তুমিই_আমার_পূর্ণতা,পর্ব ১০(অন্তিম পর্ব )

#তুমিই_আমার_পূর্ণতা,পর্ব ১০(অন্তিম পর্ব )
#মেহরাফ_মুন(ছদ্মনাম )

সবার জীবনে খারাপ সময় আসা ভালো। এই খারাপ সময়টা এসে আমাদের অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যায় তেমনি আদ্রাফের জীবনে এই সময়টা এসে শিখিয়ে দিয়ে গেল, যে থাকার সে শত বাঁধা পেরিয়েও থাকবে আর যে চলে যাওয়ার সে রাজপ্রসাদ থেকেও চলে যাবে।

আজ আদ্রাফ অনেকদিন পর আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। অফিসে যাচ্ছে ঠিকমতো।

কী এক বিভীষিকা-ময় রাত ছিল সেইদিন। গাড়িতে উঠার পরই আদ্রাফ ড্রাইভ করা শুরু করেছিল। গাড়িতে উঠার পরও মুনের সেই বেজায় রাগ রয়ে গেছে। মুখ ভার করে ছিল। আস্তে আস্তে ঢাকা-শহরের সব দোকানই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো।পুরোরাত তখন নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুনের রাগ তো ভাঙার না। তাই আদ্রাফ রাস্তার অপরপাশে আইসক্রিম এর দোকানটা থেকে আইসক্রিম আনতে বের হয়েছিল। বের হয়েই আইসক্রিম নিয়ে আনার সময়ই বিপরীত দিক থেকে চলাকালীন একটা বড়ো ট্রাক এসে মেরে দিল আদ্রাফকে। মুনের চোখের সামনে দিয়েই যেন সবকিছু থমকে গেল, পুরোরাত তখন নিস্তব্ধ, পাশেই কয়েকজন দোকানদার বেরিয়ে এসে আদ্রাফের চারপাশ ঘিরে ধরলো। আদ্রাফ চোখ বন্ধ করার সময়ও মুনের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। মুন যেন কথা বলার ভাষাটাও হারিয়ে ফেলেছে। চোখের সামনেই আদ্রাফের রক্তাক্ত, নিতর দেহটা পরে রইল রাস্তার মাঝে। এসব দেখার মাঝেই মুন গাড়ি থেকে বের হয়ে আদ্রাফের সামনে গিয়েই ওর নিতর দেহ দেখে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। এরপর মুন আর কিছুই জানতো না।
যখন সেন্স ফিরে তখন নিজেকে হাসপাতালের ব্যাড এ আবিষ্কার করে। পাশেই মিম বসে ছিল মুনের হাত ধরে। মুন চোখ খুলতেই আদ্রাফের কথা জিজ্ঞেস করে তখন মিম উত্তরে বলে পাশের ক্যাবিনে আদ্রাফের অপারেশন চলছে। মুন একপ্রকার লাফিয়ে উঠেই আদ্রাফের ক্যাবিনের সামনে দৌড়ে গিয়েছিল। ওখানেই শুভ্র দাঁড়িয়ে ছিল। জীবনে অনেক রোগীর চিকিৎসা করেছিল কিন্তু নিজের ভাই সমান বন্ধুর অপারেশন করতে তার হাত কাঁপবে, কান্না আসবে তাই সে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেনি। মিম এসেই মুনকে পাশের এক চেয়ারে বসিয়েছিল, অতিরিক্ত স্ট্রেস নিলে মুনের বাচ্চার ক্ষতি হবে বলে। অপারেশন শেষে ডাক্তার বের হয়েই বলেছিলো আদ্রাফের সুস্থ হতে অনেকদিন লাগবে, কথাও বলতে আস্তে আস্তে সময় নিতে হবে, পা ভেঙে গিয়েছিল, হাঁটাচলা করতে পারবে না, আপাতত ব্যাড রেস্টে থাকতে হবে। মানে পুরো দিন-রাতের জন্য একটা হোম নার্স লাগবে আদ্রাফের। কিন্তু মুন মানেনি, সেই-ই করবে আদ্রাফের সব কাজ।
সেইদিনের পর থেকে মুন তার ভারী পেট নিয়েও আদ্রাফের সব কাজ করতো। আদ্রাফ কিছুই বলতে পারতো না, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতো। মুন অনেক কেয়ার করতো আদ্রাফের। অবশ্য মিম কয়েকদিন থেকেছিল মুনের সাথে এরপর তার এক্সামের জন্যই চলে যেতে হয়েছিল চট্টগ্রামে। মুনের ডেইলিভারির দিনও সে আদ্রাফকে কাছে পায়নি। একসময় ফুটফুটে এক পরী আসলো মুনের কোল আলো করে। মিম তো এক্সামের পর আবারও চলে এসেছিলো মুনের জন্য। শুভ্র আর মিমের দিন শুরু হতো পরীটাকে দিয়েই। এরমধ্যে শুভ্র আর মিমের মধ্যে অনেক ভাব হয়ে গিয়েছে আগের মত আর তারা এখন ঝগড়া করে না।
মুন এক হাতেই সব সামলাতো, সংসারের কাজ, আদ্রাফের দেখা-শোনা সব মিলিয়ে পরিবারটাকে আরও সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নিতো মুন। এত কষ্টের পরেও রাতে পরীটার মুখের দিকে তাকিয়েই সুখ সুখ অনুভব হতো মুনের।পাশেই আদ্রাফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। মেয়েটা একদম আদ্রাফের মতোই হয়েছিল।
এসবের মাঝে আরও একটা সুখের সন্ধান হলো আদ্রাফ আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছিলো। এমনই একদিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল আদ্রাফ। সেইদিন সে তাঁর পরীটাকে প্রথম কোলে নিয়েছিল। সে তো তখন বেজায় খুশি। আদ্রাফ তো সেইদিন খুশিতে কান্না-ই করে দিয়েছিলো তাঁর ফুটফুটে পরীটাকে কোলে নিয়ে। পরিবারটা যেন এক পূর্ণতায় রূপ নিয়েছিল।

জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে সেই দিনগুলির কথা মনে করছিলো মুন। মেয়েটা তাঁর দাদার কাছেই আছে, তাঁর দাদারও আর কিছু লাগে না এখন আর। হঠাৎ পিছন দিক থেকে এক জোড়া হাত এসেই মুনকে জড়িয়ে ধরলো। তাঁর মুখটা মুনের কাঁধের উপরই। মুনের আর বুঝতে বাকি রইল না এটা কে। প্রথম দিনের ন্যয় আদ্রাফ এখনো অফিস থেকে আসার সময় মুনের জন্য বেলিফুল নিয়ে আসে আর কোপায় গুঁজে দেয়। আদ্রাফ ঐভাবেই মুনকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল,’তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজড আছে।’

-‘কী এমন সারপ্রাইজড?’

-‘শুভ্র আর মিমের বিয়ে সামনের শুক্রবারে।’

-‘কীইইইই? সত্যি? কিন্তু মিম আমাকে বলেনি তো আর আপনিও তো একটু বলেননি আর শুভ্রভাই উনিও তো কিছু বলেনি! এতটাই পর হয়ে গেলাম সবার কাছ থেকে?’মুন মুখ ভার করেই বলে উঠলো।

-‘আরে এটাই তো সারপ্রাইজ্ড।’

এরপর পরই মিম, শুভ্র কল করে উঠল মুনকে।

—————————

অবশেষে দিনটি আসলো। আজকে মিমের গায়ে হলুদ। মুন আজকেই চলে যাবে মিমের সাথে। মিম এসে মুনের মেয়েকে তৈরী করে নিয়ে গিয়েছে ওর দাদার কাছে। আর আদ্রাফ শুভ্রর পক্ষ থেকেই আসবে বিয়েতে। মুনও পুরোপুরি রেডি। আদ্রাফ মুখ ভার করে বিছানার উপরই বসে আছে।

-‘ এই বিয়েতে যেতে হবে না তোমার।’ আদ্রাফ ওই অবস্থা থেকেই বলে উঠলো।

-‘ মানে কী?’

