আষাঢ়ে_প্রেম_শ্রাবনে_পরিণয়,পর্ব_০৩

আষাঢ়ে_প্রেম_শ্রাবনে_পরিণয়,পর্ব_০৩
লেখিকা_সুমাইয়া_জাহান

মিনারা ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলে হামিদা কনুইয়ের ভর দিয়ে মাথা উঁচিয়ে দরজার দিকে দেখে।মিনারা চলে গেছে নিশ্চিত হলে সে শোয়া থেকে চুপিচুপি উঠে বসে।সেঁজুতি তখন গভীর ঘুমে মগ্ন।শুধু ঘুম নেই হামিদার চোখে।সাবতের সাথে সেঁজুতির কি কথা হয়েছে জানার জন্য তার কিশোরী মন আগ্রহশীল হয়ে উঠছে।হামিদা ক্ষণকাল মৌন হয়ে বসে থাকে তারপর বালিশের তলা হতে একখানা আধ ভিজা চিঠি বের করে নিলো।চিঠিটা সেঁজুতি তাকে দিয়েছিলো।সেঁজুতি পা পিছলে পড়লে হামিদা তাকে তুলতে এগিয়ে যায় আর সেই সময় সেঁজুতি চুপিচুপি হামিদার হাতে দিয়ে বলেছিলো,
“চিঠিটা তোর কাছে রাখিস হামিদা।আম্মা এক্ষুনি উইঠা আইবো যদি দেইখা ফেলেন তো সর্বনাশ হইতে কিছু বাকি থাকবো না।”
হামিদা ক্ষণকালের জন্য ভ্রুকুঞ্চিত করে পরে আবার ফিসফিসিয়ে বলে,

“আম্মা কি করে আইবো?”
সেঁজুতি হামিদার মাথায় চাটি মেরে বলে,
“আম্মার ঘুম পাতলা তোর চিল্লাচিল্লি শুইনা আম্মা এতক্ষনে ঘুম থেইকা জাইগা উঠছে।”
সেঁজুতি কথা শেষ হতে না হতে সেখানে মিনারা উপস্থিত হন।মিনারাকে দেখে হামিদা দ্রুত চিঠি লুকিয়ে ফেলে।

হামিদা চিঠির দিকে ক্ষণকাল দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে রইলো।তার উৎকন্ঠিত মন বলছে চিঠিটা খুলে দেখতে কিন্তু তার জাগ্রত মস্তিষ্ক বলছে অন্যের চিঠি পড়তে নেই।হামিদা উভয় সংকটে পড়ল।মন আর মস্তিষ্কের দোটানায় অবশেষে মস্তিষ্কের জয় হলো।আর তখনি সে মনের কথা শুনতে পেলো তার মন বলছে, ‘তুমি সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণ করেছো আমিও তোমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছি।’
মাঝে মাঝে মন নামক বস্তুটি বড্ড বেপরোয়া হয়ে উঠে।ঠিক ভুল বিচার করার শক্তি তখন বিকল হয়ে যায়।আর ঠিক তখনি মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠে সে বেপরোয়া মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে কিন্তু মন মস্তিষ্কের কথা মানতে নারাজ। সে চায় নিজের কথা শুনতে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে।আর ঠিক তখনি মানুষ সিদ্ধান্তহীনতা ভোগে।মন এবং মস্তিষ্কের এই লড়াইয়ে মানুষ তার চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে আর তখনি সে ভুল করে বসে।তবে সকল ক্ষেত্রে এই যুক্তি অনর্থক।মাঝে মাঝে মনকে প্রাধান্য দিতে হয় মনের কথা শুনতে হয়।যখন তুমি বুঝবে মন যা চাইছে তাতে মস্তিষ্ক নামক বস্তুটি তোমায় কোনো প্রকার বাধা প্রদান করছে না তখনি তুমি কেবল মনের কথা শুনবে, আর সেটাই তোমার জন্য সঠিক বলে জেনে রাখবে।

