নিরুদ্দেশ ২য় খন্ড পর্ব ৩১

নিরুদ্দেশ ২য় খন্ড
পর্ব ৩১

শৈশব-কৈশোর-যৌবন পার করে এখন বার্ধক্যের দরজায় পৌঁছে গেছে সবুজ। জীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির মধ্যে কাটিয়ে ফেলেছে অনেকগুলো বছর। শেষ জীবনে পৌঁছে গেছে। এবার মেলাতে হবে হিসাব খাতা। মানুষ বলে সময়ের সাথে সাথে জীবনে বৈচিত্র্যময় অনেক ইতিহাস ভুলে যায়। সবুজ কি ভুলতে পেরেছে? তার জীবনের সমস্ত ইতিহাস মনে আছে। তার ছোটবেলার বন্ধু! যাদেরকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবনের অর্ধেকটা সময় রচিত হয়েছে। সকলের ঊর্ধ্বে ছিল তাদের বন্ধুত্ব। কথা ছিল তারা হবে কৃষকের ঘাম। হতে পেরেছিল কি জানে না। কিন্তু জীবনের সবটুকু দিয়ে বন্ধুত্বকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল। বন্ধুত্বের মধ্যে বাঁচতে চেয়েছিল। কথা ছিল তিনজন কখনো আলাদা হবে না। দুজনকে ছাড়া একজন হাসতে পারবে না। আবার দুজনকে ছাড়া একজন কাঁদতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে তা কি হয়েছে? হ্যাঁ হয়েছে। সূর্যময় তাদেরকে ছেড়ে অনেক আগে চলে গেছে। সেদিন থেকেই তাদের জীবনের হাসি কান্না সবকিছু থেমে গেছে। ওই প্রথম জীবনে তীব্র সংজ্ঞাহীন আঘাত পাওয়ার পর সবকিছু আঘাত কে তুচ্ছ মনে হয়েছে। তারপর জীবনে অনেক বেদনা এসেছে অনেক খুশি এসেছে। কিন্তু কোনো খুশি তাদেরকে আনন্দ দিতে পারেনি আবার কোনো বেদনা তাদেরকে মর্মান্তিক ভাবে ভেঙে দিতে পারেনি। সমস্ত কিছু তাদের কাছে তুচ্ছ লেগেছে। সংকেত কোথায় আছে জানা যায়নি। সে আদৌ বেঁচে আছে না পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে তাও জানে না। তবুও মন তাকে খুঁজে বেড়ায়। মনে মনে বলে যেখানে থাকুক ভালো থাকুক। আবার কিছু কিছু মানুষ বলে জীবনে যদি সঠিক মানুষ পাওয়া যায় তাহলে পুরোনো মানুষটাকে ভোলা সম্ভব। তবে তোতা কি ভুল মানুষ? না তো। সঠিক মানুষ। তবুও সবুজ কেন সাথীকে ভুলতে পারলো না? ভোলার চেষ্টা করেনি? করেছিল তো। সবকিছু ভুলে গিয়ে তোতাকে আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুলতে পারেনি। তাকে ভুলতেই ভুলে গেছে। কাউকে ভালোবাসবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েও যেমন তাকে ভালোবাসা যায় না তেমনি কাউকে ভুলবো বললেও ভোলা যায় না। এটাই জগতের নিয়ম। যে মেয়েটা তাকে এত ভালোবাসা দিল। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সারা জীবন অপেক্ষা করে গেল। তার প্রতি সৃষ্টি হলো না তীব্র ভালোবাসা। যা সৃষ্টি হয়েছে তা শুধুমাত্র করুণা কৃতজ্ঞতা আর শান্ত ভালোবাসা, যে ভালোবাসা সবার প্রতি সৃষ্টি হয়। তোতা হেরে গেছে। ভালোবাসা জয় করতে পারেনি। ভালোবাসা জয় করা কি খুব সহজ? সারাটা জীবন পার করে ফেলল তবুও ভালোবাসা জয় করতে পারলো না। মেয়েটার বুকে কত কষ্ট লুকিয়ে রয়েছে। এক বুক সমুদ্র দিয়েও তার কষ্ট