একজন_রুশা,৮ম পর্ব

#একজন_রুশা,৮ম পর্ব
ধারাবাহিক গল্প
নাহিদ ফারজানা সোমা

উত্তরা- ঈশানী নানা-নানীর চিঠিগুলো এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছে। আগে আসতো লম্বা লম্বা চিঠি, গোটা গোটা অক্ষর। আস্তে আস্তে চিঠিগুলো ছোট হতে থাকলো, লেখাগুলো আঁকাবাঁকা। তারপরে এক সময় চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেলো। আর কখনোই আসলো না। নানা-নানী উত্তরাকে তরী আর ঈশানীকে ঈশা বলে ডাকতেন।

নানার একটা ছড়া,

“ঈশা যখন হাসে,
শিউলি ঝরে ঘাসে।
ঈশা যখন কাঁদে,
গ্রহণ লাগে চাঁদে।
ঈশা যখন পড়ে,
বই উড়ে যায় ঝড়ে।
ঈশা যখন খেলে,
পায়রা ডানা মেলে।”

উত্তরা নানার আরেকটি চিঠিতে হাত বুলায় _

“তরীর আগেই ঈশা হলো এমবিবিএস পাশ,
তরী তবে পাশ করে কি কাটবে ঘোড়ার ঘাস?
রোগীরা সব তার আগেই তো
চলে যাবে ঈশার ভাগেই তো,
যেমন ধরো নানী এবং ফটিকচন্দ্র দাস (নানা স্বয়ং)
ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদবে তরী, এ কি সর্বনাশ! ”

উত্তরা ডাক্তারিতে চান্স পেলো, ঐ সময়ে ঈশানীও ক্লাসে প্রথম হয়ে এবং প্রাইমারি বৃত্তি পেয়ে সিক্সে উঠলো। দুই বোনের বয়সের পার্থক্য সোয়া ছয় বছর। ঠিক মতো খেলে, হাঁটাহাঁটি করলে শরীরের ব্যথা বেদনা কমে যাবে এ জাতীয় উপদেশ দিয়ে ঈশানী তার নানীকে চিঠি লিখেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে নানার এই চিঠি।

কি যে দারুণ সুন্দর ছিলো দিনগুলি! দাদার কথা মনে নেই উত্তরার। দাদা মারা যান যখন, তখন উত্তরার বয়স আড়াই বছর। দাদা নাকি তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন। অসুস্থ, ভাঙাচোরা শরীর নিয়েও।

দাদীর কথা ভাবলে বুক ফেটে যায় উত্তরার। কতোশতো স্মৃতি দাদীকে নিয়ে। এসএসসি তে খুব ভালো রেজাল্ট করে আনন্দিত উত্তরা যখন কলেজে ভর্তি হলো,তখন দাদী মারা গেলেন। উফ্,কি ভয়ংকর কষ্ট ! বহুদিন লেগেছিল উত্তরার মোটামুটি স্বাভাবিক হতে। তার কেবল মনে হতো,দাদীকে ছেড়ে এতো লম্বা জীবন কাটানো কোনো ভাবেই সম্ভব না। এরপরে একে একে নানী, নানা চলে গেলেন,উত্তরা দিব্যি বেঁচে রইলো।

বেঁচে আছে ঠিকই উত্তরা তবে কিছুটা জীবন্মৃত অবস্থায়। রুশার মন প্রায়ই খুব খারাপ থাকে উত্তরার চিন্তায়। জীবনে কতো কঠিন সময় পার করেছেন রুশা-রফিক, এখন তাঁদের শান্তিতে থাকার সময়। রিটায়ারমেন্টের পরে নিজেদের একটি বাড়ি হয়েছে, তার থেকে অনেক বড় কথা,তিন ছেলেমেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কেউ বখে যায়নি, জামাই -বৌরা মন্দ নয়, ফুলের মতো নাতিরা আছে। অন্যান্য পরিজনরাও খারাপ নেই। রফিক -রুশা ছেলেমেয়েদের উপরে নির্ভরশীল নন। সুদীর্ঘ সংগ্রাম শেষে তাঁদের তো এখন স্বস্তি ও আনন্দে থাকার কথা। দু’জন মিলে ঘুরে বেড়ানোর কথা। অন্যদের জীবন গুছিয়ে দিতে যেয়ে নিজেদের সাধ-আহ্লাদের পরোয়া করেন নি এই দম্পতি, এখন তো সেই দায়িত্বের জালে আষ্টেপৃষ্টে বন্দী থাকার কথা নয়। কিন্তু শান্তি কোথায়?

