নেশাক্ত_তোর_শহর পর্ব:: ১৩,১৪

নেশাক্ত_তোর_শহর
পর্ব:: ১৩,১৪
ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১৩

নিজের মন মত সাজতে ব্যস্ত তৃষ্ণা। হালকা লিপস্টিক আর কাজল দিয়ে আয়না সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে ব্যস্ত সে। মাঝে মাঝে লজ্জায় কুঁকড়ে উঠছে আবার মিটমিটে হাসছে। মাটি স্পর্শ করা লম্বা আঁচল তুলে মাথায় দিল। চোখ বন্ধ করে হাসছে যেন আয়নাটা আয়াত। হঠাৎ-ই তার কোমড় জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দিল কেউ। ধক করে খুলে পাশে তাকালো তৃষ্ণা। আয়াত তাকে পেছন থেকে জরিয়ে ধরে আছে। খোঁপা করা লম্বা চুলের গোছা খুলে দিলো। চুলের খোঁপা খুলে সাড়া পিঠে ছড়িয়ে পড়লো চুলোগুলো। কাঁধের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল আয়াত। গভীর গভীর ভাবে মুখ গুঁজে তৃষ্ণার গলায়। কম্পিত হলো তৃষ্ণা। গভীর সেই অনুভূতি। আয়াতের জড়িয়ে থাকা হাতাটার উপর নিজের হাত রাখল। অক্ষিযুগল বন্ধ তখন আয়াতে প্রতিচ্ছবি আয়নার মাঝে। এখন পর্যন্ত একবারও আয়াতের মুখশ্রী দর্শক করে নি সে। আয়নাতে তার প্রতিচ্ছবি দেখছে। হুট করে আয়াতের দিকে ফিরিয়ে নিল তৃষ্ণাকে। আচম্বিতে এমন ধাক্কার জন্য প্রস্তত ছাল না তৃষ্ণা। বিধায় হাত গিয়ে ঠেকলো আয়াতের বাহুতে। আয়াত হাত তখনও শাড়ি বেধ করে তৃষ্ণার পেট স্পর্শ করেছে। হাত সরিয়ে কপালের উপর চুলগুলো স্বযত্নে সরিয়ে দিয়ে বলল..

— পিয়াসু পাখি। তুমি জানো তোমাকে এই রুপে কতোটা সুন্দর লাগছে। তোমার এই মুগ্ধ কর রুপে আমার ভেতরটা জ্বলে পুড়ে নিঃশ্ব হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করতে তোমরা এই অপূর্ব সুন্দর সাজটা নষ্ট করতে। কি বলো তুমি করবো।

লজ্জার্থ তৃষ্ণার মুখটা আমাদের বুকে গুজে নিল। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে আয়াতের দিকে তাকালো। আয়াত দৃষ্টি তার মুখের মাঝে স্থীর হয়ে আছে। আয়াতের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে গেল সে। পায়ের পাতার উপর ভর করে সামান্য উচ্চতা বৃদ্ধি করলো। চোখ বন্ধ করে অধর স্পর্শ করার আগেই ফোন বেজে উঠল। বিরক্তিতে শরীরের পেশি শিথিল হয়ে গেছে। ইচ্ছে করছে ফোনটা ভেঙ্গে ফেলতে। বাজতে বাজতে কেটে গেল ফোন। পূর্ণরায় ফোন বাজতেই কপালে বিরক্তিকর ভাব ফুটে উঠলো তৃষ্ণার। রিসিভ না করলে বাজতেই থাকবে।
সময় অবিলম্ব না করে দ্রুত ফোনের দিকে এগিয়ে গেল। স্কিনে ভাই লেখা দেখেই কপাল কুঁচকে গেল। ভড় সন্ধ্যায় তাহসান কেন ফোন করেছে। কৌতূহল দমাতে না পেরে তট জলদি ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরলো। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে তিশার কন্ঠস্বর ভেসে এলো.

