অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত-৭ শেষ

অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত-৭ শেষ
এ রহমান

ঝলমলে রোদ্রজ্জল সকাল। নদীর পাড়ের পরিবেশটা হুট করেই আনন্দময় হয়ে উঠলো। স্বচ্ছ পানির মতো চারিদিকে অনুভুতির স্বচ্ছতার ছড়াছড়ি। ঠাণ্ডা বাতাসটাও এখন সহনীয়। ঈশা স্থির দৃষ্টিতে হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে বিস্ময় তার। কিছুক্ষন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। মৃদু আওয়াজ কানে আসতেই সজাগ হল ঈশা। হাতের উপরে তাক করা দৃষ্টি ইভানের দিকে ফেরাল। গোছানো অনুভূতি সম্পন্ন স্বচ্ছ চোখ জোড়ার মাঝে এক অনাবিল প্রশান্তি। যার গভীরতা মাপার ক্ষমতা হয়তো ঈশার নেই। অল্প সময়ের ব্যবধানে কি থেকে কি হয়ে গেলো। এক অনিশ্চয়তায় ভরা সম্পর্কের শুভ সূচনা হল। বেনামি সম্পর্কটা আজ নাম পেলো। জমে থাকা পানি চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। ইভান হতাশ শ্বাস ছেড়ে এক আঙ্গুলে আলতো করে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল
–কাদবে না একদম। চুপ করো।

ঈশা দৃষ্টি নামিয়ে নিচের দিকে তাকাল। কিভাবে বোঝাবে এটা যে সুখের কান্না। কিন্তু সুখের হোক বা কষ্টের এই নারীর নোনা অশ্রুবিন্দু যে ইভানের কাছে মরন যন্ত্রণা সমতুল্য। ইভান আবারো শক্ত করে দুই হাত চেপে ধরে বলল
–তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল।

ঈশা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। ইভান ভারী নিশ্বাস ছেড়ে বলল
–অপেক্ষার প্রহর কতোটা নিষ্ঠুর হয় সেটা হয়তো আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। এতো বছরে তোমাকে দেখার জন্য ছটফট করেছি। কত নির্ঘুম রাত পার করেছি। সেসবের কথা আমি নিজেও বলতে পারব না। কিন্তু একটা সুপ্ত আশা ছিল তোমাকে পাওয়ার। তাই কষ্টটা মেনে নিয়েছি। আমাকে হয়তো কাজের জন্য…।

কথা শেষ করতে পারলো না ইভান। তার আগেই ফোন বেজে উঠলো। অল্প কিছু শব্দ বিনিময় করেই কথা শেষ করে ফেললো। যার কারনে ঈশা কিছুই বুঝতে পারলো না। নিচের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল
–চলো।

ঈশা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল
–কোথায় যাবো?

–তোমার বাসায়।

ইভানের কথা শুনে ঈশা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। বুঝে গেলো কিছু একটা হয়েছে। তাই আবারো জিজ্ঞেস করলো
–কোন সমস্যা?

ইভান মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলো কোন সমস্যা নেই। আবারো হাত বাড়িয়ে দিলো। ঈশা আলতো করে ভরসার হাতটা ধরেই ফেললো। এই হাত ধরেই আজ থেকে শুরু হল নতুন জীবনের সূচনা।

————
গাড়ি ঈশাদের বাড়ির সামনে এসে থামল। ঈশা গাড়ি থেকে নেমে ইভানের সামনে দাঁড়ালো। ইভান মৃদু স্বরে বলল
–ভেতরে চলো।

ঈশা বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকাল। কিছুটা অস্থির কণ্ঠে বলল
–ভেতরে মানে? ভেতরে কেন যাবেন?

ইভান ভ্রু কুচকে ফেললো। বলল
–ভেতরে যাবে না? এখানেই দাড়িয়ে থাকবে?

ঈশা কথা বুঝতে না পেরে আবারো বলল
–আমার বাড়ি আমি ভেতরে যাবো। কিন্তু আপনি কেন ভেতরে যাবেন?

