অরোনী, তোমার জন্য~২০(শেষ)

অরোনী, তোমার জন্য~২০(শেষ)
লিখা- Sidratul Muntaz

রাফাত কক্সবাজার যাওয়ার দু’টো টিকিট কিনেছে। দুই সপ্তাহের ট্যুর। তাদের রিসোর্ট অনেকটা সমুদ্রের গর্জন স্পষ্ট শোনা যাবে এমন জায়গায়। ঈদের পরেই ওরা রওনা হবে। রাবেয়া এসব শুনে বায়না ধরলেন তিনিও যেতে চান। শাশুড়ীর কথা শুনে অরোনী সম্পূর্ণ হতবাক। প্রথমে সে ভেবেছিল রাবেয়া বুঝি মজা করছেন। কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়িতে মেহমান এলো। রাবেয়ার বোনের পরিবারের লোক। তাদের কাছে কান্নাকাটি করে রাবেয়া বলছেন,” আমার ছেলে আর ছেলের বউ কক্সবাজার ঘুরতে যাবে। কিন্তু আমাকে একবারও যেতে বলল না। আমার কি শখ-আহ্লাদ নেই? সমুদ্র এতো পছন্দ করি। আমাকে রেখে ওরা কিভাবে চলে যাচ্ছে?”
আরও অনেক কীর্তন গাওয়া শুরু করলেন। কেউ রাবেয়াকে কিছু বোঝাতেও যাচ্ছে না। এই ধরণের কথা শোনার পর অরোনীর ধারণা তার মতো সকলেই হতভম্ব। তবুও রাবেয়া দমলেন না। তিনি অরোনীকে পইপই করে বলে দিলেন রাফাত বাড়ি ফিরলে তিনি এই বিষয়ে কথা বলবেন।
রাতে রাফাত ফিরলে অরোনীই প্রথমে বিষয়টা তুলল,” দুইটা টিকিট কা’টা তোমার একদম উচিৎ হয়নি। তিনটা কা’টলে ভালো হতো।”
রাফাত ভ্রু কুচকে বলল,” কিসের টিকেট?
” কক্সবাজারের।”
” তিনটা কেন?”
অরোনী নির্বিকার গলায় বলল,” মাও আমাদের সাথে যেতে চাইছেন।”
কথাটা শুনে রাফাতের বিষম উঠে গেল। অরোনী হাসতে লাগল৷ রাফাত নিজেকে সামলে বলল,” মা কি দিন দিন বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন? এসব কি শুরু করেছেন?”
” তোমার মা, তুমিই জানো। আমাকে বলেছেন তুমি বাড়ি ফিরলে তোমাকে যেন কথাটা জানাই। তুমি নাকি অবশ্যই রাজি হবে। ”
” রাজি হওয়ার প্রশ্নই আসছে না। মা যদি আমাদের সাথে যান তাহলে বাড়ির অন্য সদস্যরাও যেতে চাইবে। এটা নিশ্চয়ই কোনো ফ্যামিলি ট্যুর না যে দল বেঁধে সবাই যাবো!”
” মা কিন্তু তাই ভাবছেন।”
” আমি মায়ের সাথে কথা বলবো।”
রাফাত সাথে সাথেই উঠে গেল রাবেয়ার সাথে কথা বলার উদ্দেশ্যে। রাবেয়া ছেলেকে পেয়ে হাসিমুখে বললেন,” রাফাত, এসেছিস তুই? ভালোই হলো। তোর সাথে জরুরী কথা ছিল।”
রাফাত নরম গলায় বলল,” মা, যদি কথাটা কক্সবাজারে যাওয়ার ব্যাপারে হয় তাহলে স্যরি। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারবো না৷ এটা তো কোনো ফ্যামিলি ট্যুর না।”
” ফ্যামিলি ট্যুর আবার কি? আমি নিজে যেতে চাইছি৷ তুই আমাকে নিবি না? তুই জানিস না আমার সমুদ্র কত পছন্দ? বউয়ের সাথে ঘুরে বেড়াবি আর মা গেলেই সমস্যা? বয়স হয়েছে দেখে কি আমার কোনো শখ-আহ্লাদ নেই? আমারও ইচ্ছে করে ঘুরতে যেতে।”
” তুমি ঘুরতে যেতে চাইলে আমি তোমাকে আলাদা নিয়ে যাবো মা। দরকার পড়লে আমরা সবাই মিলে যাবো। কিন্তু এইবার না প্লিজ।”
” এইবার না কেন?”
রাফাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সরাসরিই বলল,” কারণ এইটা আমাদের হানিমুন ট্রিপ। তোমাকে কি আমি আমার হানিমুনেও নিয়ে যাবো?”
” সমস্যা কি নিয়ে গেলে? আমি মা হিসেবে ছেলের কাছে যাওয়ার আবদার করতে পারি না?”
নির্মল সাহেব পুরো কথোপকথন শুনছিলেন। এবার চুপ থাকতে না পেরেই বললেন,” রাবু, তুমি হানিমুনে যেতে চাইলে আমার কাছে আবদার করো। ছেলের কাছে কেন? ছেলে-বউয়ের সাথে তো কেউ হানিমুনে যায় না। স্বামীর সাথে যায়। কি আর করা? তোমার যখন এতো শখ! বুড়ো বয়সে আবার না হয় গেলাম।”
স্বামীর টিটকিরি গায়েই মাখলেন না রাবেয়া। তিনি নিজের মতো বায়না করেই গেলেন। কান্নাকাটি পর্যন্ত করলেন। এমনকি দুপুরে খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। অরোনী এসব দেখে হেসেই খুন। শাশুড়ীর সামনে অবশ্য হাসে না। কিন্তু আড়ালে রাফাতকে নিয়ে খুব হাসে। রাফাত আর কি বলবে? মায়ের আচরণে নিজেই লজ্জায় হতভম্ব।
একদিন রাফাত আর অরোনী অন্ধকার ছাদে বসে গল্প করছিল। হঠাৎ রাফাত কি মনে করে যেন জিজ্ঞেস করল,” তুমি খুশি তো অরোনী? মা কি সত্যিই তোমাকে আর জ্বালায় না?”
অন্ধকারেও অরোনীর চেহারার ঋনাত্মক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,” এখনও তিনি জ্বালান। কিন্তু সমস্যা হলো, আগে আমি জবাব দিতে পারতাম। এখন পারি না। আগে তিনি খোচা মারতেন, অপমান করতেন। মাঝে মাঝে সহ্য সীমার বাহিরে গেলে আমিও অনেক কথা বলে ফেলতাম। কিন্তু এখন তিনি খুব ভালো ব্যবহার করেন। তাই বিপরীতে আমি খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। যা বলেন তাই শুনতে হয়। হাসি মুখে কোনো কাজের কথা বললে নিষেধ করা যায় না। কষ্ট হলেও করে দিতে হয়।”
” আমাকে কখনও বলোনি তো?”
” বলি না। তুমি হয়তো ভাববে আমারই সমস্যা। তোমার মা ভালো ব্যবহার করলেও আমার প্রবলেম, খারাপ ব্যবহার করলেও আমার প্রবলেম। তাহলে আমি চাই কি? এটাই নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে!”
” এতোদিনে আমাকে এই চিনলে?”
” না। কিন্তু সবারই একটা ধৈর্য্যের সীমা আছে। তুমি সারাদিন বাহিরে বাহিরে থাকো, কত পরিশ্রম করো, বাড়ি ফেরার পর তোমাকে ফ্যামিলি রিলেটেড বিষয় নিয়ে জ্বালাতে আমার ভালো লাগে না।”
রাফাত হতাশ কণ্ঠে বলল,” আমি কি করবো জানি না। যদি পারতাম, তোমাকে নিয়ে আলাদাই থাকতাম। একটা কথা বলি অরোনী, তুমি ভার্সিটি যাওয়া শুরু করো। পড়াশুনার মধ্যে থাকলে মা তোমাকে আর জ্বালাতে পারবেন না।”
” আমিও কয়েকদিন ধরে বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। ঈদের পর থেকে ক্লাস শুরু করলে কেমন হয়?”