হামিদা পাশ ফিরে হারিকেনের আলো বাড়িয়ে নিলো।চিঠির একাংশ বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে।হামিদা চিঠির ভাঁজ না খুলেই হারিকেনের পাশে রেখে দিলো।তারপর এক দৃষ্টিতে চিঠির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।হারিকেনের উত্তাপে চিঠি শুকাতে শুরু করেছে।ধীরেধীরে হামিদার চোখ জড়ো হয়ে আসে।আর সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো সে।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে সেই সাতসকাল হতে।
বারান্দায় পাটি বিছিয়ে ফরিদ আর হামিদা বই পড়ছে।হামিদা এইবার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে আর ফরিদ দ্বিতীয় শ্রেনী।দু জনের বয়সের মধ্যে ছয় বছরের ব্যাবধান।সেঁজুতি এখনো বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে মেঘলা আকাশ দেখছে।পুরো আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে।মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও একটু আধটু সাদা মেঘরাশির দেখা মিলে আবার কালো মেঘে ঢেকে যায়।সেঁজুতি মেঘের এই লুকোচুরি খেলা দেখে মিটিমিটি হাসছে।তার মনেও আজ সাদা কালো মেঘর ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে।সাবেতের সঙ্গে রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে যাওয়ার ব্যাপারটা মনে পড়তেই তার সারা শরীরে অজানা এক শিহরণ বয়ে গেলো।শরীরের পশম খাড়া হয়ে যায়।ঘনঘন নিশ্বাস উঠানামা করে।সেঁজুতি মনে মনে সুখ অনুভব করে।সে জানে না এই সুখকর অনুভুতির নাম কি।সাবেতের উপস্থিতি কেনো তাকে অনুভুতি শুন্য করে দেয়।সাবেত যখন তার আশেপাশে থাকে তখন সে নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ শুনতে পায়।ভয় আর ভালোলাগা দুটো অনুভুতি তার সারা শরীর মন জুড়ে শিহরণ জাগিয়ে তুলে।এক অদ্ভুত মাধুর্যতা তাকে সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে। তবে কি একেই বলে প্রথম যৌবনে প্রথম প্রেমের অনুভুতি?সেঁজুতি আর ভাবতে পারে না লজ্জায় গাল দুটো গোলাপ রাঙা হয়ে উঠে।হঠাৎ সে শোয়া থেকে উঠে বসে।কোমরের ব্যাথা অনেকটা কমেছে।বিছানা থেকে গলা বাড়িয়ে বারান্দায় দেখলো হামিদা আর ফরিদ বই পড়ছে।সেঁজুতি গলা নিচু করে হামিদাকে ডাকে।হামিদা সেঁজুতি সাবধানী কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে রুসুই ঘরের চালার দিকে দেখে।মিনারা চুলায় খিচুড়ি বসাচ্ছেন।হামিদা মাকে কিছুসময় পর্যবেক্ষণ করে উঠে ঘরে গেলো।সেঁজুতির জিজ্ঞাসু চোখের চাহনি বুঝতে পেরে আগে আগে সে বলল,

“আম্মা চুলায় খিচুড়ি বসাইছে এক্ষুনি এহানে আইবো না আপা।তুমি চিঠিডা খুলো দেখো ডাক্তার সাহেব কি লিখছেন।”
সেঁজুতি ক্ষণকাল কিছু একটা ভাবলো তারপর গলা খাদে নামিয়ে বলল,
“আমার ডর করে হামিদা।হাত কাঁপতাছে দেখ?”

