তোমার_আমার_চিরকাল🌸 || পর্ব – ৪৪ || #লেখনীতে_বিবি_জোহরা_ঊর্মি

#তোমার_আমার_চিরকাল🌸
|| পর্ব – ৪৪ ||
#লেখনীতে_বিবি_জোহরা_ঊর্মি

রাতের শহর বেশ জমকালো। তবে রাত যত গভীর হয় নিস্তব্ধতা এসে ভিড় করে। কোলাহল কমতে শুরু করে। আর নিস্তব্ধ রাত মীরার খুব পছন্দের। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। কি সুন্দর জ্যোৎস্না ছড়িয়েছে। রাস্তায় যানবাহন ও মানুষের চলাচল রয়েছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের এই অপূর্ব দৃশ্য দেখছিল মীরা। ঠান্ডার মধ্যে সোয়েটার পরে রেখেছে সে। আহান তার বন্ধুর সাথে বাহিরে গিয়েছে। মীরাকে একা রেখে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিল না তার। কিন্তু ওর বন্ধু ওকে জোর করে নিয়ে গেছে।
মীরা একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে কখন আহান আসবে। ঠকঠক করে আওয়াজ হয় দরজায়। মীরা বারান্দা থেকে বেরিয়ে আসে। দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে দেখে আহানের বন্ধুর স্ত্রী হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মীরা তাকে ভিতরে আসতে বলল। উনি ভেতরে এসে বললেন, “এখানে একা একা বসে না থেকে চলো তুমি আমাদের সাথে আড্ডা দিবে।”
মীরা ভাবল আসার পর থেকে এদের সাথে তেমন একটা কথা হয়নি। যেহেতু এখন আহান নেই, তাই ওদের সাথে বসে গল্প করা যেতেই পারে। মীরা সম্মতি জানায়। তারা দুজন একসাথে চলে গেল ড্রয়িংরুমে। সেখানে বাচ্চারা কার্টুন দেখছে আর বৃদ্ধা মহিলাটি বসে বসে পান খাচ্ছেন। মীরা ওদের সামনে গিয়ে বসলো। বৃদ্ধা মহিলাটি মীরাকে জিগ্যেস করলেন, “তুমি কি চুপচাপ? কথাবার্তা খুব একটা বলো না দেখছি।”
মীরা লজ্জায় পড়ে গেল। অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষজন কি বলবে সেসব মাথায় আসেনি তার। লাজুক হেসে মীরা জবাব দিল। “আমি আসলে একটু সংকোচবোধ করছিলাম।”
ভাবি বললেন, “কথা বলতে আবার সংকোচ কিসের? আচ্ছা, তোমার বাসা কোথায়?”
“আমার বাসা ফেনীতে। একাডেমিক রোড এর ডাক্তার পাড়ায় আমাদের বাসা।”
“তোমাদের দুজনের বাসায়ই এক জায়গায়?”
“হ্যাঁ, ওনার বাসা আর আমাদের বাসার মধ্যে পাঁচ মিনিটের ব্যবধান।”
“তোমাদের কি লাভ ম্যারেজ?”
মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন ভাবি। মীরা স্বাভাবিক হয়ে জবাব দিল। “জি, আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করতাম। বাসায় ভাইয়া জানিয়েছে। আমার ভাইয়া আমাদের সম্পর্কে সব জানতো। পরিবারের আলোচনার পর আমাদের বিয়ে ঠিক হয়।”
“দারুণ তো। জানো, আমাদেরও লাভ ম্যারেজ। আমার বাসা গাজিপুর। সোশ্যাল মিডিয়ায় দুজনের আলাপ, এরপর প্রেম অবশেষে প্রণয়।”
“আপনার অসুবিধা হয়না এতো দূরে জার্নি করতে?”
