ওহে_প্রেয়সী_ভালোবাসি,পর্ব-২,৩

#ওহে_প্রেয়সী_ভালোবাসি,পর্ব-২,৩
#মারিয়া মীম
পর্ব-২

” নো, ফ্লাওয়ার, আপি যাবে না। ভাইয়া যাবে।”
পেছন থেকে আওয়াজ হতেই আমরা পেছনে তাকালাম।

২.
পুনম ওর ভাইয়াকে দেখেই আমার কোল থেকে নেমে ভাইয়ার কাছে গিয়ে জরিয়ে ধরে। ভাইয়া ওকে কোলে নিতেই পুনম আদুরে গলায় বলল, “ইয়েয়েয়ে… খুব মজা হবে। ”
আমি চলে আসতে নিলেই মানুষটা ডাক দিল, “প্রিয়তা! ” আমি কিছু না বলে শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম। উনিই আবার বলল,
“তোমার আজ কলেজে যেতে হবে না। কাল থেকে যেও। ”

নিচে আসতেই দেখা পেলান ফুফুর। রান্না ঘরে নাস্তা বানানোয় ব্যস্ত তিনি। আমাকে দেখেই আদুরে গলায় ডাকল,
“উঠে পড়েছিস? যাক ভালোই হলো। টেবিলে দেখ নাস্তা দেওয়া আছে৷ প্রিয়ক উঠেছে? না উঠলে ডাক দে। একসাথে খেয়ে নে দুজন। ”
“উঠেছে মামনি। পুনমের সাথে আসছে। ”
“ঠিক আছে। বস তুই। আমি হাতটা ধুয়েই আসছি। ”
“আচ্ছা মামনি৷ ”

ছোট থেকেই ফুফুকে মামনি বলি আমি। ফুফু আমার মায়ের থেকে কোন অংশে কম না। আমার জন্মের সময় মা অসুস্থ ছিল খুব। সেসময় ফুফুই আমাকে সামলে রেখেছে। অতটুকুন একটা বাচ্চা মেয়েকে সামলানো সহজ কথা নয়। যা ফুফু করেছিল। মা পুরো সময়টাই শুয়ে থাকত। আমাকে কোলে নিয়ে বসবে সেই অবস্থাটাও ছিল না। তার কারন খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল মায়ের। বিয়ের পরপরই আমার জন্ম। অত অল্প বয়সে এতটা ধকল নিতে না পারায় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুই তিনমাস লেগে গিয়েছিল মায়ের সুস্থ হতে। এসময় মা আমাকে খুব বেশি যেটা করতে পারত তা হলো আমাকে খাওয়ানো আর ঘুম পাড়ানো। বাকি সবকিছু ফুফুই করতো। দাদী না থাকায় পুরোটাই ফুফুর উপর এসে পড়ে। কথা বলা শিখতেই ফুফুকে মামনি ডাকি আমি। আর ফুফু ও আমাকে মেয়ের মতো না মেয়েই মনে করে আদর যত্ন করে।

টেবিলে বসার কিছু মুহূর্ত পার না হতেই পুনম আর প্রিয়ক নিচে নেমে আসে। পুনম তখনও প্রিয়কের কোলে। পুনমকে নিয়ে বের হতে গেলেই মামনি বাঁধা দেয়। বলে,
“আগে খেয়ে নে। তারপর যা।”
“মা, অলরেডি অনেকটা লেইট হয়ে গিয়েছে। খেতে বসলে আরো লেইট হবে। এসে খেয়ে নিব।”
“কোনো লেটফেট হয়নি। এখনও অনেকটা সময় আছে । আগে খেয়ে নে। তারপর যাবি। ”
“আচ্ছা। ”
মামনির রাগের কাছে বাধ্য হতে হয় প্রিয়ককে। অবশ্য মায়ের বাধ্য ছেলেই বলা যায় প্রিয়ককে। পুনমকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসে পড়ে আমার পাশের চেয়ারে। তার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে যায় আমার। সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেই। বুঝতে পারি তার দৃৃষ্টিও আমাতেই ছিল। প্রিয়ক কোনো মতে একটা স্যান্ডউইচ খেয়ে উঠে পড়ে। পুনম আগেই খেয়ে নিয়েছিল। তাই আর কিছু খায় না। পুনমকে আবার ও কোলে নিয়ে বলল,
“সবাইকে বাই বলো।”
“গুড বাই, মাম্মা, আপি।”
“গুড বাই, মাই লাভ বার্ড। ”

পুনমকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আরও একবার তার দৃষ্টিতে আবদ্ধ করে নেয় আমাকে। প্রিয়ক আর পুনম বের হয়ে যাওয়ার পর আমি আর মামনি খেয়ে নেয়। নিজের মনের ভেতরের অবস্থা ভিতরে রেখেই মামনির সাথে গল্প করে সকালটা কাটালাম।

এখন শরৎকাল। এসময়ের আকাশটা আমার খুব পছন্দের। মন খারাপ কিংবা ভালো দুটোর সাক্ষী ওই দূরের নীল সাদা রঙের মিশ্রিত আকাশ। মামনিদের ছাদের উপর একটা ছোট দোলনায় বসে আছি আমি। দোলনাটায় আসলেই ছোট। একজন সুন্দরভাবে বসতে পারবে। আর দুজন বসতে গেলে একজনের কোলে আরেকজনকে বসতে হবে। দোলনাটা আমিই বানাতে বলেছিলাম। আমার জীদের কাছে হার মেনে প্রিয়কই বানিয়ে দিয়েছিল। সেদিনটার কথা এখনও চোখে ভাসে।
তখনও এমনি শরৎকাল ছিল। হঠাৎ করেই এসেছিলাম মামনিদের বাসায়। আর এসেই কেন জানি চলে আসি ছাদে। আশপাশ দেখতে দেখতে হুট করে দোলনায় দোল খাওয়ার ইচ্ছা হলো। কিন্তু ছাদে কোনো দোলনা ছিল না। তাই দৌড়ে নিচে নেমে মামনির কাছে যায়।

“মামনি, মামনি।”
“কি হলো তোর আবার? হুট করে এসেই ছাদে চলে গেলি। আবার এখন নেমে লাফাচ্ছিস কেন?’
” উফফ মামনি। আমার কথা তো শোনো।”
“আচ্ছা বল। শুনছি।”
“ভাইয়া কোথায় বলোতো?”
“ওতো ওর ঘরেই আছে। হয়তো ঘুমাচ্ছে।”. ” এখন! কিন্তু এখন তো ভাইয়া ঘুমায় না । তাহলে?”
“অনেক রাত করে ফিরেছে কাল। তাই।”
“আচ্ছা দেখছি আমি।”

বলেই মামনির আর কোনো কথা না শুনেই উপরে চলে যায় ভাইয়ার রুমে। ভাইয়া কখনও দরজা লক করে ঘুমায় না। তার খোলায় পেলাম। ভিতরে ঢুকে আসলেই ভাইয়াকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলাম। একবার ডাকবো না ডাকবো না করেও মনের ইচ্ছা দমিয়ে না রাখতে পেরে ডাক দেই ভাইয়াকে।
‘ভাইয়া, ও ভাইয়া। ওঠো না।”
ভাইয়া একটু নড়েচড়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। উঠাবোই ভাইয়াকে। তাই টেবিলের উপর থাকা পানির গ্লাসের কিছুটা পানি ভাইয়ার মুখে ঢেলে দেয়। এভাবে পানি ঢালায় ভাইয়া লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। সাথে রেগেও যায়। সেসময় ভাইয়ার চোখ দেখে ভয় পেয়েছিলাম খুব। তবে ভাইয়া আমাকে দেখতেই শান্ত হয়ে যায়। সমস্ত রাগ যেন হাওয়ায় মিশে যায়। ভাইয়া সবার উপর রেগে গেলেও আমার বেলায় তা হয়ে ওঠে না। সেদিনও তাই হয়েছিল। শুধু আস্তে করে বলেছিল, “এটা কি করলি তুই?”
ভয়ে আমতা আমতা করে বলেছিলাম, “সরি ভা.ভাইয়া। তু.তুমি উঠছিলে না। তাই।”
“তাই বলে এভাবে? আর এখন এখানে কেন তুই?”
“এমনি।”
“আচ্ছা কি চাই সেটা বল। আর কিছু না চাইলে নিচে যা। মামনির সাথে কাজ কর। ”
“দোলনা। দোলনা চাই ভাইয়া৷ ”

ভাইয়া আমার কথায় অনেকটাই অবাক হয়েছিল। কেমন করে যেন দেখছিল আমাকে। যেন কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী এসে দাঁড়িয়ে আছে ওনার সামনে। কিছুকাল পার হতেই বলল, ” মাথা কি গেছে তোর। ছোট বাচ্চা নাকি তুই? তুই দোলনা দিয়ে কী করবি? ”

