গাঙচিল,পর্ব_১৫

গাঙচিল,পর্ব_১৫
লেখিকা: অজান্তা অহি (ছদ্মনাম)

—“অজান্তা,চলো আমাদের ফ্ল্যাটে ফিরে যাই।না কোরো না প্লিজ!”

অহি বিছানার চাদর টান টান করে রোদ্দুরের দিকে এক পলক গভীর চাহনি দিল।তারপর টেবিলের উপর থেকে মলিন কাভারের বালিশ দুটো বিছানার মাঝামাঝি রেখে বলল,

—“এত রাতে ফ্ল্যাটে যাব কেন?”

রোদ্দুর এগিয়ে এসে অহির মুখ সোজা বিছানায় বসে পড়লো।চট করে একটা হাত ধরে বলল,

—“এত কেন কেন করবে না তো।চলো না!”

—“মা তো যাবে না রাতের বেলা।বিয়ের দিন রাত হয়ে গেছিল বলে এ বাড়িতে থেকে গেল।আপনার মনে নেই?আজও তো রাত দশটার কাছাকাছি।”

রোদ্দুরের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হলো।সত্যিই তো!এদিকটা সে ভেবে দেখেনি।ভেবেছিল মাকে আর অহিকে সাথে নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরবে আজ রাতেই।যদিও ফ্ল্যাট বেশিদূর নয়,কিন্তু মা তো এতরাতে যেতে রাজি হবে না।

পরক্ষণে রোদ্দুরের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠলো।অহির হাত টেনে আরো একটু কাছে নিয়ে বলল,

—“মা তাহলে আজও এই বাড়িতে থাকুক।তাছাড়া মাকে দেখে বড্ড খুশি মনে হচ্ছে।এখানে সবার সাথে কথাবার্তা বলছে,ইচ্ছে মতো সব করছে।এর আগে তো সবসময় ঘরবন্দী থাকতো।নাজমা খালা আর আমি ছাড়া আর কারো সাথে পরিচয় ছিল না তেমন।প্রেমের বিয়ে বলে আমার নানার বংশের সাথেও তার সম্পর্ক নেই।বলি কি?আজ রাতটা মা তাহলে এখানে থাকুক।কাল সকালে শফিক গিয়ে রেখে আসবে বা আমি এসেই নিয়ে যাব।আজ বরং আমরা রাতের ঢাকার শহরে হাঁটি।”

অহি চিন্তিত মুখে বলল,

—“কিন্তু সবাই রাজি হবে?এত রাতে ছাড়বে আমাদের?আজই তো মাত্র এ বাড়িতে এলাম।”

—“আরে ছাড়বে ছাড়বে!অজান্তা,তুমি দ্রুত নীল রঙের শাড়িটা পড়ে ফেলো তো।”

বলে রোদ্দুর উঠে দাঁড়ালো।দরজার দিকে এগিয়ে যেতে অহি পথ আগলে দাঁড়াল।ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,

—“বাইরে যাচ্ছেন কেন?”

রোদ্দুর অবাক হয়ে বলল,

—“কেন যাচ্ছি বুঝতে পারছো না?শাড়ি পড়বে তো তুমি।রেডি হও!”

—“আজ আপনি আমায় শাড়ি পড়িয়ে দিন।”

অহির আবদারে রোদ্দুরের গলা শুকিয়ে গেল।দু পা পিছিয়ে বড়সড় ঢোক গিলল।গায়ের টিশার্টটা টেনেটুনে ঠিক করে বলল,

—“অজান্তা,আমি শাড়ি পড়াতে পারি না।”

অহি নাক ফুলিয়ে বলল,

—“সেটা পারবেন কেন?পারেন তো শুধু কাঁপা-কাঁপি করতে।শাড়ি খুলতেই আপনার দফারফা হয়ে যায়। আর শাড়ি পড়াবেন!”

