অতঃপর প্রণয়,পর্ব:১৬

অতঃপর প্রণয়,পর্ব:১৬
অরিত্রিকা আহানা

“তুমি অমন দৌড়ানি দিলা ক্যান বউ ?”, ইরিনকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললেন বৃদ্ধ জামিলা খাতুন। ইরিনের তাকে চিনতে পেরেছে।সম্পর্কে ইনি হেলাল সাহেবের চাচি। সেই হিসেবে আয়াজের দাদি । ইরিন খাটের ওপর বেজার মুখে বসে আছে। জামিলা খাতুন ইরিনের সামনে বসে বলল,

—“খাও নাই ক্যান? ভাইয়ের ওপরে রাগ করছো?”

ইরিন জবাব না দিয়ে নতমুখে বসে রইলো। ডাইনিং টেবিলে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা খেতে বসেছে।লোকজন বেশি হওয়ায় আলাদা আলাদা করে খেতে বসেছে সবাই। ইরিন আগেই মুক্তাকে জানিয়ে দিয়েছে সে খাবে না। মুক্তা ইচ্ছে করেই নিজে না এসে জামিলা খাতুনকে পাঠিয়েছে ইরিনকে ডাকার জন্য। মুক্তাকে নানান ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন জামিলা খাতুন। সে কেবল লজ্জায় লাল হয়ে আঁচল চাপা দিয়ে হেসেছে। মহসিন দুতিনবার তার এমন হাসার কারণ জিজ্ঞাসা করেছে। লজ্জায় বলতে পারে নি সে। ইরিনের মুখ ভার দেখেই জামিলা খাতুনকে পাঠিয়েছে সে। জমিলা গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,

—“শোন বউ একটা কথা বলি, পুরুষ মানুষেরে বেশি লাই দিবা না। লাই পেলে মাথায় উঠে এরা। এদেরকে সব সময় কড়াকড়িতে রাখতে হয়। নাহলে দেখবা হাতের বাইরে চলে গেছে। কথায় কথায় তোমারে উঠাবে আর বসাবে। তোমার বয়স কম। বুদ্ধিসুদ্ধি হয় নাই। তাই বড় হিসেবে তোমাকে কিছু উপদেশ দেই। শোনো, এমন ভয় পাওয়া চলবো না। সে তোমারে শাসন করার আগে তুমি তারে শাসনে করবা। সে যদি একধমক দেয় তুমি ফিরাইয়া ধমক দিবা তিনটা। কথা কি কইলাম বুঝছো?”

ইরিনের এসব ক্যাচাল ভালো লাগছে না। জমিলা খাতুন কি বলছে তার একফোঁটা সে মনোযোগ দিয়ে শোনে নি। তার তো রাগে আয়াজকে এইমুহূর্তেই টাক বানিয়ে ফেলতে মন চাইছে। আয়াজ এভাবে কেন দৌড়ালো তাকে? আর সে-ই বা কেন দৌড় দিলো? তার তো উচিৎ ছিলো দাঁড়িয়ে থেকে আয়াজকে ভড়কে দেওয়া? কথায় আছে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। ইরিনের অবস্থাও তাই। মুড অফ করে বসে রইলো সে। জমিলা ইরিনের সাথে কথা বলে মজা পাচ্ছেন না। ইরিনের ঘর থেকে বেরিয়ে আয়াজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।


আয়াজ খাটের ওপর বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। জমিলা খাতুন ভেতরে ঢুকে বললেন,

—“কেমন পুরুষ তুমি? তোমার বউ রাগ কইরা না খাইয়া বইসা আছে আর তুমি ভালোমানুষের মত বইসা কাজ করো?”

—“ইরিন খায় নি?”

—“না। সে তোমার ওপর রাগ করে আছে।”

—“আমার ওপর? আমি কি করেছি?”

—“তুমি তারে বিকেলবেলা সবার সামনে দৌড়ানি দিলা ক্যান?”

—“ও পায়ের ব্যথা নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছিলো কেন?”