” খুব ভালো হয়। ”
রাফাত একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অরোনীকে কাছে আনল। অরোনী রাফাতের বুকে মাথা রেখে অনেকটা তাকে খুশি করার জন্যই বলল,” আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি খুব ভালো আছি। কারণ তুমি আমার সাথে আছো।”
রাফাত আরও শক্ত করে অরোনীকে জড়িয়ে ধরে বলল,” সবসময় থাকবো জানপাখি!”

দেখতে দেখতে ঈদুল আযহা চলে এলো। অরোনী বিয়ের পর প্রথম ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়ির সবার জন্য জমিয়ে শপিং করল। একই সাথে দীপ্তিও সবার জন্য শপিং করেছে। চাঁদরাতে অরোনী সবার হাতে উপহার তুলে দিচ্ছিল। রাবেয়ার জন্য একটা বেগুনি জামদানি কেনা হয়েছে। এই শাড়ি দেখে রাবেয়া মুখ কুচকে বললেন,” এর চেয়ে দীপ্তির দেওয়া শাড়িটা কত সুন্দর! পুরো বারো হাজার টাকা দাম। দামী শাড়ি তো সুন্দরই হবে। আমি ঈদের দিন ওই শাড়িটাই পরবো।”
অরোনী হেসে বলল,” আপনার যেটা ইচ্ছে হয় সেটাই পরবেন মা। দামী শাড়িতেই আপনাকে সুন্দর লাগবে। এটা তো দামী শাড়ি না। কমদামী শাড়ি। মাত্র ছয়হাজার টাকা।”
রাফাত ইশারায় অরোনীকে চুপ করতে বলল। অরোনীর চোখে জল এসে গেছিল। রাফাত আর সে এবার ঈদে কিছুই কিনেনি। শুধু বাড়ির সবাইকে খুশি করার জন্য বোনাস আর বেতনের সবটাকা শপিংয়ে খরচ করে ফেলেছে। আর কোরবানির জন্য জমানো টাকা দিয়ে তো গরুই কেনা হলো। তবুও শাশুড়ীকে খুশি করা গেল না। তিনি বড় বউয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অথচ এই বড়বউ সবাইকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে ঈদ করতে। রাহাতও গেছে বউয়ের আঁচল ধরে। এতে কোনো দোষ নেই। অরোনী জীবনে প্রথম মা’কে ছেড়ে ঈদ করছে। তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে৷ তাও শাশুড়ীর মন পাওয়া যায়নি। তবে নির্মল সাহেব অরোনীর পাঞ্জাবী খুব পছন্দ করলেন। বার বার মেলে গায়ে লাগিয়ে বলছিলেন,” কেমন লাগছে বউ মা বলোতো?”
অরোনী হাসি মুখে বলেছে,” নায়ক লাগছে বাবা। একদম অমিতাভ বচ্চন!”
রুমা আর তানজিমা ঈদের দিন অরোনীর দেওয়া পোশাক পরেনি। দীপ্তির দেওয়া পোশাকগুলোই পরেছে। তারা আবার বড়ভাবী অন্তঃপ্রাণ। নিলিমা আবার অরোনীর দেওয়া জামা পরেছে। কারণ অরোনীর চয়েজ অনেক সুন্দর। কম দামে কিনলেও সে সবার জন্য খুব সুন্দর জামা কিনেছে। উর্মি তো সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোসল সেরে অরোনীর দেওয়া নতুন জামা পরে সালামিও চাইতে চলে এসেছে। রিতু দীপ্তির উপহার খুলেও দেখেনি। সেও অরোনীর দেওয়া জামা পরেছে। ঈদটা সবার সাথে ভালোই কেটেছে। নির্মল সাহেবের দূর সম্পর্কের বন্ধু এসেছেন বেড়াতে। অরোনী তাঁর জন্য চা নিয়ে এলো। ভদ্রলোক অরোনীর মুখের তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,” তোমার নাম কি মা?”