মাপা যাবে না। একটা ঘরের মধ্যে সে কিছুদিন থাকতে পারতো না। জীবনে এমন এক নিষ্ঠুর নিয়তি এল… যেখানে একটা ঘরে তাকে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে ফেলতে হলো এবং আরও অনেকগুলো বছর কাটাতে হবে। ঘরটাকে অবশেষে ভালোবেসে ফেলেছে। আর ক’টা বছর বাঁচবে জানে না। শেষ জীবনটাও তাকে এখানে কাটাতে হবে। অনেকগুলো বছর কলম ধরেনি। সে আবার লিখলে কে বা পড়বে? কেউ পড়বে না। তবুও লিখতে ইচ্ছে করে। সে জানে, কেউ না পড়লেও তোতা পড়বে। তার জন্য তো লেখা যায়। সবুজ এখন তোতার জন্য লেখে। সবসময় লিখতে পারে না। মাঝেমধ্যে লিখে। তোতা দেখা করতে এলে তাকে লেখাগুলো দেয়। খুব খুশি হয় সে। কখনো পড়ে শোনায়। আবার কখনো লেখাটা বাড়ি নিয়ে চলে যায়। একা একা পড়ে। আজ মেঝেতে বসে তোতার জন্য একটা চিঠি লিখছিল। এমন সময় জোড়া পায়ের শব্দ শুনতে পেল। কত মানুষই এই পথ দিয়ে যাওয়া-আসা করে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই পেছনে ঘুরে দেখার চেষ্টা করল না। কিন্তু খেয়াল করে বুঝলো জোড়া পায়ের শব্দ তার কাছে এসে থেমেছে। তারপর আর শব্দ শোনা যায়নি। কোনো মানুষ যদি সেখানে এসে থাকে তাহলে সাড়া দিল না কেন? চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বুঝি? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? সে কি ঘুরে দেখবে? মনের প্রশ্ন দূরে রেখে পেছনে ঘুরলো। অবাক হলো। কলের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে পরল। লোহার গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দাদা অন্তিম আর পাশে অভিমুন্য। অভিমুন্য অনেক বড়ো হয়ে গেছে। এর আগে বহুবার তোতার সঙ্গে এসেছে সে। চিনতে অসুবিধা হলো না। দাদার চোখ থেকে ঝর-ঝর করে জল ঝরে পড়ছে। চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখলো। ভুল কিছু দেখছে না তো? এটা কি করে সম্ভব? তার দাদা তাকে সবসময় অপছন্দ করে এসেছে। এমন কি যখন তার নামে কেস চলছিল তখন একদিনও কোর্টে যায়নি। একবারের জন্যও ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। তবে আজ! হঠাৎ? গুটি গুটি পায়ে দাদার দিকে এগিয়ে গেল। করুন কণ্ঠস্বরে বলল,’দাদা!’
‘কেমন আছো, ভাই!’ কতকাল পর দাদার মুখে ভাই শব্দটি শুনল। খুব ছোটবেলায় দাদা তাকে ভাই বলে ডাকতো। তারপর থেকে আর ডাকেনি। তারপর একটা পর্যায়ে দুজন দুজনের সাথে কথা বলতো না। ঝগড়া নেই… মনোমালিন্য নেই…. একটা বাড়িতে থেকেও এক আকাশ দূরত্বে ছিল তারা। দুই ভাইয়ের চোখ ছলছল করছে। চোখের জলে যেন ভাব বিনিময় হয়ে গেল। দোষ কারোর একার নয়। দুজনে সমান ভাবে দোষী। শুধু বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছে। নিজেদের ব্যবহারে অনুতাপ করল। একনাগাড়ে অন্তিম ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুতেই চোখ ঘোরাচ্ছে না।
‘কি এত দেখছো? দেখার মতো কি আছে?’
