তোমার_আমার_চিরকাল🌸 || পর্ব – ৪৬ || #লেখনীতে_বিবি_জোহরা_ঊর্মি

#তোমার_আমার_চিরকাল🌸
|| পর্ব – ৪৬ ||
#লেখনীতে_বিবি_জোহরা_ঊর্মি

ভোঁর হতেই আহান মীরাকে নিয়ে হেটে চলেছে। ভোঁরে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে নামাজ পড়ে রেড়ি হতে। মীরা ঠিক বুঝলো না কেন। মীরা নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় ঘুরাঘুরি করলো। আহান এসেই মীরাকে ধমক দিয়ে বলে রেড়ি হতে। এই ভোঁর বেলা কোথায় যাবে তাও বলেনি। বাধ্য হয়ে মীরা রেড়ি হলো। একটা সুন্দর সাদা চুরিদার পড়লো। শাড়ি পড়লে ঠিক সামলাতে পারবে না। বাহিরে একটু আলো ও একটু অন্ধকার রয়েছে। আহান যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে মীরাকে সেটাই সে বুঝতে পারছেনা। মীরা বিরক্তি নিয়ে বলল, “আপনি বলবেন কোথায় যাচ্ছি? দেখুন, বাহিরে এখনো অন্ধকার। কোথায় যাচ্ছি?”
“সময় হলেই জানতে পারবে। আগে এসো।”
একটা বাজারের কাছে আসলো তারা। বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ। ওখানে দুজন সেনাবাহিনীর লোক দাঁড়িয়ে ছিল৷ আহান তাদের কাছে গিয়ে কি কি যেন বলল। মীরা দূর থেকে কিছুই শুনতে পেলো না। আহান এসে আবারও মীরার হাত ধরলো। সামনের দিকে এগিয়ে চলল। পিছনে সেনাবাহিনীর লোক দুটোও আসছে। মীরা আবার জিগ্যেস করলো। “বলুন না কোথায় যাচ্ছি। আর ওনারা আমাদের পিছনে আসছেন কেন?”
“আমি ওদের বলেছি আসতে। কথা বলো না। গেলেই দেখতে পারবে।”
মীরার প্রচন্ড রাগ উঠে। নিজের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। হাটতে হাটতে পাহাড়ের কাছে চলে এলো তারা। আহান দুটি লাঠি নিয়ে একটা মীরাকে ও একটা নিজের কাছে রাখলো। তারপর মীরার হাত ধরে বলল, “সাবধানে উঠবে। আমাকে ধরে রাখবে, পরে যেতে পারো। আমরা এখন পাহাড়ে উঠব।”
“এটা তো অনেক উঁচু!”
“এখানেই আমরা উঠব।”
মীরা একবার উপরে তাকিয়ে আবার নিচে তাকাল। এতো উঁচুতে উঠতে গিয়ে যদি আবার সে পড়ে যায়? শুভ্র মেঘগুলো আকাশের অনেকটা নিচে, মাথার উপরে ভাসছে। আচ্ছা, পাহাড়ের চুড়ায় উঠলি কি এই মেঘগুলো ছোঁয়া যাবে? মনে মনে ভাবতে থাকে মীরা। আহান মীরার দিকে হাত বাড়াল৷ মীরা আহানের হাত ধরে উপরে উঠতে নিল।
.
উঠতে উঠতে পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে ওরা। কিন্তু এর মাঝে মীরা একবার পড়ে যেতে নিয়েছিল। আহান তাকে শক্ত করে ধরে নিয়েছে বিধায় এ যাত্রায় বেঁচে গেল। প্রচন্ড শীত করছে। মীরা শুধু একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে এসেছে। আর আহান জ্যাকেট পরে আছে। মীরার চুলের সাথে কি যেন লেগে মীরার চুল ভিজিয়ে দিল। মীরা আসে পাশে তাকিয়ে দেখে মেঘগুলো একদম তাদের কাছাকাছি। পাহাড়ে উঠে হাঁপাতে শুরু করল দু’জন। এক টুকরো মেঘ এসে মীরার গাল স্পর্শ করল। সাথে সাথেই মীরা চমকে উঠল। মেঘ গলে পানি হয়ে গেল। মীরা খুশিতে লাফিয়ে উঠে আহানকে বলল। “মেঘ! মেঘ এসে ছুঁয়ে গেল আমায়। আহান!”