উত্তরা মেয়েটা বলতে গেলে প্রতিদিন অসুস্থ থাকে। ভীষণ অসুস্থ। জামাই খুবই ব্যস্ত ডাক্তার। উত্তরার জন্যও তো এমন কর্মচঞ্চল, সফল জীবন চেয়েছেন রুশা -রফিক। কিন্তু মেয়েটা গাছের মগডালের কাছাকাছি এসে তীরবিদ্ধ পাখির মতো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো। আগে উত্তরা কাছাকাছি থাকতো,রুশা-রফিকের জানটাও ঠান্ডা থাকতো। জামাই-মেয়ে-নাতিদের সব সমস্যায় ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন দু’জনা। বুবুন-টুকুনও বড় যত্নে থাকতো নানা-নানীর কাছে। এরপর আশফাক বাড়ি কিনলো অন্য এলাকায়,অনেক দূরে। ইচ্ছা থাকলেও দুদিন পরপর আসা -যাওয়া করা যায় না। একে তো দূর, তার উপরে ঢাকা শহরের স্পেশাল জ্যাম।

উত্তরার জন্য খুব মন কাঁদে বাপ-মায়ের। মাঝেমধ্যে বুবুন-টুকুন ফোন করে কান্নাকাটি করে নানা-নানীর কাছে, মা সারাদিন ঘুমাচ্ছে, অনেক ডাকাডাকির পরে একটু তাকাচ্ছে, আবার ঘুমিয়ে যাচ্ছে। মা আজ থেকে থেকে শুধু বমি করছে। মা আজ কিচ্ছু খায় নি। রুশা ফোনে নাতিদের কান্না শোনে, নাতিদের মনের অবস্থা কল্পনা করে তার বুক ফেটে যায়, উত্তরার সমস্যা কি ভাবলে গলা শুকিয়ে যায়, কয়েকদিন পরপর মেয়ের বাসায় আসে, মেয়ের অসুস্থ চেহারা দেখে মনটা ভেঙে যায়, নাতি দুটোর অসহায়ত্ব বড্ড যন্ত্রণা দেয়। মা সারাক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকলে শিশুমনে কতোটা ভীতি,কষ্ট আর অনিশ্চয়তা বোধ তৈরি হয়, তা তো কারোর অজানা নয়।

উত্তরাকে একবার জরুরি ভাবে হসপিটালাইজড করা হলো খুব ই মুমূর্ষু অবস্হায়। রুশা প্রবল ঝাঁকুনি খেলো। কিন্তু বাইরে শক্ত থাকলো। এই মুহূর্তে তাকে ভেঙে পড়লে হবে না। নাতি দুটো পাগলের মতো হয়ে গেছে মা হারানোর ভয়ে। উত্তরার জন্য দুশ্চিন্তায় রফিক সাহেব প্রায়ই মনমরা হয়ে থাকেন। এখন রুশার ভেঙে পড়া মানে রফিক সাহেবের আরও অসুস্থ হয়ে পড়া, বুবুন-টুকুনের অসহায়ত্ব আরও দশ গুণ বেড়ে যাওয়া। উত্তরা সে যাত্রা বেঁচে ফিরলো, তবে ভয়ের স্হায়ী ছাপ পড়ে গেলো বাপ-মা আর বাচ্চা দুটোর মনে।

