আমার_অপ্রিয়_আমি,পর্বঃ৯

আমার_অপ্রিয়_আমি,পর্বঃ৯
রিলেশন_সিরিজ
Ipshita_Shikdar (samia)


কথাগুলো বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে হাতে বাড়িয়ে দিলাম। কাব্যও হয়তো আর প্রত্যাখ্যান করার সাহস পায়নি তাই আমার এগুনো হাতে হাত রেখে মৃদুহাস্য চেহারায় ‘হ্যাঁ’ বললো। সেই থেকে শুরু হলো আমাদের সুখকর পথচলা কিন্তু কে জানতো তা ছিলো মাত্র দুমাসের। রিলেশনে যাওয়ার একমাস পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো বলতে গেলে আমার সম্পূর্ণ জীবনের সোনালী দিনগুলো তখনই ছিলো। একমাস পর থেকে কেমন একটা অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর পরিবেশ এসে পড়েছিলো আমাদের মাঝে।

দুজন মানুষের একে অপরকে ভালোবাসলে একজনের রঙে অপরজনের নিজেকে রাঙাতে হয়। তাই দুজনার মাঝে একজন এমন হতে হবে যে নিঃস্বার্থভাবে নিজ রঙ ছেড়ে অন্যের রঙকে আপন করে নিবে অন্যাথায় ভালোবাসা অবিরাম হলেও সংসার কিংবা সম্পর্ক টিকে না বরং তার অবস্থান হয় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী।

কাব্য এবং আমার মাঝে এই সমস্যাটাই বিদ্যমান ছিলো। আমরা দুজনেই অপরজনকে নিজ রংয়ে রাঙাতে চেতাম, চাইতাম সে আমার মতো নিজেকে সাজাক কিংবা আমার ইচ্ছানুযায়ী আমাকে ভালোবাসুক। কোনো বিশেষ সময়ে দুজন চাইতাম নিজে পছন্দমতো রংয়ের কাপড় দুজন একসাথে পরিধান করি। অবশেষে বিশেষ ও সুন্দর মুহূর্তগুলো নষ্ট হতো মনমালিন্যের মাঝেই। এছাড়াও তাকে নিয়ে আমার ইনসিকিউরিটিস বাড়ছিলো দিনদিন। কথায় আছে না ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়, আমার অবস্থাও তাই ছিলো। একে তো জীবনে প্রথমবার এমন একজনকে পেলাম তার উপর সম্পর্কের যাচ্ছেতাই অবস্থা তাহলে তাকে হারানোর ভয়টা অস্বাভাবিক কিছু না। তাই সন্দেহর বীজ দিনদিন আমার মনকে ভেঙে ফেলছিলো যার ফলে আমি কাব্যকে না জানিয়েই তাকে দিয়ে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন পেপার সাইন করিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি। এটারই সুযোগ নেয় সেই ছেলেটা।

কাব্যর পরিবার ঢাকা থাকলেও সে থাকতো আমার সাথে সিলেট ছোট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে। একদিন হঠাৎ সে তার সাথে একজন যুবক নিয়ে এসে বলে,

— ইশা লুক! আমার সাথে কে এসেছে দেখো। তোমার একমাত্র হবু দেবর এসেছে ঢাকা থেকে শুধুমাত্র তোমাকে দেখতে। হি ইজ মাই ফুপি’স ওয়ান এন্ড ওনলি সন। আর এটা হলো তোমার হবু ভাবি ইশা মানে কাব্যর হবু বউ।

— হ্যালো ভাইয়া! কেমন আছেন আপনি?

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি ইশা। তুমি কেমন আছো বলো?

— শি ইজ ফাইন। বাট তুমি ইশাকে নাম ধরে ডাকছে কেনো? শি ইজ ইউর ভাবি, তাই না?

— সো হোয়াট ব্রো? এখনো বিয়ে হয়নি আর ভবিষ্যৎ তো বলা যায় না তাই আমি ইশাকে তার নাম ধরেই ডাকি। এমনিতেও সে আমার বয়সে ছোট। তাই না ইশা?

