নিরুদ্দেশ পর্ব ৪

নিরুদ্দেশ
পর্ব ৪

খবরের কাগজে সামান্য কিছু যা লেখা ছিল তা পড়ে ফেলতে বেশি দেরি করলেন না রায়বাবু। তবে ঘটনা সম্পূর্ণ পরিস্কার হলো না। দ্বিধা রইল। সত্য ঘটনা যাচাই করার জন্য সবুজকে ডেকে পাঠালেন। সারা বাড়িতে দ্রুত খবর ছড়িয়ে পরলো। থতমত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সবার মধ্যে কৌতূহল। পরবর্তী সময়ে কী হবে?

সবুজ এ বাড়িতে এ-বাড়ির ছেলের মতো থাকে। কাজের ছেলে হলেও তাকে কোনো কাজে কেউ-ই জোর করে না। নিজের ইচ্ছের মতো কাজ করে। সকাল সকাল তার ডাক পড়ায় একটু ঘাবড়ে গেল। আবার রায়বাবু ডাকছেন। সে দ্রুত উলঙ্গ শরীরে পোশাক গলিয়ে উপস্থিত হলো। সেখানে সবাইকে আগে থেকে উপস্থিতি দেখে আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। কিছু একটা ঘটেছে অনুমান করতে পারলো। রায়বাবু তার সামনে খবরের কাগজ ফেলে বললেন,’এগুলো কি সব সত্য ঘটনা?’ কাগজটা হাতে তুলে নিল সে। চটপট চোখ বুলিয়ে নিল। চোখে জল এলো না। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্নও হলো না। বাবা-মার কথা মনে পড়লো। এ ভাবে চলে আসা কি ঠিক হয়েছে? তাঁরা কত কষ্ট পেয়েছেন? যন্ত্রণা সহ্য করছেন। পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অথচ এখানে দিব্যি রয়েছে সে। বাবা নিজেই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তাছাড়া সে নিজের বাড়িতে সুখ খুঁজে পায় না। মনে হয় পরাধীন ভাবে বেঁচে আছে। স্বাধীনতা নেই। নিজের ইচ্ছের দাম নেই। অথচ এখানে পরের বাড়িতে কত সুখে আছে। স্বাধীনতা রয়েছে। নিজের মতো করে বাঁচতে পারে। শুধু মাত্র সংকেত আর সূর্যময়ের অভাব রয়েছে। তাদেরকে পেলেই হবে। সবুজ আর কিছু লুকিয়ে রাখলো না। সবকিছু সবার সামনে পরিস্কার করল। তবুও কেউ বিশ্বাস করতে চাইলো না। আবার বিশ্বাস না করে উপায়ও নেই। সবুজ মিথ্যা বলতে চাইলে অনেক মিথ্যা বলার সুযোগ ছিল। এই সামান্য কারণে কেউ নিজের বাড়ি ত্যাগ করে? মেধাবী হওয়ার সত্ত্বেও পড়াশোনা ছেড়ে দিল! একটু তাজ্জব ব্যাপার হলেও বিশ্বাস করতে হলো। তিনি সবুজকে কাছে নিয়ে বসলেন। বললেন,’চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেই। তোমার পরিবার তোমার অপেক্ষায় আছে।’
‘আমি যেতে চাই না।’ মাথা নিচু করে জবাব দিল সবুজ। রায়বাবু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। একটুখানি চুপ থেকে বললেন,’মাথা উঁচু করো।সবাইকে দেখো। এ বাড়িতে যতক্ষণ আছো ততক্ষণ কোনো ভয় কিংবা লজ্জা পাবে না। ভুল করলেও না। মানুষ ভুল করবে না তো ভুল কে করবে? আমি কি জীবনে কখনও ভুল করিনি? করেছি। অনেক ভুল করছি।’ সবুজ মাথা তুলল ঠিকই তবে কোনো কথা বলল না।
‘তুমি বাড়ি যেতে চাইছো না কেন? ভয় করছে? বাবা বকবে?’
‘তেমনটা নয়। আমার ইচ্ছে করছে না। আমার যখন ইচ্ছে করবে তখন আপনাদেরকে জানিয়ে চলে যাবো। এখন যদি ভাবেন আপনারা জোর করে আমাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসবেন তাহলে ছেড়ে দিয়ে আসতে পারেন। অসুবিধা নেই। কিন্তু আমি আবার উধাও হয়ে যাব। আপনারা আর এ বাড়িতে রাখতে না চাইলে বলুন আমি এক্ষুণি চলে যাবো। আমায় যদি কোনো শাস্তি দিতে চান দিতে পারেন। আমি মাথা পেতে নেব।’ ছেলের এত জেদ দেখে অবাক হলো সবাই। অনেকেই অনেক কথা বলতে চাইলো। পারলো না। রায়বাবুর কথার মাঝখানে কেউ-ই কথা বলার সাহস পেল না। তিনি বললেন,’তুমি এ বাড়িতে থেকো অসুবিধা নেই। তবে কাজের ছেলে হয়ে নয় আমার নিজের সন্তান হয়ে থেকো। আজ থেকে আর কোনো কাজ করতে হবে না।’
‘তা আমি পারবো না। আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো। পরিশ্রম না করে কিছু পেতে চাই না।’
‘ আহ্! এখন কি তোমার পরিশ্রম করার বয়স? কাল থেকে তুমি সাথীর সাথে স্কুলে যাবে।’
সবুজকে কিছুতেই রাজি করানো গেল না। একে একে সবাই নিজের কাজে চলে গেলে। রায়বাবু অনেক বুঝিয়েও ব্যর্থ হলেন। কি করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। ছেলেটা যা জেদি তাতে কোনো কথাই শুনবে না সে। তাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে এলেও সেখানে থাকবে না। ঠিক ভেগে যাবে। তারপরের ঠিকানা কি হবে কেউ-ই জানে না। ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। তার চেয়ে বরং যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। ভালো থাকবে। নিজের মতো থাকুক। যখন মন চাইবে তখন না হয় চলে যাবে। কিন্তু সবুজের বাবা যদি সবকিছু জানতে পেরে যায়? তাঁরা সবকিছু জেনেও সবুজকে তাঁদের বাড়িতে আটকে রেখেছে। এ তো অন্যায়! তাঁরা চাইলে থানা পুলিশ করতে পারে। না, ভয়ের কিছু নেই। সবুজ তো রয়েছে। সে কখনই মিথ্যা কথা বলবে না। তাঁরা কেউ-ই জোর করে রাখেনি।
সবুজের পরিচয় জানার পর তাঁর প্রতি সকলের আদিখ্যেতা একটু বেড়ে গেছে। যা একদমই পছন্দ করছে না সে। একটু বেশি বেশি মনে হচ্ছে। বাড়িতে সকলই পূর্বের মত কথা বললেও সাথী একবারের জন্যও কথা বলেনি। কোনো কারনে তার রাগ হয়েছে। কাছাকাছি আসছেও না। তাকে দেখতে না পেয়ে বুকের ভেতর কেমন হচ্ছে। বিকেলের দিকে যখন সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তখন সবুজ গুটিগুটি পায়ে তার ঘরে গিয়ে পৌঁছলো। বই খাতা খুলে কি সব করে যাচ্ছে। তাকে দেখতে পেয়েও কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে নিল। কাছে আসতে বলল না। খারাপ লাগল সবুজের। নিজে এগিয়ে গিয়ে সাথীর পাশে বসল। তবুও কোনো কথা বলল না। বইয়ের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গেল। সবুজ মজা করে তার বই খাতা বন্ধ করে দিল। আদুরে কন্ঠে বলল,’কি হয়েছে তোমার? তুমি আর আমার সাথে কথা বলো না কেন? সামনে এসেও এড়িয়ে যাও।’
‘তাতে তোমার কি?’
