দৃষ্টির অগোচরে,৯ম_পর্ব,১০ম পর্ব

দৃষ্টির অগোচরে,৯ম_পর্ব,১০ম পর্ব
মুশফিকা রহমান মৈথি
৯ম_পর্ব

বাহিরের ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালা দিয়ে ঘরে আসছে। সেই আলো এবং সিড়িঘরের আলোতে তার ঘরের টেবিলের উপর রাখা একটা সাদা রঙ্গের বক্সটি দেখা যাচ্ছে। নুশরাত দরজাটি লাগিয়ে দিলো। লাইট জ্বালাতেই দেখলো ফ্লোরে রক্তের ছিটা লেগে আছে। টেবিলের উপর রাখা সাদা বক্সটাতে রক্তের ছিটা রয়েছে। নুশরাত শুকনো ঢোক গিললো। তার বাসায় কেউ ঢুকেছে ভাবতেই বুক কেঁপে উঠছে তার। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগলো। কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন করে উঠলো,
– কে? কে এখানে?

সারা বাসায় পিন পতন নীরবতা। নুশরাত নিজেকে শান্তনা দেবার জন্য বললো,
” কেউ নেই, কেউ নেই। এটা শুধু ভয় দেখানোর চেষ্টা মাত্র। কেউ নেই”

ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করলো নুশরাত। দ্রুত রবিনের মোবাইল এ একটা ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিলো। এবার মোবাইলটা সোফাতে রেখে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে হাটা দিলো নুশরাত। বুক টিপটিপ করছে নুশরাতের। রুমে ঢুকতেই একটা তীব্র গন্ধ নাকে এলো তার৷ এই গন্ধটা বেশ পরিচিত নুশরাতের। সময় পার হলেও গন্ধটা এখনো একই রয়েছে। আবারো ঘরে কেউ আছে, সে তাকে হয়তো লুকিয়ে থেকে তাকে। নুশরাত রুমের লাইটটা জ্বালালো না। হাতের পাশে রাখা ফুলদানিটা হাতে তুলে নিলো সে। খেয়াল করলো জানালার পর্দাটা নড়ছে। নুশরাত ধীর পায়ে পর্দাটার দিকে এগোচ্ছে। ভয় করছে, কিন্তু কৌতুহলের কাছে ভয়টা দমে যাচ্ছে। যদি নুশরাতের ধারণা ঠিক থাকে তবে পর্দার পেছনের মানুষটি সে যাকে এই ছয়মাস পাগলের মতো খুজেছে নুশরাত। মাহিরের খুনি, সে সেই রাতে মাহিরের প্রাণ নিয়েছিলো৷ পর্দার থেকে নুশরাতের দূরত্ব কেবল কয়েক ইঞ্চি৷ নুশরাত যখন পর্দাটা সরানোর চেষ্টা করলো তখনই একটা কালো মুখোশধারী ব্যাক্তি অতর্কিতে তার উপর হামলা করে দিলো। ধারালো ছুরির আঘাত পড়লো নুশরাতের বাহুতে। টাল সামলাতে না পেড়ে নুশরাত ফ্লোরে পড়ে গেলো। লোকটি তখন তড়িৎ গতিতে বারান্দার দিকে ছুটে যায়। নুশরাত হাতে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলো৷ রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ক্ষত স্থান থেকে। কোনো মতে উঠে দাঁড়ালো নুশরাত। ছুটে বারান্দার কাছে গেলো সে। ০)০কিন্তু বারান্দায় কেউ নেই। লোকটা যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। নুশরাতের বিল্ডিংটা পাঁচতালায়। এতো উঁচু থেকে লাফ দিলে কারোর বাঁচার কথা নয়। আবার কোনো দিকে যাবার ও জায়গা নেই। অথচ মুখোশধারী লোকটা যেনো গায়েব ই হয়ে গেলো৷ হাতের ব্যথাটা তীব্র হচ্ছে। ছুরিতে এর আগেও কেঁটেছে নুশরাতের। তবে এই ক্ষতের যন্ত্রণা যেনো অসহনীয়।

