অরোনী তোমার জন্য~১

অরোনী, তোমার জন্য~১
লিখা- Sidratul Munta

অরোনী প্লেটে একপিস গলদা চিংড়ী নেওয়ার সময় রাবেয়া বললেন,” এখান থেকে নিও না। এটা বাচ্চাদের জন্য করা হয়েছে।”
অরোনীর হাত থেমে গেল। ডাইনিং টেবিলের সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাবেয়া অরোনীর শাশুড়ী হোন। তিনি সব ব্যাপারেই অরোনীকে নিষেধ করেন। এটা তার স্বভাব। কিন্তু খাওয়া-দাওয়া নিয়েও যে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন সেটা ভাবেনি অরোনী। রাবেয়া বললেন,” সবার মাথা গুণে চিংড়ী রান্না হয়েছে। তুমি একটা নিয়ে গেলে একজনের কম পড়ে যাবে। তুমি বরং ইলিশ ভাজা নাও।”
অরোনী নরম কণ্ঠে বলল,” মা, আমি তো ইলিশ মাছ খাই না কাটার জন্য।”
রাবেয়া এই কথা শুনে যেন কিঞ্চিৎ বিরক্তই হলেন।
” কাটার জন্য ইলিশ মাছ খাও না? মেয়েদের সব খাওয়া শিখতে হয়। কি আর করবে? একটা ডিম ভেজে খেয়ে নাও তাহলে।”
অরোনী কি এখন খাওয়া ছেড়ে উঠে রান্নাঘরে ডিম ভাজতে যাবে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে শুধু পালং শাক আর ডাল দিয়েই খেতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই অরোনীর সমবয়সী ননদ নিলিমা এসে গলদা চিংড়ী প্লেটে তুলে নিল। অরোনী বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল,” আরে নিলি, কি করছো? এটা তো বাচ্চাদের জন্য।”
কথাটা শুনে নিলিমাসহ ডাইনিং টেবিলের সবাই অরোনীর দিকে তাকাল। রাবেয়াও অবাক হয়ে তাকালেন। অরোনী হেসে বলল,” মাথা গুণে করা হয়েছে তো। তুমি নিয়ে গেলে একটা বাচ্চার কম পড়ে যাবে না? তুমি এইটা রেখে ইলিশ ভাজা নাও।”
নিলিমা একটু আহ্লাদ করে বলল,” কিন্তু ভাবী, আমি তো ইলিশ মাছ কাটা বেছে খেতে পারি না। আর আমার চিংড়ী খুব ফেভারিট। ”
” তাতে কি হয়েছে? আমিও তো খেতে পারি না। তবুও মা আমাকে চিংড়ি নিতে দেননি। বাচ্চারা তো আর চিংড়ী ছেড়ে ইলিশ খাবে না। আমিও নেইনি সেজন্য। দেখো আমার প্লেট খালি। তুমিও আমার মতো শাক আর ডাল দিয়ে খেয়ে নাও। নয়তো ডিম ভেজে খাও। কি আর করবে? ঠিক বলেছি না মা?”
রাবেয়া বক্রদৃষ্টিতে তাকালেন অরোনীর দিকে। নিলিমা উদাস হয়ে বলল,” সত্যি মা? আমার জন্য চিংড়ী নেই?”
রাবেয়া কঠিন গলায় বললেন,” কে বলেছে নেই? চিংড়ী আমার বাচ্চাদের জন্য৷ তুইও তো আমার বাচ্চাই। তোর জন্যও একটা চিংড়ি বরাদ্দ আছে।”
নিলিমা এবার অরোনীর দিকে চেয়ে হাসিমুখে বলল,” দেখেছো ভাবী? মায়ের কাছে সন্তানেরা সবসময় বাচ্চাই থাকে।”
অরোনী হতাশ কণ্ঠে বলল,” তাইতো দেখছি। কিন্তু আমি জানতাম শাশুড়ী নাকি মায়ের মতো হয়। আজকে বুঝলাম কথাটা ভুল। আমার বয়সী হয়েও তুমি মায়ের কাছে বাচ্চা। আর আমি বুড়ী।”
নিলিমা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল,” তুমি খুব মজা করে কথা বলো ভাবী।”
” বিশুদ্ধ সত্যি কথাগুলো মজা করেই বলতে হয় নিলি।”
রাবেয়া চেহারা শক্ত করে খেতে লাগলেন। অরোনীর চাচী শাশুড়ী বললেন,” তাহসিন তো রাতে খাবে না। ও ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি বরং ওর চিংড়ীটা খেয়ে ফেলো। নাও অরোনী।”
অরোনী মুচকি হেসে বলতে যাচ্ছিল সে খাবে না। কিন্তু এর আগেই রাবেয়া ধমক দিয়ে উঠলেন,” কেন ওকে দিচ্ছো? তাহসিন সকালে উঠে খেতে চাইলে? ফ্রীজে তুলে রাখো এটা।”
চাচী শাশুড়ী মুখ গোমড়া করে রেখে দিলেন। রাবেয়া বাড়ির কর্তী। তিনি যা বলেন সকলে তাই করতে বাধ্য। নাহলে বাড়িতে সিডর, সুনামী সব একসাথে শুরু হয়। খাওয়া শেষে রাবেয়া আদেশ দিলেন,” অরোনী, তুমি প্লেটগুলো কিচেনে নিয়ে ধুঁয়ে ফেলো যাও। সারাদিন তো শুয়ে-বসেই থাকো। এখন একটু কাজ করো।”
