প্রেমময়_বসন্তের_আগমন #পর্বঃ৭ #বর্ষা

#প্রেমময়_বসন্তের_আগমন
#পর্বঃ৭
#বর্ষা

ড্রয়িং স্পেসে বসে আছে ওয়াজিহা।চারপাশ ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করছে।অনেকক্ষণ যাবৎ ইউশা কিচেনে কাজ করছেন। ওয়াজিহাকে যেতে বারণ করেছেন।সকালে দেখা এত্তো এত্তো কেয়ারটেকারের কেউ এখন আর ভিলাতে নেই। ওয়াজিহার ভীত হওয়া উচিত হলেও সে তার চরিত্রের মতো বিন্দাস বসে আছে।

ইউশা কিচেন থেকে উঁকি দেয়। ওয়াজিহা এদিক ওদিক তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে রিমোট হাতে বারবার বিরক্ত ভঙ্গিমায় টিভিতে চ্যানেল চেঞ্জ করছে।ইউশা মাথা ঝাঁকিয়ে হাসে।বিরবির করে কিছু একটা বলে।

ওয়াজিহার দৃষ্টি থামে নিউজ চ্যানেলে।গুরুতর এক সড়ক দুর্ঘটনা।আহত বিদেশী এক ব্যক্তি। কেননা গাড়ি থেকে প্রাপ্ত কাগজপত্র তাই জানান দেয়। অবশ্য রোগী এখন হসপিটালাইজড। অবস্থা বলা এখনিই সম্ভব নয়।মধ্যম পর্যায়।মাথায় আঘাতটা আতংকের সৃষ্টি করেছে বেশি।

ওয়াজিহা একদৃষ্টিতে খবরের হেডলাইন গুলো পড়ে এবং খবর শোনে।চোখ তার ছলছল করছে।এমনটা তার প্রায়ই হয়,বলা যায় সাধারণ বিষয়। কেননা সে যে কারো কঠিন অবস্থা সহ্য করতে পারে না।তবে প্রতিবার তার চোখের জল না গড়ালেও এবার গড়ায়।

ওয়াজিহা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কাউকে ফোন দেয়। চোখের জলটা আগেই আড়াল করে নিয়েছে।ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করে না। ওয়াজিহা উঠে দাঁড়ায়।

”কি হয়েছে?কোনো সমস্যা?”

ড্রয়িং টেবিলে ট্রে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করে ইউশা। ওয়াজিহা ক্লান্ত দৃষ্টিতে একবার ইউশার দিকে তাকায়। ইউশা যেন ক্লান্ত দৃষ্টির মানে বোঝে।ইউশা এগিয়ে আসতে নিয়েও থেমে যায় কেননা এখনো যে সত্য গোপন।আগে সত্য সামনে আসুক তারপর নাহয় চারপাশের বসন্ত উৎযাপন করা যাবে!

”মিষ্টার ইউশা ইজহান আজ নাহয় আমি আসি।অন্য কোনদিন আবারো দেখা হবে হয়তো!”

”হয়তো কেন? ইনশাআল্লাহ দেখা হবে!তবে আরেকটু থেকে যান।আমি রান্না করেছি স্পেশালি আপনার জন্য।একটু টেস্ট করেন!”

”আচ্ছা আপনার মন রক্ষার্থে ওয়ান বাইট স্যান্ডউইচ খেলাম।ওকে?”

”জুসটাও ট্রাই করেন।”

”আর না।চলি।ভালো থাকবেন!”

ওয়াজিহা বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়।ইউশা ওয়াজিহার চলে যাওয়া দেখে।ইউশার বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়।এব্যথা যেন প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার ভয় সৃষ্টিকারী ব্যথা।ইউশা ওয়াজিহার রেখে যাওয়া স্যান্ডউইচে বাইট করে।চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে ভালোবাসা।

”ভালোবাসায় যদি অপেক্ষা নামক অপেক্ষা না থাকতো তবে প্রিয়তমা তোমার অনুপস্থিতির যন্ত্রণাদায়ক ভালোবাসা হয়তো আদৌ পারতাম না বুঝতে! অপেক্ষা যেন ভালোবাসার অপর নাম!”

ইউশা আপনমনেই কথাটা বিড়বিড় করে ট্রে হাতে কিচেনে প্রবেশ করে।কফির কাপে চুমুক দিয়ে হাতে মোবাইল নেয়।চার থেকে পাঁচটা মিস কলড।ইউশা ভ্রু কুঁচকে কল দেয় উক্ত নাম্বারে।ওপর পার্শের খবর শুনে আঁতকে ওঠে।দ্রুত বাসা থেকে বের হতে নিলেই দেখে আরেক আতংকসৃষ্টিকারী ঘটনা!

