কথা_দিয়েছিলে_ফিরবে #পর্ব_১৬

#কথা_দিয়েছিলে_ফিরবে
#পর্ব_১৬
লেখিকা : আফরোজা আক্তার

সেদিনকার মত সব মিটে যায় । নাফিস অফিস শেষে বাসায় এসে চুপ করে নিজের রুমে বসে আছে । মাথায় সাজিয়ে নিচ্ছে সব কিছু । কারণ এখন নিজেকে সব থেকে বেশি শক্ত রাখতে হবে । তার মতামতের কথা সবাইকে জানাতে হবে । আর এইবার যাতে কোন রকম বাঁধা না আসে , সেই দিকটাও তাকেই দেখতে হবে । আজ অফিসে সবার সামনে জুঁইকে নিয়ে যেসব কথা সে বলেছে , তার প্রতিটা কথা সত্যি করতে হবে । জুঁইকে এক নতুন পৃথিবী দিতে হবে । ইফসিকে বাবার ছায়া দিতে হবে । ভালোবাসার মানুষ হয়ে নিজের সবটুকু দিয়ে জুঁই আর ইফসিকে এই নির্মম পৃথিবীর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে ।
নাফিসের এইসব ভাবনার মাঝে শান্তা মানে নাফিসের ছোট বোন নাফিসের রুমে প্রবেশ করে । ভাইকে এইভাবে চিন্তিত দেখে ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসে শান্তা । পাশে বসে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে সে ,

– কিরে ভাইয়া ? কি হয়েছে ?
-…………………
– এই ভাইয়া কি হয়েছে ?
– একটা ডিসিশন নিয়েছি ।
– কি ডিসিশন নিয়েছিস ?
– আমি জুঁইকে বিয়ে করবো । ইফসির দায়িত্ব নিবো ।

ভাইয়ের কথা শুনে একটু ভড়কে যায় শান্তা । বিয়ে করবে তার ভাই তাও আবার জুঁইকে তাও আবার বাচ্চা সমেত । শান্তা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ভাইয়ের কথা শুনে নিজের মতামত পোষণ করে ।

– তোর জীবন , তুই যেভাবে গুছিয়ে নিবে তাতে অন্তত আমাকে আপুকে আর বাবাকে তোর পাশে পাবি । জুঁই আপুকে যদি বিয়েও করিস , তাতেও আমাদের আপত্তি নেই তবে সমস্যা তো অন্য জায়গায় ।
– মা , তাই তো ?

ভাইয়ের কথায় মাথা নিচু করে রাখে সে । নাফিস আবারও বলা শুরু করে ।

– তিন বছর আগে আমি কিছু করতাম না বলে মায়ের কথার নিচে পড়ে নিজেকে এক প্রকার কবর দিয়ে দিয়েছিলাম । একটা নিষ্পাপ মেয়েকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিয়েছি অনেক । আর না , টাকা-ই যদি মায়ের কাছে সব হয় তাহলে আমি বর্তমানে এই সংসারে সবার খাওয়া পরার দায়িত্ব নিয়েছি । সেক্ষেত্রে আমার কথাই তাকে শুনতে হবে ।
– তুই যদি স্ট্রং থাকিস তাহলে মনে হয় না মা জোর খাটাতে পারবে ।
– হ্যাঁ ,
– এক কাজ করি আমি আপুর সাথে কথা বলে রাখবো , কাল বিকেলে আমরা জুঁই আপুর বাসায় যাবো ।
– নাহ থাক , বাসায় যেতে হবে না ।
– এই তোর হবু বউকে আমরা তুলতে যাবো না , বুঝলি । ইফসিটা তো অনেক কিউটরে ভাইয়া ।
– হ্যাঁ , একদম জুঁই । পুরো জুঁইয়ের ডুপ্লিকেট ।
– হা হা ,
– ঝুঁটি করলে যা সুন্দর লাগে না মেয়েটাকে । আমাকে পেলে সে তার মাকেও ভুলে যায় ।
– তাই ?
– হু ,
– ঠিকাছে , আমরা কাল আপুর বাসায় যাবো , আর হ্যাঁ কাল রাতেই তুই কথা তুলবি , আপু আর ভাইয়াকেও বলবো থাকতে ।
– দেখি ,
– দেখি না । বলবি , সবাই থাকলে মা আর বেশি তার জোর খাটাতে পারবে না ।