—“মাইয়া মানুষের নানান ধরনের শখ আছে। বৃষ্টিতে ভিজাও একটা শখ। তুমি বুঝবা না। এখন যাও বউয়ের কাছে গিয়া মাফ চাও। নাইলে সে খাবে না বলছে।”

আয়াজ হাসছে। জামেলা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,

—“শোনো বউ হইলো ঘরের লক্ষ্মী। কথায় কথায় তারে বকাঝকা করবা না। ভুল করলে বুঝায় বলবা, ভালোবাইসা বলবা।”

তিনি একটু থেমে আবারো সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,

—“যাও। বউয়ের কাছে যাও। তার মান ভাঙাও।না মানলে পায়ে ধরবা। কানে ধরে উঠবস করবা। সারারাত তার পাশে বসে অনুনয় বিনয় করবা।”

তারপর আয়াজের কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বললো,

—“তাতেও যদি কাজ না হয়, ঝাপ্টাইয়া ধইরা আদর করবা। দেখলা চোখের পলকে রাগ উধাও। বয়সকালে আমি যখন রাগ কইরা থাকলে তোমার দাদাজান আমারে..! ”

এইটুকু বলে হাসছেন তিনি। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন বললেন,

—“আমি যাই। ”

আয়াজও ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“ঠিক আছে দাদু আপনি যান। আমি আসছি।”

ইরিন মুক্তার ঘরে বসে টিভি দেখছে। আয়াজ সোহেলি বেগমের ঘর খুঁজে এসে মুক্তার ঘরে এসে ঢুকলো। মুক্তা আলমারির জামাকাপড় গোচ্ছাছে। আয়াজ ভেতরে ঢুকতেই ইরিন এমন ভান করলো যেন তাকে দেখতেই পায় নি। আয়াজ তার পাশে বসে মুক্তার দিকে একবার তাকালো। মুক্তা তার অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে। আয়াজ ইরিনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো,

—“ভাবি। ভুল হয়ে গেছে। মস্ত বড় ভুল। আর হবে না। এবারের মত মাফ করে দিলে ভালো হয়।”

ইরিন টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিলো। আয়াজ আবারো বললো,

—“ভাবি। আমি তো বললাম আর হবে না।”

ইরিন তার দিকে ঝাঁঝালো চোখে একবার তাকিয়ে পুনরায় টিভির দিকে দৃষ্টি দিলো। আয়াজও তার পাশে খাটে গিয়ে বসে বললো,

—“ভাবি। আমি কানেধরে ক্ষমা চাইছি। আর হবে না!”

মুক্তা হাসি থামাতে পারছে না। অবশেষে ওদের দুজনকে একান্তে মান অভিমান ভাঙ্গানো সুযোগ করে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে বেরিয়ে গেলো সে। যাওয়ার সময় আয়াজের মাথায় চাটি মেরে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়ে গেলো, ‘বেস্ট অফ লাক।’

ইরিন সোফার ওপর পা উঠিয়ে বসেছে। আয়াজ টিভির সুইচ বন্ধ করে দিয়ে তার পাশে এসে বসে বললো,

—“খাস নি কেন তুই?”

ইরিন নিরুত্তর। আয়াজ তার হাত ধরতে নিলেই ঝাড়া মেরে হাতদুটো কোলের ভেতর ঢুকিয়ে নিলো।

আয়াজ চট কদে হাটুগেড়ে তার সামনে বসে পড়লো। ইরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে বললো,

—“সরি। এই যে দেখ কান ধরলাম।”

—“আপনি আমাকে ছাড়ুন। সবার সামনে আমাকে দৌড়ানি দিয়ে এখন ভালোবাসা দেখাতে এসেছেন? লাগবে না আমার এমন ভালোবাসা।”

আয়াজ হঠাৎ ওকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ওর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আধশোয়া হয়ে ওর মুখোমুখি বসলো। ইরিন ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে। আয়াজ ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

