কাগজের তুমি আমি দ্বিতীয়_অধ্যায়,৫ম_পর্ব,৬ষ্ঠ_পর্ব

কাগজের তুমি আমি দ্বিতীয়_অধ্যায়,৫ম_পর্ব,৬ষ্ঠ_পর্ব
মুশফিকা রহমান মৈথি
৫ম_পর্ব

শেষবারের জন্য একটাবার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। জানাতে ইচ্ছে করছে তার বাচ্চাকে বাঁচানোর উপায় খুঁজে পেয়েছে ধারা। কথাটা ভাবতেই ফোনটা হাতে নিলো ধারা। এতোদিন ফোন অফ করে রেখেছিলো ধারা। ফোনটা অন করতে না করতেই মোবাইল স্ক্রিনে দিগন্তের নামটি ভেসে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে শুনতে পায়,
– তাহলে অবশেষে ফোনটা রিসিভ করলে

দিগন্তের থমথমে গলার কথাটা শুনার মাত্র চোখের কোনে পানি জমতে লাগলো ধারার। ইচ্ছে করছিলো গলা ছেড়ে কাঁদতে, নালিশ করতে, বলতে দেখো আজ তোমার জন্য আমার কি অবস্থা। কিন্তু পরবর্তীতে দিগন্তের কথাগুলো শুনে সব যেনো গলাতে এসেই আটকে গেলো। ধারার উত্তরের অপেক্ষা না করেই দিগন্ত বলতে লাগলো,
– খুব তো ভালোই আছো, বিয়ে করছো শুনলাম। তা তোমার উড বি বর জানে তো ইউ আর নট ভার্জিন।
– মানে?
– মানেটা খুব সোজা, তুমি যে বিয়ের আগেই অন্য ছেলের বেডে উঠেছো, প্রেগন্যান্ট ও হয়েছো এই কথাগুলো কি তোমার হবু বর জানে? তোমার হবু বরের জন্য আমার সত্যি ই কষ্ট হচ্ছে। বেচারা তোমার সুন্দর মুখটা দেখে বিয়েতে রাজী তো হয়ে গেছে, কিন্তু সে তো জানে না তোমার এই ভালো মানুষী চেহারাটার পেছনে একটা চরিত্রাহীন নারী লুকানো। কি জাদু করে তাকে নিজের জালে ফাসিয়েছো?

দিগন্তের কথাগুলো এক একটা বিষতীরের মতো ধারার হৃদয়ে লাগছে। ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে কিন্তু বেহায়া চোখ গুলো কারোর বাধন শুনতে নারাজ। নিজের মতোই বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। এই মানুষটাকে সে বিশ্বাস করেছিলো, এই মানুষটাকে? বুক থেকে চাপা আর্তনাদ বের হচ্ছে। আবার কোথাও না কোথাও একটা প্রশান্তি ও আছে; সময় থাকতে দিগন্তের চেহারাটা তার দেখা হয়ে গেছে। তার সন্তান নাই চিনলো তার বাবাকে, এমন বাবাকে চেনার চেয়ে না চেনাটাই উত্তম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারা বললো,
– তুমি কি আমাকে এই কথাগুলো বলতেই ফোন দিয়েছো? আমিতো সেদিন বলেই দিয়েছিলাম, আমাদের নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। তাহলে কেনো ফোন করেছো?
– শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর চাইতে, সেদিন আমার সামনে এতো সতী সাজছিলে, বাচ্চাটাকে তুমি নষ্ট করতে চাও না। তাহলে আজ ঠিক ই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে বড়লোক কাউকে বিয়ে করার কথা চিন্তা করছো। শুনেছি সে একজন ভালো ডাক্তার। এটাই যদি তোমার মনে ছিলো তবে আমার সাথে সম্পর্কে জড়ালে কেনো? কেনো আমাকে নিজের মায়ায় বাধলে? আসলে আমার ই ভুল তোমার ইনোসেন্ট মুখটা দেখে কখনো ভাবি ই নি তুমি এতোটা স্বার্থপর হতে পারো। তোমার সরল মুখের পেছনের কুটিল ধারাকে বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।