“মীরা বেশি লাফালাফি করবে না। আমরা এখন অনেক উঁচু পাহাড়ে আছি।”
“আপনি দেখুন, কত মেঘ! কি সুন্দর দলবেঁধে ভেসে যাচ্ছে।”
“একটু অপেক্ষা করো আরও একটা জিনিস দেখাব তোমায়।”
মীরা ও আহান পূর্ব দিকে তাদের থেকে কিছুটা সামনের দিকে, জড় হয়ে থাকা পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। মীরা খুব উচ্ছ্বাসিত। একটু পর ঐ পাহাড়ের মধ্য থেকে একটু একটু আলো ছড়িয়ে পড়লো। দীপ্তিময় সোনালী সূর্য উদয় হতে লাগল। এতো কাছ থেকে সুর্য উদয় কখনো দেখেনি মীরা। সূর্য উদয় হচ্ছে আর সামনের ভেসে যাওয়া মেঘগুলোকে ঢেউ এর মতো মনে হচ্ছে। সমুদ্রে সূর্য অস্তের সময় যখন সমুদ্রের পানি ঢেউ তোলে, ঠিক তেমনি মেঘগুলোও যেন ঢেউ খেলছে। আস্তে আস্তে সূর্যটা পাহাড় থেকে বেরিয়ে সবকিছু আলোকিত করে দিয়েছে। মীরা ও আহান মুগ্ধ হয়ে দেখছে। এতো সুন্দর মুহুর্ত তাদের জীবনে কখনো আসেনি। আহান মীরার দিকে ফিরে তাকাল। দু’কদম পিছিয়ে গেল সে। মুখের দু’পাশে হাত রেখে স্ব জোরে চিৎকার করে বলল, “মীরা! আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ শেহজাদী! লাভ ইউ আ লট।”
পাহাড়ের স্ব উচ্চতায়, আকাশের নিচে, সূর্য উদয় এর সময়, মেঘেদের এতো কাছে থেকে কেউ মীরাকে ‘ভালোবাসি’ বলবে তা আগে কখনো কল্পনা করেনি সে। আহানের কথাগুলো তার কানের বেজে যাচ্ছে। পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বলায় আহানের আওয়াজ ডাবল শোনাচ্ছে। মীরা চোখ বুজে নিল। টুপটুপ করে পানি পড়ছে চোখ থেকে। সব কাঁন্না কষ্টের হয়না, কিছু কাঁন্না আনন্দের হয়। মীরা এগিয়ে গিয়ে আহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখের পানি অনবরত গড়িয়ে পড়ছে। নাক টেনে বলল, “আই লাভ ইউ টু আহান।”


দিবাকে মীরার মা এসে বলল বারোটায় রেড়ি হয়ে থাকতে। দিবা কিছু না বুঝে তার ফুপিকে জিগ্যেস করল, “রেড়ি হয়ে কোথায় যাবো ফুপ্পি?”
মীরার মা বললেন, “আজ এক জায়গায় দাওয়াত আছে সবার।”
“তোমরা যাওনা। আমি বরং বাসায় থাকি।”
“ঠাটিয়ে এক চড় মারব! তোকে একা রেখে আমরা যাব ভেবেছিস?”
“আমাকে দেখে যদি কেউ কিছু জিগ্যেস করে।”
“কে কি বলবে? আমরা মীরাদের ওখানে যাচ্ছি।”
চমকে উঠে দিবা। “মীরারা এসেছে?”
“নাহ্। ওর শাশুড়ী কাল আমাদের সবাইকে দাওয়াত দিয়ে গেছেন। তাড়াতাড়ি রেড়ি হয়ে নে।”
“আমি না গেলে হয়না?”
“আমি তোকে রেড়ি থাকতে বলেছি। দ্বিতীয়বার যেন বলতে নাহয়।”
দিবার মন খচখচ করছে। মীরা নেই। ও বাসায় তো আয়ান আছে। মীরা থাকলে নাহয় তার সাথে গল্প করে সময় কাটিয়ে আসা যেত। কিন্তু এখন ওখানে একা বসে থাকবে? আয়ানের সামনে যেতে চায়না সে। কিন্তু এই কথাটা সে কি করে বোঝাবে তার ফুপিকে।

দুপুর বারোটা বেজে গেছে। দিবা এখনো রেড়ি হয়নি। সে এখনো ভাবছে যাবে কি যাবে না। আয়ানের মুখোমুখি সে হতে চায়না। মীরার ভাবি এসে দেখল দিবা কি যেন ভাবছে বসে বসে। উনি ভ্রু কুচকে জিগ্যেস করলেন, “এই তুমি রেড়ি হওনি?”