রুশা -রফিক মেয়েকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য কিছুদিন উত্তরার বাসায় থাকলেন। এক সকালে উত্তরা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। টুকুনকে খুঁজতে যেয়ে রুশা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলো এবং টুকুনের অলক্ষ্যে বেশ সময় নিয়েই দেখলো। ছোট্ট টুকুন তার বিজ্ঞান বাক্সের ছোট্ট আয়নাটা বারবার ধরছে উত্তরার নাকের সামনে। কিছুক্ষণ ধরে রেখে আয়নাটা গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখছে তাতে কোনো বাষ্প জমলো কিনা। মা নিঃশ্বাস ফেললে তো আয়নায় বাষ্প জমার কথা।

দৃশ্যটা রুশাকে দারুণ নাড়া দিলো। একটা নিষ্পাপ, দুধের শিশু কি আতংক নিয়েই না জীবন কাটাচ্ছে। রুশা-রফিক নিজেদের বাসায় চলে গেলে এরা তো আরও নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। মানসিক রোগী না হয়ে যায়! কিন্তু নিজেদের বাসা ছেড়ে কয়দিনই বা এখানে থাকা যায়। ঐ বাড়িতে আবার নৈঋতের দুই বাচ্চা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে। শুধুমাত্র গৃহকর্মী দের হাওলায় বাচ্চাদের রাখার পক্ষপাতী রুশা একদমই না।সন্তানদের জন্ম দিয়ে তাদের অনিরাপদ রাখার কোনো অধিকার বাপ-মায়ের নেই। নৈঋত -শ্রাবণীর সকাল-সন্ধ্যা অফিস। তাদের ছেলেদের খুব যত্ন করে বড় করেছেন রুশা এবং রফিক সাহেব। পাড়া প্রতিবেশীদের বাচ্চারা এসে রুশার হাতে খেয়ে যেতো। বাচ্চাদের খাওয়াতে অপারগ মায়েরা বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিতেন রুশার কাছে। তারাও পরম আনন্দে রুশা আম্মার কাছে এসে গলা পর্যন্ত খেয়ে যেতো। সেখানে নিজের নাতিদের খাওয়ার কষ্ট, নিরাপত্তার অভাব, নিঃসঙ্গতা সহ্য করা রুশার জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার। শ্বশুর-শাশুড়ির আন্তরিক স্নেহ,ননদদের ভালোবাসা সত্বেও শ্রাবণীর অনেক অভিযোগ, অসন্তুষ্টি ছিলো। আলাদা সংসার পাতার কথা রুশা নিজেই অনেকবার নৈঋতকে বলেছে। সব মেয়েরই নিজের সংসারের স্বপ্ন থাকে, শ্রাবণী যদি সেই স্বপ্ন দেখে, সেটা মোটেও অপরাধ না। রুশা এ কথাগুলোই ছেলেকে বলেছে বারবার। নৈঋতের একই উত্তর, “বিয়ের আগে আমি তাকে বলেছিলাম, আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে।প্রথম সন্তান। আমার এক বোনের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন, আরেক বোনেরও হবে কয়েক বছরের মধ্যে। আমি কিন্তু আমার বাবা-মাকে ছেড়ে আলাদা থাকবো না। তাঁরা তোমার সাথে কোনো অন্যায় করবেন না,আমার বোনেরাও করবে না,আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তারপরও যদি এমন কিছু হয়, আমি সেটার প্রতিবাদ করবো। তোমার কোনো রকম অসম্মান যেন কখনো না হয়,আমি সেই ব্যাপারে খুবই অ্যালার্ট থাকবো। কিন্তু অকারণে আমাকে বাপ-মায়ের থেকে আলাদা হতে বলা যাবে না। কাজেই তুমি চিন্তা করে দেখো আমাকে বিয়ে করবে কি না।”