“হয়, তবে আমি মানিয়ে নিয়েছি। আসলে এখন আমার গাজিপুর যেতেই ইচ্ছে করে না। বাচ্চারা আছে। আর আমি চলে গেলে আমার শাশুড়ী মা একা হয়ে পড়েন। ওনাকে ছেড়ে যেতে আমার ইচ্ছেই করে না। আমার পরিবার তো এতো দূরের সম্পর্ক মেনে নিতেই চায়নি। আমার শাশুড়ী তখন ঢাল হয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ায়। উনি আমাকে নিজের মেয়ের মতো যেভাবে আগলে রাখেন, ওনার বাঁধন ছেড়ে যেতে ইচ্ছেই করে না আমার।”
ভাবির কথায় মীরা মুগ্ধ হলো। বউ শাশুড়ীর কতো ভাব। তার শাশুড়ীও এখন তার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে উঠেছে। শুধু মাঝে মাঝে আহানের মায়ের কথা মনে হয় তার। ওর নিজের শাশুড়ী আজ বেঁচে থাকলে না জানি কি কি করতেন ছেলের বউদের জন্য। এসব ভেবে দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়ল।
কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। আহানরাও এসে গেল। আহানের হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট দেখল মীরা। আহান প্যাকেটটা নিয়ে তাদের রুমে চলে গেল। মীরাকে কিছু বলল না। মীরার একটু সন্দেহ লাগলো। কি আছে ওই প্যাকেট এ? কৌতূহল মীরার বরাবরই একটু বেশি। কিন্তু সে এখন জানতে চাইবে না। যেহেতু আহান তাকে না দেখিয়ে ওটা নিয়ে চলে গেছে সেহেতু, আহান এখন ওটা কিছুতেই দেখাবে না। রাত দশটার মধ্যে খাওয়া দাওয়া হয়ে যায়। খাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ আড্ডা হলো চারজনের। মীরার ঘুম পেলে সে চলে যায় রুমে। মীরাকে যেতে দেখে আহানও আর ওখানে থাকে না।

রুমে এসে বিছানা গোছাচ্ছে মীরা। আহান মীরার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। বিছানা গোছানো শেষ হলে পিছন ফিরতেই আহানের সাথে ধাক্কা খায় সে। হকচকিয়ে বলে, “এভাবে কেউ পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে? কথাবার্তা ছাড়া! আজিব।”
আহান কিছু বলল না। একটা ড্রয়ার থেকে তখন আনা প্যাকেটটা বের করলো। মীরাকে দিয়ে বলল, “তোমার জন্য।”
মীরা বিস্মিত হলো। এটা তাহলে সারপ্রাইজ ছিল, তাই আহান তখন তাকে দেয়নি? মীরা আহানের হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেললো। প্যাকেটের ভেতরে অনেকগুলো চকলেট ছিল। নিজের পছন্দের সব চকলেট দেখে সবগুলোই হাতের মুঠোয় নিল মীরা। চকলেট পেয়ে খুব খুশি হয়ে গেল মীরা। ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখেছে বিজয়ের হাসি। যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছে সে। নিজের প্রিয়তমাকে খুশি দেখে আহানের বেশ ভালো লাগে। নিষ্পলক মীরার দিকে চেয়ে থাকে অনিমেষ। মীরা চকলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আহান নিজের হাত দুটো পিছনে গুঁজে রাখল। হুট করেই ঝুঁকে মীরার ঠোঁটে কিস করে বসলো সে। মীরা কিংকর্তব্যবিমুঢ়! হাতে থাকা চকলেটগুলো আপনা আপনিই ফ্লোরে পড়ে গেল। চোখ বড়ো বড়ো করে আহানের দিকে তাকিয়ে দেখে সে দুচোখ বন্ধ করে আছে। পুরো শরীর জুড়ে এক অজানা শিহরণ বইছে তার। আহান নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ছে না। একিভাবে আঁকড়ে ধরে আছে মীরার ঠোঁটজোড়া। একটুপর মীরার কোমর চেপে ধরলো আহান। মীরাকে আরও কাছে টেনে নিন। মীরার পুরো শরীর কাঁপছে! নিজেকে ছাড়ানোর কোনো রাস্তাই দেখছে না মীরা। আত্মসমর্পণ করলো আহানের কাছে। চোখ বুজে নিয়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো আহানকে।
