সূর্যোদয় #পর্ব_১৯ #কারিমা_দিলশাদ

#সূর্যোদয়
#পর্ব_১৯
#কারিমা_দিলশাদ

একটা লোকের সাথে ধা’ক্কা লাগতে গিয়েও ঐশীর তাড়াতাড়ি সরে যাওয়ায় আর ধা’ক্কা লাগে নি। তবুও ঐশী তাড়াতাড়ি করে সরি বলে। ঐশীর সরি’র জবাবে লোকটিও হালকা হেসে বলে,

“ নো নো ইটস ওকে। ধা’ক্কা লাগে নি। আপনি ঠিক আছেন তো?”

এবার ঐশী লোকটার দিকে ভালো করে নজর দেয়। টাক মাথার স্যুট প্যান্ট পড়া একজন বয়স্ক লোক। বয়স্ক বলবে না মধয়বয়স্ক বলবে তা বুঝতে পারে না। কারণ মাথায় টাক অথচ চেহারায় একটা কম বয়স কম বয়স ভাব আছে। লোকটির প্রশ্নে ঐশী সৌজন্যেমূলক হাসির সাথে জবাব দেয়,

“ হ্যা হ্যা আমি ঠিক আছি।”

এরপর লোকটি ঐশীর দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

“ হাই। আই এম এসপি মারুফ হাসান। ”

এসপি শুনে ঐশীর মুখ হা হয়ে যায়। মুখে কিছুটা ভয়ের রেশও দেখা যায়। ততক্ষণে অনিকও আবার ঐশীর পাশে ফিরে এসে দাঁড়িয়েছে। ঐশী একবার অনিকের দিকে তাকিয়ে মারুফের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে আবার হড়বড় করে সরি বলতে থাকে। আর অনিক দেখিয়ে বলে,

“ সরি এসপি স্যার, সরি সরি সরি। আসলে আমি আমার ফ্রেন্ডের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে, আসলে…….”

মারুফ ঐশীর সাথে হাত মিলিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে তার হাতটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। ঐশীর কথা শেষ না করতে দিয়েই হাস্যোজ্জল মুখে বলে,

“ ইটস ওকে। ইটস টোটালি ওকে। ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আমি কোনো বাঘ ভাল্লুক না। সো বি ইজি।”

মারুফের কথায় ঐশী হালকা করে একটু হাসে, সাথে কিছুটা ইজিও হয়। মারুফ বলে,

“ আপনার নামটা যেন কি?”

“ জি আমার নাম ঐশী। তারান্নুম ঐশী। ”

“ ইয়াহ্ ঐশী। I saw your dance… Fabulous… অসাধারণ। আপনার মুভমেন্ট, চোখ সব সবকিছু অসাধারণ।”

মারুফের চাহুনি এবং কথায় ঐশী কিছুটা লজ্জা পায়। লোকটা অদ্ভুত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যা তারকাছে বেশ লজ্জাজনক লাগছে। সে লজ্জামিশ্রিত হেসে ধন্যবাদ জানায়। এরপর মারুফ জিজ্ঞেস করে,

“ কিসে পড়ছেন?”

“ জ্বি আমি ইংরেজিতে অনার্স করছি। এবার থার্ড ইয়ারে উঠবো। ”

“ ওহহ নাইস! ডান্স কি এখনও শিখেন?”

“ আমম আসলে আমি এখন একটা ডান্স ক্লাস চালাচ্ছি। আমি এখন শিখাই।”

“ ওহহ ওয়াও!! সেল্ফডিপেন্ড!! ভেরি এপ্রিসিয়েট।”

জবাবে ঐশী কেবল মুচকি হাসি দেয়। তার আসলে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। এভাবে এতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কোনো অচেনা পুরুষমানুষের সাথে সে সচরাচর কথা বলে না। তাও আবার লোকটা কথায় কথায় তার প্রশংসা করছে। অন্যদের ক্ষেত্রে কি হয় জানে না, তবে প্রশংসা শুনলে ঐশীর ভীষণ অস্বস্তি হয় লজ্জা লাগে। তারউপর লোকটার চাহনিটা কেমন জানি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। খারাপ নজর না, তবে চাহনিতে কিছু একটা যেন আছে। কিছুটা মুগ্ধতা প্রকাশ পাচ্ছে তবে তা ঐশীর জন্য ভীষণ অকওয়ার্ড পরিস্থিতির তৈরি করছে। মারুফ হয়তো ঐশীর অস্বস্তিটা বুঝতে পারলো। তাই সে একটা শ্বাস নিয়ে হেসে বলে,

