নীল_চোখ,পর্বঃ এক

গল্পঃ নীল_চোখ,পর্বঃ এক
লেখাঃMd_Tarajul_Islam(Shihab)

“আপনি কখনো মা হতে পারবেন না”
ডাক্তারের কাছে থেকে এই কথাটি শোনার পর থেকে তিশা প্রচন্ড রকম ভেঙ্গে পড়েছে।মাঝে মধ্যে তো খুব কান্না করছে।তিশার স্বামী আয়ান তাকে শান্তনা দিচ্ছে কিন্তু কিছুতে তিশা স্বাভাবিক হতে পারছে না।একটা মেয়ের মাঝে মা হবার কোনো ক্ষমতা নেই এর মতো কষ্টের কিছু হয়তো আর হয়না।
বাসায় এসে কথাটি শোনা মাত্র আয়ানের মা রত্না বেগম মুখ বাঁকা করে বলল
->আগেই বলেছিলাম এই মেয়ের দ্বারা আমরা কখনো দাদি ডাক শুনতে পারবো না আজ আমার কথায় ঠিক হলো।
আয়ান ওর মায়ের কথায় কিছু বললো না।তিশা বাড়ির এক কোণায় দাড়িয়ে থেকে চোখের পানি ফেলছে।আয়ান তিশার পাশে দাড়িয়ে বলল
->মায়ের কথায় কিছু মনে করো না তিশা।
তিশা মুচকি হেসে বলে উঠলো
->কি মনে করবো বলো?তাছাড়া উনি তো ভুল কোনো কথা বলেনি তাই না?
কথাটি বলে তিশা তাড়াতাড়ি রুমে চলে গেলো।তিন বছর আগে তিশার সাথে আয়ানের পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছিলো।তবে দুইজন একে অপরকে চিনতো অনেক আগে থেকেই।আয়ান তিশাকে প্রচন্ডরকম ভালোবাসে।তিশাও আয়ানকে খুব ভালোবাসে।তিশা রুমে চুপ করে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে আছে।আয়ান এসে ওর পাশে বসলো।তিশার গায়ে হাত রাখতেই সে ঘুরে আয়ানের দিকে তাকালো।তিশা কাঁদছে।আয়ান তিশার চোখ মুছে দিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল
->এই পাগলি এভাবে কাঁদছো কেন হুম?
তিশা কাঁদতে কাঁদতে বলল
->আমি কখনো হয়তো তোমায় বাবা ডাক শুনাতে পারবো না।আমি একটা অলক্ষী মেয়ে।
আয়ান তিশার মুখ চেপে ধরে বলল
->চুপ এমন কথা আর দ্বিতীয় বার বলবে না।দরকার নাই আমার বাবা ডাক শোনার,তুমি সারাজীবন আমার পাশে থেকো এটাই চাই আমি।
তিশা আর কিছু বলতে পারলো না।ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে।

বিকেল বেলা তিশা বাইরে আসতে শুনতে পেলো ওর শাশুড়ি রত্না বেগম প্রতিবেশী আছমা আন্টির সাথে গল্প করছেন,
“কি দেখে যে মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম,ওই রূপটায় যা সুন্দর এছাড়া আর কোনো কাজের না সে।”
“আমি বলি কি তোমরা বরং ছেলেটাকে আবার নতুন করে বিয়ে দিয়ে দাও।অমন সোনার টুকরো ছেলেকে যে সেই বিয়ে করতে রাজি হবে।”
“আমিও তাই ভেবে নিয়েছি,আয়ানকে আবার বিয়ে দিবো।এই মেয়ের কারনে আমরা কেন দাদি ডাক থেকে বঞ্চিত হবো?”
“সেটাই তো।তুমি বললে আমি একটা মেয়ের ব্যবস্থা করতে পারি।আমার চেনা জানা একটা মেয়ে আছে,যে এই মেয়ের থেকে অনেক সুন্দরী।”
“আয়ানের বাবা এলে আগে কথা বলি,তারপর তোমায় জানিয়ে দিবো,আর আয়ানকে আমি যা বলবো সে তাই করবে।”
“যা করার তাড়াতাড়ি করো,বলা তো যায়না আবার তাবিজ করতে পারে।”
তিশা এসব কথা শুনার পর ওর বুক কেমন যেন ভারি হয়ে এসেছে।মনে হচ্ছে কেউ ওর বুকের ওপর কয়েক টন পাথর চাপিয়ে দিয়েছে জোরপূর্বক।তিশা মনে মনে ভাবছে,উনারা তো ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে,আমার জন্য করে কেন তারা দাদি ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবে?

