আষাঢ়ে_প্রেম_শ্রাবনে_পরিণয়,পর্ব_৪

আষাঢ়ে_প্রেম_শ্রাবনে_পরিণয়,পর্ব_৪
লেখিকা_সুমাইয়া_জাহান

স্কুল থেকে ফেরার পথে সেঁজুতি একটা কথাও বললো না।তার ভিতরে ঝড় বয়ে চলেছে।চিঠিতে লিখা সাবেতের প্রতিটা বাক্য তার মনকে রোমাঞ্চিত করে তুলছে।অতল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত চঞ্চল তার আঁখি দুটি যেনো সমুখে সেদিন বৃষ্টিতে গাছ তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যুবকটিকেই দেখছে।যুবকটি গাছ তলায় দাঁড়িয়ে অপলকে সেঁজুতির দেখছিলো।কি নেশাধরা সেই চোখের দৃষ্টি।সেদিন সাবেতের চাহনিতে কতশত মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিলো জানা নেই সেঁজুতির।সাবেতের নেত্রপল্লব দুটিতে নির্লজ্জতা ছাড়িয়ে যায় নি সেদিন,যায় নি অবাধ্যতার সীমানা পেরিয়ে কামুকতায়।পৃথিবীর সকল পুরুষ যে এক নয়,তাদের দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি কিংবা ভালো লাগাও যে এক নয় সেদিন সাবেত কে দেখে প্রথমবারের মত উপলব্ধি করেছিলো সেঁজুতি।পুরুষ মানুষ যে কেবল নারীকে কামনার দৃষ্টিতে দেখবে তা কিন্তু নয়।নারীকে দেখার আগ্রহ সকল পুরুষেরই কম বেশি থাকে তবে সেই দেখার দৃষ্টিভঙ্গি যে সকল পুরুষের এক হবে তা নয়। সব পুরুষকে নারী দেহ টানে না টানতে পারেও না। কিছু পুরুষ মানুষ কেবল নারীর চোখ কিংবা ঠোঁটের কোণ ঘেঁষা ছোট্ট তিল পর্যন্তই নিজের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা রাখে।তার ছেয়ে গভীরে যাবার সাহস কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের হয় না।নারীর সৌন্দর্য অবশ্যই তার চোখ দেখে বুঝতে হবে।নারীর হাসি দেখে তার আভিজাত্য কতটুকু তা বুঝার ক্ষমতা পুরুষের থাকা চাই নয় তো নারীর হৃদয় দ্বারে প্রবেশ করার ক্ষমতা পুরুষ কখনো অর্জন করতে পারবে না।নারীর সৌন্দর্য কেবল নারীর শরীরে নয় বরং ফাগুনে উত্তাল সমীরণে এলোকেশীর খোঁপায়ও থাকে হাজার মুগ্ধতা।আষাঢ়ের ঘন বরষার টলটলে জলের ন্যায় চোখ দুটিতে হাজার স্বপ্ন বিচরণেও ছড়িয়ে থাকে নারীর মাধুর্যতা।মুক্ত বিহঙ্গের মতো নারীর চঞ্চলতা যে পুরুষকে মুগ্ধ করে কেবল সেই পুরুষটি একজন নারীকে নিজের বক্ষে ধারন করার অধিকার রাখে।এমনকি সেই নারীকে বুকের বা পাঁজরে যোগ্যতম ঠাঁই দেয়ার মত ক্ষমতাও সেই পুরুষটিই রাখে।যে পুরুষ নারীর কৃষ্ণ বর্ণেও নারীর সৌন্দর্য, মাধুর্যতা কোমলতা কিংবা প্রেম খুঁজে পায় সেই কেবল সুপুরুষ শব্দটি বহন করার অধিকার রাখে।আর সাবেত?সেও সুপুরুষ থেকে কোনো অংশে কম নয় তাকে নেহাত সুপুরুষ বললেও কম বলা চলে সে একজন প্রেমিক পুরুষও বটে।আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘরাশির মতো ষোড়শীর এলোকেশে সে মুগ্ধতা খুঁজে পেয়েছিলো।পদ্মবিলের শালুকের পাপড়ির ন্যায় শুভ্র ঠোঁট দুটো তাকে নির্বাক করেছিলো তার হৃদপিন্ড স্তব্ধ করে ছিলো পাখির নীড়ের মতো চোখ দুটি।সে হৃদয়ে কাল বৈশাখীর ঝড় অনুভব করেছিলো নতুন সদ্য যৌবনে পা রাখা যুবতীর লজ্জা রাঙা ভয়ার্ত চাহনি দেখে।সে খুন হয়েছিলো তার প্রিয় আষাঢ়ের সদ্য ফোটা কামিনীর নির্মলতায়।