ইভান কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চমৎকার হেসে বলল
–আমার হবু শশুর বাড়ি। আমি যাবো না? এটা তো অন্যায় ঈশা।

ঈশা বিরক্ত হয়ে বলল
–দেখুন বাবা জানতে পারলে ঝামেলা হয়ে যাবে। এই আংটিটা দেখলেই কত প্রশ্ন করবে। আমি কি উত্তর দেবো সেটা নিয়েই ভাবছি।

ইভান আবারো হাসল। ঈশার এবার খুব রাগ হল। কঠিন গলায় বলল
–হাসছেন কেন? আপনি খুব অসভ্য একজন মানুষ।

ইভান হাসি থামিয়ে বলল
–তাই না? আর একটু অপেক্ষা করো তারপর দেখাচ্ছি অসভ্য কাকে বলে। সব বুঝিয়ে দেবো।

ঈশা লজ্জায় মিইয়ে গেলো। সাথে রাগের মাত্রাটাও বেড়ে গেলো। ইভান কোন কথা না বলেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো তাকে। একদম বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কলিং বেল চেপে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো দরজা খোলার। ঈশা আর কোন কথা বলছে না। সে বুঝতে পেরেছে ইভান তার কথার উত্তর দেবে না। অযথা কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু মনের মধ্যে ভীষণ ভয় কাজ করছে। হৃদপিণ্ডটাও জোরে জোরে লাফানো শুরু করেছে। ইভানের সাথে এভাবে বাসায় গেলে বিষয়টা কে কিভাবে নেবে সেটাই ভেবে মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলো তার। ইভানের সামনে হয়তো কিছুই বলবে না। কিন্তু পরে তাকে অনেক প্রশ্ন করবে। সেসব প্রশ্নের জবাব দেবে কিভাবে? সাত পাঁচ ভাবতেই দরজা খুলে গেলো। ঈশা শুকনো ঢোক গিলে ফেললো ভয়ে। রুমা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সুন্দর হাসি দিয়ে বলল
–ভেতরে আসো।

ঈশা অবাক হল। রুমার এমন আচরন বেশ সন্দেহজনক। সে দাড়িয়েই ভাবছে। ইভান ভেতরে ঢুকেও থেমে গেলো। পেছনে ঘুরে বলল
–এটা আপনার বাড়ি ম্যাডাম। নিশ্চিন্তে ভেতরে ঢুকতে পারেন। কেউ কিছুই বলবে না।

রুমা হেসে ফেললো। ইভান তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভেতরে চলে গেলো। ঈশার মাথায় গোলমেলে চিন্তা। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঈশা ধির পায়ে ভেতরে ঢুকেই চমকে গেলো। ইভানের পরিবারের সবাই সোফায় বসে আছে। সাথে তার ছোট মামা। তার বাবা তাদের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। ইভান সবাইকে সালাম দিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। ঈশা একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতেই তার বাবা বললেন
–আমার ঈশার সাথে একটু কথা আছে। আপনারা একটু বসুন।

সবাই সম্মতি জানালো। ঈশার হৃদপিণ্ডের গতি আরও দ্রুত হল। ঘামতে লাগলো অনবরত। হাত পাও কাঁপছে অল্প বিস্তর। বাবাকে বরাবর সে ভীষণ ভয় পায়। ইভানের সাথে এভাবে বাইরে যাওয়া নিয়েই হয়তো বাবা রাগ করেছে। ঈশার বাবা তার সামনে এসে থমথমে মুখে বললেন
–আমার সাথে ভেতরে এসো।

তিনি চলে গেলেন। ঈশা এক পলক রুমার দিকে তাকাল। কারণ যে কোন বিপদ থেকে এই ভাবী ছাড়া তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। রুমা চোখের ইশারায় ভেতরে যেতে বলল। ঈশা ভেতরে চলে গেলো। ঈশার বাবা বিছানায় বসে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঈশা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ তুলে বললেন
–বসো।

ঈশা পাশে বসল। তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন
–তুমি ইভানকে আগে থেকেই চিনতে?

ঈশা ওড়নার মাথা শক্ত করে চেপে ধরল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো ভয়ে। কথা বলার মতো শক্তি পেলো না। তাই মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো। থমথমে কণ্ঠে তার বাবা আবারো বললেন
–কিভাবে চেন? আর কবে থেকে চিনতে?

