আমি_জান্নাত #পর্বঃ০৪

#আমি_জান্নাত
#পর্বঃ০৪
#ফারজানা_আক্তার

আব্বু ভাইয়া আমি আবারো পড়ালেখা শুরু করতে চাই, আমি কলেজে এডমিশন নিতে চাই। নাহিদের ইভটিজিং এর কারণে এসএসসি পরিক্ষার পর আর পড়ালেখা হয়নি আমার এমনকি ঘর থেকে এক পা বাহিরে দেওয়ারও সুযোগ হয়নি কখনো আমার, পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে আমার সব স্বপ্ন মাটি হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু আমি এখন আবার আমার সেই পুরোনো স্বপ্নগুলোকে নতুন করে জন্ম দিতে চাই। প্লিজ তোমরা বাঁধা দিওনা আর আমায়।

আমার কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেন আর বলেন এই সিদ্ধান্ত যেনো আমি চেঞ্জ করি। ঘরের বাহিরে যেনো চলাফেরা না করি আমি। কিন্তু আমাকে যে এবার সাহসী হতেই হবে, নাহিদকে মুখের উপর জবাব দিতেই হবে। আমি বুঝতে পারছি আম্মুর মনে অনেক ভয় আমাকে নিয়ে। আমি বাহিরে গেলে নাহিদ আবারো আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে এটাই আম্মুর ধারণা। তবুও আমাকে এই সিদ্ধান্তে অটুট থাকতে হবে, নাহিদকে দেখিয়ে দিতে হবে ওর ভয়ে আমরা পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকিনি। এলাকার প্রায়ই সকলেই নাহিদকে ভয় পায় এটাই নাহিদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তবে আর নয় এই অত্যাচার। নাহিদকে শাস্তি পেতেই হবে আর তার জন্য আমাকে বাহিরের দুনিয়ার সাথে মিশতে হবে, ধৈর্য্য ধরতে হবে অনেক। হুট করে তো আর কিছু করা যায়না, সময় লাগবে, ধীরে ধীরে আসবে সব হাতের মুটোই।
আমার সিদ্ধান্তের কথা শুনে আব্বু আর ভাইয়া একদম চুপসে গেছেন। কোনো কথায়-ই বলছেননা উনারা। আমিও খানিকক্ষণ চুপ থাকলাম তারপর ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম

“প্লিজ ভাইয়া আমাকে বাঁধা দিওনা, আমি অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্তে এসেছি”

ভাইয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল

“আগামীকাল যাবো এডমিশন নিতে, তৈরি থাকিস”।

আব্বুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুচকি হাঁসি দিলেন আব্বু। খুব খুশি লাগছে আমার। কিন্তু আম্মুর মুখে প্রচুর চিন্তার চাপ। আম্মুকে পেঁছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম

“চিন্তা নয় দোয়া করো আম্মু, তোমার মেয়ে পারবে ইনশাআল্লাহ “।

ভাইয়া আমার ফোনটা দিয়ে গেলো। রুমে যেয়ে নয়না কে কল করে সব বললাম। মনে হচ্ছে যেনো আমার চেয়ে বেশি নয়না খুশি হয়েছে আমার এই সিদ্ধান্তে।
________________

বিকালের দিকে একটুখানি ঘুম দিলাম, আবার আছরের আজান দিলে উঠে নামায পড়ে রান্না ঘরে গিয়ে কফি বানালাম এক কাপ। কফি হাতে নিয়ে ঘরের সদর দরজার দিকে পা বাড়ালাম ঠিক তখনই আম্মু ডেকে জিজ্ঞেস করলেম কোথায় যাচ্ছি?

“একটু বাগানে যাচ্ছি আম্মু, কত কত দিন আমার বাগান দর্শন করা হয়নি, খুব স্বাদের বাগান কিনা।”