‘কিচ্ছু নেই। তবুও দেখতে ইচ্ছে করছে।’ দাদার কথার সঠিক অর্থ বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। তারপর অন্তিম হেসে উঠলো। চোখের জল মুছে নরম কন্ঠে বলল,’আমি এখানে কেন এসেছি জানো? আমাকে কে পাঠিয়েছে বলতো?’ সবুজ একটু অবাক হলো। তবে দাদা নিজে থেকে আসেনি।
‘আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। টাকা বাড়ি-গাড়ি এগুলো সবকিছু তুচ্ছ। জীবনে সবচেয়ে দুর্লভ জিনিস তো সুন্দর একান্নবর্তীবর্তী পরিবার। যা আমাদের ছিল। আর আমরা অবহেলায় হারিয়েছি। আমি সবসময় টাকা আর সম্মানের পেছনে ছুটেছি।কখনো পেছনে ঘুরে দেখিনি পেছনে আমার ভাই ভাইয়ের বউ বাবা-মা নিজের স্ত্রী রয়েছে। সেগুলো যদি দেখতাম তাহলে আজ এখানে দাঁড়াতে হতো না। টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে ভাই ভাইয়ের বউ অনেক দূরে সরে গেছে। মা-বাবা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। নিজের স্ত্রী রাগে-অভিমানে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমার কাছে প্রচুর টাকা। কিন্তু এত টাকা নিয়ে আমি কি করবো? আমি পারবো আমার ভাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে? আমি পারবো আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে? পারবো আবার একসঙ্গে বসে খাবার খেতে? আর কখনো সম্ভব নয়।’ অন্তিম থেমে গেল। সবুজ কিছু বলল না। অভিমুন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ পর অন্তিম আবার বলতে শুরু করল..
‘আমি জানি না তোমাদের সম্পর্কের মধ্যে কি ছিল। আমি জানতে চাইও না। শেষ জীবনে এসে পুরনো কথা মনে করিয়ে তোমাকে বিব্রত করতে চাই না। বাবার বেশিরভাগ সম্পত্তি আমি নেব এই আশায় পল্লী গ্রামের মেয়েকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। সহজ সরল ভেবে ঠকিয়ে দেব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তোমার ঘাড়ে চড়িয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমিতো বাঁচাতে পারিনি। অথচ সে-ই পল্লীগ্রামের মেয়েটা আমাকে ভুল থেকে সঠিক জায়গায় তুলে এনেছে। সবকিছু তুচ্ছ করে আমাদের পরিবারকে এক করেছে। আজীবন অনিশ্চিত অপেক্ষা কে করে? তোতা করছে। আমি যদি পারতাম তোমাকে নিয়ে তার কাছে দিয়ে দিতাম। কিন্তু আমি অক্ষম। পারবো না। মাতৃহারা অভিমুন্যকে নিজের হাতে গড়ে তুলেছে। আজ এখানে আমাকে পাঠিয়েছে। আমি আসতে বিব্রত বোধ করছিলাম। তোমার সামনে এসে আমি কি বলবো। তোমার সামনে দাঁড়ানো মতো ক্ষমতা আমার নেই। তোতা বলল, তুমি গিয়ে শুধু তোমার ভাইয়ের চোখের দিকে তাকাবে। তোমাকে কিছু বলতে হবে না। দেখবে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। মেয়েটি জাদু জানে। কারোর চোখ কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। আমার মন বলছে আমরা দুজন দুজনকে ক্ষমা করে দিয়েছি।’ অন্তিম হু হু করে কেঁদে গেল। দাদার কান্না দেখে নিজেকে সামলাতে পারল না সবুজ। তার চোখ থেকেও জল ঝরে পরলো। অভিমুন্য কোনো রকম ভাবে বাবাকে সামলে নিল। কয়েকটি মুহূর্ত নিস্তব্ধ কেটে গেল। বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি নেই। কাজের কথা বলতে হবে। চোখের জল মুছে ভারী কণ্ঠে অন্তিম বলল,’বাবা তো চলে গেছে। যাওয়ার আগে উইল করে যায়নি। হিসেব অনুযায়ী বাবার সমস্ত সম্পত্তি ভাগীদার আমরা দুই ভাই। কি করবে এত সম্পত্তি? সম্পত্তি তোমার নামে না তোতার নামে হবে?’
‘কারোর নামে হবে না।’
‘মানে?’