সেদিন সাবেতকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা আর ভয় দুটোই যেনো সেঁজুতিকে ঝেঁকে বসেছিলো।কি করবে কোথায় যাবে এই যুবকের নিষ্পলক দৃষ্টি এড়াতে?সেঁজুতি ভাবতে পারছিলো না।লজ্জায় লজ্জাবতী লতার মতো নুইয়ে যেতে ইচ্ছে হয়েছিলো তার।সেঁজুতির সর্বাঙ্গ কাঁপছিলো।ঠোঁট দুটো ভয় আর লজ্জায় নিজেদের চেপে ধরেছিলো।সেঁজুতি মনে হয়েছিলো এই বুঝি সে জ্ঞান হারাবে।পদ্মবিলের অথৈ জল তাকে দূর থেকে বহু দূর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।সেঁজুতির হৃদপিন্ড ধমকা হাওয়ার মতো উথালপাতাল করেছিলো।ধমনীতে রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো।বুক ধুকধুক করছিলো।সে ভয়ে ভয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে,কেউ তার এই অভিনব লজ্জার সাক্ষী হয়েছিলো কিনা দেখতে।ভাগ্যিস সেদিন আশেপাশে কেউ ছিলো না।সেদিন তার ভয়ানক লজ্জার কেবল একজন ব্যাক্তিই রাজসাক্ষী হয়েছিলো।আর সেই একটি মাত্র রাজসাক্ষী ছিলেন তারই ডাক্তার সাহেব।

ভাবতে ভাবতে বাড়ি এসে পৌঁছালো সেঁজুতি এবং হামিদা।হামিদার মনে তখন উৎকন্ঠা পাহাড় সম।সে যেনো কল্পনায় সাবেত আর সেঁজুতির মিলনকাল দেখতে পাচ্ছে।সেঁজুতি লাল টুকটুকে বেনারসি পড়ে সাবেতের পাশে উপনিবেশন করছে।সাবেতের পড়নে সাদা শেরওয়ানী।কি অপূর্ব ই না দেখাচ্ছে দুজনকে।যেনো রাজযোটক।

