নিশুতি_তিথি,পর্ব ১৮,১৯

#নিশুতি_তিথি,পর্ব ১৮,১৯
লেখা : মান্নাত মিম
পর্ব ১৮
___________

৪১.
দুপুরের কড়া রোদের উত্তাপের সাথে মিশে আঞ্জুমানের লতানো দেহখানিও উত্তাপিত হওয়ার জোগাড়। মগ্ন ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে যেন দিনমণির এতশত কলাকৌশল। তাই নিজের অগ্নিশিখার রেখা ফেলে ঘুমন্ত পরির হাঁসফাঁস বাড়িয়ে দিয়ে ঘুম ভাঙালো। আড়মোড়া ভেঙে ওঠে কিছুক্ষণ বসে রইল আঞ্জুমান। মাথায় কিছু ঠাওর করতে পারছে না নিজের বিষয়ে। সে কে? কোথায়? তাৎক্ষণিকভাবে মস্তিস্ক অচল হয়ে রইল। মিনিট দুয়েক গড়ালে বিছানা থেকে নামার উদ্দেশ্যে সম্মুখে পা বাড়াল মাথা কেমন করে ঝিমঝিমিয়ে উঠল। চারিদিকে তাকিয়ে ঝাপসা চোখে আঁধারের খেলা দেখতে পেল। এরমাঝে কেবল উন্মুক্ত বারান্দা দিয়ে আলোর পসরা সাজানো চক্ষু বিদ্ধ হলো। এগিয়ে গেল আলোর দিকে হাতছানি দিতে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বাগানের ফাঁকফোকর দিয়ে আগত আলোর ঝলকানিতে স্পষ্ট হয়ে এলো নিম্নে দোলনায় বসে থাকা আলীকে। একটু পরে ওঠে দাঁড়ালো আলী। তার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। আলীকে দেখে মস্তিষ্কে সেদিনের কলঙ্কিত হয়ে তকমা পাওয়ার ঘটনাটা স্মৃতিতে হানা দিলো। বারান্দার রেলিঙে তাকালো একবার আবার তাকালো আলীর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে। দেখতে পেল আতংকিত হয়ে আলীর পাংশুটে মুখ।

৪২.
এতবার হসপিটালের দোরগোড়ায় আলী এ-জীবনে কখনো আসেনি। যতটা না আঞ্জুমানের জন্য আসতে হলো তাকে। তখন তার রুমের বারান্দায় আঞ্জুমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতর কেউ খামচে ধরেছিল। অশুভ আশংকারা ভর করেছিল। আগেপিছু কিছুই ভাবার অবকাশ পায়নি। তড়িৎ গতিতে দৌড়ে নিজ রুমে প্রবেশ করে দেখে, আঞ্জুমান বারান্দার রেলিঙে পা তুলছে মাত্র। হামলে গিয়ে টেনে ধরে আঞ্জুমানের হাত। ঝাপটে ধরে নিজের দিকে ফিরাতে গিয়ে দু’জন একসাথে ফ্লোরে পড়ে। ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে আঞ্জুমান। অতঃপর একপ্রকার দুশ্চিন্তার ভারে জ্ঞানহীন আঞ্জুমানকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আলী। বর্তমানে ডাক্তারের কক্ষে অবস্থান করছে আলী। ডাক্তার এলেন কিছুক্ষণ পরেই।

‘মেয়েটার হাসবেন্ড হোন দেখলাম ফরমে।’

‘জি।’

‘বয়স বেশ অল্প দেখলাম। কিছুক্ষণ পরপর জ্ঞান হারাচ্ছে যে, ভালো লক্ষ্মণ নয় সেটা।’

আলীর উদ্বিগ্নতা দ্বিগুণ হারে বেড়ে চলেছে। খারাপ কিছু হয়নি তো আঞ্জুমানের। অস্থিরতার সহিত চিন্তান্বিত প্রশ্ন তার,

‘কারণ কী? বড়ো ধরনের রোগ হয়েছে?’