“ এনিওয়ে…” — বলে পকেট থেকে তার কার্ডটা বের করে ঐশীর দিকে দেয় আর বলে,

“ দিস ইজ মাই কার্ড। ইউ ক্যান কল মি এনিটাইম।”

ঐশী কার্ডটা হাতে নিয়ে দারুণ কনফিডেন্সের সাথে হেসে বলে,

“ সিওর স্যার।” —যেন সে অবশ্যই তাকে কল করবে।

“ সো বাই। টেক কেয়ার।”

“ বাই। ভালো থাকবেন।”

ঐশীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মারুফ চলে যায়। মারুফ চলে যেতেই ঐশী মুখ ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তবে ঐশী আর মারুফের এই কথোপকথন যেন অন্য একজনের মনে সূঁচের মতো বিঁ’ধছে।

————————-

স্মৃতির সাথে আজ জয়ও এসেছিল অনুষ্ঠানে। ঐশীর নাচ দেখার ভীষণ ইচ্ছে যে ছিল তার। তাই আর সেই সুযোগটা মিস করতে চায় নি সে। আর নাচ দেখে সে আবারও মুগ্ধ, বিমোহিত।

মেয়েটা তাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে। মেয়েটার কথায় সে মুগ্ধ, মেয়েটার বাচনভঙ্গীতে সে মুগ্ধ, মেয়েটার চিন্তা ভাবনায় সে মুগ্ধ। আর আজ মেয়েটার আরও এক রুপে সে মুগ্ধ। আজ আরও এক অমায়িক সৌন্দর্যের সম্মুখীন হয়েছে সে।

গায়ে জড়ানো লালা সাদা মিশেলে লেহেঙ্গা, চোখ ভর্তি টানা টানা কাজল, পাতলা পেলব ঠোঁটে লাল রঙের ছোঁয়া, খোঁপায় বেলীফুলের মালা, আলতা রাঙা পা যাতে জড়ানো ঘুঙুর, আলতায় হাতও রাঙা, আর তা ভর্তি লাল কাচের চুড়ি। সবকিছু অমায়িক সৌন্দর্য বহন করছে। আর নৃত্যরত তার শরীরের প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি। প্রতিটা মুভমেন্ট তার অতিব মোহনীয়। আর সবকিছু ছাড়িয়ে মোহনীয় মেয়েটার মুখের হাসি। যেই হাসিতে যেকোনো ছেলের হৃদয় কপোকাত হতে বাধ্য।

ঐশী নেমে আসতেই সে তার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। ঐশী স্টেজ থেকে বারান্দায় আসতেই স্মৃতি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করে। তখনও জয় দূর থেকে ঐশীকে দেখতে এবং তার ঘোর কাটাতে ব্যস্ত। এরপর তো সেই প্রজাপতি চঞ্চলাভাবে উড়তে উড়তে অন্যদিকে চলে যায়। তাদের খোঁজে যতক্ষনে সে এসে পৌঁছায় ততক্ষণে এসে দেখে ঐশী এক লোকের সাথে খুব হেসে হেসে কথা বলছে।

ঐশী তার সাথেও সবসময় হেসে হেসেই কথা বলে। সবার সাথেই বলে। তবে আজ কেন জানি ওই লোকটার সাথে হেসে হেসে কথা বলা তার মোটেও ভালো লাগে নি। হয়তো তার কারণ লোকটার চাহনি। লোকটার চাহনিতে পরিষ্কার সে বুঝতে পেরেছে লোকটাও তারমতো ঐশীতে চরমভাবে মুগ্ধ। সেও তো একই নৌকার মাঝি। তার উপর আবার ঐশী ওই লোকটার সাথে হাতও মিলিয়েছে। কই তার সাথে তো কখনো হাত মেলায় নি।