আম্মু আমার কথা শুনে বললেন উনিও আমার সাথে যাবেন। আম্মুও গা মাথা ভলো করে ঢেকে পা বাড়ালেন আমার সাথে। আমি জানি আম্মু কেনো আমার সাথে যাচ্ছেন কারণ আম্মু আমাকে আর একা ছাড়তে চাননা, ভীষণ ভয় পেয়েছেন কিনা বিয়ের দিনের ভয়াবহ ঘটনার পর।
বাগানে গিয়ে দেখলাম আমার সব গাছে ফুলের ভীড়, বাগানও দেখলাম খুব পরিষ্কার পরিছন্ন। হয়তো ভাইয়া দেখাশোনা করেছে এতোদিন আমার অনুপস্থিতিতে, আর যখন আমি দেখাশোনা করতাম তখন এইভাবে সব গাছগুলোতে ফুল ফুটতো নাহ, ভাইয়ার হাতে যাদু আছে বলতে হবে।
একে একে সব ফুল ছুঁয়ে দিচ্ছি আমি আর আম্মু দোলনায় বসে আমার সব পাগলামি পর্যবেক্ষণ করছেন খুব মনোযোগ সহকারে। আমার বাগানের ঠিক দক্ষিণ পাশে একটা দোলনা আছে, এই দোলনা ভাইয়া তার প্রথম উপার্জন দিয়ে কিনে দিয়েছিলেন আমায়, বাগানের দক্ষিণ পাশটা ছায়াময় আর হালকা মৃদু বাতাসও আছে ওইদিকে তাই ওই দোলনায় বসে বাগান বিলাশ উপভোগ করার আনন্দয় আলাদা। আমাদের বাড়িটা একা বাড়ি হওয়ায় কোনো লোকজন নেই আমরা ছাড়া, আর বাড়িটাও সম্পূর্ণ টিন দিয়ে যাপানো তাই বাহিরের কেউ আমাদের কে দেখেননা আর আমরাও কাউকে দেখিনা আমাদের বাড়িতে না আসা অব্ধি। আমার এই ঘটনার পর শুনেছি অনেক আত্মীয় স্বজন দেখতে এসেছে আমায় কিন্তু আম্মু কাউকেই আমার সাথে দেখা করার অনুমতি দেননি কারণ আমার চেহারা দেখে নানান জনে নানান কথা আবিষ্কার করবে হয়তো তাই।

পরেরদিন সম্পূর্ণ পর্দার সাথে ভাইয়া আর আমি কেলেজে গেলাম। একটা মহিলা কলেজে এডমিশন নিলাম। ভালোই লাগছে।
কলেজ থেকে ফেরার পথে নাহিদ দেখলাম সিগারেট খাচ্ছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আমি ভাইয়া কে বললাম আমাকে দোকান থেকে একটা সিগারেট এনে দিতে, ভাইয়া সিগারেটের জন্য গেলে আমি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। ভাইয়া অনেকবার জিজ্ঞেস করলেও ভাইয়াকে বলিনি সিগারেট কেনো লাগবে আমার শুধু বলেছি আনলেই দেখবে কি করবো সিগারেট দিয়ে। নাহিদ একা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্কুল মাঠের পাশের বড় আমগাছের সাথে গা ঠেকিয়ে আর সিগারেট খাচ্ছে একমনে, আশেপাশে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা। এটাই আমার জন্য সুবর্ণ সুযোগ মনে হচ্ছে। নাহিদ আমাকে দেখতে পাচ্ছেনা কারণ আমি নাহিদের পেঁছনে।
ভাইয়া সিগারেট আনলে ভাইয়াকে বলি সিগারেট টা জ্বালিয়ে দিতে। সিগারেট জ্বালিয়ে দিলে পা টিপে টিপে নাহিদের পেঁছনে গিয়ে দাঁড়ায়, ভাইয়া আমার সাথে সাথে আসলেও কিছুই বললোনা শুধু আমি কি করতে যাচ্ছি সেটা লক্ষ করছে।
নাহিদ আমাদের উপস্থিতি টের পায়নি, সেই সুযোগে আমিও পেঁছন থেকে নাহিদের বামগালে জলন্ত সিগারেট টা চেপে ধরলাম, হঠাৎ শরীরে এমন আঘাত পেয়ে ছিঁটকে পরে নাহিদ। আমাকে দেখে কিছুটা সময় থম মেরে ছিলো সে, প্রথমে আমাকে চিনতে পারেনি পর্দা অবস্থায় থাকাতে পরে ভাইয়াকে দেখে চিনতে পেয়েছে আমায়। পরে গালে হাত দিয়ে লাফাতে লাফাতে বললো

“জান্নাত তুই কিন্তু এটা ঠিক করলিনা, পরে পস্তাতে হবে তোকে তোর ফেমিলিকে তোর এই তেজের জন্য ”

আমিও রাগের মাথায় গটগট করে বললাম

“আমি তো সামান্য সিগারেটের আঘাত দিয়েছি তোকে যেটার দাগ কিনা খুব সহজেই চলে যাবে কিন্তু তুই যে আমাকে সারাজীবনের দাগ দিলি সেটা কি কিছুই না তোর কাছে? তুই কি ক্ষতি করবি আমার আর আমার পরিবারের তুই চিন্তাও করতে পারবিনা তোর জন্য কি অপেক্ষা করছে। যাইহোক তোর কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো তোকে জানানো।”

আমি পুরো কথা শেষ করার আগেই নাহিদ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠে “কি জানাতে এসেছিস তুই এভাবে আমাকে আঘাত করে”?