‘এইটুকু মেয়ে তো এত রাগ করো কেন?’
‘আমি রাগ করলাম কি না করলাম তাতে তোমার কি?’ সাথীর এমন ছোট্ট মেয়ের মতো হাত নাড়ানোর ভঙ্গি কথা বলার ভঙ্গি বেশ ভালোই লাগলো সবুজের। সে খুব হাসলো। হাসতে হাসতে বলল,’এত রেগে আছো কেন? কেউ বকেছে তোমায়?’
‘কেউ বকেনি। কিন্তু তুমি আমায় অনেক মিথ্যা কথা বলেছো।’
‘মিথ্যা কথা!’
‘হ্যাঁ মিথ্যা কথা। তুমি আমায় মিথ্যা বলেছো। তোমার বাবা রয়েছেন মা রয়েছেন একটা গোটা পরিবার রয়েছে। আর তুমি আমাদের কাছে সবকিছু লুকিয়েছো। এ মিথ্যা না বুঝি! তুমি একটা মিথ্যাবাদী। যাও এখান থেকে। আর আসবে না।’
‘আমি মিথ্যা বলি না। তাই তো এতদিন কাউকে কিছু বলিনি।’
‘তা বলে আমায়ও কিছু বলবে না! কতবার তোমায় জিজ্ঞেস করেছি। বললে কি এমন অসুবিধা হয়ে যেতে?’
‘বললেই বা কি সুবিধা হতো?’ সবুজের পাল্টা জবাব দ্রুত পেয়ে সাথী চুপ করে গেল। চোখ পাকালো। শান্ত হয়ে কন্ঠস্বরে মৃদু ভাব এনে বলল,’এই বোকা ছেলে তুমি বোঝ না আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে। তবুও আমায় কেন সব কিছু বল না?’ চমকে উঠলো সবুজ। তার পছন্দের কিশোরী তাকে পছন্দ করেছে। এ যে অপ্রত্যাশিত। কত মেয়ে তার রূপের প্রশংসা করেছে‌ কিন্তু কেউ এমন মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভালোলাগার কথা বলেনি। সবুজ তার দিকে তাকালো। সাথী তার দিকে তাকিয়ে লজ্জামাখা মুখে মিটিমিটি হাসছে। কৃত্রিম আলো মুখে পড়ে মুখখানা লাবণ্যে ভরে গেছে। নবকিশলয় মুখ দুটি হঠাৎ করে কথা হারিয়ে ফেললো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা অতিক্রম করে সাথী বলল,’তুমি বাড়ি গেলে না কেন? তোমার বাবা মা কষ্ট পাবে না বুঝি? তোমার মা এক কাঁথার নীচে থেকে তোমাকে বড়ো করলেন।আর বড়ো হতেই তুমি তাদের ছেড়ে চলে আসলে? একবারও তাঁদের কথা ভাবলে না? এ কিন্তু অন্যায়।’
‘আমি অন্যায় করিনি। বাবা বলেছিলেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। বেরিয়ে এসেছি।’
‘তিনি রাগ করে বলেছিলেন। তা বলে তুমি সত্যি সত্যি চলে আসবে? তুমি সত্যিই বোকা গো।’ সবুজ ভাবলো সত্যি কি সে অন্যায় করেছে? সে তো অন্যায় করতে পারে না। আজ পর্যন্ত ভুলবশত কিংবা কোনো উপায় না থাকায় হয়তো দু-একটা ভুল কিংবা অন্যায় করেছে। কিন্তু জেনে বুঝে কখনো করেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসাও অন্যায় নয়। প্রথমত বাবা বলেছেন বেরিয়ে যেতে দ্বিতীয়ত নিজের ভালোলাগাকে গুরুত্ব দিয়েছে।নিজের ভালোলাগাকে গুরুত্ব দেওয়া কখনো অন্যায় হতে পারে না বরং তা গর্বের। কারণ পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষই নিজের ভালোলাগাকে গুরুত্ব দেয় না। আর সে তা করতে পেরেছে। সাথী গা ঘেঁষে বসলো। হাসিমুখে বলল,’তুমি বাড়ি না গিয়ে আমার একটা উপকার করেছো।’
‘কি উপকার?’