“তুমি এত ডরাও ক্যারে?কিচ্ছু হইবো না তুমি খুইলা পড় কি লিখছে।”
সেঁজুতি ভয়ার্ত চোখে হামিদার দিকে তাকালো।হামিদা চোখের ইশারায় সেঁজুতিকে চিঠি খুলতে বলে আবার দরজার কাছে চলে গেলো।
সেঁজুতি কাঁপা কাঁপা হাতে বালিশের তলা থেকে চিঠি বের করে নিলো।ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে।ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে।হাত পা দুটো আপনা আপনি শীতল হয়ে উঠছে।চিঠি খোলার মত সাহস পাচ্ছে না সে।হামিদা দরজায় দাঁড়িয়ে একবার বাহিরের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার সেঁজুতির দিকে।তার উৎকন্ঠার শেষ নেই।সাবেত চিঠিতে কি লিখেছে সেটা সেঁজুতির থেকে তার জানার আগ্রহ বেশি।সেঁজুতি চিঠি খুলতে সময় নিচ্ছে দেখে হামিদা ফিরে আবার সেঁজুতি কাছে এসে বলল,

“কি হইলো আপা চিঠিডা খুলো না ক্যারে?তাড়াতাড়ি করো আম্মা আইসা পড়লে কিন্তু আর পড়তে পারবা না।”
হামিদার কথা সেঁজুতি কান অবদি পৌঁছালো না।ভয়,লজ্জা আর ভালোলাগার মিশ্রণে তার কান দুটো গরম হয়ে উঠেছে।পেটে কেউ হাজারটা প্রজাপতি ছেড়ে দিয়েছে এমন অনুভুতি হচ্ছে।সেঁজুতি কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠির ভাঁজ খুলতে গেলে হামিদা ছোঁ মেরে চিঠিটা হাত থেকে নিয়ে নেয়।আকস্মিক এমন কিছু ঘটায় চমকে উঠে সেঁজুতি।দরজায় মিনারাকে দেখতে পেয়ে তার আত্না কেঁপে উঠে।হামিদা পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে,
“আম্মা আপার ব্যাথা আছে কিনা জিজ্ঞাস করতে আইছি।আপা কইতাছে ব্যাথা কিছুটা কমছে।”

মিনারা একবার হামিদাকে দেখলেন।তারপর চুপচাপ সেঁজুতির পাশে এসে দাঁড়ালেন।কপালে হাত ঠেকিয়ে সেঁজুতি শরীরের উত্তাপ পরখ করে দেখে বললেন,
“জ্বর এখন নাই।ব্যাথাডা আছে?”
সেঁজুতি মাথা দুলিয়ে না জানায়।মিনারা আবার বলেন,
“আইজ আর স্কুলে যাওন লাগবো না।”
মিনারা কথা শেষ করার আগেই হামিদা চেঁচিয়ে বলল,
“আম্মা আইজ আপার স্কুলে যাওনই লাগবো।”
মিনারা হামিদার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।বললেন,

“ক্যারে জাওন লাগবো ক্যান।”
বারান্দা থেকে ফরিদ মায়ের কথা শুনতে পেয়ে বলল,
“আম্মা আমিও তাইলে আইজ স্কুলে জামু না।বাইরে কি বৃষ্টি আইজ আর যাওন লাগবো না।”
হামিদা ফরিদের দিকে দাঁত কিড়মিড় করে তাকালো।সঙ্গে সঙ্গে ফরিদের হাসি মিলিয়ে গেলো।চোখ নামিয়ে বলল,
“বৃষ্টি বেশি তাই তো কইছি।”

“তোরে এত কথা কন লাগবো ক্যারে?বেশি পাকনা হইছোস?”

মিনারা ছেলে মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“চুপ কর তোরা।ফরিদ হামিদা তোরা দুইজনেই স্কুলে যাইবি।স্কুল কামাই করন যাইবো না তোগো বাপে হুনলে বকবো।”