রাতে আয়ানের বাবা শাহ আলম বসে আছেন।তখন রত্না বেগম তিশার ব্যাপারটি জানালেন।সাথে এটাও জানালেন তিনি আবার আয়ানকে বিয়ে দিবেন।এটা শুনে শাহ আলম বললেন
->এই সামান্য কারনে তুমি আবার ছেলেকে বিয়ে করাবে?আর আবার বিয়ে দিলে তখন মেয়েটার মনের অবস্থা কি হবে বুঝতে পেরেছো?
তখন রত্না রেগে গিয়ে বলল
->ওর যা খুশি হয়ে যাক তাতে আমার কি?ওর কারনে আর যাই হোক আমি দাদি ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবো না।
->আচ্ছা তিশার মতো ব্যাপারটা যদি তোমার সাথে ঘটতো তাহলে তুমি কি করতে?
->যেটা হয়নি সেটা বলে লাভ কি?
এমন সময় তিশা রুমে এসে বলল
->মা আপনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
->তোমার আপত্তি থাকলেও আমি বিয়ে দিবোই।
তিশা মুচকি হাসলো ওর শাশুড়ির কথা শুনে।আয়ান রাতের বেলা কাজ থেকে বাসায় আসতেই রত্না বেগম আয়ানকে কথাটা বললো।আয়ান শুনে বলে উঠলো
->আমি কখনো বিয়ে করবো না।দরকার পড়লে বাচ্চা দত্তক নিবো কিন্তু তারপরেও দ্বিতীয় বিয়ে করবো না।
তখন রত্না বেগম ইমোশনাল ভাবে ব্লাক মেইল করতে লাগলেন,কাঁদতে লাগলেন।তখন তিশা আয়ানকে বুঝাতে লাগলো।তখন আয়ান বলল
->যত যাই হোক আমি বিয়ে করবো না।আমি তোমায় ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে গ্রহন করতে পারবো না তিশা।
->একটা বার আমার চিন্তা করো,তুমি আরেকটা বিয়ে করলে যদি তার বাচ্চা হয় তাহলে তার মুখ থেকে আমিও তো মা ডাক শুনতে পারি তাই না।তুমি প্লিজ রাজি হয়ে যাও।
আয়ানকে তিশা অনেক ভাবে বুঝানোর পর আয়ান বিয়েতে রাজি হলো তবে শর্ত দিলো,তিশাকে সে কখনো ছাড়বে না।আয়ানের মা-বাবা আগে তিশার সাথে যেরকম আচরন করছে সেরকমটায় করতে হবে।ওর সমস্যার কারনে ওকে কখনো খোঁটা দেওয়া যাবে না।যদি তারপরও এমন কিছু ওর মা-বাবা করে তাহলে সে ঠিক সেরকমটায় ওই মেয়ের সাথে করবে।আয়ানের মা-বাবা ওর শর্ত মেনে নিলো।
আজ আয়ানের বিয়ে আছমার ঠিক করা মেয়েটির সাথে।সকাল থেকে তিশাকে বেশ হাসি-খুশি দেখাচ্ছে কিন্তু এই হাসি-খুশির পিছনে কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে সেটা একমাত্র তিশাই জানে।আয়ান তিশাকে ডেকে বলল
->তিশা আজ তুমি এতটা খুশি কেন?তোমার কি কিছু মনে হচ্ছে না?
তিশা হাসি মুখে আয়ানের গাল টেনে বলল
->বারে আজ আমার একমাত্র বন্ধুর বিয়ে আর আমি খুশি হবো না তো কে খুশি হবে শুনি?
->বন্ধু?
->কেন ভুলে গেলি তুমি তো বলেছিলে,যদি আমাদের দুইজনের মধ্যে কখনো ঝগড়া বা কোনো কিছু হয়ে যায় তাহলে আমরা যেন সবসময় একে অপরের বন্ধু হয়ে পাশে থাকি।আর আজ আমি সেটাই করছি।
বিকেল বেলা আয়ান বিয়ে করে বাসায় আসলো।আয়ানের যার সাথে বিয়ে হলো মেয়েটির নাম অধরা।দেখতে অনেক সুন্দরী।বয়স একুশ-বাইশ হবে।তিশা বলল
->দুইজনকে বেশ মানিয়েছে।
কথাটা শুনে তিশার ওপর আয়ানের রাগ হলো খুব।তিশা নিজে গিয়ে অধরাকে রুমে রেখে আসলো।তিশা আগে থেকে ওর থাকার রুম ঠিক করে নিয়েছে।তিশা সে রুমে এসে বসে আছে।আজ ওর আয়ান অন্যে কারো এটা ভাবতেই ওর খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু তারপরেও কিছু তো করার নেই।আজ যদি সে মা হতে পারতো তাহলে এমন দিন দেখতে হতো না।তিশা ওর ডায়েরিতে কি যেন লিখছে।ডায়েরির পাতা চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে।এমন সময় ওর কাঁধে কেউ হাত রাখলো।তিশা তখন চমকে উঠে পিছনে তাকালো কিন্তু দেখলো ওর পিছনে কেউ নেই।তিশা একটু ভয় পেলো।পরে ভাবলো হয়তো মনের ভুল।তিশা আবার ডায়েরি লেখায় মনযোগ দিলো।একটু বাদে আবার কেউ ওর কাঁধে হাত রাখলো তখন তিশা পিছনে তাকিয়ে দেখলো আয়ান দাড়িয়ে আছে,তিশা চেয়ার ছেড়ে উঠে চোখ মুছে বলল
->তুমি এখানে কেন?