ততক্ষণে আমার সব ভয় উধাও হয়ে গিয়েছে। জেদ ধরি দোলনার জন্য। না পেরে সেদিনই লোক নিয়ে এসে বানিয়েছিল দোলনাটা। দোলনা দেখে এতোটাই পছন্দ হয়েছিল যে খুশিতে ভাইয়াকে জরিয়ে ধরছিলাম। ভাইয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “আমার পাগলিটা।” আমার খুশিটাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আজ! তার জন্যই মিথ্যা অপবাদ বয়ে বেড়াচ্ছি দিনের পর দিন। ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি কানে আসতেই হুস ফেরে আমার৷ দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসার সময় দুহাতের বাঁধা পায়। হুট করে এমনটা হওয়ায় ভয়ে কেঁপে উঠি। সামনে তাকাতেই দেখি প্রিয়ক দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে নিমিষেই ভয়টা কেটে যায়। কিন্তু প্রিয়ক এখানে কখন এলো তা বুঝতে পারলাম না। আমি নিজেকে তার বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিতেই ভাইয়া বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করিস কেন সবসময়? এখনি তো পড়ে যাচ্ছিলি।”

আমি কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আবারও হাত ধরে টান দেয়। এবার টানে সোজা তার বুকে গিয়ে পড়ি। ভয় ও পায় কিছুটা। তাতে আপনা আপনিই দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরি। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে প্রিয়ক আমাকে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরে। আর বলল,
“আর একবার ছটফট করলে ছাদে নিয়ে যেয়ে নিচে ফেলে দিবো বলে দিলাম। চুপচাপ এভাবে থাক। ”

আমি চুপ করে রইলাম। জানি আমার ক্ষেত্রে এমনটা কখনই করবে না। তবুও চুপ করে রইলাম কি বলে সেটা শুনতে। এবার প্রিয়ক নিজেই আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুহাত আমার গালে রেখে বলল,
“এই পাগলী, আমার সাথে কেন কথা বলছিস না? হ্যাঁ কেন বলছিস না। আজ পাঁচদিন হলো এসেছি আমি। চার মধ্যে দুটো কথাও তুই আমার সাথে বলিস নি। সবার সাথে কথা বলছিস। এমনকি পুনমের সাথেও দুষ্টুমি করছিস। শুধু আমার সাথে কথা বলছিস না। কেন হ্যাঁ কেন? কি করেছি আমি।”
“এত কিছুর পর ও তুমি আশা করছো তোমার সাথে কথা বলবো? কি করেছো জানো না তুমি? আমার জীবনটা শেষ করে এখন বলছো কি করেছো। কি করেছো জানোনা, তাইনা ভাইয়া? কিচ্ছু জানোনা তুমি?”

চলবে….????

( ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন এবং অবশ্যই ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে আমাকে শুধরাতে সাহায্য করবেন। আর এতোটা অপেক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ।)

#ওহে_প্রেয়সী_ভালোবাসি
#মারিয়া মীম (ছদ্মনাম)
পর্ব ৩

রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে আমার। প্রায় একঘন্টার উপর শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছি। তবুও রাগটা কমছে না। যে মানুষটা এতো কিছু করলো, যার জন্য এত কিছু হলো, সেই এখন জিজ্ঞাসা করছে কী করেছে! মানুষটার প্রতি যা একটু সম্মান বাকি ছিল তাও যেন শেষ হতে চলেছে। নিচ থেকে মামনির ডাক কানে আসায় নিচে নেমে আসি। বেতের তৈরি সোফার উপর বসে আছে মামনি। তার পাশে পুনম আর প্রিয়ক ও আছে। পুনমের হাতে মিল্কশেক। মামনির হাতে চায়ের কাপ আর প্রিয়কের হাতে কফি মগ। মামনি আমাকে দেখে একটা চাপের কাপ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“প্রিয়ক বলল মাথা ধরেছে নাকি তোর? নে এটা ধর। চা টা খেয়ে নে। দেখবি মাথা ধরাতরা সব সেরে যাবে। ”
“না মামনি। কিছু খাবো না এখন। ঠিক আছি আমি। ”
“কত ঠিক আছিস, জানি আমি। বস তো এখানে। চুপচাপ চা টা শেষ কর। ”