তার তাকানোর ভঙ্গিমায় আমার একটু আনকমফর্টেবল লাগছিলো। তবুও মনের ভুল ভেবে তা উপেক্ষা করে তার কথা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালাম। এরপর থেকে প্রায়সময়ই সে কাব্যর সাথে আমাদের ডেটে চলে আসতো। কখনো কখনো সে একাও আমার সাথে দেখা করতে কলেজে কিংবা গার্ডেনে আসতো। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগতে পরে মানিয়ে নিয়েছিলাম, এমনকি ভালো এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। একদিন কথায় কথায় সে বলে বসলো,

— শেষ পর্যন্ত কাব্য একটা গতি পেলো জীবনে নাহলে ও যা ডুবে থাকতো এসবে। আই এম রেয়ালি হ্যাপি ফর মাই এন্ড থ্যাংকস টু ইউ সে ঐ পথ থেকে ফিরে আসলো।

— কোন পথ আর কি বলছো তুমি? আমি তোমার কথার কিছু বুঝতে পারছি না!

— কেনো? কাব্য কি তোমাকে কিছু বলেনি তার অতিত সম্পর্কে নাকি তুমি বলতে দ্বিধা বোধ করছো? যদি তা হয়ে থাকে ডোন্ট ওয়ারি আমি জানি সব।

— হোয়াট দ্য হেল! আমি কিছু জানি না তুমি ক্লিয়ারলি বলো প্লিজ।

— কিহ! কাব্য তোমাকে কিছু বলেনি তাহলে এটা তার উচিত হয়নি। নাহ, আমি তোমাকে ধোঁয়াশায় রাখতে পারি না নাহলে নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে যাবো। কাব্য আ-আসলে একটা ফ্লাট এবং মেয়েবাজ… স্কুল ও কলেজ থেকে এসব নিয়ে অনেক কমপ্লেইন আসতো তাই মামা-মামি অতিষ্ঠ হয়ে তাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর ভাইয়ার এখানেও দুজন মেয়ের সাথে প্রেম হয় তবে সে তাদের থেকে বোর হয়ে যায় এবং ব্রেকাপ করে। তাছাড়া লাস্ট যে মেয়েটার সাথ রিলেশন ছিলো নাম যেনো কি… নিশাত! নিশাত! তার সাথে তো এখনো ভালো সম্পর্ক। তবে তাতে কি!

— হোয়াদ্দা ফা* আর ইউ সেয়িং সে তো আমাকে বলেছে নিশাত তার কাজিন বোন। সে আমাকে এভাবে ধোঁকা দিলো কিন্তু কেনো?

— সে হয়তো বলতে ভয় পাচ্ছিলো। ডোন্ট টেক ইট নেগেটিভলি।

তিয়াসের এই কথাগুলো যেনো আমার সন্দেহকে নতুন গতি দিয়েছিলো। আগের থেকে আরও বেশি সন্দেহ করতে শুরু করলাম, সব বিষয়ে জবাবদিহিতা করতে বলতাম, কথায় কথায় ঝগড়া করতাম। কিছুদিন পর কাব্য আমাকে কল করে বললো কাব্যর বাসায় আসতে কারণ তার সেদিন নাকি বাসায় পার্টি ছিলো। আমি যেয়ে দেখি পার্টিতে নিশাত সহ কাব্যর সব বন্ধুবান্ধব এসেছে। তিয়াস কাব্যর কোথায় জিজ্ঞেস করায় আচমকা খেয়াল করলাম কাব্য ও নিশাত দুজনেই পার্টি অর্থাৎ ছাদ থেকে গায়েব। চেনা ভয়ে আমার মনটা আবার কেঁপে উঠলো। তাদের খুঁজতে ছুটলাম ফ্ল্যাটের দিকে কিন্তু যেয়ে যা দেখলাম তাতে আমি হতভম্ব।

নিশাত কাব্যর এক হাত নিজের দুহাতের মাঝে নিয়ে কাঁদছে, আর কাব্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম তার হাতে একটি কাগজ, দেখতে অনেকটা মেডিকাল রিপোর্টের মতো। আমি তাদের কিছু না বলেই ভিতরে ঢুকে মেয়েটার হাত থেকে একটানে কাগজটা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। তা দেখে এবার নিজেকেনিঃস্ব এবং নিস্তেজ মনে হচ্ছিলো। কারণ রিপোর্টটি ছিলো নিশাতের প্রেগনেন্সি টেস্টের এন্ড দ্য রেজাল্ট ওয়াজ পসিব্যাল।