— বোনু আমি হসপিটালে এডমিট আছি। একবার আসবি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোকে।

আর কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেলো। তৃষ্ণা কানে কাছে কিছুক্ষন হ্যালো হ্যালো করে রেখে দিল। হঠাৎ বোনের কি এমন হলো যে, হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো। একরাশ অভিমান জমে গেল তার, তার বোনের জন্য আজ তার জীবনটা ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
রিজভীর সাথে তার বিয়ে হয়নি। স্বপ্নটা ভেঙে গেছে, এটাই হয়তো তার বিধান ছিল। আল্লাহ জোড়ায় জোড়ায় মানুষ সৃষ্টি করছে। আর তার জোড়া আয়াত। রিজভীর অবহেলা থেকেই আয়াতকে পেরেছে। তবুও সে বেঁচেছে। কারণ কেউ কারো জন্য মরে যায় না। কিন্তু আয়াত যদি তৃষ্ণাকে অস্বীকার করে, তাহলে হয়তো এবার আয়াতের শোক কাটিয়ে উঠতে পারবে না। রিজভী ছিল তৃষ্ণার জীবন আর আয়াত অক্সিজেন। যাকে ছাড়া তৃষ্ণার অস্তিত্ব নেই। বিগত মাসেই সে বুঝতে পেরেছে।

আশেপাশে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো তৃষ্ণা। আয়াত রুমের কোথাও নেই। বেলকেনি, ওয়াশরুমে দেখে বেডের উপর বসে পড়লো। আবার সে স্বপ্ন দেখেছে। কল্পনা করেছে আয়াতকে। তব্ধ নিঃশ্বাস ছেড়ে পার্স ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলো।

_______________________
হসপিটালের করিডোরে পায়চারী করছে তাহসান। তার পাশেই বসে আছে শান্তি, রিজভী ও-তার পরিবার। করিডোরে সবাইকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল তৃষ্ণা। ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল..

— ভাইয়া আপু কোথায়? কি হয়েছে ওর?

দৃষ্টি সরিয়ে সবাই তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কারো মুখে কথা নেই । কেবিনের ভেতরে ইশারা করে বললেন..

— তিশা কেবিনের ভেতরে আছে। বিকেলের দিকে পেইন ওঠায় হসপিটালে আনার হয়েছে। রক্তস্বল্পতায় ভূগছে। ডাক্তার সিজারিয়ানের আয়োজন করছে। একটু পর ভেতরে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হবে। টেনশনে আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে।

তাহসানের কথা শেষ হওয়ার আগেই রিজভী এসে তৃষ্ণার সামনে দাঁড়ালো। দুহাত জোর করে হাঁটু ভাঁজ করে তৃষ্ণার সামনে বসে পড়লো। অপরাধী কন্ঠে বলল.

— আমি জানি তৃষ্ণা। আমি অন্যায় করেছি, অনেক বড় অন্যায় করেছি। শুধু তোমার সাথেই নয় তিশার সাথেও। তোমাকে হারানোর শাস্তি আমি তিশাকে দিয়েছে, তার জন্য আমি অনুতপ্ত।
আমি চাইনা, আমার ভুলের জন্য তিশাকে হারাতে। আমি জানি, আমি শাস্তি তুমি দাও। আল্লাহ দিয়ে। তার ফলস্বরূপ আমি তিশাকে হারিয়ে ফেলতে বসেছি। তিশা ছোট থেকে তোমাকে মায়ের মতো ভালোবেসে বড় করেছে! কখনো তোমার উপর আঘাত আসতে দেয়নি। আঙ্কেল আন্টির মৃত্যুর পর তোমার সব দায়িত্ব নিয়েছে। সন্তান ভুল করলে মা যেমন ক্ষমা করে দেয়। মা তেমন ভুল করলে সন্তানেরও তো ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। আমি দেখছে তিশাকে সারারাত জেগে কাঁদতে। ঘুমের মাঝে তৃষ্ণা তৃষ্ণা বলে কেঁদে উঠতেই।
তুমি প্লীজ তিশাকে ক্ষমা করে দাও। প্লীজ তৃষ্ণা।