আমি একটু মুচকি হাসলাম যদিও পর্দার জন্য আমার হাসিটা নাহিদ লক্ষ করতে পারেনি তবে আমার কথার ভাজে সে বুঝতে পেরেছে আমি যে হেসেই কথা বলতেছি। আমিও টুক করে হালকা গলায় বলে দিলাম “আমি কলেজে এডমিশন নিয়েছি, আর এটা হলো তোর প্রথম হার আর আমার প্রথম জিত তাই তোকে এটা জানানো তো আমার কর্তব্য,, তাইনা?”

আমার কথা শুনে যেনো নাহিদের গালের জলন্ত ব্যাথার চেয়ে বুকের ব্যাথা বেড়ে গেলো দিগুণ। কারণ নাহিদ সবসময়ই চেয়েছে আমি যাতে সামনে আগাতে না পারি কেননা নাহিদকে আমি সেদিন অনেক অপমান করেছিলাম যেদিন নাহিদ আমাকে প্রথম বার প্রপোজ করেছিলো আর এর পর থেকে যতদিন স্কুলে পড়েছি ততদিন সে আমাকে প্রপোজ করে গেছে কিন্তু আমার নাহ কে হ্যাঁ তে পরিবর্তন করতে পারেনি সে।
আমার কথায় রেগেমেগে নাহিদ আমাকে মারতে আসলে ভাইয়া আমার সামনে দিয়ে দাঁড়িয়ে যায় হাতাতিতে একসময় ভাইয়া আর নাহিদের মধ্যে মারপিট লেগে যায় তখন আমি আর কিছু না ভেবে সেই জলন্ত সিগারেট নাহিদের হাতে চেপে ধরি। আবারো ছিঁটকে পরে নাহিদ, নাহিদ আবার আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে চাইলে আমি ব্যাগ থেকে সেই ধারালো ছু*রি টা বের করি। আমার হাতে ছু*রি আর আমার চোখের রাগ দেখে নাহিদ ভয় পেয়ে যায়। নাহিদ হয়তো ভাবতে পারছেনা আমি এতো সাহস কোথায় পেয়ছি কিন্তু সত্য হলো আমার পরিবারই আমার সাহস।
______________

সন্ধ্যায় একা বসে আছি জানালার কাঁচ ধরে, মনটা ভীষণ খারাপ। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম যে পরিবারের কাউকে সাথে নিয়ে আর কখনো এমন কিছু করবোনা যা করার আমি নিজেই করবো। ভাবতে ভাবতে যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার, এমন জীবন তো চাইনি আমি তবে কেনো হলো এমনটা আমার সাথে। সূর্যও ঢুবে গেলো, পৃথিবী কিছুটা অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে, সব পাখিরা সারি সারি হয়ে ফিরে যাচ্ছে নিজ ঠিকানায়, আমি বসে বসে উপভোগ করছি প্রকৃতির এই খেলাটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান দিলে ওজু করে নামাযে বসে যায় আমি।

রাতের খাবার খেতে বসলেও খাওয়ার প্রতি কোনো রুচি নেই আমার। আমার খাওয়ার প্রতি অনীহা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আর তা নিয়ে আম্মু খুবই দুশ্চিন্তা করেন। আব্বু বললেন আমার জন্য ঔষুধ আনবে, ঔষুধ খেলে নাকি রুচি ফিরে আসবে কিন্তু সবাই তো এটাই জানেনা যে নাহিদকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত আমার কোনো কিছুতেই রুচি আসবেনা।
কোনোমতে কিছুটা খাবার খেয়ে ঘুমাতে চলে গেলাম আমি নিজের রুমে। ঘুম আসছেনা কিছুতেই। অনেকক্ষণ বিছানায় এইপাশ ওইপাশ করে উঠে বসলাম। তারপর আধশোয়া হয়ে বসে ফোন হাতে নিয়ে ডাটা অন করলাম। ফেসবুকে যেতেই একটা নিউজে আমার চোখ আটকে পড়েছে, আমি খুবই হতাশ হয়ে ফোন টা হাত থেকে রেখে দিয়ে চোখজোড়া বুঁজে নিলাম।
মানুষ সবকিছুর সাথে লড়াই করতে পারলেও হৃদয়ের অনুভূতির সাথে কখনোই লড়াই করতে পারেনা। অনুভূতি গুলো স্বাধীন, তাকে বেঁধে রাখা যায় না। আবার অনুভূতি জিনিসটা টা সবার প্রতি আসেওনা আর যার জন্য আসে সে গুরুত্ব দেয়না। অনুভূতি গুলোর ডানা থাকলেও উড়তে ভয় পায় তারা।

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here