রাত ১০টা,
বাসাটায় পুলিশ ঘোরাফেরা করছে। কেউ বাক্সটার ছবি তুলছে, কেউ রক্তের ছিটা পরীক্ষা করছে। রবিন নুশরাতের পাশে বসে রয়েছে। নুশরাত হাতটা সাদা রুমাল দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছে। যাতে ব্লিডিং বন্ধ হয়। তার আসতে খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। সে পুলিশ কমপ্লেইন করে তারপর এসেছে। সাব-ইন্সপেক্টর ইমাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ কঅরতে লাগলেন। তার বেশ অবাক লাগছে। কারণ একটা মানুষ চুরি করার উদ্দেশ্যে এসে থাকলে সে চুরি করবে। কিন্তু কোনো জিনিস ই মিসিং হয় নি। উলটো একটা বাক্স রেখে গেছে। তিনি হিনহিনে কন্ঠে নুশরাতকে জিজ্ঞেস করলেন,
– আচ্ছা আপনার কি কারোর সাথে শত্রুতা রয়েছে? মানে কেউ হুমকি টুমকি দিয়েছে?
– জ্বী না স্যার। আমাকে কেউ হুমকি দেয় নি। তবে আমার পেশাটাই এমন শত্রুর অভাব নেই। কেনো বলুন তো?
– এই ইন্সিডেন্ট টা আর কিছুই নয়। আপনাকে ভয় দেখাতে এসেছিলো। লোকটার উদ্দেশ্য আপনাকে মেরে ফেলা নয়। যদি মারার উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে হি কুড হ্যাভ কিল্ড ইউ। শুধু বাহুকে ছুরিঘাত হতো না। আচ্ছা এই বক্সটাকি খুলেছেন?
– না আমি খুলি নি।
– তাহলে আমরাই খুলি।

বলেই সাব-ইন্সপেক্টর ইমাম বক্সটা হাতে নিলেন। মাঝারি আকৃতির সাদা বক্স, সাদা বক্সে রক্তের ছিটা এবং উপরে গোলাপী ফিতে দিয়ে বো করে বাধা। বক্সটা খুলতে বেশ অবাক হলেন তিনি। ভেতরে একটা লাল কাগজ দুভাজ করে এবং ছয়টা “Paul Sebastian” পারফিউমের বোতল। কেউ কাউকে পারফিউম গিফট করেও ভয় দেখাতে পারে বলে জানা ছিলো না ইমামের। অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার পারফিউম রয়েছে। কেউ এতো দামী উপহার এতোটা ভয়ানক ভাবে দিতে পারে ইমামের জীবনে দেখা কেসগুলোর মধ্যে এই প্রথম। এবার তিনি লাল কাগজটা খুললেন। গোটা গোটা অক্ষরে পুরো চিঠিটা লেখা৷ খুব পরিপাটি করে সময় নিয়ে লেখা হয়েছে। কোনো কাটাকাটি নেই, নেই কোনো ওভাররাইটিং। ফাউন্টেন পেন দিয়ে হয়তো লিখেছে। কাগজটাও বেশ দামী মনে হচ্ছে। ইমাম সাহেব পড়তে শুরু করলেন, চিঠিতে লেখা রয়েছে;

উকিল সাহেবা,
প্রিয় আপনাকে বলবো না। কারণ আপনি আমার প্রিয় নন। বরং সবথেকে অপ্রিয় মানুষদের একজন। কারণ আপনার জন্য আমার ছয়মাস বসে থাকতে হচ্ছে। আমার কাছে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে আপনি৷ তা শুনলাম আজকাল ওকালতি ছেড়ে পারফিউমের শখ পুষেছেন। আমার পারফিউমটা বুঝি আপনার খুব ভালো লাগে। তাই পাঠিয়ে দিলাম। ছয় বোতল আছে। এবার আর দোকানে দোকানে যেয়ে মেনস পারফিউম খোঁজা লাগবে না। কি অদ্ভুত এতো কমন একটা পারফিউম অথচ আপনি এটাকে খুঁজেই পান নি। এবার না একটু ক্ষান্ত দেন। নয়তো সামনেবার মিস হবে না।