“কিন্তু আম্মা আপারও তো যাওন লাগবো।রিনা আপা কইলো আইজ আপার ক্লাসে পরীক্ষা আছে না গেলে বার্ষিক পরিক্ষা থেইকা নাম্বার কাইটা নিবো।”
হামিদার কথা শেষ হওয়ার আগে সেঁজুতি হামিদার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।এই সম্পূর্ণ কথা হামিদা নিজে বানিয়ে বলছে।সেঁজুতি বিশ্বাস করতে পারছে না হামিদা তাদের আম্মাকে এমন ভাবে মিথ্যা কথা বানিয়ে বলছে।আর সব থেকে বেশি অবাক হচ্ছে হামিদা এত অকপটে মিথ্যা কথা বলার ধরণ দেখে।আম্মার সামনে চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলতে যেখানে সবাই ভয় পায় আর হামিদা কত সহজে মিথ্যা কথা বলছে।সেঁজুতি বুঝতে পারলো হামিদা কেনো এত সব করছে
তাই মনে মনে হাসল সে।সেঁজুতি হামিদার দিকে তাকাতেই হামিদা তাকে চোখ মারলো।

এক ছাতার নিচে তিন ভাইবোন ঘেঁষাঘেঁষি করে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে।সেঁজুতি ছাতা ধরে আছে।হামিদা আর সেঁজুতি লম্বা প্রায় কাছাকাছি।তারা দুজনেই মোটামুটি বৃষ্টি পানি থেকে নিজেদের মাথা আর বই বাঁচাতে পারলেও ফরিদ পারলো না সে পুরো ভিজে গেছে।সেঁজুতি, হামিদা উভয়ের থেকে লম্বায় ছোট হওয়ায় বৃষ্টির ঝাপটা পুরোটা এসে তার গায়ে লাগছে।সেঁজুতি ব্যাপারটা লক্ষ্য করলে ফরিদকে সে নিজের কাছে সরিয়ে আনে।বলল,

“তুই তো পুরাই ভিইজা গেলি।”

“আপা দেখো আমার বইও ভিজা গেছে।”
ফরিদ অশহায় ভঙ্গিমায় বলল।
সেঁজুতি ফরিদের হাত থেকে বইগুলো নিয়ে হামিদার হাতে ধরিয়ে দিলো।তারপর ফরিদকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা ধরলো।ফরিদের বয়স সাত বছর হলেও তাকে দেখতে পাঁচ বছরের বাচ্চা বলে মনে হয়।শরীর পাতলা হওয়ায় ওজনও কম।সেঁজুতি অনায়াসে তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে পারছে।

অর্ধেকটা পথ আসার পর বৃষ্টি থেমে গেলো।ফরিদকে কোল থেকে নামিয়ে হাঁফ থেকে বাঁচল সেঁজুতি।কোমরে ব্যাথা পাওয়ায় ফরিদকে কোলে নিয়ে হাঁটতে একটু বেশিই কষ্ট হচ্ছিলো তার।এখন কোল থেকে নামিয়ে একটু শান্তি পেলো।

ফরিদ স্কুলে চলে গেলে হামিদা সেঁজুতি একসাথে হাঁটতে থাকে।ফরিদের স্কুল থেকে কিছুটা দূরে তাদের স্কুল।
রাস্তায় কাঁদা থাকায় সেঁজুতি হামিদার হাত ধরে রেখেছে।একটু উনিশবিশ হলেই পিছলে পড়তে পারে।কিছুটা পথ এগিয়ে এসে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়লো হামিদা।হামিদাকে থামতে দেখে সেঁজুতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।হামিদা তখন ঘার ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখে বই থেকে চিঠি বের করে সেঁজুতিকে বলল,
“আপা এই লও চিঠি এইবার পড়বা কইলাম।না হয় কিন্তু তোমার লগে আমি কথা কমু না।”