—” দাদু বলছিলেন বউ রাগ করলে নাকি তাকে বেশি বেশি করে আদর করতে হয়। এতে নাকি রাগ কমে যায়।”

ইরিন জবাব দিলো না। অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। আয়াজ তার গালে গাল ঘষে বললো,

—“রাগ করিস না হরিণ। তুই তো আমার লক্ষ্মী বউ। ”

ইরিনের এখন ছাড়াপাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে না। শান্ত হয়ে বসে আছে। আয়াজ পলকহীন ভাবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।আলতো করে ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,

—“কালকে আমরা বৃষ্টিতে ভিজবো। তুই আর আমি। তুই ভিজবি আমি দেখবো। কেমন?”

—“আপনি ভিজবেন?”

—“হ্যাঁ!”

আয়াজ এখনো তাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আয়াজের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। ইরিনের তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত উঠে বসলো। আয়াজ মুচকি মুচকি হাসছে।

—“চল। রুমে চল।”

—“আপনি যান। আমি আসছি।”

আয়াজ বেরিয়ে গেলো। ইরিনের ভীষণ লজ্জা লাগছে। সেই ছোট্টবেলা থেকে চেনা এই মানুষটা কাছে আসলে ইদানীং তার বেশ লজ্জা লাগে। এই মানুষটার সাথে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে সে ঝগড়া করতে পারে ভালোবাসার কথা ততটা স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে পারে না। সমস্ত শরীর লজ্জায় নুইয়ে আসে। শরীর আড়ষ্ট হয়ে আসে।

আয়াজ বেরিয়ে যেতেই মুক্তা এসে বললো,

—“মা তোকে খেতে ডাকছেন।”

—“যাচ্ছি।”


পরেরদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি নেই। আকাশ একদম পরিষ্কার।সুহানার বিয়ের আয়োজন চলছে। ইরিন কয়েকবার আয়াজের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়েছে যেন বৃষ্টি না আসাটাও আয়াজের দোষ। দুপুরে ঝকঝকা রোদ উঠলো। ইরিন রাগে চোখমুখ লাল করে বললো,

—“আপনি আগেই জানতেন না? আজকে বৃষ্টি হবে না? তাই আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিলেন?”

আয়াজ অসহায় কন্ঠে বললো,

—“আমি কি করে জানবো আজকে বৃষ্টি হবে না? আমি কি ওয়েদার ফোরকাস্ট জানি? ”

—“জানতেন আপনি সব জানতেন।”

—“বিশ্বাস কর হরিণ, আমি সত্যি জানতাম না। আচ্ছা আজকে না হলে কাল ভিজবো আমরা।”

—“লাগবে না। আমি আর জীবনেও কোনদিন বৃষ্টিতে ভিজবো না। মিথ্যেবাদী কোথাকার।”

ইরিন রাগে গটগট করে হেটে চলে গেলো। আয়াজ রীতিমত অবাক হয়ে চেয়ে আছে। বৃষ্টি না আসার সাথে তার দোষ কোথায়?

ঘন্টাখানেক বাদেই আকাশে মেঘ জমা হলো। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। মেঘ ডাকছে। বলতে না বলতেই শুরু হলো ভারি বর্ষণ।দুপুরের খাবারে পর সবাই যার যার ঘরে রেস্ট কিচ্ছে। ইরিনও ঘরে কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে।আয়াজ তার পাশে বসে মৃদু স্বরে ডাক দিয়ে বললো,

—“এই হরিণ? বৃষ্টিতে ভিজবি না? উঠ, দেখ? বাইরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে?”

ইরিন আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। জানালার বাইরে তাকাতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,

—“ছাদে যাবেন?”

—“আয়।”

ছাদে উঠে আয়াজ দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। ইরিন একদৌঁড়ে ছাদের মাঝ বরাবর চলে গিয়েছে। দুহাত মেলে বৃষ্টিতে ভিজচ্ছে সে। আয়াজ রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার বৃষ্টিবিলাস দেখছে। হঠাৎ করেই ইরিনকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো সে,

—“ইরিন তোর বান্ধবীদের কারো বিয়ে হয়েছে?”