ইতি
আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী

নুশরাত ঝিম ধরে বসে রয়েছে। তার মাথা ভনভন করছে। এই লোকটা তাকে এই গোটা ছয়মাস ফলো করে গেছে। অথচ নুশরাত টেরটি অবধি প্রায় নি। তার চুলের গোড়া থেকে ঘামের রেখা গড়িয়ে পড়ছে। সাব-ইন্সপেক্টর ইমাম শান্তভাবে বললেন,
– এটা হুমকি ছিলো। আচ্ছা মিস নুশরাত আপনি এই লোকটাকে চিনেন?
-..…….
– দেখুন, এটা স্যাফটির ব্যাপার। আমাদের সাথে কো-অপারেট না করলে এই বদমাইশটাকে ধরা যাবে না। আপনি একটু খুলে বলবেন ঘটনাটা কি?

নুশরাত চুপ করে আছে। রবিন নুশরাতের চুপ করে থাকা দেখে ইমামকে বললো,
– স্যার আমার মনে হয় আমাদের আপাতত নুশরাতকে একটু রেস্ট নিতে দেওয়া উচিত। ওর হাতের ফাস্ট এইডটাও করা হয় নি। টিটেনাস নিতে হবে। বলি কি, কাল সকালে আমরা থানায় আসি?
– জ্বী, আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তাহলে আমরা এখন আসি। সাবধানে থাকবেন। আর উনাকে উনার রিলেটিভের বাসায় রেখে আসতে পারেন। ব্যাপারটাকে এতো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয় আমাদের।
– জ্বী। ধন্যবাদ, এখানে আসার জন্য।
– এটা আমাদের ডিউটি। আসি

বলেই ইমাম এবং কন্সটেবলগুলো চলে গেলো। নুশরাত এখনো জমে আছে। তার হাত পা কাঁপছে। এই প্রথম এতো শান্ত ভাবে কেউ মৃত্যু হুমকি দিয়েছে তাকে। লোকটা ভীষণ পাষন্ড এবং অসম্ভব ধূর্ত। প্রতিটি স্টেপ সে মেপে মেপে এগোয়। ধূর্ত না হলে মোটেই সাদ্দামের ছাপ গ্লাভস এ রেখে যেতো না। রবিন নুশরাতকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
– তুই ঠিক আছিস?
– হুম
– এই চিঠিটা কে পাঠাতে পারে বলে তোর মনে হয়?
– জানি না। হাতটা ব্যাথা করছে। একটু হাসপাতাল পর্যন্ত ড্রপ করে দিবি?

রবিন কথা বাড়ালো না। নুশরাত কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছে। তাই অহেতুক কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। রবিন নুশরাতের হাত ড্রেসিং করিয়ে তাকে তার মার বাড়িতে ড্রপ করে দিলো। নুশরাতকে দেখে পারভীন বেগম নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন৷ তার হাতে ব্যান্ডেজ দেখে তার প্রশ্ন যেনো বেড়ে গেলো। কিন্তু নুশরাত একটা প্রশ্নের ও উত্তর দিলো না। তার ঘুম পাচ্ছে, খুব ক্লান্ত সে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলো নুশরাত।

এক সপ্তাহ পর,
মতিঝিল থানার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে নুশরাত। রবিন তাকে ফোন করেছে। একজন তাকে নিজের উকিল হিসেবে নিযুক্ত করতে চায়। ছেলেটির নাম স্নিগ্ধ। ছেলেটির বয়স পঁচিশ। পড়াশোনা করে ঢাকা কলেজের মাস্টার্সে। পার্টটাইম ডেলিভারিবয় হিসেবে কাজ করে। ছেলেটাকে খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথমে রবিন কেসটাকে হ্যান্ডেল করতে চেয়েছিলো কিন্তু ছেলেটা নুশরাতকে নিজের উকিল হিসেবে চায়। নুশরাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থানার ভেতরে প্রবেশ করলো সে। সেখানে ঢুকেই দারোগাকে বললো,
– আচ্ছা আপনাদের থানা স্নিগ্ধ নামের কাউকে ধরে এনেছে। আমি তার উকিল, আমি স্নিগ্ধ এর সাথে কথা বলতে চাই।
– দাঁড়ান স্যারের সাথে কথা বলে নিতে হবে।
– আপনাদের স্যার কোথায়?