প্রথম দিকে ভালোই চলছিলো, কিন্তু শ্রাবণী পাল্টাতে লাগলো। শ্রাবণীর মনোভাব বুঝতে পেরে রুশা বারবার নৈঋতকে আলাদা সংসার পাততে বললো। হোক নৈঋত পরম আদরের ধন, কিন্তু সংসারের জটিলতা এড়ানোর জন্য স্ত্রীর চাওয়াকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। শ্রাবণীর যখন মনে হলো তার ছেলেরা যথেষ্ট বড় হয়েছে, শ্বশুর -শাশুড়ির সাপোর্টের এখন কোনো দরকার নেই, তখন সে আলাদা বাসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। শ্রাবণীর বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন, কর্মসূত্রে মা অন্য জেলায় থাকেন, মাসে কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় আসেন,ভাই বোনেরাও যার যার মতো জীবন যাপন করে, শ্রাবণী তার পরিবারের ভরসায় বাবার বাড়ির একদম কাছে ফ্ল্যাট নিতে সংকল্পবদ্ধ হলো, বাপের বাড়ির কাছ ঘেঁষে যেমন বাস করতো উত্তরা। উত্তরার শ্বশুর -শাশুড়ি , বিশেষত শ্বশুর নিজের বাড়ি ফেলে ঢাকাতে থাকতে চাইতেন না, শাশুড়ি অসুস্থ ছিলেন,উত্তরা তাঁকে জোরাজোরি করেছিল তাদের সাথে থাকার জন্য। ননদদের কাছে সুপারিশ করেছিল। শাশুড়ির তেমনই ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু স্বামীর স্বার্থে তাঁকে ঢাকার বাইরে নিজেদের বাড়ি থাকতে হতো। তারপরে তো তাঁরা চিরতরে চলে যান।

নৈঋতের বিয়ের সময় উত্তরা চাকরি করতো, বাবা-মায়ের কাছাকাছি থাকার লোভে এবং সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সে এবং আশফাক রুশার বাড়ি ঘেঁষে বাসা ভাড়া করেছিলো। উত্তরার বড় ছেলে বুবুন রুশা -রফিকের প্রথম নাতি। রফিক-রুশা-নৈঋত-ঈশানী বুবুনকে চোখে হারাতো। একদিন না দেখলে অস্হির হয়ে পড়তো সবাই। আশফাক ভোরে বের হয়ে অনেক রাতে বাসায় ফিরতো। রফিক -রুশার তাই নির্দেশ ছিলো, উত্তরা যেন সকালেই বুবুনকে নিয়ে চলে আসে, এখান থেকে নাস্তা খেয়ে হাসপাতালে যায়, হাসপাতাল থেকে বাপের বাড়িতে ফিরে আসে, রাতে আশফাক আসার আগে আবার যেন বাসায় চলে যায়। উত্তরার গৃহসহকারী রান্না করে রাখতেন, তাও প্রতি রাতে রুশা বাক্স বাক্স খাবার জামাইয়ের জন্য পাঠাতো। তার বক্তব্য, বাসায় সবাই ভালো -মন্দ খায়, ঐ খাবারে আশফাকেরও হক আছে।

সারাদিন বুবুন ও উত্তরার উপস্থিতি, আশফাকের জন্য নিয়মিত খাবার পাঠানো শ্রাবণী পছন্দ করতো না। তার অসন্তোষ একটু একটু করে বাড়ছিলো। একদিন সে শাশুড়িকে বলেই ফেললো,”প্রতিদিন জামাইকে
খাবার পাঠান কেনো?” রুশা জবাব দিয়েছিলো, “ও আমার আরেকটা ছেলে। সারাদিন বাইরে কি খায় না খায়, রাতে আমার রান্না খাক।”

“উত্তরা রাঁধতে পারে না? ওর নিজের বাসা থাকতে প্রতিদিন এখানে থাকে কেন?”