দুই ভাই বোন যুক্তি করে সব ঠিকঠাক করে আরেক বোনকেও সব জানিয়ে দেয় । নাফিসের পরিবারে সবাই এক পাশে শুধু নাফিসের মা-ই আলাদা একা এক পাশে । আর এটাই তাদের ভয়ের কারণ ।

পরদিন বিকেলে ডোরবেলের আওয়াজ পেয়ে জুঁই গিয়ে দরজা খুলে । দরজায় নাফিসকে দেখে হাল্কা হাসি দেয় সে । এ সময় নাফিস আসবে ভাবে নি সে । দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেই নাফিস জুঁইকে বলে ,

– ঘুমাচ্ছিলে নাকি ?
– হ্যাঁ , একটু শুয়েছিলাম । উঠে নামাজ পড়লাম ।
– বুড়ি টা কোথায় ?
– মুড অফ , ঘুম থেকে উঠছে তার জন্যে । ভেতরে আসবে না ?
– মেহমান আসছে তো !
– কে আসছে ?
– এই যে এনারা এসেছেন ।

বলে পিছনে হাত দিয়ে দেখায় নাফিস । নাফিস সরে গেলে জুঁই নাফিসের দুই বোন শান্তা আর শাম্মিকে দেখতে পায় । শান্তা আর শাম্মিকে দেখে জুঁই পুরাই থ হয়ে যায় । আর ওরা দুজনও এত বছর পরে জুঁইকে এইভাবে দেখে অবাক হয়ে যায় । শান্তা দৌড়ে এসে জুঁইকে জড়িয়ে ধরে । জুঁইয়ের গালে একটা চুমু খায় শান্তা ।

– আপু তুমি কেমন আছো গো ?

জুঁই জবাব দিবে কি ? সে তো পুরাই থ । পিছন থেকে শাম্মিও এসে জড়িয়ে নেয় জুঁইকে । শাম্মিও বলে ওঠে ,

– কেমন আছো কাদম্বরী ?

শাম্মি জুঁইকে কাদম্বরী বলে ডাকতো । তার ভাই ডাকতো আর জুঁইও দেখতে এতটাই মিষ্টি যে , যে কেউই তাকে আদর করতো । জুঁই হালকা করে সবার চোখের আড়ালে আড় চোখে নাফিসের দিকে তাকায় । আর নাফিসও মুচকি হেসে চোখ মেরে দেয় জুঁইকে । তারপর ওরা দুজন এক সাথে বলে ওঠে ,

– কি গো বলো না কেমন আছো ?
– হে , ওহ । হ্যাঁ ভালো আছি । তোমরা কেমন আছো গো ?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি আমরা । এখন থেকে হয়তো আরও ভালো থাকবো ।
– ভেতরে আসো ।

জুঁই ওদের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যায় । শান্তা আর শাম্মি বেশ হেসে হেসে ভেতরে ঢুকে যায় । তখন শাম্মি বলে ওঠে ,

– আপু তোমার মেয়ে কইগো ?

শাম্মির মুখ থেকে এই কথা শুনে একটু বিচলিত হয়ে জুঁই নাফিসের দিকে তাকায় । নাফিস তখন চোখের ইশারায় জুঁইকে বুঝায় সবটা । জুঁই তখন নিজের চোখ জোড়া শান্ত করে বন্ধ করে ফেলে ।

– ইফসি কই আপু ?

শান্তার কথায় জুঁই উত্তর দেয় ,

– ওই রুমে , বসে আছে ।
– আমরা যাই তাহলে ?
– যাও ।

শান্তা আর শাম্মি ওই রুমে যায় ইফসিকে দেখতে । আর এই ফাঁকে জুঁই নাফিসকে বলে ওঠে ,

– ওরা কি সবটা জানে নাফিস ?
– শান্তা আগে থেকেই জানতো আর গতকাল রাতে শাম্মি জেনেছে ।
– নাফিস , যা হচ্ছে তা কি ঠিক হচ্ছে ?