দুপুরের পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো।সেঁজুতি সাবেতের দেয়া চিঠি বুকে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে জানালার বাহিরে বৃষ্টি দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।যতবার সে চিঠিটা পড়ছে ততোবারই এক অন্যরকম আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছে।এক অদ্ভুত সুখকর অনুভুতিতে তার শরীর মন ছুঁয়ে থাকতে সর্বক্ষণ।সেঁজুতি জানে না তার এই অনুভুতির কি নাম,শুধু জানে সাবেত নামক ব্যাক্তিটির কথা ভাবলেই তার বুক ধড়পড় করে,হাত পা শীতল হয়ে আসে,লজ্জা আর ভালোলাগা গুলো একসাথে তাকে অস্থির করে তুলে।সেঁজুতি চোখ বন্ধ করে সাবেতের মুখটা কল্পনা করতে চায় কিন্তু তার কল্পনায় বার বার সাবেতের টানা হাতে লিখা গুলো ভেসে উঠে।সেঁজুতি লজ্জা পায়।লজ্জায় তার দু কান গরম হয়ে উঠে।ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপতে থাকে।এই কেমন সুখকর যন্ত্রণাময় অনুভুতি?সেঁজুতি আর ভাবতে পারে না শোয়া থেকে ধীরেধীরে উঠে বসে।বৃষ্টি তখন সেঁজুতিদের টিনের চালে নৃত্য করছে।চারপাশে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব।আকাশটা কেমন গম্ভীর হয়ে আছে।সেঁজুতি বালিশের তলায় হাত রাখার পূর্বে একবার জানালার বাহিরে দেখলো।ঝুপঝাপ বৃষ্টি পড়ছে সেই কখন থেকে থামার কোনো লক্ষণ ই দেখতে পেলো না সেঁজুতি।বৃষ্টির ফোটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।চোখ জ্বালা করে পানি পড়তে শুরু করে।সেঁজুতি ক্ষণকাল বাদে চোখ ফিরিয়ে আনে। ছোট্ট একটা নিশ্বাস তার বুক ছিঁড়ে বেড়িয়ে দুই হাটুর ভাঁজে এসে পড়ে।সেঁজুতি চমকায়। কি উত্তপ্ত সেই নিশ্বাস। ভয় হয় সেঁজুতির তবে কি সত্যি তার বুকের বা পাশ টা প্রেম নামক অনল তাপের দহনে দগ্ধ হতে শুরু করেছে?”আশে পাশে কেউ তার দগ্ধ বুকের ক্ষত দেখে ফেলে নি তো?”সেই এক মহা চিন্তায় বেকুল হয়ে উঠে সেঁজুতি।সকলের অগোচরে লুকিয়ে রাখা আবেগ গুলো যেনো দলা পাকিয়ে বেড়িয়ে আসতে চায়।কি এক লজ্জায় সেঁজুতির ফর্সা গাল দুটো গোলাপ রাঙা হয়ে উঠে।সেঁজুতি আরো কিছু সময় জানালার বাহিরে তাকিয়ে থেকে পরে বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট টিনের একটা বাক্স বের করে আনে।সোনালি রঙ করা তাতে।এর পূর্বে এত সুন্দর বাক্স কোনো দিন দেখে নি সেঁজুতি।কি অপূর্ব কারুকাজ করা তাতে।সেঁজুতি জানে না বাক্সে কি আছে।সে খুলে দেখে নি সেটা, দেখার সাহসও হয় নি।সেঁজুতি শক্ত হাতে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয় বাক্সটা।আষাঢ়ের এক ঘন বরষার রাতে একজন প্রেমিক পুরুষ তার প্রেয়সীকে এটা নিবেদন করেছিলো।সেঁজুতি ক্ষণকাল বক্সটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসে।তার এই হাসির পিছনে কত সহস্র আবেগ ভালোলাগা ভালোবাসা আর লজ্জা লুকায়িত আছে সেটা যদি কেউ দেখতো তবেই বুঝতো এই ষোড়শী মনের গভীরে প্রথম প্রেমের অনুভুতি কতটা গভীর কতটা উষ্ণ।

বৃষ্টি মাথায় করে কাছারিঘরের পিছন দিয়ে বাড়ি ঢুকলো হামিদা।মাথায় বড় একটা কচুপাতা ধরে আছে।কাছারিঘরের বারান্দায় উঠে কচুপাতাটা ছুড়ে জংগলের দিকে ফেলে দিলো।কিছু সময় এদিক সেদিক তাকিয়ে পরে গলা খাদে নামিয়ে ফরিদকে ডেকে বলল,

“ফরিদ ওই ফরিদ।ফরিদ্দা?”

ফরিদ কাছারিঘরে দুটো ছেলের সাথে গুটি খেলছিলো হামিদার চাঁপা কণ্ঠস্বর শুনে সে সাবধানী হয়ে উঠল, বলল,

“ডাকো ক্যারে ছুডু আপা?”

