ওহে_প্রেয়সী_ভালোবাসি,পর্ব ১৫

#ওহে_প্রেয়সী_ভালোবাসি,পর্ব ১৫
মারিয়া মীম (ছদ্মনাম)

দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। প্রকৃতি পাল্টায় তার রুপ। আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে ছয়টি ঋতুর আবর্তন ঘটলেও প্রভাব দেখা দেয় তিনটির। গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। এখন প্রকৃতি পুরো দুস্তর শীতের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছে। কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আশে চারপাশ। দৃষ্টির নিকটে থাকা বস্তুও অদৃশ্যমান। এরই মাঝে কম্বল মুড়ি দিয়ে প্রশান্তির ঘুমের রাজ্যে ডুবে আছে প্রিয়ক। তাকে দেখে একটা দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় চাপল। সেটা পূরন করতেই সব জানালার পর্দা সরিয়ে দিই। তারপর খুব সাবধানে একটা রুমাল ভিজিয়ে এনে কম্বল উঠিয়ে প্রিয়কের মুখের উপর বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা ফেলি। দুয়েক ফোঁটা পড়তেই লাফিয়ে ওঠে প্রিয়ক। আর আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠি। প্রিয়ক রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসব কি ছেলেমানুষী, প্রিয়তা। পাগল হয়ে গেলি নাকি?”
তারপর মুখের উপর পড়া পানির বিন্দুগুলো মুছে নেয়। আর আমি তখনও হেঁসে চলেছি। এরপর হুট করেই প্রিয়ক আমাকে বেডে ফেলে দিয়ে সেই ভেজা রুমাল আমার সারামুখ গলায় লাগিয়ে দেয়। হঠাৎ এমন হওয়ায় আমি ঘাবড়ে যায়। শীত শীত অনুভূতি হতেই প্রিয়ককে ধাক্কা মে’রে সরিয়ে দিতে চাইলে আমার দুহাত নিজের হাত দিয়ে বিছানার সাথে চেপে ধরে। আর বলল,
“দেখ এবার কেমন লাগে? ”
কেমন লাগছিল তো তা বুঝতে পারছিলাম না। অদ্ভুত এক অনুভূতি। অস্থির লাগছিল। তার দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না। দৃষ্টি নামিয়ে নিই৷ ঠান্ডা অনুভুতি ততক্ষণে কেটে গিয়েছে। আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেই তাকিয়ে আছে। প্রিয়ক মৃদু স্বরে বলল,
“প্রিয়তা৷ ”
প্রিয়কের ডাকে তার দিকে ফিরতেই সে নেশালো কণ্ঠে বলল,
“এমন পাগলামি আর করিস না। এই পাগল একবার পাগলামি শুরু করলে তখন কিন্তু খুব করে পস্তাতে হবে। যা সহ্য করতে পারবি তো?”
প্রিয়কের কথার অর্থ খুব ভালো করেই অনুভর করতে পারছি আমি। হালকা লজ্জাভাব এসে ভর করে। নিজেকে কম্বলের মাঝে লুকিয়ে নিই৷ প্রিয়ক আর কিছু না বলে উঠে ওয়াসরুমে চলে যায়। প্রিয়ক যেতেই আমি নিচে চলে আসি।

শীত মানেই এক অন্য রকম আনন্দ। চারদিকে নানা রকম পিঠা বানানোর ধুম পড়ে। হরেক রকমের মজার মজার পিঠা। সেই সাথে আছে বাহারি সব খাবার। যা দেখেই মনটা নেচে ওঠে। শুধুমাত্র এই একটি কারনে শীত আমার পছন্দের একটি ঋতু। তবে এসময় কষ্ট লাগে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য। যা এই শীতের তীব্রতা সহ্য করেও পড়ে থাকে রাস্তার অলিতে-গলিতে। একটা পাতলা কাপড় পর্যন্ত থাকে না অনেকের কাছে। তাদের জন্য শীতটা বড্ড কষ্টের। গরমে তাও সহ্য করতে পারলেও শীতের তীব্রতা যত বাড়ে মানুষের কষ্টের পরিমান ততবাড়ে। এত কষ্ট সহ্য করেও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্ঠা চালায়। তাইতো নিজের অবস্থানের কথা মনে করে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে বারবার শুকরিয়া আদায় করি। আর প্রার্থনা ওই সব মানুষগুলোর জন্য।