জুঁইয়ের এমন কথায় নাফিস জুঁইয়ের কাছে এসে জুঁইকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় । আলতো করে জুঁইয়ের ঘাড়ের চুলের মাঝে নিজের মুখ ডোবায় । তখন বলে ,

– যা হচ্ছে একদম ঠিক হচ্ছে । ভালো যখন বাসি তাহলে প্রকাশ করতে ক্ষতি কোথায় ।
– কিন্তু নাফিস আমি যে ,,,,,,,,,,,,,

তখন নাফিস তার হাত দিয়ে জুঁইয়ের ঠোঁট জোড়ায় বাঁধা দেয় ,

– আর কিছু বলো না প্লিজ । তুমি কি , তুমি কেমন আমি সব জানি । দয়া করে এইসব আর বলো না । প্লিজ
– আমার ভয় হয় নাফিস । সুখের দিন গুলো স্থায়ী হবে তো ?
– ইনশাআল্লাহ হবে ।
– আমার কপালে তো সুখ সয় না নাফিস ।
– এইবার থেকে সইবে , দেখে নিও ।

শান্তা আর শাম্মি তখন রুমে ইফসিকে ইচ্ছামত চটকাচ্ছে । যেন মনে হচ্ছে এটা তাদের ভাইয়ের আপন সন্তান । আর ইফসিকে কোলে তুলে নিয়ে ওরা দুজন নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে ।

– এই শান্তা এটা এত কিউট কেন রে ?
– একদম জুঁই আপুর মত না ?
– হ্যাঁ , একদম ।
– ইশশ , মাশা-আল্লাহ , এই বুড়ি ফুপি ডাকো তো আমাদের ।
– হ্যাঁ , এই ফুপি ডাকো তো মা ।

শান্তা আর শাম্মি ইফসিকে দিয়ে ফুপি বলানোর চেষ্টা করতে ব্যস্ত৷। কিন্তু ইফসি বুড়ি যে মুখে খিল দিয়েছে তো দিয়েছেই । সে এক্কেবারে চুপ হয়ে আছে । কিচ্ছু বলে না সে । শান্তা ওর গালে ঠোঁটে চুমা দেয় । শাম্মি ওর ঝুঁটিতে চুমা দেয় । আর ইফসি বুড়ি চুপ করে ওদের আদর খাচ্ছে কিন্তু কথা বলে না ।

– এই আপু ,
– হু ,
– বাবা ওরে দেখলে কি যে করবে , আল্লাহ জানে ।
– হ্যাঁ , এটা এত কিউট মাশা-আল্লাহ আমার তো মনে হচ্ছে এখনি খেয়ে ফেলি ।

এমন সময় জুঁই আর নাফিস রুমে পা রাখে । পেছন থেকে তারা দুজনেই শান্তা আর শাম্মির কার্যকলাপ দেখছে । নাফিস এগিয়ে গিয়ে ওদের কাছ থেকে ইফসিকে নিজের কোলে তুলে নেয় । নাফিসকে দেখে ইফসি ভুবন মাতানো হাসি দেয় । নাফিসের গলা জড়িয়ে ধরে ইফসি । এটা দেখে শান্তা আর শাম্মি অবাক । ওরা বলে ,

– দেখেছো , কি পঁচা মেয়ে । আমাদের সাথে একটু হাসলোও না আর এখন পাপার কোলে গিয়ে কি হাসি

ওদের মুখ থেকে পাপা কথাটা শুনে জুঁইয়ের বুকে ধক করে একটা ধাক্কা দেয় । ওরা যে এতটা আপন করে নিবে ইফসিকে এটা জুঁই এখনও ভাবতেই পারে নি । ওদের কথা শুনে নাফিস জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হেসে দেয় । তার এই হাসি যেন বলে দিচ্ছিলো ” জুঁই দেখেছো তো সব ঠিক হচ্ছে ” , ” জুঁই বলেছিলাম না সব ভুলিয়ে দিবো ” , ” জুঁই আমি পারবো তুমি দেখো , আমি পারবো ” ।
তারপর নাফিস ইফসিকে অনেক আদর করে দেয় আর বলে ,

– পাপা ডাকো তো মা , ডাকো তো পাপা ।

ইফসিও অনায়াসে পাপা বলে ডেকে উঠে । বাচ্চাটা পাপার মানে বুঝার আগেই তার পাপা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় না ফেরার দেশে । আর যতটুকু ছিল ততটুকু ইফসিকে ততটা খেয়ালই করেনি ফারুক ।
এদিকে ইফসির মুখে পাপা শুনে নাফিস কেন জানি ইফসিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাখে । নাফিসের চোখের কোণে পানি জমে যায় । নাফিস আবারও বলে ,