-‘ ঠিকই বলেছি, যে বিয়ে আমাদের আলাদা করে দিচ্ছে, সেই বিয়েতে না যাওয়াই ভালো।’ আদ্রাফ বাচ্চামো ফেইস করে বলে উঠলো।

-‘ এক বাচ্চার বাবা হয়ে নিজেই এখনো বাচ্চামনে স্বভাব করছেন। কে বলবে, ইনি না-কি এক বাচ্চার বাপ্! ‘এই কথা বলেই মুন উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

-‘হায় আল্লাহ! আমাদের দুলাভাই এতটা বউ-পাগল জানতাম না তো।’ রুমে ঢুকতে ঢুকতেই বলে উঠলো মিম।

-‘ আরে! আমি মেয়ের জন্য বলছি।’আদ্রাফ মাথা চুলকিয়ে বলে উঠলো।

-‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব বুঝি রে ভাই।’ মিমের পিছন দিয়ে শুভ্রও ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো।

-‘আরে শুভ্র ভাই আপনি?’ মুন বলল।

-‘হ্যাঁ ভাবি, ভাবলাম আপনারা যখন মিমের সাথে চলে যাবেন তাহলে আমার ভাইটা একা কীভাবে থাকবে? তাই ওকেও নিতে আসলাম।’ শুভ্র বলল।

-‘তোর হোক তারপর তুইও বুঝবি।’ আদ্রাফ রাগী রাগী ফেইস করে বলে উঠলো।

-‘আরে ভাই, আমি অলরেডি অনেক থেকে ফেলেছি আর একা থেকে বুঝতে চায় না। আমি তো ছাড়বোই না।’ মিমের দিকে চোখ টিপে বলে উঠলো।

-‘হয়েছে। এবার চলেন সবাই।’ মুন বলে উঠলো।

——————————-

অবশেষে শুভ্র আর মিমের বিয়ের কার্য সব ঠিকঠাক সম্পন্ন হয়ে গেল। বিয়ের পর পরই আদ্রাফ মুনকে নিয়ে চলে আসলো বাসায়।
রাতে মুন বাবুকে ঘুম পাড়িয়ে ঠিকঠাকভাবে সব গুছিয়ে রাখছিলো। এমন সময় আদ্রাফ এসেই মুনের চোখ বেঁধে দিয়ে কোলে তুলে নিল। মুন চিৎকার করতে নিলেই আদ্রাফ ফিসফিস করে বলে উঠলো কোনো কথা না।

আদ্রাফ মুনকে ছাদে নিয়ে গিয়েই চোখ খুলে দিল। মুন চোখ খুলতেই হতবাক। ছাদটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ছোট ছোট লাইট দিয়ে আর একটা ছোট কেকসহ। কেকের উপর লেখা ‘শুভ বিবাহবার্ষিকী বউ, ভালোবাসি চাঁদ’। মুন পিছন ফিরতেই দেখে আদ্রাফ হাটু মুড়ে বসে মুনের দিকে রিং বাড়িয়ে দিয়েছে। মুনের তো খেয়ালই ছিল না আজ তাঁদের বিবাহবার্ষিকী এটা। আদ্রাফ হাটু মুড়ে ওই অবস্থায় বলে উঠলো,

