দৃষ্টির অগোচরে দ্বিতীয় অধ্যায়,১২তম_পর্ব,১৩তম_পর্ব

দৃষ্টির অগোচরে দ্বিতীয় অধ্যায়,১২তম_পর্ব,১৩তম_পর্ব
মুশফিকা রহমান মৈথি
১২তম_পর্ব

অন্ধকার কামড়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নুশরাত। কামড়া টি শিক এবং জাল দিয়ে আটকানো। শিকে জং পড়েছে। ফিনাইলের বাজে গন্ধ নাকে আসছে। আশপাশের কোলাহল, আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। আর্তনাদ বাঁচার জন্য, স্বাভাবিক ভাবে বাঁচার জন্য। নুশরাতের ঠিক সামনে দেয়ালে কিছু লিখে যাচ্ছে শিকল বন্দী লোকটি। তার দৃষ্টি স্বাভাবিক নয়। এলোমেলো চাহনী। চুলগুলো বেশ বড় হয়েছে, পরণে ময়লা জামা, হাতের নখগুলো দেয়ালে ঘষতে ঘষতে ক্ষয়ে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে। এই চারদেয়ালের আধারে থাকতে চায় না সে। তার মুক্তি চাই। কিন্তু মুক্তি আদৌ পাওয়া সম্ভব। নুশরাত ধীর কন্ঠে বললো,
“রবিন?”

দেয়ালে লেখা থামিয়ে পেছনে ফিরে রবিন। রক্তবর্ণ চোখগুলো দেখে বুক কেঁপে উঠে নুশোরাতের। এই মানুষটি তার বন্ধু ছিলো বিশ্বাস হচ্ছে না। আগের জেল্লা আর নেই লোকটির মুখে। চোখগুলো গর্তে চলে গেছে। চুলগুলো উসকোখুসকো, দৃষ্টি অগোছালো। ঠোঁটের কোনায় রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। এখানের পরিদর্শকদের থেকে জানতে পেরেছে হুটহাট করেই রবিনের হিংস্রতা বেড়ে যায়। নিজের উপর সংযম হারিয়ে ফেলে সে। তখন নিজের হাত নিজে কামড়ায়, নিজেকে জখম করে। তাকে সামলাতেও ভয় পেয়ে যায় ডাক্তাররা। শুধু একজন ডাক্তার কোনোভাবে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করে। তারপর ট্রাংকুলাইজার দিলে ঘুমিয়ে পড়ে রবিন। এই মেন্টাল এট্যাক এই এক মাসে বহুবার হয়েছে। তার ধাতস্থ হতে বেশ সময় লাগে। গতকাল একই জিনিস আবার হয়েছিলো। যে ডাক্তারটি তাকে শান্ত করে সে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলো না। ফলে অবস্থা প্রচন্ড ভয়াবহ হয়ে উঠেছিলো। একজন নার্স ও আহত হয়েছে। ফলে তাকে শিকল বন্দী করতে বাধ্য হয় ডাক্তাররা। যখন নুশরাত রবিনের সাথে দেখা করার জন্য আবেদন করছিলো সবাই তাকে বারণ করে। রবিন তার উপর আক্রমণ করলে আবারো একটা ঝামেলা হবে। কিন্তু নুশরাতের জিদের কাছে তারাও ব্যর্থ হয়। এখন যখন সে রবিনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে মনের মধ্যে ক্ষীণ ভয় জাগছে। আবার একটা সিদ্ধান্তেও সে আসতে পেরেছে, ইশরার গায়েব হবার পেছনে রবিনের হাত নেই। যে মানুষটা নিজের মাঝেই নেই, সে অন্যের ক্ষতি কিভাবে করবে! রবিন শূন্য চোখে এগিয়ে এলো নুশরাতের দিকে। হাটার সাথে সাথে শিকল মাটিতে ঘর্ষিত হচ্ছে। চিনচিনে আওয়াজ আসছে। শ্লেষ্মাজড়িত কন্ঠে রবিন ধীরে ধীরে বলে,
“অবশেষে তুই এসেছিস? আমি তো ভেবেছিলাম তুই আমাকে ভুলেগেছিস!”
“তুই আমাকে চিনতে পারছিস?”
“আমার স্মৃতি অনেক তুখর নুশরাত। তোর থেকেও তুখর, তুই জানিস এটা, তবুও জিজ্ঞেস করছিস? তোকে আমার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলাটা অসম্ভব। যদি সম্ভব হতো তবে তুই বেঁচে থাকতি না।“