পাখির কলকাকলির আওয়াজে ঘুম ভাঙে ওয়াজিহার।চোখ প্রচন্ড জ্বালা করছে তার।শরীরেও বেশ ব্যথা।হাতটা দু’টোকে নিজের দিকে আনতে গিয়েই আটকে যায় তার হাতেরা। ওয়াজিহা হঠাৎ উপলব্ধি করে প্রকৃত পক্ষে সে এখন কোথায়!

শেকলে আবদ্ধ ওয়াজিহা।পানির ছিটা পড়ছে ওপর থেকে।বিশাল কাঁচের বাক্সের মাঝে পানি পড়ে অনেকখানিই ভরে উঠেছে। ওয়াজিহা নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে।

”মামনি চেষ্টা করে কোনো ফয়দা হবে না।সো বেহুদা চেষ্টা না করে মরার জন্য অপেক্ষা করো!”

ওয়াজিহা এদিক ওদিক তাকায়।তবে পানি চোখের ওপর পড়ার কারণে সব ঘোলাটে। ওয়াজিহা চেঁচিয়ে ওঠে।বলে,

”হু দ্যা হেল আর ইউ?”

আর কোনো জবাব আসে না।আসে শুধু হাসির আওয়াজ।তবে ওই আওয়াজে যে প্রতিশোধের বাতাস আছে তা বুঝে যায় ওয়াজিহা। ওয়াজিহা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য এদিক ওদিক করতে থাকে।তবে লোহার শক্ত এ শেকল থেকে যে এভাবে মুক্তি সম্ভব না।

ওয়াজিহার কোমড় অব্দি পানি ভরেছে।গলা অব্দি আসতে হয়তো সময় নেবে না। ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে। ওয়াজিহার এই কাঠিন্য সময়েও একটি প্রবাদ মনে পড়ছে।

”ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপের সমারোহে বৃহৎ পাপের সৃজনশীলতা!”

ওয়াজিহা ঝাপটা পানি এড়িয়ে কোনো মতে কাঁচের বাইরে তাকায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা কোনো এক স্থান।চারপাশে শুধু গাছ আর গাছ। ওয়াজিহার মাথা ভার হয়ে আসছে বারবার।ওর যে ঠান্ডার ধাঁচ আছে।বেশি সময় ভিজলে হুটহাট জ্বর আসে। ওয়াজিহার চোখ নিভু নিভু!

”পুতুল, পুতুল ইউ কান্ট কেস মি..!”

”পিয়ু থেমে যাও!”

ইউশা ইজহানের নামক ব্যক্তির বাসা থেকে আসার পর দ্বিতীয়বারের মতো দৃশ্যপট এটা। ওয়াজিহার মনে পড়ে ওই ভিলা থেকে বের হওয়ার সময়ই কেউ বা কারা যেন তাকে আটক করে। ওয়াজিহার মাথা চরম পর্যায়ে ঘুরছে,ভার হয়ে আসছে। কেমন গরম,গরম লাগছে! অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভবের ফলেই এই গরম ভাব যে ঠান্ডা চরমভাবে লাগাবে তার আর বলতে বাকি নেই!

”ওয়াজিহা, ওয়াজিহা হয়ার আর ইউ?”

নিভু নিভু দৃষ্টিতে ওয়াজিহা বাইরে দেখে।না, পানির কারণে কিছুই সুস্পষ্ট নয়‌। শুধুমাত্র ওই ভেসে আসা আওয়াজ। ওয়াজিহার সাড়া দেওয়ার মতোই শক্তি নেয় এখন।হয়তো এই পানির সাথে কোনো মেডিসিনও পড়ছে।তাইতো তার মাঝে এতো দূর্বলতা প্রবেশ করেছে।

ওয়াজিহা তবুও শেষ চেষ্টা করে। চিৎকার করে ”আমাকে বাঁচান!”

সন্ধ্যা লগ্ন। হসপিটালে সুয়ে আছে ওয়াজিহা।পাশেই বসে আছে ইউশা।তার চোখে ভয় স্পষ্ট।হারিয়ে ফেলার ভয়।ডাক্তার তাসকিন তালুকদার রাফিন প্রবেশ করেন। তাসকিন ইউশাকে পেছন থেকে দেখতে পেলেও ওয়াজিহার চেহারা দেখতে পায় না।তাসকিন প্রফুল্ল চিত্তে ইউশাকে ডাকে। কেননা আজ তার প্রফুল্লতারই যে দিন।কালকের দিনটা খারাপ হলেও আজকের দিনটা তার জন্য বেশ ভালো।স্নিদ্ধা আবারো মা হতে যাচ্ছে।কাল বিকালেই খবর পেয়েছে তাসকিন। তাসকিন গলায় ঝুলানো স্টেথেসকোপ হাতে নিয়ে এগিয়ে যায়।

”এক্সকিউজ মি. আপনি সরলেই আমরা রোগীকে দেখতে পারবো!”

