তোমার_আমার_চিরকাল🌸 || পর্ব – ৪৮ ||

#তোমার_আমার_চিরকাল🌸
|| পর্ব – ৪৮ ||
#লেখনীতে_বিবি_জোহরা_ঊর্মি

রাত প্রায় এগারোটা। মীরাদের বাসায় বেশ হৈচৈ হচ্ছে। মিরাজ, আয়ান, মীরার ভাবি আর দিবা মিলে লডু গেইম খেলছে। মীরাকে বলা হয়েছিল খেলার জন্য। কিন্তু তার ভালো লাগছে না বলে সে দূরে চলে যায়। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ। তবে মীরা খায়নি, আহানের সাথে খাবে বলে। সবাই বলল আহানের দেরি হওয়ায় সে হয়তো তার বাসায় চলে গেছে। আজ আর এখানে আসবে না। মীরা যেন খেয়ে নেয়। কিন্তু মীরা মানে না। সে বলল, আহান আসবে। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তার। খেলা প্রায় শেষ হয়ে গেল। জিতল দিবা। কথা অনুযায়ী দিবাকে কাল ফুসকা ট্রীট দিবে মিরাজ ও আয়ান। সবাই মীরাকে বুঝিয়ে ঘুমাতে চলে গেল। মীরা তাদের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে।

অন্যদিকে দিবা তার রুমেই যাচ্ছি। হুট করে দিবার সামনে আয়ান চলে আসে। দিবা থমকে যায়। ধুকপুক করছে অন্তস্থল। ভয় পেয়েছে সে। দুইবার থুথু ফালায় নিজের শরীরে। আয়ান হাসতে হাসতে বলে, “এতো ভয় পেয়েছ!”
“কি চাই? পথ থেকে সরুন।”
আয়ান নিজের দুহাত তার পেন্টের পকেটে গুঁজে দিবার দিকে ঝুঁকলো। দিবা ভ্রু কুচকে মাথাটা সরয়ে নিল। আয়ান বাঁকা হেসে বলল, “তোমাকে চাই। তোমায় মনটা আমায় দিয়ে দাওনা।”
“এটা আমার মন মিস্টার আয়ান। কোনো সাধারণ জিনিস নয় যে আপনি চাইলেন আর আমি দিয়ে দিলাম।”
“তাহলে তোমার মন পেতে আমায় কি করতে হবে? বড্ড ভালোবাসি যে। এতো অবহেলা কেন করছ।”
দিবা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। আয়ানের পানে চাইলো। বলল, “আপনি আমায় ভুলে যান আয়ান। আমার কাছ থেকে আপনি কখনোই ভালোবাসা নামক এই জিনিসটা পাবেন না।”
“কিন্তু কেন সেটা আমি জানতে চাইছি। আমি তোমার সাথে মজা করি বলে এসব বলছ?”
“নাহ্। অন্য কারণ।”
“কি কারণ তা জানতে চাই।”
“ইচ্ছে করছে না আমার।”
“আমি তোমাকে স্যরি বলতে এসেছি দিবা। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই আমার ছিল না। কিন্তু তবুও কেন জানি তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেলি। স্যরি ফর এভরিথিং।”
“ইটস ওকে।”
দিবা এটা বলেই চলে আসতে নিল। কিন্তু আয়ান আবারও তার পথ আটকালো। দিবা বিচলিত হয়ে বলল, “আবার কি?”
“বলোনা কেন আমায় তুমি ভালোবাসতে পারবে না?”
“আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই।”
আয়ান দিবার হাত ধরলো। দিবা হকচকিয়ে উঠে! করুণ কণ্ঠে আয়ান বলে, “আমার তোমাকে বড্ড প্রয়োজন দিবা। তোমাকে আমার লাগবেই। আমায় একটু বোঝো তুমি। ভালোবাসি তোমায়।”
“হাত ছাড়ুন আয়ান। কেউ চলে আসবে।”
“আমি কাউকে ভয় পাইনা দিবা।”
“কিন্তু আমি পাই। ছাড়ুন আমার হাত। আপনার সাথে আমি কোনো সম্পর্কেই জড়াতে চাইনা।”
“আমার অপরাধ কি?”
“অপরাধ আপনার নয়, সত্য এটাই যে আমি কোনোদিক দিয়েই আপনার যোগ্য না। আপনি প্লিজ আমায় ভুলে অন্য কাউকে ভালোবাসুন। তাকে নিয়ে সুখে থাকুন।”
“অন্য কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয় দিবা। তুমি আমার হও বা না হও আমি আজীবন তোমাকেই ভালোবাসব। তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”
“আমি কখনোই আপনার হবো না।”
“আমার ভালোবাসা সত্যি হলে তুমি ঠিক আমার হবে দেখো।”
আয়ান দিবার হাত ছেড়ে দেয়। দিবা মাথা নত করে আয়ানের সামনে দিয়ে চলে যায়। চোখের কার্ণিশে চিকচিক করছে লোনাজল।।যায় আয়ানের চোখ এড়ায়নি। দিবা যাওয়ার পর আয়ান একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে।