“আম্মা বাড়িত আছে?”

ফরিদ ক্ষণকাল মাথা চুলকিয়ে কিছু ভাবে।তারপর বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে বলে,

“আম্মা বাড়িত নাই।মজিদ চাচা গো বাড়িত গেছে।আইতে মেলা দেরি হইবো।”
ফরিদের কথা শুনে খুশিতে হামিদার চোখ চকচক করে উঠল।তার মা মজিদ চাচার বাড়ি গেছে তার মানে তিনি মজিদ গিন্নির সাথে কাঁথা সেলাই করতে গেছেন।তিন চার ঘন্টার আগে কোনো ভাবেই বাড়ি ফিরবেন না ভেবেই যেনো হামিদা হাতে আসমান পেয়ে বসলো।তার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছে আজ।তার কষ্ট ব্যার্থ হতে দেয় নি বলে আল্লাহর কাছে সে মনে মনে হাজার বার শুকরিয়া আদায় করলো।ফরিদ হামিদার তৎক্ষনাৎ খুশি হওয়ার কারন বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকলো।হামিদা ফরিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।বলল,

“এই নে দুইডা টাকা আছে এইহানে তুই রাখ এগুলা, আম্মারে কিছু কইবি না কইলাম।”
ফরিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করে,

“তুমি টাকা কই পাইলা ছুডু আপা?”

“তোরে এত কথা কন লাগবো ক্যারে?টাকা দিছি রাখ না লাগলে দিয়া দে।”
হামিদা দাঁত কিড়মিড় করে বলতেই ফরিদ দমে গেলো।সে আর যাই করুক টাকা ফিরিয়ে দিবে না।এই টাকা সে মাটির ব্যাংকে জমিয়ে রাখবে।আসছে বছর বৈশাখী মেলায় সে এই টাকা দিয়ে একটা পিস্তল কিনবে বলে মনে মনে ঠিক করে নিলো।

কাঁদা আর শ্যাওলার জন্য উঠানে পা রাখা যায় না।এই কয়দিন টানা বৃষ্টির কারনে উঠানে শ্যাওলা জমেছে।পা ফেলে হাঁটার উপায় নেই তবুও হামিদা অতি সাবধানী হয়ে পা টিপে টিপে থাকার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।বাড়িতে ঢুকার পথে মিনারা কয়েকটা ইটের টুকরা বিছিয়ে দিয়েছে হাঁটার জন্য কিন্তু সেগুল কাঁদায় প্রায় ডুবে গেছে।কাছারিঘরের দিকে তেমন কেউ আসা যাওয়া করে না তাই সেদিকে মিনারা ইট দেয় নি।হামিদা কাছারিঘর হতে নেমে অতি সাবধানে হেঁটে ঘরের সামনের বারান্দায় গিয়ে উঠলো।দুপুর থেকে সে ঘরে ছিলো না রানীদের বাড়িতে গিয়েছিলো।সেখানে গিয়ে ছলেবলে জেনে এসেছে সাবেত বিকেল চার টায় নদীর ঘাটে তার আপার জন্য অপেক্ষা করবে।
রানী চেয়ারম্যান বাড়ির ছোট মেয়ে।হামিদার সাথে একই ক্লাসে পড়ে আর সেই সুবাদে হামিদা প্রায় সময় চেয়ারম্যান বাড়িতে যাওয়া আসা করে। আজ রানীর সাথে দেখা করার নাম দিয়ে কাউকে না জানিয়ে চুপিচুপি সাবেতের ঘরে গিয়ে উঠেছিলো হামিদা।সাবেত প্রথমে হামিদাকে দেখে অবাক হয়েছিলো।তাদের বাড়ির অন্দরমহলে সচরাচর বাহিরের কেউ প্রবেশ করে না আর সে জায়গায় হামিদা একেবারে তার শোবার ঘরে চলে গেলো।সাবেত ক্ষণকাল হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।তারপর তার মনে পড়লো হামিদা তার ছোটো বোনের বান্ধবী তাই হয় তো এসেছে।তাছাড়া বেশ কিছুদিন আগেও একবার হামিদা তাদের বাড়িতে এসেছিলো।আর সে দিন কথায় কথায় সাবেত জানতে পারেছিলো যে মেয়েটি তার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো যাকে দেখে সাবেতর হৃদয়ে হাজারটা রঙবেরঙ এর প্রজাপতি উড়ে বেড়ায় সর্বক্ষণ।যার পাখির নীড়ের মতো কাজল কালো ডাগর চোখে নিজেকে হারিয়েছিলো,সেই আষাঢ়ে সদ্য ফোটা কামিনীটি আর কেউ নয় সে হামিদার বড় বোন সেঁজুতি।