ভেতরটা পানির জন্য হাহাকার করে উঠলো। ঈশা ঢোক গিলে গলা ভেজাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু লাভ হল না। বেশ কষ্ট করে বলল
–আমার ক্লাসমেট ইফতির বড় ভাই। ইফতি আর আমি ক্লাস ৬ থেকে একসাথে পড়তাম। তখন তাদের বাসায় দেখেছি।

ঈশার বাবা চুপ হয়ে গেলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন
–তাহলে তো ইভানের সম্পর্কে সব কিছুই তোমার জানার কথা।

ঈশার ভেতরটা আবারো কেঁপে উঠলো। বাবার কথার অর্থ ধরতে পারলো না। চুপ করেই থাকলো। ঈশার বাবা বেশ শান্ত কণ্ঠে বললেন
–তোমার মামা যখন প্রথম প্রস্তাব এনেছিলেন তখন আমি কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম ছেলের বাড়ি থেকে তোমাকে পছন্দ করেছে। কিন্তু সেই সময় আমি তোমার বিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই বলেছিলাম একটু সময় দরকার। ওরা তারপর আর কোন যোগাযোগ করেনি। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ওনারা আর যোগাযোগ করবেন না। কিন্তু ইভান পড়া শেষ করে আসার পর ওনারা আবারো প্রস্তাব পাঠায়। আমি বিষয়টা সেভাবে ভেবে দেখিনি। কিন্তু ওদের আগ্রহ দেখেই আমি খোঁজ খবর নেই। ইভানের সম্পর্কে জেনে আমার ভালই মনে হয়। তাই তোমাকে দেখা করতে বলি। তাদের মতামতের অপেক্ষা করছিলাম আমরা এতদিন। তারা তো কিছুই জানালো না। কিন্তু গতকাল রাতে তোমার মামা ফোন করে সব বলে। তখনই আমি জানতে পারি। তুমিও তো কিছুই বললে না যে ছেলেকে আগে থেকেই চেন।

ঈশা আমতা আমতা করে বলল
–আসলে বাবা…। আমি…।

তার বাবা বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
–ওনারা চান আজকেই কাবিন করে ফেলতে। আমি বলেছি বিয়েটা যেহেতু তোমার তাই তোমার মতামত না নিয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। এখন তুমি যা বলবে আমি তাদেরকে তাই জবাব দেবো।

ঈশা জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। বাবার কথার ধরন আজ তার কাছে অস্পষ্ট। বাবা কি তার উপরে রাগ করে আছে? বুঝতে পারছে না কিছুতেই। ঈশার বাবা বললেন
–তাড়াতাড়ি জানিয়ে দিলেই ভালো হয়। ওনারা অপেক্ষা করছেন।

ঈশার আচমকাই মন খারাপ হয়ে গেলো। আজ পর্যন্ত বাবার সিধান্তের বাইরে কোন কথা বলেনি। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বাবা তার মনের কথা বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোনটাই ঈশার মনের বিরুদ্ধে নয়। বাবা তাকে খুব ভালো বোঝে। কিন্তু আজ এমন কেন হচ্ছে? জীবনের এতো বড় সিদ্ধান্ত বাবা পুরোটাই তার উপরে ছেড়ে দিচ্ছেন? বাবা আদৌ এই সিদ্ধান্তে খুশী কিনা ঈশা সেটাও বুঝতে পারছে না। কি বলবে সেটা আজ তার জানা নেই। আকাশ পাতাল ভেবে ভীষণ কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। টলমলে চোখে তাকাল বাবার দিকে। কাঁপা কণ্ঠে বলল
–বাবা তোমার যা ভালো মনে হয় তুমি তাই করো। আমি মেনে নেবো।

শেষের কথাটার মাঝে কেমন বিষাদের ছায়া। বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে তার। চোখের পানি আটকাতে পারলো না ঈশা। নিচের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলেই চলেছে। ঈশার বাবা একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন
–মেনে নেয়ার কথা হলে আমি তোমাকে বলতাম না। নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতাম। আমি হয়তো তোমার জন্য আরও ভালো ছেলে খুঁজে আনতে পারতাম। কিন্তু তোমার মানসিক শান্তিটা কি নিশ্চিত করতে পারতাম? সেটা ভেবেই আমি সিদ্ধান্ত তোমার উপরে ছেড়ে দিয়েছি। তুমি সুখে থাকলে আমার আর কিছুই চাওয়ার নাই। তবে…।