‘একটা কথা কী। সকল রোগের বড়ো রোগ হচ্ছে মানসিক অবসাদ। সেখানে থাকে নানাবিধ জল্পনা-কল্পনা দুশ্চিন্তার। এসব চিন্তা থেকে শরীরে বাসা বাঁধে রোগেরা। আর বেশিরভাগ রোগের ওষুধ হলো হাসিখুশি থাকা। যা বর্তমানে খুবই বিরল, মেলা দুষ্কর। যার কারণে জীবনের ঢেউ থমকে যায় হঠাৎ করেই।’

বিরক্ত হওয়া আলীর মুখে তাকিয়ে কথাগুলো ব্যাখ্যাতে নিয়ে গেলেন না আর ডাক্তার সাহেব মোদ্দা কথায় পৌঁছে বললেন,

‘যাইহোক, আঞ্জুমান মেয়েটাকে অবজারভেশন করে দেখলাম, মেয়েটা বেশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মেডিকেল হিস্ট্রোরিতে আরো দেখলাম, কিছুদিন আগেও না কি হসপিটালাইজ করতে হয়েছে তাকে। তাও সুস্থ হওয়ার আগেই বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। যেটা মোটেও ঠিক হয়নি। এত অল্প বয়সে কী এমন হলো যাতে করে এত্ত টেনশন তার মাঝে?’

আলীকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফের বললেন,

‘যদি বিষয়টা ব্যক্তিগত হয়, তাহলে আমার বলা উচিত সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে সময় দিন মেয়েটাকে। নিজেদের মধ্যে মানসিকভাবে ভালোবাসার প্রবণতা সৃষ্টি করেন। আগলে রাখার মাধ্যমে যত্ন-আত্তির মাধ্যমে নিজের ভালোবাসা জাহির করুন। একসাথে বসে সমস্যার সমাধানে এগুনোই বুদ্ধিমানের কাজ। বুঝতে পারছেন কী বুঝাতে চাচ্ছি। নাহলে হিতে বিপরীত ঘটে, মেয়েটা কোমায় চলে যাবে।’

আলীর মধ্যে উশখুশতা দেখা দিলো। সে তো আর যেচে বলতে পারবে না আঞ্জুমানকে বিয়ে করার জঘন্যতম ক্রীয়ার ঘটনা। তাই ডাক্তারের কথাগুলো আমলে নিয়ে এবার থেকে ভালোবাসা দেখিয়ে আঞ্জুমানকে সুস্থ করে কাছে টানবে, ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেখাবে সে। এই দৃঢ় সংকল্পে বেরিয়ে পড়ল আঞ্জুমানকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে।

৪৩.
আজকের পুরো দিনটা মোটেও সুখকর ছিল না রিমার জন্য। ক্ষণে ক্ষণে আলীকে স্মরণে হৃদয় পুড়ছে রিমার। এবার যাচ্ছে কতদিনের জন্য। থাকবে কী করে আলীকে ছাড়া? আলীর গায়ের গন্ধ স্পর্শবিহীন? দমবন্ধ হয়ে মারা না পড়লেই হয়। ভালোয় ভালোয় বিয়ের অনুষ্ঠানে নিজের হৃদয়, ধ্যানটাকে সংযত করলেই হয়। অবশ্য কথা বলার মাধ্যমে যদি-ও একটু কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা শিথিল হয়। এজন্য যাওয়ার আগে ড্রাইভার দিয়ে শপিংমল থেকে কিনে আনা মোবাইল পাঠিয়ে দিয়েছে আলীর কাছে। ইস! মাঝে মাঝে আফসোস হয়, সে যদি গ্রামীণ পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতো কতই না ভালো হতো তাহলে। সারাদিন সম্মুখে প্রিয় মানুষটাকে দেখে চোখ জুড়াত। কিন্তু সেই সুযোগ তো নেই। তার অভ্যাস নেই গ্রামের শুষ্ক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার। উপরন্তু কোনকিছুই সেখানে হাতের নাগালে পাওয়া যায় না। বহু পথ পারি দিয়ে শেষে গিয়ে পৌঁছাতে হয় গঞ্জে। ভাবতই গা কাটা দিয়ে ওঠে। এতএত ঝক্কি সামলানোর মতো মেয়ে নয় সে। সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড়ো হয়েছে। বাবা-মা তো কখনোই দিতে চাইবেন না। সেজন্যই তো আলীকে রাখা ঘর জামাই যাকে বলে। বিমর্ষ চিত্তে রিমা গোছগাছ করছে জামাকাপড়ের। ছোটো ভাবির মামার বিয়ের পনেরো দিন আগে থেকে সেখানে উপস্থিত থাকবে। আসলে এমনটা করার পিছনে কারণও রয়েছে। সে জানে, আলী ইলেকশনের কাজে ব্যস্ত থাকবে। তাই খুব একটা সময় তাকেও দিতে পারবে না তাকে। গ্রামে ইলেকশনের প্রচারে দৌড়াদৌড়ি করে আবার ঢাকায় এসে তাকে সময় দিবে, বেচারার অবস্থা হবে কাহিল। শেষে দেখা যাবে অসুস্থ হওয়ায় একূল-ওকূল দু’কূলই যাবে। তারচেয়ে ক’দিনের জন্য আলীকে সে অব্যাহতি দিলো তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া থেকে। নিজেকেও ব্যস্ত রাখল এ-ক’দিনে। বেচারি! সে তো আর জানে না, আলী আগে থেকেই চেয়ারম্যান পদচ্যুত। সেখানে নির্বাচনে দাঁড়ানোর কোন কথাই না সেখানে।