অরোনী মিষ্টি হেসে বলল,” অরোনী।”
সে চলে যাওয়ার পর রাবেয়া আর নির্মলের কাছে ভদ্রলোক নিঃসংকোচ আবেদন করলেন, অরোনীকে বাড়ির বউ বানাতে চান। রাবেয়া এই কথা শুনে রেগে আগুন। নির্মল শব্দ করে হেসে বললেন,” এটা অলরেডি আমার ছোট ছেলের বউ।”
ভদ্রলোক লজ্জায় জীভ কাটলেন। অরোনীর মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে তিনি ভেবেছিলেন অরোনী এই বাড়ির মেয়ে। রাবেয়া দুইতলায় এসেই অরোনীকে বহুদিন পর ধমক দিলেন। এখন থেকে যেন অরোনী সবসময় মাথায় কাপড় দিয়ে চলা-ফেরা করে। তাকে দেখতে নাকি বাড়ির বউ বলে মনেই হয় না! অরোনী মনখারাপ করল না। হাসিমুখে বলল,” ঠিকাছে মা।”
দুইদিন পর রাফাত আর অরোনীর কক্সবাজার যাওয়ার সময় চলে আসে। অরোনী সকাল থেকেই গোছগাছ শুরু করে। তাই দেখে রাবেয়ার সে কি কান্না! তিনি ঘুরতে যেতে পারছেন না। ছেলে আর ছেলের বউ চলে যাচ্ছে। এ কেমন অবিচার! কেউই রাবেয়ার কান্নাকাটিকে পাত্তা দিল না। চলে যাওয়ার সময় অরোনী সবার থেকে বিদায় নিতে এলো। রাবেয়ার কাছে এসে যখন বলল,” আসছি মা। ভালো থাকবেন।”
রাবেয়া অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলেন। কোনো জবাবও দিলেন না।
অরোনীদের দুই সপ্তাহের ট্যুর ছিল সবচেয়ে আনন্দায়ক সময়। তারা সারারাত জেগে খুনশুঁটি করেছে, সকালে বেলা করে বিছানা ছেড়েছে, সন্ধ্যা হলেই সমুদ্রের তীরে হাত ধরে একসাথে হেঁটে বেড়িয়েছে, শপিং করেছে। কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, রাফাতের অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই৷ সারাক্ষণ দু’জন একসাথে। কত মজা! কক্সবাজার ছেড়ে অরোনীর যেতেই ইচ্ছে করছিল না। মন চাইছিল রাফাতকে নিয়ে সারাজীবন এখানেই থেকে যেতে। যেদিন তারা চলে যাবে তার আগের দিন রাতে সমুদ্রের বালুবেলায় বসে অরোনী এই কথা রাফাতকে জানাল। রাফাত তখন জবাবে বলল,” দেখেছো? এজন্যই আমি বলেছিলাম দুইমাসের কথা। তখন তো রাজি হওনি। এখন তুমিই যেতে চাইছো না।”
অরোনী অসহায় স্বরে বলল,” মাত্র দুই সপ্তাহেই এই অবস্থা হয়ে গেছে। দুইমাস থাকলে তো আমি এখানে ফ্ল্যাট কেনার জন্য কান্নাকাটি শুরু করতাম।”
রাফাত হাঁফ ছেড়ে বলল,” ভাগ্যিস দুইমাস থাকিনি। এইখানে ফ্ল্যাট কেনার মতো এতো টাকা আমার নেই।”
অরোনী হেসে ফেলল৷ রাফাত হঠাৎ অরোনীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,” দেখো, আমাদের ফিউচার। নেক্সট টাইম আমরা এভাবে আসবো।”
অরোনী তাকিয়ে দেখল দূর-দূরান্তে একজোড়া দম্পতি হেঁটে যাচ্ছে। তাদের মাঝে হাত ধরে হাঁটছে একটা ছোট্ট পুতুল। ক্ষণে ক্ষণেই পুতুলটা মাথা দুলাচ্ছে৷ ইশ, কি সুন্দর দৃশ্য! অরোনী মনে মনে বলল,” ইনশাআল্লাহ। ”