‘এই যে তোমায় সবসময় কাছে দেখতে পাবো। তোমাকে দেখতে ভালো লাগে।’ ছটফটে কিশোরীর কথা শুনে খুব লজ্জা পেলো সবুজ। মাথা নিচু করে রইল। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কটা দৃঢ় হয়ে উঠল। একে অপরের প্রতি আকর্ষণ বাড়লো। কারণে অকারণে বহুবার দুজনে কি সব কথা বলে যায়। যার কোনো অর্থ নেই। বলতে হয় তাই বলে। কথায় কোনো মাধুর্যতা নেই অথচ শুনতে ভালো লাগে। আপনাআপনি কথার ছন্দ চলে আসে। সাথীর বেশ কয়েকজন প্রাইভেট শিক্ষক থাকলেও মাঝে মধ্যে সবুজের কাছে পড়তে বসে। কত সুন্দর ভাবে সবকিছু বুঝিয়ে দেয় সে। তার মধ্যে আলাদা একটা জেদ আছে। যা সব কিছুকে হার মানাতে সক্ষম।

সামনের মাসে রায়বাবুর জন্মদিন। ওইদিন রায় পরিবারে ঘটা করে উৎসব হয়। তার আগে বর্ণালী দেবী বেনারসে গিয়ে পূজা দিয়ে আসেন। এমনটা বছরের পর বছর হয়ে আসছে। ব্যতিক্রম নেই। তবে এবার রায়বাবু আর সাথী গেল না। প্রত্যেক বছর স্বামী-স্ত্রী আর ছোট মেয়ে যায়। কিন্তু এবার তা হলো না। রায়বাবু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। সাথীর পরীক্ষা রয়েছে। তাই তাকে যেতে দেওয়া হলো না। বর্ণালী দেবী বড়ো মেয়ে রুপাকে নিয়ে যাত্রা করলেন। বাড়িতে দুটো মানুষের অনুপস্থিতি ভালোভাবে বোঝা গেল। সাথী একা হয়ে পড়লো। পড়াশোনা বাদে দিনে বেশিরভাগ সময় সবুজের সঙ্গে থাকে। মাত্র ক’দিনের মধ্যে বড্ড অগোছালো হয়ে পড়েছে। জামাকাপড় তো কেউ পরিষ্কার করে দিয়েছে। কিন্তু শরীর! তা কেউ পরিষ্কার করে দেয়নি। ধুলো ময়লা জমা হয়ে কালো কুণ্ডলী আকারে দাগ পড়েছে। মায়ের অভাব বোঝা যাচ্ছে। বড্ড অগোছালো সে। সারা দিনে একবারও মাথায় চিরুনি দেয় না। গায়ে হাতে তেল মাখে না। চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। মার আর বড়দিদির ছাড়া কারোর কথা শোনে না সে। কারোর প্রতি সামান্য ভয়ও নেই। আর দুজনেই বাড়ি থেকে চলে যাওয়ায় সে যেন হাতের কাছে স্বর্গ পেয়েছে। যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। এই কদিন রোদে ঘুরে ঘুরে গায়ের রং রাঙ্গা করে ফেলেছে। মেজদি কত বকুনি দিল কিন্তু তাতে কিছু হলো না। বিড়ালের মতো গা ঝেড়ে মুখ ভেংচি কেটে চলে গেল। সে খুকি হয়ে উঠেছে। অবোধ খুকি!
সদ্য বিকালে ঘুম থেকে উঠেছে সবুজ। সূর্যি মামা তখনো বিদায় নেয়নি। তবে শীতল ভাব চলে এসেছে। বেশ কয়েকদিন হলো শীত পড়েছে। পূজোর পূর্বে শীতের আগমন পরিবেশ ও শরীর দুটোকেই স্বস্তি দিচ্ছে। বিছানার উপর পা মুড়ে বসে কিছু ভাবছিল। এমন সময় দরজায় শব্দ হলো। ঘুরে দেখল সাথী চুপিচুপি দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে আসছে। হাতে আয়না চিরুনি আর দুটো কালো ফিতা। তার নবমোহিনী মুখে দেবহাসি। তার চলার ধরন দেখে না হেসে পারা যায় না। তার বর্তমান অবস্থায় ভয়ানক। মাথার চুলগুলো এলোমেলো আর নোংরা জট পাকানো। হাত পা সাদা হয়ে গেছে। যেখানে সেখানে চামড়া কুঁচকে গেছে। গলায় কালো ময়লা জমেছে। তাতেও তাকে সুন্দরী লাগছে। খপ করে পৌঁছে সবুজের পাশে বসলো। মুখ টিপে বলল,’এই বোকা ছেলে! আমার চুল গুলো বেঁধে দাও না!’ তার হাতে থাকা জিনিসগুলো সবুজের দিকে বাড়িয়ে দিল। কোনো জবাব পাওয়ার আগেই সে সবুজের দিকে পিঠ করল আর মুখ দেওয়ালের দিকে। বলল,’বেঁধে দাও!’
‘এমনই ঠিক আছে। বাঁধার কি দরকার?’ একটু হেসে বলল।
‘ভালো লাগছে না। আমায় দেখে সবাই হাসছে। মাথাও ব্যথা করছে।’
‘কাজল দিদির কাছে যাও। সে ভালো করে বেঁধে দেবে। আমি তো এমন কাজে অভ্যস্ত নই।’
‘তার কাছে গেলেই আমার শুধু খুঁত ধরবে। আমার মধ্যে এত ভালো গুণ রয়েছে সেগুলো সে খুঁজে পাবে না।শুধু বদ অভ্যাস গুলো খুঁজে বার করবে। দিদি না খুব খারাপ।’
মুখ টিপে হাসলো সবুজ। তার কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,’বদ অভ্যাস গুলো বাদ দিলে আর খুঁত ধরবে না। ভালো মেয়ে হয়ে যাও।’
‘তুমিও না সত্যি! এত ভাবতে হবে না চুল বেঁধে দাও তো।’ সবুজ সম্পূর্ণ সাথীর গা ঘেঁষে বসলো। তার মাথায় একবার চিরুনি বুলিয়ে বুঝলো মাথার যা অবস্থা তাতে চিরুনি বোলানো সম্ভব নয়। তেল দিতে হবে। সাথী ছুটে গিয়ে মায়ের ঘর থেকে নারকেল তেল নিয়ে এল। সবুজ এক দক্ষ মাথা বাঁধুনির মত মাথায় সুন্দর করে তেল মাখিয়ে দুই দিকে ঝুঁটি করে চুল বেঁধে দিল। সাথীর মুখে তৃপ্তির হাসি। চট করে সবুজের হাত থেকে আয়না ছাড়িয়ে নিজের মুখ দেখলো। ঝুঁটি টান দিয়ে দেখলো বেশ আঁটোসাটো করে বাঁধা হয়েছে। কপাল এখন একটু বেশি চওড়া হয়ে গেছে। মায়ের মতো অত সুন্দর বাঁধতে পারেনি তবে অসুন্দরও নয়। তার দিকে মুখ করে বসলো। বলল,’তুমি এত ভালো চুল বাঁধতে কি করে শিখলে? তোমার মা বুঝি শিখিয়েছেন?’