তখনই পেছন থেকে কানে এলো,
– আমি এখানের অফিসার ইনচার্জ। আপনার কিছু জানার ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলতে পারেন।

কথাটি শেষ হতেই পেছনে ফিরে নুশরাত। তার ঠিক পেছনে দাঁড়ানো মানুষটি আর কেউ নয় বরং তৌহিদ………

চলবে

দৃষ্টির অগোচরে
১০ম পর্ব

– আমি এখানের অফিসার ইনচার্জ। আপনার কিছু জানার ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলতে পারেন।

কথাটি শেষ হতেই পেছনে ফিরে নুশরাত। তার ঠিক পেছনে দাঁড়ানো মানুষটি আর কেউ নয় বরং তৌহিদ। আজ ছয় মাস পর আবার ও তৌহিদ এবং নুশরাত মুখোমুখি। পৃথিবীটা সত্যি গোলাকার। এই মানুষটাকে এখানে দেখবে এটা কখনোই কল্পনা করে নি নুশরাত। নুশরাত বেশ কিছুসময় ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে রইলো তৌহিদের দিকে। এই ছয়মাসে তৌহিদ বেশ বদলে গেছে। লম্বা চওড়া সুঠাম দেহী শ্যাম বর্ণের পুরুষটি এখন আর আগের মতো সুদর্শনটি নেই। কাচা চুলের মাঝে পাঁকা চুলগুলো চোখে পড়ছে, চোয়ালটা বেশ ভেঙ্গে গেছে, চোখের নিচে কালিটা যেনো গাঢ় হয়েছে। নুশরাতকে দেখে তার মুখের ভাব পরিবর্তন হলো না। ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে নুশরাতের চোখে। নুশরাত তার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ফলাফল শূন্য। সময়ের কথা চিন্তা করে নিজেকে সামলে নিলো নুশরাত। জড়তাবিহীন কন্ঠে বললো,
– স্নিগ্ধ রহমানের উকিল নুশরাত চৌধুরী। স্নিগ্ধ এর সাথে দেখা করতে চাচ্ছি।
– বেশ, আলিফ উনাকে স্নিগ্ধ এর সাথে দেখা করার ব্যাবস্থা করে দাও।

তৌহিদ ঠান্ডা কন্ঠে দারোগা আলিফ মাহবুবকে নির্দেশ দিলো। এর পর নিজের রুমের দিকে রওনা দিলো সে৷ তার ব্যবহার দেখে কারোও বলার সাধ্যি নেই লোকটা নুশরাতের এতো পরিচিত। মাঝে মাঝে খুব পরিচিত মানুষের অপরিচিত মানুষের কাতারে ফেলতে একটা মূহুর্ত ই যথেষ্ট হয়। হয়তো তৌহিদ এবং নুশরাতের মাঝে সেই মূহুর্তের তিক্তটা একটু বেশি ই ছিলো। তাই তো আজ নুশরাত কেবলই একজন আগন্তক তৌহিদের কাছে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হলো নুশরাতের। সে আলিফের পেছন পেছন স্নিগ্ধের লকাপের কাছে গেলো৷ স্নিগ্ধের লকাপের কাছে গিয়ে খেয়াল করলো একটা নীল শার্ট পড়া ছেলে একদম কোনায় হাটুগেড়ে বসে রয়েছে। ছেলেটা মাথা নিচু বসে রয়েছে। মুখখানা দেখা যাচ্ছে না। আলিফ লকাপের শিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। কিন্তু তাতেও ছেলেটা মাথা তুললো না। তখন নুশরাত গলা খাকারি দিয়ে বললো,
– স্নিগ্ধ?