বলেই তিনি থেমে গেলেন। ঈশার মাথায় হাত দিয়ে মুচকি হেসে বললেন
–ইভান ভালো ছেলে। আমার ভালই লেগেছে। যথেষ্ট ভদ্র। এখন বাকিটা তোমার উপরে। তুমি কি রাজি মামনি? ওনারা অপেক্ষা করছেন।

ঈশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। ঈশার বাবা হ্যা বুঝে নিয়েই বললেন
–ওনারা চাইছেন আজকেই কাবিনটা করে নিতে।

ঈশা অস্থিরভাবে পলক ফেলে মৃদু স্বরে বলল
–আজকেই?

–হ্যা আজকেই। আর আমি দ্বিমত করছি না কারণ ইভান…।

ঠিক সেই মুহূর্তে রুমা ঘরে ঢুকল। বাবা মেয়ে দুজনেই সেদিকে তাকাল। রুমা বলল
–বাবা আমার মনে হয় আর দেরি করা ঠিক হবে না। ইভানেরও তো গোছানোর ব্যপার আছে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। কাবিনটা হয়ে গেলে অন্তত নিশ্চিন্ত।

ঈশার বাবা মাথা নেড়ে রুমার কথায় সম্মতি দিলেন। ঈশার মাথায় হাত দিয়ে আদরের ভঙ্গীতে হাত নাড়িয়ে বললেন
–মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নাও মামনি। কিছুক্ষনের মধ্যেই কাজী এসে পড়বে।

ঈশা কোন কথা বলল না। তার বাবা বের হয়ে গেলেন। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। রুমার দিকে তাকাতেই মিষ্টি হেসে বলল
–কোন শাড়িটা পরবে?

ঈশার আলমারি খুলে একটু সোরে দাঁড়ালো। সেদিকে তাকিয়েই বলল
–তাড়াতাড়ি বল। কোনটা পছন্দ?

ঈশা অবাক হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। যা হচ্ছে সবটা কি সত্যি? তাহলে কি তার অপেক্ষার অবসান হচ্ছে? এই মুহূর্তটা কোনভাবেই তার কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। এই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তটা জীবনে কি সব সুখ এনে দেবে?

———-
ঈশা জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে। ভীষণ মন খারাপ তার। চোখে পানি টলমল করছে। যে কোন সময় বাধ ভাঙ্গা ঢেউ এর মতো আছড়ে পড়বে। দরজায় শব্দ হতেই পেছন ফিরে তাকাল। ইভান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অভিমানে ভরপুর ঈশা মুখ ফিরিয়ে নিলো। মন খারাপটা আরও বেশী হল। চোখের পানি আটকাবার চেষ্টা করেও পারলো না। ইভান এগিয়ে এসে পেছনে দাঁড়ালো। মাতাল করা সুগন্ধির ঘ্রাণ নাকে এসে ঠেকলেও ঈশা ঘুরে তাকাল না। ইভান দূরত্ব মিটিয়ে দাঁড়ালো। দুই পাশে গ্রিলে হাত রেখে ঈশার চুলের ঘ্রাণ টেনে বলল
–আমি তোমাকে…।

ঈশা ঘুরে গেলো। ইভানের নাকের সাথে নাক স্পর্শ করতেই খানিকটা চমকে উঠলো। শরীর জুড়ে বয়ে গেলো শিহরণ। চোখ বন্ধ করে ফেললো। আচমকাই অভিমানটা আরও গাড় হল। কয়েক মুহূর্ত থেমে নিজেকে শান্ত করে নিলো। কথাগুলো আজ বলতেই হবে। নিজেকে ধাতস্থ করে ইভানের কলার চেপে ধরল। কঠিন গলায় বলল
–আপনি বিদেশে চলে যাচ্ছেন অথচ আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি একবারও? কেন এসেছেন এখন? এখন বলে কি লাভ?

ইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিলো। এতোটা কাছে আসায় ঈশার হাতের বাধন আলগা হয়ে গেলো। ইভান আবেগি কণ্ঠে বলল
–আই এম সরি পাখি। এতো তাড়াতাড়ি সব রেডি হয়ে যাবে আমিও ভাবিনি। আমি তোমাকে বলতাম। কিন্তু তার আগে চেয়েছিলাম বিয়েটা করতে। তারপর বলতাম। কিন্তু তার আগেই যে সব রেডি হয়ে যাবে সেটা বুঝতে পারিনি জান।

ঈশা ধাক্কা দিয়ে ইভানকে সরিয়ে দিলো। মুখ ফুলিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল
–চলে জান আপনি।

কথাটা বলতে বলতেই আবারো গড়িয়ে পড়লো অশ্রুবিন্দু। হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে মুছে নিলো। কিন্তু লাভ হল না। অবাধ্য অশ্রুবিন্দু গড়েই পড়ছে অনবরত। ইভান পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
–এমন করো না প্লিজ। তুমি এভাবে রাগ করে থাকলে আমি কিভাবে যাবো বলো। আর গিয়েই বা আমি থাকব কিভাবে? একটু বোঝার চেষ্টা করো জান।

ইভানের এমন কথা শুনে ঈশা কিছুটা নরম হল। কিন্তু মন খারাপটা ঠিক হল না। ইভান আবেগি কণ্ঠে বলল
–আমি ১ বছরের জন্য যাচ্ছি। ১ বছর পর ফিরে এসে তোমাকে একবারে আমার কাছে নিয়ে যাবো। ততদিন আমার আমানত তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। খেয়াল রাখবে। কোন ক্ষতি হলে কিন্তু আমি তোমাকে আজিবনেও ক্ষমা করবো না।

ঈশা নরম কণ্ঠে বলল
–যেতেই হবে?

ইভান চোখ বন্ধ করে ফেললো। ঈশাকে নিজের দিকে ঘুরে নিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো। উষ্ণ আলিঙ্গনে ঈশা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লো। নিজেকে সরিয়ে নেয়ার ক্ষমতা হল না। সমস্ত সংকোচ বাধা পেরিয়ে সেও জড়িয়ে ধরল। ইভান হাতের বাধন আরও শক্ত করে বলল
–এভাবে বললে তো আমি সমস্ত কাজ ফেলে তোমার কাছেই সারাদিন বসে থাকব। তুমি এমন করলে আমি কিভাবে যাই? যেতে তো আমারও ইচ্ছা হচ্ছে না। তবুও যেতে হবে।

আবেগি ঈশা আবারো কেদে উঠলো। ইভান চুলের ভাজে হাত গলিয়ে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল
–তোমার কান্না আমার সহ্য হয়না জান। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তো। শান্ত হও।

ঈশা নিজেকে থামানর চেষ্টা করলো। সে ইভানকে এই মুহূর্তে কষ্ট দিতে চাইছে না। দরজায় শব্দ হতেই ইভান ঈশাকে ছেড়ে দিলো। দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো। রুমা ঘরে ঢুকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল
–তোমাদের রোম্যান্স শেষ হলে খেতে ডাকছে। বাইরে আসো।

ইভান রুমার দিকে তাকিয়ে বলল
–শেষ আর কই হল? তুই মাঝপথে বিরক্ত করলি। আর একটু সময় দেয়া যেতো না?

–আমি এখন বিরক্ত করলাম তাই না? এতদিন ঠিকই আমাকে দরকার পড়েছিলো। এখন বিয়ে করে ফেলেছিস তাই দরকার শেষ। তুই অকৃতজ্ঞ ইভান। আমি ভাবতেও পারছি না।

ইভান ভ্রু কুচকে বলল
–আমি অকৃতজ্ঞ? হাউ ফানি! তোর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার অভ্যেস নেই আসলে সেটা বল। কি করিনি তোর জন্য। তোর প্রেম থেকে বিয়ে অব্দি গড়ানোর পেছনে এই আমার অবদান। সব ভুলে গেলি তাই না?