-‘ ভীষণ ভালোবাসি চাঁদ। তুমি আমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলে, না? জানো আমার ভালোবাসা সম্পর্কে বিশ্বাসটা পুরোপুরি আসেনি কোনোদিন, তাই তো এত কেয়ার করার পরও তোমাকে কোনোদিন বলা হয়নি ভালোবাসি।
আমার বাবারও প্রেমের বিয়ে ছিল। বাবাও ভীষণ ভালোবাসতো উনাকে। আস্তে আস্তে বাবা ব্যবসা নিয়ে বিজি হয়ে পড়ে। আর আমার জন্মদ্রাত্রী আমার আটবছর চলাকালীন পরকীয়াতে জড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার বাবা তাও কোনোদিন আজ পর্যন্ত উনাকে খারাপ বলেনি। আমার বাবার ভাষ্যমতে, হয়তো বাবা তাঁর স্ত্রীকে ঠিকমতো ভালোবেসে আগলে রাখতে পারেনি। কেমনে পারলো ওই মহিলাটা? একটা বাচ্চা রেখে পালিয়ে যেতে? তাঁদেরও তো প্রেমের বিয়ে ছিল, ভালোবাসা ছিল অনেক তবুও কীভাবে পারলো এটা করতে? সেই পর্যন্ত আমি ভালোবাসা শব্দটাকে ঘৃণা করতাম। কিন্তু তোমাকে যেইদিন আমি প্রথম দেখি সেইদিনই ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি আসার পর আমার সেই আগের বিশ্বাসটা ভেঙে দিলে। আমার এক্সিডেন্ট এর পর তুমি শিখিয়ে দিলে আসলেই সবাই এক নয়। তুমিও চাইলে তখন আমাকে ছেড়ে যেতে পারতে। টানা তিনমাস তুমি তোমার শরীর খারাপের মধ্যেও আমার খেয়াল রেখেছিলে। মানুষের জীবনে তো অনেক কিছুই অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে যায়, তেমনি করে তুমিও আমার জীবনে হঠাৎ করে চলে আসো। তুমি এসেই আমার সবকিছু অগোছালো করে দিয়েছিলে। মনের উপর তো আর কারো হাত থাকে না। কিন্তু ওইযে বিশ্বাসটা যে আসতো না আমার। আমি জানি তুমি কাছে থাকলেই আমার মন টানবে। তাই তো তোমাকে দূরে সরানোর জন্য সেরোগেসির প্রস্তাবটা দেওয়া, যাতে করে সেরোগেসির মাধ্যমে তোমার বাচ্চা নিয়ে আমি তোমার অস্তিত্বটা সারাজীবন রাখতে পারি আর তুমিও যেন আমাকে ঘৃণা করো। আমি দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, একটা বাচ্চা মা ছাড়া সুন্দরভাবে জীবনে বাঁচতে পারে। কিন্তু তুমি দূরে যাওয়ার বুঝেছি তোমাকে ভুলবার নয়। আমার ধারণাটাও বদলে দিলে তুমি, তুমিও দেখিয়ে দিলে সবাই এক নয়, এইযে এখন দেখো এতকিছুর পরেও তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি, একহাতেই সব সামলিয়েছিলে। এতকিছুর মাঝখানেও তোমার স্বামী নিয়ে জেলাস ছিলে, নার্স দিতে চেয়েছিল আমার জন্য, কিন্তু না তুমি অসুস্থতার মধ্যেও আমার সবধরণের কেয়ার করতে অথচ আমিই পাশে ছিলাম না তোমার সময়ে। এটাই তো ভালোবাসা। সত্যিকারের ভালোবাসা ছেড়ে যাওয়ার নয় চাঁদ। তুমিই আমার আগের অতীতের বিশ্বাসটা ভেঙে দিলে চাঁদ। ভালোবাসি অনেক অনেক। হয়তো তোমার মত করে বাসতে পারবো না কিন্তু তবুও সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করব। তুমি যে আমার মুনপাখি।’

মুন তো ওখানেই দাঁড়িয়ে কান্না করে দিয়েছে। এই কান্না যে দুঃখের নয়, সুখের। অবশেষে আদ্রাফ মুখ ফুটে বলল। এটাই তো শুনতে চেয়েছিল আদ্রাফের মুখ থেকে মুন। আদ্রাফ উঠেই মুনকে রিং পড়িয়ে দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করে বলে উঠলো,

-‘এই পূর্ণিমার চাঁদের মতোই তুমি আমার অন্ধকার জীবনটাকে আলো করে দিয়েছো। রাতের বেলায় চাঁদ যেমন পুরো আকাশটাকে সুন্দর বানিয়ে দেয় ঠিক তুমিও আমার জীবনে এসে জীবনটাকে সুন্দর করে দিয়েছো। আমার জীবনে তুমিই আমার চাঁদ।আমার জীবনটাকে তুমিই পূর্ণ করে দিয়েছো। তুমিহীনা এই আদ্রাফের জীবন অপূর্ণ।
তুমিই আমার পূর্ণতা মুনপাখি।’