এবার ছেলেটা মাথা তুললো। নুশরাত অবাক চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এতো সুন্দরও কোনো ছেলে হতে পারে! নুশরাতের মনে হলো ছেলেটা আল্লাহ তায়ালা বেশ নিপুণ ভাবে বানিয়েছেন। অসম্ভব নিঁখুত শিল্পকর্ম। ফর্সা বর্ণের এতোটা মায়াবী চেহারা, কেউ বলবে এই দেশের ছেলে সে। এতোটা মায়াবী চেহারার কেউ বুঝি খুন করতে পারে। সবথেকে আকর্ষণীয় ছেলেটার নীলাভ চোখ জোড়া। লেন্স না পড়ার পর ও এতোটা সুন্দর কারোর চোখের মনি হয় জানা ছিলো না নুশরাতের। কিন্তু কতোটা নির্দয় ভাবে ছেলেটাকে মেরেছে। চোখের নিচে রক্ত জমে কালচে হয়ে রয়েছে। ঠোঁটটা ফেটে গেছে। এখনো রক্ত লেগে রয়েছে তার ঠোঁটে। গালের এক জায়গা কেঁটে গেছে। কেউ একটু ঔষধ ও লাগাতে দেয় নি। অবশ্য থার্ড ডিগ্রী বলতে এই দৃশ্যকেই বোঝায়। নুশরাতকে দেখে স্নিগ্ধের মুখে অমায়িক হাসি ফুটে উঠলো৷ তার চোখ চকচক করছে। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো দেখলে যেমন উচ্ছ্বাসিত হয় ছেলেটার চোখেও সেই উচ্ছ্বাসটাই দেখা যাচ্ছে। নুশরাত আলিফকে বললো,
– আমি ওর সাথে পারসোনালি কথা বলতে চাই। আমাদের কি সেই ব্যাবস্থাটা করে দেওয়া যাবে।
– জ্বী আসুন

আলিফ লকাপ খুলে দিলো। স্নিগ্ধ খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এলো। আলিফ ইন্টারোগেশন রুমেই তাদের কথা বলার ব্যাবস্থা করে দিলো। স্নিগ্ধের জন্য কেনো যেনো মায়া হলো নুশরাতের। এই প্রথম অচেনা একজন মানুষ যে কিনা খুনি তার জন্য নুশরাতের মায়া হচ্ছে। নুশরাত ভনিতা ছেড়ে বললো,
– এতো উকিলের মাঝে আমি ই কেনো? আমাদের কেনো তুমি নিজের উকিলের রুমে বেছে নিলে? আমি এতোও ভালো উকিল নই

স্নিগ্ধ কিছুক্ষণ চুপ রইলো। নুশরাতের সূক্ষ্ণ দৃষ্টি তার চোখ বরাবর স্থির। মানুষ মিথ্যে বললেও তার চোখ মিথ্যে বলতে পারে না। আর যদি কোনো মানুষের মিথ্যে চোখ দ্বারাও না ধরা যায় তবে সে মানুষ নয় শয়তান। স্নিগ্ধ এবার মুখ খুললো, আমতা আমতা করে বললো,
– আমি তেমন কোনো চিন্তা করে আপনাকে বাছাই করি নি। শুধু ভেবেছি আপনি আমার অবস্থা বেশ ভালো করে বুঝতে পারবেন। কাউকে মিথ্যে দোষে ফাসালে তার উপর দিয়ে কি যায় সেতা আপনি বেশ ভালো করেই জানেন। আমি খুনটা করি নি ম্যাডাম। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি উনাকে চিনি অবধি না। আমার আইডি কার্ড ওখানে কি করছে আমি সত্যি ই জানি না।

স্নিগ্ধ এর চোখ ছলছল করছে। ছেলেটা মিথ্যে বলছে না। তার চোখ স্বচ্ছ। অজানা কারণেই ছেলেটার মাঝে নিজেকে খুজে পাচ্ছে সে। ছয়মাস আগে সেও এই পজিশনে ছিল৷ যেখানে তার বাঁচার কোনো উপায় ছিলো না। নুশরাত মুচকি হাসি দিলো। সেই হাসিতে শীতল আশ্বাসের পরশ ছিলো। স্নিগ্ধকে সে বললো,
– তুমি আমাকে খুলে বলবে কি হয়েছিলো? তুমি আমাকে খুলে না বললে আমরা কিন্তু নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবো না।

স্নিগ্ধ কিছুক্ষণ নুশরাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে নতুন ঔজ্জ্বল্য দেখা যাচ্ছে। সে ধীর কন্ঠে নিজের কাহিনী নুশরাতের কাছে তুলে ধরলো।