খোচা না মেরে কথা বলতে পারেন না এই মহিলা।অরোনী সবসময় জবাব দেয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে ধুঁয়ে ছাড়ে।
এতোগুলা নোংরা প্লেট দেখে অরোনী অবাক হয়ে বলল,” মা, এতোগুলা প্লেট আমি একা কিভাবে ধোবো? আমাকে হেল্প করার জন্য কেউ এলে ভালো হতো।”
সে কথাটা বলেছে কারণ বাড়িতে তার তিনজন উপযুক্ত ননদ আছে। একজনের বয়স তেইশ। অরোনীর থেকে পাঁচবছরের বড়। অরোনী তাকে ডাকে রুমা আপু। আরেকজনের একুশ বছর। অরোনীর থেকে দুই বছরের বড়, তার নাম তানজিমা। তৃতীয়জন হলো নিলিমা, তার আঠারো বছর। অরোনীর সমবয়সী। তারা ডিনারের পর হৈহৈ করে লুডু খেলতে বসেছে। আর একান্নবর্তী পরিবারের সকলের এঁটো বাসন ধোঁয়ার দায়িত্ব পড়েছে একা অরোনী উপর। কারণ সে বাড়ির বউ। ঝি-চাকরানীর বিকল্প!
রাবেয়া খোচা মেরে বললেন,” এইটুকু কাজও একা করতে পারবে না? তোমার মা কি তোমাকে কিছু শেখাননি বড়দের মুখে মুখে তর্ক করা ছাড়া?”
রাবেয়া কথাটা এতো জোরে বলেছেন যে ড্রয়িংরুম থেকেও শোনা গেল। নিলিমা আর উর্মি উঁকি মেরে তাকাল। একজন ফিসফিস করে বলল,” মা কাকে বকে রে?”
আরেকজন উত্তর দিল,” কাকে আবার? ছোট ভাবীকে। সে তো সারাক্ষণ বকাই খায়।”
তারপর চাপা হাসির গুঞ্জন। অরোনী এবার জবাব না দিয়ে পারল না। জোর গলায় বলে উঠল,
” তর্ক-বিতর্ক শেখাতে হয় না মা। এটা অভ্যাসের বিষয়। পরিস্থিতির চাপে মানুষ অনেককিছুই করে। আমাকেও তর্ক করতে হয়। কারণ এই বাড়িতে বিতর্কিত ব্যাপারগুলো খুব বেশি দেখি তো, সেজন্য।”
অরোনী চাবুক পেটা জবাব দিয়ে এঁটো প্লেটগুলো রান্নাঘরে নেওয়ার জন্য গুছাতে লাগল। রাবেয়াও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। ক্ষুব্ধ গলায় বললেন,” তর্কটা যেমন শিখেছো তেমন যদি ঘরের কাজগুলো শিখতে তাহলে আজকে এতো সমস্যা হতো না। এজন্যই বংশ দেখে মেয়ে আনতে হয়। পারিবারিক শিক্ষা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে৷ ”
অরোনী প্লেটগুলো নিয়ে রান্নাঘরে চলে যাচ্ছিল। শাশুড়ীর কথা শুনে থেমে গেল। কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,” পারিবারিক শিক্ষার কথা যেহেতু বললেন সেহেতু আমিও একটু বলি। আমার মা না হয় আমাকে বাড়ি থেকে কাজ শিখিয়ে পাঠাননি।কিন্তু আপনার বাড়িতেও তিনজন আছে। যাদেরকে সারাক্ষণ ফার্মের মুরগীর মতো বসে থাকা ছাড়া আপনি অন্যকিছু শেখাতে পারেননি।”
রাবেয়া এতোবড় কথা শুনে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন। অরোনী মিষ্টি হেসে বলল,” খুব ভয় লাগে মা। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাদের অবস্থাও যদি আমার মতো হয়!”
জবাবটা দিয়েই অরোনী দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেল। রাবেয়া রাগে আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে থাকলেন।
পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগিয়ে অরোনী থালা-বাসন ধোঁয়ার কাজ শেষ করল। রান্নাঘরে প্রচন্ড গরম। অরোনীর শরীর ঘামে অর্ধেক ভিজে গেছে। খুব ক্লান্ত লাগছে তার। সিংকের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কোমড়, পা উভয়ই ধরে এসেছে। অরোনী কোনোমতে হেঁটে বেডরুমে এসে বিছানায় বসল। এসির টেম্পারেচার কমিয়ে ছেড়ে দিল। ঘর ঠান্ডা করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। এমন সময় দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল রাফাত। এসেই ধপ করে বিছানায় বসল। বিছানা নড়ে উঠল। অরোনী ভয় পেয়ে বলল,” কি ব্যাপার?”