—–সমাপ্ত——
সবার জীবনে খারাপ সময় আসা ভালো। এই খারাপ সময়টা এসে আমাদের অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যায় তেমনি আদ্রাফের জীবনে এই সময়টা এসে শিখিয়ে দিয়ে গেল, যে থাকার সে শত বাঁধা পেরিয়েও থাকবে আর যে চলে যাওয়ার সে রাজপ্রসাদ থেকেও চলে যাবে।

আজ আদ্রাফ অনেকদিন পর আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। অফিসে যাচ্ছে ঠিকমতো।

কী এক বিভীষিকা-ময় রাত ছিল সেইদিন। গাড়িতে উঠার পরই আদ্রাফ ড্রাইভ করা শুরু করেছিল। গাড়িতে উঠার পরও মুনের সেই বেজায় রাগ রয়ে গেছে। মুখ ভার করে ছিল। আস্তে আস্তে ঢাকা-শহরের সব দোকানই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো।পুরোরাত তখন নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুনের রাগ তো ভাঙার না। তাই আদ্রাফ রাস্তার অপরপাশে আইসক্রিম এর দোকানটা থেকে আইসক্রিম আনতে বের হয়েছিল। বের হয়েই আইসক্রিম নিয়ে আনার সময়ই বিপরীত দিক থেকে চলাকালীন একটা বড়ো ট্রাক এসে মেরে দিল আদ্রাফকে। মুনের চোখের সামনে দিয়েই যেন সবকিছু থমকে গেল, পুরোরাত তখন নিস্তব্ধ, পাশেই কয়েকজন দোকানদার বেরিয়ে এসে আদ্রাফের চারপাশ ঘিরে ধরলো। আদ্রাফ চোখ বন্ধ করার সময়ও মুনের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। মুন যেন কথা বলার ভাষাটাও হারিয়ে ফেলেছে। চোখের সামনেই আদ্রাফের রক্তাক্ত, নিতর দেহটা পরে রইল রাস্তার মাঝে। এসব দেখার মাঝেই মুন গাড়ি থেকে বের হয়ে আদ্রাফের সামনে গিয়েই ওর নিতর দেহ দেখে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। এরপর মুন আর কিছুই জানতো না।
যখন সেন্স ফিরে তখন নিজেকে হাসপাতালের ব্যাড এ আবিষ্কার করে। পাশেই মিম বসে ছিল মুনের হাত ধরে। মুন চোখ খুলতেই আদ্রাফের কথা জিজ্ঞেস করে তখন মিম উত্তরে বলে পাশের ক্যাবিনে আদ্রাফের অপারেশন চলছে। মুন একপ্রকার লাফিয়ে উঠেই আদ্রাফের ক্যাবিনের সামনে দৌড়ে গিয়েছিল। ওখানেই শুভ্র দাঁড়িয়ে ছিল। জীবনে অনেক রোগীর চিকিৎসা করেছিল কিন্তু নিজের ভাই সমান বন্ধুর অপারেশন করতে তার হাত কাঁপবে, কান্না আসবে তাই সে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেনি। মিম এসেই মুনকে পাশের এক চেয়ারে বসিয়েছিল, অতিরিক্ত স্ট্রেস নিলে মুনের বাচ্চার ক্ষতি হবে বলে। অপারেশন শেষে ডাক্তার বের হয়েই বলেছিলো আদ্রাফের সুস্থ হতে অনেকদিন লাগবে, কথাও বলতে আস্তে আস্তে সময় নিতে হবে, পা ভেঙে গিয়েছিল, হাঁটাচলা করতে পারবে না, আপাতত ব্যাড রেস্টে থাকতে হবে। মানে পুরো দিন-রাতের জন্য একটা হোম নার্স লাগবে আদ্রাফের। কিন্তু মুন মানেনি, সেই-ই করবে আদ্রাফের সব কাজ।
সেইদিনের পর থেকে মুন তার ভারী পেট নিয়েও আদ্রাফের সব কাজ করতো। আদ্রাফ কিছুই বলতে পারতো না, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতো। মুন অনেক কেয়ার করতো আদ্রাফের। অবশ্য মিম কয়েকদিন থেকেছিল মুনের সাথে এরপর তার এক্সামের জন্যই চলে যেতে হয়েছিল চট্টগ্রামে। মুনের ডেইলিভারির দিনও সে আদ্রাফকে কাছে পায়নি। একসময় ফুটফুটে এক পরী আসলো মুনের কোল আলো করে। মিম তো এক্সামের পর আবারও চলে এসেছিলো মুনের জন্য। শুভ্র আর মিমের দিন শুরু হতো পরীটাকে দিয়েই। এরমধ্যে শুভ্র আর মিমের মধ্যে অনেক ভাব হয়ে গিয়েছে আগের মত আর তারা এখন ঝগড়া করে না।
মুন এক হাতেই সব সামলাতো, সংসারের কাজ, আদ্রাফের দেখা-শোনা সব মিলিয়ে পরিবারটাকে আরও সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নিতো মুন। এত কষ্টের পরেও রাতে পরীটার মুখের দিকে তাকিয়েই সুখ সুখ অনুভব হতো মুনের।পাশেই আদ্রাফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। মেয়েটা একদম আদ্রাফের মতোই হয়েছিল।
এসবের মাঝে আরও একটা সুখের সন্ধান হলো আদ্রাফ আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছিলো। এমনই একদিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল আদ্রাফ। সেইদিন সে তাঁর পরীটাকে প্রথম কোলে নিয়েছিল। সে তো তখন বেজায় খুশি। আদ্রাফ তো সেইদিন খুশিতে কান্না-ই করে দিয়েছিলো তাঁর ফুটফুটে পরীটাকে কোলে নিয়ে। পরিবারটা যেন এক পূর্ণতায় রূপ নিয়েছিল।

জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে সেই দিনগুলির কথা মনে করছিলো মুন। মেয়েটা তাঁর দাদার কাছেই আছে, তাঁর দাদারও আর কিছু লাগে না এখন আর। হঠাৎ পিছন দিক থেকে এক জোড়া হাত এসেই মুনকে জড়িয়ে ধরলো। তাঁর মুখটা মুনের কাঁধের উপরই। মুনের আর বুঝতে বাকি রইল না এটা কে। প্রথম দিনের ন্যয় আদ্রাফ এখনো অফিস থেকে আসার সময় মুনের জন্য বেলিফুল নিয়ে আসে আর কোপায় গুঁজে দেয়। আদ্রাফ ঐভাবেই মুনকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল,’তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজড আছে।’

-‘কী এমন সারপ্রাইজড?’

-‘শুভ্র আর মিমের বিয়ে সামনের শুক্রবারে।’

-‘কীইইইই? সত্যি? কিন্তু মিম আমাকে বলেনি তো আর আপনিও তো একটু বলেননি আর শুভ্রভাই উনিও তো কিছু বলেনি! এতটাই পর হয়ে গেলাম সবার কাছ থেকে?’মুন মুখ ভার করেই বলে উঠলো।

-‘আরে এটাই তো সারপ্রাইজ্ড।’

এরপর পরই মিম, শুভ্র কল করে উঠল মুনকে।

—————————

অবশেষে দিনটি আসলো। আজকে মিমের গায়ে হলুদ। মুন আজকেই চলে যাবে মিমের সাথে। মিম এসে মুনের মেয়েকে তৈরী করে নিয়ে গিয়েছে ওর দাদার কাছে। আর আদ্রাফ শুভ্রর পক্ষ থেকেই আসবে বিয়েতে। মুনও পুরোপুরি রেডি। আদ্রাফ মুখ ভার করে বিছানার উপরই বসে আছে।

-‘ এই বিয়েতে যেতে হবে না তোমার।’ আদ্রাফ ওই অবস্থা থেকেই বলে উঠলো।

-‘ মানে কী?’