অনেকদিন কেটে গেছে। বাড়ির অবস্থা পরিবর্তন হয়েছে। রাফাত ভেবেছিল কোনোদিন নিজের পরিবার থেকে সে আলাদাহবে না। কিন্তু আলাদা হতেই হলো। বাগানবাড়ি ভেঙে এপার্টমেন্ট তৈরীর পরিকল্পনা চলছে। ভাই-বোনের প্রত্যেককে একটি করে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। রাফাত অরোনীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছে। তাদের সাথে রিতুও এসেছে। ফ্ল্যাট খুব সুন্দর। মাসে বিশ হাজার টাকা ভাড়া। তিনটি বেডরুম৷ একটি কমন রুম। তিনটি বাথরুম। বিশাল ডাইনিং-ড্রয়িং। একটি রান্নাঘর। অরোনী বুঝতে পারছে না রাফাত এতোবড় বাসা কেন নিল! মাত্র তিনজন থাকবে এই বাসায়। এতোবড় ফ্ল্যাটের কোনো দরকার ছিল না৷ তারপর জানা গেল মা-বাবা আর নিলিমা বছরে দুইছেলের বাড়িতেই ঘুরবেন। কিছুদিন রাহাতের বাড়ি থাকবেন। কিছুদিন রাফাতের বাড়ি। তারা এলে যেন থাকতে অসুবিধা না হয় সেজন্যই বড় বাসা নিতে হয়েছে। মেঝো চাচী আর ছোট চাচীদের ফ্ল্যাট নিয়ে থাকার মতো অবস্থা নেই। তাই তাদের জন্য নিচতলায় দু’টো রুম করে দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট হওয়ার পর সবাই সবার মতো ভাগ করে নিবে। অরোনীরা মাঝে মাঝে চাচীদের বাড়ি বেড়াতে যায়। তবে আলাদা ফ্ল্যাটে রাফাত-অরোনীর বেশ ভালো দিন কাটছে। রিতু কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গেছে। এখন সারাদিন অরোনী একাই বাসায় থাকে। তবে রাফাত খুব দ্রুত অফিস থেকে ফিরে আসে। আর অফিসে যায়ও দেরি করে। কারণ এখন তাকে বেশি জার্ণি করতে হয় না। অফিস বাড়ির কাছেই। প্রতিদিন রাফাত ফিরে এলে অরোনী কফি বানায়। দু’জন বারান্দায় বসে একমগে কফি খায়। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করে, সিনেমা দেখে। তবে এর মাঝে অরোনীর সাথে একটা বীভৎস ঘটনা ঘটে৷ রুবায়েত কিভাবে যেন অরোনীদের বাসার ঠিকানা পেয়ে গেছিল। একদিন নির্জন দুপুরে এসে হাজির হয়। অরোনী তখন ঘুমিয়ে ছিল। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে ভাবে রাফাত এসেছে। মাঝে মাঝে রাফাত লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় চলে আসে। অরোনীকে দেখে যায়। সেদিনও অরোনী তাই ভেবেছিল। তবুও কি মনে করে যেন লুকিং গ্লাসে তাকায়। তারপর তার পিলে চমকে ওঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ইন্টারকমে ফোন করে দারোয়ানকে খবর দেয়।দারোয়ান রাফাতের নাম শুনেই রুবায়েতকে ঢুকতে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল অরোনীদের আত্মীয় হয় বুঝি। কিন্তু অরোনীর অভিযোগ শুনে দ্রুত চারতলায় ছুটে আসে। রুবায়েতকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে। রুবায়েত চিৎকার করে বলছিল,” ভাবী, আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। প্লিজ লাস্ট একটা চান্স আমাকে দিন৷ আমার সাথে একবার দেখা করুন।” অরোনী ভয়ে শিটিয়ে রইল। রাফাত একবারও ফোন ধরেনি। তার জরুরী মিটিংটাও সেদিনই ছিল। সে অফিস থেকে ফিরে আসার পর অরোনী কাঁদতে কাঁদতে সবকিছু জানায়। রাফাতের মেজাজ আর ঠিক থাকল না। রুবায়েত অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছিল। এবার তাকে থামানো দরকার। একটা উচিৎ শিক্ষা দিতেই হবে। রাফাত ঠান্ডা মাথায় ব্যবস্থা করল। তার ভার্সিটির কিছু বন্ধুকে সাথে নিয়ে একদিন রুবায়েতকে শায়েস্তা করার আয়োজন সাজাল। তাকে প্র্যাংক কলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এনে খুব মারা হলো। সেই মারের জোর এতোবেশি ছিল যে রুবায়েতকে সাতদিন হসপিটালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। কিন্তু তাকে কে মেরেছে, কারা মেরেছে আর কেনোই বা মেরেছে রুবায়েত তার কিছুই বুঝতে পারল না।
একদিন রাফাত বাসায় এসে খোশমেজাজে বলল,” তোমার জন্য দুইটা গুড নিউজ আছে। আগে কোনটা শুনতে চাও বলো।”
অরোনী দূর্বোধ্য হেসে বলল,” আমি তো জানি না কোনটা কয় নাম্বার। তুমিই বলো।”
” ওকে। প্রথম গুড নিউজ হলো, রুবায়েত হসপিটালে।”
” মানে? কিভাবে?”
রাফাত বিজয়ী হাসি হেসে শোনাল তার কান্ড। অরোনী মোটেও খুশি হলো না। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,” যদি মরে যেতো তাহলে তো তোমরা ফেঁসে যেতে।”
” এমনভাবেই মেরেছি যাতে না মরে। ধুঁকে ধুঁকে বাঁচে। একটা হাত অথবা পা ডিস্ট্রয় হবেই।”
” বলো কি! এতোবড় রিস্ক নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। সেকেন্ড গুড নিউজটা কি?”
” রিতুর বিয়ে ঠিক করেছি।”
” ওমা, কি বলো? আগে রুমার বিয়ে ঠিক না করে তুমি রিতুর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছো?”
” দেখো অরো, রুমার বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার জন্য সবাই আছে। মা-বাবা, চাচা-চাচী, ভাইয়া, ভাবী। একটা না একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। তাছাড়া রুমা শিক্ষিত, ভালো ফ্যামিলির মেয়ে। তার জন্য পাত্রের অভাব হবে না। কিন্তু রিতুকে নিয়ে ভাবার মতো কেউ নেই। এজন্যই রিতুর বিয়েটা বেশি ইম্পোর্ট্যান্ট।”
” হুম। ঠিক বলেছো। ছেলে কি করে?”
” খুব ভালো ছেলে। আমার অফিসেই চাকরি করে। একদম ছোট পোস্টে। গ্রাম থেকে এসেছে। পরিবারে শুধু ছেলে আর ছেলের মা। রিতুর ছবি দেখে পছন্দ করেছে।”
” ওয়াও, এবার রিতু তাকে পছন্দ করলেই হলো।”
” তা তো অবশ্যই। ওর বিয়ে আমরা ধুমধাম করে দিবো।”
বিয়ের কথা রিতুকে ফোন করে জানানো হলো। রিতু সানন্দে রাজি হয়ে গেল। একবার পাত্রকে দেখার তাগিদও অনুভব করল না। রাফাত তার জন্য পাত্র পছন্দ করেছে, এটাই অনেক বড় ব্যাপার৷ সে চোখ বন্ধ করে বিয়ে করবে। অরোনী বলল,” বিয়ের পর আমাদের ভুলে যাবি না তো?”
” কি কন ছোটভাবী? আপনেগোরে কেমনে ভুলি? বিয়ের পর আমার হইবো দুইডা সংসার। প্রথম সংসার আপনেগো। তারপর নিজেরডা। আগে আপনের সংসারের কাম করমু। তারপর সময় হইলে নিজেরডা করমু। নাইলে নাই।”
অরোনী হাসতে হাসতে বলল,” আমার সংসারের কাজ তোকে করতে হবে না। তুই মেহমান হয়ে বেড়াতে আসবি।”
রিতু গোমরা মুখে বলল,” পর কইরা দিবেন?”