রোদ্দুর আঙুল উঁচিয়ে বলল,

—“আ-আমি আজ সারা রাত ইউটিউব ঘেঁটে শাড়ি পড়া শিখবো।বুঝতে পেরেছো তুমি?না শিখলে আমার নাম রোদ্দুর হিম নয়।বলে রাখলাম।”

রোদ্দুর চলে যেতে অহি ফিক করে হেসে ফেলল।সে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করলো।

রোদ্দুর বাইরে বের হয়ে চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিল।এই মেয়ের আশপাশে থাকলে কেমন যে অনুভূতি হয়!প্যান্টের পকেট থেকে হাত বের করে সে শফিকের রুমে ঢুকলো।

শফিক কারো সাথে ফোনে কথা বলছিল।রোদ্দুরকে দেখে কল কেটে কান থেকে ফোন নামাল।শফিকের হাতে নতুন অ্যান্ড্রয়েড।টিউশনির টাকা জমিয়ে সে কিনেছে।রোদ্দুর একটা ফোন তাকে গিফট করেছিল।কিন্তু সে কিছুতেই নিতে রাজি হয়নি।অগত্যা সেটা এখন অহির হাতে।

—“হেই ব্রো!”

রোদ্দুর টেবিলের চেয়ার টেনে বসতে শফিক তার সামনাসামনি বিছানায় বসে পড়লো।তাকে একটু ক্লান্ত লাগছে।এতগুলো মানুষ বাড়িতে।এটা ওটা আনা নেওয়া করতে করতে আর বাজারে যেতে যেতে সে কিছুটা টায়ার্ড।

—“ফোনের ওপাশে কে ছিল?স্পেশাল কেউ?”

রোদ্দুরের অতিশয় স্বাভাবিক কন্ঠে শফিক ঘাবড়ে গেল।ডান হাত কপালে বার কয়েক চালান করে অহেতুক হাসার চেষ্টা করলো।রোদ্দুরের দিকে এক পলক চেয়ে বলল,

—“ফ্রেন্ড।জাস্ট ফ্রেন্ড!”

—“জাস্ট ফ্রেন্ড!বাহ!আমি হলাম গিয়ে ইনভেস্টিগেশন অফিসার।কেউ হাঁ করলেই তার ভেতরের সব পড়তে পারি।”

—“একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না রোদ্দুর ভাইয়া?হাঁ করলেই সব বুঝে যান?কই, বুবুকেই তো বুঝতে পারেননি।”

—“হে হে হে।হাসালে শফিক।তোমার বুবুকে বুঝতে পারিনি কে বলেছে?তোমার বুবুকে জিজ্ঞেস করিও।এখন সারাক্ষণ আমার কথায় উঠ-বস করে।আমার ভয়ে তার কাঁপা-কাঁপি অবস্থা।সামান্য হাত ধরলেই কেঁদে টেদে গঙ্গা বানিয়ে ফেলে।এমন ভয় পায় আমাকে।কিন্তু আমি তাকে ভীষণ ভালোবাসি বলে তার সবকিছু ভালো লাগে।এখন শোনো,তোমার জাস্ট ফ্রেন্ডের ব্যাপারে আমি মোটামুটি জানি।কতদিন হলো অ্যাফেয়ার?”

শফিক শুকনো ঢোক গিলে বলল,

—“বেশি না।চার মাসের মতো।ও আমার ক্লাসমেট।খুবই লক্ষী মেয়ে।”

—“নাম কি?”

—“ইয়ে মানে,ভাইয়া ওর নামটা….একটু কেমন জানি।আসলে ওর জন্মের সময় আলট্রাসনোগ্রাফিতে এসেছিল ছেলে হবে।সেজন্য বাসার সবাই রনি নাম ঠিক করে রেখেছিল।কিন্তু জন্মের পর দেখা গেল মেয়ে।তো কি করা!বাসার সবাই রনি বলেই ডাকে।ভার্সিটিতে ওর নাম দেয়া রনিয়া।রনির সাথে আ যুক্ত করা।আমি ওকে একটা বিশেষ নামে ডাকি।আমাদের মধ্যে তুই তুকারি সম্পর্ক।ও আমার পরিবার সম্পর্কে সবই জানে।আমাদের দারিদ্র্যতাকে সে আমার মতই আপন করে নিয়েছে।”

রোদ্দুরের ভেতর ভালো লাগা কাজ করলো।যাক,এই ছন্নছাড়া ছেলেটার জীবন গুছিয়ে দেয়ার জন্য একটা মেয়েলি হাত খুবই প্রয়োজন ছিল।সে হেসে বলল,

—“তোমার ঠেলাগাড়ি ঠেলার জন্য তো হেল্পার পেয়েই গেলে।এখন যত্ন করে তাকে আগলে রেখো।মেয়েদের হাতে জাদু আছে।বুঝেছ?তার এক ধাক্কাতেই তুমি সোজা বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাবে।”

শফিক লাজুক হাসলো।রোদ্দুর বলল,

—“বাবার ব্যবসা কেমন চলে শফিক?”