দিবা চমকে উঠে। হঠাৎ মীরার ভাবির আগমন তাকে ভাবনার জগৎ থেকে বের করে আনে। “আসলে আমি ভুলে গিয়েছিলাম।”
“আমরা সবাই রেড়ি হয়ে গিয়েছি। শাওয়ার নিয়েছ তো?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে চটপট রেড়ি হয়ে নাও।”
মীরার ভাবি এসে দিবার ব্যাগ থেকে একটা গাউন বের করে দিলেন। তার সাথে সেলোয়ার, ওড়না ও মেচিং হিজাব দিলেন। দিবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্নামেন্টস নেই?”
“আছে তো।”
“তাড়াতাড়ি করে সব পড়ে রেড়ি হও। মা কিন্তু তোমাকে বকবে।”
“আচ্ছা।”
দিবার আর কিছু করার ছিলনা। সে বাধ্য হয়ে রেড়ি হতে লাগলো।


মীরারা রিসোর্টে বসে খাবার খাচ্ছে। একটু পরেই তারা বেরিয়ে পড়বে। মীরার বেশ মন খারাপ। আরও দুইদিন থাকার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু আহানের ছুটির কথা ভেবে তাদের আজ যেতে হচ্ছে। ফেণী যেতে যেতে রাত হবে। আবার কাল সকালে আহানকে থানায় যেতে হবে। খেতে খেতে মীরা বলল, “আচ্ছা কাল আমরা কোথায় গিয়েছিলাম?”
“কংলাক পাহাড়ে।”
“জায়গাটা অনেক সুন্দর। আসেপাশের আদিবাসী মানুষগুলোকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। ইচ্ছে করছিল এখানেই সারাজীবন থেকে যাই।”
“এরপর যখন আসব, তখন এক সাপ্তাহর ছুটি নিয়ে আসব। তোমায় সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাব।”
“কাল সন্ধ্যার মুহুর্ত আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না। এই খোলা বারান্দা, মুক্ত আকাশে হাজারো তারার মেলা। জ্যোৎস্না ছড়ানো পূর্ণিমার চাঁদ, আমি আপনি পাশাপাশি বসা, একসাথে চাদর মুড়ি দিয়ে চন্দ্র বিলাস! আমি কখনো প্রত্যাশাই করিনি আমার জন্য এতো কিছু অপেক্ষা করছিল। ধন্যবাদ আহান। আমাকে এতো সুন্দর সুন্দর মুহুর্ত উপহার দেওয়ার জন্য। এগুলো সব স্মৃতি হয়ে আজীবন আমার মনে গেঁথে থাকবে।”
“নিজের শেহজাদীকে খুশি রাখার চেয়ে বড়ো কিছু আর কি হতে পারে! তোমাকে হাসিখুশি রাখা আমার দায়িত্ব! ধন্যবাদ দিচ্ছ কেন? আমি কি পর?”
“আমি কখন বললাম আপনি পর।”
“তাহলে ধন্যবাদ দিচ্ছ কেন?”
“কি বলব তাহলে?”