“আমরা উত্তরাকে থাকতে বলি। ও আর বাবু না থাকলে আমাদের ভালো লাগে না। বাড়িটা তোমার বাবার করা। এখানে আর সবার মতো উত্তরারও অধিকার আছে। যতোদিন আমি এবং তোমার বাবা আছি, আমরা আমাদের মতো করে তিন সন্তানকে দেখবো,কারোর কোনো অসুবিধার কারণ না হয়ে। ”

রুশা অবাক হয়েছিলো। যে মেয়েকে উত্তরা-আশফাক এতো ভালোবাসে, তার মনোভাব ননদ-নন্দাই সম্পর্কে এরকম? উত্তরার জন্য তো শ্রাবণী বা তার স্বামীর এক পয়সা ব্যয় হচ্ছে না, উত্তরাতো তাদের এতোটুকু বিরক্ত করছে না, তাহলে শ্রাবণীর সমস্যা কোথায়?

আশফাককে রুশা যেমন পুত্র স্নেহ দিয়েছিলো,শ্রাবণীকেও একই ভাবে কন্যাজ্ঞান করেছিলো। আফসোস,শ্রাবণী সেটা বুঝলো না।

নতুন ফ্ল্যাটে নতুন সংসারে প্রথম কিছু দিন খুব ভালো চললো। এরপরে শুরু হলো সমস্যা। নৈঋত -শ্রাবণী চাকরির জন্য সারাদিন অফিসে, বাচ্চা দুটার অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। এমনিতেই দাদা-দাদী, ফুপুদের ছেড়ে আসায় তাদের কষ্টের সীমা ছিলো না, এখন যোগ হয়েছে নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্ব। বাসায় দুই শিশু আর দুই পরিচারিকা। বড়রা বাসায় না থাকলে যা হয়, গৃহকর্মীদের বেশির ভাগ সময় ব্যয় হয় টেলিভিশনে নইলে অসময়ে ঘুমিয়ে।

প্রায়ই রাতুল স্কুল থেকে এসে দেখতো মিতুল না খেয়ে আছে। তাকে নাকি অনেক সাধ্য সাধনা করা হয়েছে,কিন্তু সে কিছুতেই খায় নি। রাতুল নিজেই শিশু, তারপরও সে মিতুলকে আদর করে ভুলিয়ে ভালিয়ে খাওয়ায়,তারপরে নিজে খায়। এমনও হয়েছে, মিতুলকে খাইয়ে ক্লান্ত হয়ে রাতুল ঘুমিয়ে পড়েছে নিজে না খেয়েই।

একদিনের ঘটনা। মিতুল গ্রীল বেয়ে জানালার মাথায় উঠতে যেয়ে আপেলের মতো টুপ করে খসে পড়লো । সারা শরীরতো বটেই, মাথাটাও সজোরে লাগলো মেঝেতে। রাতুল ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। ডাকাডাকি শুরু করলো দুই গৃহকর্মীকে। কারোর কোনো সাড়াশব্দ নেই। মিতুল ভীষণ কাঁদছে। বিপন্ন রাতুল গ্লাসে পানি এনে মিতুলের মাথা ধুইয়ে দিলো, যত্ন করে চুলগুলো মুছে দিলো। সহকারীদের একজন দিবানিদ্রায় ছিলো, অপরজন গোসল করছিলো।

রুশা দিনের মধ্যে অনেকবার ফোন করে নাতিদের খবরাখবর নিতো, নাতিদের সাথে কথা বলতো। নাতিরা ভালো নেই, বুঝতে কোনো সমস্যা হতো না।