– আবার বলো তো মা , বলো তো পাপা । বলো মা পাপা বলো ।

ইফসি আবারও পাপা বলে ওঠে । তখন ওরা হেসে দেয় । এরপর নাফিস ইফসিকে বলে ,

– মা , ফুপি বলো । এইযে এরা ফুপি । ডাকো তো মা , ফুপি বলে ডাকো ।

ইফসি কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে মায়ের দিকে তাকায় । তখন জুঁই এগিয়ে এসে ইফসিকে কোলে তুলে নেয় ।

– আম্মুন , ডাকো তো একটু । ফুপি বলে ডেকে দেও তো ।

মায়ের কথায় ঠোঁট ফুলিয়ে ” পুপি ” বলে ডেকে উঠে ইফসি । ইফসির মুখ থেকে শব্দটা বের হবার সাথে সাথে শান্তা ইফসিকে কোলে তুলে নেয় আর অজস্র চুমায় ভরিয়ে দেয় ইফসির ছোট ছোট গাল গুলো । শাম্মিও আদর করে দেয় । এ যেন এক ভালোবাসার পরিবার হতে দেখা যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে জুঁইয়ের সময় পরিবর্তন করতে ছুটে চলছে ।

সেদিন রাতে সবাইকে নিয়ে ড্রইং রুমে বসে নাফিস । এদিকে শান্তা শাম্মি আর শাম্মির স্বামী এরা জানে সবটা । এখন শুধু নাফিসের বাবা মাকে জানানোর পালা । নাফিসের মা আর বাবা পাশাপাশি বসে আছে । আরেক সোফায় ওরা তিন জন বসা । আর সিংগেল সোফায় নাফিস বসা । তখন নাফিসের মা বলে ওঠে ,

– তুই কি কিছু বলবি ?

মায়ের কথায় মাথা তুলে তাকায় নাফিস । তারপর মাথা নাড়িয়ে মুখ দিয়ে বলে ,

– হ্যাঁ ,
– ওহ , বল কি বলবি ।
– বাবা , আমি ঠিক করেছি আমি বিয়ে করবো ।

আনিস বেপারি আর রেহানা বেগম এক সাথে বলে ওঠে ,

– আলহামদুলিল্লাহ ভালো তো ।

তখন নাফিসের মা রেহানা পারভিন বলে ওঠে ,

– আমি কালই তোর খালার সাথে কথা বলবো , সব ঠিক করে ফেলবো ।

এই কথা শুনে আনিস বেপারির মুখে কালো মেঘ ভর করে । কারণ তিনি রেহানা পারভিন এর বাপের বাড়ির দিকে কখনোই সম্মতি পোষণ করেন নি । তখন নাফিস আবার বলে ওঠে ,

– আমার কথা শেষ হোক , তারপর বলো মা ?
– আচ্ছা বল কি বলবি ?
– বিয়ে করবো বলেছি , খালার মেয়েকে করবো বলি নি ।
– তাহলে কাকে করবি ? পছন্দ আছে নাকি ?

তখন নাফিস দৃঢ় কন্ঠে বলে ,

– আমি জুঁইকে বিয়ে করবো । আর এটাই আমার শেষ কথা ।

জুঁইয়ের নাম শুনে রেহানা পারভিন যেন আকাশ থেকে পড়ে । ছেলে এটা কি বলে ? তখন তিনি সাথে সাথে বলে ওঠে ,

– এত বছর পরে জুঁই এলো কই থেকে ?
– যেখান থেকেই আসুক , ও-কেই বিয়ে করবো আমি ।
– শুনছিলাম তো বিয়ে হয়েছে ওই মেয়ের ।
– হ্যাঁ , একটা বাচ্চাও আছে । স্বামী মারা গেছে ।
– কিহহ , তুই শেষে কিনা এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করবি ।

তখনই আনিস সাহেব বলে ওঠে ,

– জুঁই আর নাফিস তখন বিয়ে করলেও তো ওদের একটা বাচ্চা থাকতো ।
– তুমি চুপ থাকো , খবর দার কথা বলবা না । নাফিস এইসব বাদ দে । ওই বিবাহিত এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করবে আমার ছেলে কখনো না ।

তখন শান্তা বলে ,

– তোমার সমস্যা কি মা ? ভাইয়ার জীবন ভাইয়া যা পারে করবে । তোমার তো সমস্যা হওয়ার কথা না ।
– হ্যাঁ মা , এটা তো ঠিকই এটা ভাইয়ার জীবন , ভাইয়া যা ভালো বুঝবে করবে ।