.

চোখ লেগে যাচ্ছিল মীরার, এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠে। মীরা ধড়ফড়িয়ে উঠে। আহান এসেছে ভেবেই দৌড়ে চলে যায় দরজা খুলতে। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে সে। বিবর্ণ, ফ্যাকাশে চেহারা আহানের। চুলগুলো সব এলোমেলো হয়ে আছে। এক হাত দিয়ে কপালের মাঝ বরাবর ধরে আছে সে। মীরা চিন্তিত স্বরে আহানের মাথায় হাত রেখে বলে, “কি হয়েছে আপনার?”
আহান মীরার হাত সরিয়ে নেয়। মীরাকে কিছু না বলে দুই আঙ্গুল দিয়ে কপাল চেপে ধরে হেটে চলে যায় উপরে। মীরা দরজা বন্ধ করে আহানের পিছু পিছু আসে। রুমে এসে আহান বিছানায় বসে পড়ে। মীরা আহানের সামনে বসে তার কপালে হাত রেখে বলে, “কি হয়েছে আপনার? সারাদিন কোথায় ছিলেন আপনি? একটা ফোনও করলেন না, আবার আমি ফোন দিলেও ধরেননি। এলেন এতো রাত করে। সারাদিন কিছু খেয়েছেন কিনা তাও জানি না।”
আহান মীরার উপর বিরক্ত হলো। সে বলল, “মাথা ব্যথা করছে মীরা। সরো তুমি।”
মীরা স্তম্ভিত! আহান মাথা ব্যথা বলে তাকে দূরে সরে যেতে বলছে? মীরা তাও বলল, “খাবেন না আপনি? সে-ই কখন থেকে বসে আছি। খেয়ে নিবেন চলুন।”
মীরা আহানের হাত ধরে টান দিতেই আহান আবারও বলে, “মীরা তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমার খিঁদে নেই, মাথা ধরে আছে।”
“আমি মুভ লাগিয়ে দেই?”
“লাগবে না।”
“আপনি এভাবে কেন কথা বলছেন? যা-ই বলি তাই না করে দিচ্ছেন।”
“দেখো মীরা! বললাম আমার ভালো লাগছে না। তুমি কেন এতো প্রশ্ন করে যাচ্ছ? এতো প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না এখন। কাল বলব সব। এখন ঘুমাও তুমি। আমাকেও একটু রিলেক্স করতে দাও।”
এই আহান সেই আহান নয়, যেই আহানকে মীরা চিনে। এতো পরিবর্তন একটা দিনে মানুষ কি করে হতে পারে? মীরা আরও কয়েকবার আহানকে খাওয়ার জন্য বলল। কিন্তু আহান উল্টো সিনক্রিয়েট করে বসে। দুজনের মধ্যে খুব রাগারাগি হয়। কথা কাটাকাটি হতে থাকে। আহানের ব্যবহারে মীরা দুঃখ পায়। আত্মসম্মানে লাগে তার। আহান মীরাকে যা তা বলে গেছে রাগের বসে। মীরা শুধু কাঁন্নাই করেছে। আহান কিছুক্ষণ মীরাকে কথা শুনিয়ে ব্যথার কারণে ঘুমিয়ে পড়ে। অন্যদিকে মীরা! তার অবস্থা দেয়ালে পিঠ ঠেকার মতো। আহান তার সাথে এমন দূর ব্যবহার করবে কল্পনার বাহিরে ছিল। মীরা ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। নিঃর্স্বাথভাবে আহানকে ভালোবেসেছে সে। কখনো আহানের কাছ থেকে কিছু চায়নি। আহানের পরিবারকেও সে ভালোবেসেছে। সবার দিকে খেয়াল রেখেছে। এমনকি পোষা বিড়ালটার দিকেও সে খেয়াল রেখেছে। মীরা যখন আহানের জীবনে আসে, তখন আহান একাকীত্ব নিয়েই ছিল। এখন যখন সব ফিরে পেয়েছে, মীরাকেই সে ভুলে গেছে। মীরা কখনো নিজের বিষয়ে ভাবেনি। আহান ও তার পরিবারের ব্যাপারে ভেবছে। কিভাবে কি করলে পরিবার জোড়া লাগবে, পরিবারে সুখ শান্তি আসবে, এসবই মীরার লক্ষ্য ছিল। আর আজ আহান, রাগের বসে তাকেই ছুড়ে ফেলে দিল! এতো সহজেই! মীরা যেমন সহজ ঠিক তেমনি কঠিনও। মীরার আত্মসম্মানে কেউ আঘাত দিলে, মীরা তাকে কখনোই ক্ষমা করে না। মীরার জেদ চাপলো। কাঁন্না নিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। এই শীতের মধ্যে সে শাওয়ার অন করে তার নিচে ভিজতে থাকে। শিরায় শিরায় কম্পন হচ্ছে তার। চোখের পানি সব শাওয়ারের পানিতে মিলে যাচ্ছে। কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে আজ শাওয়ারের নিচেই থাকবে। আহান এসে তাকে নিয়ে যায় কিনা এটা সে দেখবে।