জলিল মোল্লা স্যান্ডেলের দোকান খুলেছে সেদিনের পর থেকে।এই বয়সে কেউ চাকরি বাকরি দিচ্ছিল না।সেজন্য স্যান্ডেলের ব্যবসাতে ঢুকেছে।পাইকারি দরে জুতা এনে প্রতিদিন লক্ষীবাজার ফুটপাতে বসে।ভালোই আয় হয়।বলতে গেলে রমরমা ব্যবসা।এর জন্য তিনি অহিকে আর চাকরি করতে দেননি।এমনকি শফিকের তিনটে টিউশনির একটা বাদ দিয়ে দিয়েছে।শফিক হাসিমুখে বলল,

—“অনেক ভালো চলছে।বাবা প্রফেশনাল হয়ে গেছে একদম।”

রোদ্দুর আর দেরি করলো না।হাতঘড়ির দিকে এক নজর চেয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“শফিক, আমরা এখন গুলিস্তান যাব।তোমার বুবু কান্নাকাটি করছে ফ্ল্যাটে ফেরার জন্য।ওখানে নাকি খুবই মূল্যবান কিছু ফেলে রেখে এসেছে।কত করে বললাম, চলো সকালে যাই।কিন্তু কিছুতেই শুনছে না।আমি রাজি না দেখে রুম থেকে বের করে দিয়ে দরজা আটকে বসে আছে।কি আর করা!এখন আমরা দুজন রওনা দিবো।তুমি একটু মা -বাবাসহ সবাইকে বুঝিয়ে বলো।”

শফিক কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,

—“ঠিক আছে।সমস্যা নেই।আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলছি।তাছাড়া বেশি রাত হয়নি।ঢাকাতে রাত দশটা,এগোরাটা ব্যাপার নাহ!”

রোদ্দুরের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো।

২৬.

রাতের ঢাকা শহর আলোতে ঝলমল করছে।চারপাশে হলুদ আর সাদা আলোর সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক পরিবেশ বিরাজ করছে।অহি মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছে পরিবেশটা।

রাতের ঢাকা শহরে পা ফেলে হাঁটা হয়নি তার।আজ প্রথমবারের মতো মনে হলো প্রতিটি মেয়ের একবার হলেও রাতের শহরে হাঁটা উচিত।এত এত চমৎকার একটা মুহূর্ত, অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতির সাক্ষী প্রতিটি মানুষের হওয়া উচিত।

অহি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে চলছে।চারপাশের পরিচিত পরিবেশ কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছে।সে রোদ্দুরের ধরে রাখা হাতটা চেপে দাঁড়িয়ে পড়লো ফুটপাতে।মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাল।ঘন কৃষ্ণ আকাশে ফিনিক তারার মেলা বসেছে।কালো চাদরে যেন উজ্জ্বল আলোর ছিটেফোঁটা।কি সুন্দর লাগছে।

হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।ইট,সিমেন্টের ভিড়ে দু একটা কদাচিৎ গাছের সবুজ পাতা ফিনফিনে হাওয়ায় দুলছে।সেসব পাতায় আবার রাস্তার আলো পড়ে অদ্ভুত সব নকশা তৈরি হচ্ছে।কয়েক সেকেন্ড পর পর সাই করে গাড়ি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।সব মিলিয়ে কেমন অন্য রকম পরিবেশ।

অহি রোদ্দুরের হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

—“জীবন এত সুন্দর কেন?”

রোদ্দুর হেসে ফেলল।এই মেয়েটা এত অল্পতে তুষ্ট কেন?এর চাওয়ার পরিধি এত ছোট্ট কেন?একটু বেশি চাইলে ক্ষতি কি!আর দশটা মানুষের মতো এত চাহিদা কেন নেই তার?এখানেই যে তার গাঙচিল সবার থেকে আলাদ।সবার থেকে বেস্ট।অনন্য!