এই তো কয়দিন আগের কথা সাবেত বাহিরের ঘরের বারান্দায় একটা আরাম কেদারায় বসে নোবেল পড়ছিলো।হঠাৎ তার বোন রানী সাথে করে একটি মেয়ে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়।রানীর হাতে একটা পুতুলের বাক্স ছিলো।সাবেত নোবেল বন্ধ করে চশমাটা চোখ থেকে সরিয়ে দেখলো সেদিনের সেই মেয়েটি সাবেতকে দেখে বড়ই লজ্জা পাচ্ছে।লজ্জায় সে একেবারে লজ্জাবতী লতার মতো নুইয়ে যাচ্ছে।রানী তার এক হাত মুঠো করে ধরে আছে।সাবেত দেখলো শ্যামলা গায়ের বরণ মেয়েটি লজ্জায় একেবারে এতটুকু হয়ে আছে।কি বিস্ময়ে মেয়েটির চোখ অস্থির হয়ে আছে।মনে হয় একটু ছাড় পেলেই দৌড়ে পালাবে।মেয়েটি রানীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানো চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু রানী নাছোড়বান্দা কিছুতেই ছাড়বে না। হামিদা উপায় না পেয়ে নতজানু হয়ে রানীর পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।কিছুক্ষণ বাদে রানী তাকে কানে কানে কিছু বললো।সাবেত ব্যাপারটা লক্ষ্য করে রানীকে জিজ্ঞাস করলো,

“কিছু বলবি রানী?”
রানী কিছু বলতে গেলে হামিদা তার মুখ চেপে ধরে।সাবেত পুরো ব্যাপারটা পরখ করে দেখেলো কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলো না।তাই আবার জিজ্ঞাস করলো,

“কি হলো কিছু বলার আছে আমাকে?”
রানী তখন হামিদার হাত নিজের মুখ থেকে সরিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,

“ভাইয়া আজ আমার বড় মেয়ের বিয়ে কিন্তু একটা বিপদে পড়েছি।”

“কি বিপদ শুনি?”

“মেয়েকে যে বিয়ে দিবো কি দিয়ে বিয়ে দিবো? ঘরে তো মিষ্টি নেই।মিষ্টি ছাড়া কি মেয়ে বিদায় করা যায়?”
রানীর কথা শুনে সাবেত ওষ্টধর প্রসারিত করে হাসলো বলল,

“ওহ এই ব্যাপার?তা আমি না হয় তোর মেয়ের বিয়ের বাকি কাজ সম্পন্ন করে দিবো কিন্তু তাতে আমার লাভ?”