এসবকিছু দেখে তার হাসিখুশি মনটা চরমভাবে বি’ষিয়ে গেল। সে আর একটা সেকেন্ড ওখানে না দাঁড়িয়ে চলে আসে। ঐশীর সাথেও দেখা করে না।আসতে আসতে স্মৃতিকে জানিয়ে দিতেও ভুলে না। বাসায় এসে সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বাইকের চাবিটাও দূরে কোথাও ছুড়ে মা’রে। গায়ের পাঞ্জাবিটা খুলে মেঝেতে ফেলে দেয়। নিজেও মেঝেতে বসে বিছানায় ঠেস দেয়।

কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার কিচ্ছু না। সহ্যই হচ্ছে না তার বিষয়টা। একদমই সহ্য হচ্ছে না। রাগে রীতিমতো ফোঁস ফোঁস করছে জয়।

তার ঐশী কেন অন্য একটা পুরুষের সাথে হেসে হেসে কথা বলবে, হাত মেলাবে? ঐশী কেবল তার সাথে কথা বলবে, তার সাথে হাসবে, ঐশীর হাত কেবল সে ধরবে। অন্যকেউ না। “তার ঐশী”!!

ভাবতে ভাবতেই কথাটা তার মাথায় ক্যাচ করে। ঐশী তার কবে হলো? ঐশী তো তার না। ঐশীকে নিয়ে সে এতোটা হিং’সাপরায়ণ হচ্ছে কেন? সে কি কোনোভাবে আবার তার মনে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে। ঐশীকে জায়গা দিয়ে ফেলছে?

কিন্তু সে তো তার সবটা দিয়ে পুতুলকে ভালোবাসে। পুতুল তার জীবনে আসুক আর না আসুক। সে পুতুলকে ভালোবাসে এটা তো সত্য। একটা মানুষ এক মনে কেবল একজনকেই ভালোবাসতে পারে। আর সে তা করে ফেলেছে। তার মন-মস্তিষ্কে আবারও এসমস্ত খেয়াল আনা অন্যায়। তার দ্বারা তো আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না৷ তারপরও কেন ঐশীর প্রতি অন্য কারো মুগ্ধতা দেখে তার বুকে জ্বালা করছে? ঐশীকে অন্যকারো সাথে কথা বলতে দেখে তার দমবন্ধ হয়ে আসছে? কেন?

এসব চিন্তা করতে করতে জয় নিজের মাথার চুল খামচে ধরে। একপর্যায়ে উঠে বেড সাইডের টেবিলের উপর থাকা ল্যাম্পস্যাডটা নিয়ে ছুড়ে মা’রে দেয়ালের দিকে। যা দেয়ালে লেগে ঠাস করে ভেঙে যায়। বিছানার চাদর টেনে ফেলে দেয়।

————————–

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে এখনও জয় নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছে। কলেজ থেকে এসে স্মৃতিও অনেকবার দরজা ধাক্কিয়েছে। কিন্তু জয় দরজা খুলে নি। বরং ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। এমনকি ইলোরা ইয়াসমিনও দরজায় নক করে তবে তার কথাতেও দরজা খুলে নি জয়। কেবল তাকে একা থাকতে দিতে বলেছে।

আজ প্রায় একবছর পর আবারও জয়ের এমন ব্যবহারে ইলোরা ইয়াসমিন এবং স্মৃতি আ’তংকে সিটিয়ে যায়। ঘর থেকে ভাংচুরের শব্দও শুনা গেছে। যা বিগত তিনবছরের মধ্যে কখনো করে নি জয়। প্রথম দিকে ভাং’চুর করলেও পরের দুবছর নিজেকে ঘরবন্দী করে কষ্ট দেওয়া পর্যন্ত সীমিত রাখলেও ভাং’চু করে নি। আর একবছর হলো তো জয় একদম স্বাভাবিক। একদম আগের সেই জয়, যেন তার জীবনে পুতুল নামের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাহলে কি জয় সত্যিই এতদিন অভিনয় করে যাচ্ছিল? চিন্তায় মুষড়ে যায় ইলোরা ইয়াসমিন। সুখ কি তার কপালে আর ধরা দিবে না কখনো?

চিন্তায় চিন্তায় আর না পেরে এক পর্যায়ে সিয়াম আর ফয়সালকে কল দেন তিনি।

#চলবে

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here