আয়ান কিছু না বলে তিশাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো
->তুমি ছাড়া আমি দ্বিতীয় কাউকে কি করে স্পর্শ করি বলি।আমি যে পারবো না এটা।
তিশাও মনে মনে বলছে,”আমিও তো এটা কখনো চাই না,কিন্তু এছাড়া তো আর উপায় নেই”।
এমন সময় রত্না একটু জোর গলায় বলল
->মেয়েটাকে ঘরে আর কতক্ষন বসিয়ে রাখবি এবার তো আয়।
তখন তিশা আয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।দেখলো আয়ানের চোখে হালকা পানি।তিশা এটা দেখে হেসে ফেললো তারপর বলল
->পাগল ছেলে তোমার বউ যদি চোখে পানি দেখে তাহলে কি ভাববে বলো তো?
->যা ভাবার ভাববে তাতে আমার কি?
->আচ্ছা চলো তো এখন তুমি।
তিশা নিজে আয়ানের হাত ধরে ওকে বাইরে নিয়ে আসলেন।তারপর ওর রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বললো
->অল দ্যা বেস্ট।
আয়ান ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো সেই মুহুর্তে আবারো তিশার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়লো।
আয়ান রুমে এসে দেখলো অধরা বেলকনির দরজার কাছে দাড়িয়ে থেকে কি যেন দেখছে।আয়ান গলা খ্যাকারি দিতেই অধরা ঘুরে ওর দিকে তাকালো।তখন মনে হলো অধরার চোখে যেন নীল রংয়ের আলো জ্বলছিলো।অধরা একবার চোখ বন্ধ করে আবার খুললো।তখন আয়ানের মনে হলো না ওর চোখ একদম স্বাভাবিক রয়েছে।অধরা আয়ানের মুখোমুখি দাড়িয়ে বলল
->আপনি এসেছেন?আমি তো আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
->আমার জন্য অপেক্ষা করছো কেন?
অধরা তখন রহস্যময় ভাবে হাসলো।আয়ান কিছু না বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।আয়ানের তিশার কথা খুব মনে পড়ছে।মেয়েটি না জানি এখন কতটা কষ্ট পাচ্ছে।অধরা এসে আয়ানের পাশে শুয়ে পড়লো।আয়ান পিছনে তাকিয়ে দেখলো অধরা ওর দিকে তাকিয়ে আছে,ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত রকমের হাসি।চোখ থেকে ঠিক রে বের হচ্ছে নীল আভা।আয়ান অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।আয়ান মনে মনে ভাবতে লাগলো,এটা কার সাথে আমার বিয়ে হলো আর তার চেহারা এমন ভয়ংকর কেন?আয়ান আবার অধরার দিকে তাকালো দেখলো সে চুপটি মেরে চোখ বন্ধ করে স্বাভাবিক ভাবে শুয়ে আছে।আয়ান মনের ভুল ভেবে ঘুমিয়ে পড়লো।
হঠাৎ আয়ান ওর বুকে চাপ অনুভব করলো আর ঘাড়ের প্রচন্ড রকম ব্যথা অনুভব করলো।আয়ান চোখ মেলে তাকাতে গিয়ে তাকাতে পারছিলো না শুধু অনুভব করছিলো সে কারো সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় আছে।
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর আয়ান দেখলো সে একা রুমে শুয়ে আছে।আয়ান উঠে বসলো।ওর গলার কাছে কেমন যেন জ্বালা করছে।আয়ান ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসতেই দেখলো অধরা ওর মায়ের সাথে কাজ করছে।আয়ান তিশাকে খুজতে লাগলো।তারপর আয়ান বাড়ির বাইরে এসে দেখলো তিশা ঝাড়ু হাতে ওদের বাড়ি উঠান ঝাড় দিচ্ছে।আয়ানের দিকে চোখ পড়তেই তিশা হেসে উঠে বলল
->এই যে মিস্টার রাত কেমন কাটলো।
তিশার এই কথা আয়ানের কাছে বিরক্ত লাগলো।আয়ান তিশার কাছে এসে বলল
->তুমি ছাড়া প্রতিটা রাত আমার কাছে দুর্বিষহময়।
তিশা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।আয়ানের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে আয়ানের গলার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো তারপর বলল
->একি আয়ান! তোমার গলার কাছে দুটো কিসের চিহ্ন?দেখে অনেকটা সাপের দাঁতের মতো মনে হচ্ছে কিন্তু এগুলো অনেকটা বড়।
আয়ান ওর গলায় হাত দিলো।

চলবে,,,,।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here