সেঁজুতি কাঁপা হাতে চিঠিটা ধরলো।তার বুক ধুপধুপ করছে।চিঠির ভাঁজ খোলার মতো শক্তি কিংবা সাহস কোনোটাই সে পাচ্ছে না।চিঠি হাতে নিলেই তার ধমনী দ্রুত উঠা নামা করতে শুরু করে।গলা শুকিয়ে আসে যেমনটা সাবেত সামনে থাকলে হয়।চিঠিতে সাবেতের ছোঁয়া লেগে আছে।কত যত্নেই না এই চিঠিটা তাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছে সাবেত ভাবতে ভাবতে সেঁজুতি মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে।হামিদা আর অপেক্ষা করতে পারছে না সেঁজুতি কখন চিঠিটা খুলে পড়বে।সেঁজুতি ক্ষণকাল স্থির থেকে শেষে চিঠিটা খুলেই ফেললো।তার চোখে সাবেতের টানা টানা হাতের লিখা ভাসতেই হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো।সেঁজুতি একবার দেখেই চোখ বন্ধ করে নিলো।এই চিঠি পড়ার ক্ষমতা তার নেই।মনে হচ্ছে এই বুঝি অনুভুতি মিশ্রিত সকল শিহরণ তার শরীরে ঝেঁকে বসছে।হামিদা সেঁজুতির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।সেঁজুতির মুখে লজ্জার প্রতিফলন ভেসে উঠেছে।হামিদা উৎসাহিত হয়ে বলল,

“আপা জলদি পড়ো।”

সেঁজুতি ধীরেধীরে চোখ মেলে তাকায়।সাবেতের টানা হাতে লিখা গুলো আবার সমুখে উদিত হয়।চিঠি পড়তে গেলে সেঁজুতি গলা কাঁপে।মুখ থেকে কথা উচ্চারিত হতে চায় না।বুক ধুক ধুক করে।শ্বাস প্রশ্বাস বেড়ে যায়।তবুও অনেকটা সাহস নিয়ে সে পড়া শুরু করলো।