সকাল আটটা বাজতে চলল। এতক্ষণে ঘুম ভেঙেছে আহানের। ঘুম থেকে উঠে পাশে মীরাকে সে দেখতে পায়নি। আশেপাশে চোখ বোলাচ্ছে। মীরা রুমে নেই। আহান উঠে বারান্দায় গেল। সেখানেও মীরাকে সে দেখেনি। ওয়াশরুমের কাছে আসতেই পানির আওয়াজ পায় সে। মীরা কি তবে ওয়াশরুমে? কিন্তু দরজা তো খোলা! বাহিরে থেকে আহান কয়েকবার মীরাকে ডাকল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসলো না। আহান দরজা খুলে। কিন্তু এমন একটা দৃশ্য দেখতে পায় সে, যা দেখে আহানের বক্ষঃস্থল কেঁপে উঠে! আহান দেখে মীরা ওয়াশরুমের ফ্লোরে পড়ে আছে। শাওয়ার অন করা। শাওয়ারের সব পানি মীরার গায়ের উপর পড়ছে। আহান দ্রুত এসে মীরার মাথাটা নিজের কোলে নেয়। আলতো করে মীরার দুই গালে হাত রেখে মীরাকে ডাকতে থাকে। মীরা নিস্তেজ হয়ে আছে। আহানেদ বুক কেমন ধক করে উঠল। চারপাশটা এলোমেলো লাগছে তার। মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছে কি করল সে। মীরাকে কোলে নিয়ে সে নিচে নেমে গেল। বাসার সবাই তখন নাশতা করছিল। এই অবস্থায় মীরাকে দেখে সবার আত্মা কেঁপে উঠে। আহান হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায়। পিছনে ছোটে মিরাজ, মীরার মা, দিবা, আয়ান ও মীরার বাবা। এতজন মানুষ ছুটে গেল আহানের পিছনে। বারবার ডেকে চলেছে আহানকে মীরার কি হয়েছে। কিন্তু আহান কোনো জবাব দেওয়ার অবস্থাতেই নেই। আহান একটা সিএনজি করে মীরাকে নিয়ে চলে গেল। পিছনে ওরা সবাই একটা সিএনজি করে আহানের পিছু নিল। মীরার মা কাঁন্নায় ভেসে যাচ্ছেন। সবাই চিন্তায় একেবারে অস্থির।