নৈঋত বাচ্চাদের জন্য দুশ্চিন্তায় অস্হির হয়ে গেলো। এদিকে বাবা-মাকে ছেড়ে এসে নৈঋত খুব কষ্ট পেতো। সেই কষ্ট সে প্রকাশ করতো না, করুক শ্রাবণী মনের মতো সংসার। কিন্তু এখন রাতুল-মিতুলের কি হবে? বাচ্চা দুটার খাওয়ার ঠিক নেই, নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। একাকীত্বের কারণে তারা জেদি হয়ে যাচ্ছে।সারা পৃথিবীর উপরেই তাদের রাগ আর অভিমান। শ্রাবণী বহির্মুখী। চাকরির বাইরেও সে সব ধরণের পারিবারিক, সামাজিক, অফিসিয়াল প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে, বাসায় ফিরতে প্রায় রাত হয়, ছুটির দিনেও তার কোনো না কোনো কাজ থাকে।

এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় শ্রাবণী শ্বশুর -শাশুড়িকে আবেদন জানালো তাদের সংসারে এসে থাকার জন্য। নাতিদের আর ছেলের মুখ চেয়ে রুশা-রফিক মাঝেমধ্যে যেয়ে কয়েকদিন থাকতেন। কিন্তু এভাবে কি আসা যাওয়ার মধ্যে থাকা যায়? নৈঋত -শ্রাবণী পুরোপুরি বিপন্ন ছেলেদের নিয়ে। শ্রাবণীর এখন শ্বশুর -শাশুড়িকে বড়ই দরকার। সুতরাং, পুণরায় একসাথে থাকা।

আবারও একটা কঠিন সময় এলো রুশার। উত্তরার অপারেশন লাগবে।বেশ বড়সড় অপারেশন। রফিক সাহেবের শরীরটাও বড় খারাপ। এতোটাই খারাপ, তাঁকে উত্তরার বাসায় নেওয়ার সাহস পেলো না রুশা। আশফাক থাকবে উত্তরার কাছে হাসপাতালে, বুবুন-টুকুন অজানা আশংকায় অস্হির হয়ে আছে, এই সময়ে বাচ্চা দুটোর কাছে থাকতে হবে রুশাকে, হঠাৎ যদি কোনো জরুরি দরকার পড়ে, রফিক সাহেবকে কে হাসপাতালে নিয়ে যাবে? ঈশানী এসে থাকতে চেয়েছিলো বুবুন-টুকুনের কাছে, কিন্তু রুশার মন মানলো না। আল্লাহর উপরে ভরসা করে নৈঋতের কাছে রফিক সাহেবকে রেখে রুশা চলে এলো উত্তরার বাড়ি।

উত্তরার অপারেশন হলো দীর্ঘ সময় নিয়ে। মহামারীর সময়। তবু দুই নাতিকে নিয়ে বিকালে হাসপাতালে চলে আসে রুশা। রাত দশটার দিকে আবার বাসায় ফিরে যায় নাতিদের নিয়ে। নাতিরা কাঁদতে থাকে। রুশা আদর করে তাদের সামলায়। নিজের সব কষ্ট, দুশ্চিন্তা সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়। রফিক সাহেবের জন্য প্রবল দুশ্চিন্তা যদিও নৈঋত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় থাকার মানে হলো বাবার তিল পরিমাণ অযত্ন হবে না। শ্রাবণীও শ্বশুরের যথেষ্ট খেয়াল রাখছে। উত্তরার জন্য অজানা ভীতি তো আছেই। জগৎ সংসার সব নীরস হয়ে যাচ্ছে রুশার কাছে, শরীরটা কাহিল লাগে, স্বামী অসুস্থ, মেয়ে অসুস্থ, তবু অন্যদের ভালো রাখার জন্য কান্না বুকে চেপে হাসতে হয়, সংসারের দায় দায়িত্ব পালন করতে হয়।

উত্তরার অপারেশনের ঠিক দুই দিন পরে রাতে নাতিদের নিয়ে যখন বাসায় ফিরছিলো রুশা, তখন একমাত্র বোনপো ফোন দিলো খালাকে। এটা সেটা নানা কথা বলে নিয়ে সন্তর্পণে খালাকে জানালো, বড় মামা একটু আগে মারা গেছেন। বড় মামা,অর্থাৎ রুশার সবচেয়ে বড় ভাই।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here