“তোমায় আমি মেয়ের বিয়ের সাক্ষী করবো,দোহাই লাগে যাও আমায় বিপদ থেকে উদ্ধার করো।”

সাবেত বোনের পাঁকা কথা শুনে একগাল হেসে উঠে চলে গেলো।হামিদা তখন কাছুমাছু হয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।সাবেত কিছুটা পথ এগিয়ে আবার দাঁড়াল,ফিরে হামিদাকে একবার ভালো করে দেখলো।সেঁজুতি আর হামিদার চেহারায় বেশ মিল রয়েছে তবে হামিদা থেকে সেঁজুতি দেখতে কিছুটা ফর্সা তবুও হামিদার শ্যামলা চেহারায় আলাদা একটা মায়া দেখতে পেলো সাবেত।

সেদিন রানীর পুতুলের বিয়েতে সাবেত সাক্ষী হিসেবে থাকলো।হামিদার সাথেও সে টুকিটাকি কথা বলেছে।তবে সাবেতের সাথে কথা বলতে হামিদা একটু বেশিই লজ্জা পাচ্ছিলো।সাবেত হামিদাকে সহজ করার জন্য মিনারা বেগমের কথা জিজ্ঞাস করে আর তখন কথায় কথায় হামিদা অনেক কিছু বলে এমনকি তার আপা সেঁজুতির কথাও বলে।সাবেত খুব মনোযোগ দিয়ে হামিদার প্রতিটি কথা শুনছিলো আর কল্পনায় সেঁজুতির গোলাপ রাঙা বৃষ্টি ভেজা মুখটা ভাসছিলো।

বারান্দায় কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে সেঁজুতি সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটা লুকিয়ে ফেললো।তারপর কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞাস করলো,
“আম্মা তুমি আইছো?হামিদা কই গেছে কিছু জানো?”

সেঁজুতির কথা শেষ হওয়ার পূর্বে হামিদা ঘরে ঢুকে।হামিদাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সেঁজুতি অস্থির হয়ে উঠে কিন্তু প্রকাশ করে না।নিজেকে শান্ত রেখে বলে,

“গেছিলি চেয়ারম্যান বাড়ি?কথা হইছে উনার লগে?”

হামিদা খুশীতে গদগদ হয়ে বলল,

“হ,আপা কথা হইছে।বিকেল চার টার দিকে নদীর ঘাটে থাকবো কইছে সাবেত ভাই।তুমি জলদি তৈরী হইয়া লও।আম্মা ঘরে নাই এইডাই সুযোগ।”

___________

হামিদার পিছু পিছু সেঁজুতিও বাড়ির পেছনের দিকে হিজল গাছের নিচে এসে দাঁড়াল।হিজল গাছের গোড়ার এসে দাঁড়াতেই সেঁজুতির সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠলো।এই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে গত রাতে সে সাবেতের সঙ্গে দেখা করেছিলো।এই হিজল গাছ রাতের সেই দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলো।হঠাৎ করেই সেঁজুতির হিজল গাছটাকে খুব লজ্জা লাগতে শুরু করে।মনে হয় যেনো হিজল গাছটা তার কানে কানে বলছে আমি তোর গোপন প্রেমের সাক্ষী ছিলাম।লজ্জায় সেঁজুতি কান গরম হয়ে উঠে।গাল দুটো রক্তজবা রঙ ধারণ করে।হামিদা সেঁজুতি এমন লজ্জা রাঙা মুখ দেখে হেসে ফেলে তারপর একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সেঁজুতিকে বলে,

“আপা তুমি এই পথ দিয়া সোজা নদীর ঘাটে চইলা যাও, কেউ দেখবো না এহন।”

সেঁজুতি হামিদার দিকে ভয়ার্ত চাহনিতে তাকায়।হামিদা তাকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘কিচ্ছু হবে না।’সেঁজুতি কাজল কালো আঁখি দুটিতে তখন রাজ্যের অস্থিরতা ভর করেছে।তার দৃষ্টিতে আকুলতা।মনে আনচান করছে।শরীরে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে।মস্তিষ্ক জ্ঞান শুন্য হওয়ার উপক্রম।সে যে কি অনুভুতি সেঁজুতি কাউকে বলে বুঝাতে পারছে না।ভালোলাগা, ভয় আর লজ্জারা যখন এক হয় তখন একজন মানুষ কেমন পরিস্থিতিতে পতিত হয় সেটা হয় তো কেউ এই উপরিস্থিততে না পড়লে বুঝতো না।সেঁজুতি ক্ষণকাল একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।চিন্তা আর সংকোচে সে বা হাতের বৃদ্ধা আংগুলি দিয়ে ডান হাতের তর্জনী খুঁটতে থাকে।তার বুকের ভিতর শ্রাবনের ভরা নদীর টলটলে জল উথালপাতাল করছে।প্রথম প্রেমের অনুভুতিরা তাকে দু-দন্ড স্থির হতে দিচ্ছে না।
হামিদা সেঁজুতিকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