‘আমি জল খাওয়ার সময় কৃষকদের চাষের জমিতে জলের অভাবের কথা মনে পড়ে। আমি খাবার খাওয়ার সময় ফুটপাতের ওপর পড়ে থাকা মানুষদের কথা মনে পড়ে। তারা আমাকে দু-দণ্ড শান্তি দিতে পারে না। ওই মানুষগুলো দেখলে আমার হৃদয় নিষ্ঠুর ভাবে কেঁপে ওঠে। সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা একসঙ্গে আমায় আঘাত করে। আমি ওদের জন্য কিছু করতে চাই। তাদের জন্য কিছু করতে পারলে আমার মন শান্ত হয়।’ অন্তিম ভাইয়ের দিকে তাকালো। সবুজ আবার বলল,’আমার একটা উপকার করবে?’ অন্তিম মাথা নাড়াতে সবুজ বলল,’আমার ভাগের সম্পত্তি দিয়ে ওদের জন্য কিছু করো। তাতে আমি অনেক খুশি হবো। আমার জন্য এটুকু করতে পারবে?’ অন্তিম হেসে উঠলো। ভাই কে জড়িয়ে ধরার সুযোগ থাকলে অবশ্যই একবার জড়িয়ে ধরতো।
‘তুমি বদলায়নি। তুমি বদলাতে পারো না। সবুজকে মাটি আর খোলা আকাশে মানায়। আমি কথা দিচ্ছি তোমার সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করবো। আমি সবার সামনে প্রমাণ করব, আমার ভাই হয়তো অনেকগুলো ভুল কাজ করেছে। কিন্তু তার হৃদয় ক্ষুদ্র নয়। অনেক বড় মনের মানুষ। সে আজও সাধারণ মানুষের কথা ভাবে। তাদের কথা চিন্তা করে রাতে ঘুমোতে পারে না। তাদের জন্য কষ্ট হয় তার। নিজের সবটুকু দিয়ে সাধারন মানুষদের উন্নতির কথা ভেবেছে। সাধারণ মানুষদের জন্য লড়াই করেছে।’ আরও কিছুটা মুহূর্ত কথা বলে তারা বিদায় নিল। সবুজ দাদার দিকে তাকিয়ে রইল। কি অদ্ভুত জীবন! যতক্ষণ আমরা জানতে পারি মানুষটাকে আমরা কাছে পেতে পারবো, হারানোর ভয় নেই। ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ওই মানুষটাকে ভালোবাসবো না। মানুষটাকে ভালোবাসতে শুরু করবো তখনই যখন জানতে পারবো মানুষটাকে আর কাছে পাওয়া সম্ভব নয় তার পাশে বসে গল্প করা অসম্ভব।’

তোতা কিছু একটা কাজ করছিল। হঠাৎ করে মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনে বাইরে বেরিয়ে এলো। ময়ূর তরতর করে তাদের বাড়ির দিকে আসছে। বেশ ভয়ার্ত লাগছে তাকে। তার বিয়ের খবর অনেক আগেই পেয়েছিল। লতা বিয়ে নিয়ে মোটেও খুশি ছিল না। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিয়েছিল। তোতা লতাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু বলেছিল, আর কয়েকটা বছর পৃথিবীতে আছে। ওদের সংসার ওরা কেমন ভাবে কাটাবে ওদের ব্যাপার। তাদের উপর ছেড়ে দাও। তুমি তোমার মতো থাকো। তাদের ভালো-মন্দ তাদেরকে বুঝে নিতে দাও। তবুও তাকে খুশি করতে পারছিল না। ছেলের ধর্ম ত্যাগ কিছুতেই মেনে নিচ্ছিল না। বড় অস্থির অশান্ত হয়ে পড়েছিল। ময়ূরকে এমন অবস্থায় দেখে ভয় করল। কিছু একটা অঘটন ঘটে যায়নি তো! ময়ূর তোতার কাছে এসে জানতে চাইল তার মা এখানে এসেছে কিনা! দুপুর বেলা খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে আর মাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভেবেছিলো আশেপাশে কারোর বাড়িতে হয়তো গেছে। কিন্তু কোথাও নেই। তোতার মুখে ‘না’ শুনে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল ময়ূর। অপেক্ষা করলো না। তোতা চেষ্টা করল ময়ূরকে আটকানোর। কিন্তু সে কিছুতেই থাকলো না। মাকে হারিয়ে আর কিছু ভাবতে পারছে না। দ্রুত বেরিয়ে গেল। তোতা সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। লতাকে খুব ভালো করে জানে। খুব অভিমানী মেয়ে। তীব্র অভিমানে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়নি তো? কিন্তু এই বৃদ্ধা বয়সে কোথায় যাবে? হাঁটার জন্য সামান্য শক্তিটুকু তো নেই। গেলেও বেশিদূর যেতে পারবে না। খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবুও দুশ্চিন্তা হলো। মন খারাপ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর এসে বসলো। কয়েকদিন আগে সবুজের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তাকে একটা চিঠি দিয়েছে। এখনো পড়া হয়নি। চিঠিটা বের করলো। ভাঁজ খুলে পড়তে আরম্ভ করলো….