‘মায়াজালে বন্দি তুমি,
মিথ্যের শিকলে বাঁধা হৃদয়,
মৃগতৃষা আমি,
ধু ধু হাওয়ার মরুভূমির মরিচীকার ন্যায়।’

চলবে…

#নিশুতি_তিথি
লেখা : মান্নাত মিম
পর্ব ১৯
___________

৪৪.
দূরত্বের সাথে গুরুত্ব বাড়ে প্রবাদের দিন শেষ। উলটো কাছে থাকলে, পাশে সময়ে-অসময়ে পেলে মায়া-মহব্বত জাগে। সেই পাশে থাকার প্রচেষ্টায় আঞ্জুমানকে নিজের বেডরুমেই রাখবে এখন থেকে আলী। দরকারি-অদরকারির সবকিছুর খেয়াল রাখবে। পাছে আবার দূরে রাখতে গিয়ে কোনো অঘটন না ঘটিয়ে ফেলে এই আশংকায় আরো বেশি কাতর হয়ে পড়ে সে। তাই এটাই ভালো মনে করল। যতই তাকে ভয় করুক আঞ্জুমান। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার সিস্টেম অ্যাপ্লাই করবে। অর্থাৎ ভয় দিয়ে ভয়কে জয় করবে। আঞ্জুমানের প্রতি কোমল আচরণের প্রভাবে আলীকে অবশ্যই সে ভালোবাসবে, বাসবে তো? ভাবনা যদি-ও আলীর তবুও কোথাও কিন্তুর একটা অস্তিত্ব রয়ে যায়।

‘ওঠ, আঞ্জু। ওঠ।’

ঘুমন্ত আঞ্জুমানকে জাগানোর চেষ্টায় এবার কাঁধ জড়িয়ে ধরে উঠিয়ে বিছানায় বসালো। আজ সকালের অবস্থা গুমোট অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টির আশংকা করা যায়। তাও বেশ জোরেসোরে’ই নামবে দেখা যায়। রাহিমা খালা রান্নাবান্না সেরেছেন কোন ক্ষণেই। তাকে আগেভাগে রান্না করে চলে যাওয়ার কথা আলী’ই বলেছে। আজকের বৃষ্টিমুখর সময়টাকে দু’জন কপোত-কপোতীর একসাথে কাটানোর পরিকল্পনা আলীর। ঠান্ডা-ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝে ঘুমটা বেশ আরামের হয়। কিন্তু সেটার ব্যাঘাত ঘটায় আঞ্জুমানের চোখ বোজে মুখ কুঁচকে এলো।

‘কী হলো মুখ কুঁচকে রাখলি যে? কোথাও ব্যথা পেয়েছিস না কি?’

