে বড়ো বিপাকেই পড়েছে। পড়াশোনা এত কষ্ট জানলে খুব সাদামাটা একটা বিষয় নিয়েই পড়তো নাহয়। অহি তার হাতের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে সময় দেখে নিল। সকাল সাড়ে সাতটা বাজছে। দশটায় পরীক্ষা। বাসা থেকে ভার্সিটির দূরত্ব অনেক তার উপর বৃষ্টি। সে হিসেব করেই একটু আগে বের হয়েছে কিন্তু তাও বৃষ্টির জন্য কোনো লাভই হচ্ছে না। আকাশের রঙও ভীষণ ধোঁয়াশা। সময়টা সকাল সাতটা মনে না-হয়ে যেন মনে হচ্ছে সন্ধ্যা সাতটা। সময় নিজ গতিতে বয়ে যাচ্ছে অথচ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। হাতের ছাতাটা বৃষ্টির ভার বোধহয় আর বহন করতে পারছে না। বাতাসের ছাঁটে বেশ খানিকটা ভিজেও গেছে সে। জামার হাতাটা ছোটো হওয়ায় হাত ভিজে গেছে যার ফলস্বরূপ ভীষণ ঠান্ডাও লাগছে। তন্মধ্যেই একটা বাস ছুটে আসতে দেখে অহি ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাত বাড়াল, দ্রুত ছুটে গেল বাসটার দিকে। বাসটার গতি ধীর হলেও থেমে গেল না। সেই আধো ছুটন্ত বাসেই প্রায় যুদ্ধ করে ওঠে দাঁড়াল অহি। বাস দেখেই ছাতা বন্ধ করে দিয়েছিল যার কল্যাণে তার শরীর এখন পুরো ভিজে একাকার। অহি বিরক্ত দৃষ্টিতে বাসের এধার থেকে ওধার চোখ ঘুরিয়ে নিল একটু বসতে চাওয়ার আশা নিয়ে। এবং তার ভাগ্যের সুদৃষ্টিতে সে একটা সিটও পেয়ে গেল। যেই দ্রুত ছুটে গিয়ে বসতে নিবে ঠিক তখনই পরিচিত পুরুষ মুখমন্ডলটা তার দৃষ্টিগোচর হলো। সে অবাক কণ্ঠে বলল,
“আরে হুমুর বাপ যে!”

নওশাদ আশ্চার্য ভঙ্গিতে চোখ উঠিয়ে চাইল অহির পানে। সেও অবাক কণ্ঠে বলল,
“আইসক্রিম আন্টি যে! তা আজ তো হুমুর আইসক্রিম লাগবে না কিন্তু তবুও আন্টির দেখা মিলল যে!”

অহি মুচকি হেসেই নওশাদের পাশের সিটে বসল। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আন্টির আজ পরীক্ষা, তাই আন্টি বের হয়েছে। হুমু কেমন আছে?”

“আর বলবেন না, হুমু তো প্রায়ই আপনার কথা বলে, তার আইতকিরিম আন্তি বলে কথা। কিন্তু আমরা তো হুটহাট দেখা হওয়া মানুষ সেটা ওকে কীভাবে বলি, বলুন তো?”

“ওর কথা আমারও প্রায় মনে পড়ে। দেখা করিয়ে দিয়েন একদিন।”

“আচ্ছা। তা আপনার কী পরীক্ষা? কোন ডিপার্টমেন্ট? কোন ইয়ার?”

“সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট, থার্ড ইয়ার।”

নওশাদ চোখ বড়ো বড়ো করে চাইল। অবাক কণ্ঠে বলল, “থার্ড ইয়ার! বুঝা যায় না। ছোটো লাগে। তা সাইকোলজির স্টুডেন্ট, আমি কিন্তু বেশি ইন্টারেস্টেড এই বিষয়টা নিয়ে।”

“স্বাভাবিক ভাবেই এটা নিয়ে যারা জানেনা তারা সকলেই আগ্রহ প্রকাশ করে।”

“তা, আপনি মানুষ পড়তে পারেন?”