তোতাপাখি, আজ কতগুলো বছর একসঙ্গে না থেকেও একসঙ্গে কাটিয়ে ফেললাম। জীবনে কত চড়াই-উতরাই পার করেছি। শেষ জীবন কেমন কাটবে তা ধারণা করতে পারছি। কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখুন,জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ এই তিনটি কথা কি কেউ আগে থেকে বলতে পারে। সম্ভব নয়। বয়স হয়েছে। কতদিন বাঁচবো জানি না। আমি চলে যাওয়ার আগে আপনাকে কিছু কথা বলে যেতে চাই। যেদিন থেকে আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে সেদিন থেকে আপনি আমাকে অসংখ্য প্রশ্ন করেছেন। আমি আপনার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। আমার সমস্ত উত্তর আপনাকে স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আপনাকে স্বস্তি দেয়নি। বারবার দিয়েছে দীর্ঘশ্বাস। আপনি আমায় বারবার জিজ্ঞেস করেছেন, আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা! আমি সঠিক উত্তর দিয়েছি। তবুও আপনি স্বস্তি পাননি। ভাবেন আমার ভালোবাসা মিথ্যা। স্ত্রীকে ভালোবাসতে হবে তাই ভালোবাসি,-এমনটা নয় তোতাপাখি। আমি আপনাকে সত্যি ভালোবাসি। হ্যাঁ, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা শান্ত ধীর শীতল কিন্তু মিথ্যা নয়। সবকিছু ছেড়ে আপনাকে নিয়ে বাঁচবো এমন ভাবে হয়তো ভালোবাসিনি। তা বলে মিথ্যা ভালোবাসা? চাঁদের জন্য কি আমরা সবকিছু ছেড়ে দিই? চাঁদের জন্য কী আমরা কিছু করি? কিছুই তো করি না। তবুও এক সমুদ্র নিয়ে তাকে আমরা ভালোবাসি। চাঁদের প্রতি ভালোবাসা কি কখনো ক্ষীণ হয়ে আসে? আপনি তো চাঁদ। আমি চাঁদকে ভালোবাসি। মানুষের মস্তিষ্কের কাজ মনে রাখা। সেখানে আমি জলজ্যান্ত একটা মানুষকে কি করে ভুলে যাব, বলুন? আমি সাথীকে ভুলতে পারিনি। এবং আমি তাকে আমাদের জীবনের মধ্যে টেনে এনে আপনাকে কখনো বিব্রত করার চেষ্টা করিনি। তবুও মাঝে মাঝে তার কথা মনে পড়ে যায়। আমি কি করবো? আমি হয়তো পৃথিবীর প্রথম পুরুষ যে দুটো নারীকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমায় ক্ষমা করো তোতাপাখি। আপনি আমায় অনেক কিছু দিয়েছেন। আপনার এক জন্মের ভালোবাসা আমি সাত জন্ম ধরেও ফিরিয়ে দিতে পারবো না। আমি আপনার কাছে চির ঋণী। আমায় ক্ষমা করো। আমি যদি আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই চিঠি পাবেন। আর যদি না থাকি তাহলে এটাই আমার শেষ চিঠি তোতাপাখি। ভালো থাকুন।
ইতি
আপনার রাজামশাই
চিঠিটা পড়ে টপটপ করে চোখ থেকে জল ঝরে পরলো। স্বামীর মুখে ভালোবাসা শব্দ শোনাটা যেমন দুর্বল এবং মধুর তেমনি স্বামীর মুখে অন্য নারীর প্রশংসা বড়ো মর্মান্তিক। কতটা অসহায় সে! চোখের জল মুছে ফেলল। এভাবে কাঁদলে কি হবে? মানুষটাও তাকে ভালোবাসি। এক টুকরো ভালোবাসা নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছি। আর কয়েকটা বছর অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঠাকুরের কাছে প্রদীপ জ্বালাতে হবে। শাড়ি বদলে ঘর থেকে বাইরে বেরোলো। এমন সময় খুশিমনে দু-জন পুরুষ মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। কণ্ঠস্বর খুব পরিচিত। অন্তিম কাজ থেকে সম্ভবত বাড়ি ফিরছে। কিন্তু তার সঙ্গে কে? তার অনুমান ভুল নয়। কণ্ঠস্বর ভালো করে চেনে। আনন্দে তার চোখ থেকে জল ঝরে পড়ল।