দিগন্তের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, বারবার গলা ধরে আসছে। খুব কষ্ট হচ্ছে যা বলে বুঝাতে পারছে না। চোখগুলো জ্বলছে, বারবার ভিজে আসছে। রাগে, দুঃখে সব তছনছ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। ধারা কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। এরপর নীরবতা ভেঙ্গে ঠান্ডা গলায় বললো,
– তুমি বারবার আমাকে অনুভব করিয়ে দাও আমি আবেগে ভেসে কতোটা বড় ভুল করেছি, ঠিক বলেছো আমি স্বার্থপর, খুব স্বার্থপর। আজ নিজের স্বার্থপরতার কারণে আমার এই পরিণতি। তবে কি জানো আমার মনে কোথাও একটা খারাপ লাগা কাজ করছিলো, তোমাকে ঠকাচ্ছি নাতো এটা ভেবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বেশ করেছি বিয়েতে রাজী হয়ে। যাকে আমি বিশ্বাস করে সর্বস্ব দিতেও পিছ পা হই নি সেই মানুষটা যখন আমাকে নিয়ে এতো বাজে কথা বলতে পারে, তখন আমার সত্যি নিজের উপর ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়। কি ভুলটাই না করেছি। যাক আমার মতো কুটিল মেয়ে তোমার জীবনে আর কোনোদিন কোনোকিছুর দাবি নিয়ে দাঁড়াবে না। আশা করি সুখে থাকবে। আর আমার বিয়ে এসো। সত্যি আমি একজন ভালো মানুষকে নিজের জালে ফেলেছি। তাকে দেখেও যেও সাথে বিয়েটাও খেয়ে যেও। রাখছি।

বলেই ফোনটা রেখে দেয় ধারা। সেখানেই ধপ করে বসে পড়ে সে। পেটে হাত দিয়ে ধরা কন্ঠে বলে,
– আমি ওকে কোনোদিন জানতে দিবো না তোর অস্তিত্ব। কোনোদিন না। সে যদি মনে করে তুই নেই, তবে তাই সই। তাই সই

বলেই হু হু করে কেঁদে উঠলো সে। অপরদিকে রাগে ক্ষোভে হাতে থাকা ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিগন্ত। নিজের ব্যাথিত মনকে কিছুতে শান্ত করতে পারছে না। সব কিছু একটা সপ্তাহে উলট পালট হয়ে গেলো। কেনো যেনো সব কিছু এলোমেলো লাগছে। ধারাকে সে সত্যি ভালোবেসেছিলো, খুব ভালোবেসেছিলো। এমনটা কেনো করলো ধারা এটা ভেবেই বুকটা হু হু করে উঠছে দিগন্তের। চোখটা বন্ধ করলেই সেই শুভ্র নারীর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। রাগ উঠছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে দিগন্তের। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে একের পর এক দেয়ালে আঘাত করছে কিন্তু মনকে শান্ত করতে পারছে না। কিছুতেই না_______

__________________________________________________________________________________________________________________________________________________________________________

সন্ধ্যা ৭টা,
স্থানঃ ধারাদের বাসা
হলুদের অনুষ্ঠান খুব না হলেও মোটামোটি জাকজমকভাবেই হচ্ছে। সেলিম সাহেবের যদিও এতোটা জাকজমক ভাবে করার ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু সুভাসিনী বেগমের একটাই কথা, তার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা, সে কোনো কমতি রাখবে না। আর ধারার জীবনে ও এই বিয়েটা প্রথমবারই হচ্ছে সুতরাং এসব সাদামাটাভাবে বিয়ের আয়োজন তার একেবারেই পছন্দ হয় নি। সেলিম সাহেবের আপত্তি ছিলো যেহেতু এখন ধর্মীয়ভাবে বিয়েটা গ্রহণযোগ্য নয়, তাই লোক দেখানো আয়োজনের কি দরকার। কিন্তু সুভাসিনী বেগমের কথা তখনের কথা তখন দেখা যাবে, দরকার হলে বাচ্চাটা হবার পর আরো ধুমধাম করে তাদের বিয়ে দিবেন। সুভাসিনী বেগমের আগ্রহ দেখে অনল ও কোনো আপত্তি জানায় নি। তার মাকে এতোটা খুশি বিগত ক বছরে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে। তার মাকে প্রাণবন্তভাবে হাসতে দেখে তার ও মনে একটা স্বস্তি কাজ করছে, বিয়ের বুদ্ধিটা এতোটাও খারাপ নয়।