আমার প্রিয় আষাঢ়ের সদ্য ফোটা কামিনী,

কি ভাবছো?চিঠির শুভারম্ভটা আষাঢ়ের সদ্য ফোটা কামিনী বলে করেছি কেনো?তবে শুনো, তুমি আমার আষাঢ়ের সদ্য ফোটা কামিনী।ঘন বরষায় ঝিলের জলে সাদ্য ফুটন্ত নীল শালুকের ন্যায় তোমার ওই বদনখানী প্রথম যেদিন দেখেছিলাম বিশ্বাস করো,বিশ্বাস করো আমি নিজেকে হারিয়ে ছিলাম তোমার ওই ঝিলের জলের ন্যায় টলটলে ডাগর আঁখিদ্বয়ে।আমি ভুলেছিলাম আমি কে?আমি অনুভব করেছি আমার হৃদপিন্ডের অসারত্ব।থেমে গেছে ধমনীর রক্তচলাচল।শালুকের নীলভ পাপড়ির ন্যায় ওই ওষ্টধর দুটি আমার প্রাণ কেড়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছে কতবার।বিশ্বাস করো এই আষাঢ়ে ঘন বরষায় প্রথম যেদিন তোমায় দেখেছিলাম আমার দৃষ্টি তোমাতেই নিবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।সেদিন টি ছিলো সোমবার।আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ।একজন বারো বছর বয়সী মেয়ে ছুটে এলো চেয়ারম্যান বাড়িতে।সাথে সাত বছরের একটি ছেলে।আমি তখন কাছারিঘরে ইংরেজি নোবেল পড়ছি।মেয়েটি ছুটে এসে কাছারিঘরের দরজায় দাঁড়াল।বলল,চাচা বাড়ি আছে?”আমি মেয়েটিকে জানালাম আব্বা বাড়ি নেই।মেয়েটি মন খারাপ করলো,চলতে যেতে অগ্রসর হলো।শ্যামলা গায়ের মেয়েটির মুখে তখন আষাঢ়ে কালো মেঘ জমেছে বড্ড মায়া হলো আমার।ডেকে জিজ্ঞাস করলাম খুকী কিছু বলতে এসেছিলে।মেয়েটি পিছন ফিরে আমার দিকে তাকালো মুখে একরাশ আশার আলো দেখতে পেলাম।মেয়েটি বলেছিল,”চাচার কাছে আসছি আম্মার খুব অসুখ করেছে।আব্বা বাড়ি নাই একজন ডাক্তারের খুব দরকার আম্মাকে না হয় বাঁচাতে পরবো না।চাচা যদি গঞ্জের রফিক ডাক্তারকে আনার ব্যাবস্থা করেন তবে খুব উপকার হয়।তখন আমি মেয়েটিকে বলেছিলাম,’রফিক ডাক্তারকে আনতে পারবো না যদি চাও তবে আমি গিয়ে তোমার আম্মাকে দেখে আসতে পারি।আমার কথা শুনে মেয়েটি বড্ড অবাক হয় কিন্তু মুখে কিছু বলে না।আমি আমার ডাক্তারি জিনিস পত্র নিয়ে মেয়েটির সাথে বেড়িয়ে পড়ি।প্রায় কুড়ি মিনিটের রাস্তা হাঁটার পর একটা বাড়ি এসে পৌঁছাই।মেয়েটি আমাকে তার আম্মার কাছে নিয়ে যায়।ভদ্র মহিলাটি আমাকে দেখে চিনতে পারলেন না।জিজ্ঞাস করলেন আমি কে।আমি নিজের পরিচয় দিতেই তিনি উদগ্রীব হয়ে পড়েন। আমি তাকে শান্ত করে তার চিকিৎসা করে ওষুধ লিখে দেই।তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।তখন পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো কিন্তু মুশকিল হলো তখন যখন বাড়ির উঠান পেড়িয়ে রাস্তায় পা রাখলাম।ঝুপঝাপ বৃষ্টি আরম্ভ হলো।বৃষ্টির প্রথম ঝাপটায় আধ ভিজা হয়ে গেলাম প্রায়।কিছু বুঝার আগেই মুষালধারে বৃষ্টি নামলো।কি করবো কিছু বুঝতে না পেরে একটা গাছের নিচে এসে দাঁড়ালাম।মাথায় বৃষ্টি পড়েছে দেখে চুল ঝাঁকাতে থাকি আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পুরো পৃথিবী থমকে যায়।হৃদস্পন্দন থেমে গেলো।নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। আমি কে সেটাই ভুলেছিলাম।আমার দৃষ্টি তখন সামনে থাকা পুকুরে।একজন ষোল কি সতেরো বছরের ষোড়শী পুকুরে সাতার কাঁটছে।আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে আর তার মাঝে সদ্য নতুন যৌবনে পা রাখা কিশোরী পদ্মবিলে সাতার কাটছে।এই অপরুপ দৃশ্য ক্ষণকালের জন্য আমার বাক শক্তি কেড়ে নিয়েছিলো।আমি দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না।আমার মস্তিষ্ক বলছে দৃষ্টি নত করতে কিন্তু আমার মন চাইছে মেয়েটিকে দেখতে।