এটা যে কখনো সম্ভব নয় তা বিশ্বাস করতে পারল না। মুহুর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলল কোথাও। ছুটে আবার ঘরে ফিরে এলো। কপালে টিপ পরল। মাথায় চিরুনি দিল। তারপর বেরিয়ে এলো। তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার রাজামশাই। কি করে সম্ভব? কোনো কিছু ভাবতে পারল না তোতা। সবকিছু ত্যাগ করে সবুজকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলো না। নিরবে কেটে গেল অসংখ্য সুখের মুহূর্ত। পাখি ডানা মেলে উড়তে পেরেছে। হৃদয়ের কবুতরি পাখা মেলেছে। বুক ধুকপুক করছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,’আপনি!’ সবুজ জবাব দিতে পারলো না। তার মুখ থেকে শব্দ বের হলো না। অন্তিম বলল,’তোমার বিয়েতে কোনো উপহার দিতে পারিনি। আজ সামান্য একটি উপহার নিয়ে এসেছি। আমার ভাই বড়ো ভালো। তাকে ক্ষমা করে গ্রহণ করো। ফিরিয়ে দিও না।’ তোতা চোখের জল মুছলো। সবুজকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কি তার রয়েছে? যদি ফিরিয়ে দিতে পারতো তাহলে এত কাল অপেক্ষা করতে হতো না। এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। এটা কি করে সম্ভব? সবুজ জেল থেকে কি করে মুক্তি পেল? তোতা অন্তিমের দিকে তাকিয়ে বলল,’কি করে সম্ভব হলো? কি করে মুক্ত করলে?’
‘থাক না। জানাটা কি জরুরী?’
‘খুব জরুরী। আমায় বল।’ অন্তিম সবকিছু খুলে বলল। আজ কুড়ি-বাইশ বছর ধরে কারাগারে বন্দী রয়েছে সবুজ। এতগুলো বছরে তার কোনো খারাপ ব্যবহার পায়নি। তার নামে রেপুটেশন ভালোই ছিল। একটু খোঁজ নিয়ে দেখেছে ভাই এর মুক্তি আদৌ সম্ভব কি নয়! কোথাও একটু আশার আলো দেখেছিল। অনেক ছোটাছুটির পর সম্ভব হয়েছে।তবে প্রত্যেক মাসের শেষে একবার করে থানায় যেতে হবে। তোতার চোখ দুটো লাল হয়ে এসেছে। অন্তিমের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চায় না। কান্না মাখা মলিন কন্ঠে তোতা বলল,’দাদা…।’
‘আমি কোনো ধন্যবাদ কিংবা প্রশংসা নিতে চাই না। বোনের জন্য এটুকু কিছুই না।’ কথাগুলো বলে অন্তিম বেরিয়ে গেল।
তোতা সবুজের দিকে তাকিয়ে বলল,’দেখেছেন দাদা কত বদলে গেছে।’
‘সবকিছু আপনার জন্য সম্ভব হয়েছে। আপনি সব কিছু পারেন।’
‘ভুল বললেন রাজামশাই। সবকিছু আমি পারি না। সবকিছু ঠিক করতে পারে ভালোবাসা। ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়। আপনি ভেতরে আসুন। এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি!’