ধারার রুমে যেতেই সুভাসিনী বেগম দেখলেন, তার বান্ধবীরা তাকে সাজাতে ব্যস্ত। কাঁচা হলুদ কাতানের শাড়িতে কি অপরুপ লাগছে ধারাকে। ফর্সা গায়ে হলুদ রংটা যেনো মিলে আছে। সুভাসিনী বেগম নিজে পছন্দ করেছেন এই শাড়িটা। চোখে মোটা করে কাজল দিয়ে দিয়েছে, ঠোটে কড়া লাল লিপস্টিক, গা ভর্তি সাদা ফুলের গহনা। কাল অবধি মেয়েটাকে একটা জ্যন্ত লাশের মতো লাগছিলো তার কাছে। কিন্তু আজ কি মায়াবীটাই না লাগছে। কিন্তু মুখটা তবুও শুকনো করে রেখেছে। অন্যমনস্ক হয়ে জীবনের হিসাব মিলাতে যেনো ব্যস্ত। কাছে যেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
– আমার বউমাটাকে কি মিষ্টি না লাগছে

সুভাসিনী বেগমের কথাটা কর্ণপাত হতেই মাথা তুলে তাকায় ধারা। ছলছল নয়নে তার প্রতি অনুগত প্রকাশ করে সে, আজ তার জন্যই ধারার বাচ্চাটা নতুন জীবন পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে। সুভাসিনী বেগম মুচকি হাসি দিয়ে বলেন,
– নতুন বউ এর কি কাদতে আছে রে পাগলী
– তুমি এতো ভালো কেনো ফুপি?

সুভাসিনী বেগমের মাজা জড়িয়ে বলে ধারা। সুভাসিনী বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
– আমি ভালো নই রে, খুব স্বার্থপর। নিজের স্বার্থে তোকে আমার ঘরে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। বয়স তো কম হলো না, ছেলেটার জীবনটা সাজিয়ে দিতে চাই। আমার বিশ্বাস তুই পারবি ধারা, আমার ইট পাথরের বাড়িটাকে সংসার করে তুলতে। কাঁদিস না। এখনও অনেক লড়াই বাকি

সুভাসিনী বেগমের কথাগুলোর মর্ম ধারার বোধগম্য হলো না। অবাক নয়নে শুধু দেখতে লাগলো তাকে। তার চোখে একটা শুন্যতার ছোঁয়া আছে যা ধারার হৃদয়কেও নাড়িয়ে দিলো___

হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলে বর, কনেকে একই সাথে স্টেজে আনা হলো। পাশাপাশি বসে রয়েছে অনল, ধারা। আড় চোখে একবার একে অপরকে দেখে নিলো তারা। অনলকে বেশ মানিয়েছে সাদা পাঞ্জাবিতে, তার উপরে একটা কোটি পরা। হাতা কনুই অবধি ফোল্ড করে রেখেছে, হাতে কালো একটা টাইটান ঘড়ি। চুল গুলো বেশ সুন্দর করে স্টাইল করে রেখেছে সে। অনলের সাথে চোখে চোখ পরতেই চোখ সরিয়ে নিলো ধারা। যেনো চোর ধরা পরেছে, এমন লাগছে নিজের কাছে। সবাই একে একে হলুদ দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একটি মেয়ে স্টেজে উঠতেই অনলের মুখের ভাব বদলে গেলো। ধারার কাছে মেয়েটিকে বেশ চেনা চেনা লাগছিলো। অনলের গালে হলুদ দেওয়ার সময় ধীর কন্ঠে বললো সে…………

চলবে

কাগজের_তুমি_আমি
দ্বিতীয়_অধ্যায়
৬ষ্ঠ_পর্ব

হঠাৎ একটি মেয়ে স্টেজে উঠতেই অনলের মুখের ভাব বদলে গেলো। ধারার কাছে মেয়েটিকে বেশ চেনা চেনা লাগছিলো। অনলের গালে হলুদ দেওয়ার সময় ধীর কন্ঠে বললো সে,
– তাহলে বিয়েটা করছো! তোমার বিয়েতে দাওয়াতি হিসেবে আসবো ভাবি নি। অভিনন্দন রইলো।

খুব ধীরে বললেও ধারার কানে ঠিক ই গেলো কথাগুলো। মেয়েটির চোখ চিকচিক করছে। যেন এখনই অশ্রুধারাগুলো মুক্তি দিয়ে দিবে তার চোখ জোড়া। অনল নির্বিকারভাবেই বসে রয়েছে। ধারা একবার অনলের মুখ আর একবার মেয়েটির মুখ পানে চাওয়া চাওয়ি করছে। মনের মধ্যে একরকম অস্বস্তি কাজ করছে, মেয়েটির সাথে অনলের কি সম্পর্ক এটা জানার কৌতুহলে মনটা বারবার ব্যাহত হয়ে উঠছে। সে কি তার অনল ভাই এর জীবনে একটি অবাঞ্ছিত কাঁটা রুপে এসেছে! বুঝতে পারছে না। এতো সুন্দর সুপুরুষের কোনো প্রেমিকা থাকবে না এমনটা ভাবাও হয়তো বোকামি হবে।
– ধন্যবাদ আসার জন্য মাহি, ভেবেছিলাম তুমি আসবে না। তুমি আসাতে খুব ভালো লাগলো, আমাদের জন্য দোয়া করো। শামিম, রাফিদরাও এসেছে। তুমি ওদের সাথেই থেকো।