—“তিনজনের হয়েছে। দুজজের বাচ্চাও আছে।”

—“বাহ! ওরা জানে তোর বিয়ে হয়েছে?”

—“জানে। ”

—“তোকে জিজ্ঞেস করে নি তোর বেবি আছে কি না?”

আয়াজ বুঝতে পারলো ইরিন লজ্জা পেয়েছে। জবাব না দিয়ে ছাদের অন্যপাশে চলে গিয়েছে সে। এর মধ্যেই ছাদের দরজায় দুমদাম আওয়াজ শুরু হলো। আয়াজ দরজা খুলতে যাচ্ছিলো ইরিন দৌড়ে এসে তার হাত চেপে ধরে বললো,

—“খুলবেন না। প্লিজ!”

—“কেন?”

—“ওরা কি ভাববে?”

আয়াজ স্থিরভাবে কিছুক্ষন ইরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো। ইরিনকে উদ্দেশ্য করে বললো,

—“না খুললে আরো বেশি কিছু ভাববে!”

ইরিন চেহারার লাজুক ভাব। আয়াজের ভালো লাগছে। ইদানীং ইরিন কথায় কথায় কেমন লজ্জা পায়। ভীষণ আদুরে লাগে দেখতে। ছাদের দরজা খুলতেই মুক্তাসহ আরো অনেকে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো। মুক্তা বললো,

—“এদিকে আমরা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। আর মিয়া বিবি ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে রোমান্স করো?”

—“রোমান্সের আর সময় পেলাম কই ভাবি? মাত্র এসেছি এর মধ্যেই তো তোমরা চলে এলে।”

তার কথা শুনে সবাই খিলখিলিয়ে হাসছে। আয়াজের চাচাত ভাইয়ের বউ রোকসানা ইরিনকে খোঁচা মেরে বললো,

—“ইরিন ভাবিকে সত্যি করে বলতো আয়াজ এতক্ষন কি করছিলো?”

আয়াজ বললো,

—“ভাবি আসো দেখাই কি করছিলাম। ওকে কেন জিজ্ঞেস করছো? আমাকে জিজ্ঞেস করো আমি দেখাই?

আরেকদফা হাসির রোল পড়লো। রোকসানা চোখ পাকিয়ে বললো,

—“ঠিক আছে তুমিই বলো। ছাদের দরজা বন্ধ করে কি করছিলে দুজনে? দরজা খুলতে এতক্ষন লাগলো কেন?”

আয়াজ চট করে ইরিনের দিকে তাকালো। ইরিনের চেহারায় বিব্রত ভাব। আয়াজ হেসে উঠে বললো,

—“ঐপাশে ছিলাম তো তাই শুনতে পাই নি!”

—“ঐপাশে কি করছিলা দুজনে?”

—“কি শুনলে তুমি খুশি হবে?”

—“সত্যি কথা বলো।”

আয়াজ হাসছে। সবাই তার দিকে চোখ পাকিয়ে চেয়ে আছে। ইরিনের মাথায় আসছে না এরা সবাই এমন নির্লজ্জের মত কথা বলছে কি করে? সবার কথার মাঝখানে একছুটে নিচে নেমে গেলো সে। কিন্তু আয়াজের রেহাই হলো না। তাকে ঘিরে সবাই জোট বেধে দাঁড়িয়েছে।

—“সত্যি কথা না বললে তোমাকে ছাড়ছি না।”

আয়াজ বুঝতে পেরেছে একটা কিছু না শোনা পর্যন্ত এই মহিলা পার্টি তাকে ছাড়ছে না। সে লাজুক লাজুক ভাব নিয়ে বললো,

—“তোমরা যা ভাবছো তাই!”

কথা শেষ করে সে প্রস্থান। আপন মনেই হাসছে সে! আহা! কি সুন্দর মিথ্যে।
.
.
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here