নার্সের কথায় ইউশা সরে আসতেই তাসকিন বড় বড় চোখ করে তাকায়। তাসকিন নিউরোলজিস্ট হলেও আজ চিকিৎসক স্বল্পতায় তার এখানে আসা। তাসকিনের চোখে পানি টলটল করছে।হয়তো এখনই ঝড়বে। তাসকিন নিজেকে কন্ট্রোল করে নিজের যথাসাধ্য চেষ্টা চালাতে লাগে ওয়াজিহার জ্ঞান ফেরাতে। মিনিট পাঁচেক প্রচেষ্টায় জ্ঞান ফেরে ওয়াজিহার।তবে শ্বাসকষ্টে ভুগছে সে।তাইতো অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে তার হাইপারনেস কপাতে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে।

তাসকিন ওয়াজিহার কেবিন থেকে বেরিয়েই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলটুকু মুছে নেয়।সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।

”আমি তো লাবণ্যময়ীকে ভালোবাসি না।আমার তো শুধু তার আলাপচারিতার সঙ্গই ভালো লাগে। তাহলে তার কষ্টে আমি কেন আজ ব্যথিত!”

তাসকিন উত্তর পায় না।তখনই ফোন বেজে ওঠে ওর।পকেট থেকে ফোন বের করে হেসে দেখে ”মাই ওয়াইফি ” দিয়ে সেভ করা নাম্বার।আজকেই এই নামে সেভ করেছে সে এই নাম্বারটা।আগে ছিল তো স্নিদ্ধা নামে নাম্বারটা।তবে আজ কালকের আনন্দ তাকে প্রশান্তি দিয়েছে।তোয়ার মৃত্যুর পর যে তাসকিন সম্পূর্ণই একরোখা এবং খারাপ আচরণ করতো স্নিদ্ধার সাথে।যেন তোয়ার মৃত্যুর পেছনে স্নিদ্ধাই দায়ী!হাহ..

”সন্ধ্যায় কিছু খেয়েছো?”

”না।তুমি খেয়েছো তোয়ার আম্মু!”

”তুমি না বলতে আমি তোয়ার আম্মু হওয়ার যোগ্য ছিলাম না।আজ হঠাৎ কি হলো যে বলছো আমি তোয়ার আম্মু!”

স্নিদ্ধার কন্ঠে তাচ্ছিল্য। তাসকিন চুপ থাকে।কিই বা উত্তর আছে তার কাছে। পরিবারের আদরের ছোট সদস্য ছিল তোয়া।তোয়ার জন্মের পর স্নিদ্ধা আবারো পড়াশোনা শুরু করেছিলো।তোয়ার দেখভাল ওর দাদু -দিদুনই করতো। তোয়ার যেদিন বছর দুই পূরণ হলো সেদিন সবাই নদী ভ্রমণে ঘুরতে গেলো। বিশাল ঝড়ের কবলে মেয়েটা স্নিদ্ধার হাত ছাড়িয়ে ছুটে ছিলো তাসকিনের কাছে।তবে তাসকিন ধরার পূর্বেই মেয়েটা প্রবল স্রোতে ভেসে গেলো! পরিবারের মানুষগুলো স্নিদ্ধাকে মানসিক সাপোর্ট দিলেও স্নিদ্ধা ভালোবাসার মানুষের থেকে অমানবিক যন্ত্রণা পেয়েছে!

চলবে?

(আসসালামুয়ালাইকুম পাঠকগণ মাথা পুরো ব্লাক এন্ড হোয়াইট হয়ে গিয়েছিলো।চার-পাঁচবার লেখার পরও কল্পিত কাহিনী উঠে না আসায় আর পোষ্ট করা হয়ে উঠেনি। আজকের পর্বটা কিছুটা থ্রিল রেখেছি। ইনশাআল্লাহ‌ পরবর্তী পর্বে আর দেরিও হবে না এবং যথাসময়ে দেওয়া হবে! ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।)

পূর্ববর্তী পর্বঃ
https://www.facebook.com/groups/371586494563129/permalink/929125688809204/?mibextid=2JQ9oc

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here