রবিনের দৃষ্টি প্রখর হচ্ছে, তার চোখের দিকে দৃঢ় নয়নে তাকিয়ে আছে নুশোরাত। সেই চোখে আগের রবিনের ছাপ দেখা যাচ্ছে। নুশরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“বাঁচার মতো বাঁচতে দিচ্ছিস কই? প্রতিনিয়ত ভয় হয়, এই বুঝি সব শেষ। ইশরাকে পাওয়া যাচ্ছে না। অজানা মানুষ আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে। তোর মনে হয় আমি বেঁচে আছি?”
“তাহলে তুই ও ভয় পাস?”
“আলবত, এমন কোনো মানুষ নেই যে ভয় পায় না।“
“ঠিক, তবে ভয় মানুষের চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করে। তুই এতোটাই ভয়ের মায়াজালের আকটে গেছিস যে দৃষ্টির অগোচরে কি হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছিস না। তাইতো ইশরাকে না খুজে আমার কাছে এসেছিস। একটা কথা মাথায় গেঁথে নে। ক্ষতি করার থাকলে গত তিন বছরেই করতে পারতাম। আমার আড়ালে যখন আমার বাসার তল্লাশি করেছিলি, তুই কি ভেবেছিস আমি বুঝি নি? তুই জানতি ঈশানী মেয়েটি আমাকে সাহায্য করছিলো খুনগুলো করতে, তবুও আমাকেই ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলি। যাতে মেয়েটি আমাকে দেখে ঘাবড়ে যায়। তোর আমার উপর প্রথম সন্দেহটা পারফিউমের ঐ শপের বাহিরে আমাকে দেখে হয়েছিলো। তোর কি মনে হয় আমি জানতাম না?”

রবিনের কথাগুলো শুনে হতভম্ব হয়ে যায় নুশরাত। রবিন সব জানতো, তাহলে সে তার ক্ষতি করে নি কেনো? এক মিনিট চুপ থেকে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় সে রবিনের দিকে,
“তাহলে আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিলি কেনো?”
“অহেতুক প্রশ্নে সময় নষ্ট করিস না। সেসব এখন অতীত। কেনো বাঁচিইয়েছি তাতে এখনের বর্তমানটা বদলে যাবে না। তবে একটাই কথা বলবো। তোর মনে যে ভয়ের কুন্ডলি পাকছে তা তোর চিন্তাকে হ্রস করে দিচ্ছে। তোর ভয়টা তোকে গ্রাস করছে। নিজের সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলছিস তুই। তোকে ভীত দেখে তোর শত্রু জেতার আগে জিতে যাচ্ছে। আমি যে নুশরাতকে চিনি সে ভীত ছিলো না। মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর, পথ পাবি। খুনী যতই চালাক হোক এ ভুল করে, যেমন আমার ভুল ছিলো। বহু ভুল ছিলো। ভুলগুলো না করলে হয়তো আজ আমার কাহিনীটা অন্যরকম হতো।“

নুশরাত কোনো উত্তর দিলো না। বিনা বাক্যে স্থান ত্যাগ করলো সে। রবিনের বুক চিরেই দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। নুশরাতের সাথে বন্ধুত্বটি প্রতিশোধের জন্যই করেছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্বটা তার হৃদয়ের কোনায় অনুভূতির বীজ বুনতে শুরু করেছিলো। হয়তো সেজন্য তার পশুর হিংস্রতা নুশরাতকে ছুতে পারে নি। হয়তো সেজন্যই নুশরাতের উপর মাহির হত্যার অপবাদ পড়লে খুনের ছুরিটা ডাস্টবিনে ফেলে এসেছিলো সে। রবিনের চোখ থেকে নোনাজলের রেখা গড়িয়ে পড়লো। পশুরও দূর্বলতা থাকে। খুব জগন্য মানুষ ও ভালোবাসতে পারে!