অতিবাহিত হলো অনেকটা সময়। একে অপরের সাথে মিশে আছে তারা। মিষ্টি আলিঙ্গনে মগ্ন দু’জন। ঘোর কাটবে না সহজেই। আজ দুজন দুজনের খুব কাছাকাছি। প্রেমের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে তাদের মাঝে। রাতের শেষ ভাগ অতিক্রম হচ্ছে। ভালোবাসার রেশ কাটেনি এখনো। সকাল হয়ে যাবে একটু পরেই। শরীর জুড়ে ক্লান্তি এসেছে। কিছুক্ষণ ঘুমের প্রয়োজন। সকাল হলেই নতুন দিন, নতুন মুহুর্তর সাথে আলাপ হবে।


সারারাত ঘুম আসেনি আয়ানের। বিছানার এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি খেয়েছে। ছটপট করেছে। শুধু ভেবেছে, দিবাকে কি হার্ট করে ফেলল? এতো বেশি না বললেই পারতো। আবার ব্লকও করে দিয়েছে। দিবা কি কষ্ট পেয়েছে? অস্থির লাগছে আয়ানের। বিছানা থেকে উঠে বসল সে। গায়ের কম্বলটা সরিয়ে দিল। এই শীতের মধ্যেও সে ঘামতে শুরু করল। ট্রি টেবিলের উপর রাখা গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে গ্লাসটি নিয়ে পানি খেল। গ্লাসটি টেবিলের উপর রেখে কপালে দুই আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরলো। ফোনটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজগুলো দেখতে লাগল। নাহ্। অনেক কিছুই বলে ফেলেছে দিবাকে। ভাবতে ভাবতে আনব্লক করে দিল দিবার আইডিটা। দেখা হলে একদিন স্যরি বলে নিবে। কিন্তু আদৌও কি দেখা হবে? পরে মনে পড়ল পরিক্ষার কথা। দুইদিন পরেই তো ডিগ্রির ফাইনাল পরিক্ষা। ওটা তো ফেনী কলেজে হবে। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখে ফুটে উঠল আয়ানের। ভাবছে পরিক্ষা যখন তাদের কলেজেই দিতে আসবে, তাহলে দেখা করে ক্ষমা চেয়ে নিবে। কে জানে দিবা ওকে কি ভাবছে। গালিগালাজ করেনি বলে অভদ্র আর অসভ্য ভাবেনি নিশ্চয়ই। হয়তো ভেবেছে রাগী, বদমেজাজি। এসবই ভাববে, অভদ্রতা বা অসভ্যতার মতো তো সে কিছু করেনি। প্রিতি ছাড়া তার আরও দুজন মেয়ে ফ্রেন্ড আছে। তাদের কখনো একটা খারাপ শব্দও বলেনি সে। প্রিতি তো ছোটবেলার বন্ধু। কিন্তু এরা তো সেই হাই স্কুল থেকে ওর সাথে আছে। কোনো মেয়ে কেন, ছেলেবন্ধুগুলোর সাথেও গালি দিয়ে কথা বলেনি। খারাপ শব্দ উচ্চারণ করেনি। অসভ্য অভদ্র হলে তো অনেক আগেই হতো। তবে সে শান্ত নয়। দুষ্টামি করে প্রচুর। আজ আর তার ঘুম আসবে না। এই সময়টাকে সে কাজে লাগাল। চেঞ্জ করে ওয়াশরুমে গিয়ে অজু করলো। রুমে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে শুরু করল। একটু পরেই ফজরের আজান দিবে। নামাজ পড়ার জন্য এমনিতেই তাকে উঠতে হতো। আয়ান তার বাবা ও ভাইয়ের মতো পাঁচ ওয়াক্তই নামাজ পড়ে। অন্তত নামাজের দিক দিয়ে ওরা সবাই ঠিকাছে। আর বাকিসব যেখানে যাক। সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করবেই।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here