বাধ্য হয়েই চাপের কাপ হাতে নিলাম। আর এও বুঝতে পারলাম আমার এ সময়ে গোসলের কারন প্রিয়ক মামনিকে আমার মাথা ব্যথার অযুহাত দিয়েছে। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলাম মনে মনে। একটু একটু করে চায়ের কাপে চুমুক বসাচ্ছি আর প্রিয়ককে দেখছি। কতটা শান্ত ভাবে বসে কফি খাচ্ছে মানুষটা। কে বলবে এই মানুষটা কারো সুন্দর জীবনকে নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছে। তবে এই মানুষটার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার আছে। অনেক প্রশ্ন আছে। যার উত্তর একমাত্র তার কাছেই আসে। আর সেই উত্তর যে কোনো মূল্যেই আমার চাই।
চা প্রায় শেষের দিকে। তখন মামনিকে বললাম,
“মামনি, আমার ফোনটা দেখেছো তুমি? কয়েকদিন ধরে পাচ্ছি না। ”
“ওটা ভেঙে গেছে। তাই ফেলে দিছি। নতুন ফোন কালকেই পেয়ে যাবি।”

মামনি কিছু বলার আগেই কফি মগে আর এক চুমুক দিয়ে প্রিয়ক বলল। অত্যন্ত অবাক হয়ে তাকালাম প্রিয়কের দিকে। অথচ মানুষটার এদিকে যেন কোন ধ্যান নেই। সে তার মতো কফি খেতে ব্যস্ত। কত সহজে বলে দিল ভেঙে গেছে। যেদিন প্রিয়ক বাইরে থেকে এসেছে সেদিন থেকেই ফোনটা পাচ্ছি না। তার মানে ফোনটা প্রিয়কই সরিয়েছে। ভাবতেই মনটা আরো বিষিয়ে উঠল। সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মামনির দিকে তাকিয়ে বললাম,
“মামনি তোমার ফোনটা দাও তো। আম্মির সাথে কথা বলবো। ”
“আচ্ছা এই..”
“মায়েরটা নেওয়ার দরকার নেই। আমার টা নিয়ে যা। ”

মামনিকে বাধা দিয়ে প্রিয়ক তার ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে কথাটা বলল। রাগ লাগছিল খুব। মামনির সামনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইনি। তাই ফোনটা নিয়ে উপরে চলে আসি। আসার সময় মামনিকে আসছি বলেই এসেছি। তবে প্রিয়ককে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিনি। তবে তার দৃষ্টি যে আমার যাওয়ার পানে ছিল তা বুঝতে অসুবিধা হলো না।
রুমে এসেই আগে মায়ের নাম্বারে ফোন দেওয়ার জন্য ফোন অন করতেই দেখলাম লক দেওয়া। প্রিয়ক না খুলেই আমার কাছে ফোন দেওয়ার জন্য রাগ হলো খুব। দু একবার চেষ্ঠা করেও যখন খুলতে পারলাম না তখন পিছন থেকে আওয়াজ এলো।
“উল্টা পাল্টা পাসওয়ার্ড দিয়ে ট্রাই না করে সঠিকটা দিলেই তো খুলে যায়। তোর দেওয়া পাসওয়ার্ডটাই আছে। ”