” নারে পাগলী। পর কেন? বিয়ের পর তো এটাই নিয়ম।”

রাবেয়া একদিন সুযোগ পেয়েই ছোট ছেলের বাড়িতে চলে এলেন। অরোনীকে না জ্বালালে তাঁর পেটের ভাত হজম হবে না৷ যতদিন রাবেয়া বাড়িতে থেকেছেন অরোনীর জন্য ততদিন ছিল যন্ত্রণার মতো। সকালে উঠে নাস্তা বানাতে হবে, দুপুরে বিভিন্ন আইটেমের তরকারি রাঁধতে হবে। সকাল-বিকাল শাশুড়ীকে চা বানিয়ে দিতে হবে। তিনি আবার ঠান্ডা পানি খেতে পারেন না৷ গলায় সমস্যা। গরম পানি করে দিতে হবে। সেই গরম পানিও আবার তিনি সাথে সাথে খাবেন না৷ দেরি করে খাবেন। ততক্ষণে পানি হয়ে যাবে ঠান্ডা। অরোনীকে আবার গরম করতে হবে। কি যে জ্বালা! শাশুড়ী আসার পর থেকে অরোনী কাজ করে আর দম ফেলার ফুরসত পায় না। যদিও সকালে বুয়া আসে। তবুও অরোনীকে সন্ধ্যায় ঘর মুছতে হয়। তিনি সারাঘর জুতো পরে হাঁটবেন। একই জুতো পরে ছাদে চলে যাবেন। অরোনী যদি এই বিষয়ে কিছু বলে তাহলে বিনীত ভঙ্গিতে বলবে,” স্যরি বউমা। মনে ছিল না।”
অরোনী সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে নিচ্ছে। শাশুড়ী আর থাকবেনই কয়দিন? রাহাত ভাই প্রত্যেকদিন ফোন করেন। মাকে নেওয়ার জন্য কত পায়তারা। এই সময় মাকে হাত করা সবচেয়ে বেশি দরকার। কিন্তু রাবেয়া তো কিছুতেই যাবেন না। তিনি চলে গেলে অরোনীকে কে জ্বালাবে? তিনি খাবেন অরোনীর রান্না। কিন্তু প্রশংসা করবে দীপ্তির। দীপ্তি এই করে, দীপ্তি সেই করে। এসব শুনতে শুনতে অরোনীর কান ঝালাপালা। একদিন রাতে রাফাত বাড়ি ফেরার পর রাবেয়া এমন মাথা ব্যথার ভাণ ধরলেন যেন মাথা ব্যথায় মরেই যাচ্ছেন। অরোনী বাধ্য হয়েই বলল, ” মা মাথা টিপে দিবো?”
সেই বলাটাই তার কাল হলো। রাত একটা পর্যন্ত বসে বসে শাশুড়ীর মাথা টিপতে হলো। আঙুল ধরে এলো। শেষমেষ রাবেয়া ঘুমালেন। অরোনী সারাদিন কাজ করে এতোবেশি ক্লান্ত ছিল যে তার মনে হচ্ছিল বিছানায় পিঠ লাগাতে পারলেই সে ঘুমের দেশে তলিয়ে যাবে। বিছানায় এসে দেখল রাফাত ঘুমিয়ে পড়েছে। তার ঘুমন্ত মুখটা দেখে অরোনীর খুব ভালো লাগলো। মনে হলো, শুধু এই মানুষটির সাথে থাকার জন্য সে পৃথিবীর সব যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবে। তবুও একে ছেড়ে যেতে পারবে না। অরোনী নীরবে রাফাতের পাশে এসে শুয়ে পড়ল। সাথে সাথেই রাফাত অরোনীকে জড়িয়ে ধরল। অরোনী অবাক হয়ে বলল,” তুমি ঘুমাওনি?”