আমি কি করবো?কার কথা শুনবো?আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি।নারীর রুপ এতটা কোমল আর স্নিগ্ধময় হতে পারে সেদিন প্রথম অনুভব করলাম।সদ্য ফোটা কামিনী ফুলের ন্যায় স্নিগ্ধতা তার সারা অঙ্গ জুড়ে।বৃষ্টির ফোট এসে জমেছে সেই সদ্য ফোটা কামিনীর নরম শুভ্র পাপড়ি গুলোয়।স্বচ্ছ ঝিলের টলটলে জলের ন্যায় তার আঁখি দুটি। ফুটন্ত শালুকের ন্যায় তার বদন একমুহূর্তের জন্য আমায় ভুলিয়ে দিয়েছিলো আমার আমিকে।আমি যেনো আর আমিতে ছিলাম না তোমাতে হারিয়ে গেছি।তোমার দিঘল কালো কেশ জুড়ে যেনো আষাঢ়ে মেঘ জমেছিলো।কামিনীরা শোভা পেয়েছিলো তোমার ওই দিঘল কালো চুলে।বৃষ্টির অজস্র ফোটা এসে তোমায় ভিজিয়ে দিচ্ছিলো।তুমি পরম সুখে তাদের বরণ করছিলে।হঠাৎ কি জানি হলো তুমি আমায় দেখে নিলে।আমায় তাকিয়ে থাকতে দেখে পানির গভীরতায় নিজেকে আড়াল করে নিলে আমিও লজ্জা পেয়ে গেলাম।নিজের প্রতি রাগ হলো কেনো এইভাবে তোমাকে দেখছিলাম কি না কি ভাবছো তুমি আমায় দেখে।লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো নিজের ব্যাক্তিত্বে আঘাত লাগলো অজান্তে। এই যেনো ঘোর অপরাধ করার মতো পাপ করে ফেলেছি।এই পাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় না পেয়ে স্থান ত্যাগ করতে চাইলাম কিন্তু একি আমি পারছি না।আমি চলে যেতে চেয়েও যেতে পারছি না।কোন অদৃশ্য শক্তি আমায় যেতে দিচ্ছে না?আমি না চাইতেই আরেকবার আড়চোখে তোমায় দেখলাম।তোমার চোখ দুটিতে বিস্ময়।আর সে বিস্ময় কিছু সময়ের ব্যাবধানে ভয়ে পরিণত হলো।তুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখছিলে।তোমার চাহনিতে ভয় সঞ্চার হলো।তুমি নিভু নিভু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে।এই দৃষ্টিতে ছিলো কেবল ভয়।উঁহু শুধু ভয় নয় ওই দৃষ্টিতে আরো কিছু ছিলো হয় তো সেটা লজ্জা।তোমার সেই লজ্জা আর ভয়ার্ত দৃষ্টিতে প্রথম বারের মতো আমি খুন হয়েছি।তোমার খুনি দৃষ্টি আমার হৃদয়ে ঝড় তুলে দিয়েছিলো।আর সে ঝড় এখনো আমি হৃদয়ে ধারণ করে চলেছে।আমি খুন হয়েছিলাম,এক ষোড়শী নারীর ভয়ানক চাহনি দ্বারা প্রথম বারের মতো সাবেত নামক কড়া ব্যাক্তিত্বের অধিকারী ব্যাক্তিটি খুন হয়েছিলো।তারপর? তারপর আরো অনেক কথা।এক চিঠিতে বলে শেষ হবার নয়।পরে না হয় একদিন বলবো।আজ বিকেলে চলে যাচ্ছি।যাবার পূর্বে তোমায় একটিবার দেখতে চাই।যদি সময় হয় তবে নদীর ঘাটে চলে এসো।আর হ্যাঁ একটা কথা বলা হয় নি।জানি না কি করে বলবো তোমায় খুব ভয় লাগছে।যদিও বলছি না লিখছি তবুও আমার হাত কাঁপছে।কলম চলতে চাইছে না হাতের সকল শক্তি দিয়ে কলম চালিয়ে লিখছি,”তুমি কি আমার সহধর্মিণী হবে সদ্য ফোটা কামিনী?”জানি না তোমার মতামত কি হবে তবে মন বলছে কিছু একটা হবে।তোমায় ভালোবাসি কথাটা বলার মতো সাহস আমার নেই।তাই সহধর্মিণী হওয়ার আবেদন জানিয়েছি।আর হ্যাঁ তোমায় একটা বাক্স দিয়েছি সেটা খুলে দেখো একটি জিনিস পাবে। যদি তোমার মতামত হ্যাঁ হয় তবে সে জিনিসটা তোমার অঙ্গে এতটুকু স্থান পেতে দিও তবেই আমি বুঝে নিবো তোমার সম্মতি আছে কি নেই।নদীর ঘাটে তোমার অপেক্ষায় থাকবো যদি পারো তবে চলে এসো।

ইতি,
তোমার ডাক্তার সাহেব।

সেঁজুতি চিঠিটা ভাঁজ করে নিলো।নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।এমন পাগল করা অনুভুতি কেনো হচ্ছে তার জানা নেই।তবে সে এতটুকু জানে নদীর ঘাটে তাকে যেতে হবে।

চলবে,,,।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here