“আপি আপি! কি ভাবছো তুমি?”
হঠাৎ ডাকে হুস ফেরে আমার। পুনম আমার গায়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হাটু ভেঙে ওর সামনে বসে বললাম,
“কই কিছুনাতো। বাট আমার বার্ডটা আজ এত তাড়াতাড়ি উঠেছে কেন? ”

মুখটা ছোট করে পুনম বলল,
“আব্বু উঠিয়ে দিয়েছে।”

বুঝতে পারলাম জোর করে উঠানো হয়েছে ওকে। ওর মন খারাপ দুর করতে বললাম,
“চলো আমরা ছাদে যায়। দোল খাবো।”
“ইয়েয়েয়ে…।”
বলেই লাফিয়ে উঠল। পুনম কে নিয়ে ছাদে চলে এলাম। আসার আগে রুমের দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়েছিলাম প্রিয়ক বেড়িয়েছে কিনা। না বের হয়নি। আর মামনি তখন বিভিন্ন রকম পিঠা বানানোয় ব্যস্ত। ছাদে এসে পুনমকে দোলনায় বসিয়ে দোল দিতে থাকি। প্রতি দোলে একটা ঠান্ডা হাওয়া ছুঁইয়ে যাচ্ছে আমাদের। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর এক শীতল স্রোত বয়ে যায় কানের নিচ থেকে ঘাড়ে। থমকে যায় আমি। না এটা প্রকৃতির শীতলতা নয়, অন্য শীতলতা৷ পিছনে ফিরতে গেলেই মৃদু কণ্ঠে শুনতে পাই,
“তোকে ছোয়ার অধিকার শুধু আমার। এই বাতাস কেন, কাউকে সেই অধিকার দেই নি আমি। ”
থমকে যায় আমি। থেমে যায় আমার হাত। অন্য কিছু ফিল করতে পারছিলাম না। মানুষটা দিনদিন কেমন যেন হয়ে উঠেছে। তার পাগলামি বেড়েছে। বেড়েছে আমাকে নিয়ে তার অনুভূতিগুলো। এরই মাঝে পিছন থেকে আমার দুহাতের উপর নিজের দুহাত রেখে হালকা ভাবে দোলনায় দোল দেয়। কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“আই লাভ ইউ, প্রিয়তা।”
বলেই কানের লতিতে হালকা বাইট দিয়ে মৃদু হেসে নিচে চলে যায়। আর আমি! সেখানেই থমকে থাকি। রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে চলেছে এক অন্যরকম শিহরণ।

ফাইনাল পরীক্ষার শেষদিন আজ। সব পরীক্ষা আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হয়েছে। হল থেকে বের হতেই দেখলাম প্রিয়ক দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ গাড়ি নিয়ে আসিনি। আমি প্রিয়কের কাছে যেতেই ও একটা রিকশা ডেকে তাতে আমাকে উঠতে বলে নিজেও উঠে পড়ে। আমি উঠে বসে তাকে বলি,
“আজ গাড়ি আনোনি কেন?”
“রিকসায় ঘুরবো তাই। অনেকদিন হলো রিক্সায় যাওয়া হয়না। ”

আসলেই তাই। লাস্ট কবে গেছি জানা নেই। তাই আর কথা বাড়ালাম না। প্রিয়ক আমাকে নিয়ে একটা পার্কে আসে। চারপাশটা খুব সুন্দর করে সাজানো। বিভিন্ন রঙ বেরঙের দেশি বিদেশি প্রজাতির ফুলে ছেয়ে আছে চারপাশ। এর মাঝে কেউ হাঁটছে তো কেউ পার্কে থাকা বেঞ্চে বসে গল্প করছে। কিছু বাচ্চারা দৌড়াতে ব্যস্ত। তাদের সাথে ছুটছে তাদের মা। প্রিয়ক আমাকে নিয়ে হেঁটে চলেছে চারপাশে। তবে বাচ্চাদের সাথে তাদের মাকে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আম্মিকে এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। মাঝে মাঝে কথা হলেও দেখি না অনেক দিন হলো। ওই ঘটনার পর আর মাকে দেখার সুযোগ হয়নি। হুট করেই কান্না পাচ্ছিল আমার।
“এই প্রিয়তা, কি ভাবছিস বলতো?”
প্রিয়কের ডাকে তার দিকে ফিরে তাকাই। আমার মলিন মুখ দেখে তার চোখ ছোট হয়ে এলো। আমার গালে হাত রেখে অস্থির হয়ে বলল,
“খারাপ লাগছে? কি হয়েছে বল? খারাপ লাগলে চল বাসায় চলে যাবো।”
“আম্মিকে খুব মনে পড়ছে। দেখতে ইচ্ছা করছে আম্মিকে।”
আমি আস্তে করে বললাম। প্রিয়ক আমার কথায় মৃদু হেঁসে বলল,
“তাহলে সামনে তাকা “।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালাম। আমাদের থেকে দু তিনহাত দূরেই আম্মি দাঁড়িয়ে আছে। আম্মিকে দেখে যেয়ে জরিয়ে ধরি। আম্মি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