নওশাদের প্রশ্নে হাসল অহি। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “বই পড়েই কূল পাই না আর আপনি বলেন মানুষ পড়তে! বড্ড কঠিন কাজ তা।”

“কিন্তু আমার জানা মতে, আইসক্রিম আন্টি সবই বোধহয় পারবে।”

_

চাঁদনী আজ কয়েকদিন যাবত অফিস যায় না। লজ্জায় ঘরের বাহিরেও তেমন যায় না। ফোন, স্যোশাল মিডিয়াতেও সে একটিভ নয়। যেন দুনিয়া থেকে নিজেকে আড়াল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা সে করেছে। কিন্তু আজ বৃষ্টি তার ভেতরটা তৃষ্ণার্ত করেছে। আজ ভিজতে ভীষণ ইচ্ছে করছে তার, ভিজে অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে করছে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। চাঁদনী আলগোছে শরীরের জামাটা পাল্টে নেয়। টাকার ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।

সকাল হওয়ায় রোজা সওদাগর আর অবনী বেগম রান্নাঘরেই ব্যস্ত। তার উপর বাহিরে বৃষ্টি। বাড়িতে তুহিনও আছে। বৃষ্টি বলে সে বের হয়নি। সকলে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। চাঁদনী বেশ আড়াল হয়েই বেরিয়ে গেল।

খুব দ্রুতই সে বৃষ্টির ছাঁট নিয়েও এলাকা ছেড়ে বেরুলো। এতক্ষণ মুখে ওড়না দিয়ে ঘোমটা জড়ানো থাকলেও এলাকা ছেড়ে বেরুতেই ঘোমটা খানা ছাড়িয়ে দেয়। খোলা রাস্তায় প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। বুক ভরে যায় তৃপ্তিতে। আহা, জীবন কতটা নির্মল! মাটির ভিজে গন্ধে তার শরীর তাজা হয়ে ওঠে। মন খারাপ যেন নিমিষেই হারিয়ে যায়। তন্মধ্যেই পেছন থেকে তার এককালীন প্রিয় পুরুষের কণ্ঠ ভেসে আসে,
“চাঁদ!”

চাঁদনী থমকে যায়। বৃষ্টির এমন তুমুল নৃত্যে চোখ মেলে থাকাটা দায় হয়ে যায় তবুও সে তাকায়। শাহাদাৎ এর ছাতার নিচে গম্ভীর মুখটা দৃষ্টিগোচর হয়। শাহাদাৎ আরেকটু এগিয়ে আসে, অবাক কণ্ঠে বলে,
“বৃষ্টিতে ভিজছো যে! ঠান্ডা লাগবে না?”

চাঁদনীর কঠিন চোখে তাকানোর কথা থাকলেও সে তাকায় কোমল ভাবে। ধীরে উত্তর দেয়,
“ঠান্ডা লাগবে কিনা জানিনা। তবে শান্তি লাগছে।”

“তোমার সাথে যে ছেলেটার ছবি ভাইরাল হয়েছে, সেটা কে ছিল?”

শাহাদাৎ এর প্রশ্নে চাঁদনী কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
“ছিল আমার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী।”

“শুভাকাঙ্ক্ষী যে দুঃখ ডেকে আনল!”

“অভাগা যেখানে যায়, সমুদ্র শুকিয়ে যায়- প্রবাদ বাক্যটা শুনেছিলে? আমি সেই অভাগা। দোষ শুভাকাঙ্ক্ষীর না, দোষ তো আমারই কপালের। তুমিও তো আমার প্রিয় ছিলে, ভাগ্যের জোরে আজ প্রাক্তন। ভাগ্যেরই তো সব খেলা, তাই না বলো?”

শাহাদাৎ কিছুটা মাথা নত করলো। লজ্জিত কণ্ঠে বলল,
“আমি তোমায় বিশ্বাস করি। তা, আমাকে ক্ষমা করবে না কখনো?”

“করে দিয়েছি অনেক আগে। আমি সবসময় চাই তুমি সুখী হও। সুখী হওয়ার জন্য যদি তোমার আমাকে ছাড়তে হয় তাতেও আমার আপত্তি ছিল না। আর আজ যখন দেখলাম তুমি আমাকে ছাড়া সত্যিই সুখী, তখন আমার শান্তি লাগছে। বরং তুমি আমার সাথে থাকলে কিন্তু সুখী হলেনা সেটা আমাকে কষ্ট দিত। অথচ আজ শান্তি পাচ্ছি।”

“আমাকে আর চাও না?”