রুমা সরু চোখে তাকিয়ে বলল
–ভুলিনি। তখন তো ভেবেছিলাম আমার জন্যই হয়তো এতো কিছু করছিস। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি তুই আমাকে হেল্প করার নামে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেছিস। তোর মাথায় যে এসব ছিল সেটা তো তখন বুঝতে পারিনি।

ইভান বিরক্ত হয়ে বলল
–এখন তুই বকবক না করে আমাদেরকে একটু প্রাইভেসি দে। বাইরের বিষয়টা ম্যানেজ করে নে।

তাদের এই কথোপকথন আর সম্বধন শুনে ঈশা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাল। রুমা সেটাতে পাত্তা না দিয়ে বলল
–ঠিকাছে। আরও কিছুক্ষন সময় দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি কথা শেষ কর।

রুমা বেরিয়ে যেতেই ঈশা ইভানের দিকে তাকাল। ইভান দৃষ্টির অর্থ বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বলল
–রুমা আর আমি খুব ভালো বন্ধু। তোমার ভাইয়ার সাথে যখন রুমার প্রেম চলছিলো তখন আমিই ওদেরকে হেল্প করতাম। আমার কথার উপরে নির্ভর করেই রুমার বাড়িতে বিয়ে দিতে রাজি হয়। এর প্রতিদান স্বরূপ তোমার ভাইয়া তার বোনকে আমার হাতে নিশ্চিন্তে তুলে দিতে প্রস্তুত হয়েছে। আর আমার সম্পর্কে তোমার বাবার কাছে যথেষ্ট সুনামও করেছে। এই জন্যই তো তোমার বাবা কোন ঝামেলা ছাড়াই মেনে নিয়েছে।

ঈশা বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন। কঠিন গলায় বলল
–আমি কেন জানিনা এসব? সবাই সবকিছু জানে অথচ আমাকে কেউ কেন কিছুই বলেনি?

–কারণ আমি জানাতে চাইনি তাই। রুমা আর ইশান ভাইয়া আমার কথাতেই তোমাকে কিছুই জানায়নি।

ঈশার কাছে এখন সবটা পরিস্কার। সে পুরো হিসেব মিলিয়ে ফেললো নিমেশেই। বলল
–তার মানে আমার ডাইরি ভাবীই আপনাকে দিয়েছে। আর সেদিন আমার ঘরে ফুল আপনিই রেখেছিলেন? কিভাবে ঢুকেছিলেন ঘরে?

ইভান ঠোঁট চেপে হাসল। ভাবলেশহীন ভাবে বলল
–তোমার চ্যলেঞ্জ একসেপ্ট করাটা আমার কাছে খুব জরুরী ছিল। সেটার জন্য আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম। তাই তোমার ভাইয়ার হেল্প নিয়েই মেইন দরজা দিয়েই ঘরে এসেছিলাম। কি ভালো তোমার ভাইয়া। খুব বড় মনের মানুষ।

ইভান শব্দ করে হেসে উঠলো। ঈশা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। সে এসবের কিছুই বুঝতে পারলো না। ইভান হাসি থামিয়ে ঈশার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল
–কাল সকালে আমার ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে আসার দরকার নেই। আমি তোমাকে সবটা জানিয়ে দেবো। ভালো থেকো। নিজের খেয়াল রাখবে। তোমাকে অনেক মিস করবো।

ঈশা গভির দৃষ্টিতে তাকাল। তার মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো। চোখের পানি আবারো টলমল করে উঠলো। ইভান বুঝতে পেরেই ঈশার সামনে দাঁড়ালো। কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো ইভান। ঠোঁটের কোনে গভীর চুমু দিয়ে বলল
–আবারো অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত পাখি। আমি নিরুপায়।

ঈশা ইভানের উপরে নিজের শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিলো। ইভান শক্ত করে জড়িয়ে নিলো তাকে। ঈশা চোখ বন্ধ করে আছে। ইভান কে অনুভব করছে সে। ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পাওয়াটা চরম সুখের। আজ এই মুহূর্তটা সেই সুখের আগমনি বার্তার জানান দিচ্ছে। কিন্তু সেই সুখ পুরোপুরি প্রাপ্তি হবে আরও একটা অপেক্ষা অবসানের পর। ঈশা অপেক্ষা করবে ইভানের ফেরার। অপেক্ষা করবে আরও একটা অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here