‘না।’
‘তাহলে নিজে থেকে শিখেছো?’
‘না।’
‘এই বোকা ছেলে শুধু না না বলছো কেন?কে শিখিয়েছেন সেটাতো বলবে?’
‘‌সংকেতের বাবা।’
‘এই সংকেত আবার কে গো? আগে তো কখনো তোমার মুখ থেকে নামটা শুনিনি। মুখে বারবার কথা রেখে দিচ্ছ কেন?’
‘ওই যে…। আমার যে বন্ধুকে কথা দিয়ে আমি পড়াশোনা ছেড়েছি….। তোমাদের পরিবারে মতো আমাদের পরিবারে এত ঘনিষ্টতা নেই। একে অপরের থেকে দূরত্বটা অনেক। আমাদের বাড়িতে সবাই টাকা সম্মান আর কাজ নিয়ে পড়ে থাকে। কারোর ভালোলাগায় খারাপলাগায় কিছু যায় আসে না। ছোটোবেলায় আমার মাথায় অনেক বড়ো বড়ো চুল ছিল। আমি একটু তাড়াতাড়ি স্কুল যেতাম। ওই সময় মা সময় পেতেন না আমার চুল বেঁধে দেওয়ার জন্য। পেলেও প্রায় সময় অনীহা প্রকাশ করতেন। তাই আমি জামা প্যান্ট পরে বইখাতা নিয়ে বন্ধুর বাড়ি চলে যেতাম। ওর বাবা ওকে তৈরি করে দিতো আর আমায় চুল বেঁধে দিতো। প্রায় দিন এমন হতো। তিনি আমায় শুধু চুল বাঁধা নয় আরও অনেক বাড়ির কাজ শিখিয়ে দিয়েছেন।’ কিশোরীর মনে সবুজের আক্ষেপ ধরা পরল না। তার অভিমানটা বুঝলো না। তার বলা এতগুলো বাক্য ব্যর্থ হয়ে গেল। সে অন্য কিছুতে মজা পেয়েছে। তার আবেগকে একফোঁটাও গুরুত্ব দেয়নি। সে হেসে বলল,’তোমার ছোট বেলায় মেয়েদের মতো মাথায় বড়ো বড়ো চুল থাকতো? তা আবার ঝুটি করে বাঁধতে?’ সে হাসলো। খুব হাসলো। সবুজ না চাইতেও তার হাসিতে হাসি মেলালো। খাট থেকে নেমে দাঁড়ালো। প্রসন্ন হাসি বিনিময় করে বলল,’আসি কেমন! প্রাইভেট পড়তে যাব।’ চটপট ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল‌ সাথী। তাকে ডেকে ফিরালো সবুজ। সমস্ত শিক্ষকরা বাড়িতে পড়াতে আসেন। তাহলে আজ বাইরে পড়তে যাচ্ছে কেন? মিথ্যা কথা বলে কি কোথাও যাচ্ছে? এই মুহূর্তে মিথ্যা বলাটা খুববেশি অসম্ভব নয়। কিছু তো একটা সমস্যা রয়েছে।
‘তাড়াতাড়ি বল কি বলবে? আমাকে আবার অতদূরে যেতে হবে।’
‘বাইরে কেন পড়তে যাবে? মাস্টারমশাই বাড়িতে আসবেন না?’
‘উনার ছেলে অসুস্থ তাই বলেছেন কয়েকদিন যেন আমি তাঁর বাড়িতে পড়তে যাই।’
‘এই অবস্থা যেও না। শরীরের অবস্থা দেখেছো? ধুলো ময়লায় ভর্তি হয়ে আছে। ভালোকরে পা হাত ধুয়ে তেল মেখে বাড়ি থেকে বের হও। রাস্তায় অনেক লোক আছে দেখলে হাসবে তো।’
‘কে ধুয়ে দিবে আমার পা হাত?’ করুন কণ্ঠস্বর মিলল সাথীর গলায়। সবুজের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে কি আদৌ চৌদ্দ বছরের কিশোরী? দেখে তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তার ব্যবহারে বয়সের ছাপ নেই। সে তো খুকি। ছোট খুকি। বড্ড ছোট খুকি। মা ছাড়া সম্পূর্ণ অচল। সবুজ তাকে কুয়োর কাছে নিয়ে গেল। সাথীকে পিঁড়ি উপর দাঁড়াতে বলল। বাধ্য খুকির মতো দাঁড়াল সে। সবুজ ঘটিতে জল এনে তার পায়ে দিল। পায়ে হাত দিতেই খিলখিল করে হেসে উঠলো সাথী। সে-ই হাসি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পরলো। বারবার প্রতিধ্বনি হল। সবুজ বিরক্ত হলো না। হাত-পা রগড়ে ধুয়ে দিল। তার নবকুমারী মুখের হাসি মুগ্ধ করলো। পা-হাত-মুখ পরিষ্কার করে দেওয়ার পর সাথী সবুজের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো। অবাক হলো। দ্রুত পা সরিয়ে বলল,’ও মা! আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে কেন?’