বলতে বলতে তৃষ্ণার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো রিজভী। অনুসূচনায় স্তব্ধ হয়ে গেল তৃষ্ণা। রিজভী একটিও বাজে কথা বলেনি। তিশা তৃষ্ণার সব ভুল কমা করে দিয়েছে। আর সেই সামান্য একটা আঘাত নিয়ে তিশাকে ক্ষমা করতে পারেনি।

ছলছল করে উঠলো তৃষ্ণার নেত্রজোড়া। কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। তিশাকে তখন ড্রেস পড়িয়ে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে তিশার দিকে এগিয়ে গেল। অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই মুখে মিথ্যা হাসির রেখা ফুটিয়ে এগিয়ে গেল। হালকা ঝুঁকে মাথায় চুমু খেল। চোখের কোণে কালা জমে গেছে, চেহারা কেমন হয়েছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। পেটের উপর হাত বুলিয়ে উচ্ছাসের স্বরে বলল..
— শুনলাম মাম্মাকে না-কি খুব জ্বালাচ্ছিস। মাম্মা বুঝি ব্যাথা পায়না।(তিশার পেটের উপর মাথা রেখে) কি বললি তোর ভেতরে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আর একটু সময় সোনা। তারপর তুই আমাদের কাছে চলে আসবি। আমরা একসাথে ইলিশ মাছ চুরি করবো। হা হা হা।

কারো কন্ঠস্বর শুনে বেষ্টিত নয়নজোড়া খুলে তাকালো তিশা। পেছনে থেকে কালো শারী পরিধিতা একটা মেয়েটাকে পেটের উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে চাঁপা হাসলো সে। তিশা খুব ভালো করেই জানে, এটা তার ছোট বোন তৃষ্ণা। তৃষ্ণার মাথায় হাত রেখে উঠে বসতে চাইলে ধমক দিয়ে শুইয়ে দিলো সে। বাচ্চামো করে বলল..

— আমার চিন্তায় চোখের নিচে কালি জমিয়ে ফেলেছিস দেখছি। এই কাজল বিক্রি করে পুচকু-কে মানুষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিস না-কি?
আমি পুচকু-কে চুরি করা শেখাবো। তারপর বিক্রি করে পুচকু মানুষ হবে। বুঝলি।

নাক টেনে দিল তৃষ্ণা। তৃষ্ণার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মনের তৃষ্ণা দূর করছে তিশা। কতোদিন পরে বোনটাকে হাসতে দেখছে। হাতটা নিজের হাতে বন্দী করে আলতো হেসে বলল..

— আমি তোর এতোবড় ক্ষতি করলাম; তুই রেগে নেই আমার উপর।

— এতো গুলো ধন্যবাদ তোকে আপি; আয়াতকে আমার জীবনের এনে দেওয়ার জন্য। ভাবছিল, তোকে কেন ধন্যবাদ দিচ্ছি। আয়াত আমার জীবনে আসার জন্য একমাত্র কারণ তুই। রিজভী আমার জীবন থেকে গেছে বলেই আয়াত এসেছে। প্রথমে হয়তো রিজভীর শূন্যতা অনুভব করেছি কিন্তু পরে আয়াত অনুভব করতে দেয় নি। আয়াতের পাগলামিতে অতিষ্ঠ করে রেখেছে। এখন আমি আয়াতের নেশায় নেশাক্ত। রিজভীর নয়।

অজানা হাসি ফুটে উঠল তৃষ্ণার মুখে। তার বোনটাকে আয়াত নামক ছেলেটা ভালো রেখেছে, এতেই সন্তুষ্ট সে। এখনো আয়াতের সাথে দেখা হলে, অসংখ্য ধন্যবাদ জানাবে তাকে। অন্তত তার বোনটাকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য।

(চলবে)

#নেশাক্ত_তোর_শহর
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১৪

রুমের এক কোণ থেকে অন্য কোণে পায়চারী করে চলেছে তৃষ্ণা। একটু আগে একপ্রকার জোর করেই তাহসান বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। বোনের অবস্থা ভেবে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কপালের কোণে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে তার।
কালো শাড়িটা ফ্লোরের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাঁটার সময় পায়ের সাথে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। গভীর চিন্তা করে ঠাস করে বেডের উপর বসে পড়লো সে। পায়ের বৃদ্ধ আঙ্গুলের সাহায্য আঁকিবুঁকি করছে। পাশে চোখ যেতেই আয়াতের হাসৌজ্জ্বল মুখটা ভেসে উঠলো সামনে। আয়াত গভীর ভাবে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। সামান্য একটু আয়াতের দিকে সেটে গেল তৃষ্ণা। আয়াতের বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখলো। শান্তিপূর্ণ শ্বাস নিয়ে উচ্ছাসের সুরে বলল..