-‘ ঠিকই বলেছি, যে বিয়ে আমাদের আলাদা করে দিচ্ছে, সেই বিয়েতে না যাওয়াই ভালো।’ আদ্রাফ বাচ্চামো ফেইস করে বলে উঠলো।

-‘ এক বাচ্চার বাবা হয়ে নিজেই এখনো বাচ্চামনে স্বভাব করছেন। কে বলবে, ইনি না-কি এক বাচ্চার বাপ্! ‘এই কথা বলেই মুন উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

-‘হায় আল্লাহ! আমাদের দুলাভাই এতটা বউ-পাগল জানতাম না তো।’ রুমে ঢুকতে ঢুকতেই বলে উঠলো মিম।

-‘ আরে! আমি মেয়ের জন্য বলছি।’আদ্রাফ মাথা চুলকিয়ে বলে উঠলো।

-‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব বুঝি রে ভাই।’ মিমের পিছন দিয়ে শুভ্রও ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো।

-‘আরে শুভ্র ভাই আপনি?’ মুন বলল।

-‘হ্যাঁ ভাবি, ভাবলাম আপনারা যখন মিমের সাথে চলে যাবেন তাহলে আমার ভাইটা একা কীভাবে থাকবে? তাই ওকেও নিতে আসলাম।’ শুভ্র বলল।

-‘তোর হোক তারপর তুইও বুঝবি।’ আদ্রাফ রাগী রাগী ফেইস করে বলে উঠলো।

-‘আরে ভাই, আমি অলরেডি অনেক থেকে ফেলেছি আর একা থেকে বুঝতে চায় না। আমি তো ছাড়বোই না।’ মিমের দিকে চোখ টিপে বলে উঠলো।

-‘হয়েছে। এবার চলেন সবাই।’ মুন বলে উঠলো।

——————————-

অবশেষে শুভ্র আর মিমের বিয়ের কার্য সব ঠিকঠাক সম্পন্ন হয়ে গেল। বিয়ের পর পরই আদ্রাফ মুনকে নিয়ে চলে আসলো বাসায়।
রাতে মুন বাবুকে ঘুম পাড়িয়ে ঠিকঠাকভাবে সব গুছিয়ে রাখছিলো। এমন সময় আদ্রাফ এসেই মুনের চোখ বেঁধে দিয়ে কোলে তুলে নিল। মুন চিৎকার করতে নিলেই আদ্রাফ ফিসফিস করে বলে উঠলো কোনো কথা না।

আদ্রাফ মুনকে ছাদে নিয়ে গিয়েই চোখ খুলে দিল। মুন চোখ খুলতেই হতবাক। ছাদটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ছোট ছোট লাইট দিয়ে আর একটা ছোট কেকসহ। কেকের উপর লেখা ‘শুভ বিবাহবার্ষিকী বউ, ভালোবাসি চাঁদ’। মুন পিছন ফিরতেই দেখে আদ্রাফ হাটু মুড়ে বসে মুনের দিকে রিং বাড়িয়ে দিয়েছে। মুনের তো খেয়ালই ছিল না আজ তাঁদের বিবাহবার্ষিকী এটা। আদ্রাফ হাটু মুড়ে ওই অবস্থায় বলে উঠলো,