সম্মুখে বসা তারউপর ঝুঁকে থাকা অস্থির কণ্ঠে বলা আলীকে দেখে বোজে থাকা চোখ মেলে ভয়ে খানিক সিঁটিয়ে সরে এলো। সেটা দেখে বুঝতে পেরে আলী ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে, আঞ্জুমানকে তার বিরুদ্ধেই বাহু জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়ে এলো। আধশোয়া হয়ে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসে আঞ্জুমানকে বুকের মধ্যের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল। অতঃপর আঞ্জুমানের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলল,

‘আমাকে ভয় পাওয়ার কারণটা কী বলবি দয়া করে?’

নিশ্চুপ থাকা কাঁপতে থাক আঞ্জুমান আলীর গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠের বদলে শান্ত, মায়া জড়ানো কথায় ভড়কে গিয়ে থমকালো। কাঁপাকাঁপিটা-ও কমে এলো। ভাবল, আসলেই তো লোকটাকে ভয় পাওয়ার কারণ কী? ভাবলেও সেটার উত্তর মিললো না তার ছোটো মাথায়। চুপ থাকতে দেখে আলী ফের বলল,

‘বিয়েটা হয়ে গেছে যেখানে, সেখানে তোকে তো আমি হুমকিধামকি দিয়ে ফেলে দেইনি। সময় দিয়েছি, আমাকে মেনে নেওয়ার। কারণ অন্যরকম পরিস্থিতিতে পড়ে বিয়ে হয়েছে আমাদের। এখন এতদিন পরে এসেও আমাকে এতোটা ভয় পাওয়ার কারণ কী হতে পারে বুঝতে পারছি না। আসলেই কি আমায় মেনে নিতে পারছিস না না কি চাচ্ছিস না, কোনটা?’

এতোগুলো কথার মর্মার্থ বোধ হতেই মর্মাহত হলো আঞ্জুমান। তার মুখে কথা বলার জো নেই। কী-বা বলবে সে? আলী তো ঠিকই বলছে। আর লোকটা-ও যে তাকে মেনে নিয়েছে স্ত্রী হিসেবে হাবে-ভাবে, যত্ন-আত্তি তো বোঝা’ই যাচ্ছে। তাহলে তার মনটা কেন মানতে নারাজ? নিজের মনের খবর সে নিজেও জানে না। অবুঝ কি না। ভাবতে ভাবতে যখন আঞ্জুমানের চোখ ফের বোজে আসা ধরল, তখন আলী তার দিকে নজর ফিরালো দেখল মেয়েটা আবারও ঘুমে ঢুলছে। বুঝল ওষুধের কারসাজি। কিন্তু নাহ খেয়ে তো ঘুমুতে দেওয়া যায় না। তাই ডেকে তুলে ধরে নিয়ে ওয়াশরুম পর্যন্ত দিয়ে এলো।

৪৫.
প্রোমোদ গুণছে রিমা অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। অথচ এই বৃষ্টিতে মনে হয় না আর হবে যাওয়া।

‘ধ্যাত! মুডটাই নষ্ট হয়ে গেল।’

‘কী গো ভাই, মুখ এমন পেঁচার মতো করে আছ কেন?’

ছোটো ভাবি সামিয়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রিমার কথা শুনে জিজ্ঞেস করল।

‘মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে।’

‘আহা! সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।’

‘আরে, দেখছ না ঝড় আসবে, বৃষ্টি হবে। এরমধ্যে যাবো কীভাবে?’

হেসে দিলো সামিয়া। তার হাসি দেখে রাগে গাল ফোলালো রিমা। সেটা দেখেও না দেখার ভান করে তৈরি হতে লাগল। রিমা লক্ষ করে বলল,

‘কী ব্যাপার রেডি হচ্ছো যে?’

‘হব না?’

অবাক হওয়ার ভানে এবার চটে গেল রিমা।

‘ভনিতা ছেড়ে বলো আসল কথা।’

‘গাড়ি দিয়ে নিতে আসছে সমীর ভাই।’

শুনেই স্তব্ধতা গ্রাসের সাথে ভর করল অস্বস্তিকরতা। সেটা বোধহয় সামিয়ার চক্ষুগোচর হলো। তাই তাকে স্বাভাবিক হতে বলে আরো বলল,

‘সমীর ভাই আসতে চায়নি। মা-ই জোর করে পাঠালো। ভাইয়ার সামনে স্বাভাবিক থেকো প্লিজ। সবাই ভুলে গেছে, তুমি-ও তো।’