‘বা রে! প্রণাম করবো না! তুমি না আমার থেকে বড়! বড়রা ছোটদের পা ছুঁলে ছোটদেরকে বড়দেরকে প্রণাম করতে হয়।’ এই বালিকা কথায় বেশ পটু। সঠিক শিক্ষা পেয়েছে। উপস্থিতি বুদ্ধি বেশ প্রখর। কোথায় কি বলতে হবে করতে হবে তার সম্বন্ধে বেশ বিজ্ঞ। আবার ঘরে ফিরে এসে সবুজ নিজের হাতে তাকে তেল মাখিয়ে দিল। পরিপাটি করে সাজিয়ে দিলো। মুহূর্তগুলো কত আনন্দময় হয়ে পার হলো তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বুকের মধ্যে নবজাগরণের ফুর্তি জেগে উঠলো। উৎফুল্লতায় ভরা হৃদয় কেঁপে উঠলো। এমন সময় এই বালিকা হঠাৎ করে বড় অদ্ভুত আচরণ করল। খপ করে সবুজকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,’এই বোকা ছেলে তোমায় খুব ভালবাসি গো। আমাকে তোমার কাছে রাখবে? খুব ভালোবাসবো তোমায়।’ পছন্দের মানুষের কাছে এমন কথা শুনতে কার না ভালো লাগে! আনন্দ বিস্ময়ে কৌতুকে চোখ ছলছল করে উঠলো। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। সাথী এখন সম্পূর্ণ তার দেহের সাথে আবদ্ধ হয়ে আছে। তাকে জড়িয়ে রেখেছে। ছাড়তে চাইছে না। এই নির্জন জায়গায় দুজনে একা। সম্পূর্ণ একা! কেউ কোথাও নেই। এইভাবে থাকুক না তাকে জড়িয়ে ধরে। ছাড়তে চায় না সে। সাথী আবার গুনগুন করে বলল,’বল, তুমি আমায় ভালোবাসো কিনা?’ এই কিশোরীকে হৃদয় থেকে তুলে দিতে পারল না। সেও লজ্জা কিংবা অন্য কোনো কারণে মুখ তুললো না। সে-ই প্রথম দিন থেকেই সাথীকে ভালো লাগে। তাকে ভালোবাসে অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল। বলার সাহস হয়নি। এই মেয়েটা যে বড়ো অবোধ। কিছু বোঝে না। খুকির মতো আচরণ করে। তবে আজ আর পারলো না। মনের গোপন কথা আর লুকিয়ে রাখলো না। আলতো করে তার মাথায় হাত রেখে বলল,’আমিও তোমায় ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। সে-ই জন্য বারবার লুকিয়ে চুকিয়ে তোমার কাছে চলে যেতাম। তোমার সাথে কথা বলতেও খুব ভালো লাগে। ভালো লাগে তোমাকে। তোমার ছোট ছোট দুষ্টুমি আবদার গুলো খুব পছন্দ। তুমি ভালো মেয়েও।’ সাথী নিজে থেকে বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। এটুকুতেই তার চোখের কোণায় জল জমা হয়েছে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,’যাবে না তো আমায় ছেড়ে? চলে গেল রাগ করবো কিন্তু। ওই যে রাত আট’টায় একটা সিরিয়াল হয় না, ওখানে বউটার স্বামী যে ভাবে তার বউকে আগলে রেখেছে আমায়ও ওই ভাবেই আগলে রাখবে।’
‘ কিন্তু আমি যদি কোনো দিন বাড়ি না ফিরি, তাহলে তো আমার কোনো বাড়ি থাকবে না। কোথায় থাকবে তুমি?’
‘যেখানে আমায় নিয়ে যাবে সেখানে থাকবো। গাছের তলায় নিয়ে গেলে গাছের তলায় থাকবো।’ সবুজ হালকা হাসলো। মেয়েটা অনেক কিছুই বোঝে আবার অনেক কিছুই বোঝে না। কখনো গ্রাম্য খুকি হয়ে যায় আবার কখনও গ্রাম্য কিশোরী। মন বড়ো চঞ্চলা। বিপরীত মানুষটার হৃদয়ের অনুভুতি বোঝার চেষ্টা করল। দুজনেই ছটফট করছে। সাথীর লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারেছে না। ছুটে পালিয়ে যাবে? না! তাহলে তো সবুজের থেকে দূরে চলে যাবে। যদি সে দরজা লাগিয়ে দেয় তাহলে তাকে দেখতে পাবে না। সে আবার সবুজকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল,’একটা চুমু দি তোমার গালে?’
‘না!’ না এমন ভাবে বললো যে চমকে উঠলো সাথী। বুকে হাত দিয়ে দেখল বুক ধড়পড় করে কাঁপছে। হঠাৎ সে এমন আচরণ করায় ঘাবড়ে গেল। আবার ভয়ও পেলো। তার থেকে সামান্য দুরত্ব তৈরি করে বলল,’ কি হলো? এমনভাবে চিৎকার করে উঠলে কেন?’
‘জানো না, এভাবে চুমু খাওয়া পাপ।’
‘পাপ হতে যাবে কেন? তুমি তোমার বাবা মাকে চুমু দাও না? দাদাকে চুমু দাও না?’
‘ওই সম্পর্ক আর এ সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য অনেক। সবকিছুর মধ্যে সবকিছু মেলানো যায় না। তোমার সামনে যদি এখনই কোনো ছেলেকে নিয়ে এসে বলা হয় চুমু দিতে, তুমি দেবে?’
‘যাকে চিনি না তাকে দিতে যাব কেন?’
‘যদি চিনে থাকো তাহলে কি দেবে?’
‘ওটা নির্ভর করে বিপরীত মানুষটা কেমন। শুধু শুধু দিতে যাব কেন?’