-‘ ভীষণ ভালোবাসি চাঁদ। তুমি আমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলে, না? জানো আমার ভালোবাসা সম্পর্কে বিশ্বাসটা পুরোপুরি আসেনি কোনোদিন, তাই তো এত কেয়ার করার পরও তোমাকে কোনোদিন বলা হয়নি ভালোবাসি।
আমার বাবারও প্রেমের বিয়ে ছিল। বাবাও ভীষণ ভালোবাসতো উনাকে। আস্তে আস্তে বাবা ব্যবসা নিয়ে বিজি হয়ে পড়ে। আর আমার জন্মদ্রাত্রী আমার আটবছর চলাকালীন পরকীয়াতে জড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার বাবা তাও কোনোদিন আজ পর্যন্ত উনাকে খারাপ বলেনি। আমার বাবার ভাষ্যমতে, হয়তো বাবা তাঁর স্ত্রীকে ঠিকমতো ভালোবেসে আগলে রাখতে পারেনি। কেমনে পারলো ওই মহিলাটা? একটা বাচ্চা রেখে পালিয়ে যেতে? তাঁদেরও তো প্রেমের বিয়ে ছিল, ভালোবাসা ছিল অনেক তবুও কীভাবে পারলো এটা করতে? সেই পর্যন্ত আমি ভালোবাসা শব্দটাকে ঘৃণা করতাম। কিন্তু তোমাকে যেইদিন আমি প্রথম দেখি সেইদিনই ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি আসার পর আমার সেই আগের বিশ্বাসটা ভেঙে দিলে। আমার এক্সিডেন্ট এর পর তুমি শিখিয়ে দিলে আসলেই সবাই এক নয়। তুমিও চাইলে তখন আমাকে ছেড়ে যেতে পারতে। টানা তিনমাস তুমি তোমার শরীর খারাপের মধ্যেও আমার খেয়াল রেখেছিলে। মানুষের জীবনে তো অনেক কিছুই অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে যায়, তেমনি করে তুমিও আমার জীবনে হঠাৎ করে চলে আসো। তুমি এসেই আমার সবকিছু অগোছালো করে দিয়েছিলে। মনের উপর তো আর কারো হাত থাকে না। কিন্তু ওইযে বিশ্বাসটা যে আসতো না আমার। আমি জানি তুমি কাছে থাকলেই আমার মন টানবে। তাই তো তোমাকে দূরে সরানোর জন্য সেরোগেসির প্রস্তাবটা দেওয়া, যাতে করে সেরোগেসির মাধ্যমে তোমার বাচ্চা নিয়ে আমি তোমার অস্তিত্বটা সারাজীবন রাখতে পারি আর তুমিও যেন আমাকে ঘৃণা করো। আমি দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, একটা বাচ্চা মা ছাড়া সুন্দরভাবে জীবনে বাঁচতে পারে। কিন্তু তুমি দূরে যাওয়ার বুঝেছি তোমাকে ভুলবার নয়। আমার ধারণাটাও বদলে দিলে তুমি, তুমিও দেখিয়ে দিলে সবাই এক নয়, এইযে এখন দেখো এতকিছুর পরেও তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি, একহাতেই সব সামলিয়েছিলে। এতকিছুর মাঝখানেও তোমার স্বামী নিয়ে জেলাস ছিলে, নার্স দিতে চেয়েছিল আমার জন্য, কিন্তু না তুমি অসুস্থতার মধ্যেও আমার সবধরণের কেয়ার করতে অথচ আমিই পাশে ছিলাম না তোমার সময়ে। এটাই তো ভালোবাসা। সত্যিকারের ভালোবাসা ছেড়ে যাওয়ার নয় চাঁদ। তুমিই আমার আগের অতীতের বিশ্বাসটা ভেঙে দিলে চাঁদ। ভালোবাসি অনেক অনেক। হয়তো তোমার মত করে বাসতে পারবো না কিন্তু তবুও সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করব। তুমি যে আমার মুনপাখি।’

মুন তো ওখানেই দাঁড়িয়ে কান্না করে দিয়েছে। এই কান্না যে দুঃখের নয়, সুখের। অবশেষে আদ্রাফ মুখ ফুটে বলল। এটাই তো শুনতে চেয়েছিল আদ্রাফের মুখ থেকে মুন। আদ্রাফ উঠেই মুনকে রিং পড়িয়ে দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করে বলে উঠলো,

-‘এই পূর্ণিমার চাঁদের মতোই তুমি আমার অন্ধকার জীবনটাকে আলো করে দিয়েছো। রাতের বেলায় চাঁদ যেমন পুরো আকাশটাকে সুন্দর বানিয়ে দেয় ঠিক তুমিও আমার জীবনে এসে জীবনটাকে সুন্দর করে দিয়েছো। আমার জীবনে তুমিই আমার চাঁদ।আমার জীবনটাকে তুমিই পূর্ণ করে দিয়েছো। তুমিহীনা এই আদ্রাফের জীবন অপূর্ণ।
তুমিই আমার পূর্ণতা মুনপাখি।’

—–সমাপ্ত——

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here