রাফাত ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল,” তোমাকে ছাড়া ঘুম আসে না। অভ্যাস হয়ে গেছো আমার।”
অরোনী সামনে ঘুরে রাফাতকে জড়িয়ে ধরল। বিনিময়ে রাফাত তার সারামুখে চু’মু দিল, আদর দিল। সারাদিনের কোনো কষ্টই আর কষ্ট মনে হলো না অরোনীর। শুধু মনে হলো রাফাত এভাবেই সারাজীবন তার পাশে থাকুক, তার হাতটা ধরে রাখুক। দিনশেষে সেই তো দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ!

অতিরিক্ত –
অথৈ অনেকদিন পর এই বাড়িতে এসেছে। প্রায় দুইবছর হবে। অনেক কিছু বদলে গেছে এখন৷ বাগান বাড়িতে দালান উঠেছে। সবাই নিজ নিজ এপার্টমেন্টে থাকে। শুধু করম চা গাছটা আজও সম্মুখ দরজায় লাগানো। অরোনীর ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে। বয়স আটমাস তেরোদিন। তার নাম রাখা হয়েছে,” আবরার জাহিন।” বোনের ছেলে জাহিনকে দেখতেই অথৈ এর ছুটে আসা। কিন্তু করিডোরে তার দেখা হয়ে গেলো একটি অদ্ভুত ছেলের সাথে। ছেলেটি খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এমন নয় যে সে হাঁটতে পারে না। আসলে সমস্যা তার চোখে। সে চোখে দেখতে পারছে না। কারণ তার চশমা নেই। চশমা নেই এটা বললেও ভুল হবে। চশমা তার হাতে আছে। তবুও সে হন্যি হয়ে চশমা খুঁজছে। বিড়বিড় করে বলছে, “কেউ আমার চশমাটা দেখেছো?”
অথৈ এর চিনতে ভুল হলো না। এটিই সেই বই পড়ুয়া মুডি ছেলেটি। যে অথৈ এর দিকে কখনও তাকায়নি! অথৈ হাসতে লাগল ছেলেটির বোকামি দেখে। চশমা হাতে নিয়েই চশমা খুঁজে বেড়াচ্ছে। এতো বোকা মানুষ হয়? মিষ্টি কণ্ঠের হাসি শুনে তাহসিন একটু ভড়কে গেল। ভাঙা কাঁচের চুড়ির মতো তার কানে হাসির শব্দ বাজতে লাগল। কি সুন্দর কিশোরীর মতো হাসছে মেয়েটি। প্রাণবন্ত, সতেজ হাসি। এমন সুন্দর হাসির শব্দ তাহসিন আগে কখনোই শোনেনি। সম্মুখে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে একবার তাকালো সে। কিন্তু মুখ দেখা গেল না। কেবল একটি কালার প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। উফ, তাহসিন তার চশমাটা কেন খুঁজে পাচ্ছে না? সুন্দর হাসির মেয়েটিকে তার দেখতে ইচ্ছে করছে! কিন্তু চশমা খুঁজে পাওয়ার আগেই যদি মেয়েটি চলে যায়? তাহসিন বিনীত ভঙ্গিতে বলল,” আপনি কি আমার চশমাটা দেখেছেন?”
অথৈ এর আরও জোরে হাসি পেল। কত বুদ্ধু! হাতের মুঠোয় চশমা ধরে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছে চশমার কথা। অথৈ এর হাসির রিনিঝিনি শব্দ তাহসিনের বুকে ঝড় তুলে দিল। কোন বইয়ে যেন পড়েছিল সে, সুন্দর মুখ নয় ভালোবাসা হয় সুন্দর মন দেখে। অথবা তীক্ষ্ণ হাসির মাতাল করা শব্দের মোহময় ইন্দ্রজালে আটকে থেকে। কিছুতেই মনে আসছে না, লাইনটা কোন বইয়ের? তাহসিনের উচিৎ আগে চশমাটা খুঁজে বের করা। অন্তত মিষ্টি হাসির মেয়েটিকে দেখার জন্য হলেও চশমা পেতেই হবে!

সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here