‘আমি এটাই বোঝাতে চাইছি। আমাকেও এখন সম্পূর্ণ চেনোনি। আমাকে বিয়ে করো তারপর চুমু খাবে। এখন এসব করলে ঈশ্বর আমাদের দুজনের উপর রুষ্ট হবেন।’ সাথী এবার আর চুপ রইল না। খিলখিল করে হেসে উঠলো। কপাল চাপড়ে বলল,’হায় রে কপাল! কত বোকা তুমি। এত ভয় পাও কেন? সবকিছুতে পাপপূর্ণ নিয়ে ভেবে লাভ কি? ভালো ছেলে হতে চাও? ভালো ছেলে হওয়া ভালো। তবে ভালোর জন্য সব কিছু বর্জন করাটা ঠিক নয়।’ এটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে একটু অবাক হলো বটে তবে খুব তাড়াতাড়ি তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। মেয়েটা কিছুই বোঝে না। মুখে যা আসে তাই বলে যায়। তার কথার মায়ায় পড়ে কোনো ভুল কাজ করা যাবে না। ভবিষ্যৎ এর কথা কেউই জানে না। হয়তো এমন দিনও আসতে পারে যে দিন শুধুই পাপ কাজ করতে হতে পারে। তখন তো পাপের পরিমাণ বেড়ে যাবে। ঈশ্বর ক্ষমা করবেন না। তাই এখন থেকে পাপ কাজ না করাই ভালো। কথাগুলো ভেবে জিভ কাটল। আরও সতর্ক হয়ে চলতে হবে। কোনোভাবে যেন ভুল করে না ফেলে। সবুজ জিভ কামড়ে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইলো। কপাল আর বুকে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো। এমন ঘটনা দেখে মোটেও হতভম্ব হলো না সাথী। উল্টে হাসলো। ছেলেটা বড্ড ভীতু। খুব দেখেশুনে সতর্কভাবেই জীবন যাপন করে। একগাল হেসে বলল,’ঠিক আছে চুমু খাব না।’ কন্ঠস্বর কেমন যেন রুগ্ন। সবুজ বুঝলো রাগ করেছে। তবুও তার কথায় রাজি হলো না। তার যে ভয় করে। স্কুলে মাস্টারমশাই বলেছিলেন যদি সৎ পথে চলো তাহলে জীবনে সবকিছু পাবে। তোমার সব ইচ্ছা একদিন পূর্ণ হবে যদি পাপ কাজ না কর। অন্যায় না করো। তাই সে কখনো কোনো অন্যায় কিংবা পাপ কাজ করে না। আবার অনেক বই পড়ে জেনেছে, পাপের শাস্তি অনেক সময় নিজের প্রিয়জনের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। ঈশ্বর প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়ে তাকে দগ্ধে দগ্ধে মারে। প্রিয়জন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। তার জন্য কারোর ক্ষতি হোক সে চায় না। সে সাথীকে কাছে টেনে নিল।বলল,’তুমি মাথার ঝুঁটি খুলে ফেলো আমি আবার বেঁধে দেব। কিন্তু এমন আবদার কর না। তা আমি কখনো পারব না।’
‘আমি রাগ করিনি বোকা ছেলে। তুমি যেমনটা চাও তেমনটা হবে।’
‘তাহলে কপালে একটা কালো টিপ বসিয়ে নাও। সুন্দর লাগবে।’
‘আমি বুঝি সুন্দর না?’
‘সুন্দর তো। আরও বেশি সুন্দর লাগবে তোমায়।’ সাথী চোখ টিপে হাসলো। বেশিক্ষণ সেখানে রইল না। মায়ের ঘরে চলে আসলো। কপালে ছোট্ট কালো টিপ বসিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখে হাসলো। সত্যি সুন্দর দেখাচ্ছে। গুটি গুটি পায়ে হাসিমুখে মাস্টারমশাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজ তাকে বেজায় খুশি দেখাচ্ছে। খুশিতে মত্ত রয়েছে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে কিছুতেই পড়াতে মন বসাতে পারল না। বারবার নানা ধরনের প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিচ্ছে। মাস্টারমশাই বেশ কিছুক্ষণ পড়ানোর পর বুঝলেন আজ ছাত্রীর পড়ায় একদম মন নেই। কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। এতে কোনো নতুনত্ব নেই। মাঝেমধ্যে সবার ক্ষেত্রে এমন হয়। অনেক সময় মাথায় অনেক চিন্তা থাকলে আবার অনেক সময় অনেক খুশি থাকলে এমনটা হয়। মাস্টারমশাই ঠিক বুঝতে পারলেন না সাথীর মন কি চাইছে? কি ভাবছে সে? তিনি শান্ত গলায় বললেন,’কিছু হয়েছে তোমার? এত অমনোযোগী দেখাচ্ছে কেন?’