কাব্য ও নিশাত এমনিতেই আমার অনাকাঙ্ক্ষিত আগমনে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার উপর আমি তাদের যা নয় তা বলে অপমান করা শুরু করি।

— ওহ! তাহলে এই তোমাদের সো কল্ড ভাইবোনের সম্পর্ক, যার আড়ালে এসব অবৈধ কার্যকলাপ করে যাও। আর এই মেয়ে তোমার কি কোনো লজ্জাশরম নেই! চরিত্রের এই অবস্থা কেনো! যাকে ভাই বলে পরিচয় দিতে, জানতে তার গার্লফ্রেন্ড আছে সেই ছেলের সন্তান পেটে নিয়ে বসে আছো! ছিহ! তোমাদের মতো মেয়েদের তো…

আর কিছু বলতে পারলাম না তার আগেই কাব্য আমাকে ঠাস করে এক চর লাগিয়ে দিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলতে লাগলো,

— কখন থেকে কিসব আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছো যার না আছে কোনো হাত-পা, না আছে কোনো যুক্তি, না কোনোরুপ প্রমাণ। তোমার সাহস কি করে হয় আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বোনকে এতো ফালতু কথা বলার! এখন যাও আমার সামনে থেকে! জাস্ট গো নাউ!

আমি একবার নিশাতের দিকে তাকালাম, মেয়েটা এককোণে বসে কাঁদছে। কেনো যেনো আমার সেদিন একফোঁটা মায়া লাগলো না তার জন্য বরং একরাশ রাগ নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলাম সেখান থেকে। হয়তো মনটা সম্পূর্ণ কলুষিত হয়ে গিয়েছিলো সন্দেহ নামক রোগে। পার্কিংলটে আসতেই দেখা হলো তিয়াসের সাথে। আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে বের হয়েই যাচ্ছিলাম কিন্তু সে আমার হাত ধরে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করো বসলো,

— কি হয়েছে! কাঁদছে কেনো তুমি?

আমি রাগের ঘোরে কাঁদতে কাঁদতে সব তাকে বলে বসলাম। সে আমাকে পার্কিংলটে বিদ্যমান সোফার একপাশে বসিয়ে পানি পান করালো। আমাকে বলতে লাগলো,

— দোষ কাব্য করেছে তাই দোষী সে। তুমি কেনো কাঁদবে? তুমি তো কোনো ভুল করেনি। যদি তুমি কাঁদো তাহলে কাব্য বুঝে ফেলবে তুমি তাকে ছাড়া অচল এবং তোমার ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করবে আবার। তুমি তাকে প্রমাণ করে দাও তুমি তাকে ছাড়াও ভালো থাকতে পারো। তখন সে বুঝতে পারবে তোমার কষ্ট

কাব্যর উপর এমনিতেই তখন অনেক রাগ ও ক্ষোভ জমে গিয়েছিলো মনে। তাই তার এই কথায় অনেকটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— কি করে আমি তা প্রমাণ করবো?

সে বাঁকা হেসে আমাকে বললো,

— তার মতো তুমিও অন্যকে নিয়ে মেতে উঠার অভিনয় করো। এতে সে যেমন বুঝবে তুমি তাকা ছাড়াও অন্যকে নিয়ে মেতে থাকতে পারো তেমনিভাবে সে তোমাকে অন্যের সাথে ভালো থাকতে দেখে বুঝতে পারবে কি হারিয়েছে।

কাব্যর উপর রাগ ও ক্ষোভ এতোটাই তীব্র ছিলো যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই তার কথায় সায় জানিয়ে আমি সেই পথে নেমে পড়লাম। যেহেতু দেখতে সুন্দর ও আধুনিকা ধরনের ছিলাম নতুন সম্পর্কে জড়াতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। দুদিন পর কাব্য আমাকে সরি বলতে আমার কলেজের সামনে আসে তখন আমি সেই ছেলের সাথে কথা বলছিলাম। তাকে দেখতে পেয়ে আমি ছেলেটার সাথে আরও গা ঘেঁষে কথা বলতে শুরু করি। কাব্য ততদিনে আমার প্রতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। তাই খুব রেগে আমাকে বলতে লাগে,

— এসব কি ইশা? আর এই ছেলে কে তোমার সাথে? তোমাকে জড়িয়ে ধরেই বা আছে কোন সাহসে!