“আপা আম্মা আইসা পড়লে কিন্তু সব শেষ।তুমি তাড়াতাড়ি যাও।”
সেঁজুতি অশহায় দৃষ্টিতে একবার হামিদাকে দেখলো তারপর ওড়না দিয়ে ভালোভাবে পুরো গা ঢাকা দিয়ে মাথায় লম্বা গোমটা টানে।আকাশে তখন কালো মেঘে ছেয়ে আছে।গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে চারপাশে।কাঁদা মাটির সোঁদা গন্ধ চারপাশে মৌ মৌ করছে।সেঁজুতির বুক ধড়পড় করে।সামনে এক পা বাড়াবে সেই শক্তি টুকু সে পাচ্ছে না।নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।তার পেটে হাজারটা প্রজাপতি নাচানাচি করছে কি এক শিহরণ জেগে উঠছে শরীর জুড়ে।সেঁজুতি মুখে লজ্জার ছাপ স্পষ্ট।হামিদা সেঁজুতিকে একবার ভালো করে দেখলো।কালো সেলোয়ার কামিজে তার আপাকে আসমানের পরীর মতো লাগছে।হামিদা চোখে কিনারা থেকে কাজল নিয়ে সেঁজুতি বা হাতের তালুতে ছুঁইয়ে দিলো।তাতে সেঁজুতি একটু চমকালো পরোক্ষণেই আবার হামিদার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।হামিদা প্রায় সময় এইভাবে সেঁজুতি নজর কাটিয়ে দেয়।

________________________

ঘাটের কাছাকাছি এসে হাঁটার গতি কমিয়ে দিলো সেঁজুতি। তার পা আর চলছে না।দূর থেকে সাবেতকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।সেঁজুতি আর সাবেতের মাঝে আর কয়েক কদম দূরত্ব।সাবেত কে দেখে সেঁজুতির প্রচণ্ড লজ্জা করলো।তার বুকে ধুক ধুক শব্দ হচ্ছে।নিশ্বাস ভাড়ি হয়ে আসছে।হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে উঠেছে।ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো সেঁজুতির।সেঁজুতি মনে মনে শুকনো একটা ঢোক গললো।জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিয়ে সেগুলো প্রসারিত করার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।ভয়, সংকোচ, সংশয় আর লজ্জা যেনো তাকে ঘিরে ধরেছে।সেঁজুতির একবার মনে হলো এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে কিন্তু পরোক্ষণে আবার নিজেকে শান্ত করে নিলো।মাথা থেকে গোমটা সরে গেছে দেখে সেটা কপাল অবদি টেনে নেয়।তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ধীরেধীরে সাবেতের দিকে এগুতে থাকে।

সাবেত ঘাটের সিঁড়িতে পায়চারি করছে।সেঁজুতিকে এগিয়ে আসতে দেখে সে নড়েচড়ে দাঁড়াল।সেঁজুতি যত তার দিকে এগিয়ে আসছে ততোই যেনো তার হৃদ কম্পন বেড়ে যাচ্ছে।সাবেত সেই শব্দ ক্রামাগত শুনতে পাচ্ছে।সেঁজুতি সামনে আসতেই সে পূর্বের মতো হৃদয়ের অসারত্ব অনুভব করলো।সেঁজুতির কাজল কালো চোখ দুটো দেখে সাবেত যেনো ঘোরে চলে যাচ্ছে।সেঁজুতি লজ্জায় মাথা নুইয়ে সাবেতের সামনে এসে দাঁড়ায়।সাবেত একপলক সেঁজুতিকে দেখলো তারপর বলল,

“আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবে না।”

সাবেতের কথায় সেঁজুতি একপলক চোখ তুলে তাকায়।সাবেত গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখছে।সেঁজুতি তাতে একটু লজ্জা পেলো।লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলো।সাবেত সেটা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিলো।তারপর বলল,

“আমি চলে যাচ্ছি।তবে খুব শীগ্রই ফিরবো ততো দিনে তুমি মন দিয়ে পড়াশুনা করবে আর প্রতি মাসে দুটো করে চিঠি লিখবে আমায়।”

সেঁজুতি বিনাবাক্যে মাথা দুলিয়ে নিজের সম্মতি জানায়।সাবেত খুশি হয়।অন্তরে শীতলতা অনুভব করে।সেঁজুতি মাঝে মাঝে আড়চোখে সাবেতকে দেখে কিন্তু মুখে কিছু বলে না।সাবেত কিছুসময় গভীর দৃষ্টিতে সেঁজুতিকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।সাবেতের দীর্ঘশ্বাস সেঁজুতির কানে লাগতেই চমকাকে উঠে।তারপর বিস্ময়ে সাবেতের দিকে তাকায়।সাবেতের নজর তখন সেঁজুতির পায়ে।সেঁজুতি সাবেতের দৃষ্টির অর্থ বুঝতে সময় নিলো না মুহূর্তে ওড়নার ভাঁজে লুকিয়ে রাখা বাক্সটা বের করে আনে।সাবেত অবাক হয়ে দেখে কিছু বলতে পারে না।সেঁজুতি লজ্জায় নতজানু হয়ে বাক্সটা সাবেতের দিকে এগিয়ে দেয়।সাবেত অবাক হয়ে শুধু সেঁজুতিকে দেখছে।সেঁজুতি এইভাবে তার দেয়া ভালোবাসার চিহ্নটুকু ফিরিয়ে দিবে ভাবতে পারে নি।মুহূর্তে বুকের বা পাশে চিন চিন করে একটা ব্যাথা অনুভব করে সাবেত কিন্তু প্রকাশ করে না।সেঁজুতির হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেঁপে ধরে।সেঁজুতি ভয়ে ভয়ে একবার সাবেতকে দেখে তারপর সহজভাবে বলে,

“বাক্সে কি আছে আমি জানি না,খুলে দেখি নাই তবে যাই থাকুন না কেনো আমি চাই আপনি নিজের হাতে সেটা আমারে পড়াই দেন।”

সেঁজুতির শেষ কথা কানে পৌঁছাতে চমকে উঠে সাবেত।মুহূর্তে তার ওষ্টধর দুটি প্রসারিত হয়ে উঠে।আনন্দে তার চোখে জল আসতে চায়।সে যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না। সব যেনো স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।

সাবেতকে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেঁজুতি আবার বলল,

“কি হইলো? তাড়াতাড়ি করেন কেউ এইদিক টায় আইসা পড়লে বদনাম হইয়া যাইবো।”

সাবেত তখন আর একমুহূর্ত দেরি করলো না বাক্স খুলে একজোড়া নুপুর বের করে আনলো।সেঁজুতি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো।সাবেত একবার ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে নিলো তারপর ঘাটের সিড়িতে হাটু গেড়ে বসে সেঁজুতি পায়ে নুপুর জোড়া পড়িয়ে দিলো।

“নাও পড়িয়ে দিলাম এইবার তুমি আমার হলে আমার প্রিয় আষাঢ়ে সদ্য ফোঁটা কামিনী।”
বলে সাবেত শেষবারের মতো একটা চিঠি সেঁজুতির হাতে ধরিয়ে দিলো।তারপর সেঁজুতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নৌকায় উঠে বসে।

চলবে,,,,।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here