প্রিয়কের কথায় চরম মাত্রায় অবাক হলাম। আজ থেকে আরো চার বছর আগে ভাইয়া যখন নতুন ফোন কিনে তখন ফোনটা সবার প্রথম আমি হাতে নিয়েছিলাম। দুষ্টুমি করে আমার নাম লিখে পাসওয়ার্ড দিয়ে দেই৷ ভাইয়া তা দেখে আমাকে কিছুই বলে নি। শুধু মুচকি হেসেছিল শুধু। কিন্তু এটা তো সেই ফোন নয়। অন্য আরেকটা৷ লক স্ক্রিনে আমার নাম লিখতেই তা আনলক হয়ে যায়। একটু বেশিই অবাক হয় আমি। প্রিয়কের দিকে তাকাতেই দেখলাম হালকা হাসির রেখা ফুটে আছে। যেন চোখে হাসছে মনে হলো। আমি কিছু না বলেই আম্মিকে ফোন দিলাম। আর প্রিয়ক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই নিচে চলে যায়।
ফোনের ওপাশ থেকে আম্মির কন্ঠস্বর পেতেই ঢুকরে কেঁদে ফেললাম আমি। আম্মি আমাকে শান্ত হতে বলে।
“পাগল মেয়ে আমার। এভাবে কাঁদে নাকি কেউ? চুপ যা তো। আমার লক্ষী। ”
“তুমি কেমন আছো আম্মি। তোমাকে ভীষণ মিস করছি।”
“আমি ঠিক আছি। আর আমি এও জানি তুই ও ভালো থাকবি ওখানে। ওখানে যে তোর আর এক মা আছে। ”
“হুম, আম্মি। কিন্তু ভাইয়াকে যখন দেখি রাগে আগুন জলে। মনে হয় খু*ন করে ফেলি তাকে। ”
“শান্ত হ। আমার মেয়েটা এত অধৈর্য কবে হলো? যে ধৈর্য ধরে সবকিছু সামলায় একদিনের এতটা ধৈর্যহারা হয়ে গেল।”
“আম্মি, তাকে দেখলে মাথা ঠিক থাকে না আমার।”
“অধৈর্য হইস না মা আমার। একটু সবুর কর। আর প্রিয়ককে জিজ্ঞেস করছিলি কেন করেছিল এমনটা সে? কিছু বলেছে?”
“না আম্মি। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করি নি। তার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই আমার। ”
“জানি রে। তবুও বলতে তো হবেই। আমি ও যে জানতে চাই আমার ফুলের মতো পবিত্র মেয়েটার গায়ে কেন মিথ্যা কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে গেল? কেনই বা তোকে বিয়ে করল?”
“আচ্ছা আম্মি। সময় সুযোগ বুঝে জানতে চাইবো।”
“ঠিক আছে। মন খারাপ করবি না একদম। নিজেকে শক্ত করে রাখবি। মায়ের মতো দূর্বল হবি না একদম। ”
“হুম।”

আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দিলাম আমি। তারপরই কিছু একটা মনে পড়তেই ফোনের গ্যালারিতে গেলাম। এখানের অবস্থাও সেই পূর্বের ন্যায়। আমার অজস্র ছবি আর ভিডিওতে ভর্তি হয়ে আছে। এগুলো একসময় খুব প্রিয় থাকলেও আজ তা যেন সহ্য হচ্ছে না। আমার সমস্ত ছবি আর ভিডিও ডিলেট করে দেয় ফোন থেকে। তাতে কিছুটা শান্ত মনে হয় নিজেকে। ডায়াল প্যাডে গিয়ে খুব সাবধানে একটা নাম্বার উঠিয়ে কল করি। দুবার রিং হওয়ার পর ও রিসিভ না হওয়ায় ডিলেট করে দেই নাম্বারটা। ফোন নিয়ে নিচে যেতে গেলেই রিং বেজে ওঠে ফোনের। স্ক্রিনে পরিচিত নাম্বার দেখতেই তা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে আসা শব্দে বুক কেঁপে উঠল আমার। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই “এখনও কথা বলা শেষ হয়নি?”
শব্দে পিছনে তাকাতেই দেখলাম প্রিয়ক দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু না বলে ফোন কেটে দেয়৷ “হয়েছে।” বলে ফোন তার হাতে দিতেই মনে পড়ে নাম্বারটা ডিলেট করা হয়নি। যদি দেখে তাহলে কি হবে ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে আমার। আবার ফোন চাইবো তার আগেই প্রিয়ক ফোন নিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রিয়ক বেরিয়ে যেতেই বিছানায় ধপ করে বসে পড়ি। টেনশন আর ভয়ে নিজেকে পাগল পাগল লাগছে আমার। কিন্তু কিছু মুহুর্ত পার হতেই প্রিয়ক হন্তদন্ত হয়ে আবারও রুমে আসে। আর এসেই আমার গলা টিপে ধরে। আর বলে,
“বড্ড বার বেড়েছিস তুই। তোর সাহস কি করে হলো ছবিগুলো ডিলেট করার? বল কি করে হলো? ”