— হি ইজ মাই বয়ফ্রেন্ড। তুমি কি ভেবেছো শুধু তুমিই আমাকে ছাড়া ভালো থাকতো পারে আমিও পারি। আমি ও মানে জিসানের সাথে খুব সুখী… প্রতিদিন একেক জায়গায় ঘুরতে যাই, ডেটে যাই, বিশেষ মুহূর্তগুলো একে অপরের হাতে হাত রেখে উপভোগ করি। দারুণ সময় কাটে!

— ছিহ! ইশা তুমি এই কাজটা করতে পারলে! আসলে তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোই বাসোনি তা নাহলে এতো সহজে সবটা ভুলে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে পারতে না।

বলেই সে হরহর করে সেখান থেকে চলে গেলো। কয়েকদিন পর জানতে পারলাম সে চেনা শহরটা ছেড়ে চলে গিয়েছে। তবে তিয়াস তখনো এখানে এবং আমাকে অনেক সময়ও দিতো। প্রথম প্রথম সব ঠিক থাকলেও তারপর কেমন যেনো শূণ্যতায় গ্রাস হচ্ছিলাম। বড্ড পোড়াতো এই শহর আমায় কারণ এটাই তো ছিলো কাব্য ও আমার পরিচয়ের ও ভালোবাসাময় মুহূর্তের স্থান। আমিও ছেড়ে দিলাম তবে শুধু এই শহরকে নয় দেশটাকেই।

নতুন করে শুরু হলো জীবন। সব ভালোই চলছিলো পড়ালেখার ব্যস্ততার মাঝে কিন্তু দিনশেষে কাব্যর শূণ্যতায় আমাকে পুড়তেই হতো। হঠাৎ একবছর আগে এক শুক্রবার মাসিক বাজার করতে যেয়ে দেখি নিশাত এক পুরুষের সাথে এবং কোলে অত্যন্ত কিউট এক বাচ্চা। বুঝতে আর বাকি রইলো না এটা তার সন্তান তবে ছেলেটা কে? দেখে তো স্বামীস্ত্রীই মনে হচ্ছে তাহলে কাব্যর সাথে কি… এতো না ভেবে এগিয়ে গেলাম তার দিকে।

সে আমায় দেখে খাণিক অবাক হলেও পরক্ষণেই মুখে কাঠিন্যতা নিয়ে এলো। আমি অতশত না বকে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলাম তার সাথের পুরুষটির পরিচয় নিয়ে। সেও অনায়াসে বলে ফেললো লোকটি তার স্বামী এবং সন্তানের পিতা। আমি খাণিকটা সময় তার দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই সে বলতে শুরু করলো,

— হ্যাঁ, কাব্য এবং আমার মাঝে কোনো কালেই কোনোরুপ সম্পর্ক ছিলো। আমরা খালাতো ভাইবোন এবং বেস্টফ্রেন্ডস। আর ঐদিন কাব্য আমাকে একজন ভাই হিসেবে সামলাচ্ছিলো। কারণ আই ওয়াজ প্রেগন্যান্ট বিফর ম্যারেজ এন্ড নীল মানে আমার বয়ফ্রেন্ড বা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার স্বামী তখন বিয়ের জন্য তৈরি থাকলেও বাচ্চার জন্য তৈরি ছিলো না। তাই সে আমাকে বারবার এবোর্শনের জন্য ফোর্স করছিলো কিন্তু আমি মা হয়ে কি করে নিজের সন্তানকে মারতে পারি… তাই সবমিলিয়ে এই কঠিন সময়ে কাব্যকে কাঁদতে কাঁদতে নিজের দুঃখগুলো বলছিলাম যাতে সে সাহায্য করতে পারে। সে সময়ই তুমি এসে… আর ও তোমাকে থাপ্পড় মেরে বসে। পরে অবশ্য নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চাইতে গিয়েছিলো কিন্তু তুমি যা করলে। সে যাই হোক তোমার যা জানার ছিলো বলে ফেলেছি আমি।