রেহানা পারভিন দুই মেয়েকেই ধমক দিয়ে উঠেন ,

– একদম চুপ , কি বুঝিস তোরা এইসবের । হ্যাঁ , কি বুঝিস ? একদম চুপ ।
– মা , শুনো । ভুলে যেও না তোমার জন্যেই কিন্তু এইসব হয়েছিল । এখন ভাইয়া যা চায় তাই হোক । আমাদের আপত্তি নেই এতে ।

তখন আনিস বেপারিও বলে ওঠে ,

– হ্যাঁ , আমারও আপত্তি নেই ।

তখন নাফিস অত্যন্ত ভদ্রতার সহিত তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে ,

– মা মনে পড়ে , তিন বছর আগে এমন এক রাতের বেলায় তোমাদের নিয়ে বসেছিলাম । আমার মুখ থেকে কথাটা বের হওয়া মাত্রই তুমি মা কি করেছিলে ? তখন নির্বোধ ছিলাম , আয় রোজগার ছিল না । আমার উপর আমার বোনদের দায়িত্ব এই সেই বলে নিজেকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিছো । তোমার ভাবনাকে সম্মান দিয়ে নিজের সব কিছু বিসর্জন দিয়ে দিছি । তোমার ইচ্ছাতে সম্মতি পোষণ করে একটা নিষ্পাপ মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছি । তবে মা এখনকার আর তখনকার সময়ের মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ । ভুলে যেও না আমি তোমারই ছেলে । তুমি যতটা দূর আগাবে আমিও ততটা দূর আগাতে পারি বরং তার চাইতে বেশি পারি । তাই বলছি , আমায় রাগিয়ে দিও না । এই পুরো সংসারটা আমার টাকায় চলে । এইযে কাপড় পরে মানুষকে দেখাও তাও আমার টাকায় ।
– নাফিসসস ,
– বাস্তব কথা বললাম । খোটা দেই নি । তোমরা আমার মা বাবা । তোমরা হাজার পাবে আমার কাছে এটা সত্যি । তবে আমি আমার জীবনে সবটা হারাতে পারবো না মা । বিয়ে জুঁইকেই করবো , এটাই ফাইনাল ।

নাফিস এই কথা বলে সবার সামনে থেকে উঠে চলে যায় । আর রেহানা পারভিন যেন এই মুহুর্তে বিষ খেয়ে বিষ হজম করছেন ।

অফিসে সবাই এখন নাফিস আর জুঁইকে দেখলে মাথা নিচু করে থাকে । হয়তো লজ্জা নয়তো রাগ । তবে নাফিস এইসবের কিছুই তোয়াক্কা করে না । যে পুরুষ নিজের মাকেই তোয়াক্কা করে নি সে আর অন্যদের কি তোয়াক্কা করবে । নাফিসের এমন ডিসিশনে মাহবুব স্যার , মোহি এমনকি নাফিসের পরিবারের সবাই শুধু তার মা ছাড়া সবাই রাজি ।

অন্যদিকে , জুঁই তার মাকে সবটা জানিয়েছে । সে অন্তত এতটুকু জানে যে তার মায়ের কাছ থেকে সে সর্বদিক থেকে সাপোর্ট পাবে । তাই ভাই আর ভাবীকে না জানিয়ে আগে মাকে জানিয়েছে । সেদিন সন্ধ্যায় জুঁইয়ের মা জুঁইয়ের বাসায় আসে । তখন মাকে খোলসা করে সবটাই জানায় সে ।

– তুই কি রাজি আছিস মা ?
– বার বার ফিরিয়ে দিয়েছি মা , বিশ্বাস করো । অনেক বার ফিরিয়ে দিয়েছিলাম । পরে দেখলাম মানুষটাকে আর আমার এই হতভাগ্য জীবনটাকে আরেকটা সুযোগ দিয়েই দেখি না । অন্তত ইফসিটা তো বাবার ছায়া পাবে ।
– হ্যাঁ রে মা , মানুষ একা বাঁচতে পারে না । একজন পুরুষ লাগেই জীবনে । আমি তো ভেবেই পাই নি যে নাফিস এতদিন পর এইভাবে তোকে আপন করে নিবে ।
– হ্যাঁ মা । সে একটুও বদলায় নি মা ।
– আল্লাহ পাক যেনো এইবার তোর ভাগ্যে ভালো কিছু রাখে রে মা । আমি যাতে মরার আগে দেখে যেতে পারি ।
– এইসব বলো না মা । তুমি ভালো থাকো এটাই অনেক আমার জন্যে ।
– নাফিসকে একবার আসতে বল , দেখি ও-কে ।
– ও তো মনে হয় বাসায় মা ।
– তাহলে থাক ।