শ্বাস আটকে আসে আমার। তবুও ছাড়ার নাম নেই। তার চোখমুখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। আর সে আগুনে আমাকে পুড়িয়ে ছাই না করা পর্যন্ত নিভবে না। একসময় হুট করেই আমাকে ছেড়ে দেয়। ছাড় পেতেই তার থেকে খানিকটা দূরে সরে যায়। বার কয়েক জোরে জোরে শ্বাস টানতে থাকি। সেই সাথে কাশি তো আছেই। প্রিয়ক আমার দিকে আবার ও অগ্রসর হতে নিলেই নিজেকে গুটিয়ে নেই। তবে এবার তার চোখে রাগ নয়, যেন কষ্ট দেখতে পেলাম আমি। বাট সেটা কিসের কষ্ট? আমার এই অবস্থা দেখে নাকি আমাকে শেষ করতে না পারায়! উত্তর পেলাম না কোনো। এর মাঝেই প্রিয়ক আমাকে তার বুকে জরিয়ে নেয়। আমি ছাড়াতে গেলে শুনতে পায়,
“আই ম সরি, প্রিয়তা। আই রেলি সরি। বিশ্বাস কর তোকে কষ্ট দিতে চাইনি। তুই বল তোকে কখনও কষ্ট দিতে পারি আমি? বললা? পারি আমি।”

শেষের কথাগুলো আমার গালে হাত রেখে বলল। আমার সারা মুখে তার উষ্ণ পরশ বুলাতে থাকে পাগলের মতো। সেই মুহূর্তে মনে হলো আমি অন্য কোথায় রয়েছি। প্রিয়ক তখন পাগলের মতো করছিল। যেন কষ্ট আমি না, ও পেয়েছে। কিন্তু কেন? আমার কষ্টে সে কেন পাগলের মতো করছে?

সারাদিন নিজের উত্তাপে পুরো ধরনীকে উত্তপ্ত করে রাখলেও সন্ধ্যা নামলেই যেন নিজেকে আড়ালে লুকিয়ে ফেলে দূর আকাশে থাকা নক্ষত্রটি। সে সময় প্রকৃতি সেজে উঠে অন্য রকম এক সৌন্দর্যে। এক সময় তা রুপ নিতে থাকে কালো আঁধারের। সেই আঁধারকে আবার আলোকিত করতে উদয় হয় অন্য আরেকটি গ্রহ। তাতে হয়তো পুরো ধরনী আলোকিত হয় না। তবুও আলোকিত করার অনির্বাণ চেষ্টা তার। তবে কৃত্রিম আলোয় ঠিকই আলোকিত হয় ধরনী। সেই কৃত্রিম আলোর মৃদু রেখা সারা রুমে পড়তেই চোখে পড়ল প্রিয়ককে। রাতের খাবার খেয়ে এসে নিজে শুয়ে পড়লেও রাতজাগা পাখির মত জেগে আছে প্রিয়ক। কাল রাতের মতো আজও তার হাতে কলমটি রয়েছে। তা দ্বারা কিছু লিখে চলেছে একটু পর পর। এই মুহূর্তে একটা নিষিদ্ধ ইচ্ছা মনের মাঝে জাগ্রত হলো। তবে তা করা হলো না। এলোমেলো চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালাম তা আর টের পেলাম না।

কপালে কিছু শীতল স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায় আমার। মস্তিষ্ক জাগ্রত হলেও হতে পারল না চোখদুটি। বড্ড ক্লান্ত মনে হলো তাকে। মেলতে কষ্ট হচ্ছে। পিটপিট করে চোখ মেলতেই আবছা আলোয় প্রিয়কের মুখটা চোখে পড়ল। কিছু একটা করছে সে। একটু পরই ঠান্ডা কিছু আমার কপালে রাখতেই কেঁপে উঠলাম আমি। উঠতে গেলে নিজের শরীরের উপর প্রচন্ড ভার মনে হলো। জ্বর এসেছে বুঝতে আর বাকি রইলো না। আর প্রিয়ক যে মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে তাও বুঝতে পারলাম। ছোট বেলা থেকেই এই অভ্যাসটা আছে আমার। ভয় পেলে জ্বর চলে আসে। সন্ধ্যায় প্রিয়কের হুট করে ওমন করায় যে ভয় পেয়েছিলাম এটা তারই পরিনাম। প্রিয়ককে কিছু বলতে চাইলেও কন্ঠস্বর থেকে কোনো ধ্বনি বের হলো না। শুধু ঠোঁট নাড়াতে পারলাম। তাতে প্রিয়ক কি বুঝল কে জানে। তবে আমাকে বলল,
“কথা বলিস না। চুপ করে শুয়ে থাক। ঠিক হয়ে যাবে।”
প্রিয়কের কন্ঠস্বর অন্য রকম ছিল। অনেকক্ষণ কান্না করলে বা জোর করে কান্না আটকে রাখলে যেমম শোনা যায় ঠিক তেমন। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অন্য রকম আলোড়ন সৃষ্টি হতে লাগল।

চলবে….???

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here