নুশরাত এলোমেলো পায়ে হাটছে এস্যাইলামের করিডরে। এতো মানুষের কোলাহল তার কান অবধি আসছে না। সে শুধু রবিনের কথাগুলোই ভেবে যাচ্ছে। তাইতো একজনের সাথে ধাক্কাও খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায় সে। নিজের স্বম্বিত ফিরতেই দেখে লোকটি তার হাতের ঔষধ গুলো গুছাচ্ছে। ইঞ্জেকশনের ফাইলগুলো ভেংগে গুড়ো গুড়ো হয়ে গিয়েছে। লোকটির মুখে মাস্ক পড়া, তার মুখটি দেখা যাচ্ছে না। খানিকটা লজ্জিত কন্ঠে নুশরাত বলে উঠে,
“সরি, আমি দেখি নি”
“এতো অন্যমনস্ক হলে কখন কোন বিপদে পড়ে যাবেন তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই সাবধান”

বলেই লোকটি উঠে দাঁড়ায়। হনহন করে হেটে চলে যায় সে তার কাজে। লোকটির হাটার সাথে একটি লোকের বেশ মিল রয়েছে। কিন্তু সে কে মনে পড়ছে না নুশরাতের। এখন চিন্তা করার সময় ও নেই। এখন ইশরাকে খুজে পাওয়াটাই আসল। একজন কিশোরীকে ভরদুপুরে কেউ গায়েব করে দিতে পারে না যতক্ষণ না মেয়েটি নিজ থেকে যায়। তার মানে ইশরাকে যে কিডন্যাপ করেছে তাকে ইশরা চিনে। নুশরাত উঠে দাঁড়ালো। তার জামাটা ঝেরে বেরিয়ে যায় এসাইলাম থেকে।

বুড়িগঙ্গা ব্রীজের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তৌহিদ। এখান থেকে ২০০ মিটার পশ্চিমে একটি কবরস্থান আছে। কবরস্থানের পাশেই বড় মসজিদ। এই মসজিদের ইমামের দায়িত্বেই এই কবরস্থানের কার্যক্রম থাকে। উনি মসজিদেই থাকেন, সেখানেই তার জীবন ব্যাতীত হচ্ছে বিগত পনেরো বছর। যখন তৌহিদ সেখানে পৌছায় তখন তিনি অযু করছিলেন মসজিদের কলে। তৌহিদ এবং তার টিম সরাসরি তাকে ঘিরে ধরে। গোবেচারা ইমাম সাহেব আতকে উঠে লোকের হঠাৎ আক্রমনে। কাঁঅয়া স্বরে বলেন,
“আসসালামু আলাইকুম জনাব, কি সাহায্য করতে পারি।“
“আজকে নতুন কোনো কবর নেওয়া হয়েছে?”
“আজ্ঞে?”

তৌহিদের আকর্ষিক প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে যায় ইমাম। সে উদ্বিগ্ন এবং ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ফেলফেল করে চেয়ে থাকে। তৌহিদ রাগ সামলাতে না পেরে জোরে বলে উঠে,
“ দেখুন ইমাম সাহেব দুটি মানুষের কাছে কখনো কিছু গোপপুলিন করতে নেই, এক মা দুই পুলিশ। ভালোয় ভালোয় উত্তির দিন।“

ইমাম কাঁপা হাতে নতুন কবরটি দেখিয়ে দেয়। তৌহিদ তার টিমকে বলে,
“খোড়”

তৌহিদের নির্দেশে তার টিম শাবল নিয়ে কবর খুড়তে থাকে। অবশেষে মাটি খুড়ে সাদা কাফলে পেচানো লাশটি তুলে পুলিশ, লাশটির বাধন খুড়তেই সবার মুখের রঙ পালটে যায়। তার নাকে হাত দিয়ে আলিফ বলে,
“স্যার, উনাকে হাসপাতালে নিতে হবে, শ্বাস চলছে।

আলিফের কথা শুনে ইমামের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে যায়,
“নাউজুবিল্লাহ”

কারণ কাফনে পেঁচানো মানুষটি আর কেউ নয় বরং ইশরা………

চলবে…

দৃষ্টির অগোচরে
দ্বিতীয় অধ্যায়
১৩তম_পর্ব

বুড়িগঙ্গা ব্রীজের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তৌহিদ। এখান থেকে ২০০ মিটার পশ্চিমে একটি কবরস্থান আছে। কবরস্থানের পাশেই বড় মসজিদ। এই মসজিদের ইমামের দায়িত্বেই এই কবরস্থানের কার্যক্রম থাকে। উনি মসজিদেই থাকেন, সেখানেই তার জীবন ব্যাতীত হচ্ছে বিগত পনেরো বছর। যখন তৌহিদ সেখানে পৌছায় তখন তিনি অযু করছিলেন মসজিদের কলে। তৌহিদ এবং তার টিম সরাসরি তাকে ঘিরে ধরে। গোবেচারা ইমাম সাহেব আতকে উঠে লোকের হঠাৎ আক্রমনে। কাঁঅয়া স্বরে বলেন,
“আসসালামু আলাইকুম জনাব, কি সাহায্য করতে পারি।“
“আজকে নতুন কোনো কবর নেওয়া হয়েছে?”
“আজ্ঞে?”