সে অহির হাত ধরে কিছুটা এগিয়ে গেল।এখানে রাস্তা বেশি চওড়া।বহু মানুষ জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে।ফ্ল্যাটের কাছাকাছি এসে গেছে প্রায়।তাই তাড়াহুড়ো নেই।বাস থেকে নেমে আধঘন্টার মতো হলো তারা হাঁটছে।অহির হাত চেপে সে ফুটপাতে বসে পড়লো।

পাশের জায়গাটুকু ফু দিয়ে ধুলোমুক্ত করলো।তাতেই ক্ষান্ত হলো না রোদ্দুর।প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যুর গোছা বের করে বিছিয়ে দিল।ইশারায় অহিকে পাশে বসতে বলল।

অহি বসে পড়লো পরম আনন্দে।ফের রোদ্দুরের হাত ঝাঁকিয়ে বলল,

—“বলুন না জীবন এত সুন্দর কেন?জানেন আমার এতদিনও বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না।জীবন আমার কাছে ঋণের মতো মনে হতো।যা না চাইলেও টেনে নিয়ে যেতে হবে।একমাত্র মৃত্যুতে সে ঋণের বোঝা কাঁধে থেকে নামবে।একটা দিনও আমি বেঁচে থাকার কোনো মানে খুঁজে পাইনি।আমার গভীর রাতের দীর্ঘশ্বাসগুলো জানে কতটা কষ্টে আমার সকাল হতো।কতটা বেদনা নিয়ে রোজ আমার পৃথিবীর অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতো।

কিন্তু এই দেখুন,আপনার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে কেমন যেন সব পরিবর্তন হতে শুরু করলো।এখন আমার ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটলেই মনে হয় আমার বেঁচে থাকা সার্থক।অন্তত এই ঘটনার জন্য আমার বেঁচে থাকতে হতো।বেঁচে না থাকলে এত সুন্দর একটা মুহূর্তের আমি চিরসাক্ষী হতে পারতাম না।

আপনি মানুষটা সত্যিই ম্যাজিক জানেন।কেমন হুট করে আমার জীবনে এসে সব পরিবর্তন করে দিলেন।সব অশুভ থেকে অ শব্দটাই ভ্যানিশ করে দিলেন।আমার আমিকে আপনি প্রখর রৌদ্রে তপ্ত করে আবার নিজেই হিম হয়ে নামলেন।আপনার এই পাগলামিগুলোর অংশ হতেও আমি এখন হাজার জনম বাঁচতে চাই।শত কোটি জনম শুধু আপনাকেই চাই।”

শেষের কথাগুলো অহি ক্ষীণ কন্ঠে বলল।কিন্তু রোদ্দুরের কানে ঠিক পৌঁছাল।রোদ্দুর খালি হাতটা বুকে চেপে আছে।কোনোরকমে বলল,

—“অজান্তা!তোমার এই রোমান্টিক কথা শুনে আমার বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে।সুখের ব্যথা।প্রেমের ব্যথা!”

অহি যেন সংবিৎ ফিরে পেল।কাঠ কাঠ গলায় বললো,

—“রোমান্টিক কথা কখন বললাম আবার?”

রোদ্দুর কিছু বলল না।এই মেয়েটার তার প্রতি ভালোবাসার ধরণ অন্যরকম।অন্য রকম হবে না কেন?এই মেয়েটাই যে অন্য রকম।সবার থেকে আলাদা।

দুজন চুপচাপ বসে রইলো কিছুক্ষণ।হঠাৎ মনে পড়ায় অহি বলল,

—“আপনার বাবার সাথে কথা হয়নি আর?”

রোদ্দুর অন্যমনষ্ক হয়ে গেল।রাস্তায় চলমান রিকশা গুলোর দিকে চেয়ে বলল,

—“হয়নি অজান্তা।জানো,ছোটবেলায় আমি বাবার বাধক ছিলাম।বাবার সবকিছুতে আমি মুগ্ধ।সবসময় তাকে ফলো করতাম।তিনি যা করবেন আমারও তাই করা চাই।তিনিও আমি বলতে পাগল।সবকিছু দিয়ে আগলে রাখতেন।কিন্তু তার দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে তিনি আস্তে আস্তে আমাদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে।হঠাৎ করে তার পরিবর্তন আমি ধরতে পারি। কিন্তু আড়ালে চেপে যাই।তারপর তার বিয়ের কথা ফাঁস হওয়ার পর কেমন যেন অপছন্দ হতে থাকেন তিনি।কিছুটা পছন্দ করলেও মায়ের অসুস্থতার পর সবটা মুছে গেছে।একটা সময় যেই আমি বাবা নামক মানুষটার জন্য পাগল ছিলাম,সেই আমি আজ তার নামটাও শুনতে পছন্দ করি না।তার কথা মনে পড়লেই জীবনের সেই মুহূর্ত গুলো মনে পড়ে,যখন আমার মা নিজের গায়ে নিজে আঁচড় কাটতো।কামড়ে,খুবলে ফেলতো নিজের শরীর।নিজের সন্তানকে দা নিয়ে ধাওয়া করতো।নিজে……..”