— “আয়াত আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খুশি। তুমি জানো, আমার সাথে আপির সব অভিমান দূর হয়ে গেছে। আপির কোলে ছোট একটা পুচকু আসবে।আচ্ছা আমাদের পুচকু কবে আসবে”।

মাথা তুলে আয়াতের দিকে তাকিয়ে হাসলো তৃষ্ণা। যে হাসিতে লুকিয়ে আছে হাজারো চাওয়া। আয়াত তৃষ্ণার কোমড় জরিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল..

— “যেদিন তুমি নিজ থেকে চাইবে, আমাদের সম্পর্ক আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রী সম্পর্কের মতো হোক সেদিন”।

— ‘আমি তো চাই আমাদের সম্পর্ক টা স্বাভাবিক হোক”।
আয়াতের বাহু ছেড়ে সরে গেল তৃষ্ণা। দুজনের মাঝে বেশ দূরত্ব নিয়ে। আয়াত হাসলো। তার পিয়াসু পাখিটা নিজ থেকে তাকে চাইছে। তৃষ্ণার দিকে একটু এগিয়ে গেল সে। তৃষ্ণার কোমড় জরিয়ে কাছ এনে শান্ত কন্ঠে বলল..

— “ভালোবাসি! খুব বেশি ভালোবাসি তোমায় তৃষ্ণা। আমিও চাই আমার জীবনটা রঙে রঙিন করে তুলতে”।

আয়াতের কথায় লজ্জায় লাল হয়ে গল তৃষ্ণার মুখ। নিজের লজ্জার্থ মুখটা ধীরে ধীরে আয়াতের বুকে গুজে নিল। তৃষ্ণার কাছে আয়াতই তার একমাত্র স্থান, সেখানে সে নির্দ্ধিয় সবকিছু করতে পারে।

বেশ কিছুক্ষণ পর হুশ ফিরল তৃষ্ণার। এখনো সে আয়াতের নগ্ন বুকে মাথা রেখে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আধোও এটা আয়াত কি? আয়াত আসবে কিভাবে? নিশ্চয়ই আয়াতের ভুত!

মস্তিষ্ক সচল হতেই আয়াতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। তার ফলস্বরূপ তৃষ্ণা নিজেই নিচে পড়ে গেল।কোমড়ে হাত রেখে সামনে তাকালো।আয়াত ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে‌। পড়নে একটা টাওয়াল ছাড়া কিছু নেই। হয়তো তৃষ্ণার এমন বিহেবে মানে বোঝার চেষ্টা করছে।

ভুতুড়ে ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল..
— “আপনি! কে আপনি? আমি সিউর আপনি আয়াতের ভুত! আপনি এখানে কেন এসেছেন”?

ভয়ে ভয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে তৃষ্ণা। শাড়ির সাথে আটকে থেমে গেল সে।
তৃষ্ণার এমন বিহেবে প্রচুর বিরক্ত হচ্ছে আয়াত। দাঁতে দাঁত চেপে বলল..

— “বিদেশে পানির অভাব পড়েছে। তাই শাওয়ার নিতে এসেছি। নিয়েই আবার চলে যাবো”।

আয়াতের উত্তর গ্ৰহনযোগ্য হলো না তৃষ্ণার আছে। উঠে দাঁড়িয়ে ঘনঘন পলক ফেলে বলল..

— “আপনি মজা করছেন আমার সাথে তাই না? আপনি আমাকে জ্বালাতে এখানে এসেছে। ছিঃ কি নিম্ন আপনার ভাবনা। আমাকে জ্বালাতে এতোদিন জামা কাপড় পড়ে এসেছেন আর আজ একটা টাওয়াল। যদি এতোই দেখাতে চান, তাহলে ওটুকু রেখেছেন কেন”?