তার কথাগুলো যেনো অপারাধবোধ ও কাব্যর শূণ্যতা আরও বাড়িয়ে দিলো। আমি ছলছল চোখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

— কাব্য এখন কোথায় আছে? আমাকে দয়া করে বলে কারণ আমি যে তার সাথে দেখা করে এই ভুল বুঝাবুঝির সমাপ্তি ঘটাতে চাই।

— সমাপ্তি ঘটালেই কি আর না ঘটলেই কি নতুন সম্পর্কের শুরু হয়ে গিয়েছে তার জীবনে। আমার ভাইটার প্রেম ছিলে তুমি আর প্রেমটা হাজারটা হয় জীবনে এবং আসে-যায়। তবে তার সীমা ভালোবাসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তই। অবশ্য প্রেমকেও ভালোবাসাতে রূপান্তর করা যায়। যাই হোক যেহেতু কাব্যর জীবনে তার ভালোবাসা এসে পড়েছে তাই নতুন করে তুমি ফিরে এসে তার জীবনটা উথালপাতাল করার দরকার কি! যে ভাই আমাকে আমার সন্তান ও ভালোবাসা উভয়ই দিয়েছে তাকে আমি অসুখী করতে পারি না কখনোই। তাই তার ঠিকানা বলতে পারছি না ক্ষমা করো তুমি। আর ভালোবাসলে সম্পর্ক টিকে না তার চাইতে জরুরি বিশ্বাস।

কথাগুলো বলেই সে তার স্বামী ও সন্তান নিয়ে বের হয়ে গেলো। এদিকে আমি স্তব্ধ ও নিস্তেজ হয়ে সেখানেই বসে পড়লাম। সৌভাগ্যবশত আমার ক্লাসমেট পাশে ছিলো। সে-ই আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। দুদিনে নিজেকে সামলে কাব্যর খোঁজখবর নেয়া শুরু করলাম। কারণ তাকে আমার যেকোনো মূল্যে চাই। কাব্য ও তিয়াস ছাড়াও তার ফ্রেন্ডস ও নিজের কলেজ ফ্রেন্ডসদের নাম্বার আমি নিজ হাতে ডিলিট করেছিলাম ফোন থেকে, নিজের পুরাতন সিমটাও নষ্ট করেছিলাম এয়ারপোর্টে কারণ পিছুটান রাখতে চাইনি তখন। তার পুরাতন ফেসবুক আইডিটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বেশ কয়েকবার সার্চ করেও। তাছাড়া কাব্যর সাথে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক মিলিয়ে মাত্র তিনমাস তাই তার কিছুই তেমন একটা জানতাম না আমি। ইনশর্ট কাব্যকে পাওয়া আমার জন্য ওয়াজ লাইক আ ড্রিম তবুও মনে সুপ্ত আশা তখনও ছিলো।

কিছু মাস পরই কাউকে না জানিয়ে দেশে আসলাম, মায়ের ট্রান্সফার ততদিনে আবারও ঢাকায় হয়েছিলো। তাই ফিরে পেলাম নিজের পুরাতন ফ্রেন্ডদের বিশেষ করে আমার প্রাণপ্রিয় বেস্টুকে। তার কাছ থেকে শুনলাম তার এঙ্গেজমেন্ট আমাকে যেতেই হবে। জেনে এতোটাই এক্সাইটেড হয়েছিলাম যে এতো দুঃখ কিছু সময়ের জন্য ঘুচে গিয়েছিলো। কিন্তু এঙ্গেজমেন্টের দিন যা দেখলাম পুরোনো ক্ষতগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠলো। কারণ আমার বেস্টুর ভালোবাসা ও তার হবু স্বামী আর কেউ নয় আমার ক্ষণিকের পাওয়া ভালোবাসা।