শাহাদাৎ এর অদ্ভুত প্রশ্নে হেসে প্রায় খুন চাঁদনী। হাসতে হাসতে বলল,
“তোমাকে চাওয়া সেদিনই ছেড়ে দিয়েছি যেদিন শুনেছি তুমি অন্য কাউকে চাও। যে আমার, সে আমারই। তার এক অংশ যদি অন্যকারো হয় তবে তা আমার চাই না। অথচ তুমি আগাগোড়া পুরোটাই অন্যকারো। কীভাবে চাই তোমাকে বলো?”

শাহাদাৎ এর লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে এলো। চাঁদনী কালো মেঘের পানে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“পৃথিবী বড্ড নিষ্ঠুর, যে যাকে ভালোবাসে সে তাকে পায় না। এমনটা কেন হয় শাহাদাৎ? সৃষ্টিকর্তা কী জানেনা? ভালোবাসার মানুষকে ছাড়া আমরা বড্ড যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকি। এ বেঁচে থাকায় কোনো মহত্ত্ব নেই, শাহাদাৎ। তোমরা কেন দিনশেষে এমন বদলে যাও? তোমরা তো জানোনা শাহাদাৎ, তোমরা একটা মানুষকে মেরে ফেলো হয়তো অজান্তেই।”

_

পুরো শহর যখন বৃষ্টিতে দুঃখবিলাস করছে চিত্রা তখন গায়ে জ্বর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শাহবাগের মোড়ে। শরীরে দেখা দিয়েছে মৃদু কম্পন। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বাহার, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। চিত্রার চোখ-মুখ তখন প্রায় অনেক বেশিই লাল হয়ে আসছে। বাহার ধমক দিল,
“এই মেয়ে, বৃষ্টির মাঝে তোমার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে ভালো লাগছে! অদ্ভুত সব কর্মকান্ড।”

“ভালো লাগছে। আপনি পাশে থাকলে আমার সবই ভালো লাগে।”

বাহার আড় চোখে চাইল মেয়েটার পানে। কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠেই বলল,
“আমি তোমার টিচার হই, মনে রেখো।”

“সেটা তো পড়ার টেবিল অব্দি। শাহবাগের মোড়ে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার সবচেয়ে পছন্দের পুরুষ হয়ে।”

“জ্বর কী আবেগ বাড়িয়ে দিল?”

“না তো, প্রেম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার বড্ড প্রেম পাচ্ছে, বাহার ভাই।”

মেয়েটার লাগামহীন কথাবার্তায় বাহার কপাল কুঁচকে ফেলল। চিত্রার কিছুটা কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখল। না জ্বর তো ততটা বাড়েনি তবে শরীর মোটামুটি ভালোই গরম। কিন্তু উল্টোপাল্টা বকার মতন অবস্থা হয়নি। তবে মেয়েটা ইচ্ছাকৃত এসব বলছে! বাহারকে লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে! চিত্রা ততক্ষণে বাহারের হাতটা চেপে ধরল, ফিসফিস করে বলল,
“জ্বরটা শরীরের না, মনের। একটু উষ্ণতা চাচ্ছে মন।”

বাহার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। পকেট থেকে সিগারেট বের করল। সিগারেটে ফুক দিয়ে বলল,
“পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্টি অনুভূতি কী জানো, রঙনা?”

চিত্রা চোখ উল্টে তাকালো। মন খারাপ নিয়ে বলল, “কী, বাহার ভাই?”

“প্রেমিকার ঠোঁটের চুমু।”

বাহারের লাগামহীন কথায় চিত্রা হতভম্ব। সে বাহারকে অবাক করতে চেয়েছিল কিন্তু বাহার নিজেই এমন কথা বলবে তা যেন সে ভাবতেও পারেনি। বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“বাহার ভাই!”

বাহার উচ্চ স্বরে হেসে দিলো। চিত্রার বেশ ক্ষানিকটা কাছে এসে জড়িয়ে ধরল মেয়েটা কোমল কোমড়টা। ঘোরগ্রস্তের মতন বলল,
“আগুনের সংস্পর্শে এলে মোম গলে আর প্রেমিকার সংস্পর্শে এলে প্রেমিক গলবে না তা কী করে হয়, রঙনা? আমিও তো প্রেমিক হতে চাই, পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি অনুভূতি আমারও তো পেতে ইচ্ছে করে।”

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here