কিছুক্ষণ পর আহান মীরাকে নিয়ে একটা হসপিটালে আসে। জোরে জোরে ডক্টরকে ডাকতে থাকে। একজন ডাক্তার এসে দেখলে৷ একটা ক্রিটিকাল অবস্থা। উনি জিগ্যেস করলেন, “এসব কি? ওনার এই অবস্থা কেন? কিভাবে হলো?”
আহান তুতলে বলল, “শা..শাওয়ারের পানি পড়েছেহহ! প্লিজ ডক্টর, আমার ওয়াইফকে একটু দেখুন।”
আহানের মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না। ডক্টর দেরি করলেন না। মীরাকে আইসিউতে নিয়ে গেলেন। আহানের সারা শরীর কাঁপছে। কাল রাতের কথা মনে পড়ে গেল। কাল মীরাকে রেগে যা তা বলে ফেলেছে সে। তার ফল সে এভাবে পাবে? মীরাকে হারিয়ে? আহানের চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি পড়তে থাকে৷ এদিকে মিরাজরা সবাই এসে পড়েছে। একজন ডাক্তার এসে বললেন, “একেবারে লাশ বানিয়েই এনেছেন দেখছি। একটা কাজ করতেন, মেরেই ফেলতেন!”
ডাক্তারের কথায় আহান রেগে যায়। ডাক্তারের কলার চেপে ধরে বলে, “একদম বাজে কথা বলবেন না। কিচ্ছু হবে না আমার মীরার।”
“ছাড়ুন আমাকে। আধমরা করে নিয়ে এসেছেন, এখন আমাকে শাসাচ্ছেন? ওনাকে বাঁচানো যাবে কিনা সন্দেহ। আপনারা বললে আমরা ওনার ট্রিটমেন্ট শুরু করব, কিন্তু লাইফ রিস্ক আছে।”
ডাক্তারের মুখে এসব শুনে আহান স্তব্ধ হয়ে গেল। ডাক্তারকে ছেড়ে ধপ করে বসে পড়ল ফ্লোরে। মীরার মায়ের কাঁন্না, আহাজারিতে সবাই ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে মিরাজ আহানের কলার চেপে ধরে বলে, “তুই আমার বোনের সাথে কি করেছিস? বিয়ের দিন তোকে কি বলেছিলাম! আমার প্রাণভোমরাকে আমি তোর হাতে তুলে দিলাম। যত্ন নিস। বলেছিলাম কিনা? কিন্তু তুই আমার কথাটা রাখলি না। আমার বোনকে কষ্ট দিলি। মেরেই ফেললি তাকে।”
“বিশ্বাস কর মিরাজ।”
“তোকে আমি আর বিশ্বাস করিনা আহান।”
“খুব ব্যস্ত ছিলাম কাল। এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত প্রায়। তারউপর আমাদের এসিপি স্যার মারা গেছেন। সেখানে যেতে হলো। থানায় এসে দেখলাম অনেকগুলো ফাইল পড়ে আছে। ওগুলো দেখতে হলো। একটা মিশনে যাওয়ার কথা ছিল তার প্ল্যান করেছি সবাইকে নিয়ে। ভেবেছিলাম বাসায় চলে যাব, কিন্তু মীরা বলেছিল সে তাদের বাসায় যাবে। রাত গভীর হলেও আমি তোদের বাসায় আসি। মাথা ব্যথায় শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। আসার পর থেকেই মীরার প্রশ্ন করা শুরু হয়ে গেল। আমি তাকে বলেছি কাল সব বলব। এখন মাথা ব্যথা করছে। মীরাকে বলেছি ঘুমাতে। কিন্তু সে আমার কথাই শোনেনি। আবারও প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করতে থাকে। একটু রাগ উঠল। মীরার সাথে মিসবিহেভ করে ফেলেছি আমি। কিন্তু তার বদলে মীরার এই হাল আমি চাইনি। আমি পারছিনা মিরাজ।।আমার মীরাকে বাঁচা।”
“খবরদার তোর মুখে আমার বোনের নাম নিবি তো! আমার বোনটা আসার পর থেকেই তোকে কল দিয়ে যাচ্ছে। তোর চিন্তায় সে এক গ্লাস পানিও খায়নি। কতবার বলেছি খেয়ে নে। কিন্তু না ওর এক কথা, তুই আসলেই ও খাবে। আর সে-ই তুই কিনা আমার বোনকে এভাবে শাস্তি দিলি? শোণ আহান, তুই এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে যাবি। এক্ষুনি।”
“মিরাজ!”
“ডাকবিনা আমায়।”
ডাক্তার তাড়া দিচ্ছেন। মিরাজ ডাক্তারকে মীরার চিকিৎসা করাতে বললেন। আহান দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলো। ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে তার। কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here