‘কই কিছু না তো।’ তার কথার ধরনটা একটু কেমন কেমন লাগলো। প্রতিদিনের মত স্বাভাবিক নয়। বাইরে থেকে অনেক খুশি আছে ভেতরেও অনেক খুশি। তবে কোনো ব্যাপার নিয়ে মনে অনেক দ্বিধা জন্মেছে। বুঝতে পারছে না কোনটা ঠিক কোনটা ভুল। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন,’বলো কি হয়েছে? মাস্টারমশায়ের কাছে কিছু লুকোতে নেই। আমি চেষ্টা করব সমাধান করার।’ মাস্টারমশাই ভরসা যোগাতে একটু সাহস পেলো সাথী। বলল,’জীবনে পাপপূর্ণ বলে কি আদৌ কিছু রয়েছে? পাপ কাজ করলে ঈশ্বর কি সত্যিই আমাদের শাস্তি দেন? পাপ কাজ করলে কি জীবনে অনেক অপূর্ণতা থেকে যায়? জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা কিছু করার আগে কি ভাবা উচিত?’ হঠাৎ করে এত সুন্দর এবং অনেকগুলো প্রশ্ন শুনে অবাক হলেন। মেয়েটার হলো কি? এই বয়সে তো এমন প্রশ্ন মাথায় আসার কথা নয়। বয়স বাড়লে মস্তিস্কের বিকাশ হলে সাধারণত এমন প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে উঠে। আর এর উত্তর বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন। তবে সাথীকে আশাহত করলেন না। এত দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বললেন,’তুমি যে সমস্ত প্রশ্ন করলে তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হবে ‘অবশ্যই।’ তবে একটা কথা কি জানো, জীবনে‌ প্রতিটা কাজের পূর্বে সতর্কভাবে চললে কিংবা ছোটখাটো যে কোনো মুহূর্তের পূর্বে দশবার ভাবলে জীবনে ভুলের পরিমাণ খুব কম হবে। কিন্তু জীবনে কখনো সুখ খুঁজে পাবে না। জীবনকে নিজের মত করে সাজিয়ে গুছিয়ে কিন্তু জীবনে সুখ পাওয়া যায় না। জীবনে সুখ খুঁজতে হলে মুহূর্তগুলোকে ভালোবাসতে হয়। শুধু ভালো নয় খারাপ মূহুর্ত গুলোকেও আপন করতে হয়। জীবনে সব সময় মস্তিষ্ক কি বলছে তা শুনতে নেই -মাঝেমধ্যে মনের কথাও শুনতে হয়। তাই তো হঠাৎ মৃত্যু কখনো তৃপ্তি এনে দেয় আবার কখনো আনন্দ। আমরা সবাই মৃত্যুর লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ‌কার কখন ডাক পড়বে জানি না। ডাক পড়লেই ছুটি। মন আর মস্তিষ্ক উভয়কেই পরিস্থিতি সাপেক্ষে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আজ রায়বাবুর জন্মদিন। উৎসবে মেতে উঠেছে রায় পরিবার। পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে। রঙ্গিন রঙ্গিন অসংখ্য আলো টাঙ্গানো হয়েছে। সন্ধ্যা হতেই সেগুলো জ্বলে ওঠায় বিশাল বাড়ি আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। এই আনন্দ শুধুমাত্র রায় পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা কুসুমগঞ্জের জন্য আনন্দের এক মুহূর্ত। এখানকার আদিবাসী হতদরিদ্র মানুষগুলো তৃপ্তি করে ভালো-মন্দ খাবারের সুযোগ পায়। বিকালে রায় পরিবারের পক্ষ থেকে বস্ত্র শুকনো খাবার আরও নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছু দান করা হয়। এই সুযোগ একজন কিংবা দুইজন নয় সমস্ত দরিদ্র আদিবাসীরা পায়। সাহায্য সামান্য হলেও দরিদ্র মানুষদের কাছে অনেক বড়। এবারের জন্মদিন আরও বেশি উত্তেজিত মুহূর্ত তৈরি করেছে। রায়বাবু অসুস্থ। তিনি নিশ্চয়ই উনার সমস্ত সম্পত্তি ও সোনার সংসারের পরবর্তী মালিক কে হবে তা নির্ধারণ করে যাবেন। আগে থেকে যদিও কোনো কানাঘুষো হয়নি তবে অনুমান করা যায়। কারণ যুগ যুগ ধরে এমনটা হয়ে আসছে। জমিদারি প্রথা এখন আর নেই। তবুও কেন এখানকার সাধারণ মানুষ এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে? অবশ্যই অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমান সমাজের নিয়ম অনুযায়ী বাবার সমস্ত সম্পত্তি ছেলেমেয়ের সমান ভাবে পাওয়ার কথা। কিন্তু রায় পরিবারে তা হয় না। সমস্ত সম্পত্তি পায় একজন এবং তিনি সবকিছু দেখাশোনা করেন। যা সমাজের বহু মানুষের চোখে বড্ড দৃষ্টিকটু তবুও রায় পরিবার যুগ যুগ ধরে একই ধারা মেনে আসছে। কোনো ব্যতিক্রম নেই। এদের প্রচুর পরিমাণে জল জমি, পুকুর, বাগানবাড়ি রয়েছে। আর অধিকাংশ জলজমি এবং পুকুরে এখানকার অধিবাসীরা ভাগে চাষবাস করে থাকে। তাদের কথাও সবসময় মাথায় রাখতে হয়। আশেপাশে গ্রামে কেউ ভাগ জমিতে চাষ করলে বিঘাপ্রতি মালিকে চার মণ ধান দিতে হয়। সেখানে রায়বাবু নেন মাত্র দুই মণ। ব্যাংক থেকে লোন নিলেও সুদ দিতে হয়।আর রায়বাবুর কাছ থেকে টাকা ধার নিলে তা সময়মতো ফেরত দিতে হয় -সুদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। খরা প্রবণ অঞ্চল হওয়ায় প্রকট জলের সংকট দেখা যায়। এখানে সরকার যত না নলকূপ কিংবা কুয়ো তৈরি করেছে তার চাইতে বেশি নলকূপ আর কুয়ো রায়বাবু নিজের টাকায় তৈরি করেছেন। অথচ এর জন্য তিনি কখনও অহংকার করেননি। নিজের অনেক কিছু রয়েছে, তা দিয়ে যদি সাধারণ মানুষের কিছু সুবিধা করতে পারেন তাতে তিনি ঈশ্বরের প্রশংসা পাবেন। ঈশ্বরের কাছে অহংকার করে বলতে পারবেন তিনি অতটা খারাপ মানুষ ছিলেন না। রায়বাবুর সকলের প্রতি এমন দয়ালু মনোভাবের জন্য তিনি কিছু মানুষের কাছে দেবতা হয়ে আছেন। মানুষটাকে কেউ অসম্মানের চোখে দেখে না। সবাই শ্রদ্ধা করে। উনাকে মেনে চলে। জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও আজও একটা ছাপ পড়ে রয়েছে এই পল্লী গ্রামে। তাইতো আদিবাসী মানুষগুলো এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এর পরবর্তী মালিক কে হবে? সেও কি রায়বাবুর মত দয়ালু হবে? যদি না হয় তাহলে কিছু করার নেই। কারণ তারা কোনো কর দেয় না। সমস্ত সম্পত্তি তাঁদের। তাঁরা চাইলে যা খুশি তাই করতে পারে। তার উপর কোনো অধিকার নেই। রাতে খাওয়ার পূর্বে সামান্য অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে। নাচ গান এবং পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌ নৃত্য……। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী মানুষগুলো অনেক আগেই চলে এসেছে। তারা সাজগোজ করছে।কয়েকটা ছোট বড়ো কাঠের বাক্স সাজিয়ে যাত্রার সময় যেভাবে স্টেজ করা হয় ওই ভাবে স্টেজ করা হয়েছে। দর্শকেরও অভাব নেই। অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। কাজলের নাচ গানের প্রতি ভালোবাসা ভীষণ। সে সামনে নিজের মতো করে একটা জায়গায় নিয়ে বসে গেছে। তার আবার একা বসতে মন চায় না। তাই পাশে সবুজকে বসিয়েছে। আজ তার কোনো কাজ নেই। শুধু সে নয় কমলারও কোনো কাজ নেই। বাড়িতে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে বাইরে থেকে লোক কাজ করতে আসে। অনুষ্ঠানের দিন বাড়ির লোকেরা কাছ থেকে মুক্তি পায়। তারা সবার সঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ পায়। সেও বড্ড কৌতুহলী হয়ে আছে। বিরক্ত হচ্ছে না। আজ পর্যন্ত বইয়ের পাতায় ছৌ নৃত্য কথা শুনে এসেছে কিন্তু আজ চোখের সামনে তা দেখতে পাবে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে গল্প করল কাজলদির সাথে। কিছুক্ষণ পর লক্ষ করল কেউ থামের আড়াল থেকে তাকে ডাকছে। চিনতে অসুবিধা হলো না। সাথী তাকে ডাকছে কেন? সকাল থেকে তার দেখা সাক্ষাৎ নেই। একবারের জন্যও কাছে আসেনি। বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধবীদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছে। তীব্র আনন্দে মত্ত আছে সে। তাতে সবুজের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ছোট মেয়ে নিজের মতো আনন্দে থাকুক না। কোনোরকম অভিমান জন্মায়নি। সে দৌড়ে সাথীর কাছে হাজির হলো। আজ সে মায়ের একটা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে। বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। মিটিমিটি করে হাসছে। তার থেকে সহজে চোখ ফেরাতে পারল না। কিন্তু সবুজের মনে একটা ভাবনা উদয় হলো। সাথী মায়ের এত বড়ো শাড়ি তার ছোট শরীরে কোথায় জড়িয়েছে? এটুকু তো শরীর,তাতে বারো হাত শাড়ি জড়িয়েছে! মেয়েদের কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বিশেষ করে নিজেদের সাজগোজের ক্ষেত্রে। একটু অবাক করে সাথী তার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে ছুটে পালালো। পূর্বের জায়গায় গিয়ে কাগজটা খুলে দেখবে ভাবছিল। পরে নিজের সিদ্ধান্ত বদলালো। যদি খারাপ কিছু থাকে। তাহলে কাজলদি সাথীকে বকুনি দেবে। এখানে লুকিয়ে খোলাই শ্রেয়। কাগজ খুলে দেখলো কাটা কাটা অক্ষরে লেখা ‘এই বোকা ছেলে তোমায় আমি ভালোবাসি।’ হাতের অক্ষর চিনতে অসুবিধা হলো না। হেসে উঠলো। মুখ ফিরে দেখল সাথী দৌড়ে চলে গেলেও পালিয়ে যায়নি। থামের আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখছে। চোখে চোখ পড়তেই চোখ টিপে হাসলো সাথী। রঙ্গিন আলোয় মুখখানা ভারি দেখাচ্ছে। এবার সত্যি সত্যি পালিয়ে গেল। সবুজের হৃদয় উৎফুল্লতায় ভরে উঠলো। এই আনন্দের মুহূর্তে যে তাকে মনে পড়েছে সেটাই অনেক। দুঃখের সময় তো অনেকে মনে পড়ে কিন্তু সুখের সময় কয়জনকে মনে পড়ে? সে আবার কাজলের পাশে গিয়ে বসল। রাতের অনুষ্ঠান এবং খাওয়া-দাওয়া পর্ব গোছাতে প্রায় এগারোটা পেরিয়ে গেল। একে একে সারা বাড়ি ফাঁকা হল। রায়বাবু নিজের ঘরে সকল আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারের সদস্যদের ডেকে পাঠালেন। সকলের উপস্থিতিতে তিনি ঘোষণা করলেন, এই বাড়ির পরবর্তী মালিক তাঁর পুত্রবধু অর্চনা। তিনি সমস্ত কাগজপত্র আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিলেন। সমস্ত কিছু অর্চনার হাতে তুলে দিলেন। সে মাথা পেতে সবকিছু নিল। ধৈর্য এবং সৎ পথে সমস্ত দায়িত্ব পালন করার প্রতিজ্ঞা করলো। সবাই আশ্চর্য হয়ে হয়ে গেল। কাজল ছাড়া কারোর মুখে হাসি ফুটে উঠল না। এমনকি সাথীর মুখেও হাসি হারিয়ে গেল। সেও এমনটা মেনে নিতে পারছে না। এ বাড়ির মহিলারা যে পূর্বে এই বাড়ির মালিক হয়নি তা কিন্তু নয়। বার কয়েকবার এই বাড়ির উত্তরাধিকারী মহিলারা হয়েছে। তবে সে ছিল এই বাড়ির বড়ো কন্যা। কিন্তু এবার তো কোনো কন্যা সন্তান কিংবা পুত্র সন্তান উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচিত হলো না। নির্বাচিত হল অন্য কোনো এক কন্যা। তাই সহজেই সবাই মেনে নিতে পারল না। রুপা রেগে গিয়ে চলে গেল। কেউ বাধা দিল না। কাউকে পাত্তা না দিয়ে রায়বাবু পুত্রবধূকে সবকিছু বোঝাতে লাগলেন। একটা সময় বিরক্ত হয়ে বর্ণালী দেবী সেখান থেকে চলে গেলেন। একে একে জায়গাটি ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু বসে রইলেন রায়বাবু আর অর্চনা। এমন সিদ্ধান্তের পর সন্তানদের মধ্যে যে ঠান্ডা লড়াই শুরু হবে তা তিনি জানতেন। এর জন্য প্রস্তুত হতে বললেন পুত্রবধূকে। সবাইকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে। বোঝাতে হবে। বারবার বোঝাতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ মানুষের হৃদয় জয় করা -তবে অসম্ভব নয়।

পর্ব ৫ আসছে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here