অনলের হাসিমুখে কথাগুলো শুনে আবার চিন্তায় পড়ে গেলো ধারা। লোকটা এমন ভাবে কথা বলছে যেনো মাহি নামক মেয়েটার উপস্থিতি তার কাছে ব্যাপার ই নয়, তার কিছুই যায় আসে না। মাহি মুখে মলিন হাসি একে ধারার উদ্দেশ্যে বললো,
– তুমি অনেক লাকি, অনল ভাই এর মতো একজনকে স্বামী হিসেবে পাচ্ছো। আমরা তো ভেবেছিলাম সারাজীবন একা একা ই কাটিয়ে দিবে সে। খুব জানার ইচ্ছে হয় কি জাদু করেছো সে অনল ভাই পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেলো। অবশ্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছি, যাক গে নিজের খেয়াল রেখো সাথে বাবুর ও। মাত্র তিন সপ্তাহ চলছে তো, এই সময় একটু রিস্ক থাকে।

বলেই মাহি স্টেজ থেকে নেমে গেলো। অনল চোয়াল এখনো শক্ত করে বসে রয়েছে, মাহির কথাটাগুলো তার পছন্দ হয় নি। ধারা মাথা নিচু করে আছে, এখন সে মেয়েটিকে চিনতে পেরেছে। মাহি তার কন্সাল্টেড ডাক্তার। তাকে চেকাপ সেই করেছে। কিন্তু হাসি মুখেও কিছু ঠেস মারা কথা বলেদিলো মেয়েটি। তার চোখে অনলের জন্য অন্য অনুভূতি অনুভব করলো ধারা। সে তো মেয়ে, একটা মেয়ের চোখ পড়া এতোটাও কঠিন নয় তার জন্য। খুব ইচ্ছে করছিলো অনলকে কিছু জিজ্ঞেস করতে, কিন্তু অনলের ওই এক দোষ; জিজ্ঞেস করলে ট্যারা কিছু কথা শুনিয়ে দিবে যা একেবারেই সহ্য হবে না অনলের। তাই মুখে কলুপ এটে বসে থাকাই শ্রেয়।

হলুদের অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে, অতিথিরা সবাই যে যার মতো চলে যাচ্ছে। অনল নিজেই তাদের বিদায় দিচ্ছে। সবাইকে বিদায় দিতে দিতে শামিম, রাফিদ, মাইসার সাথে দেখা। বেশ হাসি তামাশা করলো তারা। এরা তার হাসপাতালের কলিগ। বেশ ভালো সম্পর্ক তাদের সাথে তার। মাহিও আছে তাদের মধ্যা। মাহি একটা কথাও বললো না। সবাই সামনে এগোলে মাহি বলে উঠলো,
– তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো, সময় হবে?
– কাজের কথা? প্যাশেন্ট রিলেটেড?
– নাহ, কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই

অনলের বুঝতে বাকি রইলো না মেয়েটা কি বলতে চায়। সম্মতি জানিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গেলো মাহিকে অনল। বেশ থমথমে গলায় মাহিকে বললো সে,
– বলো, কিসের উত্তর?
– আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এমন পুরুষ যে একজনকে ভালোবাসলে যত কিছু হয়ে যাক না কেনো তার জায়গাটা কাউকে দিবে না। কিন্তু এখন তো দেখছি সেরকম কিছুই না