সারাটা বিকাল আম্মির সাথেই ছিলাম আমরা। সন্ধ্যা নামার পূর্বেই আম্মিকে পৌছে দিয়ে আসি। তবে সে বাসায় যাওয়ার সুযোগ নেই। আম্মিকে পৌঁছে দিয়ে প্রিয়ক আমাকে সেই সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে আসে। এখান থেকে সুর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্য যেন চোখ জুরিয়ে যায়। সূর্যের লাল কমলা মিশ্রিত রুপ এক অন্যরকম রুপ সৃষ্টি করে। যা এই মুহুর্তে প্রিয়কের বুকের সাথে মিশে অনুভব করছি। প্রিয়ক পেছন থেকে দুহাতে জরিয়ে রেখেছে। তার হাতদুটি আবদ্ধ হয়ে আছে আমার নিতম্বে। আমার কাঁধে মুখ রেখে সূর্যাস্ত দেখতে ব্যস্ত মানুষটা। হয়তো বা আমাকে দেখতে।

সময়! যাকে চাইলেও নিজের ৃতো করে রাখা যায় না। সে তার মত বয়ে চলে অভিরাম ধারায়। ঠিক তেমনি শীত কেটে গিয়ে প্রকৃতিতে নেমে এলো বসন্তের ছোয়া। নতুন সাজে মুখরিত হয়ে উঠল ধরনী। নানান সাজে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে ব্যস্ত প্রকৃতি প্রেমীরা। প্রেমিক যুগল ব্যস্ত তার মনের মানুষটির মন রাঙাতে। কেউ বা ব্যস্ত তার অভিমানী প্রেয়সীর মান ভাঙাতে। একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে আর হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। সেদিকেই অপরুপ দৃষ্টিতে চেয়ে তাকে প্রেমিক পুরুষটি। বাসন্তি রঙে সবাই নিজেকে সাজালেও প্রেমিক পুরুষটির কাছে তার প্রেয়সীই যেন সবচেয়ে মোহময়ী। প্রিয়কের ফ্লাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পিচঢালা পথে প্রেমিক যুগলের হাতে হাত রেখে চলার দৃশ্য দেখে চলেছি আমি। এমন সময় পিছন থেকে প্রিয় মানুষের ছোয়া নিজের দুগালে পেতেই আপনা আপনি আমার হাত সেখানে চলে গেল। প্রিয়ক দুহাতে রঙ নিয়ে তা আমার গালে লাগিয়ে দিয়েছে। তারপর নিজের আমার গালের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিজেকেও রাঙিয়ে নিয়েছে। তাতে লজ্জা পেলাম আমি। প্রিয়ক ওর বাহু বন্ধনে আমাকে আবদ্ধ করে নেয়। কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“এখন নিজেকে এই রঙেই রাঙিয়ে নে। আর তো ৫দিন। তারপর আমার রঙে রাঙাবো। ”
লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিই আমি। প্রিয়ক আমার চিবুক ধরে উঠিয়ে তার ওষ্ঠ ছোয়ায় আমার ওষ্ঠে। চোখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরি নিজের শাড়ির আঁচল। আর পাঁচদিন পর আমাদের বিয়ে। এবার আর কোনো জোর করে নয়, বরং সেচ্ছায়। দুজনের সম্মতিতে বিয়ে। থাকবে না নিজেদের মধ্যে আর কোন সংকোচ। ভাবতেই অদ্ভুত অনুভূতি ভিতরটা দখল করে নেয়। এর মাঝে প্রিয়ক আমাকে ছেড়ে ভিতরে চলে যায়। একটু পর ফিরে আসে একটি ফুলের গাজরা নিয়ে। তা খুব যত্ন করে পরিয়ে দেয় আমার খোঁপায়। পরানো শেষ হতেই আমাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে প্রিয়ক বলল,
“এবার ঠিক আছে। একদম পারফেক্ট। আমার বসন্তকন্যা।”

চলবে..??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here