শেষটা অনুরোধের শোনালো। রিমা নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টায় আছে। গতবারের কাহিনি ভুলে গিয়েও মনের খাতায় আবারো উঁকি মেরে টুকা দিয়ে গেল। যদিও ভুল বোঝাবুঝি ছিল তবুও কাহিনি হয়েছিল এ-নিয়ে সেগুলো তো আর ফেলনা নয়। কিন্তু রিমা সেটা ভুলে গিয়ে কোন গাধামিতে যে, সামিয়ার সাথে যাওয়ার জন্য যোগ দিলো। ওহ্, আলীর জন্যই তো যেতে রাজি হয়েছিল। এখন আফসোস হচ্ছে। আফসোস করেও তো লাভ নেই।

৪৬.
ডাইনিংয়ে খাওয়ার কথা থাকলেও আলী রুমেই খাবার নিয়ে এলো, এই প্রথমবার। আগে সময়গুলোতে কখনোই খাওয়ার জায়গা এখন থেকে ওখান হয়নি। রিমা শহুরে মেয়ে কত বলেছিল, সকালে ঘুম থেকে ওঠে আবার নিচে গিয়ে খেতে যেতে ভালো লাগে না। ওপরে আনলে কি হয়, দু’দিনেরই তো কথা। লাভ হয়নি কোনো। অথচ আজ নিয়ম বদলেছে, বদলেছে মানুষটা-ও। আলী কি একই রয়েছে? নাহ, সে-ও বদলাচ্ছে একটু একটু করে, কারো স্পর্শে, কারো নিবিড় সান্নিধ্যে।

‘হা কর তো দেখি।’

আলীর ঘরের বারান্দাটা আঞ্জুমানের বেশ পছন্দ হয়েছে। বাইরের প্রকৃতি যে টানে মেয়েটাকে খুব করে। বারান্দায় ছোটো একটি সেন্টার টেবিল আর দু’টো চেয়ার রাখা। সেখানেই বসে আছে আলী ও আঞ্জুমান। টেবিলে রাখা খাবার একটু করে নিয়ে আঞ্জুমানের মুখের সম্মুখে ধরে আলী। নির্দেশ করে মুখে নিতে। বাইরের এখনো গুমোট ভাব তবে বাতাস বইছে, ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস। প্রকৃতি দেখতে বিভোর থাকা আঞ্জুমান ফিরে তাকায় আলীর দিকে। মুখের সামনে খাবারের লোকমা দেখে। বিনাবাক্য ব্যয়ে সেটা মুখে পুরে নেয়। আলীর বিচক্ষণতা বুঝে, আঞ্জুমান তাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টায়। মেনে নিতেই হবে কারণ মেয়েটার ফিরে যাওয়ার সকল পথ বন্ধ তবে একটা বাদে। সেটা হলো আলীর মনের ঘর। সেই ঘরের দরজা খােলা রেখেছল আলী। আঞ্জুমানের শুধু ভেতরে প্রবেশ করার অপেক্ষা। অতঃপর প্রবেশ করবে আর আলী খট করে দরজায় খিল দিবে। মুখে খাবার চিবানো প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা আঞ্জুমানের খেয়াল হলো না, আলীর ঠোঁট কোণ ঘেঁষে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়া হাসির রেখা। আনমনে আঞ্জুমান খাবার মুখে বলল,

‘আপনে গো বাইত কোনো ফুল গাছ নাই ক্যান?’

এই প্রথম আঞ্জুমান কথা বলল তাও আবার আলীর সাথে। বিষয়টা আলীর বোধগম্য হতে বেশ সময় নিলো। যখন দেখল উত্তরের আশায় আঞ্জুমান তার দিকে তাকিয়ে তখন বিস্মিত ভাব যেন আকাশ ছুঁলো। মেয়েটা তাকে কবে ঠিকমতো লক্ষ করেছে, সময়কাল ভাবলেও সারাদিন পার হয়ে যাবে। ধ্যানচ্যহত হলো পাশে গাছে থাকা কোকিল পাখির কুহু’র সুরে। সেদিকে তাকিয়ে আলী উত্তরে বলল,

‘আছে তো একটা আছে।’

‘কই আমি তো দেখলাম না।’