আয়াতের কপালে সরু রুদ্র ভাজ ফুটে উঠলো। উঠে ধীর পায়ে তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে গেল কয়েকপা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল..

— ”এতোই যখন দেখতে ইচ্ছে করে? নেকামো না করে আগেই বলতে পারতে। স্টুপিট”।

বলেই টাওয়ালে হাত রাখল। মুহুর্তের তৃষ্ণার চোখ বড় বড় হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। “ভাইয়া গো” বলে এক চিৎকার দিয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। তৃষ্ণার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তব্ধ নিঃশ্বাস ছাড়ল আয়াত। তৃষ্ণার পার্স ব্যাগ খুঁজে চাবী বের করলো। কাবার্ড খুলে ট্রাউজার আর টি শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

___________________
স্তব্ধ হয়ে বসে আছে তৃষ্ণা। আধ ঘন্টা ধরে তৃষাকে জিজ্ঞাসা করছে, কি হয়েছে। সে মুখে স্যলোটেপ লাগিয়ে বসেছে। তৃষ্ণার চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে মনিকা, আরোহী, লেবু। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে ফোপাতে লাগল সে।
বিরক্তি নিয়ে অষ্টাদশ বার জিজ্ঞাসা করলো মনিকা।

— মা আমাদের রুমে ভুত!

একে অপরের দিকে তাকিয়ে পূর্ণরায় তৃষ্ণার দিকে তাকালো সবাই। আদোও ভুত বলে কিছু হয়না। কিন্তু তৃষ্ণাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে মিথ্যা কথা বলছে। মনিকার ভাবনার মাঝেই মুখ খুললো লেবু..

— “ভাবীজান আমি একশত পার্সেন্ট সিউর মরা মানষের আত্মা তোমার পিছ লাগছে। আম্মা আপনি তারাতাড়ি ভাবীরে ফকিরের কাছে লইয়া জান। নাইলে পরে ভাবীরে আত্মায় লইয়া যাইবো গা। আল্লাগো বাঁচাও”।

সাথে সাথে লেবুর পিঠে চপল মারলো আরোহী। হালকা ধমকে দিয়ে বলল..

— “তুই চুপ করবি লেবু। তোর ফকির তুই মাথায় নিয়ে রাখ”।

— “তুমি ফকির বাবার নামে ফেলা ফেলা কইরো না। একবার তিনি অভিশাপ দিলে অনেক বড় ক্ষতি হইয়া যাইবো”।

চোখ গরম করে তাকাতেই ভয়ে চুপসে গেল লেবু। তৃষ্ণার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল..

— “ভাবী আমি বুঝতে পারছি, একা একা ভাইয়ার রুমে থাকাতে তোমার ভয় করছে। ঠিক আছে আজ থেকে আমিও তোমার সাথে থাকবো কেমন”?

— “তুমি কি মনে করেছ? তুমি থাকলে তোমার ভাই আসতে পারবে না”।

চিন্তিত হয়ে পড়লো আরোহী। তার জানা মতে তার ভাই ইউ-কে। দেশে ফিরল কখন। না-কি তৃষ্ণার হ্যালো স্লুয়েশন। আরোহীর ভাবনার মাঝে আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠল তৃষ্ণা.

— “আমি হসপিটাল থেকে ফিরে যখন রুমে ছিলাম; তখন তোমার ভাইকে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ কোথা থেকে বেডের উপর টাওয়াল পড়ে উদয় হলো। তারপর টাওয়াল খুলে..

আর কিছু বলার আগেই মুখ চেপে থেমে গেল তৃষ্ণা। ভ্রোমের মাঝে কি বলতে কি বলে ফেলেছিল সে। তখনই আশ পাশ থেকে পুরুষালী কন্ঠস্বর ভেসে এলো.

— “তারপর কি? টাওয়াল খুলে ধিতাং ধিতাং নাচছিলাম”!