হঠাৎ করেই জুঁইয়ের কিছু মনে পড়ে যায় । আর জুঁই বারান্দায় চলে যায় । মেয়ের এমন ভাবে উঠে জানালার কাছে যাওয়া দেখে জুঁইয়ের মা অবাক হয়ে যায় । উঠে মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় ।

– কিরে মা , এইদিকে চলে এলি যে ।
– বেনারসি পরে নিজের ভালোবাসাকে মাটি চাপা দিয়ে বউ বেশে ফারুকের ঘরে গিয়েছিলাম মা । কিন্তু আল্লাহ পাক কি খেলাই টা না খেলে দিলেন আমার সাথে । আল্লাহ পাক আমার ভাগ্যটাকে কি দিয়ে গড়েছে আমি আজও বুঝলাম না মা ।
– কাঁদিস না মা , আর কাঁদিস না । আল্লাহ পাক তোকে তো কম কাঁদায় নি হয়তো সামনে তোর অনেক সুখ আছে ।
– আমার তো আবার সুখে এলার্জি মা , দেখো না কোন সুখই কপালে সয় না ।
– আয় খেতে আয় ।

এই বলে জুঁইয়ের মা ইফসিকে কোলে নিয়ে সামনের রুমে যায় । আর জুঁই চাপা স্বরে কেঁদে দেয় । এমন অবস্থাতেই নাফিসের ফোন এসে জুঁইয়ের মোবাইলে । নাফিসের ফোন পেয়ে নিজেকে শান্ত করে গলা ঠিক করে ফোনে হাত দেয় জুঁই ।

– হ্যালো আসসালামু আলাইকুম !
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , কাঁদছো কেন ?
– কই না তো ,
– কই কি আবার , কাঁদছিলে তুমি । কন্ঠই বলে দিচ্ছে ।
– এমন কিছুই না ।
– আমি আমার কাদম্বরীর নিঃশ্বাসটাও চিনি ।
– বাদ দাও , কি করো ?
– কি করি ?
– হু কি করো ?
– বলবো ?
– হু বলো ,
– বলবো ?
– হ্যাঁ , বলো না ।
– শুনবে?
– হ্যাঁ ,
– তবে শুনো ,

” ওগো আমার কাদম্বরী
শুনতে কি পাও তুমি
তোমার আলতা রাঙা পায়ে
নুপুর পরিয়ে তার তালে
মাতাল মোর মন
আমি তোমারও সনে
থাকিবো সদা
ইহাই আমার পন
লাল শাড়িতে বউ সাজিয়ে
আনবো আমার ঘরে
তোমার রূপে দেখো গো
আমি যাতে না যাই মরে ”

নাফিসের এই কাব্যে জুঁইয়ের যেন কলিজা ফেটে যাচ্ছে । নাফিসকে কেন যেন দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তার । খুব ইচ্ছে হচ্ছে আজ নাফিসকে দেখতে । তখনই নাফিস হেসে বলে ,

– কেমন হলো ,

তখনই জুঁই তার বক্তব্য রাখে ,

– নাফিস আমি তোমাকে দেখতে চাই , এক্ষুনি এই মুহুর্তে দেখতে চাই ।
– এখন ?
– হ্যাঁ , প্লিজ আসো । আমি তোমাকে দেখতে চাই ,
– আচ্ছা তবে আজ কাদম্বরী এত রোমান্টিক হলো কি করে ,
– আসবে কিনা বলো ?
– আচ্ছা বাবা , আসতেছি ।
– আমি অপেক্ষায় আছি ।

” তুমি অপেক্ষায় রত থাকো
কাদম্বরী
আমি গাজরা হাতে আসবো
তোমার কাছে
নিতে তোমায় আপন করে
আমার এই মনে ”

এই বলে নাফিস লাইন কেটে দেয় । আর জুঁই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে নাফিসের আসার পথে ।।

.
.

চলবে………..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here