তৌহিদের আকর্ষিক প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে যায় ইমাম। সে উদ্বিগ্ন এবং ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ফেলফেল করে চেয়ে থাকে। তৌহিদ রাগ সামলাতে না পেরে জোরে বলে উঠে,
“ দেখুন ইমাম সাহেব দুটি মানুষের কাছে কখনো কিছু গোপপুলিন করতে নেই, এক মা দুই পুলিশ। ভালোয় ভালোয় উত্তির দিন।“

ইমাম কাঁপা হাতে নতুন কবরটি দেখিয়ে দেয়। তৌহিদ তার টিমকে বলে,
“খোড়”

তৌহিদের নির্দেশে তার টিম শাবল নিয়ে কবর খুড়তে থাকে। অবশেষে মাটি খুড়ে সাদা কাফলে পেচানো লাশটি তুলে পুলিশ, লাশটির বাধন খুড়তেই সবার মুখের রঙ পালটে যায়। তার নাকে হাত দিয়ে আলিফ বলে,
“স্যার, উনাকে হাসপাতালে নিতে হবে, শ্বাস চলছে।

আলিফের কথা শুনে ইমামের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে যায়,
“নাউজুবিল্লাহ”

কারণ কাফনে পেঁচানো মানুষটি আর কেউ নয় বরং ইশরা। অক্সিজেনের অভাবে তার জ্ঞান নেই। অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছে সে। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। হয়তো তাকে অজ্ঞান করে কাফনের কাপড়ে পেঁচানো হয়েছে। হয়ত জ্ঞান ফেরার পর সে ছোটাছুটি করার হাজারো চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাধা জায়গায় থাকার কারণে কোনো সুবিধা করে উঠতে পারে নি। আর মাটি থেকে আড়াই ফুট নিচের থেকে আওয়াজ পাওয়াটা বেশ দুষ্কর। তাই কেউ তার চিৎকার শুনতে পারে নি। ক্লান্ত হয়ে শেষমেশ অজ্ঞান হয়ে যায় ইশরা। তৌহিদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। একটা তেইশ বছরের নিস্পাপ মেয়েটির সাথে কেউ এতো পৈশাচিক আচারণ করতে পারে এটা তার জানা ছিলো না। জানা ছিলো না বললে ভুল হবে। “কানা বসির” নামক লোকটিও নৃশংসভাবে খুন করতো। কিন্তু তাই বলে জ্যান্ত কবর। ধুকে ধুকে মারা। প্রতিটা মূহুর্ত সে বুঝবে একটু একটু করে তাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হয়তো আর কয়েকমিনিট দেরি করতে ইশরাকে বাঁচাবার পথ থাকতো না। ঠান্ডা শরীরটা শুধু মাটি থেকে তুলতে হতো। এই অজানা শত্রুটি সবকিছু ভেবেই ইশরাকে কবর দিয়েছে। এখন এশার ওয়াক্ত। কাউন্টডাউনের ঘড়িতে আধা ঘন্টা বাকি। আধা ঘন্টা মধ্যে যদি ইশরাকে মাটি থেকে তোলা না হতো সে ওখানেই মরে পড়ে থাকতো। পানির নিচে একটা সময় পর্যন্তই শ্বাস নেওয়া যায়। যেহেতু কবর টা অধিক গভীর নয় তাই এই সময়টা খুব হলে ২ ঘন্টা। যেহেতু তাকে কোনো বাক্সের মধ্যে রাখা হয় নি। কিন্তু সমস্যা হলো আতংক। আতংকে মানুষ বেশি অক্সিজেন নেয়, ফলে এই দু ঘন্টাও কমে যায়। ইশরার ক্ষেত্রেও তাই। তার এখন অবস্থা আতংকের কারণেই আরোও খারাপ হয়েছে। অজানা শত্রুটি ইশরাকে জীবন্ত কবর দিয়েছে। সে চাইলে তাকে মারতে পারতো। কিন্তু জীবন্ত কবর দেবার আরেকটি কারণ হলো সে দেখতে চেয়েছিলো তার ক্লু মানুষ ধরতে পারে কি না। ঐ কবিতাটি ই ছিলো সেই ক্লু।
“শূন্য ঝুলি আজিকে আমার;
দিয়েছি উজাড় করি
যাহা-কিছু আছিল দিবার,
প্রতিদানে যদি কিছু পাই
কিছু স্নেহ, কিছু ক্ষমা
তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই
পারের খেয়ায় যাব যবে
ভাষাহীন শেষের উৎসবে”