রাফাত আদেশ দেওয়ার মতো বলল,” আমাকে এখনি একগ্লাস পানি দাও। গলা শুকিয়ে আছে।”
অরোনী একটু তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,
” তোমার হাতে কি হয়েছে?”
” হাতে কি হয়েছে মানে? হাতে কিছু হয়নি। ”
” ও। আমার কাছে পানি চাইলে তো, তাই ভাবলাম তোমার হাতে মনে হয় কিছু হয়েছে যে কারণে পানিটাও ঢেলে খেতে পারছো না।”
রাফাত এবার ক্ষীপ্ত কণ্ঠে বলল,” মা তো তাহলে ঠিকই বলেন। কাজের কথা শুনলেই তুমি বেয়াদবের মতো মুখের উপর জবাব দিতে শুরু করো। সমস্যা কি তোমার? ”
অরোনী হাই তুলে বলল,” তোমাদের ভাষায় এটা কে বেয়াদবি বলে নাকি? আমাদের ভাষায় বলা হয় উচিৎ জবাব।”
” শোনো অরো, এটা তোমার বাপের বাড়ি না যে সারাক্ষণ এসির নিচে শুয়ে মোবাইল টিপবে আর চটাং চটাং কথা বলবে ৷ এটা জয়েন ফ্যামিলি। এখানে থাকতে হলে সবার সাথে মিলে-মিশে, কাজ করে থাকতে হবে। গট ইট?”
অরোনী ওইপাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল,” থ্যাংকস ফোর সাজেশন। ”
” এই, আমার কথা কি তোমার ফান মনে হচ্ছে? এমন দায়সারা জবাব দিয়ে কি বুঝাতে চাইছো তুমি?”
অরোনী এবার কোনো জবাবই দিল না। রাফাত কাছে এসে অরোনীকে নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করল। অরোনী ফিরল না। শক্ত হয়ে শুয়েই রইল। রাফাত শরীরের শক্তি প্রয়োগ করল। অরোনীর রাগ লেগে গেল। উঠে বসেই রাফাতকে চড় মারল সে। রাফাত অপ্রত্যাশিত চড় খেয়ে হতভম্ব! অরোনী ফিসফিস করে বলল, ” মায়ের চামচা কোথাকার!”
রাফাত এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না যে অরোনী তাকে চড় মেরেছে৷ সে কয়েক মুহূর্ত পুরো বোকা বনে গেল। একটু পর যখন তার হুশ ফিরল তখনি রাগে উঠে দাঁড়ালো। গজগজ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অরোনীর চোখে জল চলে এসেছে তখন। এই বাড়ির একটা মানুষও যদি তার সঙ্গে একটু ভালো ব্যবহার করতো। সবাই অরোনীর বিরুদ্ধে কথা বলে। এমনকি রাফাতও। মা যা বলে তাই বিশ্বাস করে এসে অরোনীকে ধমকাতে থাকে। প্রতিদিন এতো অশান্তি আর ভালো লাগে না। তাই রাগের মাথায় আজ রাফাতকে সে চড় মেরেছে। এই চড়ের পরিণাম যে খুব সুখকর হবে না তা বোঝাই যাচ্ছে। একটু পরই বাড়ির সবাই বেডরুমের ঘটনা জেনে যাবে। সবার সামনে আবারও অরোনীকেই অপদস্ত হতে হবে। অরোনী চোখের জল মুছে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে চেষ্টা করে প্রতিবাদ করে টিকে থাকার। কিন্তু দিনশেষে খুব হাঁপিয়ে ওঠে।
তার সাথে রাফাতের বিয়েটা জীবনের সবচেয়ে বিষাক্ত ব্যাপারগুলোর মধ্যে একটি। তখন শীতকাল। অরোনী সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। নবীন বরণের অনুষ্ঠানে তাকে শাড়ি পরা অবস্থায় স্টেজে নাচের পারফর্ম করতে দেখে রাফাত। সে ছিল ভার্সিটির সিনিয়র। ফাইনালে ইয়ারের ছাত্র। অরোনীকে প্রথম দেখেই রাফাতের এতো বেশি ভালো লেগে যায় যে সেদিনই প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। রাফাত ভার্সিটির পপুলার বড় ভাই। সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। পলিটিক্সও নাকি করে। তাই অরোনী রাফাতকে সরাসরি রিজেক্ট করার সাহস পায়নি। সে বলে, ভেবে জানাবে৷ অরোনী চিন্তা করেছিল রাফাত হয়তো কিছুদিন পর ব্যাপারটা ভুলে যাবে। অরোনী তো আর প্রতিদিন সেজে-গুজে ভার্সিটি আসবে না, স্টেজে উঠে নাচবে না৷ রাফাতও তাকে দেখে আকৃষ্ট হবে না। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অরোনীর ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। আস্তে আস্তে কিছুই ঠিক হলো না। বরং আস্তে আস্তে সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যেতে লাগল।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here