নিজেকে অনেক কষ্ট সামলে বের হয়ে গেলাম সেখান থেকে। বাড়ি ফিরে কেঁদে বুক ভাসালাম কিন্তু তাতে দুঃখ একবিন্দুও কমলো না। বরং মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকলো অদ্ভুত সব চিন্তা। কখনো মনে হচ্ছিলো লিগাল্লি আমি তার স্ত্রী আমি চাইলেই তো সে নতুন করে বিয়ে করতে পারবে না। তো কখনো মনে হলো সে তো আমায় ভালোবাসে না। আবার ভাবলাম তাতে কি আমি তো বাসি, দরকার হলে ছিনিয়ে নিবো। পরের মুহূর্তেই নিজেকে ধিক্কার জানালাম বোনের মতো বেস্টুর সাথে এটা করার পরিকল্পনা করার জন্য। কারণ স্কুল লাইফে ওর মা-বাবা ও ভাইয়েরাই আমাকে পরিবারই আমাকে সামলেছে আমার প্যারেন্টস তো… পরদিনই তাকে কল করলাম দেখা করতে।

দেখা করতেই তিয়াস আমাকে কি করে ভুল বুঝিয়েছিলো তা সহ বিয়ের ব্যপার সবটা খুলে বললাম। আমি বিয়ের ব্যপারটা বলতেই সে ভয়ার্ত গলায় বললো,

— আমি ওকে এমনিতেই ধোঁয়াশার মাঝে রেখেছি তোমার ও আমার অতিত না বলে। তার মধ্যে যদি বিয়ের কথা জানে তাহলে তো কখনোই মেনে নিবে না। তার পরিবার তো অবশ্যই না। আর কেনোই বা নিবে বিবাহিত বা ডিভোর্সি ছেলের সাথে সংসার করতে কে বা কারাই রাজি হবে।

আমি তাকে আত্মস্থ করে বললাম,

— ডোন্ট ওয়ারি কাব্য। কেউ কিছু জানবে না তার আগেই আমরা ডিভোর্স করিয়ে ফেলবো। কারণ আমিও চাই না আমার সে কোনোপ্রকার কষ্ট পাক।

একদিকে কাব্যর নব বিয়ের এরেঞ্জমেন্ট চলছিলো অন্যদিকে আমাদের ডিভোর্সের। নিজেকে বাহিরের থেকে মজবুত রাখলেও ভিতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম। আমাদের ডিভোর্স প্রসেসটা একটু সময়সাপেক্ষ কারণ কাব্যদের পরিবার ঢাকা শহরের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মাঝে একটি। তাই মানসম্মানের ভয় ছিলো বলে যাতে লিক না হয় বাইরে তাই তত্যন্ত প্রাইভেটলি করা হচ্ছিলো। তাছাড়া কাগজি কাজসহ উকিলের সাথে বা দুজনার সবধরনের ডিস্কাশন কাব্যর নিজস্ব বাড়িতে এমনকি বেডরুমে করতাম। একদিন ডিভোর্সের কাজেই সেখানে ছিলাম তবে সেদিন আর নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কেঁদে ফেলি। আর কাব্য আমাকে সামলাতে জড়িয়ে ধরে, আর দুর্ভাগ্যবশত তা-ই দেখে ফেলে আমার প্রিয় বান্ধুবী। শেষপর্যন্ত তাকেও হারিয়ে আজ এই ইশা নিঃস্ব।

আরাভ এতক্ষণ এই আধুনিকা নারীর আত্মকথা শুনছিলো। কখন যে তার চোখে জল এসে পড়েছে বুঝতেও পারিনি। পাশে বসিত ব্যক্তিটি দেখার আগেই মুছে নিলো। হঠাৎই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভেবে উঠলো মানুষটি তার চাইতেও ব্যথিত। কারণ চাওয়া বিষয়গুলো না পাওয়ার চাইতে বেদনাদায়ক তা পেয়েও হারানো।

মেয়েটিও তার দিকে তাকিয়ে ম্লান ও মৃদুহাস্য চেহারায় বলে উঠলো,

— আপনার গল্পটা বললেন না যে?

— আজ অনেক রাত হয়েছে তাই বলার প্রয়োজন নেই। বরং আপনাকে বাড়ি ছেড়ে আসি, আরেকদিন বলবোনে। এখন তো চেনাজানা হয়েই গেলো, কথোপকথনও হবে, মনের ভাব প্রকাশও হবে কারণ একই ব্যথায় ব্যথিত আমরা দুজন।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here