অহি আর বলতে দেয় না।রোদ্দুরকে সে পুরনো কষ্ট গুলো, পুরনো ক্ষত গুলো মনে করতে দেবে না।তার মাকে,তাকে নিজের সবটা দিয়ে আগলে রাখবে।তার মনে একটা প্রশ্ন আসে।রোদ্দুরের বাবার দ্বিতীয় পক্ষে কোনো সন্তান আছে কি না।কিন্তু করে না।রোদ্দুরকে এসব বিষয়ে বলে মন খারাপ করিয়ে দিতে চায় না।

কিছুটা সময় কেটে যায় নিঃশব্দে।দুজন নিঃস্তব্ধতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কাব্যগাঁথা শুনে যায় যেন কান পেতে।হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়তে ঘোর কাটে রোদ্দুরের।বারোটা বাজে।এত রাতে বাইরে থাকা নিরাপদ নয়।এমনিতেই প্রচুর রাত হয়ে গেছে।

ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় সে।অহির হাত টান দিয়ে বলে,

—“অজান্তা,অনেক রাত হয়ে গেছে।চলো তাড়াতাড়ি।”

—“হুঁ!”

—“কাল সকাল থেকে আমার অফিস কিন্তু।”

অহির মন খারাপ হলেও মাথা নেড়ে হুঁ বুঝাল।তারপর দুজন হাতে হাত রেখে রাস্তা পার হয়।সাত-আট মিনিট পরেই নিজেদের ফ্ল্যাটে পৌঁছায়।ক্লান্ত শরীরটা ড্রয়িং রুমের সোফায় মেলে দিয়ে রোদ্দুর বলে,

—“অজান্তা,এক গ্লাস পানি।”

তার বলার আগেই অহি গ্লাসটা বাড়িয়ে দেয়।এক হাতে গ্লাস নিয়ে রোদ্দুর খপ করে আরেক হাতে অহির হাত চেপে ধরে।অহি চোখ দিয়ে ইশারা করে হাত ধরেছে কেন!রোদ্দুর হাত ছেড়ে দেয়।এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বলল,

—“অজান্তা,কত বার তোমার হাত ধরলাম।তারপরও যতবার হাত ধরি সেই প্রথম হাত ছোঁয়ার অনুভূতি হয়।বুকের ভেতর ধুকপুক করে।গলা শুকিয়ে যায়।অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।মনে হয় এই প্রথম হাত ধরছি।এমন কেন?”

বলে সে এক চুমুকে সম্পূর্ণ গ্লাস খালি করে।হাতের গ্লাসটা পাশে নামিয়ে রাখতেই অহি নিচু হয়ে চোখের পলকে এগিয়ে এসে রোদ্দুরের ঠোঁটে চুমু খেল।

২৭.

রোদ্দুর নিজের কেবিনে বসে ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছে।এবারের কেসটা বেশ জটিল মনে হচ্ছে।তার চেয়ে বড় জটিলতা তার মনে চেপে রেখেছে।তার সিঙ্গাপুর মিশনে যাওয়ার সব কাগজপত্র ঠিক হয়ে গেছে।পাসপোর্ট,ভিসা সব রেডি।ইভেন যাওয়ার ডেট ফাইনাল হয়ে গেছে।অথচ সে খবরটা কাউকে দেয়নি।কাউকে জানাতে পারছে না।সবটা সবার অগোচরে করা।কিন্তু এখন তো জানানো দরকার।মাকে নিয়ে চিন্তা নেই তার।অহি তাকে সামলে রাখবে।কিন্তু এতবড় ঘটনাটা অহিকে জানানো দরকার।অথচ সে অহিকে বলতে পারছে না।

কাল রাত থেকে আজ সকাল অবধি হাজার বার সে অহিকে বলার চেষ্টা করেছে।কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না।সবেমাত্র বিয়ে করেছে।এর মধ্যে এক বছরের বিচ্ছেদ।রোদ্দুরের চিন্তায় যাচ্ছে তাই অবস্থা।

দরজায় টোকা পড়ায় রোদ্দুর বলল,

—“কাম ইন!’

বিদ্যুৎ ভেতরে ঢুকে স্যালুট করে বলল,

—“স্যার,আপনার বাবা এসেছে দেখা করতে।”

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here