এই কবিতাটিতে সব ক্লু রয়েছে। মানুষ মারা গেলেই তার ঝুলি খালি হয়। মৃত্যুর পর সে শুণ্য হস্ত। সে চাইলেও কাউকে কিছু দিতে পারে না। বরং তাকেই মানুষ দেয়, ক্ষমা, স্নেহ, দোয়া। তাই স্থানটি কবরস্থান। “পারের খেয়ায় যাব যবে”, ঢাকা শহরে এই বুড়িগঙ্গা একমাত্র জায়গা যেখানে খেয়া পারাপার আছে। তাই কবরস্থানটি এই ব্রীজের কাছেই হবে। আর “ভাষাহীন শেষের উৎসব” অর্থাৎ যে সময়টা সবচেয়ে শান্ত এবং নীরব, এশার নামাজের সময়। মাগরিব শেষ হবার পর ই এশার ওয়াক্ত হয়। এই সময়ে খেয়ার পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। দিনের সকল কার্যক্রমের ইতি হয়। সবাই নিজের নীড়ে ফিরে। অর্থাৎ তৌহিদের কাছে সময়টা এশার ওয়াক্ত শেষ হওয়া অবধি ই ছিলো। ঠান্ডা কন্ঠে তৌহিদ বলে,
“আলিফ, যত দ্রুত পারো ওকে হাসপাতালে ভর্তি করো। সব ফরমালিটি আমি দেখে নিবো।“

আলিফ ইশরাকে কোলে করে জিপে তোলে। তৌহিদ এগিয়ে যায় ইমাম সাহেবের সামনে। জ্যান্ত কবরের ব্যাপারটায় তার হাওয়া টাইট হয়ে আছে। এই কবরের সময় সে উপস্থিত ছিলো। চারজন ব্যাক্তি খাটিয়াতে করে নিয়ে এসেছিলো। তাকে জানাযা পড়ানোর কথা বললে তিনি নির্দ্বিধায় জানাযাও পড়ান। অথচ তার তো জানা ছিলো না যার জানাযা তিনি পড়াচ্ছেন সেই মানুষটি জীবন্ত। তৌহিদের রুদ্রমূর্তি দেখে ইমাম সাহেব ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলেন,
“আমার দোষ নাই জনাব, আমি জানতাম না কিছু। ওরা আমাকে জানাযা পড়তে বলেছিলো, আমি ইমাম তাই আগপিচ ভাবি নাই। আমি শুধু জানাযাটুকুই পড়েছি। আমার দোষ নাই জনাব।“

তৌহিদ হাটুগেড়ে বসলো,
“স্কেচ বানাতে পারবেন তাদের?”
“সেটা কি?”
“ছবি, তাদের চেহারা তো দেখছিলেন নাকি?”
“হ্যা, চেহারা দেখেছিলাম। বর্ণনা দিতে পারবো।“
“তাহলেই হবে। মস্তিষ্কে শান দেন। চারটা স্কেচ আমার চাই। স্কেচ না বানাতে পারলে কিন্তু পুরো দোষ দোষটা আপনার উপর যাবে। মাথায় রাখবেন।“
“জ্বে আচ্ছা।“

সাব ইন্সপেক্টর শাহানকে সেই দায়িত্বটি দেয় তৌহিদ। ততক্ষনে হাবীবের জিপ এসে দাঁড়ায় কবরস্থানে। সে ছুটে আসে তৌহিদের কাছে। তৌহিদ ঠান্ডা কন্ঠে বলে,
“খোঁজ পেয়েছো?”
“জ্বী স্যার, যার নামে সিম তাকেও পাওয়া গেছে। থানায় আছে। এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি স্যার? থানায় নাকি হাসপাতালে?”
“হাঁসপাতালে, ইশরার বাঁচাটা খুব দরকার। ওই আমাদের মেইন কালপ্রিটের কাছে নিয়ে যাবে”
“জ্বী, চলুন”