মাহির কথাটা কর্ণপাত হতেই বেশ ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকায় অনল। মেয়েটাকে হাজারো বার বুঝালেও কেনো যানে তার মাথায় কিছু ঢুকে না হয়তো। ঠেস মারা কথায় যখন কিছু করতে পারে নি এখন অনলের কাটা ঘায়ে আঘাত করে মেজাজ তুঙ্গে তুলে দিলো অনলের। চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে লাগলো অনলের, চোখগুলো লাল হতে লাগলো। তার অতীতের ক্ষত এখন ও ততোটাই তাজা যতটা তখন ছিলো। মানুষের সামনে স্বাভাবিক মানুষের ন্যায় থাকলেও এখনো সেই ক্ষত বয়ে বেরোচ্ছে সে। অতীতের সুবর্ণ কথাগুলো মনে পড়তেই বুকটা হাহাকার করে উঠলো। শুন্যতা তাকে এতোটা কঠোর ভাবে জাকড়ে রেখেছে যে চাইলেও সেখান থেকে বের হতে পারবে না। বেশ ঠান্ডা থমথমে গলায় অনল প্রশ্ন ছুড়লো মাহির দিকে,
– কথাগুলোর মর্ম আমার মোটা মাথায় ঢুকছে না মাহি। তুমি এমনভাবে বিহেভ করছো যেনো আমি তোমাকে চিট করেছি বা তুমি আমার এক্স। এজ এ কলিগ, কথাগুলো বড্ড বেমানান হয়ে যায় না।

অনলের কথায় অনেকটা অপমানিত বোধ হয় মাহির। কথাগুলো সে এভাবে বলতে চায় নি। বারংবার অনলের কাছে তাকে অপমানিত হতে হয়। মাহি অনলের মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র। অনলের প্রতি তার অনুভূতিগুলো বরাবর ই তীব্র ছিলো। সে অনলকে এর আগেও নিজের মনের অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করেছে কিন্তু অনল সবসময়ই নিজের বক্তব্য এ অনড়। নিজের বেহায়াপনায় নিজের ই লজ্জা লাগছে মাহির। চোখ নিচু মাহিকে অনলের ও ভালো লাগছে না। নিজের কন্ঠ স্বাভাবিক করে বলে সে,
– তোমার প্রশ্নটা এখনো করা হয় নি
– ধারাই কেনো? তুমি তো বলেছিলে তোমার মনে কোনো নারীর প্রবেশ ঘটবে না। তাহলে ধারা কেন?

বেহায়ার মতোই ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠলো মাহি। মানুষকে এই ভালোবাসা নামক হৃদয় হর্ষক শব্দটা অনেকটাই বেহায়ার মতো বানিয়ে দেয়। মাহির ক্ষেত্রেও সেটাই খাটছে। মাহির এমন প্রশ্নে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে হয়ে পরে অনল। সত্যি ই তো সেতো বলেছিলো কাউকে নিজের মনে ঠায় দিবে না। তার মনে একজন ই থাকবে, কিন্তু আজ ঠিক ই ধারাকে তার বউ এর জায়গা দিতে হচ্ছে। মানু্ষ তো বুঝছে না কি সংঘর্ষ মনের সাথে চলছে অনলের। যদিও মনকে সামলাতে বলছে না সে কখনোই ধারাকে মনে ঠাই দিবে না। কিন্তু একটা সুপ্ত ভয় থেকেই যাচ্ছে।
– কি হলো উত্তর দিচ্ছো না যে? যদি এটাই তোমার সাথী হতে করা লাগতো তবে আমিও তো করতেই পারতাম

মাহির কথাটা শুনে বেশ হতবাক হয়ে যায় অনল। বেশ কড়া কন্ঠেই বলে,
– এজন্য আমি ধারাকে বিয়ে করছি। সে তোমার মতো নিচ চিন্তা করে না। ভালোবাসে বলে কাছে এসেছে। আর কোনোই অন্তমর্ম তার ছিলো না। সে কাছে এসেছে কারণ আমি চেয়েছি। আর একটা কথা, ধারা আমার জীবনে না থাকলেও আমি তোমাকে নিজের ছোট বোনের মতোই দেখতাম। আমার তোমার প্রতি কখনোই কোনো অনুভূতি ছিলো না, হবেও না। রাত অনেক হয়েছে আস্তে পারো।

অনলের কথাগুলোয় পুনরায় অপমানিত বোধ হলো মাহি। তার উত্তর গুলো সে পেয়ে গেছে। মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে মাহির। ছুটে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো সে। দরজায় কোনায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো ধারা। মুখ চেপে কান্না আটকালো সে। আজ তার জন্য অনলকে এমন কথাগুলো শুনতে হলো। যে পাপ সে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আজ সেই পাপের অংশীদার অনল নিজেকে দাবি করছে। এই পাপের বোঝাটা সারাটাজীবন তাদের মাঝে থাকবে। সারাটাজীবন অনলের কাছে ছোট হয়ে গেলো ধারা।
– তুই তো মানুষ ভালো না, বউ হওয়ার আগেই টিপিক্যাল বউদের মতো স্পাইগিরি করছিস।

কথাটা কানে আসতেই…..

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here