অবাকান্বিত হওয়া আঞ্জুমানকে দেখতে কত মায়াময় লাগছে। পার্থিব জগতের সৌন্দর্য যেন মেয়েটার ওপর ভর করেছে। ডাগর-ডাগর আঁখিদুটিতে এক সমুদ্র নেশা। যেখানে ডুব দিতে চাওয়া আলীর হিংস্র, নিষ্ঠুর উত্তাল হওয়া পাগল মন। ভালোবাসা পেলে যদি একটু ঠিক হয়, শান্ত হয় মনটা। এমন সময় ধুমসে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটা পড়তে শুরু করল। আলীর দ্রুত আঁধ খাওয়া খাবার নিয়ে গেল ভেতরে আগেভাগে। খেয়াল এলো আঞ্জুমান ভেতরে আসছে না। সেটা দেখে এগিয়ে গেল বারান্দায়। বৃষ্টি ভেজার সময় প্রতিটি নারীকেই অপরূপ সৌন্দর্য্যের আধিক্য লাগে। সেখানে আগে থেকে যার কাছে সকল সৌন্দর্য বিদ্যমান, তাকে ভেজা রূপে দেখা কেমন লাগে! বিদ্ধ হয়, বুকের বাঁপাশে তীব্র ব্যথার সূচনা হয়। যদি এই বৃষ্টি ভেজা অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে মণ্ডিত নারীটির স্পর্শ না করা যায়। এগিয়ে গেল বৃষ্টিতে সিক্ত হওয়া নারীটির কাছে। ভিজে থাকা কোমল দেহ খানি যখন স্পর্শ করল পেলব পৌরুষেয় শরীর, বিদ্যুৎ গতিতে রক্ত সঞ্চালনের জোগাড় তখন আঞ্জুমানের লতানো দেহখানি। পিঠ গিয়ে ঠেকানো আলীর বলিষ্ঠ বুকেতে। আলীর হাত তখন আঞ্জুমানের গণ্ডদেশ আঁকড়ে। কয়েকপল কাটলো এভাবেই দু’জনে। ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরালো আলী তাকে। বোজে থাকা চোখেও কি নেশা হয়? হয়তো, এই-যে আলীর ঘোর লাগছে যে। দু’হাতে আঞ্জুমানের কটিদেশ চেপে আচমকাই ওপরে তোলল আলী। আঞ্জুমান দু-হাত দু’দিকে ছড়ালে আলী কয়েক পাক ঘোরাতে লাগলো তাকে ওপরে রেখেই। খিলখিল করে হেসে উঠল আঞ্জুমান। তা দেখে আলী-ও হাসল, তবে শব্দহীন, স্মিত প্রফুল্লতার সহিত। বেশি ঘোরার ফলে মাথা ঘুরে উঠতে নিলে আঞ্জুমান আঁকড়ে ধরল আলীর ভেজা চুল। আঞ্জুমানের চিকন চিকন আঙুলের স্পর্শে আলীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্তে উষ্ণতা বয়ে গেল। ধীরে ধীরে নামাতে লাগল আঞ্জুমানকে। কিন্তু থেমে গেল যখন তার মুখ বরাবর আঞ্জুমানের মুখ। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দু’জনা দু’জনের দিকে। দু’জন পরিণত মানুষ তাও বিপরীত লিঙ্গের, সেখানে কিছু একটা হওয়া শতভাগ বাঞ্ছনীয়। না হওয়া অদ্ভুত ব্যাপার। উপরন্তু আলীর জন্য হালাল আঞ্জুমান। আলীর নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে আঞ্জুমান সম্মোহনী হয়ে ঘোর পড়ে যাচ্ছে। আলীর মুখ এগিয়ে আসা দেখে আঞ্জুমানের চোখ কী বুঝল কে জানে, আপন শক্তিতে দু’চোখের পাতা একত্রে বন্ধ হয়ে এলো। সময় কাটলো নিজ গতিতে কিন্তু বাহিরের ঝড়-বৃষ্টি আর দু’জন কপোত-কপোতীর মধ্যে ক্ষান্ত হওয়ার লক্ষ নেই। অবিরাম চলছে বৃষ্টি, ভালোবাসাময় বৃষ্টি।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here