আজ অনেক বছর পর পার্বতীর স্বপ্ন পূরণ হলো। পার্বতী এই পরিবারকে এক করতে চাইছিল। তার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করলো অন্তিম আর তোতা। আজ বাড়ির সকলে একসঙ্গে খাবার খেতে বসেছে। তোতা, সবুজ, অন্তিম, অভিমুন্য…। গোল হয়ে মেঝেতে খেতে বসছে। তাদের কত আনন্দ আর উচ্ছাস। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। শুধু আনন্দ আর আনন্দ। কতকাল পর বাড়িতে সুখ ফিরেছে। শুধু হারিয়ে গেছে তিনটা মানুষ। ওই তিনটা মানুষ থাকলে আরও খুশি হতো। আজ অন্তিমের পার্বতীর কথা খুব মনে পড়ছে। তাই হয়তো বেশি খাবার খেতে পারল না। সামান্য খেয়ে চলে গেল। কতগুলো বছরের পর নিজের বাড়িতে ফিরেছে সবুজ। নিজের ঘর নিজের সংসার সবকিছু ফিরে পেয়েছে। নিজের ঘরে খানিকক্ষণ বসলেই শান্তি মেলে। তার বই খাতা পেন পোশাক-আশাক সবকিছু কত যত্ন করে রেখেছে তোতা। একটাও হারিয়ে যায়নি। এই ঘরটায় একসময় ভরা সংসার ছিল। এখানে এসে সংকেত সূর্যময় আড্ডা দিত। আজ সে সব আর নেই। তারা হারিয়ে গেছে কুঞ্জবনে। বাবা-মা, কাকামশাই, জ্যাঠামশাই সবাই প্রকৃতির নিয়মে চলে গেছেন। তৃধা আর লতা… কত আপন ছিল। আজ কেউ নেই। শুধু মুখ ফিরালে তোতাকে দেখতে পাওয়া যায়। যার সাথে সে করেছে হাজার হাজার অন্যায়। তবুও ক্ষমা করে দিয়েছে। ভালোবাসা মানুষকে মানুষ বানায়। ভালোবাসা মানুষকে ক্ষমা করতে শেখায়। জীবনের এক বিচিত্রময় অধ্যায়। তোতা কিছুক্ষণ পর নিজেদের ঘরে এলো। দরজা বন্ধ করলো। সবুজকে উদ্দেশ্য করে বলল,’দেখেছেন অনেক রাত হয়ে গেছে। আপনি ঘুমাবেন না? আপনি তো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে খুব ভোরে উঠেন।’
‘সব মনে আছে আপনার?’
‘কিছু ভুলে যাইনি। সব মনে আছে সব।’ সবুজ খেয়াল করে দেখল তোতা আবার বাচ্চা হয়ে উঠেছে। এতদিন ধরে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তার খুব বয়স হয়ে গেছে। খুব ভারী ভারী কথা বলে। কিন্তু আজ! কত ছোট। শিশুর মতো ব্যবহার করছে।
‘আপনি আবার বাচ্চা হয়ে গেছেন। আগের মতো ব্যবহার করছেন।’
‘আপনার সামনে বাচ্চা হতে ভালো লাগে। আমাকে আগলে নিবেন তো? আমাকে গুছিয়ে নেবেন না?’
‘নিবো।’ তোতার দু-চোখ দিয়ে ঝর-ঝর করে জল ঝরে পড়ছে। কিন্তু কোনো শব্দ করছে না। কাছে টেনে নিল। আদুরে কন্ঠে বলল,’ কাঁদছেন কেন তোতাপাখি?’
‘আমি কাঁদছি না। শুধু চোখ থেকে জল ঝরে পড়ছে। জানি না আমার চোখে জল কেন?’
‘আপনি আমায় খুব ভালোবাসেন না?’
‘খুব। আপনি আর হারিয়ে যাবেন না তো? কারোর কাছে চলে যাবেন না তো?’
‘আমি আর কারোর নই। আমি শুধু তোতাপাখির। ছেড়ে যাবো না কোথায়ও।’
‘খুব ভালোবাসি রাজামশাই। আপনাকে ছাড়া আমার এই জীবন শূন্য।’
দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বামীর বুকে মাথা রাখার মতো দুর্লভ সুযোগ পেল তোতা। এতদিনের রাগ অভিমান ক্ষোভ যন্ত্রণা দুঃখ কষ্ট সবকিছু বদলে গেল। সবকিছু তুচ্ছ মনে হলো। এতকালের অপেক্ষা মুহুর্তের মধ্যে মনে হল ক্ষণিকের। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত যেন এখানে এসে থেমে গেছে। মানুষটাকে আবার আগের মতো পেয়েছে। সে জিতে গেছে। কেউ একজন বলে গেছিলেন জীবনের কাছে ঠিকঠাক চাইতে পারলে জীবন দুহাত ভরে দিয়ে যায়। তিনি ভুল কিছু বলে যাননি।

পর্ব ৩২ আসছে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here