দিনটি ছিলো রবিবার। স্নিগ্ধ প্রতিদিনের মতোই নিজের কাজে বেরিয়ে গেলো। সাধারণত সকাল থেকে বিকেল অবধি তার রেস্টুরেন্টে তার কাজ থাকে। সেখানে ওর্ডার নেবার এবং একাউন্টস এর কাজ তার থাকে। সেদিনটা ও ব্যাতিক্রম ছিলো না। রেস্টুরেন্ট থেকে সেদিন একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায় স্নিগ্ধ। শরীরটা ভালো লাগছিলো না। দুদিন আগে বাড়ি যাবার সময় বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিলো তাকে। তাই জ্বর জ্বর লাগছে। কিন্তু আজ ক্লাস মিস করা যাবে না। পরীক্ষা রয়েছে, মিস করলে রেজাল্টটা খারাপ হয়ে যাবে। তাই স্নিগ্ধ সময় নষ্ট না করে ক্লাসের জন্য রওনা দিলো। ক্লাস শেষ হতে হতে আটটা বেজে গিয়েছিলো। মাথা ব্যাথটাও বেশ বেড়ে গেছে তার। আজ নিশি নামক মেয়েটিকে পড়াতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মেয়েটি বেশ গোবেচারা টাইপ ছাত্রী। যতই চেষ্টা করা হোক না কেনো ভালো রেজাল্ট করাটা তার দ্বারা সম্ভব নয়। অহেতুক দেড় ঘন্টা নষ্ট হবে, শরীরটা চলতেই চাচ্ছে না আজ। তাই স্নিগ্ধ সে মুখো হলো না। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। তার বেশ ক্ষুদা লেগেছে। মেসে যেয়ে রান্না করার ইচ্ছে হচ্ছে না। তাই আজ বাহিরেই খাবে সে। পকেটটাও গরম আছে। আজ স্যালারি পেয়েছে রেস্টুরেন্ট থেকে সুতরাং একটা ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়া যেতেই পারে। স্নিগ্ধ একটা মাঝারি দামী রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলো। সেখানে একজন মেয়ের জন্মদিন পালন করা হচ্ছিলো। মেয়েটির বয়স ৮-৯ হবে। মেয়েটির বাবা উপস্থিত সকল কাস্টোমারদের সেখানে কেক খাওয়ালো৷ রেস্টুরেন্ট থেকে খাওয়া দাওয়া করে মেসে ফিরতে ফিরতে দশটা বেজে গেছিলো। শরীরের ব্যাথা তীব্রতর হচ্ছিলো। সারাদিনের ধকলটা জ্বরের জন্য যেনো প্রভাবকের মতো কাজ করলো। স্নিগ্ধ নিজের রুমে ঢুকেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো৷ তার জ্বর আসছে। গায়ের ব্যাথা ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে। একটা পর্যায়ে কখন জ্ঞান হারালো সেটা মনে নেই স্নিগ্ধের। জ্ঞান ফিরলো পরদিন সকালে, তার মাথায় জলপট্টি। মেসের ম্যানেজার আকরাম আলিকে পাশে বসে থাকতে দেখলো সে। তারপর তিনদিন জ্বরে কাতরেছে। চতুর্থদিন পুলিশ এসে তাকে এই খুনের দায়ে ধরে এসেছে।

স্নিগ্ধ কথাগুলো শেষে চুপ করে বসে রইলো। নুশরাত গভীর চিন্তায় মগ্ন। এতোকিছুর মাঝে সে আলতাফ হোসেনের বাসায় যায় পর্যন্ত নি৷ তাহলে তার লাশের হাতে ওর আইডি কার্ড কিভাবে এলো! তার প্রথমে স্নিগ্ধের কথার সত্যতা যাচাই করতে হবে৷ তাই নুশরাত উঠে দাঁড়ালো। মৃদু কন্ঠে বললো,
– চিন্তা করো না, যদি তুমি নির্দোষ হও তবে তোমার কিছু হবে।

বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। স্নিগ্ধ অসহায় দৃষ্টিতে নুশরাতের যাবার পানে চেয়ে থাকলো। নুশরাত থানা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো তখন তৌহিদ পেছন থেকে বলে উঠে,
– এই কেসটা লড়ো না……..

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here