“কিছুই না। সব সময়, সব পরিস্থিতিতে তোমার ঠোঁটের কোণে এই হাসিটা জড়িয়ে রাখবে। এটাই আমি চাই।”
“ভালোবাসি আহান।”
“ভালোবাসি শেহজাদী।”


আয়ানদের বাসায় সবাই বসে গল্প করছে। ওদিকে আয়ানের মা একা হাতে সব রান্না করেছেন। এক এক করে ডাইনিং টেবিলে সব সাজিয়ে রেখেছেন। সবার সাথে বসে এখন গল্প করছেন। দিবা অসহায় হয়ে সবার কথাবার্তা শুনছে। অন্যদিকে মেহেজাবিন কাঁন্না করায় মীরার ভাবি তাকে নিয়ে একটা রুমে চলে গেছে। সাথে মিরাজও। দিবা ভাবছে, বলির পাঠা হিসেবে তাকে এখানে রেখে ওরা চলে গেল। ড্রয়িংরুমের কোথাও আয়ানকে দেখতে পায়নি দিবা। এদিকে ওদিকে চোখ বুলিয়েও দেখল না। তাহলে কি আপদটা বাসায় নেই? আয়ান নেই ভেবে মনে মনে বেশ খুশি হলো দিবা। আস্তে করে উঠে গেল সবার সামনে থেকে। ভাবল একবার মীরার রুমে গিয়ে ঘুরে আসা যাক। ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে সে উপরে উঠে গেল। কয়েক কদম পা পেলে দুইটা রুম পেরিয়ে এলো সে। মীরার রুমে যেতে আরো একটা রুম তাকে পেরোতে হবে। তিন নাম্বার রুমটা ক্রস করতে যাবে, ঠিক সেই মুহুর্তে এক বলিষ্ঠ হাত তার ডান বাহু ধরে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল। চেপে ধরল দেয়ালের সাথে। দিবা আতঙ্কিত হয়ে ভয়ে কুকড়ে উঠে। শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে তার। সামনের মানুষটির দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল সে। তাকে দেখে রীতিমতো কাঁপা শুরু করল দিবা। গলা শুকিয়ে এলো তার। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে বলল, “আপনি! এভাবে অসভ্যের মতো আমাকে টেনে নিয়ে এলেন কেন? আবার আমার হাতও ধরে রেখেছেন। ছাড়ুন আমাকে।”
আয়ান দিবার বাহু ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, “স্যরি।”
দিবা ছাড়া পেয়ে চলে যেতে নেয়, তখন আয়ান তাকে পিছন থেকে ডেকে বলে, “শোণ।”
দিবা দাঁড়িয়ে যায়। আবার কি বলবে এই ছেলে? দিবা আয়ানের দিকে ফিরে তাকায়। আয়ান বলল, “সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখীত দিবা। আমি সেদিন একটু বেশিই রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছি। তা-ই তোমাকে যা তা বলে দিয়েছি। স্যরি দিবা।”
“আপনি যা বলেছেন কোনো কিছুই ভুল বলেননি। আমার ভুল ছিল। আমি আপনার পারসোনাল বিষয়ে নাক গলিয়েছি। তা-ই ভুলটা আমারই। আপনি কেন স্যরি বলছেন। আপনি যা বলেছেন সবই তো সত্যি।”
“বিশ্বাস করো দিবা আমি ওভাবে তোমায় বলতে চাইনি।”
“থাকনা। বাদ দিন। আমি ওসব কবেই ভুলে গিয়েছি। আর আপনাকে ধন্যবাদ। কাল অনেক বড়ো বিপদের হাত থেকে আপনি আমায় বাঁচিয়েছেন।”
“নিজের লোকদের ধন্যবাদ দিতে নেই।”
দিবা কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। আয়ান তার বিছানায় বসে পড়ল। গিটারটা হাতে নিয়ে ভাবল, যার জন্য এতো এতো গান লিখলো সে-ই তাকে পাত্তা দেয়না, এড়িয়ে চলে। হঠাৎ দিবা আবারও এলো। আয়ান চমকে তার গিটারটা পাশে রেখে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কিছু বলবে?”
“হুম। আপনি দিন দিন কেমন যেন মাস্তানের মতো হয়ে যাচ্ছেন। চুল দাড়িগুলো তো কেটে ছোট করতে পারেন নাকি? আপনার বিরক্ত লাগে না?”
“নাহ্। ভাবছি অনেক বড়ো মাস্তান হবো। তারপর এই সারা শহরে রাজত্ব করব। কিন্তু আমার একটা রাণীর অভাব!”
“আপনি একটা গাঁধা। মাস্তান হলে আহান ভাইয়া মেরে আপনার পিঠের ছাল তুলে ফেলবে।”
“এতো সহজ নাকি! আহানের চেয়ে আমি কোনো অংশে কম নই।”
“চুল দাড়িগুলো কাটবেন দয়া করে।”
“আমার চুল দাড়ি নিয়ে তোমার এতো মাথা ব্যথা কিসের।”
একটু মুড নিয়ে বলল আয়ান। দিবা রাগে কটমট করতে করতে বলল, “কিচ্ছু না। আসছি। থাকুন আপনি। মাস্তান একটা।”
দিবা সুর সুর করে বেরিয়ে গেল আয়ানের ঘর থেকে। আয়ান মুচকি হেসে বলল, “মাস্তান! বেশ ইন্টারেস্টিং তো।”
আর কিছু পাক না পাক একটা নাম পেয়েছে সে দিবার কাছ থেকে। “মাস্তান!”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here