সিঁড়ির রেলিং এ হাত রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আয়াত। সকলকে চমকে দিতে এসে নিজেই চমকে গেছে আয়াত। ফাঁকা বাড়িতে কেউই ছিল না। দারোয়ানের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল সবাই হসপিটালে গেছে। ভেবেছিলো, শাওয়াল শেষ করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বের হবে। কিন্তু সেখানেও বাঁধল বিপত্তি। তৃষ্ণা যাওয়ার আগে কাবার্ড লক করে চাবী সাথে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ট্রলির ভেতরের জামা কাপড় গুলো অপরিষ্কার। তাই টাওয়ার পড়ে বসে ছিল। কোনো প্রশ্ন করার আগেই চুলগুলো মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো আয়াত। হাতের ভেজা টাওয়াল-টা তৃষ্ণার কাঁধে ঝুলিয়ে উপরে উঠে যেতে যেতে বলল..

— “কখন এসেছি সেই ব্যাখা করতে পারবো না। পেটে প্রচন্ড ক্ষধা লেগেছে। আগে খাবো, তারপর বাকি সব।
আরোহী খাবার-টা উপরে দিয়ে যাস তো”!

যেমন অদ্ভুত ভাবে আবির্ভাব ঘটেছিলো আয়াতের। তেমনি মিলিয়ে গেল সে। সবাই এক ধ্যানে উপরে তাকিয়ে আছে। আয়াতের উপস্থিতি পরিক্ষা করতে হাতের উপর চিপটি কাটল তৃষ্ণা। তার ধারণাই সত্যি আয়াত এসেছে।

_____________________
দরজা দিয়ে সামান্য উঁকি দিল তৃষ্ণা। চারপাশে আয়াতকে নজরে এলো না তার। পা টিপে টিপে শব্দহীন রুমে প্রবেশ করে ফ্লোর থেকে অগোছালো শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

আয়াত মনে সুখে তৃপ্তি করে খাবার খাচ্ছে। তার পুরো ধ্যান ধারণা খাবারের মাঝে নিহিত। দূর থেকে সোফায় বসে আয়াতের খাওয়া মন দিয়ে দেখছে। আয়াতের সবকিছু মুখস্থ তার। অলরেডি পাঁচ লোকমা খাবার মুখে তুলেছে, এখনো আর সাত থেকে আট লোকমা খাবার মুখে তুলবে।

গভীর চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এগিয়ে গেল আয়াতের দিকে। আয়াত খাবার খাওয়ার মাঝে একবার তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে পূর্ণরায় খাওয়াতে মনোযোগ দিল। হাত কচলাতে কচলাতে দ্বিদা নিয়ে বলল..– “আমিও রাতের খাবার খাইনি”!

তৃষ্ণার দিকে না তাকিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল..

— “যাও নিচে গিয়ে খেয়ে এসো”।

কিছুক্ষণ মৌন্যতার পর আবার বলল..

— “অনেক দিন পরে আপনি এসেছেন? আপনার সাথে খেতে ইচ্ছে করছে”?

— “ঠিক আছে যাও খাবার নিয়ে এসো। একসাথে খাই”।

মুহুর্তের মাঝে চরম মন খারাপ হয়ে গেল তৃষ্ণা। আগে তো তৃষ্ণার বলার আগেই আয়াত ম্যাজিক করে সব বুঝে নিত! কই এখন তো নেয় না। তাহলে আয়াতের কেয়ারিং গুলো দিনের পর দিন কি হারিয়ে ফেলবে তৃষ্ণা।

— “বলছিলাম কি? আমি আপনার প্লেট থেকে খাবো”।

আয়াত ঢেকে রাখা প্লেটটা তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে দিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল..

— “ঠিক আছে; প্লেট নাও। আমি খাবার দিচ্ছি”।

মুহুর্তেই মেজাজ বিগড়ে গেল তৃষ্ণার। আয়াতের শার্ট টেনে নিজের কাছে এনে গলা তুলে বলল..

— “বুঝতে পারছিস না; আমি কি বলতে চাইছি? তোর সাথে, তোর প্লেট থেকে, তোর হাতের খাবার খাবো”।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here