তৌহিদ জিপে উঠে। তার চোখ স্থির। একটা পশু ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরে। সাধারণ মানুষের মাঝে মুখোশ পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। অথচ তাকে ধরতে পারছে না তৌহিদ। যে শত্রু আড়ালে তাকে সে সবথেকে ভয়ংকর হয়। কখন কোথা থেকে আক্রমন করে কিছুই বোঝা যায় না। হাবীব জিপ চালাচ্ছে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। গাড়ি চলেছে আপন গতিতে গন্তব্য হাসপাতাল।

বাসায় এসে ইশরার প্রতিটা জিনিস তন্ন তন্ন করে দেখতে লাগলো নুশরাত। ইশরার ডাইরি, ওর বই খাতা, ল্যাপটপ। সবকিছু। একটা না একটা ক্লু পাওয়া যাবে, সেই আশায়। অবশেষে ইশরার সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্টে প্রবেশ করলো নুশরাত। সবচেয়ে উপরে যে নামটি রয়েছে, তার সাথে ইশরার প্রায় প্রতিসময় কথা হতো। শুধু তাই নয়, কাল রাতেও তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়েছে। লোকটির নাম “আগুন্তক”। বোঝাই যাচ্ছে এটা একটা ফেক আইডি। ফেক আইডির প্রতি এতোটা আকর্ষিত হবে এতো বোকা মেয়ে ইশরা নয়। তাহলে কারণটি কি! লোকটির প্রোফাইল ঘাটলেও কোনো ক্লু পায় না নুশরাত, অথচ এই লোকটার সাথেই আজ দেখা করার জন্য কলেজ গেট থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলো ইশরা। হঠাৎ একটি ম্যাসেজ আসলো ইশরার আইডিতে। “আগুন্তক” নামক ব্যাক্তিটি ম্যাসেজ করেছে। ইশরাকে বিগত সাত ঘন্টা ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। সে এই লোকটির সাথেই দেখা করতে বেড়িয়েছিলো। অথচ এই লোকটি ই তাকে ম্যাসেজ করছে। কৌতুহলের তাড়ানায় ম্যাসেজটি ওপেন করলো নুশরাত। ম্যাসেজটি ওপেন করতেই তার মাথা ঘুরে যাবার যোগাড়, ম্যাসেজ এ কিছু ছবি। ছবিগুলো ইশরাকে কবর দেবার। প্রতিটা মূহুর্তের ছবি দূর থেকে কেউ তুলেছে। পরবর্তীতে আরোও কিছু ছবি পাঠালো সে, সেখানে তৌহিদ এবং তার দল ইশরাকে মাটি থেকে তুলছে। এরপরে একটি ম্যাসেজ এলো, তাতে লেখা,
“উকিল ম্যাডাম থেকে পুলিশ বাবু তো বেশী চালাক দেখছি। খামোখা মানুষ আপনাকে নিয়ে এতো বাহবা দেয়, I am so disappointed, আমি ভেবেছিলাম ধাধার উত্তর আপনি খুজে বের করবেন। যেহেতু আপনি উত্তর বের করতে পারেন নি, তাই প্যানাল্টির জন্য তৈরি থাকুন।“

নুশরাত ধপ করে খাটে বসে পড়ে। নুশরাতের মনে হচ্ছে কেউ তাকে প্রতি মূহুর্তে, প্রতি ক্ষণে চোখে চোখে রাখছে। নুশরাতের প্রতি পদক্ষেপ যেনো তার জানা। নুশরাতের মনে হচ্ছে সে কারোর হাতের পুতুল, তাকে যেভাবে নাচতে বলা হচ্ছে সে যেভাবেই নাচছে। নয়তো এতোটা সূক্ষ্ণ সময়ে সে ম্যাসেজ করতে পারতো না। ইশরাকে পাওয়া গেছে ব্যাপারটা আনন্দদায়ক হলেও, লোকটির শেষ কথাটা নুশরাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কি পেনাল্টি দিবে সে? ঠিক তখন ই ফোন আসে নুশরাতের মোবাইলে। ফোন রিসিভ করতেই শুনতে পায়,
“ম্যাডাম, তৌহিদ স্যারের জিপটা এক্সিডেন্ট করেছে………”

চলবে…

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here